‘দুশো! দুশো টাকার টেবল ক্লক।’
‘আচ্ছা যান, একশো ষাট।’
লোকটার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আমি আগেও লক্ষ করেছি। যাকে ধরবে, তাকে বধ করে ছাড়বে। ঘড়িটা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল। সেই জার্মান রূপসির দিকে তাকিয়ে আমি বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলুম।
আমার স্ত্রী-র ঘরে কোনও ঘড়ি ছিল না। বাইরের দালানে একটা ওয়াল ক্লক সারা দিন খটর খটর করত, আর সময়মতো চড়া সুরে বেজে উঠত। রাতের দিকে যখন রোগের অসম্ভব বাড়াবাড়ি, রুগি যন্ত্রণায় ছটফট করছে, সেই সময় ঘড়িতে বাজছে রাত বারোটা। ঘড়িকে তো আর থামানো যায় না। সে এক বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা। ওই ওয়াল ক্লকটা আমি সরাব।
সকালের দিকে আমার স্ত্রী ওরই মধ্যে একটু ভালো থাকে। অসুখও আলোকে ভয় পায়। দিনের আলো নিবে গেলেই দাপাদাপি শুরু করে দেয়। আমি ঘড়িটাকে সাবধানে বুকের কাছে ধরে যখন তার ঘরে ঢুকলুম, তখন বাইরের প্রকৃতি রোদের আলোয় ঝলমল করছে। বালিশের পর বালিশ সাজিয়ে তাকে ঠেসান দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আমার মনে হল, আমি একটা কপূরের মূর্তি দেখছি। একটু একটু করে উবে যাচ্ছে। কপূর তার এই প্রাত্যহিক ক্ষয় জানে না। আমরা জানি। কাল যা ছিল, আজ আর তা নেই। দিন দিন সাদা, ফ্যাকাশে হয়ে আসছে, শুধু চোখ দুটো হয়ে উঠছে অসম্ভব রকমের উজ্জ্বল!
আমি বললুম, ‘দ্যাখো, তোমার জন্যে একটা ঘড়ি কিনে এনেছি। ভারী সুন্দর।’
ঘড়িটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। আমি তাকিয়ে আছি তার মুখের দিকে। চোখ দুটো ধীরে ধীরে জলে ভরে উঠছে। আমার একটা অস্বস্তি শুরু হল। কোনও অন্যায় করে ফেললুম না। তো! ধরা ধরা গলায় সে বললে, ‘সময়?’
আমি তার মনটাকে ঘুরিয়ে দেবার জন্যে বললুম, ‘জার্মানির ঘড়ি। সারাজীবন নিখুঁত সময় দেবে। একটুও এদিক-ওদিক হবে না।’
‘সুন্দর দেখতে। ভারী সুন্দর। পৃথিবীতে কত যে সুন্দর সুন্দর জিনিস আছে।’
‘এটা তোমার চোখের সামনে, এই তাকে থাকবে। তুমি বুঝতে পারবে ক’টা বাজল। একে-ওকে আর জিজ্ঞাসা করতে হবে না, ক’টা বাজল।’
‘একটা হিসেব বলো?’
‘কীসের হিসেব?’
‘এই আর কতটা বাকি আছে!’
তখনই মনে হল, ঘড়িটা এনে আমি ভুল করেছি। যার খরচের পালা, তার সামনে এই মাপের যন্ত্র হাজির করার অর্থ, তাকে সচেতন করা। আমি বললুম, ‘তুমি বড় বেশি ভেঙে পড়েছ। অসুখ কি। কারুর করে না!’
‘তিন মাস হল।’
‘হোক না, ছ’মাসও হতে পারে।’
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। যে যাবে, সে জানতে পারে। যাত্রীর কাছে ট্রেন আসার টাইমটেবল থাকে। আমি ঘড়িটাকে সামনের তাকে রাখলুম চোখের সামনে। সেকেন্ডের সাদা কাঁটা কালো ডায়ালের ওপর পাক মেরে চলেছে।
সেদিন রাতে ভীষণ বাড়াবাড়ি হল। অসম্ভব শ্বাসকষ্ট। একবার নিশ্বাস নেবার জন্যে মাছের মতো খাবি খাওয়া। নাকে অক্সিজেনের নল পুরে দেওয়া হল। ঘর ভরতি আত্মীয়স্বজন। রোজই আমরা দল বেঁধে রাত জাগি। আমি এক পাশে বসে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছি। ন-টা বাজল, এগারোটা বাজল। বাইরের দালানের ঘড়িতে আগেই বারোটা বেজে গেল দুর্দান্ত সুরে। আমার। ভাবনা হল, কোন ঘড়িটা ঠিক! বাইরেরটা না ভেতরেরটা। একশো ষাট টাকায় ঠকে গেলুম! মাঝে মাঝে আমার স্ত্রী-র নাক থেকে নল বের করে ইঞ্জেকশানের উঁচ দিয়ে ফুটো পরিষ্কার করে আবার নাকে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে।
