লিঙ্গ দুটির আপেক্ষিক মর্যাদা, স্তরক্রম, প্রথমে তার চোখে পড়ে পারিবারিক জীবনে; একটু একটু করে সে বুঝতে পারে যে যদিও পিতার কর্তৃত্ব প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সব সময় অনুভব করা যায় না, তবে বাস্তবিকভাবে তার কর্তৃত্বই চূড়ান্ত। এটুকু বোেঝার বুদ্ধি তার থাকে যে বাবার ইচ্ছেই সবার আগে; গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলোতে মা বাবারই নামে, তারই কর্তৃত্বের মাধ্যমে, দাবি করে, পুরস্কার দেয়, শাস্তি দেয়। বাবার জীবনের আছে এক রহস্যময় মর্যাদা : যে সময়টুকু সে বাড়িতে থাকে, যে-ঘরে সে কাজ করে, তার চারপাশে থাকে যে-সব জিনিশপত্র, তার কর্মগুলো, তার শখগুলোর আছে পবিত্র চরিত্র। সে ভরণপোষণ করে পরিবারের এবং সে পরিবারের দায়িত্বশীল কর্তা। সাধারণত তার কাজের জন্যে তাকে বাইরে যেতে হয়, এবং তাই তার মাধ্যমেই পরিবারটি যোগাযোগ করে বাইরের জগতের সাথে : সে হচ্ছে বিশাল, দুরূহ, ও বিস্ময়কর দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের জগতের প্রতিমূর্তি; সে সীমাতিক্ৰমণতার মনুষ্যমূর্তি, সে বিধাতা। মেয়ে এটাই শারীরিকভাবে অনুভব করে যখন ওই শক্তিশালী বাহু তাকে তুলে ধরে পরের দিকে, সে দোলে যে-শক্তির কাঠামোর আশ্রয়ে। একদা যেমন আইসিসকে সিংহাসনচ্যুত করেছিলো রা, পৃথিবীকে সূর্য, তেমনি তার মাধ্যমেং সিংহাসনচ্যুত হয় মা।
কিন্তু এখানে গভীরভাবে বদলে যায় শিশুর পরিস্থিতি : তার একদিন হওয়ার কথা ছিলো তার সর্বশক্তিমান মায়ের মতো এক নারী–সে কখনো সার্বভৌম পিতা হবে; যে-বন্ধন তাকে জড়িয়ে রেখেছিলোতার মায়ের সাথে, সেটা ছিলো একটা সক্রিয় সমকক্ষ হওয়ার সাধনা–অক্রিয়ভাবে সে শুধু প্রতীক্ষা করতে পারে পিতার সম্মতির একটা লক্ষণ। ছেলে তার পিতার শ্রেষ্ঠত্বের কথা ভাবে একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুভূতি নিয়ে; কিন্তু মেয়েকে এটা মেনে নিতে হয় নিবীর্য প্রশস্তিবোধের সাথে। আমি। ইতিমধ্যেই দেখিয়েছি যে ফ্রয়েড যাকে ইলেক্ট্রা গূঢ়ৈষা বলেন, সেটা, তিনি যেমন মনে করেন, তেমন কোনো যৌন কামনা নয়; এটা হচ্ছে কর্তার পুরোপুরি দাবি ত্যাগ করে আনুগত্য ও ভক্তির মধ্যে কর্ম হওয়ার সম্মতি। যদি তার পিতা কন্যার প্রতি স্নেহ দেখায়, তাহলে সে বোধ করে যে মহিমান্বিতরূপে প্রতিপন্ন হয়েছে তার অস্তিত্বের সত্যতা; সে ভূষিত সে-সমস্ত গুণে যা অন্যদের অর্জন করতে হয় অনেক কষ্টে; সে লাভ করেছে পরিপূর্ণতা ও সে অধিষ্ঠিত হয়েছে দেবীত্বে। সারাজীবন আকাঙ্খভরে সে খুঁজতে পারে প্রাচুর্য ও শান্তির সেই হারানো অবস্থা।
