• বইয়ের নামঃ দ্বিতীয় লিঙ্গ – সিমোন দ্য বোভোয়ার
  • লেখকের নামঃ হুমায়ুন আজাদ
  • প্রকাশনাঃ আগামী প্রকাশনী
  • বিভাগসমূহঃ গল্পের বই

সিমোন দ্য বোভোয়ার ও নারীবাদ

লন্ডন থেকে একটু দূরে এপিং বনভূমির কাছের এক পল্লীর গরিব কৃষকপরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন এক তরুণী, ফরাশি বিপ্লবের থেকেও বিপ্লবাত্মক, ১৭৯১-এ মাত্র ৩২ বছর বয়সে, মাত্র ৬ সপ্তাহে লিখেছিলেন ১৩ পরিচ্ছেদের একটি পারমাণবিক, এখন অমর বই : দি ভিন্ডিকেশন অফ দি ব্লাইট্‌স্ অফ ওম্যান, বেরিয়েছিলো। ১৭৯২-এ। সেদিন বিশ্বের একটি বড়ো পরিবর্তন ঘটেছিলো। লেখক মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্‌ট্‌, এক সময় নিন্দিত, এখন বন্দিত নারীবাদের জননীরূপে। জননী? শব্দটি ঠিক হলো? নারীবাদ কি জরায়ু থেকে উৎপন্ন? এ-প্রথাগত অভিধাটি আজো ব্যবহৃত হয়, তাঁর ক্ষেত্রেও হয়। মননশীল কিন্তু আবেগাতুর, বিয়েবিরোধী কিন্তু প্রেম ও পুরুষের জন্য কাতর, একই সঙ্গে অগ্নিশিখা ও অশ্রুবিন্দু, মেরি নারীবাদের জোয়ান অফ আর্ক, যিনি দেখা দিয়ে, জয় ক’রে, হয়েছিলেন ট্র্যাজেডি। ১৫৭ বছর পর দেখা দেন আরেক নারী, এবার ইংল্যান্ডে নয়, ফ্রান্সে, ১৯৮৯-এ দু-খন্ডে বেরোয় তাঁর ১০০০-এরও বেশি পৃষ্ঠার বইঃ ল্য দ্যকিয়েম সেক্সঃ দি সেকেন্ড সেক্সঃ দ্বিতীয় লিঙ্গ। তিনি সিমোন দ্য বোভোয়ার। তিনিও বন্দিত বিশশতকের  নারীবাদের জননীরুপে; তাঁর বইয়ের পংক্তির পর পংক্তি থেকে জন্মেছে আধুনিক নারীবাদের বিচিত্র ধারা, অনুপ্রাণিত হয়েছেন পঞ্চাশ – ষাট ও পরের দশকগুলোর নারীবাদীরা! অ্যালিস শোয়ার্জার, দ্য বোন্ডোয়ারের এক সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী লিখেছেন, ‘পঞ্চাশ ও ষাটের তমসায়, যখন নব নারী আন্দোলন দেখা দেয় নি, তখন দ্বিতীয় লিঙ্গ ছিলো এক গুপ্ত সংকেতবিধির মতো, যার সাহায্যে আমরা নতুন নারীরা পরস্পরের কাছে বার্তা পাঠাতাম। আর সিমোন দ্য বোভোয়ার নিজে, তাঁর জীবন এবং তাঁর কর্ম, ছিলেন এবং আছেন এক প্রতীক হয়ে।’ জননী হওয়ার কোনো ইচ্ছে তার ছিলো না; মেরি তবু দুটি কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন, দ্বিতীয়টি জন্ম দিতে গিয়ে চ’লে গিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে, মাত্র ৩৮ বছর বয়সে। দ্য বোভোয়ার সন্তানে ও বিয়েতে বিশ্বাস করেন নি; মননশীলতায় তিনি মেরির থেকে প্রায়-বিপরীত মেরুর, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মননশীলতার প্রতিমূর্তি; কিন্তু ভেতরে ভেতরে মিল আছে তাদের; দ্য বোভোয়ার জাঁ-পল সাত্রের সাথে ৫১ বছর কাটিয়েছেন প্ৰেমবন্ধুত্বের সম্পর্কে, অন্য প্রেমেও পড়েছেন, মননশীল বই লেখার ফাঁকে অন্য প্রেমিককে লিখেছেন কাতর পত্র, গর্ভপাত করেছেন। দুজনেই তিরস্কৃত ও নন্দিত হয়েছেন বই প্রকাশের পর; বিরোধীরা মেরিকে বলেছে ‘পেটিকোটপরা হয়েনা’,‘দার্শনিকতাপরায়ণ সৰ্পিণী’; আর দ্য বোভোয়ারের বইয়ের একটি অংশ পত্রিকায় বেরোলে এক ফরাশি লেখক চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন যে তিনি লেখিকার যৌনাঙ্গের বিস্তৃত বিবরণ পেয়েছেন, এবং বই বেরোনোর পর ক্যাথলিকদের ধর্মীয় দুর্গ ভ্যাটিকান তার বই অনৈতিক’ বলে নিষিদ্ধ করে, এক মার্কিন সাংবাদিক অপভাষায় লেখেন লেখিকার যা দরকার, তা হচ্ছে একটা উৎকৃষ্ট সঙ্গম। মেরি প্রচণ্ড বিদ্রোহী, তিনি ভেঙে ফেলতে চেয়েছেন পুরুষের সভ্যতাকে, মুক্তি দিতে চেয়েছেন বন্দী নারীকে; দ্য বোভোয়ার প্রাজ্ঞ, সুধীর, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, কাব্যিক, ব্যাখ্যা ও উদ্ঘাটন করেছেন, অদৃশ্য জীবাণুর মতো পুরুষতন্ত্রের কাঠামোর ভেতরে ঢুকে তাকে জীৰ্ণ করেছেন। মেরি নারীবাদের জোয়ান অফ আর্ক হ’লে সিমোন দ্য বোভোয়ার নারীবাদের আইনস্টাইন। পুরুষের সাথেই তুলনা করতে হলো; তা-ই করতে হচ্ছে, কেননা দ্য বোভোয়ার, এবং সব নারীবাদীই, চান পুরুষের সাথে সাম্য; কেননা পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতায় সার্বভৌম পুরুষই প্রকাশ করে মানবপ্রজাতির সে-বৈশিষ্ট্য, যাকে দ্য বোভোয়ার বারবার বলেন- ‘ট্র্যান্সেন্ডেন্স’ : সীমাতিক্ৰমণতা, আর নারীকে আটকে রাখা হয়েছে ‘ইমানেন্স’-এ : সীমাবদ্ধতায়।

পুরোনাম সিমোন লুসি-এর্নেস্তিন-মারি-বেরত্রা দ্য বোভোয়ার, বিশ্ববিখ্যাত তিনি সিমোন দ্য বোভোয়ার (১৯০৮-১৯৮৬) নামে; তিনি দিয়ে গেছেন চিরকালের শ্রেষ্ঠ নামগুলোর একটি। দ্য বোভোয়ার জন্মেছিলেন প্যারিসে, ১৯০৮-এর ৯ জানুয়ারি  মঁৎপারনাসের কাফে দ ল রঁতঁদের ওপরে। বাবা জর্জে বেরত্রা দ্যা বেরঁত্রা দ্য বোভোয়ার ছিলেন আইনজীবী, মা ফ্রাঁসোয়া ব্রাসেয়ো; দুজন ছিলেন দু-রক্ম। দ্য বোভোয়ার ছিলেন পিতাতামার জ্যেষ্ঠ সন্তান, আরেকটি বোন ছিলো তাঁর, তাঁকে অনেকটা পুত্ররূপেই পালম করেন পিতা। তিনি লিখেছেন, “বাবা গর্বের সাথেই বলতো : সিমোনের মগজ পুরুষের; সে পুরুষের মত চিন্তা করে; সে পুরুষ।’’ তিনি বেড়ে উঠেন প্যারিসের চতুর্দশ ‘আঁরোদিসঁমা’বা এলাকায়, যেখানে থেকেছেন প্রায় সারা জীবন। মা ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিক, বাৰা সন্দেহবাদী, প্যারিসীয়; এবং অল্প বয়সেই বোভোয়ার বুঝতে পেরেছিলেন চারপাশের পৱিস্থিতি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে উঠলে দ্য বোভোয়ার দেখতে পান কী দুঃসহ ক্লাস্তিকার গৃহস্থালির কাজ করতে হয় তাঁর মাকে- যে-ক্লান্তির মর্মস্পশী বর্ণনা দিয়েছেন তিনি দ্বিতীয় লিংগ-এ; তখনই স্থির করেন কখনো গৃহিণী বা মা হবেন না। দ্বিতীয় লিংগ-এ এক তরুনীর কথা বলেছেন তিনি, যে মায়ের ক্লান্তিকর একঘেয়ে গৃহস্থালির কাজ দেখে ভয় পায় যে সেও বাঁধা পড়বে ওই নির্মম নিরর্থক নিয়তিতে, তখনি সে ঠিক করেন ফেলে সে কখনো মা আর গৃহিণী হবে না; ওই তরুণী দ্য বোভোয়ার নিজেই। ১৯২৯-এ ২১ বছর বয়সে সরবনে দর্শনে এগ্রিগেশন পরীক্ষায় পাশ করেন। তিনি; ফ্রান্সে এ-পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে লাভ করেন। এ-ডিগ্রি। পরীক্ষায় জা-পল সার্ত্র হন প্রথম, তিনি দ্বিতীয়, এবং জড়িয়ে পড়েন প্রেমে, বন্ধুত্ত্বে, এক ব্যতিক্রমী সম্পর্কে, যারা কখনো পরস্পরকে ছেড়ে যান নি, কিন্তু অন্য কারো সাথে না জড়ানোর, শুদ্ধ একনিষ্ঠ দেহ ও মনের সতীত্বের বাধ্যবাধকতায়ও থাকেন নি। সার্ত্রের সাথে দেখা হওয়ার পর বোভোয়ারের জীবন বদলে যায় চিরকালের মতো, এ-সাক্ষাৎ বিশশতকের এক শ্রেষ্ঠ ঘটনা, হয়তো বদলে গিয়েছিলো সার্ত্রের জীবনও, কেননা দ্য বোভোয়ার অস্তিত্ববাদী দর্শনের ‘অপর’ বা আদার’ হয়ে থাকার মতো নারী ছিলেন না।

কিশোরী বোভোয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন যে-ত্রাতার, রাজকুমারের, তাকে তিনি পান সার্ত্রের মধ্যে, এক সুদৰ্শন রাজকুমারের বদলে এক দার্শনিক! বোভোয়ার লিখেছেন : ‘পনেরো বছর বয়সে আমি কল্পনা করেছিলাম যে-ভাবাদর্শ, সার্ত্র হুবহু মিলে যান তাঁর সাথেঃ তিনি আত্মার এমন সঙ্গী, যার মধ্যে আমি পেয়েছি আমার সমস্ত রিপু, যেগুলো এতো উত্তপ্ত হয়ে উঠতো যে পৌছোতো ভাস্থরতায়। তার সাথে আমি অংশীদার হতে পারতাম সব কিছুর।’  এখানে সম্মানসূচক সর্বনাম ব্যবহারের কারণ হচ্ছে ৫১ বছর প্রেমে, মানসিক ও শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে থাকার পরও তারা পরস্পরকে সম্বোধন করতেন ‘আপনি’সর্বনামে। অদ্ভুত লাগে, তাহলে তাদের প্ৰেম, চুম্বন, সঙ্গমও ছিলো দার্শনিক- এক ধরনের বিয়িং অ্যান্ড নাথঃনেস? একসাথে ছিলেন ৫১ বছর, ১৯২৯এ পরিচয় হওয়ার সময় থেকে ১৫ এপ্রিল ১৯৮০তে সার্ত্রের মৃত্যু পর্যন্ত। ঘনিষ্ঠতার পর তাৱা তাদের সম্পর্ক নিয়ে ভাবেন, ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করেন অস্তিত্ববাদী রীতিতে, সিদ্ধান্তে পৌছেন অভিজ্ঞতা বাড়ানোর জন্যে কখনো কখনো ধরা দেবেন। ‘অনিশ্চিত’ বা ‘আকস্মিক’ বা ‘ঘটনাচক্ৰজাত’ বা ‘কান্টিঞ্জেন্ট’ প্রেমের কাছে, যা অনিবার্য নয়, নিতান্তু আকস্মিক, যা তারা দুজনেই করেছেন, এবং জানিয়েছেন। পরস্পরকে। সার্ত্র অবশ্য লুকোচুরি করেছেন। বিয়ে তাঁদের জন্য সুবিধাজনক হতো আর্থিকভাবে, কিন্তু তারা তা বেচে নেন নি; কেননা বিয়ে, এমনকি একত্রবাস, মানুষের জন্যে ক্ষতিকর, তাতে ‘এক’ আরেককে পরিণত করতে চায় ‘অপর’-এ, এক হয়ে উঠতে চায় কর্তা, অপরকে পর্যবসিত করতে চায় কর্মে। সার্ত্র একটি মেয়ে দত্তক নিয়েছিলেন, বোভোয়ার তাও নেন নি; তিনি যেমন নিজের জরায়ু থেকে একটি নকল দ্য বোভোয়ার প্রসব করতে চান নি, তেমনি চান নি সার্ত্রের একটি প্ৰতিলিপি। ১৯৩০-এর দশকের জন্যে তাঁদের সম্পর্ক ছিলো খুবই অসামাজিক, অপ্রথাগত। এতে বোভোয়ারের পরিবারে নানা গোলমাল দেখা দিয়েছিলো; তাঁরা একসাথেও থাকতেন না, লিভ টুগেদার করতেন না, কেননা এটাও এক ধরনের বিয়ে যা ধ্বংস করে মানুষকে; তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় স্বল্পকাল একসাথে ছিলেন। পৃথকভাবে থাকতেন তাঁরা, সাধারণত হোটেলে সন্ধ্যায় দেখা করতেন, পড়তেন ও সমালোচনা করতেন পরস্পরের লেখা। যখন বিখ্যাত হয়ে উহেন তাঁরা সাহিত্যজগতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা অসম্ভব হয়ে ওঠে তাঁদের পক্ষে; তখন তারা সকলের চোখ এড়ানোর জন্যে কাফের পর কাফে বদলাতে থাকেন। বোভোয়ার বেছে নিয়েছিলেন। নারীদের জন্যে প্রথাগত পেশাই, শিক্ষকতা: বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, খুবই ক্ষুদ্র এলাকায়, ১৯৩১ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত মার্সেই ও রোয়েঁ-এ লিসে অর্থাৎ ফরাশি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দর্শন পড়াতেন কোন কোন প্লাতো আরিস্ততল? ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৩ পর্যস্ত শিক্ষকতা করেন প্যারিসে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি দেখা দেন অস্তিত্ববাদী আন্দোলনের এক প্রধান রূপে।

তিনি ঘটনা বর্ণনা করতে, দার্শনিক তত্ত্ব তৈরি করতে, এবং স্মৃতিচারণ করতে পছন্দ করতেন, যা তিনি নিন্দে করেছেন দ্বিতীয় লিঙ্গ-এ সীমাবদ্ধ, গৃহবন্দী, নারীদের এক প্রিয় ব্যাপার ব’লে: তিনি বর্ণনা করেছেন ছোটো মেয়ে বোভোয়ার মায়ের সাথে ভোরবেলা যাচ্ছে খ্রিস্টের নৈশভোজের পর্ব উদযাপনে, মাসে; এর মধুর স্মৃতি সত্ত্বেও স’রে আসেন। তিনি ধর্ম থেকে, দেখতে পান ধর্ম একটা ধ্যাপ্পা; বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন তাঁর বিদ্যালয়, ক্যুর আদেলি দেসির, কঠোর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, এবং কৈশোরেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন ধর্মে, এটা তাঁর ক্যাথলিক মা ও তাঁর মধ্যে সৃষ্টি করে একটি দেয়াল। মগজ থাকলে হৃদয় থাকবে না। কাম থাকবে না, এটা কোনো কথা নয়; বরং দেখা গেছে মগজি নারীরা প্ৰেমে-কামে অদ্বিতীয়, এটাও এক সৃষ্টিশীলতা; ১৫ বছর বয়সে তার মনে হয় তিনি প্রেমে পড়েছেন খালাতে ভাই শাঁপিনেলের, যে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। ফ্রান্সের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ লেখকের লেখার সাথে; তার মা ওসব বইয়ের আপত্তিকর পাতাগুলো পিন দিয়ে আটকে রাখতেন। শাপিনেলের সাথে প্ৰেম তেতো হয়ে ওঠে, যখন শপিনেলে তার বোহেমীয় জীবন ছেড়ে বিয়ে করে এক ধনী নারীকে, যে নিয়ে আসে একটা বড়ো মাপের পণ। পণের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে দ্বিতীয় লিঙ্গ-এ; ফ্রান্সে এটা ছিলো, এবং তিক্তিভাবে ছিলো দ্য বোভোয়ারের মনে।

তিনি নিজের মধ্যে মিলিয়েছিলেন কর্ম ও জ্ঞানকে; তাই তিনি থেকেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কেন্দ্রে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-১৯৪৫) তিনি নাটশি অবরোধের বিরুদ্ধে ফরাশি প্রতিরোধ আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন; এ-অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন লে মাদারে (১৯৫৪) উপন্যাসে। তাঁর উপন্যাস উপস্থাপন করে অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রধান সিদ্ধান্তগুলো, দ্য বোভোয়ার সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন একগুচ্ছ উপন্যাস দিয়ে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ল এভিতে (১৯৪৩: সে থাকতে এসেছে) এটিতে ব্যক্ত হয়েছে যে-দর্শন তা দেখা যায় দ্বিতীয় লিং-এ। এটিতে এক দম্পতির সাথে আরেকটি তরুণী বাস করে দীর্ঘকাল ধরে, এতে তাদের সম্পর্ক কী সূক্ষ্মভাবে ভেঙে পড়ে, তার রূপ দেখিয়েছেন তিনি; এবং দ্বিতীয় লিঙ্গ-এ যা দেখিয়েছেন পাতায় পাতায়। একটি সত্তার সাথে আরেকটি সত্তার সম্পর্কের সমস্যা, যাতে একটি সত্তা মৌলরুপে হয়ে উঠে খাদক, অন্যটি হয়ে ওঠে খাদ্য, শিকারী ও শিকার, এর বিকাশ ঘটে এ-উপন্যাসেই। এর ঘটনা এসেছে বোভোয়ার ও সার্ত্রের ব্যক্তিগত জীবন থেকেই, নিজের জীবনকে তিনি পরিণত করেন উপন্যাস : সার্ত্রের তরুনী ছাত্রী, ওলগা কোসাকিওইজ, থাকতো তাঁদের সাথে, থাকার মধ্যে ছিলো একটা প্রথাবিরোধী চুক্তি, যা রূপ নেয় উপন্যাসে। দ্বিতীয় উপন্যাসে, অন্যদের রক্ত-এ, আর ব্যক্তিগত জীবন নয়, বিষয় হয় দার্শনিক সমস্যা; এর নায়িকা হেলেন বেরত্রা যখন দেখে একটি ছোটো ইহুদি মেয়েকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে গোস্টাপোরা, সে তখন অংশ নেয়। ফ্রান্সে জর্মন অবরোধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধসংগ্রামে, এবং বিশ্বাস পোষণ কয়ে যে হিটলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার একটিই উপায়ঃ হিংস্ৰতা। যে-অমানবিক হত্যাযজ্ঞ ঘটে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে, তাতে মৃত্যুর প্রতি নিবদ্ধ হয় তার সংবেদনশীলতা, এবং তিনি লেখেন সব মানুষই মরণশীল (১৯৪৬)। এর নায়ক অমর, সে তেরো থেকে বিশশতক পর্যন্ত সাতটি শতাব্দী ভ্ৰমণ করে; এবং উপন্যাসটি বুঝিয়ে দেয় যে অমরতা কোনো সমাধান নয়, মৃত্যু থেকেই উঠে আসে জীবনের অর্থ।

১৯৪৯-এ বেরোয় তাঁর ল্য দ্যজিয়েম সেক্সঃ দ্বিতীয় লিঙ্গ পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতায় অপর, অপ্রয়োজনীয়, খাদ্য, রুদ্ধ, সীমাবদ্ধ, বিকলাঙ্গ, দাসী ও কামসামগ্রির স্তরে থাকার জন্যে দণ্ডিত নারীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে অদ্বিতীয় গ্রন্থ; ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, ও শিল্পসৌন্দর্যে যা অতুলনীয়।

