লোকটি তখন ঘড়ির গুণাগুণে ব্যস্ত। গভীর অন্ধকারে ঘড়ি জুয়েলের মতো জ্বলবে। অ্যালার্ম আপনি দু-কায়দায় বাজাতে পারবেন। এক কায়দায় থেমে থেমে বাজবে। যত গভীর ঘুমই হোক, সে ঘুম আপনার ভাঙবেই। আর এক কায়দায় টানা বেজে যাবে। বাজতেই থাকবে। ঘুম থেকে। টেনে তুলবেই তুলবে।
‘দেখতে চান।’ বলেই সে লোকটি পেছন দিকে কী এক কেরামতি করতেই, ঘণ্টা বেজে উঠল। বেশ জোর, যেন স্কুল ছুটির ঘণ্টা। কিছুক্ষণ বেজে থামল। আবার বাজল, আবার থামল। সারা। ঘরে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। এক পাশে আমার ধবধবে সাদা, লোমঅলা কুকুরটা ঘুমোচ্ছিল। সে তড়াক লাফিয়ে উঠল। ঘড়িটাকে ধমকাতে লাগল ঘেউ ঘেউ করে। আমার রোগ-নিস্তব্ধ বাড়িতে সহসা শব্দের আন্দোলন।
আমি বললুম, ‘থামান থামান।’
লোকটি মাথার উপর একটা বোতাম টিপতেই সারা বাড়িতে নিস্তব্ধতা নেমে এল। শুধু কুকুরটা। তখনও রাগে গরগর করছে। আমি মনে মনে ভাবলুম, তুই তো কুকুর, তুই কেন, সময়ের ওপর সকলের রাগ। তোর অবশ্য বেশি রাগ হওয়াই স্বাভাবিক, কারণ, তোদের আয়ু মাত্র বারো বছর। বারো বছরেই এই সুন্দর লোমঅলা নরম দেহটি ফেলে চলে যেতে হবে। ওই ঝকঝকে কালো চোখে আর দৃষ্টি থাকবে না। আমি মানুষ। আমি হয়তো সত্তরটা বছর দুঃখে-সুখে কাটিয়ে যেতে পারব। প্রায় ছ-টা কুকুরের পরমায়ু এক সঙ্গে করলে যা হয়। আর যদি যত্নে-তোয়াজে থাকি, আনন্দে থাকি, তাহলে সাতটা কুকুরের পরমায়ু এ যুগে কিছুই নয়। আমাদের বংশে প্রায় একশো রান তোলার মতো ব্যাটসম্যান ছিলেন।
কুকুরটা আবার কোণের দিকে গিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস। লোকটি বললে, ‘একবার একটানা বাজানোটা দেখাব!’
আমি বললুম, ‘না না, কোনও প্রয়োজন নেই!’
লোকটি ঘড়ির পেছন দিকে, ছোট্ট একটা উঁচু মতো লোহার খোঁচা দেখিয়ে বললে, ‘ভেরি সিম্পল। এই দেখুন, কনটিনিউয়াসের দিকে ঠেললে নাগাড়ে বাজবে আর ইন্টারমিটেন্টের দিকে ঠেললে থেমে থেমে।’
বুঝলাম তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে আর একবার বাজায়। সব মানুষের মধ্যেই শিশুটা থেকে যায়। আমের ভেতর আমের আঁটির মতো। অ্যালার্ম বাজতেই কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করেছিল, গোঁ গোঁ করেছিল। বেশ মজা লেগেছে। আর একবার খ্যাপাতে চায়। জানে না আমার বাড়িতে কী জীবন মরণ সংগ্রাম চলেছে দোতলার ঘরে। যে-কোনও মুহূর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয়জন, আমার স্ত্রী। চলে যেতে পারে। সে এখন সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আমি তাকে বলিনি। ডাক্তার আমাকে বলে গেছেন, ‘শি ইজ ব্যাটলিং উইথ টাইম। এই যে ওষুধ, এতে আরোগ্য হবে না, শুধু কিছুদিন ধরে রাখা। আজ থেকে কাল, কাল থেকে পরশু স্পষ্ট দিন গোনা। একদিন দপ করে আলো নেবার মতো দীপ নিবে যাবে।’
যে লোকটি ঘড়ি এনেছে তার সবই ভালো, কথায় কথায় সামনের দুটো দাঁত বের করে হাসিটা ভালো লাগে না। লোকটাকে তখন ভীষণ স্বার্থপর মনে হয়। কেনা আর বেচা এর বাইরে যেন পৃথিবীতে আর কিছু নেই। উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরুর মতো, ক্রেতার পৃথিবী আর বিক্রেতার পৃথিবী। ভালোবাসার পৃথিবীটা যেন উবে গেছে!
