আমি অখিলকে বললুম, এক্ষেত্রে সনাতন উপায় যা আছে তাই অবলম্বন কর। নিরঞ্জনা কান্নাকাটি করুক, খাওয়া কমিয়ে দিক, যথাসম্ভব রোগা হয়ে যাক। তুমিও বাড়িতে মুখ হাঁড়ি করে থেকো, চুল রুক্ষ করে রেখো, নামমাত্র খেয়ো, বাকীটা রেস্তোরাঁয় পুষিয়ে নিও। ওরা দুজনে আমার প্রেসক্রিপশন মেনে নিলে, তাতে ফলও হল। অখিলের মা আর নিরঞ্জনার বাপ—মা অগত্যা রাজী হলেন। স্থির হল দু মাস পরে বিবাহ হবে।
নিরঞ্জনা কলকাতায় তার কাকার কাছে থেকে কলেজে পড়ত। তার বাপ সর্বেশ্বর তলাপাত্র বোম্বাই সরকারের বড় চাকরি করতেন, মাঝে মাঝে কলকাতায় আসতেন। আসন্ন বিবাহের স্বপ্নে অখিল দিন কতক বেশ মশগুল হয়ে রইল। তারপর একদিন সে আমাকে বললে, দেখ যতীশ, ক দিন থেকে নিরঞ্জনা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে আছে, কারণ জানতে চাইলে কিছুই বলে না। অখিলকে আশ্বাস দেবার জন্যে আমি বললুম, ও কিছু নয়, বাপ—মাকে ছেড়ে যেতে হবে তার জন্যে বিয়ের আগে অনেক মেয়েরই একটু মন খারাপ হয়।
তার পর একদিন সন্ধ্যাবেলা অখিল হন্তদন্ত হয়ে আমার কাছে এসে বললে, ভাই, সর্বনাশ হতে বসেছে। সর্বেশ্বরবাবু হঠাৎ কলকাতায় এসে নিরঞ্জনাকে বোম্বাইয়ে নিয়ে গেছেন। নিরঞ্জনার কাকার কাছে গিয়েছিলুম, তিনি গম্ভীর হয়ে আছেন, আমি প্রশ্ন করলে কিছু জানালেন না, ভাল করে কথাই বললেন না।
আমি নিরঞ্জনাকে এইমাত্র টেলিগ্রাম করেছি, চিঠি লিখেও জানতে চেয়েছি—আমাকে কিছু না জানিয়ে তার হঠাৎ চলে যাবার মানে কি, আর কারও সঙ্গে তার বিয়ে হবে নাকি?
অখিলকে আমি বললুম, ব্যস্ত হয়ো না, দু দিন সবুর করে দেখ না নিরঞ্জনা কি উত্তর দেয়। চার—পাঁচ দিন পরে অখিল এসে বললে, এই দেখ নিরঞ্জনার চিঠি, তার মতলব তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
নিরঞ্জনা অখিলকে লিখেছে—আমার সঙ্গে তোমার বিয়ে হতেই পারে না, আমাকে একেবারে ভুলে যাও। এর কারণ এখন বলতে পারব না, শুধু এইটুকু জেনে রাখ যে অন্য কোনও পুরুষকে আমি বিয়ে করব না। তুমি আমাকে চিঠি লিখো না, বোম্বাইএ এসো না, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারব না। যথাকালে সমস্তই জানতে পারবে।
অখিল পাগলের মতন হয়ে গেল। আমি তাকে শান্ত করবার চেষ্টা করলুম, বললুম, ধৈর্য ধরে থাক, নিরঞ্জনা তো বলেছে যে সব কথা সে পরে জানাবে। কিন্তু অখিল ধৈর্য ধরবার লোক নয়, নিরঞ্জনাকে রোজ চিঠি লিখতে লাগল। চিঠির কোনও উত্তর এল না। অবশেষে সে বোম্বাইএ ছুটল। দশ দিন পরে ফিরে এসে আমাকে যা বললে তা এক অদ্ভুত ব্যাপার।
সর্বেশ্বর তলাপাত্র প্রথমটা অখিলকে হাঁকিয়ে দিয়েছিলেন, নিরঞ্জনার সঙ্গে দেখা করবার অনুমতি দেন নি। কিন্তু অখিলের কন্ঠস্বর আর শোকোচ্ছ্বাস শুনতে পেয়ে নিরঞ্জনা দোতলা থেকে নেমে এসে বললে, বাবা, তুমি অন্য ঘরে যাও, যা বলবার আমিই অখিলকে বলব। বেচারাকে অনর্থক যন্ত্রণা দিয়ে লাভ কি, সব খোলসা করে বলাই ভাল।
