আমি। পাত্রী ঠিক হয়েছে?
নকুড়। আরে কোথায় পাত্রী! এখানে এসে হয়তো একটা লেপচানী কি ভুটানী বিয়ে করবে।
আমি। কচি—সংসদের সদস্যরা কিছু জানে না?
নকুড়। কিচ্ছু না। আর জানলেই বা কি, তাদের কথাবার্তা আমি মোটেই বুঝতে পারি না, সব যেন হেঁয়ালি। তবে তারা খায়—দায় ভাল, আমার সঙ্গে তাদের ঐটুকুই সম্বন্ধ। কেষ্টবাবাজী আজ বিকেলে পৌঁছবেন। সন্ধ্যেবেলা যদি এস, তবে সবটা টের পাবে, সংসদের সঙেদের সঙ্গেও আলাপ পরিচয় হবে।
কচি—সংসদের কথা পূর্বে শুনিয়াছি। এদের সেক্রেটারি পেলব রায় আমাদের পাড়ার ছেলে, তার পিতৃদত্ত নাম পেলারাম। বি.এ. পাস করিয়া ছোকরার কচি এবং মোলায়েম হইবার বাসনা হইল। সে গোঁফ কামাইল, চুল বাড়াইল এবং লেডি—টাইপিস্টের খোঁপার মতন মাথার দু—পাশ ফাঁপাইয়া দিল। তারপর মুগার পাঞ্জাবি গরদের চাদর, সবুজ নাগরা ও লাল ফাউণ্টেন পেন পরিয়া মধুপুরে গিয়া আশু মুখুজ্যেকে ধরিল—ইউনিভার্সিটির খাতাপত্রে পেলারাম রায় কাটিয়া যেন পেলব রায় করা হয়। স্যার আশুতোষ এক ভলুম এনসাইক্লোপিডিয়া লইয়া তাড়া করিলেন। পেলারাম পলাইয়া আসিল এবং বি.এ ডিপ্লোমা বাক্সে বন্ধ করিয়া নিরুপাধিক পেলব রায় হইল। তারই উদ্যমে কচি—সংসদ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তবে যতদূর জানি কেষ্টই সমস্ত খরচপত্র যোগায়। এই কচি—সংসদের উদ্দেশ্য কি আমার ঠিক জানা নাই। শুনিয়াছি এরা যাকে তাকে মেম্বার করে না এবং নূতন মেম্বারের দীক্ষাপ্রণালীও এক ভয়াবহ ব্যাপার। গভীর পূর্ণিমা নিশীথে সমবেত সদস্যমণ্ডলীর করস্পর্শ করিয়া দীক্ষার্থী ষোলটি ভীষণ শপথ গ্রহণ করে। সঙ্গে সঙ্গে ষোল টিন সিগারেট পোড়ে এবং এনতার চা খরচ হয়।
অনেক বেলা হইয়াছে, মেঘও কাটিয়া গিয়াছে। সন্ধ্যার সময় নিশ্চয়ই মুন—শাইন ভিলায় যাইব বলিয়া নকুড়—মামার নিকট বিদায় গ্রহণ করিলাম।
গৃহিণী তিন ছড়া পাঁচ সিকা দামের চুনি—পান্নার মালা উপর্যুপরি গলায় পরিয়া বলিলেন— ‘দেখ তো, কেমন মানাচ্ছে।’
আমি বলিলাম—’চমৎকার। যেন পরস্ত্রী।’
গৃহিণী। তুমি একটি ক্যাড। পরস্ত্রী না হ’লে বুঝি মনে ধরে না?’
আমি। আরে চট কেন। পরকীয়াতত্ত্ব অতি উঁচুদরের জিনিস। তার মহিমা বোঝা যার তার কম্ম নয়, তবে যে নিজের স্ত্রীকে পরস্ত্রীর মতন নিত্য—নূতন ধরি ধরি ধরিতে না পারি— দেখে, সে অনেকটা এগিয়েছে। রাধাকৃষ্ণই হচ্ছেন মডেল প্রেমিক। ফ্রয়েড বলেছেন—
গৃহিণী। ড্যাম ফ্রয়েড—অ্যাণ্ড রাধাকৃষ্ণ মাথায় থাকুন। আমাদের মতন মুখখু লোকের সীতারামই ভাল।
আমি। কিন্তু রাম যে সীতাকে দু—দুবার পোড়াতে চাইলেন তার কি?
