কেবলই শুনিতে পাই—স্বায়ত্তশাসনে ব্রিটিশ জাতির জন্মগত অধিকার। কিন্তু হে ব্রিটন, তোমাদের ইতিহাসে কি সাক্ষ্য দেয়? স্বাধীনতা কাকে বলে তোমরা কখনই জানিতে না। প্রথমে রোমানগণের, তারপর অ্যাঙ্গল, স্যাক্সন, ডেন, নরম্যান প্রভৃতি দস্যুজাতির অধীনতায় তোমাদের দিন কাটিয়াছে। যাহারা বিজেতারূপে তোমাদের দেশে আসিয়াছে, পরে তাহারাই আবার অন্য জাতি কর্তৃক বিজিত হইয়াছে। আজ কে বিজেতা কে বিজিত বুঝিবার উপায় নাই—তোমরা কেহই নিজের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করিতে পার নাই। তোমাদের জাতির স্থিরতা নাই, দেশ নিজের নয়, ধর্ম পর্যন্ত নিজের নয়। একতা তোমাদের মধ্যে কোনও কালেই নাই। সামাজিক আর্থিক কতরকম দলাদলি তোমাদের আছে তার ইয়ত্তা নাই। ক্ষুদ্র ব্রিটেনের যখন এই অবস্থা, তখন সমস্ত ইউরোপের কথা না তোলাই ভাল! নানা জাতি, নানা ভাষা, নানা ধর্ম ইওরোপকে চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন করিয়া রাখিয়াছে। একমাত্র ভারতসরকারের শাসনেই এই মহাদেশ ঠাণ্ডা হইয়াছে। তোমরা আগে একটু সভ্য হও, তার পর স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিও। তোমরা মদে ও জুয়ায় ডুবিয়া আছ, বর্বরের মত তোমরা এখনও নাচিয়া থাক, স্নান করিতে ভয় খাও, আহারের পর কুলকুচা কর না। এখন কিছুকাল শান্ত শিষ্ট হইয়া সর্ব বিষয়ে ভারতের অনুগত হইয়া চল, তারপর যথাসময়ে তোমাদের অধিকার দেওয়া—না—দেওয়া সম্বন্ধে বিবেচনা করা হইবে।
ভোমস্টাট প্রাসাদ। প্রিন্স ভোম, চৈনিক পর্যটক ল্যাং প্যাং
এবং প্রিন্সের খানসামা কোবল্ট
প্রিন্স ভোম। আচ্ছা হের প্যাং, আপনি তো নানা দেশ বেড়িয়েছেন— আমাদের এই রাজ্যটা আপনার কেমন লাগছে?
ল্যাং প্যাং। মন্দ নয়। মাঠ আছে, জল আছে, রুটি আছে, ঘাস আছে, শুওর—ভেড়া আছে। কিন্তু দেশের লোক যেন সব ঝিমিয়ে রয়েছে। কেন বলুন তো?
প্রিন্স। ঐ তো মজা। সমস্ত ইওরোপে যে অসন্তাোষ আর চাঞ্চল্য দেখেছেন, এখানে তার কিছুই পাবেন না। ভারত সরকার বলেন—আমাদের খাস রাজ্যে আমরা ইচ্ছামত প্রজাদের একটু আশকারা দেব, আবার রাশ টেনে ধরব। কিন্তু তুমি নাবালক, ওরকম করতে যেও না, মারা যাবে। তোমার রাজ্যে গোলযোগ দেখলেই তোমায় কান ধরে বার ক’রে দেব। তাই রাজ্যসুদ্ধ মৌতাতের ব্যবস্থা ক’রে দিয়েছি—সব ভোম হয়ে আছে। কোবল্ট, এক গুলি দে বাবা, তিনটে বাজে, হাই উঠছে। আহা, কি জিনিসই আপনাদের পূর্বপুরুষেরা আবিষ্কার করেছিলেন হের প্যাং!
