ঊর্ধ্বতন তৃতীয় পুরুষ কৃষ্ণব্রহ্ম ছিলেন পালোয়ান। দু-হাতে দু-মণ ওজনের দুটো মুগুর ঘুরিয়ে রোজ দু-বেলা ব্যায়াম করতেন। সেই মুগুর দুটো দোতলার সিঁড়ির মুখেই রাখা। দারুব্রহ্ম মায়াভরে সে দুটোকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে রইল কিছুক্ষণ।
তিনতলার সব ঘর বহুকাল হল তালাবন্ধ। ছাদ ফেটেছে, জানলার শিক নেই। বাদুড় চামচিকের বাসা। যত রাজ্যের পুরোনো জিনিসের আবর্জনা ডাঁই করে রাখা। শেষবারের মতো সবকিছু দেখে যাওয়ার জন্য দারুব্রহ্ম তালা খুলে ঢুকে পড়ল ঘরে। কাঠের সিন্দুক, দেয়াল আলমারি, ভাঙা ঝাড়লণ্ঠন, পুরোনো নাগরা, ভাঙা খাট, কত কী চারদিকে ছড়ানো।
কাঠের সিন্দুক খুলে এটা-সেটা নাড়াচড়া করছিল দারুব্রহ্ম, আর এটা-সেটা ভাবছিল। এমন সময় হাত ফসকে কী একটা যেন মেঝেয় পড়ে গেল। একটু চমকে উঠল দারুব্রহ্ম। চমকাবারই কথা। জিনিসটা পড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই একটা ঝলকানি আর সেইসঙ্গে খানিক ধোঁয়া বেরোলো। দারুব্রহ্ম জিনিসটা কুড়িয়ে নিতে গিয়ে দেখে, সেটা একটা প্রদীপ। প্রদীপটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ভাবছে, চোখে পড়ল ধোঁয়ার কুন্ডলিটা সামনেই পাকিয়ে-পাকিয়ে একটা লম্বা রোগা সুটকো লোকের চেহারা নিচ্ছে।
কে রে! দারুব্রহ্ম চেঁচিয়ে ওঠে।
লোকটা গোটা চারেক হাই তুলে দিয়ে বলল, আমি? আমি হচ্ছি প্রদীপের দৈত্য।
দারুব্রহ্ম হাঁ। ব্যাটা বলে কী? সে বলল, ইয়ার্কির জায়গা পাওনি? দিনে-দুপুরে ব্যাটা চুরির মতলবে বাড়িতে ঢুকে বসে আছ।
লোকটা ভয় খেয়ে বলে, সত্যিই না। অনেককাল কেউ ডাকাডাকি করেনি বলে বেশ হাজার
দেড়েক বছর একটানা ঘুমিয়ে এই উঠলাম। চুরি-টুরি কিছু হয়ে থাকলে আমি কিন্তু জানি না।
দারুব্রহ্ম সাহসী বংশের লোক। সহজে ভয় খায় না। তবে সে বুঝল, লোকটা গুল দিচ্ছে না। প্রদীপটাও আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হতে পারে। তার বংশের অনেকেরই নানা বিদঘুঁটে জিনিস সংগ্রহের বাতিক ছিল। সে বলল, বটে? তা, তোর কাজটা কী?
আবার গোটা কয়েক হাই তুলে বিশুদ্ধ বাংলাতেই লোকটা বিরস মুখে বলল, আমার কাজ কী? দেড় হাজার বছর পরে ঝুটমুট কাঁচা ঘুমটা ভাঙালেন এখন যা করতে বলবেন, তাই করতে হবে। কিন্তু আগে থেকেই বলে রাখছি প্রথমেই শক্ত কাজ দেবেন না। আমার এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। গা ম্যাজম্যাজ করছে।
দারুব্রহ্ম বুঝল, এ ব্যাটা আলাদিনের সেই দৈত্যই বটে, তবে ফাঁকি মারার তাল করছে। সে বলল, বাপু হে অত রোয়াব দেখালে কি চলে? বরাবর অনেক বড়ো-বড়ো কাজ করে এসেছ খবর রাখি। এখন পিলোলে চলবে কেন?
