দারুব্রহ্ম তেলকলে গিয়ে দেখল, সেটা বেশ রমরম করে চলেছে। দারুব্রহ্ম কাগজপত্র বের করে তার দাবিদাওয়া জানাতেই তেলকলের মালিক মূৰ্ছা গেল। আর মূৰ্ছা ভেঙে উঠেই বলল দলিলে দেখছি, আপনি দশ আনার মালিক। তবে আমার থাকবে কী? যাকগে এসব তো জানা ছিল না। কবেকার কথা সব। এখন একটা বন্দোবস্ত করা যাবে। আপনি যান।
তহসিলদারটাও দারুব্রহ্মকে হতাশ করল না। প্রজারা বলল, আমরা কি জানি ছাই যে, এ জমিরও মালিক আছে। তবে আমরা নিমকহারাম নই, বঞ্চিত করব না।
দিন দুই বাদে দারুব্রহ্ম বাড়িতে ফিরে দেখে, চারটে গোরুর গাড়ি বোঝাই ধান, দু-কলসি কাঁচা টাকা আর আনাজপাতি তেল মশলা সব এসেছে, সেদিন দারুব্রহ্ম বাড়তি দশজনের রান্না রাঁধিয়ে প্রদীপ ঠুকে দৈত্যকে বের করে বলল, খাও বাপু, পেট ভরে খাও। এ বাড়িতে অতিথির ঢেকুর ওঠে না, একথা শুনলে আমার পূর্বপুরুষেরা স্বর্গ থেকে অভিশাপ দেবে।
কিন্তু উঠল কই? দশজনের ভাত সাবাড় করে দৈত্য করুণ মুখে বলল, বটে?
দারুব্রহ্ম হাঁ হয়ে গেল।
রাত্রিবেলা বিশজনের খোরাক শেষ করেও কিন্তু দৈত্য ঢেকুর তুলল না। সাতদিনেই চার গোরুর গাড়ির চাল শেষ। বাড়িসুদ্ধ লোক জেনে গেছে যে, এত খেয়েও দৈত্যটার ঢেকুর উঠছে না। তারা রোজ দুবেলা এসে খাওয়ার সময় দৈত্যকে ঘিরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, কবে কখন ঢেকুর ওঠে। কিন্তু উঠল না। ঢেকুর না উঠলেও পাহাড়-প্রমাণ খাওয়ার ফলে কদিনের মধ্যেই সিঁড়িঙ্গে দৈত্যটার চেহারা পুরোপুরি ঘটোৎকচের মতো হয়ে উঠল। মুগুরের মতো হাত, পাটাতনের মতো বুক, মুলোর মতো দাঁত, তালগাছের মতো লম্বা।
দারুব্রহ্মেরও জেদ চেপেছে। তাদের এত বড়ো রাজবংশে একটা পুঁচকে দৈত্য এসে খেয়ে ঢেকুর তুলছে না–কেমন কথা! এ বাড়িতে ভোজ খেয়ে লোকে পাক্কা দেড়দিন মেঝেয় পড়ে থাকত। দু-চারজন ভোজ খেয়ে গঙ্গাযাত্রায় পর্যন্ত গেছে! সেই বাড়ির এই অপমান?