আমাদের বাড়িতে যে মেয়েটি কাজ করে, সে রাগ রাগ মুখে দু-কাপ চা দিয়ে গেল। যাবার সময় বলে গেল, ‘আপনি এখন এই ঘড়ি নিয়ে রঙ্গ করছেন। বাড়িতে তো তিনটে ঘড়ি রয়েছে। এখন এই অ্যাতো খরচের সময়?’ আমাদের বাড়ির সঙ্গে মেয়েটি এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, তার এইসব কথা বলার অধিকার জন্মেছে। সবাই জানে আমাকে টুপি পরানো খুব সহজ। চকচকে ঝকঝকে জিনিসের ওপর আমার ছেলেমানুষের মতো লোভ।
মেয়েটি যেতে যেতে দরজা পার হবার আগে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললে, ‘বউদি আগে ভালো হয়ে উঠুক না, তারপর এইসব বাজে খরচ যত পারেন করবেন।’
লোকটি সেই অদ্ভুত হাসি, সামান্য তোতলানো গলায় বললে, ‘এসব ঘড়ি একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না। মেড ইন জার্মানি।’
লোকটিকে ভীষণ বোকা বোকা দেখালেও পাকা ব্যবসাদার। আমার বাড়ির পরিস্থিতি, তাতে কারুর হাসা উচিত নয়, তবু লোকটির মুখের লোভী অথচ বোকা বোকা হাসি মেলাচ্ছেনা। সেই হাসিটাই বজায় রেখে চায়ের কাপে ফরফর করে চুমুক দিল।
মেয়েটি আমার বিবেকে খোঁচা মেরে গেছে। সত্যিই তো, আমি কী বলে বাজে খরচ করতে চলেছি! এই কি সময়! ওষুধে-ডাক্তারে রোজ জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি আমার সামনে নিষ্ঠুর ভবিষ্যৎ মেলে দিয়ে গেছে। বউদির ভালো হওয়া। বউদি আর কোনও দিন ভালো হবে না। খসখস করে এই ঘড়ির কাঁটা চলছে। বউদির জীবনঘড়িও চলছে। কতটা দম আছে কেউ জানে না। জীবনঘড়ির কোনও মেকানিক নেই। নিজেই চলে, নিজেই বন্ধ হয়। স্বাধীন। বাইরে থেকে দম দেবার কোনও চাবি নেই।
‘ঘড়িটার দাম কত?’
‘আপনার জন্যে আমার সবসময় স্পেশাল দাম। এ ঘড়ি আপনি আর কোথাও পাবেন না।’ লোকটি নিঃশব্দে হাসতে লাগল।
‘দামটা বলুন।’
‘কত আর, তিনটে পাত্তি দেবেন!’
‘বলেন কী! একটা টেবিল ক্লকের দাম তিনশো! আপনার মাথা খারাপ!’
‘এটা কোথাকার ঘড়ি দেখুন! জার্মানির। সারাজীবন চলবে।’
‘আমার দরকার নেই মশাই, নিয়ে যান। আমার এখন খুব দুঃসময়। আপনার সঙ্গে ঘ্যানোর ঘ্যানোর করার সময় নেই।’
‘ঠিক আছে, আমি আপনার জন্যে লোকসান করেই দেব। আপনি দুটো পাত্তি দিন।‘