বাইরের ঘড়িতে একটা বাজল। ভেতরের ঘড়িতে বারোটা বাজতে পাঁচ। আমি ভালো করে তাকালুম। সেকেন্ডের কাঁটাটা ঘুরছেনা। এ কী, ঘরের সময় ফুরিয়ে গেল নাকি! তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে ঘড়িটা তাক থেকে নামালুম। দু-দিকে দুটো দম দেবার চাবি। বাঁ দিকেরটা তিন পাক ঘোরাতেই চড়া সুরে অ্যালার্ম বেজে উঠল। আমাদের কুকুরটা একপাশে পাখার বাতাসে হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছিল। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ঘেউ ঘেউ শুরু করল। আমার এক আত্মীয়া বিরক্তির গলায় বললেন, ‘এখন ওসব থাক না।’ আমার ভুলটা বুঝতে পারলুম। অ্যালার্মের দমটা দিয়ে ফেলেছি। তখন ডান দিকের চাবিটা ঘোরাতে লাগলুম কটর কটর শব্দে। কোনওদিকে। আমার দৃকপাত নেই। খেয়াল নেই, একজনের সময় থেমে আসছে। যার দম হল বাতাস। সেই বাতাস টানতে পারছে না। আমার ঘড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। দীর্ঘ, সুঠাম সেকেন্ডের কাঁটা নেচে নেচে চলেছে। বাইরে গিয়ে সময়টা মিলিয়ে নিয়ে তাকে তুলে দিলুম। এখন আমার শান্তি। উদবেগ কেটে গেছে। দুটো ঘড়িই আমার এক সময় দিচ্ছে। সকলেই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। যার স্ত্রী-র এই রকম এখন-তখন অবস্থা, সে একটা ঘড়ি নিয়ে এই রকম ন্যাকামি করছে! সময় যে একটা দীর্ঘ রাজপথের মতো। গাড়ি যারা চালায় তারা জানে, পথের খারাপ অংশটা পেরোতে পারলেই আবার কিছুটা মসৃণ পথ, তখন সুন্দর পথ চলা। খারাপ সময়টা কোনওরকমে কাটাতে পারলেই আবার সুসময়। আমি যে সেই দিকেই তাকিয়ে আছি। ঘড়িতে সময়ের হাত ঘুরছে। দুটো বাজল, তিনটে বাজল। আমি জানি রাতটা কোনওরকমে পার করে দিতে পারলেই আমার স্ত্রী আবার কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠবে। গত তিনমাস ধরে রাতের অন্ধকার শক্তি জীবনের কূল থেকে অজানা সমুদ্রের কূলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে।
পুবের আকাশ রক্তিম হল। আমার স্ত্রী-র যন্ত্রণাকাতর চোখ দুটো সেই আকাশে। লাল। আরও লাল। অক্সিজেনের নল খুলে দেওয়া হল। একজন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললে, ‘ক্রাইসিস ইজ ওভার।’ রাতজাগানিয়ার দল একে একে বিদায় নিয়ে চলে গেল। লাল আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় আমার স্ত্রী জানাল, দিন এসেছে। রাতের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া আর একটা দিন। আমি তার পাশে বসে আছি। সে ফিশফিশ করে আমাকে বলল, ‘ঘড়িটাকে একটা সুন্দর। খোপ তৈরি করে এই উত্তরের দেয়ালে রেখো। বেশ দেখাবে। নারায়ণের ছবিটাকে সরিয়ে দিয়ো পুবের দেয়ালে।’ এই কথা ক’টি বলেই ক্লান্ত হয়ে বালিশে মাথা রাখল। বাইরে কোলাহল শুরু হয়েছে। দিনের প্রথম গাড়িটা সশব্দে চলে গেল। ‘বালিশ-তুলো’ হেঁকে চলেছে ধুনুরি। শীত আসছে। আমার জীবন থেকে একজন চলে যাচ্ছে। বসন্তের অপেক্ষায় সে আর থাকবে না। আমার এই দোতলা ঘরে সবই ঠিক আগের মতোই আছে। খাট, বালিশ, বিছানা, চাদর, বইয়ের শেলফ, ছবি, দেরাজ সব আছে। শুধু একজন নেই। সবাই প্রশ্ন করে, ‘উত্তরের দেয়ালে, তোমার অমন সুন্দর ঘড়িটা ন’টা পঁয়তাল্লিশ বেজে বন্ধ হয়ে আছে কেন?’ আমি পালটা প্রশ্ন করি, ‘বলো তো ওটা রাত না দিন?’ সেদিন ছিল শুক্লা দ্বাদশী। রাত নটা পঁয়তাল্লিশ। সময়টাকে সময়ের। স্রোতে আমি খুঁটির মতো পুঁতে রেখেছি। বাইরের ঘড়িটাকে আমি সরাইনি। সেটা চলছে। চলেই চলেছে। ওটাই আমার হিসেব। দেখতে চাই, নদীর কত দূরে এসে আর একটা খুঁটি পড়ে।
চরিত্র
ট্রেন ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে। অপরেশ জানালার ধারে গুছিয়ে বসলেন। স্টেশনে যাঁরা বিদায় জানাতে এসেছিলেন তাঁদের হাসিজড়ানো সসম্রম মুখের দিকে অপরেশ শেষবারের মতো তাকালেন। জোড়া জোড়া হাত নমস্কারের ভঙ্গিতে এখনও বুকের সামনে ঝুলছে। অপরেশ তাঁর মুচকি হাসি, ছড়ানো প্ল্যাটফর্ম থেকে তুলে:নিলেন। সবই তাঁর মাপা। সময়ের ফিতে তাঁর পকেটে ঘোরে। তাঁর সাহিত্যও ওই একই গুণে সমৃদ্ধ।
