আমি আমতা আমতা করিয়া বলিলাম—’এই মনে করছি, ছুটির ক—দিন একটু পাহাড়ে কাটিয়ে আসি, শরীরটা একটু ইয়ে কিনা।’
গৃহিণী বলিলেন—’হোআট ইয়ে? হুঁ, একাই যাবার মতলব দেখছি—আমি বুঝি একটা মস্ত ভারী বোঝা হয়ে পড়েছি? পাহাড়ে গিয়ে তপস্যা হবে নাকি?’
সভয়ে দেখিলাম শ্রীমুখ ধূমায়মান, বুঝিলাম পর্বতো বহ্ণিমান। ধাঁ করিয়া মতলব বদলাইয়া ফেলিয়া বলিলাম—’রাম বল, একা কখনও তপস্যা হয়? আমি হব না হব না হব না তাপস যদি না মিলে তপস্বিনী।’
মন্ত্রবলে স্মোক নুইসান্স কাটিয়া গেল, গৃহিণী সহাস্যে বলিলেন—’হোআট পাহাড়?’
আমি। ডালহাউসি। অনেক দূর।
গৃহিণী। হ্যাং ডালহাউসি। দার্জিলিং চল। আমার ত্রিশ ছড়া পাথরের মালা না কিনলেই নয়, আর চার ডজন ঝাঁটা। আর অত দাম দিয়ে গলায় দেবার শুঁয়োপোকা কেনা হ’ল—সেই যে বোআ না কি বলে—আর হীরে—বসানো চরকা—ব্রোচ—তা তো এ পর্যন্ত পরতেই পেলুম না। তোমার সেই ডালকুত্তো পাহাড়ে সেসব দেখবে কে? দার্জিলিং—এ বরঞ্চ কত চেনাশোনা লোকের সঙ্গে দেখা হবে। টুনি—দিদি, তার ননদ, এরা সব সেখানে আছে। সরোজিনীরা, সুকু—মাসী, এরাও গেছে। মংকি মিত্তিরের বউ তার তেরোটা এঁড়িগেঁড়ি ছানাপোনা নিয়ে গেছে।
যুক্তি অকাট্য, সুতরাং দার্জিলিং যাওয়াই স্থির হইল।
দার্জিলিং—এ গিয়া দেখিলাম, মেঘে বৃষ্টিতে দশদিক আচ্ছন্ন। ঘরের বাহির হইতে ইচ্ছা হয় না, ঘরের মধ্যে থাকিতে আরও অনিচ্ছা জন্মে। প্রাতঃকালের আহার সমাধা করিয়া পায়ে মোটা বুট এবং আপাদমস্তক ম্যাকিনটশ পরিয়া বেড়াইতে বাহির হইয়াছি।….জনশূন্য ক্যালকাটা রোডে একাকী পদচারণ করিতে করিতে ভাবিতেছিলাম—অবলম্বনহীন মেঘরাজ্যে আর তো ভাল লাগে না…এমন সময় অনতিদূরে—
এই পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথে সহিত আশ্চর্য রকম মিল আছে। কিন্তু আমার অদৃষ্ট অন্যপ্রকার—বদ্রাওনের নবাব গোলাম কাদের খাঁর পুত্রীর সাক্ষাৎ পাইলাম না। দেখা হইল ডুমরাওনের মোক্তার নকুড় চৌধুরীর সঙ্গে, যিনি সম্পর্কনির্বিশেষে আত্মীয়—অনাত্মীয় সকলেরই সরকারী মামা।
নকুড়—মামা পথের পার্শ্বস্থিত খাদের ধারে একটা বেঞ্চে বসিয়া আছেন। তাঁর মাথায় ছাতা, গলায় কম্ফর্টার, গায়ে ওভারকোট, চক্ষুতে ভ্রূকুটি, মুখে বিরক্তি। আমাকে দেখিয়া কহিলেন—’ব্রজেন নাকি?’