লোকটা ব্যাজার হয়ে বলে, সে করেছি, কিন্তু বহুকাল অভ্যাস নেই কিনা। তা ছাড়া ঘুমোলে হবে কী, খাওয়া তো আর জোটেনি। দেড় হাজার বছর টানা উপোস। শরীরটা দেখুন না কেমন
শুকিয়ে গেছে। আগে বরং কিছু খাবার-দাবার দিন।
তারপর?
তারপর যা বলবেন, একটু-আধটু করে দেব। দারুব্রহ্ম লোক খারাপ নয়। দৈত্যটার সিঁড়িঙ্গে চেহারা দেখে তার কষ্টও হল। বলল, চলো দেখি, মুড়িটুড়ি কিছু পাওয়া যায় কিনা। বলে লোকটাকে সঙ্গে নীয়ে নীচে নামল দারুব্রহ্ম। বাড়ির কেউ লোকটাকে দেখে তেমন গা করল না। গা করার মতো কিছু নেই। দারুব্রহ্ম তাকে নিজের ঘরে নিয়ে ধামা ভরে মুড়ি আর বাতাসা খাওয়াল। সবশেষে দেড় ঘটি জল খেয়ে লোকটা বলল, এ যা খাওয়ালেন, এতে তো একটা সেঁকুরও উঠবে না। যাকগে, ওবেলা কী রান্না হবে?
দারুব্রহ্ম একটা শ্বাস ফেলে বলল, একদিন এ বাড়ির অতিথিরা মাংসপোলাও খেয়ে একটা করে মোহর দক্ষিণা নিয়ে যেত। সেদিন তো আর নেই। ও-বেলা যদি হাঁড়ি চড়ে, তবে দুটো ডাল-ভাত জুটতে পারে।
লোকটা মন খারাপ করে বলল, ডাল-ভাত। ছো:।
দারুব্রহ্ম হেসে ফেলে বলল, তুমি দেখি উলটো কথা বলতে লেগেছ। প্রদীপের দৈত্যই কোথায় খাবার-দাবার জোগাড় করে আনবে, তা না, তুমিই উলটে চাইতে লাগলে।
লোকটা জবাব দিল না। ধোঁয়া হয়ে প্রদীপের মধ্যে মিলিয়ে গেল। রাত্রে সকলের খাওয়া হয়ে গেলে দারুব্রহ্ম প্রদীপটা ঠুকে আবার দৈত্যটাকে জাগায়। দৈত্যটা চারজনের খোরাক একা খেয়ে গম্ভীর হয়ে বলল, আমার খোরাকটা একটু বেশিই। তা ভরপেট না হলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু একটা ঢেকুর তো উঠবে। এতে তো একটা ঢেকুরও উঠল না। একটা হাই তুলে যাই ঘুমোই গিয়ে বলে দৈত্যটা আবার প্রদীপের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল।
পরদিন দেখা গেল দৈত্যকে একবেলা খাওয়াতে গিয়েই চালের ডোল ফাঁকা হয়ে গেছে। দারুব্রহ্ম ভাবল, আহা বেচারা। কতকাল খায়নি। একদিন তো ব্যাটার কাছ থেকে সুদে-আসলে সবই উশুল করব কদিন বরং পেট ভরে খাক।
দারুব্রহ্ম পুরোনো সব দলিল-দস্তাবেজ বের করে খুঁজতে খুঁজতে সন্ধান পেল, চৌমারির চরে তাদের কিছু জমি বহুকাল ধরে আছে, কিন্তু খাজনা বা ফসল আদায় হয়নি। একটা তেলকলের অংশীদারিরও সন্ধান পেল। খুঁজে পেতে দেখল, পুরো একটা তহসিলের খবরও সে এতকাল রাখত না। ছেঁড়া ছাতা মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়ল দারুব্রহ্ম। দাগ-নম্বর ধরে-ধরে খুঁজে পেতে জমির সন্ধান পেল। প্রজারা তাকে দেখে প্রথমে একটু বেগড়বাই করলেও স্বীকার করল যে বহুকাল তারা খাজনা বা ফসল দেয়নি। বাবা-বাছা বলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তাঁদের কাছ থেকে দারুব্রহ্ম কিছু আদায় করার চেষ্টা করছিল। এমন সময় মোড়ল চোখ মুছতে মুছতে এসে বলল, জমির মালিককে বঞ্চিত করেছি বলেই আমাদের ঘরে লক্ষ্মী নেই। আপনি যান। আমরা নিজে থেকেই পৌঁছে দেব যা দেওয়ার।
