লালিমা আর একবার বাজিবার উপক্রম করিল, কিন্তু তার প্রতিবাদ নিষ্ফল জানিয়া অবশেষে নিরস্ত হইল।
আমি বলিলাম—’তবে তুমি বিয়ে করতে চাও কেন? কত টাকা পাবে হে?’
কেষ্ট। এক পয়সাও নেব না। আমি বিবাহ করতে চাই জগতকে একটা আদর্শ দেখাবার জন্য। জগতে দু—রকম বিবাহ চলিত আছে। এক হচ্ছে—আগে বিবাহ, তার পরে প্রেম, যেমন সেকেলে হিঁদুর। আর এক রকম হচ্ছে—আগে প্রেম, তার পর বিবাহ, অর্থাৎ কোর্টশিপের পর বিবাহ। আমি বলি—দু—ইভুল। আগে বিবাহ হ’লে যদি বনিবনা না হয়, তখন কোথা থেকে প্রেম আসবে? আর—আগে প্রেম, পরে বিবাহ, এও সমান খারাপ; কারণ কোর্টশিপের সময় দু—পক্ষই প্রেমের লোভে নিজের দোষ ঢেকে রাখে। তার পর বিবাহ হয়ে গেলে যখন গলদ বেরিয়ে পড়ে তখন টু—লেট।
আমি। ওসব তো পুরনো কথা বলছ। তুমি কি ব্যবস্থা করতে চাও তাই বল!
কেষ্ট। আমার সিস্টেম হচ্ছে—প্রেমকে একদম বাদ দিয়ে কোর্টশিপ চালাতে হবে, কারণ প্রেমের গন্ধ থাকলেই লুকোচুরি আসবে। চাই—দু’জন নির্লিপ্ত সুশিক্ষিত নরনারী, আর একজন বিচক্ষণ ভুক্তভোগী মধ্যস্থ ব্যক্তি—যিনি নানা বিষয়ে উভয় পক্ষের মতামত বেশ করে মিলিয়ে দেখবেন। আমি একটা লিস্ট করেছি। এতে আছে—বেশভূষা, আহার্য, শয্যা, পাঠ্য, কলাচর্চা, বন্ধু—নির্বাচন, আমোদ—প্রমোদ, ইত্যাদি তিরানব্বইটি অত্যন্ত দরকারী বিষয়, যা নিয়ে স্বামী—স্ত্রীর হরদম মতভেদ হয়ে থাকে। প্রথমেই যদি এইসব মোকাবিলা হ’য়ে যায় এবং অধিকাংশ বিষয়ে দু—পক্ষের এক মত হয়, আর বাকী অল্পস্বল্প বিষয়ে একটা রফা করা চলে, তা হ’লে পরে গোলযোগের ভয় থাকবে না। কিন্তু খবরদার, গোড়াতেই প্রেম এসে না জোটে, তা হ’লেই সব ভণ্ডল হবে। শেষে যত খুশি প্রেম হ’ক তাতে আপত্তি নেই। এতদিন চলছিল—কোর্টশিপ, আর আমার সিস্টেম হচ্ছে—হাইকোর্টশিপ।
আমি। কোর্ট—মার্শাল বললে আরও ঠিক হয়। সিস্টেম তো বুঝলুম, কিন্তু এমন পাত্রী কে আছে যে তোমার এই এক্সপেরিমেন্টে রাজী হবে? তবে তুমি যে প্রেমের ভয় করছ সেটা মিথ্যে। তোমার ঐ মূর্তি দেখলে প্রেম বাপ বাপ ক’রে পালাবে।
কেষ্ট। পাত্রী আমি আজ ঠিক ক’রে এসেছি।
আমি। কে সেই হতভাগিনী?
কেষ্ট। ভুবন বোসের ভগ্নী, পদ্মমধু বোস।
আমি। আরে! আমাদের টুনি—দিদির ননদ? তাই বল। গিন্নী তা হ’লে ঠিক আন্দাজ করেছিলেন। কিন্তু শুনলুম তোমাদের বিয়ের কথা নাকি আগেই একবার হয়েছিল। এতে কেস প্রেজুডিসড হবে না?
কেষ্ট। মোটেই না। আমরা দু—পক্ষই নির্বিকার। ব্রজেন—দা, আপনাকেই মধ্যস্থ হ’তে হবে কিন্তু। আপনার লিগাল ম্যাট্রিমনিয়াল দু—রকম অভিজ্ঞতাই আছে, ভাল ক’রে জেরা করতে পারবেন।
আমি। রাজী আছি, কিন্তু মেয়েটা আমার ওপর না চটে।
কেষ্ট। কোন ভয় নেই, পদ্ম অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোক।
আমি। লোকটি তো বুদ্ধিমান, কিন্তু মেয়েটি কেমন?
