‘হাজার টাকা। একশোটা দশ টাকার নোটের একটা বান্ডিল। ব্যাঙ্ক থেকে তুলে বাসে উঠলুম।’
‘ব্যাগ তো মেজদি, লোকের হাতে থাকে।’
‘হাতেই ছিল। একটুক্ষণের জন্যে পাশে রেখে পানমশলা খাচ্ছিলুম, তারপর ভুলে গেছি তো ভুলেই গেছি। বেমালুম ভুল। জানিস তো আমার ভুলো মন! এখন কী হবে ভাই, অতগুলো টাকা!’
‘চলো একবার বাসগুমটিতে গিয়ে দেখি।’
আমি আর বলাই বাড়ির ভেতর না গিয়ে পেছনের বাগানে চলে গেলুম। বেশ কিছুটা হেঁটে পুকুরপাড়ে। আবার পরামর্শ।
বলাই বললে, ‘এইবার কী হবে?’
‘চল সোজাসুজি বলে দিই, ব্যাগ পুণ্যিপুকুরে।’
‘পাগল হয়েছিস। বলবে আমরা পকেটমার।’
‘বলতে পারে, তাই না?’
‘বলবেই। আর ও ব্যাগ তো জাল ফেলতে উঠবে না। ডুবুরি নামাতে হবে।’
‘তাহলে?
‘তুই তো ডুবসাঁতার জানিস?’
‘সে জানি, ভালোই জানি।’
‘তাহলে চল ব্যাগটাকে উদ্ধার করি।’
‘করে?’
‘করে, গুমটিতে জমা দিয়ে বাড়ি ফিরে যাই।’
‘এইবার ওরা যদি বলে, এতক্ষণ ছিলে কোথায়, ব্যাগটা ভিজে কেন?’
‘সেটা একটা কথা বটে। তাহলে ব্যাপারটা ভুলে যা।’
আমরা গরম লুচি আর আলুভাজা খাচ্ছি, বারান্দায় বেতের চেয়ার-টেবিলে বসে। মনটা বিষণ্ণ এমন সময় পিশেমশাই মেজদিকে নিয়ে হাসতে হাসতে, নাচতে নাচতে ফিরলেন, ব্যাগ পাওয়া গেছে টাকা সমেত। বলাই আর আমি হাঁ হয়ে গেছি। ওটা তাহলে কার ব্যাগ!
রাজা
ছবির মতো গ্রামখানি। ছোট্ট একটা নদী, সারাদিন কুলকুল করে কত কথাই বলে! সবুজ ধানখেত। গমের খেত। বড় বড় আমবাগান। ভোর হয় পাখির ডাকে। সন্ধ্যা নামে মন্দিরে আরতির ঘণ্টাধ্বনিতে। প্রত্যেক বাড়িতেই গরু আছে। নদীর ধারের সবুজ মাঠে সার বেঁধে তারা। চরতে যায় রোজ সকালে পথের লাল ধুলো উড়িয়ে। নধর গাভী। সঙ্গে তাদের বাচ্চা। আদর করে পরস্পর পরস্পরের গায়ে পড়ে। কখনও ছুটে ছুটে পথ চলে, কখনও থেমে থেমে। গরুর বাঁধা ঘণ্টার নানা রকমের টুংটাং শব্দ। সূর্য যখন নদীর ওপারে অস্তে নামে, আকাশ যখন গোলাপি লাল, তখন তারা আবার সার বেঁধে ফিরে আসে ঘুম-ঘুম চোখে।
বড় শান্তির গ্রাম। সকাল নটার সময় পাঠশালা বসে জমিদারের চণ্ডীমণ্ডপে। গ্রামের যত শিশু একসঙ্গে নামতা পড়ে। শিক্ষকমশাই বসে থাকেন আসনে। রোদের ঝাঁঝে তাঁর ফরসা মুখ লাল দেখায়। বাইরে বড় বড় প্রজাপতি ওড়ে। হলুদ রঙের বোলতা। ডুমো ডুমো ভ্রমর।
বারোটার সময় ওই ছোট নদীতে বালকের দল ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের কলকোলাহলে নদীর কী আনন্দ! গামছা দিয়ে ছোট ছোট মাছ ধরে আবার ছেড়ে দেয় জলে। এইটাই খেলা, এটাই তাদের আনন্দ।