দ্বিতীয় লিঙ্গ-এর পর বোভোয়ার আক্কার ফিরে আসেন উপন্যাসে; লেখেন তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস লে মাঁদাঁরে (১৯৫৪: দি মান্ডারিন্স্‌ : মন্ত্রীরা)। ফরাশি মাদারে শব্দটি নেয়া হয়েছে সংস্কৃত ‘মন্ত্ৰিণ’ থেকে, তবে এটা এখন ঠিক মন্ত্রী বোঝায় না, বোঝায় শিক্ষিত অভিজাতদের। এটির জন্যে তিনি পান প্রি গকুর পুরস্কার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ফরাশি বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে তাদের ‘ম্যান্ডারিন’ মর্যাদা ছেড়ে রাজনীতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলো, এটি তার বিবরণে পূর্ণ। অনেকে মনে করে এটি লিখিত সার্ত্র, কাম্যু, ও তার নিজের সম্পর্ক নিয়ে, তবে দ্য বোভোয়ার তা স্বীকার করেন না, যদিও উপন্যাসের ঘটনাগুলোর সাথে মিল আছে তাদের জীবনের। তিনি চারটি দার্শনিক বইও লিখেছেন: এর একটি পুর ওঁয়ে মরাল দ্য ল অ্যামবিগুইতে (১৯৪৭; দ্ব্যৰ্থবোধকতার নীতিশাস্ত্ৰ)। ভ্ৰমণকাহিনীও লিখেছেন দুটি: লা লঁগ মার্শ: এসে সিইর ল চিন (১৯৪৭: দীর্ঘ যাত্ৰা); এবং যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিয়ে ল’আমেরিক অ জুত্র দ্য জুর (১৯৪৮ আমেরিকা: দিনের পর দিন)। তারপর বোভোয়ার লিখতে শুরু করেন স্মৃতিকথা, ভঙ্গিতে যেগুলো অভিনব; তাঁর আত্মজৈবনিক বই চারটি : মেমোয়ার দা’ওঁয়ে জোন ফ্রিই রাঁজে কুঁৎ (১৯৫৮; কৰ্তব্যপরায়ণ কন্যার স্মৃতিকথা), ল ফার্স দ্য ল’আজ (১৯৬০; যৌবনকাল, এটি উৎসর্গ করেন সার্ত্রের নামে) ল ফর্স দে শোজে (১৯৬৩:অবস্থার চাপ), এবং তু কঁৎ ফো (১৯৭২: সব বলা ও করা হয়ে গেছে))। এগুলো ব্যক্তিগত ব্যাপার পেরিয়ে হয়ে উঠেছে ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ফরাশি বুদ্ধুজীবীদের জীবন ও মননের চিত্র। নারীবাদ ছাড়া তার বিশেষ আগ্রহের বিষয় জরায়ণ ও মৃত্যু: হাসপাতালে মায়ের মৃত্যু নিয়ে লেখেন ওয়ে মর্ত ত্রে দুসে (১৯৬৪: একটি খুব সহজ মৃত্যু), বৃদ্ধদের প্রতি সমাজের ঔদাসীন্য সম্পর্কে লেখেন লৈ ভেইয়স। (১৯৭০: বৃদ্ধকাল)। ১৯৮১তে লেলেখেন সার্ত্রের শেষ জীবনের বেদনাদায়ক বিবিরণ ল সেরেমোনি দে অদিয় (বিদায়: সার্ত্রের প্রতি চিরবিদায়)।

দ্বিতীয় লিঙ্গ সম্পর্কে কথা বলার আগে একটি ব্যাপার সম্পর্কে ভাবতে চাই, যা নারী ও পুরুষের জন্যে অশেষ গুরুত্বপূর্ণ, এবং ছিলো দ্য বোভোয়ারের জন্যেও, তা হচ্ছে প্রেম ও শরীর। শেষ জীবনে তাঁর এমন একটি ভাবমূৰ্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিলো যেনো তিনি বিশুদ্ধ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অকম্প্র মূর্তি, তাতে কোনো কামনা বাসনা হাহাকার অশ্রু নেই, তা কখনো কাপে না; তবে তিনি কোনো মর্মরে গঠিত মোমবাতি ছিলেন না। জ্ঞানের সাথে প্ৰেম কাম ক্ৰন্দনের কোনো বিরোধ নেই, বরং জ্ঞানীরা, সৃষ্টিশীলেরাই প্রেম কাম হাহাকারে হতে পারেন অদ্বিতীয়, আর সৃষ্টিশীল নারীরা প্রেমেকামে যে-চুড়ো ছোঁয়, তা পারে না একান্ত নারীধর্মী, সীমাবদ্ধ, পতিদের পরিচারিকা, ও কামসামগ্রি স্ত্রীরা। তারা ক্লান্ত সব কিছুতে, প্রেমেও, কামেও। প্রেম এবং কামও সৃষ্টিশীল ব্যাপার, তাঁর জন্যে প্রতিভা দরকার, তা শুধু যৌনাঙ্গের উত্তেজনা নয়, যদিও ওটা অবশ্যই থাকা দরকার, এবং সঙ্গে দরকার তীব্র মানবিক প্রতিভা; এটা দেখতে পাই সব প্রধান নারী ও পুরুষের মধ্যেই, দেখতে পাই মেরি ওলস্টোনক্রাফটে, যিনি কাঁপতেন প্রেমে ও কামে, দেখতে পাই সিমোন দ্য বোভোয়ারে; জাঁ-পল সার্ত্রের সাথে তিনি চিরসঙ্গীত্বে ছিলেন, তাতে অন্য প্রেমিকের জন্যে প্রেমে মন দুলতে, দেহে পুলক লাগতে তাঁর বাধে নি।

মেরি ছিলেন তীব্র প্রেমিকা, হয়তো প্রেমিকের পদতলে চুমো খেতে খেতে স্বপ্ন দেখতেন নারীমুক্তির; আমাদের বন্দিনী বিপ্লবী রোকেয়ার কথা জানা যায় না, তবে তাঁর চিঠিগুলো ভরে আছে কামহতাশার দীর্ঘশ্বাসে, কান পাতলেই সেগুলোর হাহাকার শোনা যায়। একটি বহুমূত্রগ্রস্ত বুড়োকে নিয়ে তাঁর দিনরাত্রিগুলোর কথা ভেবে আমরা শিউরে উঠি। দ্য বোভোয়ার অন্য বিশ্বের, সার্ত্রের সাথে ছিলো তাঁর আমৃত্যু সম্পর্ক, চুক্তি ছিলো তারা নিতে পারবেন অন্যান্য প্রেমিকপ্রেমিক। সার্ত্রের অনেক নারী ছিলো। বোভোয়ারও নিয়েছেন প্রেমিক, তাদের কথা তিনি লিখেছেনও; লিখেছেন। নেলসন অ্যালগ্রেন এবং পরে ক্লাদ লাঁজমান নামে আরেকজনের কথা; সমকামী সম্পর্কও তাঁর ছিলো; সম্প্রতি জানা গেছে মননশীলতার চূড়ান্তরূপ, রূপসী, দ্য বোভোয়ার ছিলেন পল্লীর রাখালী মেয়ের থেকেও আবেগপরায়ণ, রমণীয় ছিলেন অনারীবাদীরূপে যে ‘চিরন্তনী নারী’কে তিনি বাতিল করেছিলেন, সেটিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন নিজেরই ভেতরে; ভাবতে কি পারি একটি পুরুষের জন্যে দ্য বোভোয়ার কাঁদছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বা ভাবছেন তাঁর কাপড় ইন্ত্রি করার কথা, তাঁর জন্যে রান্নার বা ঘর সাজানোর কথা? ক-বছর আগে বেরিয়েছে বোভোয়ারের প্রেমপত্র বিলাভেড শিকাগো ম্যান : লেটার্স টু নেলসন অ্যালগ্লেন ১৯৪৭-৬৪। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত ১৭ বছর ধ’রে লেখা ৩০৪টি চিঠি! কে আলগ্নেন? এক গৌণ মার্কিন ঔপন্যাসিক। কাতর এসব চিঠি মনে করিয়ে দেয় জন মডেলটন মারিকে লেখা বিরহিণী ক্যাথেরিন ম্যান্সফিল্ডের চিঠিগুলোকে, যা উদ্ধৃত ক’রে দ্য বোভোয়ার দেখিয়েছেন প্রেমিকা কতোটা পাগল থাকে প্রেমিককে তাঁর প্রিয় জিনিশটি, এমনকি বক্ষবন্ধনীটি দেখানোর জন্যে। তাঁর চিঠিগুলোতে যা বিস্ময়কর, তা হচ্ছে প্রেমিকের প্রতি তাঁর অতিশয় আনুগত্য; প্রেমিককে তিনি ডেকেছেন ‘কুমির’ ‘পশু’ ও “আমার প্রিয়তম স্বামী”: নিজেকে বলেছেন “তোমার অনুগত আরব স্ত্রী, যে-আরব স্ত্রীর শোচনীয় রূপ এঁকেছেন তিনি দ্বিতীয় লিঙ্গ-এ। তিনি যখন লিখেছেন দ্বিতীয় লিঙ্গ, তখনই আলগ্রেনের কাছে লিখছিলেন কোমল, কাতর পল্লীবালার চিঠি; ১৯৪৯-এর এক সন্ধ্যায় আলগ্রেনকে লিখেছেন, ‘হায় বিধাতা! নারীরা যতো বই লিখেছে ও নারীদের সম্বন্ধে যতো বই লেখা হয়েছে, আমি সব পড়েছি এবং আমায় ঘেন্ন ধ’রে গেছে। আমি আমার আপন পুরুষ চাই!’ ১৭ বছর ধরে দ্য বোভোয়ার ইংরেজিতে, মাঝেমাঝে মধুর ভুল ইংরেজিতে, আলগ্রেনকে লিখেছেন প্রেমপত্র। তিনি রূপসী ছিলেন, তবে আলগ্রেনের সাথে দেখা হওয়ার আগে রূপ নিয়ে ভাবেন নি। ১৯৪৩-এ তাঁর একটি দাঁত পড়ৈ যায়, তিনি সেটি বাঁধান নি, কেননা তা খুবই ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর ও নিরর্থক’; কিন্তু ১৯৪৮-এ, তিনি লিখেছেন, “তোমার জন্যে সপ্তাহে তিনবার আমি গেছি। দন্তচিকিৎসকের কাছে।” তিনি চেয়েছিলেন যাতে আলগ্রেন “পায় সম্পূর্ণ হাসিসহ একটি মেয়ে’। তাদের দেখা হয়। ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে: দা বোভোয়ার ৩৯, আলগ্রেন ৩৮। এর বারো বছর আগে বেরিয়েছিলো অ্যালগ্রেনের প্রথম উপন্যাস, তাতে টাকা বা খ্যাতি কিছুই আসে নি; ১৯৪৯-এ বেরোয় তাঁর সোনালি বাহুর পুরুষ, এটা তাকে কিছুটা অর্থ ও খ্যাতি এনে দেয়। দ্য বোভোয়ার তাকে সম্বোধন করেছেন ‘আমার চমৎকার, বিস্ময়কর, ও প্রিয় স্থানীয় তরুণ’, ‘আমার মূল্যবান, প্রিয়তম শিকাগোর পুরুষ’ এবং “আমার প্রিয়তম স্বামী। তাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন আলগ্রেন; তাঁর প্রতি বিশ্বস্তু ছিলেন বছরখানেক! বোভোয়ার লিখেছেন; আমি এখন বুঝি ওটা ছিলো বোকামি, কেননা কোনো বাহুই উষ্ণ নয়, যখন তা থাকে সমুদ্রের ওপারে।’ তিনি প্যারিস ছাড়তে পারতেন, কিন্তু সার্ত্রকে নয়। আলগ্রেনকে লিখেছেন, ”তোমার সাথে আমৃত্যু দিনরাত কাটিয়ে আমি সুখ পাবো শিকাগোতে, প্যারিসে বা চিচিকাস্টেনেসোতে; তোমাকে আমি দেহে ও হৃদয়ে ও আত্মায় যতোটা ভালোবাসি, তাঁর চেয়ে বেশি ভালোবাসা সম্ভব নয়। কিন্তু যে আমার সুখের জন্যে সব কিছু করেছে, তাকে আঘাত দেয়ার থেকে বরং আমি মরে যাবো।” ৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি যতো পুরুষের সাথে ঘুমিয়েছেন, তাঁর থেকে বেশি ঘুমিয়েছেন নারীদের সাথে। সার্ত্রের সাথে তাঁর যৌনজীবন টিকেছে ন-বছর। বোভোয়ায় লিখেছেন : “তিনি সবখানেই উষ্ণ, প্রাণবন্ত পুরুষ, কিন্তু শয্যায় নয়। শিগগিরই বুঝতে পেরেছিলাম, যদিও আমার কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না; এবং প্রেমিকপ্রেমিকা হিশেবে চালিয়ে যাওয়াকে একটু একটু ক’রে মনে হতে থাকে নিরর্থক, এবং এমনকি অশ্লীল।’

বিশশতকের প্রথমার্ধ ছিলো নারীদের জন্যে এক অন্ধকার মুক্তির সময়, মুক্তির কথা স্তব্ধ হয়ে গেছে, নারীদের ধাক্কিয়ে আবার ঢুকানো হচ্ছে ঘরসংসাড়ে, বড়ো ক’রে তোলা হয়েছে ‘নারী চিরন্তনী কে, ওই অন্ধকারের মধ্যে দিব্য অরুণের মতো দেখা দেয় দ্য বোভোয়ারের ল্য দাজিয়েম সেক্স (১৯৪৯: দ্বিতীয় লিঙ্গ); এটি হয়ে উঠে পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতায় নারীর পরিস্থিতির এক ধ্রুপদী দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক, রাজনীতিক ভাষ্য, হয়ে ওঠে নবনারীদের মূলগ্রন্থ। ল্য দ্যজিয়েম সেক্সকে আপাতদৃষ্টিতে খুবই ভিন্ন মনে হয় মেরি ওলস্টোনক্রাফট্‌এর ভেন্ডিকেশন থেকে, অনেক জটিল অনেক প্রাজ্ঞ এ-বই মেরির বইটি থেকে, মেরির বইয়ের ক্রোধ ও আক্রমণ নেই এতে, এমনকি তিনি কোনো দাবিও জানান নি, তিনি ব্যাখ্যা ও উদঘাটন করেছেন নারীর পরিস্থিতি, তবে এতে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে সে চিন্তাভাবনা, যার উন্মেষ ঘটেছিলো মেরির বইতে। মেরির আক্রমণের একটি বিষয় চিরন্তনী নারী ধারণা, যা পিতৃতন্ত্রের ধর্মে দর্শনে সাহিত্যে এবং সবকিছুতে এক ধ্রুব ব্যাপার বলে গৃহীত, মেরি তা বাতিল ক’রে দেন; দ্য বোভোয়ারের প্রধান বিষয় এটিই, তবে তিনি মেরির মতো আক্রমণ করেন। নি, ধর্ম পুরাণ মনোবিজ্ঞান সাহিত্য ঘেটে দেখান এর অসারত্ব। তিনি বলেছেন, “বিধানকর্তারা, পুরোহিতেরা, দার্শনিকেরা, লেখকেরা, এবং বিজ্ঞানীরা দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে নারীর অধীন অবস্থান স্থির হয়েছে স্বর্গে এবং মর্ত্যে এটা সুবিধাজনক। পুরুষের উদ্ভাবিত ধর্মগুলোতে প্রতিফলিত হয় আধিপত্যের এ-বাসনা।’

তাঁর বিষয় সভ্যতায় নারীর পরিস্থিতি; এটা তিনি ব্যাখ্যা করেছেন ‘অস্তিত্ববাদী নীতিশাস্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে’। তাঁর মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে আমরা মানুষ, কেননা আমরা পেরিয়ে যাই প্রকৃতিকে; মানুষ হওয়ার অর্থ ক্ৰমশ হয়ে ওঠা, বিকশিত হওয়া, আবিষ্কার করা, সৃষ্টি করা, জীবনের মূল্য শুধু বেঁচে থাকায় নয়, বরং জীবনকে নিরস্তুর বিকশিত করার মধ্যে। মানবমগুলিতে আছে দুটি লিঙ্গ : পুরুষ ও নারী; এর মাঝে পুরুষ ‘বদলে দেয় পৃথিবীর মুখমণ্ডল, সে নতুন যন্ত্রপাতি তৈরি করে, আবিষ্কার করে, সে গঠন করে ভবিষ্যতের রূপ’; আর এটাই তাকে ভিন্ন ক’রে তোলে পশুর থেকে। আমাদের সংজ্ঞা কী? কর্ম ও আকাংখাই সংজ্ঞায়িত করে আমাদের। প্রজননের মাধ্যমে কেউ মানুষ হয়ে উঠতে পারে না, হয়ে উঠতে হয় সৃষ্টি ও নির্মাণের মধ্য দিয়ে; তিনি বলেছেন, ‘স্ত্রীলিঙ্গ তাঁর প্রজাতির শিকার।’ পুরুষ নিজেকে মুক্ত ক’রে নেয় নিরর্থক জৈবিক পুনরাবৃত্তির কবল থেকে, নিরন্তর চেষ্টা করে নিজের জন্যে অধিকতর স্বাধীনতা সৃষ্টির। কিন্তু নারী? নারীর শোচনীয় ট্র্যাজেডি হচ্ছে ইতিহাসব্যাপী তাকে বঞ্চিত করা হয়েছে আকাঙ্খা ও উচ্চাভিলাষের অধিকার থেকে, তাকে মানুষ হয়ে উঠতে দেয়া হয় নি। তিনি ব্যবহার করেছেন দুটি ধারণা : আত্ম (সেম্বফ) ও অপর (আদার), যে-দুটিকে তিনি মানবিক চেতনার জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাঁর মতে, প্রতিটি চেতনা বিরূপ অন্য প্রতিটি চেতনার প্রতি: একটি চেতনা নিজেকে ক’রে তোলে কর্তা, প্রয়োজনীয় বা অবধারিত, আর সে অন্য চেতনাকে ক’রে তোলে কর্ম, অপ্রয়োজনীয়, আকস্মিক! নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পারস্পরিকতা রক্ষা করা হয় নি, পুরুষ নারীকে ক’রে তুলেছে চিরন্তন ‘অপর’, তাকে ক’রে তুলেছে কর্ম, কখনো কর্তা হয়ে উঠতে দেয় নি! তাই নারী হয়ে আছে প্রকৃতি, রহস্যময়ী, অ-মানুষ; মানুষ হিশেবে তাঁর মূল্য নেই, তাঁর মূল্য অমূর্ত ধারণার প্রতিরূপ হিশেবে। নারী যতো দিন নারী হয়ে থাকবে ততো দিন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারবে না। তিনি অসামান্যরূপে ব্যাখ্যা করেছেন কিংবদন্তি বা পুরাণে এবং সাহিত্যে নারীর বাভমূর্তি; আক্রমণ করেছেন উৎপাদিত অসার নারীভাবমূর্তিকে। বলেছেন, ‘পুরুষের দাসী না হ’লেও নারী সময়ই আশ্রিত থেকেছে পুরুষের; এ-দুটি লিঙ্গ কখনো পৃথিবীকে সমভাবে ভোগ করেনি। তিনি অস্তিত্ববাদী দর্শন ব্যাবহার করেছেন, তাঁর দর্শন পুরোপুরি গহণযোগ্য নাও হ’তে পারে, কিন্তু তাঁর ব্যাখ্যা নির্ভুল। তিনি দেখিয়েছেন যে প্রত্যেক সংস্কৃতিতেই পুরুষ নিজেকে ক’রে তুল্বছ্ব মানুষের পরম রূপ, অর্থাৎ পুরুষই মানুষ, আর নারী নিতান্তই নারী; পুরুষ হচ্ছে মানুষকে মাপার মানদণ্ড, নারীকে ওই মানদণ্ডে মেপে ঘোষণা করা হয়েছে নিকৃষ্ট বলে। দ্বিতীয় লিঙ্গ-এর প্রথম খণ্ডে তিনি অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পুরুষের পক্ষপাতিত্বের; দেখিয়েছেন, ‘কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে ওঠে”; অৰ্থাৎ পিতৃতন্ত্র ছাঁচে ঢালাই ক’য়ে উৎপাদনা করে একটি উপভোগ্য বস্তু : নারী। পুরুষ করে তুলেছে প্ৰভু; তিনি বলেছেন, ‘বহু শব্দ অনেক সময় ব্যবহৃত হয় চরম আক্ষরিক অর্থে, যেমন ফ্যালাস (শিশ্ন) শব্দটি বুঝিয়ে থাকে মাংসের সে-উত্থান, যা নির্দেশ করে পুরুষকে, তারপর এগুলোকে সম্প্রসারিত করা হয় সীমাহীনভাবে এবং দেয়া হয় প্রতীকী অর্থ, তাই শিশ্ন এখন বুঝিয়ে থাকে পৌরুষ ও তাঁর পরিস্থিতি। পুরুষতন্ত্র এমন ধারণা সৃষ্টি করেছে যে শিশ্নই সমস্ত ক্ষমতার উৎস। ধনাত্মকতা ও ঋণাত্মকতার, বা বৈপরীত্যের যে-ধারণা পরে প্রধান হয়ে ওঠে ভাষাবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ও অন্যান্য বিদ্যায়, তা তিনি চমৎকারভাবে প্রয়োগ করেন। নারী ও পুরুষ ব্যাখ্যায়; দেখান যে পুরুষতন্ত্র তৈরি করেছে একরাশ বিপৰীত ধারণা, যার একটি ধনাত্মক বা প্রয়োজনীয় বা কর্তা, আরেকটি ঋণাত্মক বা অপ্রয়োজনীয় বা কর্ম, যেমন : পুংলিঙ্গ : স্ত্রীলিঙ্গ, সংস্কৃতি : প্রকৃতি, মানুষ : পশু, উৎপাদন : প্রজনন, সক্রিয় : অক্রিয়; এগুলোর মধ্যে প্রথমটি শুভ, বিপরীতটি অশুভ, এবং পুরুষতন্ত্র প্রথমটি রেখেছে নিজের জন্যে, বিপরীতটি নারীর জন্যে। তিনি বাতিল করেছেন ‘চিরন্তনী নারীত্ব’কে, তবে তিনি পুরুষকেই মানবমগুলির প্রতিনিধি হিশেবে গ্ৰহণ করেছেন, এবং নারীর জন্যে চেয়েছেন  পুরুষেরই গুণ, যেমন বহু আগে অন্ধকারতম অঞ্চলের এক নারীবাদী, রোকেয়া, পুরুষকে প্ৰচণ্ড আক্রমণ, নিন্দা, পরিহাসের পর বলেছিলেন, ‘আমাদের উন্নতির ভাব বুঝাইবার জন্য পুরুষের সমকক্ষতা বলিতেছি। নচেৎ কিসের সহিত এ উন্নতির তুলনা দিব? পুরুষের অবস্থাই আমাদের উন্নতির আদর্শ।’ রোকেয়া পুরুষকে বলেছেন অপদাৰ্থ দুশ্চরিত্র পাপিষ্ঠ শয়তান পাশবিক, দ্য বোভোয়ার এমন তিরষ্কার করেন নি; রোকেয়া বলেছিলেন, ‘পুরুষদের স্বার্থ ও আমাদের স্বাৰ্থ ভিন্ন নহে- একই। তাহদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহাই’; দ্য বোভোয়ার দ্বিতীয় লিঙ্গ-এর শেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, ‘বিদ্যমান বিশ্বের মাঝে মুক্তির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে পুরুষকেই। এ-পরম বিজয় লাভের জন্যে, এক দিকে, এটা দরকার যে পুরুষ ও নারীরা তাদের প্রাকৃতিক পার্থক্যকরণের সাহায্যে ও মাধ্যমে দ্ব্যর্থহীনভাবে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করবে তাদের ভ্ৰাতৃত্ববোধ।’ রোকেয়ায় এ-ভ্রাতৃত্ববোধ নেই, রয়েছে একটা বিরোধ, কিন্তু দ্য বোভোয়ার চেয়েছেন নারী ও পুরুষের সাম্য ও প্রীতিপূর্ণ বিকাশ।

১৭৯২-এ মেরি ওলস্টোনক্র্যাফুটের ভিডিকেশন-এর পর থেকে অনেকেই কাজ করেন, বাস্তবে ও তাত্ত্বিকভাবে, নারীমুক্তির জন্যে; গ’ড়ে তোলান একটি মৌলিক চিন্তাধারা, যাকে আজ বলা হয় নারীবাদ, তাঁর মধ্যে যেমন রয়েছেন রামমোহন রায়, লুসি স্টোন, কেড়ি স্ট্যান্টন, সুজান অ্যান্থনি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্টুয়ার্ট মিল, হেনরিক ইবসেন, বেগম রোকেয়া, হোসা লুক্সেমবার্গ, ভার্জিনিয়া উল্ফ, এবং আরো অনেকে, যারাঁ বাস্তবিক ও তাত্ত্বিকভাবে তৈরি করেন নারীমুক্তির আন্দোলন। বিশশতকে নারীবাদের শ্রেষ্ঠ তাত্ত্বিক সিমোন দ্য বোভোয়ার; তিনি যখন দ্বিতীয় লিঙ্গ লেখেন, তখন তিনি ছিলেন একা, তখন ভুলেই যাওয়া হয়েছিল নারীকে; তবে দু-দশকের মধ্যেই অন্ধকার কাটে, দেখা দেয় নারীবাদের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ বা নবনারীবাদ, বেরোয় বেটি ফ্রাইডানের ফেমনিন মিস্টিক(১৯৬৩), কেইট মিলেটের সেক্সুয়াল পলিটিক্স (১৯৬৯); দেখা দেন জারমেইন গ্রিয়ার, মেরি এলমান, সান্ড্রা গিলবার্ট, ফাতিমা মেরনিসসি, নওএল এল সাদাওয়ি, এলেন সিজো, ল্যুস ইরিগার, ক্রিস্তেভা, টাইগ্রেস অ্যাটকিন্সন, শুলামিথ ফায়ারস্টোন, শিলা রোওবোথাম এবং বিশ্ব জুড়ে আরো অজস্ৰ, যারা বদলে দেন পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারার চরিত্র; এবং তঁরা কোনো-না-কোনোভাবে ঋণী সিমোন দ্য বোভোয়ারের কাছে। নারীবাদী আর কোনো পশ্চিমি প্রপঞ্চ নয়, এটা বিশ্বজনীন!