কেষ্ট। মজবুত ব’লেই তো বোধহয়। সাত মাইল হাঁটতে পারে, দু—ঘণ্টা টেনিস খেলতে পারে, মাস্কুলার ইনডেক্স খুব হাই, ফেটিগ—কোয়েফিশেণ্ট বেশ লো। সেলাই জানে, রান্না জানে, লজিক জানে, বাজে তর্ক করে না, ইকনমিক্স জানে, গান গাইবার সময় বেশী চেঁচায় না। তা হ’লে কাল সন্ধ্যেবেলা ভুবনবাবুর বাড়ি ঠিক যাবেন—লাভলক রোড, মডলিন কটেজ।
আমি প্রতিশ্রুতি দিয়া গৃহাভিমুখ হইলাম। মুন—শাইন ভিলার গেট পার হইতেই একটা কোলাহল কানে আসিল। আন্দাজে বুঝিলাম কচি—সংসদের রুদ্ধ বেদনা মুখরিত হইয়া কেষ্টকে গঞ্জনা দিতেছে। আমি আর দাঁড়াইলাম না।
সমস্ত শুনিয়া গৃহিণী মত প্রকাশ করিলেন—’রিপিং! পারসী থিয়েটারের চাইতেও ভাল। আমি কিন্তু তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। যদি পাঁচ টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হয় তাতেও রাজী আছি।’
আমি বলিলাম—’কিন্তু তোমাকে তো শুনতে দেবে না। হাইকোর্টশিপ গোপনে হয়, ওইটুকুই সাধারণ কোর্টশিপের সঙ্গে মেলে। ঘরে থাকব শুধু আমি, কেষ্ট আর পদ্ম।’
গৃহিণী। আড়ি পাতব।
আমি। তার দরকার হবে না। সব কথাই প’রে শুনতে পাবে। আমার যে কান তাহা তোমার হউক।
গৃহিণী। যাই হ’ক আমিও যাব।
আমি। কিন্তু পরের ব্যাপারে তোমার ওরকম কৌতূহল তো ভাল নয়। ফ্রয়েড এর কি ব্যাখা করেন জান?
গৃহিণী। খবরদার, ও মুখপোড়ার নাম ক’রো না বলছি।
অগত্যা দুজনেই টুনি—দিদির বাসায় চলিলাম।
ভুবনবাবু ও টুনি—দিদি—এঁরা যেন সাংখ্যদর্শনের পুরুষ—প্রকৃতি। কর্তাটি কুঁড়ের সম্রাট, সমস্তক্ষণ ড্রেসিং গাউন পরিয়া ইজিচেয়ারে বসিয়া বই পড়েন ও চুরুট ফোঁকেন। গিন্নীটি ঠিক উলটো অসীম শক্তিময়ী, অঘটনঘটনপটিয়সী, মাছকোটা হইতে গাড়ি রিজার্ভ করা পর্যন্ত সব কাজ নিজেই করিয়া থাকেন, কথা কহিবার ফুরসত নাই। তাড়াতাড়ি অভ্যর্থনা শেষ করিয়াই অতিথিসৎকারের বিপুল আয়োজন করিতে রান্নাঘরে ছুটিলেন। পদ্ম আসিয়া প্রণাম করিল।
খাসা মেয়ে। কেষ্টা হতভাগা বলে কিনা মজবুত! একি হাতুড়ি না হামানদিস্তা? কচি—সংসদের মধ্যে বাস্তবিক যদি কেউ নিরেট কচি থাকে, তবে সে কেষ্ট—যতই প্রেমের বক্তৃতা দিক। ঋষ্যশৃঙ্গের একটা শিং ছিল, কেষ্টর দুটো শিং। কিন্তু এই সুশ্রী বুদ্ধিমতী সপ্রতিভ মেয়েটি কেন এই গর্দভের খেয়ালে রাজী হইল? স্ত্রীজাতি বাঁদর—নাচ দেখিতে ভালবাসে। পদ্মর উদ্দেশ্য কি শুধু তাই? স্ত্রীচরিত্র বোঝা শক্ত। না, মনস্তত্ত্বের বইগুলো ভাল করিয়া পড়িতে হইবে।