ঠিক একটার সময় এই নদীর ধার দিয়ে ঘোড় চেপে একজন যায়। খুব সুন্দর দেখতে। গায়ে রংবেরঙ-এর তাপ্পি মারা ঝলমলে, ঝলঝলে একটা পোশাক, মাথায় নীল রঙের পাগড়ি, হাসি হাসি মুখ। সবাই বলে লোকটি একজন জাদুকর। রাজবাড়িতে জাদু দেখাতে যায়। অনেকে বলে, ইনিই আমাদের রাজা। ছদ্মবেশে এভাবেই ঘুরে বেড়ান। নদীর ওপারে পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট। একটা বাগানবাড়ি আছে। দুপুরবেলা রাজা সেইখানে যান। ওখানে একটা ঝরনা আছে। পাহাড়ের গা বেয়ে সাদা দুধের মতো ফেনা-ফেনা জল একটা সরোবরে এসে পড়ছে। সেই জলে কত হাঁস দোল খেতে খেতে ভাসছে। লাল, সাদা, নীল, গোলাপি, খয়েরি। বাগানের ছায়া ছায়া পথে গলা উঁচু বড় বড় রাজহাঁস রাজার মতো ঘুরে বেড়ায়।
ওই সরোবরে নাকি ভারী সুন্দর একটা সাদা নৌকো আছে। রাজা সেই নৌকোয় চড়ে সারাদুপুর ওই সরোবরে, হাওয়ায় ভেসে ভেসে, নৌকো যখন যেদিকে যায় সেই দিকে যাবেন। এই সময় তিনি বই পড়েন। নানারকম বই। এই রাজা কোনওদিন যুদ্ধ করেননি। এই রাজার কোনও প্রাসাদ নেই। সম্পত্তি নেই। মণিমাণিক্য নেই। ওই একটি ঘোড়া। রাজার রাজা ছাড়া আর কেউ নেই।
কখনও কখনও গাছের তলায় তাঁবু খাঁটিয়ে থাকেন। গাছের ডালপালা জোগাড় করে এনে ইটের উনুনে আগুন জ্বেলে নিজের রান্না নিজেই করে নেন। আর যখনই মানুষ বিপদে পড়ে রাজা সবার আগে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। গ্রামের একেবারে উত্তরে এক ব্রাহ্মণ পরিবারের ছোট্ট একটি। চালাবাড়ি আছে। সেইব্রাহ্মণ ভীষণ ভগবান-ভক্ত। ভগবানের কথা ছাড়া কিছু বলেন না। জীবনে কখনও কোনও অন্যায় কাজ করেননি। রাজা এই পরিবারটিকে ভীষণ ভালোবাসেন। অনেক সময় এখানেও থাকেন। রাজার একটা বাঁশি আছে আর আছে একটা লণ্ঠন। যখন যেখানে থাকেন সেইখানে রাতের বেলা একটা গাছের ডালে লণ্ঠনটা ঝুলিয়ে দেন। মিহি নীল রঙের আলো চারপাশে ছড়িয়ে যায়, তখন বোঝা যায় রাজামশাই কাছাকাছি কোথাও আছেন।
রাজা কেন এইব্রাহ্মণের ঘরে থাকেন?
সে-ও বেশ একটা কাহিনি আছে।
এই দেশে একবার খুব দুর্ভিক্ষ হল। পর পর তিন বছর এক ফোঁটা বৃষ্টি হল না। চাষের জমি। ফেটে চৌচির। নদী শুকিয়ে গেল। গাছের পাতা ঝরে গেল। সরোবরে জল নেই। ভীষণ, ভীষণ দুর্ভিক্ষ। মানুষ মারা যেতে লাগল অনাহারে। একমাত্র শকুনদেরই খুব আনন্দ।
এই গরিব ব্রাহ্মণ পরিবারের তখন খুব দুর্দিন। শাস্ত্র প্রচার করে আর মানুষকে ধর্মের উপদেশ দিয়ে সামান্য যা পান, তাতেই দিন চলে। সে রোজগারও বন্ধ মানুষের এই দুঃসময়ে। একবার এমন হল, পর পর পাঁচদিন কোনও খাদ্য জুটল না। টানা উপবাস। ছ-দিনের দিন ব্রাহ্মণ অল্প যবের ছাতু সংগ্রহ করতে পারলেন। ব্রাহ্মণ সেই ছাতু সমান চারভাগে ভাগ করলেন। তারপর সেটিকে তৈরি করে সবে খেতে বসেছেন সপরিবারে আর ঠিক তখনই দরজায় ঘা পড়ল। ব্রাহ্মণ উঠে গিয়ে দরজা খুললেন। দাঁড়িয়ে আছেন এক অতিথি। সাদরে নিয়ে এলেন ভেতরে। আসন দিলেন। এইবার আপ্যায়ন। নিজের ভাগের খাবারটি অতিথির সামনে ধরে দিলেন। তিনি নিমেষে সেটি নিঃশেষ করে বললেন, ব্রাহ্মণ! আপনি আমার বিপদ আরও বাড়িয়ে দিলেন। আমি দশদিন না-খেয়ে আছি। এই সামান্য ছাতুতে আমার খিদের আগুন যে আরও বেড়ে গেল!