গৃহিণী। সে ত লোকনিন্দেয় বাধ্য হ’য়ে। ত্রেতাযুগের লোকগুলো ছিল কুচুণ্ডে রাসকেল।
আমি। তা—তিনি ভরতকে রাজ্য দিয়ে সীতাকে নিয়ে আবার বনে গেলেই পারতেন।
গৃহিণী। সেই আহ্লাদে প্রজারা যে রামকে ছাড়তে চাইলে না।
আমি। বাঃ, তুমি আমার চাইতে ঢের বড় উকিল। আমি তোমাকে রামচন্দ্রের তরফ থেকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। কিন্তু ভাগ্যিস তিনি সীতার মতন বউ পেয়েছিলেন তাই নিস্তার পেয়ে গেলেন। তোমার পাল্লায় পড়লে অযোধ্যা শহরটাকেই ফাঁসি দিতে হ’ত।
গৃহিণী। কেন, আমি কি শূর্পনখা না তাড়কা রাক্ষসী?
আমি। সীতা ছিলেন গোবেচারী লক্ষ্মীমেয়ে। তোমার মতন আবদেরে নয়।
গৃহিণী। সোনার হরিণ কে চেয়েছিল মশায়? কত ওজন তার খোঁজ রাখ? যদি ফাঁপা হয়, তবু পাঁচ হাজার ভরি।
আমি। আচ্ছা, আচ্ছা, তোমারই জিত। আর শুনেছ, কেষ্ট যে এখানে বিয়ে করতে আসছে। সেই কাশীর কেষ্ট।
গৃহিণী। হুরে! ভাগ্যিস খানকতক গহনা এনেছি। কিন্তু আশ্বিন মাসে লগ্ন কই?
আমি। প্রেমের তেজ থাকলে লগ্নে কি আসে যায়। তবে পাত্রীটি কে তা কেউ জানে না। হয়তো এখনও পাত্রীই স্থির হয় নি, যদিও বরযাত্রীর দল হাজির।
গৃহিণী। গ্যাড! শুনেছিলুম কেষ্টর বাপের ইচ্ছে ছিল টুনি—দিদির ননদের সঙ্গে কেষ্টর বিয়ে দিতে। সে মেয়ে তো এখানেই আছে বড়—সড়ও হয়েছে। তারও বাপ—মা নেই, তার দাদা—টুনি—দির বর ভুবনবাবু—তিনিই এখন অভিভাবক।
আমি। তা বলতে পারি না। কেষ্টর মতিগতি বোঝা শিবের অসাধ্য। যাই হ’ক, সন্ধ্যার সময় একবার কেষ্টর বাসায় যাব।
মনোহারিণী সন্ধ্যা। জনবিরল পথ দিয়া চলিয়াছি। শহরের সর্বত্র—উপরে, আরও উপরে, নীচে, আরও নীচে— স্তরে স্তরে অগণিত দীপমালা ফুটিয়া উঠিয়াছে। রাস্তার দু—ধারে ঝোপে জঙ্গলে পাহাড়ী ঝিঁঝির অলৌকিক মূর্ছনা ষড়জ হইতে নিষাদে লাফাইয়া উঠিতেছে। পরিষ্কার আকাশে চাঁদ উঠিয়াছে, কুয়াশার চিহ্নমাত্র নাই। ঐ মুন—সাইন ভিলা।
কিসের শব্দ? দার্জিলিং শহরে পূর্বে শিয়াল ছিল না। বর্ধমানের মহারাজা যে কটা আনিয়া ছাড়িয়া দিয়াছিলেন তারা কি মুন—সাইন ভিলায় উপনিবেশ স্থাপন করিয়াছে? না, শিয়াল নয়, কচি—সংসদ গান গাহিতেছে। গানের কথা ঠিক বোঝা যাইতেছে না, তবে আন্দাজে উপলব্ধি করলাম, এক অচেনা অজানা অচিন্ত্যনীয় অরক্ষণীয়া বিশ্ব—তরুণীর উদ্দেশ্যে কচি—গণ হৃদয়ের ব্যথা নিবেদন করিতেছে। হা নকুড়—মামা, তোমার কপালে এই ছিল?
আমাকে দেখিয়া সংসদ গান বন্ধ করিল। মামা ও কেষ্টকে দেখিলাম না। কেষ্ট আজ বিকালে পৌঁছিয়াছে, কিন্তু কোথায় উঠিয়াছে কেহ জানে না। শীঘ্রই সে মুন—শাইন ভিলায় আসিবে এরূপ সংবাদ পাওয়া গিয়াছে।