ল্যাং প্যাং। কিন্তু এখন আর আমাদের দেশে জন্মায় না। যা খাচ্ছেন তা ভারতের, আপনাদের জন্যই উৎপন্ন হয়।
(প্রিন্সের মন্ত্রী ব্যারন ফন বিবলারের প্রবেশ)
বিবলার। মহারাজ, ইংল্যাণ্ড থেকে সার ট্রিকসি টার্নকোট দেখা করতে এসেছেন।
প্রিন্স। আঃ জ্বালালে! একটু যে শুয়ে শুয়ে আরাম করব তার জো নেই। নিয়ে এসো ডেকে। বাবা কোবল্ট, আমায় বাঁ পাশে ফিরিয়ে দে তো।
ল্যাং প্যাং। আমি তা হ’লে এখন উঠি—
প্রিন্স। না, না, বসুন। আমি ভারতীয় কায়দায় লোকজনের সঙ্গে মোলাকাত করি, একে একে অডিয়েন্স দেওয়া আমার পোষায় না, একসঙ্গেই পাঁচ—সাত জনের দরবার শুনি। তাতে মেহনত কম হয়, গল্প—গুজবও ভাল জমে।
(টার্নকোটের প্রবেশ)
প্রিন্স। হা—ডু—ডু সার ট্রিকসি?—বসুন ঐ চেয়ারটায়। তারপর খবর কি বলুন।
টার্নকোট। প্রিন্স, আপনাকে হাগ যেতে হবে, প্যান ইওরোপিয়ান লিবার্টি লীগের সভাপতিরূপে।
প্রিন্স। মাইন গট! এ বলে কি? কোবল্ট, আর এক গুলি দে বাবা।
টার্নকোট। আচ্ছা সভাপতি হ’তে আপত্তি থাকে, না হয় অমনিই যবেন। না গেলে আমরা ছাড়ছি না।
প্রিন্স। হাগ যাব? খেপেছেন নাকি?
টার্নকোট। কেন, তাতে বাধা কি? এই তো ভাইকাডণ্ট প্যাফ, কাউণ্টেস গ্রিমালকিন, গ্র্যাণ্ডডিউক প্যাঞ্জানড্রাম—এঁরা সব যাবেন।
প্রিন্স। আরে তাদের সঙ্গে আমার তুলনা! তারা হ’ল নগণ্য ভারতীয় প্রজা, ইচ্ছা করলে জাহান্নামে যেতে পারে। আর আমি হলুম একজন স্বাধীন সামন্ত নরপতি, যাব বললেই কি যাওয়া যায়? যদি মহাক্ষত্রপের হুকুম নিতে যাই তো বলবেন—ব্যাটা এক্ষুনি রাজ্য ছেড়ে বনবাসে যাও।
টার্নকোট। তবে কথা দিন রাজসূয় যজ্ঞেও যাবেন না।
প্রিন্স। গট ইন হিম্মেল! আপনার দেখছি মাথা বিগড়ে গেছে। রাজসূয় যজ্ঞে যাবার জন্যে ছ—মাস ধ’রে আয়োজন করছি, কোটিখানেক টাকা খরচ হবে—আর আপনাদের আবদার শুনে সব এখন ভেস্তে দিই! হাঁ—ভাল কথা—ব্যারন, জগঝম্প সব কটা ঠিক আছে তো? সতরটা গুণে দেখেছ?
বিবলার। আজ্ঞে হাঁ। আমি সব—কটা রদ্দুরে দিয়ে টনটনে ক’রে রেখেছি।
প্রিন্স। ঠিক সতরটা?
বিবলার। ঠিক সতর।
ল্যাং প্যাং। জগঝম্প কি হবে প্রিন্স?
প্রিন্স। বাজবে। যখন আমি যাত্রা করব, সঙ্গে সঙ্গে সতরটা জগঝম্পই বাজবে। প্রিন্স ড্রুংকেনডর্ফের মোটে তেরটা। আমার সতর।
ল্যাং প্যাং। আপনার অভাব কি, আপনি মনে করলে তো সতরর জায়গায় সাত—শ জগঝম্প, জয়ঢাক, চড়বড়ে, কাঁসি, ভেঁপু, রামশিঙে যা খুশী বাজাতে পারেন।
প্রিন্স। হেঁ হেঁ, জগঝম্প হ’লেই হয় না। সরকার যে—কটি বরাদ্দ ক’রে দিয়েছেন ঠিক সেই কটি বাজানো চাই। বেশী যদি বাজাই তবে বিলকুল বাতিল হবে। বাবা কোবল্ট, আমার নাকের ডগায় একটু সুড়সুড়ি দিয়ে দে তো।
টার্নকোট। তা হ’লে আপনি আমার কোনও অনুরোধই রাখলেন না?