বলিলাম—’আজ্ঞে হ্যাঁ। তারপর, আপনি হঠাৎ দার্জিলিং—এ? বাড়ির সব ভাল তো? কেষ্টার খবর কি—বেনারসেই আছে নাকি? কি করছে সে আজকাল?’—কেষ্ট নকুড়—মামার আপন ভাগিনেয়, বেনারসের বিখ্যাত যাদব ডাক্তারের একমাত্র পুত্র, পিতৃমাতৃহীন, বয়স চব্বিশ—পঁচিশ। সে একটু পাগলাটে লোক, নকুড়—মামাকে বড় একটা গ্রাহ্যই করে না, তবে আমাকে কিছু খাতির করে।
নকুড়—মামা কহিলেন—’সব বলছি। তুমি আগে একটা কথার জবাব দাও দিকি। এই দার্জিলিং—এ লোকে আসে কি করতে হ্যাঁ? ঠাণ্ডা চাই? কলকাতায় তো আজকাল টাকায় এক মন বরফ মেলে, তারই গোটাকতক টালির ওপর অয়েলক্লথ পেতে শুলেই চুকে যায়, সস্তায় শীতভোগ হয়। উঁচু চাই—তা না হ’লে শৌখিন বাবুদের বেড়ানো হয় না? কেন রে বাপু, দু—বেলা তালগাছে চড়লেই তো হয়। যত—সব হতভাগা—।’
এই পৃথিবীটা যখন কাঁচা ছিল তখন বিশ্বকর্মা তাহাকে লইয়া একবার আচ্ছা করিয়া ময়দা—ঠাসা করিয়াছিলেন। তাঁর দশ আঙুলের গাঁট্টার ছাপ এখনও রহিয়া গিয়া স্থানে স্থানে পর্বত উপত্যকা নদী জলধি সৃষ্টি করিয়াছে। বিশ্বকর্মার একটি বিরাট চিমটির ফল এই হিমালয় পর্বত। নাই দিলে কুকুর মাথায় ওঠে,—ভগবানের আশকারা পাইয়া মানুষ হিমালয়ের বুকে চড়িয়া দার্জিলিং—এ বাসা বাঁধিয়াছে। নকুড়—মামা ধর্মভীরু লোক, অতটা বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না।
আমি বলিলাম—’কি জানেন নকুড়—মামা, কষ্ট পাবার যে আনন্দ, তাই লোকে আজকাল পয়সা খরচ করে কেনে। অমৃত বোস লিখেছে—
ভাগ্যিস আছিল নদী জগৎ সংসারে
তাই লোকে যেতে পারে পয়সা দিয়ে ওপারে।
দার্জিলিং আছে তাই লোকের পয়সা খরচ ক’রে পাহাড় ডিঙোবার বদখেয়াল হয়েছে। তবে এইটুকু আশার কথা—’এখানে মাঝে মাঝে ধস নাবে।’
মামা ত্রস্ত হইয়া খাদের কিনারা হইতে সরিয়া রাস্তার অপেক্ষাকৃত নিরাপদ প্রান্তে আসিয়া বলিলেন—’উচ্ছন্ন যাবে। এটা কি ভদ্দর লোকের থাকবার দেশ? যখন—তখন বৃষ্টি, বাসা থেকে বেরুলে তো দশ তলার ধাক্কা, দু—পা হাঁটো আর দম নাও। তাও সিঁড়ি নেই, হোঁচট খেলে তো হাড়গোড় চূর্ণ। চললে হাঁপানি, থামলে কাঁপুনি—কেন রে বাপু?’
নকুড়—মামা চারিদিকে একবার ভীষণ দৃষ্টিতে চাহিলেন। সময়টা যদি সত্য ত্রেতা অথবা দ্বাপর যুগ হইত এবং মামা যদি মুনি ঋষি বা ভস্মলোচন হইতেন, তবে এতক্ষণে সমস্ত দার্জিলিং শহর সাহারা মরুভূমি অথবা ছাইগাদা হইয়া যাইত। আমি বলিলাম—’তবে এলেন কেন?’
নকুড়। আরে এসেছি কি সাধে। কেষ্টার স্বভাব জানো তো? লেখাপড়া শিখলি, বে—থা কর, বিষয় আশয় দেখ—রোজগার তো আর করতে হবে না। সে সব নয়। দিনকতক খেয়াল হ’ল, ছবি আঁকলে। তার পর আমসত্ত্বর কল ক’রে কিছু টাকা ওড়ালে। তার পর কলকাতায় গিয়ে কতকগুলো ছোঁড়ার সর্দার হ’য়ে একটা সমিতি করলে। তারপর বম্বে গেল, সেখান থেকে আমাকে এক আর্জেন্ট টেলিগ্রাম। কি হুকুম? না এক্ষুনি দার্জিলিং যাও, মুন—শাইন ভিলায় ওঠ, আমিও যাচ্ছি, বিবাহ করতে চাই। কি করি, বড়লোক ভাগনে, সকল আবদার শুনতে হয়। এসে দেখি—মুন—শাইন ভিলায় নরক গুলজার। বরযাত্রীর দল আগে থেকে এসে ব’সে আছে। সেই কচি—সংসদ,—কেষ্টা যার প্রেসিডেণ্ট।
