—তোতা বলল, বা রে, খোকাকে কোলে নিয়ে বুঝি পরিবেশন করা যায়!
—আচ্ছা আচ্ছা, খোকা না হয় তোর মামার কোলে থাকবে।
—আর যদি মামার—
—তাহলে তোর মামার চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার হয়ে যাবে।
১৮৭৯ শক (১৯৫৭)
নিকষিত হোম
পিনাকী সর্বজ্ঞ বললেন, প্লেটনিক লভ কি রকম জ্ঞান? দুটি হৃদয়ের পরস্পর নিবিড় প্রীতি, তাতে স্থূল সম্পর্ক কিছুমাত্র নেই। চণ্ডীদাস যেমন বলেছেন—রজকিনীপ্রেম নিকষিত হেম কামগন্ধ নাহি তায়।
পিনাকীবাবু বয়সে বড় সেজন্য আড্ডার সকলেই তাঁকে খাতির করে। কিন্তু উপেন দত্ত তার্কিক লোক, পিনাকীর সবজান্তা ভাব সইতে পারে না। বললে,আচ্ছা সর্বজ্ঞ মশায়, দুই বন্ধুর মধ্যে যদি নিবিড় প্রীতি থাকে তবে তাকে প্লেটনিক বলবেন?
পিনাকীবাবু বললেন, তা কেন বলব, সম্পর্কটি স্ত্রী—পুরুষের মধ্যে হওয়া চাই।
—ও, তাই বলুন। এই যেমন নাতি আর ঠাকুমা, নাতনী আর ঠাকুদ্দা, পিসি আর ভাইপো। এদের মধ্যে যদি গভীর ভালবাসা থাকে তাকে প্লেটনিক বলবেন তো?
—আঃ, তুমি কেবল বাজে তর্ক কর। বুঝিয়ে দিচ্ছি শোন। মনে কর একটি পুরুষ আর একটি নারী আছে, তাদের মধ্যে বৈধ বা অবৈধ মিলন হতে বিশেষ কোনও বাধা নেই। তবু তারা কেবল হৃদয়ের প্রীতিতেই তুষ্ট। এই হল প্লেটনিক প্রেম।
—আচ্ছা। ধরুন ত্রিশ বছরের সুপুরুষ গুরু আর বিশ বছরের সুশ্রী শিষ্যা। এমন ক্ষেত্রে মামুলী প্রেম আকছার হয়ে থাকে। কিন্তু মনে করুন গুরু খুব কদাকার অথচ তার সুশ্রী স্ত্রী আছে। শিষ্যাও খুব কুৎসিত, তারও সুশ্রী স্বামী আছে। গুরু আর শিষ্যার মধ্যে মামুলী প্রেম হল না, কিন্তু ভক্তি আর স্নেহ খুব হল। একে প্লেটনিক বলবেন তো?
পিনাকী সর্বজ্ঞ রেগে গিয়ে বললেন, যাও, তোমার সঙ্গে কথা কইতে চাই না। বিষয়টি তলিয়ে বোঝবার ইচ্ছে নেই, শুধু জেঠামি।
মাথা চুলকে উপেন দত্ত বললেন, আজ্ঞে না, আমি শুধু একটা ভাল ডেফিনিশন খুঁজছি।
ললিত সাণ্ডেল বললেন, ওহে উপেন, আমি খুব সোজা করে বলছি শোন। প্লেটনিক প্রেম মানে আলগোছে প্রেম, যেমন শ্রীকান্ত—রাজলক্ষ্মীর সম্পর্ক। আচ্ছা যতীশ—দা, তুমি তো একজন মস্ত সাহিত্যিক, খুব পড়াশোনাও করেছ। তুমিই বুঝিয়ে দাও না প্লেটনিক প্রেম জিনিসটা কি?