নারীবাদের বিশশতকের প্রধান প্রবক্তা, সিমোন দ্য বোভোয়ার কি ছিলেন। নারীবাদী? প্রশ্নটিই হাস্যকর মনে হ’তে পারে; এমন যে খ্রিস্ট কি ছিলেন খ্রিস্টান, মার্ক্স কি ছিলেন মার্ক্সবাদী? দ্য বোভোয়ার যখন, ১৯৪৯-এ, দ্বিতীয় লিঙ্গ লেখেন, তাঁর মনে হয়েছিলো সমাজতন্ত্রই নারীকে মুক্তি দেবে তাঁর দাসত্ব থেকে, তাই তখন তিনি নিজেকে মনে করেছেন একজন সমাজতন্ত্রবাদী, নারীবাদী নয়। কিন্তু এক সময় তাঁর ভুল ভাঙে, দেখতে পান সমাজতন্ত্র নারীকে মুক্তি দিচ্ছে না, ওটিও একটি পুংতন্ত্র। ১৯৭২-এ তিনি যোগ দেন ফ্রান্সের এমএলএফ-এ (নারীমুক্তি আন্দোলন), এবং প্ৰথমবারের মতো নিজেকে নারীবাদী বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭০-এ এমএলএফ (নারীমুক্তি আন্দোলন) স্থাপিত হওয়ার আগে ফ্রান্সে যে-সব নারীসংঘ ছিলো, সেগুলো ছিলো সাধারণত সংস্কার ও আইনপস্থি। তাদের সাথে জড়িত হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার হয় নি। তুলনায় নবনারীবাদ আমূল্যবাদী। দ্বিতীয় লিঙ্গ-এর শেষভাগে বলেছিলাম আমি নারীবাদী নই, কেননা আমি বিশ্বাস করতাম যে সমাজতান্ত্রিক বিকাশের সাথে আপনা-আপনি সমাধান হয়ে যাবে নারীর সমস্যা। নারীবাদী বলতে আমি বোঝাতাম শ্রেণীসংগ্ৰামনিরপেক্ষভাবে বিশেষ নারীসমস্যা নিয়ে লড়াইকে। আমি আজো একই ধারণা পোষণ করি। আমার সংজ্ঞায় নারীবাদীরা এমন নারী- বা এমন পুরুষ- যারা, সংগ্ৰাম করছেন নারীর অবস্থা বদলের জন্যে, সাথে থাকছে শ্রেণীসংগ্রাম; এবং তঁরা শ্রেণীসংগ্ৰামনিরপেক্ষভাবেও, সমাজের সমস্ত বদলের ওপর নির্ভর না করে, নারীর অবস্থা বদলের জন্যে সংগ্ৰাম করতে পারেন। আমি বলবো, এ-অর্থেই আমি আজ নারীবাদী, কেননা আমি বুঝতে পেরেছি যে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার আগে নারীর পরিস্থিতির জন্যে আমাদের লড়াই করতে হবে, এখানে এবং এখনই।’

সিমোন দ্যা বোভোয়ারের মৃত্যু হয় ১৪ আগস্ট, ১৯৮৬তে প্যারিসে; তখন তিনি হয়ে উঠেছিলেন নারীর সাম্য ও অধিকারের সংগ্রামের বিশ্বজনীন প্রতীক।

ল্য দ্যজিয়েম সেক্স : দ্বিতীয় লিঙ্গ বই কেমন? বলবো কি কি এটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠ গদ্য বইগুলোর একটি; বলবো কি যদিও এ-দুটির মধেয় তুলনা চলে না, এটি ওয়ার অ্যান্ড পিস-এর থেকেও উৎকৃষ্ট? কেনো বল্বো না? তলস্তয় পৌরাণিক অনেকাংশ ক্ষতিকর ও অতিমূল্যায়িত, আর দ্য বোভোয়ার ভবিষ্যতের। তত্ত্ব, দর্শন, ব্যাখ্যা প্রভৃতির কথা ছেড়ে দিলেও থাকে অনন্য শিল্পিতা, সৌন্দর্য, অজস্র উৎকৃষ্ট কবিতার রুপক, উপমা, চিত্রকর জড়ো হয়ে আছে এ-বইয়ে, এর বর্ণনাগুলোতে আছে এমন নিবিড়তা, যা ক্ষণে ক্ষণে মন এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে দেয় পরম শিহরণ, যদিও মূল আমি পড়িনি। আমি অনুবাদ করেছি এইচ এম পার্শলির অসামান্য ইংরেজি অনুবাদটি থেকে, তবে পুরোটা অনুবাদ করি নি, তাহলে হাজার পাতায় পৌছোতে হতো; অনুবাদ করেছি আমার প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো। আমি আন্তরিক থাকতে চেয়েছি পার্শলির প্রতি, যেমন তিনি চেয়েছেন। দ্য বোভোয়ারের প্রতি: কোথাও ভাবানুবাদ করি নি, মূলের মতোই উপস্থাপন করতে চেয়েছি বক্তব্য। অনুবাদে ভুগেছি নানা সমস্যায়, তার মধ্যে আছে পরিভাষা; তবে তা বড়ো নয়, ভঙ্গিটিই প্ৰধান সমস্যা। এবং সমস্যা সৰ্বনামের; ইংরেজিতে সর্বনামের পুং ও স্ত্রীলিঙ্গ রূপ রয়েছে, এবং রয়েছে বস্তু ও অবস্তুবাচক সর্বনাম, কিন্তু বাঙলা সর্বনাম লিঙ্গনিরপেক্ষ, এটা নারীবাদীদের কাছে সুখের হলেও অনুবাদকের জন্যে বড়োই অসুখের; হি’, ‘সি’র বিচিত্র রূপের, এবং ‘ইট’-এর কাজ শুধু ‘সে’ বা “তা’ দিয়ে কুলোনো যায় না; তাই অনেক সময় সর্বনামের বদলে বিশেষ্যই ব্যবহার করছি। পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণে সংশোধন করা হলো অনেক কিছু, এবং বাড়লো একশো পাতার মতো; এবং আর বাড়বে না।

হুমায়ূন আজাদ
৪ শ্রাবণ ১৪৩৮ : ১৯ জুলাই ২০০১
১৪ই ফুলার রোড
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা।

ভূমিকা – দ্বিতীয় লিঙ্গ

নারী সম্পর্কে একটি বই লেখা নিয়ে আমি দীর্ঘকাল ধরে দ্বিধায় ছিলাম। বিষয়টি বিরক্তিকর, বিশেষ করে নারীদের কাছে; এবং এটা নতুন নয়। নারীবাদ নিয়ে কলহে প্রচুর কালির অপচয় হয়েছে, এবং এখন সম্ভবত এ নিয়ে আর কিছু না বলাই ভালো। তবে এখনো এ-সম্পর্কে কথা ওঠে, কেননা গত শতকে এ-সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ বাজেকথা বলা হ’লেও তা সমস্যাটিকে একটুও আলোকিত করে নি। কোনো সমস্যা কি আছে আদৌ? যদি থাকে, সেটি কী? সত্যিই কি আছে আদৌ? যদি থাকে সেটা কি?সত্যিই কি আছে নারীরা? চিরন্তন নারীত্ত্বে বিশ্বাস করেন এমন লোক এখনো আছেন, যারা আপনার কানে ফিসফিস করে বলবেন; ‘এমনকি রাশিয়ায়ও নারীরা এখনো নারী’; এবং পন্ডিতজনেরা- কখনো কখনো একই ব্যক্তি- দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবেনঃ ‘নারীরা তাঁর পথ হারিয়ে ফেলেছে, নারী বিলুপ্ত।’ কিন্তু যদি আজও থেকে থাকে নারী, যদি তারা থাকে চিরকাল, তারা থাকুক এটা বাঞ্চিত হোক বা না হোক, তাই ভাবতে ইচ্ছে করে পৃথিবীতে তারা অধিকার ক’রে থাকবে কোন স্থান, তাদের স্থান কি কোথাও হওয়া উচিত? একটি স্বল্পায়ু সাময়িকপত্র সম্প্রতি প্রশ্ন করেছে, ‘কী হয়েছে নারীদের?’

কিন্তু প্রথমেই প্রশ্ন করা দরকারঃ নারী কী? ‘তোতা মিউলিয়েন ইন ইউতেরো’ একজন বলেন, ‘ নারী হচ্ছে জরায়ু।’ তবে কোনো কোনো নারী সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে রসজ্ঞরা ঘোষণা করেন তারা নারী নয়, যদিও অন্য নারীদের মতা তারাও জরায়ুসম্বলিত। সবাই এ সত্যটি স্বীকার করে যে মানব প্ৰজাতির ভেতরে স্ত্রীলিঙ্গরা রয়েছে; চিরদিনের মতো আজো তারা মানবমগুলির অর্ধেক। তবুও আমাদের বলা হয় যে নারীত্ব বিপন্ন, আমাদের বিশেষভাবে উপদেশ দেয়া হয় নারী হতে, নারী থাকতে, নারী হয়ে উঠতে; তাই মনে হয় যে প্রতিটি স্ত্রীলিঙ্গ মানুষই নারী নয়; নারীরূপে বিবেচিত হতে হ’লে তার থাকতে হবে সে-রহস্যময় ও বিপন্ন বৈশিষ্ট্য, যাকে বলা হয় নারীত্ব। এটা কি এমন কোনো বৈশিষ্ট্য, যা নিঃসৃত হয় ডিম্বাশয় থেকে? অথবা এটা কি কোনো প্লাতোয়ী সারবস্তু, কোনো দার্শনিক কল্পনার সামগ্রি? কোনো কোনো নারী এ-সারসত্তার প্রতিমূর্তি হওয়ার জন্যে ব্যগ্রভাবে চেষ্টা করলেও এর উৎপাদন অসম্ভব।

ধারণাবাদ তার অবস্থান টিকিয়ে রাখতে পারে নি। জীববিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান আর স্বীকার করে না চিরস্থির অপরিবর্তনীয় গুণাবলির অস্তিত্ব, যা নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যেগুলো চাপিয়ে দেয়া হয় নারী, ইহুদি, বা নিগ্রোদের ওপর। বিজ্ঞান কোনো বৈশিষ্ট্যকে আংশিকভাবে কোনো পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল বলে গণ্য করে। আজ যদি নারীত্ব না থাকে, তাহলে তা কখনো ছিলো না। তবে নারী শব্দটির কি কোনো বিশেষ অর্থ নেই? যাঁরা বিশ্বাস করেন যুক্তিবাদ ও নামবাদী দর্শনে, তাদের কাছে নারী হচ্ছে সে-সব মানুষ, যাদের স্বেচ্ছাচারীভাবে নির্দেশ করা হয় নারী শব্দটি দিয়ে। অনেক মার্কিন নাৱী মনে করে যে নারী বলে আর কিছু নেই; কোনো পিছিয়ে পড়া ব্যক্তি যদি নিজেকে নারী বলে মনে করে, তাহলে তার বন্ধুরা তাকে পরামর্শ দেয় মনোসমীক্ষণের, যাতে সে এ-আবিষ্টতা থেকে মুক্ত করতে পারে নিজেকে। আধুনিক নারী : বিলুপ্ত লিঙ্গ নামে একটি বই সম্পর্কে ডরোথি পার্কার লিখেছেন : ‘যে- সব বই নারীকে নারী হিশেবে বিচার করে, সেগুলোর প্রতি আমি ন্যায়ানুগ হ’তে পারি না…. আমার ধারণা আমাদের সবাইকে, পুরুষ ও নারীদের, গণ্য করতে হবে মানুষ হিশেবে।” তবে নামবাদ একটি অসুষ্ঠ মতবাদ; আর নারীবাদবিরোধীদের এটা দেখিয়ে দিতে কোনোই কষ্ট হয় নি যে নারীরা পুরুষ নয়। নারী অবশ্যই, পুরুষের মতোই, একজন মানুষ; তবে এ-ঘোষণা বিমূর্ত। সত্য হচ্ছে প্রতিটি বাস্তব মানুষ সব সময়ই এক একলা, পৃথক সত্তা। চিরন্তন নারীত্ব, কৃষ্ণ আত্মা, ইহুদি চরিত্র ইত্যাদি ধারণা অস্বীকার করার অর্থ এই নয় যে আজ ইহুদি, নিগ্রো, ও নারীদের অস্তিত্ব নেই; এমন অস্বীকার এদের মুক্তি নির্দেশ করে না, নির্দেশ করে বাস্তবতা থেকে পলায়ন। কয়েক বছর আগে একজন বিখ্যাত নারী লেখক লেখিকাদের একগুচ্ছ ছবির মধ্যে তাঁর ছবি অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দেন নি; তিনি চান পুরুষদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হ’তে। তবে এ সুবিধা পাওয়ার জন্যে তিনি খাটান তাঁর স্বামীর প্রভাব! যে-নারীরা নিজেদের পুরুষ ব’লে দাবি করে, তারা নির্ভর করে পুরুষদের বিবেচনা ও শ্রদ্ধাবোধের ওপরই। ট্রটস্কিপস্থি এক তরুণী, যে দাঁড়িয়েছিল এক হৈহুল্লাপূর্ণ এক জনসভার মঞ্চে, নিজের দেহের ভঙ্গুরতা সত্ত্বেও যে গুষোঘুষির জন্য ছিলো প্ৰস্তুত, তার কথা আমার মনে পড়ছে। সে অস্বীকার করেছিলো তাঁর নারীসুলভ দুর্বলতা; তবে সে এটা করেছিলো এক উগ্র পুরুষের প্রতি প্রেম থেকে, যার সমকক্ষ সে হ’তে চেয়েছিলো। অনেক মার্কিন নারীর স্পর্ধা প্রবণতা প্রমাণ করে যে তারা তাড়িত হচ্ছে তাদের নারীত্ববোধ দিয়ে। সত্য হচ্ছে, চোখ খোলা রেখে একটু ঘুরতে গিয়েই দেখা যায় মানবমণ্ডলি দু-শ্রেণীর মানুষে বিভক্ত, যাদের পোশাক, মুখমণ্ডল, শরীর, হাসি, হাঁটাচলার ভঙ্গি, আগ্রহ, এবং পেশা সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন। সম্ভবত এসব ভিন্নতা বাহ্যিক, হয়তো এগুলো লোপ পেয়ে যাবে। তবে যা নিশ্চিত, তা হচ্ছে যে এসব সুস্পষ্টভাবে বিরাজমান।

যদি নারী হিশেবে কাজ কয়া নারীর সংজ্ঞা তৈরির জন্যে যথেষ্ট না হয়, যদি আমরা তাকে ‘চিরন্তন নারীত্ব’ ধারণা দিয়েও ব্যাখ্যা করতে অস্বীকার করি, এবং যদি আমরা, আপাতত, স্বীকার করে নিই যে নারীরা আছে, তাহলে আমাদের একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই হয় : নারী কী?

প্রশ্নটি করাই, আমার কাছে, একটি প্রাথমিক উত্তর নির্দেশ করা। আমি যে এপ্রশ্নটি করছি, এটাই তাৎপর্যপূর্ণ। কোনো পুরুষই কখনো পুরুষ মানুষের উৎকট পরিস্থিতি সম্পর্কে একখানা বই লিখতে উদ্যত হবে না; কিন্তু আমি যদি নিজেকে সংজ্ঞায়িত করতে চাই, সবার আগে আমাকে বলতে হবে : ‘আমি একজন নারী’; পরবর্তী সমস্ত আলোচনা রচিত হবে এ-সত্যের ওপর ভিত্তি ক’রে। পুরুষ কখনোই নিজেকে কোনো এক বিশেষ লিঙ্গের সদস্য হিশেবে উপস্থাপিত করে শুরু করে না; সে যে পুরুষ, এটা বলা বাহুল্য। পুরুষ ও নারী শব্দ দুটি প্রতিসমরূপে ব্যবহৃত হয় শুধু গঠন হিশেবেই, যেমন আইনের কাগজপত্রে। বাস্তবে এ-দু-লিঙ্গের সম্পর্ক দুটি বৈদ্যুতিক মেরুর সম্পর্কের মতো নয়, কেননা পুরুষ ধনাত্মক ও নিরপেক্ষ উভয়ই নির্দেশ করে, যা দেখা যায় ম্যান শব্দটির সাধারণ ব্যবহারে, এটা বোঝায় সমগ্র মানবমগুলি; আর সেখানে নারী নির্দেশ করে শুধুই নেতিবাচকতা। কোনো বিমূর্ত আলোচনার মাঝে পুরুষদের মুখে শোনা যায় এমন বিরক্তিকর কথা; তুমি নারী ব’লেই এমন কথা ভাবছো; কিন্তু আমি জানি আত্মরক্ষার জন্যে আমার একমাত্র উত্তর হচ্ছে : “এটা সত্য ব’লেই আমি একথা ভাবছি, এটা বলে আলোচনা থেকে আমি সরিয়ে নিই আমার মন্ময় সত্তাকে। এমন উত্তর দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না যে : “তুমি পুরুষ বলেই উল্টোটা ভাবছে, তার কারণ পুরুষ হওয়া কোনো অস্বাভাবিকতা নয়। পুরুষ পুরুষ ব’লেই ঠিক; নারী হওয়াই অঠিক। এটা অনেকটা এমন : প্রাচীনদের কাছে ধ্রুব উল্লম্ব ব’লে একটা ব্যাপার ছিলো, যার সাথে তুলনা করে তারা নির্দেশ করতো তির্যককে, ঠিক তেমনি রয়েছে এক ধ্রুব মনুষ্যশ্রেণী, পুরুষ; নারীর রয়েছে ডিম্বাশয়, জরায়ু; এ-অস্বাভাবিকতাগুলো তাকে বন্দী ক’রে রাখে তার মন্ময়তার মধ্যে, আবদ্ধ রাখে তাকে তার নিজের স্বভাবের সীমার মধ্যে। মাঝেমাঝেই বলা হয় যে নারী চিন্তা করে তার লালাগ্রন্থির সাহায্যে। পুরুষ চমৎকারভাবে ভুলে যায় যে তাঁর দেহসংস্থানেও রয়েছে লালাগ্রন্থি, যেমন অন্ডকোষ; এবং এগুলো থেকে নিঃসৃত হয় হরমোন। সে নিজের শরীরের কথা ভাবে পৃথিবীর সাথে এক প্রত্যক্ষ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক পাতিয়ে রেখে, এবং মনে করে যে এটা সে অনুধাবন করছে বস্তুগতভাবে, আর সে নারীর শরীরকে মনে করে একটি প্রতিবন্ধকতা, একটি কারাগায়। ‘নারী বিশেষ কিছু গুণাবলির অভাবেই নারী, বৰ্লেছে আরিস্ততল, “আমরা মনে করবো যে নারীপ্ৰকৃতি প্রাকৃতিকভাবেই ত্রুটিগ্ৰস্ত।” সেইন্ট টমাস ঘোষণা করেছেন নারী হচ্ছে ‘বিকৃত পুরুষ’, একটি ‘অ্যাকস্মিক সত্তা’। এটাই প্রতীকিত হয়েছে হয়েছে আদিপুস্তক’-এ, বোসোর মতে যেখানে হাওয়াকে সমৃষ্টি করা হয়েছে আদমের একটি সংখ্যাতিরিক্ত অস্থি’ থেকে।