এই কি নিরঞ্জনা? তাকে এখন চেনা শক্ত। মাথার চুল ছোট করে কেটেছে, পায়জামা আর পাঞ্জাবি পরেছে, লম্বায় ইঞ্চি ছয়েক বেড়ে গেছে। তার কণ্ঠস্বর মোটা হয়েছে, গোঁফ বেরিয়েছে, বুক একদম ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। অখিল অবাক হয়ে তাকে দেখতে লাগল।
নিরঞ্জনা যে রহস্য প্রকাশ করলে তা এই।—সে পুরুষে রূপান্তরিত হচ্ছে। সন্দেহ অনেক দিন আগেই হয়েছিল, এখন সমস্ত লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডাক্তার কির্লাস্কার তার চিকিৎসা করছেন, হরেক রকম গ্ল্যাণ্ড খাওয়াচ্ছেন আর হরমোন ইঞ্জেকশন দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, সম্পূর্ণ রূপান্তর হতে বড় জোর আরও ছ মাস লাগবে।
অখিল আকুল হয়ে বললেন, না নিরঞ্জনা, তুমি পুরুষ হয়ো না, তা হলে আমি মরব। ট্রিটমেণ্ট বন্ধ করে দাও, বরং ডাক্তারকে বল তিনি এমন ব্যবস্থা করুন যাতে তোমার নারীত্ব রক্ষা পায়।
নিরঞ্জনা বললে, তা হবার জো নেই। আমি পুরুষ হয়ে জন্মেছি, এতদিন লক্ষণগুলো চাপা ছিল, এখন ক্রমশ প্রকাশ পাচ্ছে। যদি চিকিৎসা বন্ধ করি তা হলেও আমার পরিবর্তন হতে থাকবে, শুধু দু—তিন বছর দেরী হবে। তার চাইতে চটপট পুরুষ হয়ে যাওয়াই ভাল।
অখিল কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমার কি হবে নিরঞ্জনা? তুমি না হয় পুরুষই হয়ে গেলে, তোমার ডাক্তার কি আমাকে মেয়ে করে দিতে পারে না? তা হলেও আমাদের মিলন হতে পারবে।
নিরঞ্জনা বললে, পাগল হয়েছ? তুমি তো পুরোপুরি পুরুষ হয়েই জন্মেছ, তার আর নড়চড় হতে পারে না। এই বইখানা দিচ্ছি, ফাউলার্স সেক্স ফ্যাক্টর্স, পড়ে দেখো।
অখিল বললে, তুমি মেয়েই হও আর পুরুষই হও, তোমার সঙ্গে আমার হৃদয়ের যে সম্পর্ক তার পরিবর্তন হতে পারে না। আমি তোমাকে ছাড়তে পারব না।
নিরঞ্জনা বললে, মন খারাপ ক’রো না। তুমি আর আমি যাতে একসঙ্গে থাকতে পারি তার ব্যবস্থা করব। বাবা বলেছেন আমার চিকিৎসা শেষ হলেই আমাকে ইন্দোর ব্যাংকের সেক্রেটারির পোস্টে বসিয়ে দেবেন। বাবার খুব প্রতিপত্তি, আমি জেদ করলে তোমাকেও সেখানে একটা ভাল কাজ দিতে পারবেন। তত দিন তুমি বোম্বাই এ আমাদের বাড়িতেই থাকবে।
অখিল তার কলকাতায় চাকরি ছেড়ে বোম্বাই এ ফিরে গিয়ে নিরঞ্জনার কাছেই রইল। সর্বেশ্বরবাবু দয়ালু লোক আপত্তি করলেন না। দ্রুপদ রাজার মেয়ে শিখণ্ডিনী যেমন পুরুষত্ব লাভ করে মহারথ শিখণ্ডী হয়েছিলেন, নিরঞ্জনাও তেমনি কয়েক মাস পরে পূর্ণপুরুষ মিস্টার নিরঞ্জন তলাপাত্র রূপে ইন্দোর ব্যাংকের সেক্রেটারি হল। সর্বেশ্বরবাবুর চেষ্টায় অখিল শীলও সেই ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যাণ্ট সেক্রেটারি হল। দুজনে একসঙ্গেই বাস করতে লাগল।