যতীশ মিত্তির বললে, সব জিনিস কি বোঝানো যায়? যেমন ব্রহ্ম, তিনি তো বাক্য আর মনের অগোচর। ধর্ম, সৌন্দর্য, রস, আর্ট—এসবও স্পষ্ট করে বোঝানো যায় না। লাল রং, মিষ্টি স্বাদ, আঁষটে গন্ধ—এসবও অনির্বচনীয়, বুঝিয়ে বলা অসম্ভব, শুধু দৃষ্টান্ত দেওয়া চলে। প্রেমও সেই রকম।
উপেন বললে, বেশ তো, দৃষ্টান্ত দিয়েই প্লেটনিক প্রেম বুঝিয়ে দাও না।
পিনাকী সর্বজ্ঞ বললেন, দৃষ্টান্ত তো পড়েই রয়েছে—রামী—চণ্ডীদাস।
যতীশ বললে, সে কেবল চণ্ডীদাসের নিজের উক্তি, সম্পর্কটা বাস্তবিক কেমন ছিল তার কোনও সাক্ষী প্রমাণ নেই। আচ্ছা, আমি বিষয়টি একটু পরিষ্কার করবার চেষ্টা করছি।— প্রেম বা লাভ যাই বলা হক, তার অর্থ অতি ব্যাপক আর অস্পষ্ট। আমরা বলে থাকি—ঈশ্বরপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, পত্নীপ্রেম,বন্ধুপ্রেম। পণ্ডিতদের মতে বেগুন টমাটো আলু লংকা ধুতরো একই শ্রেণীতে পড়ে এদের ফুল ফলের অঙ্গ—প্রত্যঙ্গের মিল আছে, যদিও গুণ আলাদা। তেমনি ভক্তি প্রেম ভালবাসা স্নেহ সবই এক জাতের। তবে প্রেম বললে সাধারণত নরনারীর আদিম আসঙ্গপ্রবৃত্তিই বোঝায়। ভক্তি—শ্রদ্ধা যদি বেগুন টমাটো হয়, স্নেহ যদি আলু হয়, তবে প্রেমকে বলা যেতে পারে লংকা। প্লেটনিক লাভ বা রজকিনী প্রেম তারই একটা রকম ফের, যেমন পাহাড়ী রাক্ষুসে লংকা, ঝাল নেই, শুধু লংকার একটু গন্ধ আছে।
ললিত বললে, বুঝেছি। একটু আঁষটে গন্ধ না থাকলে যেমন কাঙালী ভোজন বা বাঙালী ভোজন হয় না, তেমনি একটু কামগন্ধ না থাকলে মামুলী বা প্লেটনিক কোনও প্রেমই হবার জো নেই। চণ্ডীদাসের নিকষিত হেম খাঁটি সোনা নয়, অন্তত এক আনা খাদ আছে।
যতীশ বললে, তোমার কথা হয়তো ঠিক, একটু লিপ্সা না থাকলে প্রেমের উৎপত্তি হয় না। এর বিচার মনোবিদগণ করবেন, আমার পক্ষে কিছু বলা অনধিকার চর্চা। আমি একটি অদ্ভুত ইতিহাস জানি। ঘটনাটি আরম্ভ হয় মামুলী প্রেম রূপে, কিন্তু দৈবদুর্বিপাকে তা প্লেটনিক পরিণতি পায় এবং কিছুকাল থমথমে হয়ে থাকে। পরিশেষে ব্যাপারটা এমন বিশ্রী রকম জটিল হয়ে পড়ে যে প্লেটো বা চণ্ডীদাসের পক্ষেও তা অনিবর্চনীয়। তবে ফ্রয়েড—শিষ্যদের অসাধ্য কিছু নেই, তাঁরা নিশ্চয় বিশ্লেষণ করে একটি ব্যাখা দিতে পারবেন।
উপেন বললে, ব্যাখা শুনতে চাই না, তুমি ইতিহাসটি বল যতীশ—দা।
যতীশ মিত্তির বলতে লাগল—
অখিল শীলকে তোমাদের মনে আছে? বছর সাত—আট আগে দু—একবার আমার সঙ্গে এই আড্ডায় এসেছিল। সে আর আমি একসঙ্গে পড়তুম। আমি বি.এল.পাস করে উকিল হলুম সে এম.এ. পাস করে কর্পোরেশনে একটা চাকরি যোগাড় করলে। কলেজে তার দু ক্লাস নীচে পড়ত নিরঞ্জনা তলাপাত্র। মেয়েটি সুন্দরী না হক, দেখতে মন্দ ছিল না, টেনিস ভলিবল খেলায় নাম করেছিল, স্বাস্থ্য খুব ভাল ছিল।
একদিন অখিল আমাকে বললে, সে নিরঞ্জনার সঙ্গে প্রেমে পড়েছে, বিয়ে করতে চায়। কিন্তু অখিলের বিধবা মা ব্রাহ্মণ পুত্রবধূ আনতে রাজী নন। নিরঞ্জনার বাপ সর্বেশ্বর তলাপাত্রেরও ঘোর আপত্তি, তিনি বলেছেন, ব্রাহ্মণ—কন্যার সঙ্গে বেনে বরের বিবাহ হলে তাদের সন্তান হবে চণ্ডাল, শাস্ত্রে এই কথা আছে।
