হাইকোর্টশিপ আরম্ভ হইল। ঘরের পর্দা ভেদ করিয়া সুদূর রান্নাঘর হইতে টুনি—দিদি ও আমার গৃহিণীর উচ্চ হাসি এবং কাটলেট ভাজার গন্ধ আসিতেছে। আমি যথাসাধ্য গাম্ভীর্য সঞ্চয় করিয়া শুভকার্য আরম্ভ করিলাম—
‘এই মকদ্দমায় বাদী, প্রতিবাদী, অনুবাদী, সংবাদী, বিসংবাদী কে কে তা এখনও স্থির হয় নি। কিন্তু সেজন্য বিচার আটকাবে না, কারণ দুই সাক্ষী হাজির,—শ্রীমান কেষ্ট ও শ্রীমতী পদ্ম।—’
কেষ্ট বলিল—’ব্রজেন—দা, আপনি এই গুরু বিষয় নিয়ে আর তামাশা করবেন না—কাজ শুরু করুন।’
আমি। ব্যস্ত হও কেন—, আগে যথারীতি সত্যপাঠ করাই।—শ্রীমান কেষ্ট, তুমি শপথ ক’রে বল যে তোমার মধ্যে পূর্বরাগের কোন কমপ্লেক্স নেই। যদি থাকে তবে মকদ্দমা এখনই ডিসমিস হবে।
কেষ্ট। একদম নেই। পদ্ম যখন পাঁচ বছরের আর আমি যখন দশ বছরের, তখন ওকে যে—রকম দেখতুম এখনও ঠিক তাই দেখি। তবে আগে ওকে ঠেঙাতুম, এখন আর ঠেঙাই না।
আমি। শ্রীমতী পদ্ম, কেষ্টর প্রতি তোমার মনোভাব কি রকম তা জিজ্ঞেস ক’রে তোমায় অপমান করতে চাই না। কেষ্টর মূর্তিই হচ্ছে পূর্বরাগের অ্যাণ্টি—ডোট। কেষ্ট, এইবার তোমার সেই ফিরিস্তিটা দাও। বাপ! তিরানব্বইটা আইটেম! বেশভূষা— আহার্য—শয্যা—পাঠ্য—এ তো দেখছি পাক্কা পনেরো দিন লাগবে। দেখ, আজ বরঞ্চ আমি গোটাকতক বাছা বাছা প্রশ্ন করি, যদি অবস্থা আশাজনক বোধ হয় তবে কাল থেকে সিস্টেম্যাটিক টেস্ট শুরু হবে। আচ্ছা, প্রথমে আহার্য সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করি—কারণ ওইটেই সবচেয়ে দরকারী, ফ্রয়েড যা—ই বলুন। কেষ্ট তুমি লঙ্কা খাও?
কেষ্ট। ঝাল আমার মোটেই সহ্য হয় না।
আমি। পদ্ম কি বল?
পদ্ম। লঙ্কা না হ’লে আমি খেতেই পারি না।
আমি। ব্যাড। প্রথমেই ঢেরা পড়ল। স্বামী—স্ত্রীর তো ভিন্ন হেঁশেল হ’তে পারে না। রফা করা চলে কিনা পরে স্থির করা যাবে। জলে লঙ্কা সেদ্ধ ক’রে দুজনকে খাইয়ে দেখে এমন একটা পার্সেণ্টেজ ঠিক করতে হবে যা দু—পক্ষেরই বরদাস্ত হয়। আচ্ছা—তোমরা চায়ে কে ক চামচ চিনি খাও?
কেষ্ট। এক।
পদ্ম। সাত।
আমি। ভেরি ব্যাড। আবার ঢেরা পড়ল।
কেষ্ট। আমি মেরে কেটে তিন চামচ অবধি উঠতে পারি। পদ্ম, তুমি একটু নাবো না।
আমি। খবরদার, সাক্ষী ভাঙাবার চেষ্টা ক’রো না। যা জিজ্ঞাসা করবার আমিই করব। আচ্ছা—কেষ্ট, তুমি কি—রকম বিছানা পছন্দ কর? নরম না শক্ত?
কেষ্ট। একটু শক্ত রকম, ধরুন দু—ইঞ্চি গদি। বেশী নরম হ’লে আমার ঘুমই হয় না।
পদ্ম। আমি চাই তুলতুলে।
আমি। ভেরি ভেরি ব্যাড। এই ফের ঢেরা দিলুম। আচ্ছা—কেষ্ট, পদ্মর চেহারাটা তোমার কি—রকম পছন্দ হয়?