এভাবে মানবজাতি হচ্ছে পুরুষ এবং পুরুষেরা নারীকে নারী হিশেবে সংজ্ঞায়িত করে না, করে পুরুষের সাথে তুলনা করে; নারীকে গণ্য করা হয় না কোনো স্বায়ত্তশাসিত সত্তা রূপে। মিশেলে লিখেছেন : নারী, আপেক্ষিক সত্তা…।” রাপোর দ্য’ইউরিয়েল-এ বেন্দা লিখেছেন : ‘নারীর শরীরের থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেও পুরুষের শরীর নিজেই অর্থ প্রকাশ করে, অন্যদিকে নারীর শরীর একলা নিজে তাৎপর্যহীন… পুরুষ নারীকে বাদ দিয়েও ভাবতে পারে নিজের কথা। নারী পুরুষ ছাড়া নিজের সম্পর্কে ভাবতে পারে না। নারী তা-ই, পুরুষ যা ঘোষণা করে; এজন্যেই তাকে বলা হয়। শুধু ‘লিঙ্গ’, যা দিয়ে বোঝানো হয় যে নারী পুরুষের কাছে শুধুই একটি লৈঙ্গিক প্রাণী; পুরুষের কাছে নারী লিঙ্গ, চরম লিঙ্গ, তার কম নয়। পুরুষের সাথে তুলনা ক’রে তাকে সংজ্ঞায়িত ও পৃথক করা হয়, নারীর সাথে তুলনা ক’রে পুরুষকে সংজ্ঞায়িত করা হয় না। নারী হচ্ছে আকস্মিক, অপ্রয়োজনীয়, যেখানে পুরুষ হচ্ছে প্রয়োজনীয়। পুরুষ হচ্ছে কর্তা, পুরুষ হচ্ছে পরম- নারী হচ্ছে অপর।

অপর ধারণাটি চেতনার মতোই একটি আদিম ধারণা। আদিমতম সমাজে, প্রাচীনতম পুরাণে পাওয়া যায় এক ধরনের দ্বৈততা- আত্ম ও অপরের দ্বৈততা। এ দ্বৈততা শুরুতে দু-লিঙ্গের বিভাজনের সাথে জড়িত ছিলো না; এটা নির্ভরশীল ছিলো না কোনো বাস্তব সত্যের ওপরও। গ্ৰানেতের চৈনিক চিন্তাধারা ও দিউমেজিলের পূর্ব ভারত ও রোম সম্পর্কিত রচনায় এটা দেখানো হয়েছে। শুভ ও অশুভ, সুলক্ষণ ও কুলক্ষণ, ডান ও বাম, বিধাতা ও লুসিফার প্রভৃতি বিপরীতাৰ্থক শব্দবন্ধে শুরুতে নারীউপাদান যতোটা ছিলো বরুণ-মিত্রা, ইউরেনাস-জিউস, সূৰ্য-চন্দ্র, এবং দিন-রাত্রি প্রভৃতি শব্দযুগলে নারী-উপাদান তার চেয়ে বেশি ছিলো না। মানুষের চিন্তাধারায় অপর একটি মৌল ধারণা।

কোনো গোত্রই কখনো নিজের বিপরীতে অপর ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত না করে নিজেকে এক বা আত্ম হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করে না। যদি তিনজন সহযাত্রী ট্রেনের এক কামরায় ওঠার সুযোগ পায়, এটাই কামরার অন্য যাত্রীদের বৈরী ‘অপর’-এ পরিণত করার জন্যে যথেষ্ট। সংকীর্ণদের চোখে নিজের গ্রামের অধিবাসী নয় এমন সব মানুষই ‘অপরিচিত’ ও সন্দেহজনক; এক দেশের মানুষের কাছে ভিন্ন দেশে বাস করে এমন সব মানুষই ‘বিদেশি’; ইহুদিবিরোধীদের কাছে ইহুদিরা ভিন্ন, মার্কিন বর্ণবাদীদের কাছে নিগ্রোরা নিকৃষ্ট, ঔপনিবেশিকদের কাছে ওই দেশের অধিবাসীরা ‘নেটিভ’, বিশেষাধিকারভোগীদের কাছে সর্বহারারা নিম্ন শ্রেণী।

বিভিন্ন ধরনের আদিম সমাজ সম্পর্কিত এক জ্ঞানগর্ভ রচনার শেষে লেভি-স্ট্রাউস পৌঁচেছেন নিম্নরূপ উপসংহারে : প্রকৃত অবস্থা থেকে সংস্কৃত অবস্থায় যাত্রা চিহ্নিত হয়ে থাকে মানুষের বিশেষ সামর্থ দিয়ে যা জৈবিক সম্পর্কগুলোকে একগুচ্ছ বৈপরীত্যের পরম্পরারূপে দেখতে পায়; দ্বৈততা, পর্যায়ক্রম, বৈপরীত্য, এবং প্রতিসাম্য, সুস্পষ্ট বা অস্পষ্টভাবএতো বেশি প্রপঞ্চ সৃষ্টি করে না, যাকে সমাজবাস্তবতার মৌল ও জরুরি উপাত্ত বলে ব্যাখ্যা করতে হবে। মানব সমাজ যদি হতো কোনো মিটজাইন বা সংহতি ও বন্ধুত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সাহচর্য, তাহলে এসব প্রপঞ্চ হতো অবোধগম্য। সব কিছু সহজ হয়ে ওঠে যদি আমরা হেগেলকে অনুসরণ করে দেখি যে চেতনার নিজের ভেতরেই রয়েছে অন্য সব চেতনার বিরুদ্ধে বিরোধিতা; বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় কর্তা–সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে অপরিহার্যরূপে, যার বিপক্ষে আছে অপর, অপ্রয়োজনীয়, কর্ম।

তবে অপর চেতনা, অপর অহং, জ্ঞাপন করে একটি পারস্পরিক দাবি। এক দেশের অধিবাসী পাশের দেশে গিয়েই আহত বোধ করে যে ওই দেশের অধিবাসীদের কাছে সে গণ্য হচ্ছে আগন্তুক’ বলে। আসলে বিভিন্ন গোত্র, জাতি, ও শ্ৰেণীর মধ্যে যুদ্ধ, উৎসব, ব্যবসা, চুক্তি ও প্রতিযোগিতার প্রবণতা হচ্ছে অপর-এর ধ্রুব তাৎপর্য থেকে তাকে বঞ্চিত করা, এবং তার আপেক্ষিকতাকে সুস্পষ্ট করে তোলা; ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় ব্যক্তি ও দলকে বাধ্য করা হয় তাদের সম্পর্কের পারস্পরিকতা স্বীকার করে নিতে। তাহলে এটা কী করে ঘটলো যে দু-লিঙ্গের পারস্পরিক স্বীকৃত হলো না, বৈপরীত্যসূচক একটি ধারণাই হয়ে উঠলো অপরিহার্য, এর সাথে সম্পর্কিত ধারণাটিকে অস্বীকার করা হলো, এবং অন্য ধারণাটিকে সংজ্ঞায়িত করা হলো বিশুদ্ধ অপর রূপে? এটা কেননা হলো যে নারী বিরোধিতা করে না পুরুষের সার্বভৌমত্বের? কোনো কর্তাই স্বেচ্ছায় হতে চায় না কম, অপ্রয়োজনীয়; অপর কখনো নিজেকে অপর রূপে সংজ্ঞায়িত করে এককে প্রতিষ্ঠিত করে না। একই অপরকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করে নিজেকে এক রূপে সংজ্ঞায়িত করার জন্যে। অপর যদি নিজের এক হওয়ার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তখন তাকে অনুগত হয়ে মেনে নিতে হয় বিরোধীর দৃষ্টিভঙ্গি। নারীর ক্ষেত্রে এ-আনুগত্য কেমন করে ঘটলো?

এমন আরো অনেক এলাকা রয়েছে, যেখানে বিশেষ কোনো একটি ধারণা অন্য ধারণার ওপর কিছু সময়ের জন্যে আধিপত্য করতে পেরেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা ঘটে সংখ্যার অসমতার জনে–সংখ্যাগরিষ্ঠরা তাদের শাসন চাপিয়ে দেয়। সংখ্যালঘুদের ওপর, বা চালায় অত্যাচার। কিন্তু নারীরা মার্কিন নিগ্রো বা ইহুদিদের মতো সংখ্যালঘু নয়; পৃথিবীতে যতো পুরুষ আছে নারীও আছে ততোই। আবার, দুটি গোত্র শুরুতে ছিলো স্বাধীন; তারা হয়তো জানতোও না একে অপরের কথা, বা হয়তো তারা স্বীকার করে নিতে পরস্পরের স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার ফলে শক্তিমানরা পরাভূত করে দুর্বলদের। ইহুদিদের ছড়িয়ে পড়া, আমেরিকায় দাসত্বপ্রথা প্রবর্তন, সাম্রাজ্যবাদের দিগ্বিজয় এর উদাহরণ। এসব ক্ষেত্রে নির্যাতিতরা অন্তত তাদের স্মৃতিতে বহন করেছে আগের দিনের কথা; সম্মিলিতভাবে তারা ধারণ করেছে এক অতীত, এক ঐতিহ্য, কখনো এক ধর্ম বা এক সংস্কৃতি।

বেবেল নারী ও সর্বহারার মধ্যে যে-সাদৃশ্য দেখিয়েছেন, তা এখানে ঠিক যে এরা কখনোই কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠি বা মানবমণ্ডলির মধ্যে একটি স্বতন্ত্র যৌথ একক গঠন করে নি। সর্বহারারা চিরকাল ছিল না, তবে নারী সব সময়ই ছিলো। নারীরা তাদের দেহসংস্থান ও শারীরবৃত্ত অনুসারেই নারী। ইতিহাস ভরেই নারীরা ছিলো পুরুষের অধীন, তাই তাদের অধীনতা কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার ফল নয় বা তা কোনো সামাজিক বদল নয়–এটা এমন কোনো ব্যাপার নয় যা সংঘটিত হয়েছে। বিশেষ সময়ে কোনো অবস্থা ঘটানো হলে অন্য কোনো সময়ে তা বিলুপ্ত করা সম্ভব, যা প্রমাণ করেছে হাইতির নিগ্রোরা ও অন্যরা; তবে এটা মনে হতে পারে যে কোনো প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব। সত্য হচ্ছে কোনো কিছুর প্রকৃতিই চিরন্তন নয়। যদি অপ্রয়োজনীয় মনে হয় নারীকে, যে কখনো প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে না, এটা এজন্যে যে নারী নিজেই পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ। সর্বহারারা বলে আমরা’; নিগ্রোরাও বলে। নিজেদের কর্তা বিবেচনা করে তারা বুর্জোয়াদের, শাদাদের রূপান্তরিত করে অপর’-এ। কিন্তু নারীবাদীদের কিছু সম্মেলন বা এ-ধরনের কিছু বিক্ষোভে ছাড়া। নারীরা বলে না আমরা; পুরুষেরা বলে নারীরা’, আর নারীরাও নিজেদের নির্দেশ করার জন্যে ব্যবহার করে এ-একই শব্দ। তারা কখনো অকৃত্রিমভাবে কর্তার মনোভাব গ্রহণ করে না। সর্বহারারা রাশিয়ায় বিপ্লব ঘটিয়েছে, হাইতিতে ঘটিয়েছে নিগ্রোরা, ইন্দো-চীনে এর জন্যে সংগ্রাম করছে ইন্দো-চীনারা; কিন্তু নারীরা কখনো প্রতীকী বিক্ষোভের বেশি কিছু করে নি। তারা তা-ই লাভ করেছে, যা পুরুষ তাদের দিতে চেয়েছে; তারা কিছুই নেয় নি, তারা শুধু পেয়েছে।

এর কারণ হচ্ছে নারীদের এমন কোনো বাস্তব সম্বল নেই, যার সাহায্যে তারা নিজেদের সংগঠিত করতে পারে একটি এককে, যা পারে তাদের সাথে সম্পর্কিত এককটির মুখোমুখি দাঁড়াতে। তাদের নিজেদের কোনো অতীত নেই, ইতিহাস নেই, ধর্ম নেই; এবং সর্বহারাদের মতো তাদের নেই কোনো কর্ম ও স্বার্থের সংহতি। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করে পুরুষদের মধ্যে; বাসগৃহ, গৃহস্থালি, আর্থিক অবস্থা, ও সামাজিক মর্যাদার সূত্রে তারা দৃঢ়ভাবে জড়িত থাকে কোনো পুরুষের সঙ্গে পিতা বা স্বামীর সঙ্গে–যা তারা থাকে না কোনো নারীর সঙ্গে। যদি তারা বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত হয়, তাহলে তারা ওই শ্রেণীর পুরুষের সাথে সংহতি বোধ করে, সর্বহারা নারীর সাথে করে না; যদি তারা শাদা হয়, তাহলে তারা শাদা শ্রেণীর পুরুষের সাথে সংহতি বোধ করে, নিগ্রো নারীর সাথে করে না। সর্বহারারা শাসকশ্রেণীকে হত্যা করার প্রস্তাব করতে পারে; এবং উগ্র কোনো ইহুদি বা নিগ্রো স্বপ্ন দেখতে পারে যে তার হাতে এসেছে আণবিক বোমা, এবং মানবমণ্ডলিকে সে ক’রে তুলেছে ইহুদি বা নিগ্রো; কিন্তু নারী পুরুষনিধনযজ্ঞের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। যে-বন্ধন তাকে বেঁধে রাখে। তার পীড়নকারীর সাথে, অন্য কিছুর সাথে তার তুলনা হয় না। লিঙ্গ বিভাজন একটি জৈবিক সত্য, এটা মানব ইতিহাসের কোনো ঘটনা নয়। নারী ও পুরুষ এক আদিম মিটজাইন-এ (সাহচর্য, সহবসবাস) পরস্পরের বিপরীতে বিন্যস্ত; নারী এটাকে ভাঙে নি। যুগল হচ্ছে এক মৌল ঐক্য, যার দু-অর্ধেককে একত্রে গেঁথে দেয়া হয়েছে, এবং লিঙ্গের রেখা ধরে সমাজে ফাটল ধরানো অসম্ভব। এখানেই পাওয়া যাবে নারীর মৌল বৈশিষ্ট্য : নারী অপর এমন এক সমগ্রতায়, যার দুটি উপাদান পরস্পরের কাছে প্রয়োজনীয়।

মনে করতে পারি যে এ-পারস্পারিকতা নারীর মুক্তিকে সহজতর করতে পারতো। হারকিউলিস যখন ওমফালের পায়ের কাছে বসে তাকে সাহায্য করেছিলো সুতো কাটায়, তখন তাকে বন্দী করে রেখেছিলো ওমফালের জন্যে তার কামনা; কিন্তু ওমফালে কোনো অর্জন করতে পারে নি স্থায়ী ক্ষমতা? জেসনের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে মিডিয়া হত্যা করেছিলো তাদের সন্তানদের; এ-নির্মম উপকথাটি নির্দেশ করে যে সন্তানদের প্রতি জেসনের ভালোবাসার মধ্য দিয়ে মিডিয়া জেসনের ওপর বিস্তার করেছিলো এক ভয়াবহ প্রভাব। লাইসিসট্রাটায় আরিস্তোফানেস প্রমোদের সাথে এঁকেছেন একদল নারীর চিত্র, যারা পুরুষদের কাম পরিতৃপ্তির মধ্য দিয়ে লাভ করতে চায় সামাজিক সুবিধা; তবে এটা নাটমাত্র। সেদিন নারীদের উপকথায় দেখা যায় ধর্ষণকারীদের শাস্তি দেয়ার জন্যে তারা বন্ধ্যা থাকার যে-পরিকল্পনা করেছিলো, তারা তা ত্যাগ করে অনতিবিলম্বে। যৌন কামনা ও সন্তান লাভের বাসনার পরিতৃপ্তির জন্যে পুরুষ নির্ভরশীল হয় নারীর ওপর, কিন্তু সত্য হচ্ছে যে পুরুষের প্রয়োজন মিটিয়ে নারী কখনো সামাজিক মুক্তি লাভ করে নি।

প্রভু ও দাস সম্পর্কিত হয় পারস্পরিক প্রয়োজনে; এ-ক্ষেত্রে প্রয়োজনটা। আর্থনীতিক, এবং এটা দাসকে মুক্ত করে না। প্রভুর সঙ্গে দাসের যে-সম্পর্ক, তাতে প্রভু গুরুত্বই দেয় না যে দাস তার প্রয়োজন, কেননা নিজের কাজ দিয়েই নিজের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা তার আছে; অন্য দিকে দাস থাকে অধীন অবস্থায়, আশায় ও ভয়ে, এবং সব সময়ই সচেতন থাকে যে তার প্রভু প্রয়োজন। যদিও প্রয়োজনটা দুজনেরই, তবু এটা সব সময় কাজ করে উৎপীড়কের পক্ষে ও উৎপীড়িতের বিপক্ষে। এজন্যেই শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তিতে বিলম্ব ঘটেছে।

পুরুষের দাসী না হলেও নারী সব সময়ই আশ্রিত থেকেছে পুরুষের; এ-দুটি লিঙ্গ কখনো পৃথিবীকে সমভাবে ভোগ করে নি। নারী আজো ভীষণভাবে প্রতিবন্ধকতাগ্রস্ত, যদিও বদলাতে শুরু করেছে তার পরিস্থিতি। কোনোখানেই তার আইনগত মর্যাদা পুরুষের সমান নয়, এবং অধিকাংশ সময়ই এটা তার জন্যে অসুবিধাজনক। যদিও কখনো তার অধিকার আইনগতভাবে স্বীকার করে নেয়াও হয়, তবু দীর্ঘকালের প্রথার ফলে তার বাস্তবায়ন ঘটে না। আর্থনীতিক ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ দুটি জাতের মতো; অন্য সব কিছু সমান থাকলেও পুরুষ পায় ভালো চাকুরি, বেশি বেতন, এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে তাদের সাফল্যের সুযোগও বেশি। শিল্পকারখানা ও রাজনীতিতে পুরুষ পায় অনেক বেশি পদ, তারাই দখল করে নেয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো। এ ছাড়াও তারা উপভোগ করে প্রথাগত মর্যাদা, কেননা বর্তমান পবিত্রভাবে রক্ষা করে অতীতকে–এবং অতীতে পুরুষেরাই সৃষ্টি করেছে সব ইতিহাস। এখন নারীরা পৃথিবীর কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে শুরু করেছে, তবে পৃথিবী এখনো পুরুষের অধিকারে–এ-সম্পর্কে পুরুষ সন্দেহহীন এবং নারীদেরও সন্দেহ সামান্য। অপর হওয়া প্রত্যাখ্যান করা, এ-লেনদেনে অংশীদার হতে অস্বীকার করা–নারীর জন্যে এটা হবে উচ্চবর্ণের সাথে মৈত্রী তাদের যে-সব সুবিধা দিয়েছে, সে-সব পরিত্যাগ করা। সার্বভৌম পুরুষ অধীন নারীকে দেয় আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রতিপাদন করে তার অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা। এটা সত্য যে প্রতিটি ব্যক্তি যেমন প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তার ব্যক্তিগত অস্তিত্ব, তেমনি নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে বস্তু হয়ে ওঠার প্রলোভনও কাজ করে তার মধ্যে। এটা এক অশুভ পথ, কেননা এ পথ যে ধরে–অক্রিয়, বিলুপ্ত, ধ্বংসপ্রাপ্ত সে–সে এর পর হয়ে ওঠে অন্যের ইচ্ছের প্রাণী। তবে এটা সহজ পথ; এ-পথ ধরলে খাঁটি অস্তিত্ব লাভের যন্ত্রণাগুলো থাকে না। নিজের সুস্পষ্ট শক্তির অভাবেই নারী কর্তার ভূমিকা লাভের দাবি জানাতে ব্যর্থ হয়, কেননা পুরুষের সাথে বন্ধনটাকেই সে চায়, পারস্পরিকতা চায় না, এবং অপর হিশেবে নিজের ভূমিকা নিয়ে সে অধিকাংশ সময়ই থাকে তুষ্ট।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে : এসব শুরু হয়েছিলো কীভাবে? সহজেই চোখে পড়ে যে লিঙ্গের দ্বৈততা, যে-কোনো দ্বৈততার মতোই, সৃষ্টি করে বিরোধ। এবং এতে যে জয়ী হয়, সে-ই ধারণ করে চরম মর্যাদা। কিন্তু পুরুষ কেননা প্রথম থেকেই জয়ী? এটা সম্ভবপর মনে হয় যে নারী হয়তো জয়ী হতে পারতো; বা ওই বিরোধের পরিণতি হতে পারতো ফলাফলহীন। এটা কীভাবে হলো যে পৃথিবী সব সময়ই থেকেছে পুরুষের অধিকারে এবং পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে এই সম্প্রতি? এ-পরিবর্তন কি ভালো জিনিশ? এর ফলে কি পুরুষ ও নারী পৃথিবীকে পাবে সমানভাবে?