দারুব্রহ্ম নাওয়া-খাওয়া ভুলে আদায়-উশুল করতে লাগল। তেলকলের ভার নিজে নিল। আরও সব নতুন-নতুন কারবার খুলতে লাগল। গাড়ি-গাড়ি চাল আসছে বাড়িতে, বস্তা-বস্তা আনাজ, ঘি, দুধ, দই। এসবই একদিন দৈত্যের ওপর দিয়ে উশুল হবে। আগে ব্যাটা ঢেকুরটা তো তুলুক।
এর মধ্যেই একদিন বাড়িতে খদ্দের এনে হানা দিয়েছিল। তখন দুপুরবেলা, দারুব্রহ্ম প্রদীপ ঠুকে দৈত্যকে মাত্র খেতে ডেকেছে। দৃশ্যটা দেখে খদ্দের চেয়ারসুদ্ধ উলটে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। তারপর থেকে আর আসেনি। কিন্তু বাড়ি বিক্রি এখন মাথায় উঠেছে দারুব্রহ্মের। বিক্রির মানেও হয় না। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপটা যখন হাতে পেয়েছে, তখন আর অভাবও থাকবে না। খামোকা পূর্বপুরুষের ভিটে বিক্রি করবে কেন? সে তাই মিস্ত্রি ডেকে বাড়িটা মেরামত করাতে লাগল। সব খরচই উশুল হবে।
মৌরসি পাট্টায় আরও কিছু জমি নিল দারুব্রহ্ম। চাষবাস বাড়িয়ে ফেলল। কারবারগুলিও বেশ ফেঁপে-ফুলে চলছে। গোশালায় গোরু, আস্তাবলে ঘোড়া, বাড়ির সামনে জুড়িগাড়ি। শুকনো বাগানে আবার গাছ লাগানো হল, তাতে ফুল ফুটল, বাড়িটা কলি ফেরানোর পর আবার ঝলমল করতে লাগল। এর মধ্যেই দারুব্রহ্মের জন্য যে মেয়েটি দেখা হয়েছিল, তার বাবা এসে হাতজোড় করে বলল আমার মেয়েটি নিলে ধন্য হই। তা তিনি হলেনও। নহবতখানায় সানাই বাজল, দারুব্রহ্ম বিয়ে করে এসে বিরাট ভোট দিয়ে সাত গাঁয়ের লোককে খাওয়াল।
কিন্তু সাত গাঁয়ের লোকের মতো খাবার একা খেয়েও ব্যাটা দৈত্য কিন্তু ঢেকুর তুলল না! তবে বলল, খিদেটা এবারে একটু কমেছে। পেটের জ্বলুনিটা তেমন নেই। বলে ফের ঘুমোতে চলে গেল। নতুন বউয়ের সামনে এই অপমানে কান লাল হয়ে উঠল দারুব্রহ্মের। বলতে নেই সে এখন লাখোপতি! একটা দৈত্যের পেট ভরাতে পারবে না? পরদিন থেকে সে কাজকর্ম দ্বিগুণ করে দিল।
মাসখানেক বাদে সে একশো গাঁয়ের লোকের আয়োজন করে দৈত্যটাকে ডাকল। খুবই লজ্জার সঙ্গে প্রকান্ড চেহারার বিকট দৈত্যটা এসে বসল আসনে। আচমন করে একটু ভাত মেখে মুখে দিয়েছে কি দেয়নি অমনি একটা বাজ পড়ার আওয়াজে আঁতকে উঠল সবাই। ঘড় ঘড়াত। ঘড় ঘড়াত। ঘড় ঘড়াত। পরপর তিনবার। অমনি চারদিকে হইহুল্লোড়-ঠেলাঠেলি পড়ে গেল। বাচ্চারা হাততালি দিয়ে নাচতে লাগল। তুলেছে। তুলেছে। দৈত্য ঢেকুর তুলেছে।
মাথা নীচু করে দৈত্যটা উঠে পড়ল। আঁচিয়ে যখন প্রদীপের মধ্যে ঢুকতে যাবে, তখনই গিয়ে দারুব্রহ্ম তাকে ধরল, এই যে বাপু। এই দিনটারই অপেক্ষা করছিলাম। ঢেকুর তো তুললে, তো কাজকর্ম কিছু করতে হয়।
দৈত্যটা অবাক হয়ে চেয়ে বলল, আপনি হুকুম করলে সবই করতে হবে মালিক। কিন্তু কাজটা আর বাকি রেখেছেন কী? লোকে আমাকে পেলেই গাড়ি চায়, বাড়ি চায়, ধনদৌলত চায়। আমি দিইও। কিন্তু আপনার যা দেখছি, এর ওপরেও আমাকে কিছু করতে হবে নাকি?
দারুব্রহ্ম কথাটা আগে ভেবে দেখেনি। এখন দেখল। বাস্তবিকই তার যা আছে তার ওপর আরও কিছু চাওয়ার মানেও হয় না। সে মাথা চুলকে বলল, তা বটে, তবে কিনা–
দৈত্যটা করুণ মুখ করে বলল, যে বাড়িতে খেয়ে আমার ঢেকুর ওঠে, বুঝতে হবে সে বাড়ির ত্রিসীমানায় কোনো অভাব নেই। ঝুটমুট আমাকে আর খাটাবেন কেন? দেড় হাজার বছরের ঘুমটা আর কয়েক হাজার বছর চালাতে দিন। শরীরটা বড়ো ম্যাজম্যাজ করছে।