কেষ্ট। তা মন্দ কি।
আমি সাক্ষীবিহ্বলকারী ধমক দিয়া বলিলাম—’ওসব ভাসা ভাসা জবাব চলবে না, ভাল ক’রে দেখ তারপর বল।’
পদ্ম লাল হইল। কেষ্ট অনেকক্ষণ ধরিয়া তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া একটু বোকা—হাসি হাসিয়া বলিল—’খাখ—খাসা চেহারা। এঃ, পদ্ম আর সে পদ্ম নেই, একেবারে—’
আমি। বস বস—বাজে কথা ব’লো না। পদ্ম, এবারে তুমি কেষ্টকে দেখে বল।
পদ্ম ভ্রূকুঞ্চিত করিয়া কেষ্টর প্রতি চকিত দৃষ্টি হানিয়া বলিল—’যেন একটি সঙ!’
কেষ্ট। তা—তা আমিই না—হয় মাথার চুলটা এক ইঞ্চি বাড়িয়ে ফেলব, আর দাড়িটাও না—হয় ফেলে দেব। আচ্ছা, এই হাত দিয়ে দাড়িটা চেপে রাখলাম—এইবার দেখ তো পদ্ম।
পদ্ম হাসিয়া লুটাইয়া পড়িল।
আমি বলিলাম—’হোপলেস। আপত্তির প্রতিকার হ’তে পারে, কিন্তু বিদ্রূপের ওষুধ নেই।’
কেষ্ট একটু নরম হইয়া বলিল—’আপনিই তো যা—তা রিমার্ক ক’রে সব গুলিয়ে দিচ্ছেন।’
আমি। আচ্ছা বাপু, তুমি নিজেই না—হয় জেরা কর।
কেষ্ট প্রত্যালীঢ়পদে বসিয়া আস্তিন গুটাইয়া বলিল—’পদ্ম, এই দেখ আমার হাত। একে বলে বাইসেপ্স—এই দেখ ট্রাইসেপ্স। এইরকম জবরদস্ত গড়ন তোমার পছন্দ হয়, না ব্রজেন—দার মতন গোলগাল নাদুস—নুদুস চাও? তোমার মতামত জানতে পারলে আমি না—হয় আমার আদর্শ সম্বন্ধে ফের বিবেচনা করব।’
পদ্ম। তোমার চেহারা তুমি বুঝবে—আমার তাতে কি। আমি তো আর তোমায় দারোয়ান রাখছি না।
কেষ্ট। আচ্ছা, তোমার হাতটা দেখি একবার—কি রকম পাঞ্জার জোর—
কেষ্ট খপ করিয়া পদ্মার পদ্মহস্ত ধরিল। আমি বলিলাম—’হাঁ হাঁ—ও কি! সাক্ষীর ওপর হামলা! ওসব চলবে না—আমার ওপর যখন বিচারের ভার তখন যা করবার আমিই করব। তুমি ওই ওখানে গিয়ে বস।’
কেষ্ট অপ্রতিভ হইয়া বলিল—’বেশ তো, আপনিই ফের কোশচেন করুন।’
আমি। আর দরকার নেই। তোমাদের মোটেই মতে মিলবে না, রফা করাও চলবে না। আমি এই হুকুম লিখলুম—napoo, nothing doing। কেস এখন মুলতবী রইল। এক বৎসর নিজের নিজের মতামত বেশ ক’রে রিভাইজ কর, তারপর আবার অত্র আদালতে হাজির হইবা।
কেষ্ট এবার চটিয়া উঠিল। বলিল—’আপনি আমার সিস্টেম কিচ্ছু বুঝতে পারেন নি। আপনি যা করলেন সে কি একটা টেস্ট হ’ল?—শুধু ইয়ারকি। আপনাকে মধ্যস্থ মানাই ঝকমারি হয়েছে।’
আমিও খাপপা হইয়া বলিলাম—’দেখ কেষ্ট, বেশী চালাকি ক’রো না। আমি একজন উকিল, বার বৎসর প্র্যাকটিস করেছি, পনর বৎসর হ’ল বিবাহ করেছি, ঝাড়া একটি মাস সাইকলজি পড়েছি। কার সঙ্গে কার মতে মেলে তা আমার বিলক্ষণ জানা আছে। আর—তুমি তো নির্বিকার, তোমার অত রাগ কেন? দেখ দিকি, পদ্ম কেমন লক্ষ্মীমেয়ে, চুপটি ক’রে বসে আছে।’