প্রশ্নগুলো নতুন নয়, এবং এগুলোর উত্তর মাঝেমাঝেই দেয়া হয়েছে। কিন্তু নারী যেহেতু অপর, তাই পুরুষেরা যে-সব উত্তর দিয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই যায়। এসব উত্তর দেয়া হয়েছে সুস্পষ্টভাবে পুরুষের স্বার্থ থেকে। সতেরো শতকের একজন স্বল্পপরিচিত নারীবাদী, পলাঁ দ্য লা বার, এটা প্রকাশ করেছেন এভাবে : ‘পুরুষেরা নারী সম্পর্কে যা কিছু লিখেছে, তার সবই সন্দেহজনক, কেননা পুরুষ একই সঙ্গে বিচারক ও বিবাদী।’ সবখানে, সব সময়, পুরুষেরা এটা বোধ ক’রে সন্তোষ প্রদর্শন করেছে যে তারাই সৃষ্টির প্রভু। সমস্ত প্রশংসা বিধাতার… যিনি আমাকে নারী করে সৃষ্টি করেন নি,’ ইহুদিরা প্রাতকালীন প্রার্থনায় একথা বলে, যখন তাদের স্ত্রীরা প্রতিবাদহীন স্বরে বলে : সমস্ত প্রশংসা বিধাতার, যিনি আমাকে তাঁর অভিলাষ অনুসারে সৃষ্টি করেছেন। যে-সব আশীর্বাদ লাভের জন্যে প্লাতো দেবতাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে যে তাকে মুক্ত মানুষ হিশেবে সৃষ্টি করা হয়েছে, দাস হিশেবে নয়; আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে তাকে পুরুষরূপে সৃষ্টি করা। হয়েছে, নারীরূপে নয়। তবে পুরুষের পক্ষে এ-সুবিধা পরিপূর্ণরূপে উপভোগ করা সম্ভব হতো না যদি না তারা বিশ্বাস করত যে এটা প্রতিষ্ঠিত পরম ও শাশ্বত ভিত্তির ওপর; তারা চেষ্টা করেছে তাদের প্রাধান্যকে অধিকাররূপে প্রতিষ্ঠিত করার। যারা আইন প্রণয়ন ও সংকলন করেছেন, তাঁরা পুরুষ ছিলেন, তাই তারা সুবিধা দিয়েছেন নিজেদের লিঙ্গকে, এবং বিচারকেরা এ-আইনগুলোকে উন্নীত করেছেন নীতির স্তরে, এটা পলাঁ দ্য লা বার থেকে আরেকটি উদ্ধৃতি।

বিধানকর্তারা, পুরোহিতেরা, দার্শনিকেরা, লেখকের এবং বিজ্ঞানীরা দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে নারীর অধীন অবস্থান স্থির হয়েছে স্বর্গে এবং মর্ত্যে এটা সুবিধাজনক। পুরুষের উদ্ভাবিত ধর্মগুলোতে প্রতিফলিত হয় আধিপত্যের এ বাসনা। হাওয়া ও প্যান্ডোরার উপকথায় পুরুষ নারীর বিরুদ্ধে নেমেছে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। তারা ব্যবহার করেছে দর্শন ও ধর্মতত্ত্বকে, যা দেখা যায় আরিস্ততল ও সেইন্ট টমাস থেকে উদ্ধৃতিতে। প্রাচীন কাল থেকেই ব্যঙ্গাকারেরা ও নীতিবাগীশেরা প্রচুর আনন্দ উপভোগ করে এসেছে নারীর দুর্বলতা দেখিয়ে দেখিয়ে। ফরাশি সাহিত্য ভরে নারীর বিরুদ্ধে যে-বর্বর অভিযোগ করা হয়েছে, তার সাথে আমরা পরিচিত। এ-বৈরিতা কখনো কখনো হয়তো সত্য, এবং অধিকাংশ সময়ই ভিত্তিহীন; তবে এগুলো কমবেশি সফলভাবে গোপন করে রাখার চেষ্টা করে নিজেকে ঠিক বলে প্রতিপন্ন করার বাসনা। যেমন মঁতেইন বলেছেন, অপর লিঙ্গটিকে ক্ষমা করার থেকে একটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ভোলা সহজ। অনেক সময় কী ঘটছে, তা বেশ স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, রোমান আইন নারীর অধিকার খর্ব করতে গিয়ে বলেছে নারীর মূঢ়তা, স্থিতিহীনতার কথা; এ-সময় দুর্বল হয়ে পড়ছিলো পারিবারিক বন্ধন, আর এতে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো পুরুষ উত্তরাধিকারীদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ার। নারীকে অভিভাবকের অধীনে রাখার জন্যে ষোড়শ শতকে আবেদন করা হয়েছিলো সেইন্ট অগাস্টিনের কর্তৃত্বের প্রতি, যিনি ঘোষণা করেছিলেন নারী এমন জীব, যে সিদ্ধান্তগ্রহণসক্ষম নয় স্থিরও নয়; এটা ঘটেছিলো এমন সময়ে যখন মনে করা হয়েছিলো যে একলা নারী নিজের সম্পত্তি দেখাশোনা করতে সমর্থ। নারীর নির্ধারিত ভাগ্য কতোটা খামখেয়ালিপূর্ণ ও অন্যায্য, তা স্পষ্ট বুঝেছিলেন মতেইন : নারী যখন তার জন্যে প্রণীত বিধিবিধান মানতে অস্বীকার করে, তখন সে একটুও ভুল করে না, কেননা নারীর সাথে আলোচনা করেই পুরুষেরাই প্রণয়ন করে এসব বিধিবিধান। ষড়যন্ত্র আর কলহের যে এতো ছড়াছড়ি, এটা কোনো বিস্ময় নয়। কিন্তু তিনি নারীর পক্ষে যোদ্ধা হয়ে ওঠেন নি।

বেশ পরে, আঠারে শতকে, সত্যিকারভাবে গণতান্ত্রিক পুরুষেরা ব্যাপারটিকে বস্তুগতভাবে দেখতে শুরু করেন। আরো অনেকের মতো দিদেরো দেখাতে চেয়েছেন যে পুরুষের মতো নারীও মানুষ। পরে জন স্টুয়ার্ট মিল ঐকান্তিকভাবে দাঁড়িয়েছেন নারীর পক্ষে। এ-দার্শনিকেরা দেখিয়েছেন অসাধারণ নিরপেক্ষতা। উনিশ শতকে। নারীবাদী কলহ আবার হয়ে ওঠে দলভুক্তদের কলহ। শিল্পবিপ্লবের একটি পরিণতি ছিলো যে নারী প্রবেশ করে উৎপাদনমূলক শ্রমে, এবং এখানেই নারীবাদীদের দাবি তাত্ত্বিক এলাকা পেরিয়ে লাভ করে আর্থনীতিক ভিত্তি, আর তাদের বিরোধীরা হয়ে ওঠে আরো বেশি আক্রমণাত্মক। যদিও তখন ভূম্যধিকার বেশ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, তবু বুর্জোয়ারা আঁকড়ে থাকে পুরোনো নৈতিকতা, যা পারিবারিক সংহতির মধ্যেই দেখতে পায় ব্যক্তিমালিকানার নিশ্চয়তা। নারীর মুক্তি এক সত্যিকার হুমকি হয়ে দেখা দেয় বলে নারীকে আবার আদেশ দেয়া হয় ঘরে ফেরার। এমনকি শ্রমজীবীদের মধ্যেও পুরুষেরা নারীর মুক্তি ঠেকাতে চেষ্টা করে, কেননা তারা নারীকে দেখতে শুরু করে বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে–বিশেষ করে এজন্যে যে নারীরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলো কম মজুরিতে কাজ করতে।

এরপর নারীর নিকৃষ্টতা প্রমাণের জন্যে নারীবাদবিরোধীরা আগের মতো শুধু ধর্ম, দর্শন, ও ধর্মতত্ত্বের নয়, তারা সাহায্য নিতে শুরু করে বিজ্ঞানের–জীববিদ্যা, নিরীক্ষামূলক মনোবিজ্ঞান প্রভৃতির। নারীকে তারা সর্বোচ্চ যা দিতে সম্মত হয়, তা হচ্ছে ‘ভিন্নতার মধ্যে সাম্য’। ওই লাভজনক সূত্রটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ; এটা উত্তর। আমেরিকার নিগ্রোদের জন্যে প্রণীত জিম ক্রো আইনের ‘সমান, তবে পৃথক’ সূত্রের মতোই। সবাই জানে এ-তথাকথিত সাম্যপরায়ণ বিচ্ছিন্নকরণের ফল হচ্ছে চরমতম বৈষম্য। যে-সাদৃশ্য এখানে দেখানো হলো, এটা কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়, কেননা যখনই কোনো জাতি, বর্ণ, শ্রেণী বা লিঙ্গকে নিকৃষ্ট অবস্থানে ঠেলে দেয়া হয়, তখন তার যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করা হয় একই পদ্ধতিতে। ‘চিরন্তনী নারী’ কথাটি ‘কৃষ্ণ আত্মা’ এবং ‘ইহুদি চরিত্র’ ধারণারই সমতুল্য। এটা সত্য যে ইহুদিদের সমস্যাটি অন্য দুটি থেকে ভিন্ন–ইহুদিবিরোধীদের কাছে ইহুদিরা নিকৃষ্ট নয়, তারা শত্রু, যাদের পৃথিবীতে টিকে থাকতে দেয়া যাবে না, নিশ্চিহ্নীকরণই তাদের জন্যে। নির্ধারিত নিয়তি। কিন্তু নারী ও নিগ্রোর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে গভীর সাদৃশ্য। এরা উভয়ই আজকাল মুক্তি পাচ্ছে একই ধরনের অভিভাবকত্ব থেকে এবং আগের প্রভুশ্রেণীটি চাচ্ছে তাদের নিজের জায়গায় রাখতে’–অর্থাৎ তাদের জন্যে নির্ধারিত স্থানটিতে রাখতে। উভয় ক্ষেত্রেই আগের প্রভুরা মুখর হয়ে ওঠে কমবেশি আন্তরিক স্তুতিতে, তারা প্রশংসায় মুখর হয় ভালো নিগ্রোর গুণাবলির, তার সুপ্ত, শিশুসুলভ, প্রফুল্ল আত্মার, অর্থাৎ অনুগত নিগ্রোর; অথবা সে-নারীর গুণাবলির, যার রয়েছে প্রকৃত নারীত্ব’, অর্থাৎ লঘু, বালখিল্য, দায়িত্বহীন–অনুগত নারীর। উভয় ক্ষেত্রেই আধিপত্যশীল শ্ৰেণীটি নিজের যুক্তিকে দাঁড় করায় এমন সব ব্যাপারের ওপর, যেগুলো সৃষ্টি করেছে তারা নিজেরাই। জর্জ বার্নার্ড শ এর সারকথা বলেছেন এভাবে, মার্কিন শাদারা কালোদের ঠেলে নামিয়ে দেয় জুতোপালিশকারী বালকদের স্তরে, এবং এ থেকে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে কালোরা জুতো পালিশ করা ছাড়া আর কিছুর উপযুক্ত নয়।’ এ-দুষ্টচক্রের দেখা পাওয়া যায় সদৃশ সমস্ত পরিস্থিতিতে; যখন কোনো ব্যক্তিকে (বা একদল ব্যক্তিকে) রাখা হয় নিকৃষ্ট পরিস্থিতিতে, তখন তাকে নিকৃষ্টই মনে হয়।

কিন্তু হওয়া ক্রিয়াটির তাৎপর্য ঠিকমতো বোঝা দরকার; প্রতারণার উদ্দেশ্যেই একে দেয়া হয় অনড় মূল্য, যদিও এটি নির্দেশ করে এক জিনিশ থেকে আরেক জিনিশ হওয়ার গতিশীল হেগেলীয় অর্থ। হ্যা, সব কিছু মিলিয়ে নারী আজ পুরুষের থেকে নিকৃষ্ট; এর অর্থ হচ্ছে এ ছাড়া নারীর অন্য কিছু হওয়ার উপায় ছিলো না। প্রশ্ন হচ্ছে : এ-অবস্থা কি চলতে থাকবে?

অনেক পুরুষই আশা করে যে এটা চলবে; সবাই যুদ্ধে ক্ষান্ত হয় নি। রক্ষণশীল বুর্জোয়ারা নারীর মুক্তির মধ্যে আজো দেখতে পায় তাদের নৈতিকতা ও স্বার্থের প্রতি হুমকি। কিছু পুরুষ ভয় পায় নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে। সম্প্রতি এক ছাত্র হেবদোলাতিন-এ লিখেছে : প্রতিটি ছাত্রী, যে চিকিৎসাবিদ্যা বা আইন পড়ে, হরণ করে আমাদের একটি করে চাকুরি।’ পৃথিবীতে নিজের অধিকার সম্পর্কে তার মনে কখনো কোনো প্রশ্ন জাগে নি। আর আর্থিক স্বার্থই সব নয়। উৎপীড়ন উৎপীড়নকারীদের যেসব সুফল দেয়, তার একটি হচ্ছে তাদের মধ্যে অধমটিও নিজেকে গণ্য করে শ্রেষ্ঠতর বলে; এভাবে দক্ষিণের একটি ‘গরিব শাদা’ও নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারে একথা ভেবে যে সে ‘নোংরা কালা আদমি’ নয়–আর ধনশালী শাদারা এ-গর্বটিকে সুচতুরভাবে লাগায় নানা কাজে।

একইভাবে, পুরুষের মধ্যে চরম অধমটিও নারীদের তুলনায় নিজেকে মনে করে একটি নরদেবতা। এম দ্য মঁতেরলঁর পক্ষে নারীদের সামনে নিজেকে নায়ক মনে করা ছিলো খুবই সহজ, পুরুষদের মধ্যে পুরুষ হিসাবে অভিনয় করে সে তা মনে করতে পারে নি, যদিও বহু নারী ওই কাজ করেছে তার থেকে অনেক বেশি ভালোভাবে। ১৯৪৮-এর সেপ্টেম্বরে ফিগারো লিতেরের-এর একটি রচনায় ক্লদ মারিয়াক, যাঁর মহৎ মৌলিকত্বের সবাই অনুরাগীনালী সম্বন্ধে লিখতে পেরেছিলেন : ‘আমরা শুনতে থাকি বিস্র উদাসীনতার স্বউদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবীর মধ্যে, এটা ভালোভাবে জেনেই যে তার বোধশক্তি কমবেশি উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত করে এমন চিন্তাভাবনা, যা আসে আমাদের থেকেই।’ এটা সুস্পষ্ট যে-বক্তাটির কথা বলা হয়েছে, তিনি মারিয়াকের নিজের চিন্তাভাবনা প্রতিফলিত করেন না, কেননা তার যে নিজস্ব চিন্তাভাবনা আছে এটা কারো জানা নেই। এমন হতে পারে যে ওই নারীটি পুরুষের মধ্যে উৎসারিত চিন্তাভাবনাই প্রতিফলিত করেন, তবে পুরুষের মধ্যেও এমন অনেক আছে যারা অন্যদের চিন্তাভাবনা আত্মসাৎ করেছে; প্রশ্ন করতে পারি যে ক্লদ। মারিয়াকের পক্ষে কি পাওয়া সম্ভব ছিলো না এরচেয়ে আকর্ষণীয় কথোপকথন, যা তাঁকে প্রতিফলিত না করে প্রতিফলিত করে দেকার্ত, মার্ক্স, বা জিদকে। যা সত্যিই অসামান্য এখানে, তা হচ্ছে যে আমরা ব্যবহার করে তিনি নিজেকে করে তুলেছেন সেইন্ট পল, হেগেল, লেনিন, ও নিটশের সমতুল্য, এবং তাদের মহিমার উচ্চতা থেকে অবজ্ঞার সাথে তিনি তাকান সে-নারীর ঝাকের দিকে, যারা একই সমতলে দাঁড়িয়ে তার সাথে কথোপকথনের সাহস করেন। আমি একাধিক নারীকে জানি, যারা অস্বীকার করতেন মারিয়াকের ‘বিনম্র উদাসীনতার স্বর’-এর পীড়ন সহ্য করতে।

এ-উদাহরণটি নিয়ে আমি একটু বেশি সময় কাটিয়েছি, কেননা পুরুষালি প্রবণতা এটিতে দেখানো হয়েছে প্রতিপক্ষকে শক্তিহীন করে তোলার মতো অকপটভাবে। কিন্তু পুরুষ আরো অনেক সূক্ষ্ম উপায়ে লাভবান হয় নারীর অপরত্ব থেকে। যারা ভুগছে হীনম্মন্যতা গূঢ়ৈষায়, এখানে তাদের জন্যে রয়েছে এক অলৌকিক মলম, আর একথা সত্য যারা নিজেদের পৌরুষ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের থেকে আর কেউ নারীর প্রতি বেশি আক্রমণাত্মক, বা বিদ্বেষপরায়ণ নয়। আজকাল অধিকাংশ পুরুষ আর নারীকে নিকৃষ্ট বলে গণ্য করে না; তাদের মধ্যে এখন গণতন্ত্রের আদর্শ কাজ করে, তাই সব মানুষকে সমান মনে না করে কোনো উপায় নেই।

পরিবারের মধ্যে থেকে শিশু ও যুবকের চোখে নারী ও প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের একই সামাজিক মর্যাদা আছে বলে মনে হয়। পরে কামনা ও প্রেমময় ওই যুবক উপলব্ধি করে তার কাম্য ও প্রেমাস্পদ নারীটির প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা; বিয়ের মধ্যে নারীকে সে শ্রদ্ধা করে স্ত্রী ও মা হিশেবে, এবং দাম্পত্য জীবনের বাস্তব ঘটনাবলিতে নারীটি পুরুষটির কাছে দেখা দেয় এক স্বাধীন মানুষরূপে। তাই পুরুষটি মনে করতে পারে লিঙ্গ দুটির মধ্যে আর কোনো অধীনতা নেই এবং সব মিলিয়ে পার্থক্য সত্ত্বেও নারী তার সমান। তবে সে গুটিকয় নিকৃষ্টতা লক্ষ্য করে–তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি হচ্ছে কোনো পেশার জন্যে নারীর অযোগ্যতা; সে মনে করে এর মূলে রয়েছে প্রাকৃতিক কারণ। যখন সে নারীর সঙ্গে থাকে সহযোগিতামূলক ও সদাশয় সম্পর্কে, তখন তার বিষয়বস্তু হচ্ছে বিমূর্ত সাম্যের নীতি এবং যে-সব অসাম্য রয়েছে, সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে সে তার মনোভঙ্গি গঠন করে না। কিন্তু যখন সে বিরোধে লিপ্ত হয় নারীর সাথে, তখন পরিস্থিতি উল্টে যায় : তখন তার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে বিরাজমান অসাম্য, এবং এমনকি এর মধ্যেই সে পায় বিমূর্ত সাম্যকে অস্বীকার করার যৌক্তিকতা।

অনেক পুরুষ যেনো সরল বিশ্বাসে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে থাকে যে নারী পুরুষের সমান এবং তাদের শোরগোল করার কিছু নেই, এবং একই সময়ে তারা বলে নারীরা কখনোই পুরুষের সমান হয়ে উঠতে পারবে না; তাদের দাবি নিষ্ফল। পুরুষের পক্ষে সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণের গুরুত্ব বোঝা বেশ কঠিন, কেননা এটাকে নগণ্য মনে হয় বাহ্যিকভাবে, কিন্তু এটা নারীর মধ্যে সৃষ্টি করে এমন গভীর নৈতিক ও মননগত প্রভাব যে মনে হয় ওগুলো উদ্ভূত হয়েছে তার মৌল স্বভাব থেকে। সবচেয়ে সহানুভূতিশীল পুরুষেরাও নারীর বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি বুঝতে পারে না। আর যে-পুরুষেরা নিজেদের সুবিধাগুলো রক্ষা করার জন্যে ব্যর্থ, তাদের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই; তারা ওগুলোর পরিমাণ নিজেরাও পরিমাপ করতে পারে না। নারীর ওপর যতো আক্রমণ চালানো হয়, সেগুলোর সংখ্যা ও ভয়াবহতা দেখে ভয় পেলে চলবে না, আর ‘খাঁটি নারী’র বন্দনার ফাঁদে পড়লেও আমাদের চলবে না।

নারীবাদীদের যুক্তিগুলোও কম সন্দেহের চোখে বিচার করলে চলবে না, কেননা অনেক সময়ই তাদের বিতর্কিত লক্ষ্য তাঁদের বঞ্চিত করে প্রকৃত মূল্য থেকে। নারী সমস্যাটিকে যদি তুচ্ছ বলে মনে হয়, তার কারণ হচ্ছে পুরুষালি উগ্রতা একে পরিণত করেছে একটি ঝগড়ায়; এবং ঝগড়ারত মানুষ কখনো ঠিকমতো যুক্তি প্রয়োগ করে না। অনেকে বলে আদমের পর সৃষ্টি হয়েই নারী পরিণত হয়েছে একটি গৌণ সত্তায়; অন্যরা বলে এর উল্টো যে আদম ছিলো একটি অসমাপ্ত খসড়া এবং বিধাতা যখন হাওয়াকে সৃষ্টি করেন তখনই তিনি সফল হন বিশুদ্ধভাবে মানুষ সৃষ্টিতে। নারীর মস্তিষ্ক ক্ষুদ্রতর; হ্যাঁ, কিন্তু সেটি তুলনামূলকভাবে বৃহৎ। খ্রিস্টকে পুরুষরূপে। সৃষ্টি করা হয়েছিলো; হ্যাঁ, তা হয়তো তার মহত্তর বিনয়ের জন্যে। প্রতিটি যুক্তিই সাথেসাথে নির্দেশ করে তার বিপরীতকে, এবং দুটিই অধিকাংশ সময় বিভ্রান্তিকর। ব্যাপারটি বুঝতে চাইলে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে এসব বাধাপথ থেকে; বাদ দিতে হবে উৎকৃষ্ট, নিকৃষ্ট, সাম্য প্রভৃতি অস্পষ্ট ধারণা, যেগুলো দূষিত করেছে এবিষয়ের প্রতিটি আলোচনাকে। আমাদের শুরু করতে হবে নতুনভাবে।