সব কিছুই কাজ করে ছোটো বালিকার দৃষ্টিতে এ-স্তরক্ৰম সুপ্রতিষ্ঠিত করতে। যেঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক সংস্কৃতির সে অন্তর্ভুক্ত, তার যে-সব গান ও রূপকথা দিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানো হয়, তার সবই পুরুষের এক সুদীর্ঘ স্তবগান। পুরুষেরা গড়ে তুলেছিলো গ্রিস, রোমান সাম্রাজ্য, ফ্রান্স ও অন্য সব দেশ, তারা আবিষ্কার করেছে সারা পৃথিবী এবং এর সম্পদ কাজে লাগানোর জন্যে উদ্ভাবন করেছে হাতিয়ার, তারা একে শাসন করেছে, তারা একে ভরে তুলেছে ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সাহিত্যসৃষ্টিতে। শিশুদের বইপত্র, পুরাণ, রূপকথা, উপকথা সব কিছুতেই প্রতিফলিত হয় পুরুষের গর্ব ও কামনা থেকে জন্ম নেয়াকিংবদন্তি; তাই পুরুষের চোখ দিয়েই ছোটো বালিকা আবিষ্কার করে বিশ্ব এবং তাতে পাঠ করে তার নিয়তি।
পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব, বাস্তবিকই, অভিভূতকর : পার্সিউস, হারকিউলিস, ডেভিড, একিলিস, লাসলো, প্রাচীন ফরাশি যোদ্ধা দ্য গয়েসলি ও বায়ার্দ, নেপোলিয়নএকজন জোয়ান অফ আর্কের স্থানে এতো পুরুষ; এবং মেয়ে তার পেছনে দেখতে পায় মহাদেবদূত মাইকেলের মহান পুরুষমূর্তি! বিখ্যাত নারীদের জীবনীগুলোর থেকে কিছুই আর বেশি ক্লান্তিকর নয় : মহাপুরুষদের তুলনায় তারা নিতান্তই ফ্যাকাশে মূর্তি; এবং তাদের অধিকাংশই পোয় কোনো বীরপুরুষের গৌরবের রোদ। হাওয়াকে তার নিজের জন্যে সৃষ্টি করা হয় নি, করা হয়েছিলো আদমের সঙ্গিনীরূপে, এবং তাকে তৈরি করা হয়েছিলো আদমের পাঁজরের হাড় থেকে। বাইবেলে প্রকৃত খ্যাতিসম্পন্ন নারী কমই আছে : রুথ নিজের জন্যে একটি স্বামী যোগাড়ের বেশি কিছু করে নি। এসথার ইহুদিদের জন্যে অনুগ্রহ লাভ করেছে আহাসুয়েরাসের কাছে নতজানু হয়ে, তবে সে ছিলো মোরডেকাইর হাতে একটি সহজে-বশ-মানা হাতিয়ার মাত্র; জুডিথ ছিলো অনেক বেশি দুঃসাহসী, তবে সে ছিলো পুরোহিতদের কাছে দাসভাবাপন্ন, এবং তার দুঃসাহসিক কাজগুলোকে, যেগুলো সন্দেহজনক ধরনের, কিছুতেই তুলনা করা যায় না তরুণ ডেভিডের পরিচ্ছন্ন, অত্যুজ্জ্বল বিজয়ের সাথে। পৌত্তলিক পুরাণের দেবীরা লঘুচপল বা অস্থিরমতি, এবং তার সবাই কেঁপে ওঠে জুপিটারের সামনে। পোমিথিউস যখন সূর্য থেকে মহিমান্বিতভাবে চুরি করে আনে আগুন, প্যান্ডোরা তখন জগতের সামনে খোলে তার অশুভের বাক্স।
একথা সত্য যে রূপকথা ও উপকথায় আছে ডাইনিরা ও কুৎসিত বুড়ীরা, যাদের আছে ভীতিকর ক্ষমতা। অ্যান্ডারসনের গার্ডেন অফ প্যারাডাইস-এর বায়ুদের মায়ের চরিত্রটি স্মরণ করিয়ে দেয় আদিম মহাদেবীকে; তার চারটি দানবাকার পুত্র ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মান্য করে তাকে, দুষ্টুমি করলে সে তাদের পিটিয়ে ভরে রাখে ছালার ভেতরে। তবে এগুলো আকর্ষণীয় চরিত্র নয়। এর থেকে অনেক বেশি সুখকর পরী, সাইরেন, ও আনডাইনরা, এরা পুরুষের আধিপত্যের বাইরে; তবে এদের অস্তিত্ব সন্দেহজনক, এদের নেই স্বাতন্ত্র; এরা হস্তক্ষেপ করে মানুষের কর্মকাণ্ডে, কিন্তু এদের নিজেদের কোনো নিয়তি নেই : অ্যান্ডারসনের ছোটো সাইরেন যেদিন নারী হয়ে ওঠে, সেদিন বুঝতে পারে প্রেমের জোয়াল কাকে বলে, এবং দুঃখভোগ হয়ে ওঠে তার নিয়তি।