বেশ, কিন্তু কীভাবে আমরা উপস্থাপন করবো প্রশ্নটি? আর আমরা এটি উপস্থাপনের কে? পুরুষ একই সাথে বিচারক ও বিবাদী; আর নারীও তাই। আমাদের দরকার একটি দেবদূত–পুরুষও নয় নারীও নয়। কিন্তু কোথায় পাবো দেবদূত? তারপর, এ-বিষয়ে দেবদূতের কথা বলার যোগ্যতা খুবই কম কেননা দেবদূত এসমস্যার মৌলিক সত্যগুলো সম্বন্ধে অজ্ঞ। উভলিঙ্গকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না, কেননা এ-ক্ষেত্রে পরিস্থিতি হবে খুবই উৎকট; উভলিঙ্গ কোনো সম্পূর্ণ পুরুষ ও সম্পূর্ণ নারীর মিলিত রূপ নয়, বরং সে গঠিত প্রত্যেকের অংশবিশেষে; তাই সে নারীও নয় পুরুষও নয়। আমার মনে হয় কিছু নারী আছেন, যাঁরা নারীর পরিস্থিতি ব্যাখ্যার জন্যে সবচেয়ে যোগ্য। আমরা যেনো এ-কূটতর্ক দিয়ে বিভ্রান্ত না হই যে এপিমেনিদেস যেহেতু ছিলেন ক্রিটের অধিবাসী, তাই অবশ্যই ছিলেন মিথ্যেবাদী; কোনো রহস্যময় কারণ পুরুষ ও নারীকে সরল বিশ্বাসে বা প্রতারণার উদ্দেশ্যে কাজ করতে বাধ্য করে না, তাদের পরিস্থিতি তাদের সত্যসন্ধানে উদ্যোগী করে। আজকালকার নারীদের অনেকেই নিরপেক্ষ হতে সমর্থ। আমরা আমাদের আদর্শান্ধ অগ্রজাদের মতো নই; খেলায় আমরা অনেকটা জিতেই গেছি। নারীর মর্যাদা সম্পর্কে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক বিতর্কগুলোতে অবিচলভাবে মেনে নেয়া হয়েছে যে লিঙ্গের সাম্য এখন হয়ে উঠছে এক বাস্তবতা, এবং আমরা অনেকেই আমাদের নারীত্বের মধ্যে কোনো অসুবিধা বা প্রতিবন্ধকতা বোধ করি নি। বিশেষ কিছু সমস্যা আছে যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তবে কিছু সমস্যাকে মনে হয় বেশি জরুরি; এবং এই নিরাসক্তির জন্যে আশা করতে পারি যে আমাদের মনোভাব হবে বস্তুনিষ্ঠ। পুরুষদের থেকে নারীর বিশ্বকে আমরা জানি অনেক বেশি অন্তরঙ্গভাবে, কেননা আমাদের শেকড় রয়েছে এর ভেতরেই, একটি মানুষের কাছে নারী হওয়ার অর্থ কী, তা আমরা জানি পুরুষের থেকে অনেক বেশি প্রত্যক্ষভাবে; এবং আমাদের কাছে এ-জ্ঞানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি বলেছি আছে কিছু অধিকতর জরুরি সমস্যা, কিন্তু নারী হওয়া জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে, সে-সম্পর্কে প্রশ্ন করা থেকে এটা আমাদের বিরত করে না। আমাদের দেয়া হয়েছে কী কী সুবিধা এবং কী কী দেয়া হয় নি? আমাদের অনুজাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে কী ভাগ্য, কোন দিকে তারা এগোবে? এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে আমাদের সময়ে নারীদের সম্পর্কে নারীদের লেখা বইগুলোতে সাধারণত অধিকারের দাবি বেশি জানানো হয় না, বরং চেষ্টা করা হয় বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝাতে। আমরা যখন অতিরিক্ত বিতর্কের যুগ পেরিয়ে আসছি, তখন আরো অনেক কিছুর সাথে এ-মন্তব্যের সত্যতা প্রমাণেরও একটি উদ্যোগরূপে উপস্থাপিত করা হচ্ছে এ-বইটি।

তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে কোনো মানবিক সমস্যা পক্ষপাতহীন মনে আলোচনা করা অসম্ভব। যেভাবে উপস্থাপন করা হয় প্রশ্নগুলো, নেয়া হয় যেদৃষ্টিকোণ, তাতে থাকে স্বার্থের আপেক্ষিকতা; সব বৈশিষ্ট্যই নির্দেশ করে মূল্য, এবং তথাকথিত সব বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনার পেছনেই থাকে বিশেষ নৈতিক পটভূমি। মূলসূত্রগুলো গোপন করে রাখার চেষ্টা না করে শুরুতেই সেগুলো খোলাখুলি বলে দেয়াই ভালো। এতে প্রতি পাতায় আর ব্যাখ্যা করতে হবে না উৎকৃষ্ট, নিকৃষ্ট, ভালো, মন্দ, অগ্রগতি, প্রতিক্রিয়া, এবং এমন আরো অনেক শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে কী অর্থে। নারী সম্পর্কিত কিছু বই জরিপ করলেই দেখতে পাই যে বারবার নেয়া হয় একটি দৃষ্টিকোণ, সেটি হচ্ছে জনগণের মঙ্গল, জনগণের স্বার্থ; আর তাতে সমাজের মঙ্গল বলতে সব সময়ই বোঝান তারা সমাজকে যেভাবে রাখতে বা গড়তে চায়, সে-ব্যাপারটি। আমরা বিশ্বাস করি যা নিশ্চিত করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত মঙ্গল, তাই শুধু জনগণের মঙ্গল; আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিচার করবো এ-অনুসারে যে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ওগুলো কতোটা বাস্তব সুবিধা দিতে সমর্থ। ব্যক্তিগত স্বার্থের ধারণাকে ব্যক্তিগত সুখের ধারণার সাথে গুলিয়ে ফেলতে চাই না, যদিও এটি আরেকু সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি। ভোটাধিকারী নারীর থেকে কি হারেমের নারীরা বেশি সুখী নয়? গৃহিণী কি বেশি সুখী নয় কর্মজীবী নারীর থেকে? তবে সুখী শব্দটি ঠিক কী বোঝায় তা অস্পষ্ট; আর এর মুখোশের আড়ালে কতোটা আছে সত্যিকার মূল্য তা আরো অস্পষ্ট। অন্যের সুখ পরিমাপের কোনো সম্ভাবনা নেই, এবং আমরা যে পরিস্থিতিকে সুখী বলতে চাই, তাকে সুখী বলে বর্ণনা করা সব সময়ই সহজ।

বিশেষ করে যাদের দণ্ডিত করা হয়েছে নিশ্চল নিরুদ্যমতায়, তাদের সাধারণত সুখী বলে ঘোষণা করা হয় এ-অজুহাতে যেনো নিশ্চল থাকার মধ্যেই আছে সুখ। আমরা প্রত্যাখ্যান করি এ-ধারণা, কেননা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অস্তিত্ববাদী নীতিবিদ্যার। প্রতিটি কর্তাই কাজ করে নিজের সীমা অতিক্রমের লক্ষ্যে; সে অন্যান্য মুক্তি অর্জনের ধারাবাহিক প্রয়াসের মধ্য দিয়েই শুধু অর্জন করে মুক্তি। বর্তমান অস্তিত্বের কোনো যৌক্তিকতা থাকে না, যদি না তা সম্প্রসারিত হতে পারে অনির্দিষ্ট মুক্ত ভবিষ্যতে। যতোবারই সীমাতিক্রমণ প্রবণতা পিছু হটে পরিণত হয় অন্তর্ভবতায়, নিশ্চলতায়, ততোবারই অস্তিত্ব অধঃপতিত হয় এ-সোয়ে বিশেষ অবস্থায় জীবনের পাশবিক বশ্যতায় এবং মুক্তি পর্যবসিত হয় সীমাবদ্ধতায় ও আকস্মিক ঘটনাচক্রে। কর্তা যদি এতে সম্মতি দেয়, তাহলে এ-অধঃপতন নির্দেশ করে তার নৈতিক ত্রুটি; এটা যদি চাপিয়ে দেয়া হয় তার ওপর, তাহলে দেখা দেয় হতাশা ও পীড়ন। উভয় ক্ষেত্রেই। এটা এক চরম অশুভ। প্রতিটি মানুষ, যে প্রতিপন্ন করতে চায় তার অস্তিত্বের যৌক্তিকতা, অনুভব করে যে মুক্তভাবে কাজ করার জন্যে তার অস্তিত্বের মধ্যে রয়েছে নিজেকে অতিক্রম করার এক অসংজ্ঞায়িত প্রয়োজন।

এখন, যা উৎকটভাবে লক্ষণীয় করে নারীর পরিস্থিতি, সেটি হচেছ যে নারীঅন্যান্য মানুষের মতো এক স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত সত্তা–দেখতে পায় সে বাস করছে এমন এক বিশ্বে, যেখানে পুরুষ তাকে বাধ্য করে অপর-এর অবস্থানে থাকতে। তারা তাকে একটি বস্তু হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, পর্যবসিত করতে চায় আকস্মিক ঘটনাচক্রে, কেননা তার অস্তিত্বের সীমাতিক্ৰমণতা ছায়াবৃত ও চিরকালের জন্যে সীমাতিক্রান্ত হয় আরেকটি অহং (নীতিচেতনা) দিয়ে, যেটি অপরিহার্য ও সার্বভৌম। নারীর নাটক ঘটে প্রতিটি কর্তার (অহং) মৌল আকাঙ্খর–যে সব সময় আত্মকে গণ্য করে অপরিহার্য বলে–এবং সে-পরিস্থিতির চাপের বিরোধের মধ্যে, যেখানে নারী হচ্ছে অপ্রয়োজনীয়। নারীর পরিস্থিতির মধ্যে কোনো মানুষ কীভাবে লাভ করতে পারে সিদ্ধি? তার সামনে খোলা আছে কোন কোন রাস্তা? কোনগুলো বন্ধ? পরাশ্রিত অবস্থার মধ্যে কী করে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব স্বাধীনতা? কী পরিস্থিতি সীমিত করে নারীর স্বাধীনতা এবং সেগুলো পেরোনো যায় কীভাবে? এগুলোই হচ্ছে সে-সব মৌল প্রশ্ন, যেগুলোর ওপর আমি কিছুটা আলোকপাতের চেষ্টা করবো। এর অর্থ হচ্ছে আমি ব্যক্তির ঐশ্বর্যের প্রতি আগ্রহী সুখের শর্তে নয়, বরং মুক্তির শর্তে।

যদি আমরা বিশ্বাস করতাম নারীর নিয়তি অবধারিত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, বা আর্থনীতিক শক্তি দিয়ে, তাহলে স্পষ্টত এ সমস্যা হতো তাৎপর্যহীন। এখন থেকে সবার আগে আমি আলোচনা করবো যে আলোক নারীকে দেখা হয়। জীববিদ্যায়, মনোবিজ্ঞানে, ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদে। তারপর আমি দেখাতে চেষ্টা করবো ঠিক কীভাবে আকার দেয়া হয়েছে ‘খাঁটি নারী’ ধারণাটিকে–কেননা নারীকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে অপর-রূপে, এবং পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে এর ফল কী হয়েছে। তারপর আমি বিশ্বকে বর্ণনা করবো নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে, যে-বিশ্বে অবশ্যই বাস করতে হবে নারীকে; এবং এভাবে আমরা মনে মনে ছবি আঁকতে সমর্থ হবে তাদের পথের বিপদগুলোর, যার মুখোমুখি হতে হবে তাদের এ-যাবৎ তাদের জন্যে নির্ধারিত এলাকা থেকে মুক্তির প্রয়সা চালাতে গিয়ে, যখন তারা পোষণ করে মানবজাতির পূর্ণ সদস্য হওয়ার আকাঙ্খা।

 

দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকা

আজকের নারীরা ন্যায়সঙ্গতভাবে বর্জন করতে পারে নারীত্বের কিংবদন্তিটি; সুনির্দিষ্ট উপায়ে দৃঢ়ভাবে তারা ঘোষণা করতে শুরু করছে তাদের স্বাধীনতা; কিন্তু পরিপূর্ণরূপে মানুষের জীবন যাপনে তারা সহজে সমর্থ হচ্ছে না। নারীদের জগতে নারীদের দ্বারা লালিত হয়ে তাদের স্বাভাবিক নিয়তি হচ্ছে বিয়ে, যা বাস্তবে আজো বোঝায় পুরুষের অধীনতা; তার কারণ পুরুষের মর্যাদা আদৌ লুপ্ত হচ্ছে না, তা আজো দাঁড়িয়ে আছে দৃঢ় অর্থনীতিক ও সামাজিক ভিত্তির ওপর। তাই আমাদের নারীর প্রথাগত নিয়তি ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করতে হবে বিশেষ যত্নের সাথে। দ্বিতীয় খণ্ডে আমি বর্ণনা করতে চেষ্টা করবো নারী কীভাবে যায় তার শিক্ষানবিশির ভেতর দিয়ে, কীভাবে সে অভিজ্ঞতা লাভ করে তার অবস্থানের, কী ধরনের বিশ্বে সে আটকে আছে, কী তার মুক্তির উপায়। তাহলেই শুধু আমরা বুঝতে পারবো নারীর সমস্যাগুলো, যারা দুর্বহ অতীতের উত্তরাধিকারী, যারা চেষ্টা করছে এক নতুন ভবিষ্যৎ তৈরির। যখন আমি ব্যবহার করি নারী বা নারীত্ব শব্দগুলো, তখন আমি অবশ্যই কোনো অপরিবর্তনীয় আদিরূপের প্রতি ইঙ্গিত করি না; আমার বহু মন্তব্যের শেষে পাঠকদের বুঝে নিতে হবে শিক্ষা ও রীতিনীতির বর্তমান অবস্থায়’ পদটি। শাশ্বত সত্য ঘোষণা এখানে আমাদের লক্ষ্য নয়, বরং আমরা বর্ণনা করতে চাই সে-সাধারণ ভিত্তি, যা আছে প্রতিটি নারী অস্তিত্বের ভিত্তিমূলে।

জীববিজ্ঞানের উপাত্ত

১.১ জীববিজ্ঞানের উপাত্ত
ভাগ ১ – নিয়তি । পরিচ্ছেদ ১ – জীববিজ্ঞানের উপাত্ত

নারী? খুবই সরল, বলেন সরল সূত্রের অনুরাগীরা : সে একটি জরায়ু, ডিম্বাশয়; সে একটি মেয়েলোক–এ-শব্দই তার সংজ্ঞার জন্যে যথেষ্ট। পুরুষের মুখে স্ত্রীলিঙ্গ কথাটি অবমাননাকর শোনায়, তবু পুরুষ তার পাশবিক স্বভাব সম্পর্কে লজ্জিত হয় না; বরং কেউ যদি তার সম্পর্কে বলে : ‘সে পুরুষ!’ তখন সে গর্ব বোধ করে। স্ত্রীলিঙ্গ শব্দটি অমর্যাদাকর, এ-কারণে নয় যে এটি জোর দেয় নারীর পাশবিকতার ওপর, বরং এজন্যে যে এটি তাকে বন্দী করে রাখে তার লিঙ্গের মধ্যে; আর এমনকি নিরীহ বোবা পশুর মধ্যেও লিঙ্গ ব্যাপারটি যে পুরুষের কাছে ঘৃণ্য ও ক্ষতিকর মনে হয়, তার মূলে আছে নারী, যে পুরুষের মনে জাগিয়ে রাখে এক অস্বস্তিকর বৈরিতা। সে জীববিদ্যার মধ্যে খুঁজে পেতে চায় তার ভাবাবেগের যৌক্তিকতা। স্ত্রীলিঙ্গ শব্দটি মনে জাগিয়ে তোলে এক ভীতিকর চিত্রকল্প–একটি বিশাল, গোল ডিম্বাণু প্লাবিত ও নপুংসক করছে একটি ক্ষিপ্র শুক্রাণুকে; দানবিক ও স্ফীত রানী পতঙ্গ শাসন করছে পুরুষ দাসদের; আরাধনাকারী নারী ম্যান্টিস ও মাকড়সা, প্রেমে পরিতৃপ্ত হওয়ার পর, ভেঙে চুরমার করে খেয়ে ফেলছে তাদের সঙ্গীদের; কামোন্মত্ত কুকুরী তার পেছনে দূষিত গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে ছুটে চলছে গলিপথ দিয়ে; বানরী অশীলভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে পাছা এবং তারপর পালিয়ে যাচ্ছে ছেনালিপনার সাথে; এবং অত্যুকৃষ্ট বন্যপ্রাণী–বাঘিনী, সিংহিনী, চিতাবাঘিনী–ক্রীতদাসীর মতো ধরা দিচ্ছে তাদের পুরুষদের রাজকীয় আলিঙ্গনের তলে। পুরুষ নারীর ওপর চাপিয়ে দেয় নিষ্ক্রিয়, আগ্রহী, চতুর, নির্বোধ, উদাসীন, কামুক, হিংস্র, নিচ প্রভৃতি বিশেষণ। এবং সত্য ঘটনা হচ্ছে সে স্ত্রীলিঙ্গ। তবে আমরা যদি মামুলি কথা অনুসারে চিন্তা করা বাদ দিই, তখন অবিলম্বে উত্থাপিত হয় দুটি প্রশ্ন : প্রাণীজগতে স্ত্রীলিঙ্গ কী বোঝায়? আর নারীর মধ্যে প্রকাশ পায় কোন বিশেষ ধরনের স্ত্রীলিঙ্গ?

পুরুষ ও নারী দু-ধরনের সত্তা, বিশেষ প্রজাতির মধ্যে যাদের পৃথক করা হয় তাদের প্রজনন ভূমিকা অনুসারে; তাদের সংজ্ঞায়িত করা যায় শুধু পরস্পরসম্পর্কিত ভাবেই। তবে প্রথমেই এটা মনে রাখতে হবে যে বিশেষ প্রজাতিকে দুটি লিঙ্গে বিভক্ত করার ব্যাপারটি সব সময় সুনির্দিষ্ট নয়।

প্রকৃতিতে এটা সর্বজনীনভাবে প্রকাশিত নয়। প্রাণীদের কথা যদি বলি, এটা সুবিদিত যে এককোষী আণুবিক্ষণিক রূপসমূহে–ইনফিউসোরিয়া, অ্যামিবা, স্পোরাজোয়ান, এবং এ-জাতীয়তে–সংখ্যাবৃদ্ধি যৌনতা থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। প্রতিটি কোষ বিশ্লিষ্ট ও উপবিশ্লিষ্ট হয় নিজে নিজেই। বহুকোষী প্রাণীদের মধ্যেও যৌনতা ছাড়াই বংশবৃদ্ধি ঘটতে পারে, কখনো এটা ঘটতে পারে বিশ্লিষ্টীকরণ প্রণালিতে, অর্থাৎ একটি দুই বা বহু টুকরো হয়ে, যেগুলো পরে হয়ে ওঠে একেকটি নতুন প্রাণী, এবং কখনো ঘটতে পারে পৃথকীকরণ প্রণালিতে, অর্থাৎ কুঁড়ি পৃথক হয়ে গড়ে তোলে নতুন প্রাণী। মিষ্টি পানির হাইড্রা, স্পঞ্জ, পোকা, টিউনিকেইট প্রভৃতিতে কুঁড়ি পৃথকীকরণ বেশ পরিচিত উদাহরণ। অসঙ্গম বংশবিস্তারে কুমারী স্ত্রীটির ডিম পুরুষের দ্বারা নিষিক্ত না হয়েই বিকশিত হয় ভ্রূণরূপে; তাই নাও থাকতে পারে পুরুষের ভূমিকা। মৌমাছিতে সঙ্গম ঘটে, কিন্তু ডিম পাড়ার সময় সেগুলো নিষিক্ত হতেও পারে, নাও হতে পারে। অনিষিক্ত ডিমগুলোর বিকাশের ফলে জন্মে পুরুষ মৌমাছি এবং জাবপোকার বেলা পুরুষ অনুপস্থিত থাকে প্রজন্ম পরম্পরায়, এবং অনিষিক্ত ডিমগুলো থেকে জন্মে স্ত্রীলিঙ্গ জাবপোকা। অসঙ্গম বংশবিস্তারের প্রক্রিয়াটি কৃত্রিমভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে সমুদ্রশল্য, তারামাছ, ব্যাং, এবং অন্যান্য প্রজাতির ওপর। এককোষী প্রাণীদের (প্রোটোজোয়া) মধ্যে অবশ্য দুটি কোষ মিলে গঠন করতে পারে জাইগোট বা জ্বণাণু, আর মৌমাছিতে নিষিক্তকরণ দরকার হয় যদি ডিমগুলো জন্ম দিতে চায় স্ত্রী মৌমাছি। জাবপোকার ক্ষেত্রে পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ই আবির্ভূত হয় শরৎকালে এবং এ-সময়ে উৎপাদিত ডিম খাপ খাইয়ে নেয় শীতের সাথে।

অতীতে কোনো কোনো জীববিজ্ঞানী এসব ঘটনা থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁচেছিলেন যে এমনকি যে-সব প্রজাতি সঙ্গমহীন বংশবিস্তারে সমর্থ, সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রজাতির বলিষ্ঠতা নবায়নের জন্যে মাঝেমাঝে দরকার পড়ে নিষিক্তীকরণ–দুটি সত্তার বংশানুক্রমিক উপাদান মিশিয়ে নবযৌবন অর্জন। এ-প্রকল্প অনুসারে জীবনের সবচেয়ে জটিল রূপগুলোতে যৌনতাকে মনে হয় এক অপরিহার্য ব্যাপার; শুধু নিম্ন প্রাণীসত্তাগুলোই পারে যৌনতা ছাড়া বংশবিস্তার করতে; এবং এখানেও একটা বিশেষ সময়ের পর নিঃশেষিত হয়ে পড়ে প্রাণশক্তি। তবে এখন মোটামুটিভাবে এ-প্রকল্প পরিত্যাগ করা হয়েছে; গবেষণার ফলে এটা প্রতিপন্ন হয়েছে যে উপযুক্ত অবস্থায় কোনো লক্ষণীয় অবক্ষয় ছাড়াই চলতে পারে সঙ্গমহীন বংশবিস্তার।।

শুক্র ও ডিম, এ-দু-রকম জননকোষ উৎপাদন অবধারিতভাবে বোঝায় না যে। থাকতেই হবে দুটি পৃথক লিঙ্গ; সত্য হচ্ছে যে ডিম ও শুক্র, দুটি অত্যন্ত পৃথক প্রজনন কোষ, উভয়ই উৎপাদিত হতে পারে একই ব্যক্তির দ্বারা। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বংশবিস্তারের দুটি রীতি সহাবস্থান করে প্রকৃতিতে, তারা উভয়ই বিশেষ বিশেষ প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখতে সমর্থ, এবং জননকোষকে দুটি ভাগে পৃথক করার ব্যাপারটি নিতান্তই আকস্মিক। তাই বিভিন্ন প্রজাতিকে পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ বলে নির্দেশ করা পর্যবেক্ষণের ন্যূনতম সত্য মাত্র।

ব্যাখ্যা না করেই অধিকাংশ দর্শনে এ-ব্যাপারটিকে গ্রহণ করা হয়েছে স্বতসিদ্ধ বলে। পাততায়ী উপকথা অনুসারে শুরুতে ছিলো পুরুষ, নারী, ও উভলিঙ্গ। প্রতিটি ব্যক্তির ছিলো দুটি মুখ, চারটি বাহু, চারটি পা, এবং দুটি সংযুক্ত শরীর। এক সময়ে তাদের বিশ্লিষ্ট করা হয় দু-ভাগে; এবং সেই থেকে এক ভাগ পুনরায় মিলিত হতে চায় আরেক ভাগের সাথে। পরে দেবতারা ঘোষণা করে যে বিসদৃশ দুই অর্ধাংশ যোগ করে সৃষ্টি করা হবে নতুন মানুষ। তবে এ-গল্প দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাওয়া হয়েছে। প্রেম; শুরুতেই স্বীকার করে নেয়া হয়েছে লিঙ্গবিভাজন। আরিস্ততলও ব্যাখ্যা করেন নি এ-বিভাজনকে; কেননা যদি বস্তু ও গঠনকে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে হয় সব কাজে, তাহলে সক্রিয় ও অক্রিয় নীতিকে দুটি ভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তিতে পৃথক করার দরকার পড়ে না। তাই সেইন্ট টমাস নারীকে ঘোষণা করেন ‘আকস্মিক সত্তা ব’লে, পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা বোঝায় যৌনতার আকস্মিক বা সংযত প্রকৃতি। তবে যুক্তির প্রতি হেগেলের সংরাগ অসত্য বলে গণ্য হতো যদি তিনি এর একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যার উদ্যোগ না নিতেন। তাঁর মতে যৌনতা নির্দেশ করে সে-মাধ্যমটিকে, যা দিয়ে কর্তা অর্জন করে বিশেষ এক জাতিতে অন্তর্ভুক্তির বোধ। কর্তার জাতিবোধ সমতাবিধান করে তার ব্যক্তিগত বাস্তবতার অসম বোধের, তার নিজের প্রজাতির কারো সাথে মিলিত হয়ে সে তার মধ্যে বোধ করতে চায় নিজেকে, সম্পূর্ণ করতে চায় নিজেকে, এবং এভাবে সে নিজের প্রকৃতিতে একীভূত করতে চায় জাতিকে এবং তাকে করতে চায় অস্তিত্বশীল। এই হচ্ছে সঙ্গম। (প্রকৃতির দর্শন, খণ্ড ৩, উপপরিচ্ছেদ ৩৬৯)। হেগেল পরে বলেন যে মিলনপ্রক্রিয় সম্পন্ন করার জন্যে প্রথমে থাকতে হবে লৈঙ্গিক ভিন্নতা। কিন্তু তার ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

আমরা মনে করতে পারি যে বংশবিস্তারের প্রপঞ্চটি রয়েছে প্রাণীর সত্তার মধ্যেই। তবে আমাদের সেখানেই থামতে হবে। প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে লৈঙ্গিক ভিন্নতার দরকার পড়ে না। তবে একথা সত্য যে প্রাণীদের মধ্য এ-ভিন্নতা এতো ব্যাপক যে একে অস্বিত্বের যে-কোনো বাস্তবসম্মত সংজ্ঞার মধ্যেই গ্রহণ করতে হয়। একথা সত্য শরীর ছাড়া মন এবং অমর মানুষ অসম্ভব, কিন্তু অসঙ্গমী ও উভলৈঙ্গিক সমাজের কথা আমরা কল্পনা করতে পারি।

দুটি লিঙ্গের ভূমিকা সম্পর্কে পুরুষ পোষণ করে এসেছে বিচিত্র ধরনের বিশ্বাস। প্রথম দিকে সেগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিলো না, সেগুলো প্রকাশ করতে শুধু সামাজিক কিংবদন্তি। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো, এবং আজো কোনো কোনো আদিম মাতৃতান্ত্রিক সমাজে বিশ্বাস করা হয় যে গর্ভসঞ্চারে পুরুষের কোনো ভূমিকা। নেই। পূর্বপুরুষদের প্রেতাত্মা সজীব জীবাণুরূপে মায়ের শরীরে ঢোকে বলে মনে করা হয়। পিতৃতান্ত্রিক সংস্থাগুলোর উদ্ভবের সাথে পুরুষ ব্যথভাবে দাবি জানাতে থাকে। বংশধরদের ওপর। জন্মদানে মায়ের একটি ভূমিকা স্বীকার করে নেয়াও দরকার হয়, তবে এটুকু স্বীকার করে নেয়া হয় যে সে শুধু ধারণ ও লালন করে একলা পিতার দ্বারা সৃষ্ট সজীব বীজটিকে। আরিস্ততল মনে করতেন ভ্রূণ উদ্ভূত হয় শুক্রাণু ও ঋতুস্রাবের রক্তের মিলনে, যাতে নারী সরবরাহ করে অক্রিয় বস্তু, আর পুরুষ দান করে শক্তি, সক্রিয়তা, গতি, জীবন। হিপ্পোক্রাতিস পোষণ করতেন একই রকম ধারণা; তাঁর মতে বীজ দু-ধরনের, দুর্বল বা নারীধর্মী, সবল বা পুরুষধর্মী। আরিস্ততলের তত্ত্ব মধ্যযুগ ধরে চলেছে এবং আধুনিক কাল পর্যন্ত টিকে আছে।

সতেরো শতকের শেষের দিকে হারভে সঙ্গমের পরপরই হত্যা করে দেখেন মাদি কুকুরদের এবং জরায়ুর শৃঙ্গে তিনি দেখতে পান ছোটো ছোটো থলে, যেগুলোকে তিনি ডিম বলে মনে করেন, তবে ওগুলো আসলে ছিলো ভ্রূণ। ডেনমার্কের শবব্যবচ্ছেদবিজ্ঞানী স্টেনো নারীর জননগ্রন্থির নাম দেন ডিম্বাশয়, যাকে আগে বলা হতো ‘নারীর অণ্ডকোষ’; সেগুলোর ওপর দেখতে পান ছোটো ছোটো স্ফীতি। ১৬৭৭ অব্দে ফন গ্রাফ এগুলোকে ডিম বলে মনে করেছিলেন, এবং এখন এগুলোকে বলা হয় গ্রাফীয় ডিম্বথলি। ডিম্বাশয়কে তখনও মনে করা হতো পুরুষের গ্রন্থির সদৃশ বলে। তবে একই বছরে আবিষ্কৃত হয় শুক্রাণু অণুজীব এবং এটা প্রমাণিত হয় যে এগুলো প্রবিষ্ট হয় নারীর জরায়ুতে; তবে মনে করা হয় সেখানে এগুলো নিতান্তই লালিত হয় এবং সেখানেই উদ্ভূত হয় নতুন সত্তাটি। ১৬৯৪-এ একজন ওলন্দাজ, হার্টসাকের, ছবি আঁকেন শুক্রাণুর মধ্যে গুপ্ত এক ‘মনুষ্যপ্রাণীর’, এবং ১৬৯৯-এ আরেক বিজ্ঞানী বলেন যে তিনি দেখতে পেয়েছেন শুক্রাণু লোম ঝরিয়ে চলছে, যার নিচে আবির্ভূত হয়েছে একটি মানুষ। তিনি তার ছবিও আঁকেন। এসব কল্পিত প্রকল্পে নারীর কাজ হচ্ছে এক সক্রিয় সজীব নীতিকে লালন করা। এসব ধারণা সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয় নি, তবে উনিশ শতকেও এগুলোর পক্ষে যুক্তি প্রয়োগ করা হতো। অণুবীক্ষণযন্ত্র ব্যবহার করে ১৮২৭ অব্দে ফন বায়েরের পক্ষে গ্রাফীয় ডিম্বথলির মধ্যে আবিষ্কার করা সম্ভব হয় স্তন্যপায়ী প্রাণীর ডিম। অল্প কালের মধ্যেই সম্ভব হয় ডিমের বিদারণ পর্যবেক্ষণ করা–অর্থাৎ কোষ বিভাজনের মধ্য দিয়ে বিকাশের সূচনা-স্তরগুলো দেখা; এবং ১৮৩৫-এ আবিষ্কৃত হয় সারকোড, পরে যাকে বলা হয় প্রোটোপ্লাজম। এর মধ্য দিয়েই ধরা পড়তে থাকে কোষের আসল প্রকৃতি। ১৮৭৯ অব্দে পর্যবেক্ষণ করা হয় তারামাছের ডিমের ভেতরে শুক্রাণুর অনুপ্রবেশ, এবং এভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় দুটি জননকোষের কেন্দ্র, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর সমতুল্যতা। নিষিক্ত ডিমের ভেতরে তাদের মিলনের প্রক্রিয়া বিস্তৃতভাবে উদ্ঘাটন করেন বেলজিয়ামের প্রাণীবিজ্ঞানী ভ্যান বেনেডেন।

তবে আরিস্ততলের ধারণাগুলো একেবারে বাতিল হয়ে যায় নি। হেগেল ধারণা পোষণ করতেন যে প্রয়োজনেই দুটি লিঙ্গ ভিন্ন, একটি সক্রিয় এবং অপরটি অক্রিয়, এবং অবশ্যই স্ত্রীলিঙ্গটিই অক্রিয়। ‘তাই এ-পার্থক্যের পরিণতিরূপে পুরুষ হচ্ছে সক্রিয় নীতি আর নারী হচ্ছে অক্রিয় নীতি, কেননা সে তার সংহতির মধ্যে থাকে অবিকশিত’ (হেগেল, প্রকৃতির দর্শন)। এমনকি ডিম্বাণু সক্রিয় নীতিরূপে গৃহীত হওয়ার পরও পুরুষেরা এর শান্ততার বিপরীতে শুক্রাণুর সজীব গতিশীলতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছে। আজকাল অনেক বিজ্ঞানী দেখিয়ে থাকেন এর বিপরীত প্রবণতা। অসঙ্গম বংশবিস্তার সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে তারা দেখতে পেয়েছেন শুক্রাণুর ভূমিকা নিতান্তই এক শারীর-রাসায়নিক প্রতিক্রিয়াসাধকের। এটা দেখানো হয়েছে যে অনেক প্রজাতিতে কোনো এসিডের উদ্দীপনায় বা একটা সূচের খোচায়ও ডিমের বিদারণ ঘটতে পারে এবং বিকাশ ঘটতে পারে ভ্রূণের। এটা ভিত্তি করে প্রস্তাব করা হয়েছে যে শুক্রাণু গর্ভসঞ্চারের জন্যে জরুরি নয়, এটা বড়োজোর একটি ভ্রূণকে গজিয়ে তুলতে সাহায্য করে; সম্ভবত ভবিষ্যতে প্রজননে পুরুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে।

বিপুল সংখ্যক প্রজাতিতে পুরুষ ও নারী সহযোগিতা করে প্রজননে। তাদের পুরুষ ও নারী হিশেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় প্রধানত তাদের উৎপাদিত জননকোষ–যথাক্রমে শুক্রাণু ও ডিম, অনুসারে। কিছু নিম্নপর্যায়ের উদ্ভিদ ও প্রাণীতে যে-কোষগুলো মিলিত হয়ে জাইগোট গঠন করে, সেগুলো অভিন্ন; এবং এ-সমজননকোষতার ঘটনাগুলো তাৎপর্যপূর্ণ, কেননা তারা নির্দেশ করে জননকোষের মৌলিক সাম্য। সাধারণভাবে জননকোষগুলো পৃথক, তবে তাদের সাম্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য। দু-লিঙ্গেই একই ধরনের আদিকালীন জীবাণু কোষ থেকে বিকশিত হয় শুক্রাণু ও ডিম। আদিকালীন কোষ থেকে স্ত্রীলিঙ্গের ভেতরে বিকশিত অপুষ্ট ডিম্বকোষ ও পুরুষের ভেতরে উদ্ভূত অপুষ্ট শুক্রকোষ প্রধানত ভিন্ন হয় প্রোটোপ্লাজমে, কিন্তু সংঘটিত প্রপঞ্চগুলো একই ধরনের। ১৯০৩ অব্দে জীববিজ্ঞানী অ্যান্সেল মত প্রকাশ করেন যে আদিকালীন জীবাণু কোষটি নিস্পৃহ, এবং যে-ধরনের জননগ্রন্থিতে এটি থাকে, অণ্ডকোষে বা ডিম্বাশয়ে, সে-অনুসারে এটি বিকশিত হয় শুক্রাণু বা ডিমরূপে। তবে এটা যাই হোক, প্রত্যেক লিঙ্গের আদিকালীন জীবাণু কোষেই থাকে একই সংখ্যক ক্রোমোসোম (যা ধারণ করে বিশেষ প্রজাতিটির বৈশিষ্ট্য), যা পুং ও স্ত্রীলিঙ্গে একই প্রক্রিয়ায় হ্রাস পায় অর্ধেক সংখ্যায়। বিকাশের এ-প্রক্রিয়াগুলোর শেষে (পুরুষের ক্ষেত্রে একে বলা হয় শুক্রাণু উৎপাদন প্রক্রিয়া, আর নারীর ক্ষেত্রে বলা হয় ডিম উৎপাদন প্রক্রিয়া) জননকোষগুলো পূর্ণবিকশিত হয়ে রূপ নেয় শুক্রাণু ও ডিমের; কিছু ব্যাপারে তাদের মধ্যে থাকে বিপুল পার্থক্য, তবে সাদৃশ্য থাকে এতে যে এদের প্রত্যেকে ধারণ করে এক প্রস্থ সমমূল্যের ক্রোমোসোম।

আজকাল এটা ভালোভাবেই জানা যে সন্তানের লিঙ্গ নির্ণীত হয় গর্ভাধানের সময় ক্রোমোসমের সংগঠন দিয়ে প্রজাতি অনুসারে এ-কাজটি সম্পন্ন করে থাকে পুরুষ জননকোষ অথবা নারী জননকোষ। স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে এ-কাজটি করে শুক্রাণু, যাতে উৎপাদিত হয় সমসংখ্যক দু-ধরনের উপাদান, এক ধরনের উপাদানে থাকে একটি X ক্রোমোসোম (যা থাকে সব ডিমেই), আরেক ধরনের উপাদানে থাকে একটি Y ক্রোমোসোম (যা থাকে না ডিমে)। X ও Y ক্রোমোসোম ছাড়াও শুক্রাণু ও ডিমে থাকে সমানসংখ্যক এ-ধরনের উপাদান। যখন শুক্রাণু ও ডিম মিলিত হয়ে গর্ভসঞ্চার ঘটে, তখন নিষিক্ত ডিমটিতে থাকে পূর্ণ দুই প্রস্থ ক্রোমোসোম। যদি গর্ভসঞ্চার ঘটে কোনো X বাহী শুক্রাণু দিয়ে, তাহলে নিষিক্ত ডিমটিতে থাকে দুটি x ক্রোমোসোম, এবং এটি পরিণত হয় স্ত্রীলিঙ্গে (XX)। যদি Y বাহী শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত হয় ডিমটি, তাহলে ডিমটিতে উপস্থিত থাকে মাত্র একটি X ক্রোমোসোম, এবং এটি হয় পুংলিঙ্গ (XY)। পাখি ও প্রজাপতির বেলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়, যদিও রীতিটি থাকে একই; ডিমই ধারণ করে X বা Y, তাই ডিমই নির্ধারণ করে সন্তানের লিঙ্গ। মেন্ডেলের সূত্র দেখিয়েছে যে বংশানুক্রমে পিতা ও মাতার ভূমিকা সমান। ক্রোমোসোমগুলো ধারণ করে বংশানুক্রমের নিয়ন্ত্রকগুলো (জিন), এবং এগুলো সমপরিমাণে থাকে ডিমে ও শুক্রাণুতে।

এ-পর্যায়ে যা আমাদের বিশেষভাবে লক্ষ্য করার কথা, তা হচ্ছে যে জননকোষের কোনো একটিকে অপরটি থেকে উৎকৃষ্ট মনে করতে পারি না; যখন তারা মিলিত হয় তখন উভয়েই নিষিক্ত ডিমের মধ্যে হারিয়ে ফেলে নিজেদের স্বাতন্ত্র। প্রচলিত রয়েছে দুটি সাধারণ অনুমান, যে-দুটি অন্তত জৈবিক স্তরে স্পষ্টভাবে ভুল। প্রথমটি, অর্থাৎ নারীর অক্রিয়তার ব্যাপারটি, ভুল বলে প্রমাণিত হয় এ-ঘটনা থেকে যে নব জীবনের উদ্ভব ঘটে দুটি জননকোষের মিলনের ফলে; জীবনের স্ফুলিঙ্গ এ-দুটির কোনোটিরই একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি নয়। ডিমের কেন্দ্রটি শুক্রাণুর কেন্দ্রের মতোই এক জীবন্ত সক্রিয়তার এলাকা। দ্বিতীয় ভুল অনুমানটি অবশ্য প্রথমটির বিরোধী। এটির মতে প্রজাতির স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয় নারীর দ্বারা, পুরুষ নীতি নিতান্তই এক বিস্ফোরক ও অস্থায়ী প্রকৃতির। তবে সত্য হচ্ছে ভ্রূণ বহন করে পিতা ও মাতা উভয়েরই জীবাণু, এবং মিলিতভাবে সে-দুটিকে সঞ্চারিত করে দেয় সন্তানসন্ততির ভেতরে, যাদের কেউ পুরুষ কেউ নারী। এটা যেনো এক উভলিঙ্গ জীবাণু প্রাণরস, যা পুরুষ ও নারীকে পেরিয়ে বেঁচে থাকে যখন তারা উৎপাদন করে সন্তান।

এসব বলার পর আমরা চোখ দিতে পারি শুক্রাণু ও ডিমের গৌণ পার্থক্যগুলোর ওপর। ডিমের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর রয়েছে ভ্রূণ লালন-পালনের শক্তি; এটি সংরক্ষণ করে এমন বস্তু, যা দিয়ে ভ্রূণটি গঠন করে গ্রন্থি। পরিণামে ডিমটি হয়ে ওঠে বিশাল, সাধারণত গোলাকার ও তুলনামূলকভাবে প্রকাণ্ড। পাখির ডিমের আকার সুপরিচিত; কিন্তু নারীর ডিম অনেকটা আণুবিক্ষণিক, আকারে মুদ্রিত যতিচিহ্নের সমান (ব্যাস .১৩২-.১৩৫ মিমি), তবে পুরুষের শুক্রাণু আরো অনেক ছোটো (দৈর্ঘ্য .০৪-.০৬ মিমি), এতো ছোটো যে এক ঘনমিটারে থাকতে পারে ৬০,০০০টি। শুক্রাণুর রয়েছে সুতোর মতো একটি লেজ ও ছোটো, চ্যাপ্টা ডিম্বাকার মাথা, যাতে থাকে ক্রোমোসোমগুলো। এর ওপর নেই কোনো জড়বস্তুর ভার; এটি পুরোপুরি জীবন্ত। এর পুরো কাঠামোই গতিশীল। আর সেখানে ডিমটি, প্রাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহৎ, স্থিতিশীল; নারীর দেহাভ্যন্তরে বন্দী বা বাহ্যিকভাবে জলের ওপর ভাসমান অবস্থায় এটি অক্রিয়ভাবে অপেক্ষায় থাকে নিষিক্ত হওয়ার। পুংজননকোষটিই একে। খুঁজে বের করে। শুক্রানুটি সব সময়ই একটি নগ্ন কোষ; আর প্রজাতি অনুসারে ডিমটি কোনো খোল বা ঝিল্লিতে সংরক্ষিত থাকতেও পারে, নাও পারে, কিন্তু সব সময়ই যখন শুক্রাণু ডিমের সংলগ্ন হয় তখন চাপ প্রয়োগ করে ডিমের ওপর, কখনো কখনো ঝাকুনি দেয়, এবং গর্ত করে ঢোকে এর ভেতরে। খসে পড়ে লেজটি এবং বৃদ্ধি পায় মাথা, গঠন করে পুংকেন্দ্ৰপরমাণু, এবং এটি এগিয়ে চলে ডিম কেন্দ্ৰপরমাণুর দিকে। এ-সময়ে ডিমটি দ্রুত তৈরি করে একটি ঝিল্লি, যা ভেতরে অনুপ্রবেশে বাধা দেয় অন্য শুক্রাণুদের। ডিমের থেকে অনেক ছোটো বলে শুক্রাণু উৎপাদিত হয় অনেক বেশি পরিমাণে; তাই ডিমের অনুরাগপ্রার্থী অসংখ্য।

তাই ডিম, তার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যে, কেন্দ্ৰপরমাণুতে, সক্রিয়; কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে অক্রিয়; নিজের ভেতরে আটকানো এর সংহত ভর জাগিয়ে তোলে রাত্রির অন্ধকার ও অন্তর্মুখি দ্রিাতুরতার বোধ। প্রাচীনদের কাছে গোলকের গঠন নির্দেশ করতে সীমাবদ্ধ বিশ্বকে, অনুপ্রবেশঅসম্ভব অণুকে। গতিহীন, ডিমটি অপেক্ষায় থাকে; এর বিপরীতে শুক্রাণুটি–মুক্ত, হালকাপাতলা, ক্ষিপ্র–জ্ঞাপন করে অস্তিত্বের অধীরতা ও অস্থিরতা। তবে এ-রূপককে বেশি দূর ঠেলে নেয়া ঠিক হবে না। ডিমকে অনেক সময় তুলনা করা হয়েছে অন্তর্ভবতার সাথে আর শুক্রাণুকে সীমাতিক্ৰমণতার সাথে; বলা হয়েছে শুক্রাণু যখন বিদ্ধ করে ডিমকে, তখন হারিয়ে ফেলে তার সীমাতিক্ৰমণতা, চলনশীলতা; যখন এটি হারিয়ে ফেলে তার লেজ, এক নিশ্চল ভর একে গ্রাস করে অবরুদ্ধ করে, নপুংসক করে। এটা ঐন্দ্রজালিক কাজ, খুবই উদ্বিগ্নকর, যেমন সব অক্রিয় কাজই উদ্বিগ্নকর, আর সেখানে পুংজননকোষের কাজগুলো যুক্তিসঙ্গত; এটি হচ্ছে গতি, যা স্থানকাল দিয়ে পরিমাপ করা যায়। এসব ধারণা মনের খেয়াল ছাড়া আর কিছু নয়। পুং ও স্ত্রী জননকোষ সংমিশ্রিত হয় নিষিক্ত ডিমে; তারা উভয়ই নিষ্ক্রিয় হয়ে সৃষ্টি করে এক নতুন পূর্ণাঙ্গতা। এটা মিথ্যে কথা যে ডিমটি লুব্ধতার সাথে গিলে ফেলে শুক্রাণুটি, এবং এও একই রকম মিথ্যে যে শুক্রাণুটি বিজয়ীর মতো জোরপূর্বক দখল করে ডিমটির এলাকা, কেননা সংমিশ্রণের ফলে উভয়েই হারিয়ে ফেলে স্বাতন্ত্র্য। যান্ত্রিক মনের কাছে গতিকে এক মহান যৌক্তিক প্রপঞ্চ ব’লে মনে হতে পারে, কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কাছেও এটা স্পষ্ট নয়। তাছাড়া জননকোষের মিলনের পেছনে কী কী শারীর-রাসায়নিক ক্রিয়া কাজ করে, তা প্রমাক্তিতভাবে জানি না। তবে দুটি জননকোষের তুলনা থেকে আমরা পৌঁছোতে পারি একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে। জীবনের রয়েছে দুটি পরস্পরসম্পর্কিত গতিময় বৈশিষ্ট্য : অতিক্রম করেই শুধু একে রক্ষা করা যায়, আবার একে রক্ষা করলেই শুধু এ পেরিয়ে যেতে পারে নিজেকে। এ-দুটি হেতু সব সময়ই কাজ করে একসঙ্গে, এবং এদের পৃথক করার চেষ্টা খুবই অবাস্তব কাজ। এ-জননকোষের দুটি যখন মেশে পরস্পরের সাথে, তখনই তারা নিজেদের অতিক্রম ও স্থায়ী করে। কিন্তু নিজের গঠনের মধ্যেই ডিমটি বুঝতে পারে ভবিষ্যৎ চাহিদাগুলো, একে গঠন করা হয়েছে এমনভাবে যে এর মাঝে দেখা দেবে যে-জীবন, তা পোষণ করতে হবে তাকে। শুক্রাণুটি নিজের জাগানো ভ্রুণটিকে বিকশিত করার মতো কোনো সম্পদই ধারণ করে না। আবার, ডিমটি এমনভাবে স্থান বদলে করতে পারে না, যাতে জ্বলে উঠতে পারে একটি নতুন জীবন, কিন্তু শুক্রাণুটি পারে এবং ভ্রমণ করে। ডিমটির দূরদৃষ্টি ছাড়া নিষ্ফল হতে শুক্রাণুর আগমন; তবে শুক্রাণুর উদ্যোগ ছাড়া ডিমটিও চরিতার্থ করতে পারতো না তার জীবন্ত সম্ভাবনা।

তাই আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারি জননকোষ দুটি পালন করে মূলত অভিন্ন ভূমিকা; একত্রে তারা সৃষ্টি করে একটি জীবন্ত সত্তা, যার মধ্যে তারা দুজনেই লুপ্ত হয় এবং অতিক্রম করে যায় নিজেদের।

এসব সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে যদি সিদ্ধান্ত নিই যে নারীর স্থান হচ্ছে গৃহ, তাহলে তা হবে গোয়ার্তুমি; তবে গোঁয়ার্তুমিপূর্ণ পুরুষ আছে অনেক। আলফ্রেড ফুইলি, তার ল্য তাঁপেরমাঁ এৎ ল্য কারাকতের বইতে, নারীর সংজ্ঞা তৈরি করেছেন সর্বতোভাবে ডিম ভিত্তি করে, পুরুষের সংজ্ঞা তৈরি করেছেন শুক্রাণু ভিত্তি করে; এবং সন্দেহজনক তুলনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন একরাশ অনুমানসিদ্ধ সুগভীর তত্ত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে এসব সন্দেহজনক ধারণা প্রকৃতির কোন দর্শনের অংশ; নিশ্চিতভাবেই বংশানুক্রম সূত্রের অংশ নয়, কেননা এসব সূত্রানুসারে নারী ও পুরুষ একইভাবে উদ্ভূত হয় একটি ডিম ও একটি শুক্রাণু থেকে। আমি অনুমান করতে পারি যে এসব ঝাপসা মনে আজো ভাসে মধ্যযুগের পুরোনো দর্শনের টুকরো, যা শেখাতে যে মহাবিশ্ব হচ্ছে এক অণুবিশ্বের অবিকল প্রতিবিম্ব–ডিমকে কল্পনা করা হতো একটি ছোটো নারী। বলে, আর নারীকে এক বিরাট ডিমরূপে। এসব ঘোর, সে-আলকেমির যুগ থেকেই যা সাধারণত পরিত্যক্ত, উকট উদ্ভটভাবে আজকের উপাত্তের বৈজ্ঞানিক যথাযথতার বিপরীত, আধুনিক জীববিদ্যার সাথে মধ্যযুগের প্রতীকের কোনো মিল নেই। কিন্তু আমাদের তত্তপ্রস্তাবকেরা বিষয়টিকে ঠিকমতো দেখেন না। এটা স্বীকার করতে হবে যে ডিম থেকে নারী খুবই দূরের পথ। অনিষিক্ত ডিমে এমনকি স্ত্রীলিঙ্গতার ধারণাও প্রতিষ্ঠিত হয় না। হেগেল ঠিকই বলেছেন যে লৈঙ্গিক সম্পর্ককে জননকোষের সম্পর্কের কাছে ফেরানো যাবে না। তাই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে নারীসত্তাকে পূর্ণাঙ্গরূপে বিচার করা।

অনেক উদ্ভিদে ও কিছু প্রাণীতে (যেমন শামুকে) দু-ধরনের জননকোষের উপস্থিতির জন্যে দু-ধরনের ব্যক্তির দরকার পড়ে না, কেননা প্রতিটি ব্যক্তিই উৎপাদন করে ডিম ও শুক্রাণু উভয়ই। এমনকি যখন লিঙ্গরা পৃথক, তখনও তাদের পার্থক্য এমন নয় যে তাদের পৃথক প্রজাতির বলে মনে হতে পারে। পুং ও স্ত্রীলিঙ্গদের বরং মনে হয় একই সাধারণ ভিত্তিমূলের বৈচিত্র্য বলে। দুটি লিঙ্গের ভ্রূণবিকাশের সময় যে-গ্রন্থি থেকে পরে গোনাড বা জনগ্রন্থি গঠিত হয়, শুরুতে সেটি থাকে অভিন্ন; বিশেষ এক স্তরেই গড়ে ওঠে অণ্ডকোষ বা ডিম্বাশয়, একইভাবে অন্যান্য যৌন প্রত্যঙ্গেরও প্রথমে থাকে একটি আদি অভিন্ন পর্ব, এ-সময়ে ভ্রূণের বিভিন্ন অংশ, যেগুলো পরে ধারণ করে সুস্পষ্ট পুরুষ বা নারীর গঠন, সেগুলো পরীক্ষা করেও ভ্রণের লিঙ্গ বোঝা সম্ভব নয়। এটা আমাদের উভলিঙ্গতা ও লিঙ্গভিন্নতার মাঝামাঝি অবস্থা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে অনেক সময়ই একটি লিঙ্গ ধারণ করে অন্য লিঙ্গের বৈশিষ্ট্যসূচক কিছু প্রত্যঙ্গ; এর উদাহরণ ভাওয়া ব্যাং, যাতে পুরুষটির ভেতরে থাকে একটি অবিকশিত ডিম্বাশয়, যা নিরীক্ষামূলক অবস্থায় ডিম উৎপাদন করতে পারে। প্রজাতির মধ্যে স্ংখ্যার দিক দিয়ে সমান ও শুরু থেকে একইভাবে বিকশিত পুং ও স্ত্রীলিঙ্গীয়রা মূলতঁ সমতুল্য। প্রত্যেকেরই রয়েছে প্রজনন গ্রন্থি–ডিম্বাশয় ও অণ্ডকোষ–যাদের ভেতরে সমতুল্য প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত হয় জননকোষ। এ-গ্রন্থিগুলো লিঙ্গানুসারে কম-বেশি জটিল নালির ভেতর দিয়ে নিঃসরণ ঘটায় তাদের উৎপাদিত বস্তু; স্ত্রীলিঙ্গে ডিম্বনালির ভেতর দিয়ে সরাসরি বাইরে বেরোতে পারে ডিম; বা বহিষ্কৃত হওয়ার আগে কিছু সময়ের জন্যে থাকতে পারে অবসারণী অথবা জরায়ুর মধ্যে; পুংলিঙ্গে বীর্য রক্ষিত হতে পারে বাইরে বা থাকতে পারো কোনো কামপ্রত্যঙ্গ, যা দিয়ে এটা ঢুকিয়ে দেয়া হয় নারীদেহে। এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীলিঙ্গ ও পুংলিঙ্গ পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত থাকে এক সমরূপ সম্পর্কে।

স্ত্রীলিঙ্গ বা নারীর সাধারণভাবে সিদ্ধ কোনো সংজ্ঞা দেয়া অত্যন্ত কঠিন। নারীকে ডিমবহনকারী ও পুরুষকে শুক্রাণুবহনকারী বলে সংজ্ঞায়িত করা যথেষ্ট নয়, কেননা জননকোষের সাথে জীবটির সম্পর্ক বেশ অনিয়ত। আবার, সব মিলিয়ে জীবটির ওপর সরাসরি বিশেষ প্রভাব নেই জননকোষের পার্থক্যের।

জীবন জটিলতম রূপ পরিগ্রহ করে স্তন্যপায়ীদের মধ্যে, এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র হয় সবচেয়ে অগ্রসর ও বিশিষ্ট। সেখানে পরিপোষণ ও সৃষ্টি বাস্তবায়িত হয় লিঙ্গপার্থক্যের মধ্যে; এ-গোত্রে, মেরুদণ্ডীদের মধ্যে, জননীই সন্তানদের সাথে রক্ষা করে ঘনিষ্ঠতম সস্পর্ক, আর জনক তাদের প্রতি দেখায় কম আগ্রহ। স্ত্রীলিঙ্গ জীব সম্পূর্ণরূপে মাতৃত্বের সাথে খাপ খাওয়ানো ও মাতৃতুসহায়ক, আর কামের উদ্যোগ গ্রহণই হচ্ছে পুংলিঙ্গের বিশেষ অধিকার।

স্ত্রীলিঙ্গ তার প্রজাতির শিকার। বছরের বিশেষ বিশেষ সময় জুড়ে, প্রত্যেক প্রজাতির জন্যে যা নির্দিষ্ট, তার সম্পূর্ণ জীবন নিয়ত্রিত থাকে এক লৈঙ্গিক চক্র (ঋতুচক্র) দিয়ে, বিভিন্ন প্রজাতিতে যার স্থিতিকাল ও ঘটনাপরম্পরা ভিন্ন। এ-চক্রের আছে দুটি পর্ব : প্রথম পর্বে ডিমগুলো (প্রজাতি অনুসারে যাদের সংখ্যা বিভিন্ন) পরিপকু হয় এবং পুরু ও নালিময় হয় জরায়ুর আভ্যন্তর আবরণ; দ্বিতীয় পর্বে (যদি নিষিক্ত না হয়) ডিমগুলো লুপ্ত হয়, ভেঙে পড়ে জরায়ুর প্রাসাদ, এবং বস্তুরাশি প্রবাহিত হয়ে বেরিয়ে আসে, নারী ও বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের স্তন্যপায়ীদের বেলা যাকে বলা হয় ঋতুস্রাব। যদি গর্ভসঞ্চার ঘটে, তাহলে দ্বিতীয় পর্বের স্থানে দেখা দেয় গর্ভ। ডিমনিঃসরণের (প্রথম পর্বের শেষে) কাল ওয়েস্ট্রাস বা গর্ভসঞ্চারকাল নামে পরিচিত এবং এটা হচ্ছে কামোত্তেজনা বা সঙ্গমের কাল।

স্ত্রীলিঙ্গ স্তন্যপায়ীদের কামাবেগ সাধারণত অক্ৰিয়; সে প্রস্তুত ও অপেক্ষমাণ থাকে পুরুষটিকে গ্রহণ করার জন্যে। স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে এটা ঘটে কখনো কখনো–যেমন কোনো কোনো পাখির ক্ষেত্রে–নারীটি পুরুষটির প্রতি সনির্বন্ধ আবেদন জানায়, তবে সে ডাকাডাকি, প্রদর্শনী, ইঙ্গিতপূর্ণ ছলাকলার বেশি কিছু করে না। সে পুরুষটির ওপর সঙ্গম চাপিয়ে দিতে পারে না। পুরুষটিই সিদ্ধান্ত নেয় পরিশেষে। পাখি আর স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে পুরুষটিই জোর করে সঙ্গম করে, আর অধিকাংশ সময় নারীটি আত্মসমর্পণ করে উদাসীনভাবে, এমনকি বাধাও দেয় পুরুষটিকে।

এমনকি যখন নারীটি ইচ্ছুক, বা উত্তেজকও থাকে, তখনও পুরুষটিই নেয় তাকে, সে নীত হয়। শব্দটি অনেক সময় ব্যবহৃত হয় আক্ষরিকার্থে, কেননা বিশেষ কোনো প্রত্যঙ্গের সাহায্যেই হোক বা বেশি বলের ফলেই হোক, পুরুষটি দখল করে তাকে এবং ধরে রাখে বিশেষ আসনে; পুরুষটিই সম্পন্ন করে সঙ্গমের আন্দোলনগুলো; এবং, পতঙ্গ, পাখি, ও স্তন্যপায়ীদের মধ্যে পুরুষটি বিদ্ধ করে নারীটিকে। এবিদ্ধকরণের ফলে ধর্ষিত হয় তার অভ্যন্তরতা, সে একটি দেয়ালের মতো, যাকে ভেঙেচুরে ভেতরে ঢোকা হয়েছে। এতে পুরুষ তার প্রজাতির ওপর কোনো পীড়ন করছে না, কেননা নিয়ত নতুন হয়েই শুধু টিকে থাকতে পারে কোনো প্রজাতি, এবং শুক্রাণু ও ডিম মিলিত না হলে প্রজাতিটি ধ্বংস হয়ে যাবে; কিন্তু নারী, যার ওপর। ভার দেয়া হয়েছে ডিম রক্ষার, সে তা নিজের ভেতরে ঢেকে রাখে, এবং তার শরীর, ডিমকে আশ্রয় দিতে গিয়ে রক্ষা করে পুরুষের উর্বরায়ণের কর্ম থেকে। তার শরীর হয়ে ওঠে একটি প্রতিরোধ, যাকে ভেঙেচুরে ঢুকতে হয়, আর তাকে বিদ্ধ করে পুরুষ লাভ করে সক্রিয়তার মধ্যে আত্মসিদ্ধি।

পুরুষের আধিপত্য প্রকাশ পায় সঙ্গমের আসনেই প্রায় সব প্রাণীতেই পুরুষটি থাকে নারীটির ওপর। এবং পুরুষটি ব্যবহার করে যে-প্রত্যঙ্গটি, সেটি একটি জড় বস্তু; কিন্তু এটি এখানে দেখা দেয় উত্তেজিত অবস্থায় এটি একটি হাতিয়ার। আর এ-কর্মে নারী প্রত্যঙ্গটি থাকে জড় আধারের স্বভাবে। পুরুষটি পাত করে তার বীর্য, নারীটি গ্রহণ করে। এভাবে, যদিও নারীটি প্রজননে পালন করে মূলত সক্রিয় ভূমিকা, সে বশ্যতা স্বীকার করে সঙ্গমে, যা আক্রমণ করে তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্রকে এবং বিদ্ধকরণ ও আভ্যন্তর গর্ভাধানের মধ্য দিয়ে তার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় এক বিরুদ্ধ বস্তু। যদিও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নারী কাম বোধ করতে পারে, কিন্তু সে যেহেতু কামাবেগের সময় চায় পুরুষ, তাই সে কামের অভিজ্ঞতাকে এক আভ্যন্তর ঘটনা হিশেবেই বোধ করে, পৃথিবী ও অন্যদের সাথে কোনো বাহ্যিক সম্পর্ক রূপে নয়।

তবে স্তন্যপায়ী নারী ও পুরুষের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এখানে : শুক্রাণু, যার ভেতর দিয়ে পুরুষটির জীবন সম্প্রসারিত হয় আরেকজনের মধ্যে, ওই মুহূর্তেই তার কাছে হয়ে ওঠে অচেনা এবং বিচ্ছিন্ন হয় তার শরীর থেকে; তাই পুরুষটি তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সে-মুহূর্তেই ঠিকঠাক ফিরে পায় যখন সে অতিক্রম করে যায় এটির সীমা। ডিমটি, অন্য দিকে, নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে থাকে নারীর শরীর থেকে যখন সেটি পূর্ণ বিকশিত হয়ে থলি থেকে বেরিয়ে এসে পড়ে ডিম্বনালিতে; কিন্তু বাইরের কোনো জননকোষ দিয়ে নিষিক্ত হলে এটা আবার প্রথিত হয়ে সংযোজিত হয় জরায়ুতে। প্রথম ধর্ষিত হয়ে, তারপর বৈরী হয়ে–নারী আংশিকভাবে, হয়ে ওঠে নিজের থেকে ভিন্ন আরেকজন। সে তার পেটের ভেতরে বহন করে ভ্রূণ যে-পর্যন্ত না সেটি পৌঁছে বিকাশের এক বিশেষ পর্যায়ে যা বিভিন্ন প্রজাতিতে বিভিন্ন গিনিপিগ জন্মে প্রায় প্রাপ্তবয়স্করূপে, ক্যাঙ্গারু জন্মে প্রায় ভ্রূণরূপেই। অন্যের ভাড়া খেটে, গর্ভধারণের কাল ভরে যে ফায়দা লোটে তার ওপর, নারী একই সময়ে হয়ে ওঠে নিজে এবং নিজের থেকে ভিন্ন আরেকজন; আর জন্মের পর সে নবজাতককে পান করায় নিজের বুকের দুধ। তাই এটা স্পষ্ট নয় ঠিক কখন এ-নতুন সত্তাটিকে গণ্য করা যেতে পারে স্বায়ত্তশাসিত ব’লে : গর্ভসঞ্চারের মুহূর্তে, জন্মের মুহূর্তে, বুকের দুধ ছাড়ানোর মুহূর্তে? লক্ষণীয় যে নারীটি পৃথক ব্যক্তিসত্তারূপে দেখা দেয় যতোবেশি স্পষ্টভাবে, জীবন তার পার্থক্যের ওপর ততোবেশি কর্তৃত্বের সাথে প্রতিষ্ঠিত করে নিজেকে। মাছ ও পাখি, যারা বিকাশের আগেই নিজেদের ভেতর থেকে বের করে দেয় ভ্রূণ, স্ত্রীলিঙ্গ স্তন্যপায়ীদের থেকে কম দাসত্বে বন্দী থাকে শাবকদের কাছে। যেসময়গুলোতে মুক্ত থাকে মাতৃত্বের দাসত্ব থেকে, তখন স্ত্রীলিঙ্গটি মাঝেমাঝেই সমান হয়ে উঠতে পারে পুংলিঙ্গ জীবটির; অশ্বী অশ্বের মতোই দ্রুতগামী, শিকারী কুকুরীর ঘ্রাণশক্তি পুরুষ কুকরের মতোই তীক্ষ্ণ, বানরীও দেখায় বানরের সমান বুদ্ধিমত্তা। তবে এ-স্বাতন্ত্রেকে দাবি করা হয় না নিজের বলে; প্রজাতির মঙ্গলের জন্যে স্ত্রীলিঙ্গটি ত্যাগ করে এ-দাবি। প্রজাতি তার কাছে দাবি করে এ-ত্যাগস্বীকার।।

পুংলিঙ্গের ভাগ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরবর্তী প্রজন্মের দিকে তার সীমাতিক্রমণের মধ্যে সে নিজেকে দূরে রাখে, এবং নিজের মধ্যে রক্ষা করে নিজের স্বাতন্ত্র। পতঙ্গ থেকে উচ্চতম প্রাণী পর্যন্ত এ-বৈশিষ্ট্যটি স্থির। কামনা ও তৃপ্তির মধ্যে রয়েছে দূরত্ব, পুরুষটি তা কাটিয়ে ওঠে সক্রিয়ভাবে; সে নারীটিকে ঠেলে, খুঁজে বের করে, ছোঁয়, শৃঙ্গার করে, এবং বিদ্ধ করার আগে তাকে ত্যাগ করে। এ-কাজে ব্যবহৃত প্রত্যঙ্গগুলো অধিকাংশ সময়ই নারীর থেকে পুরুষে উৎকৃষ্টতর রূপে বিকশিত হয়েছে। এটা লক্ষ্য করার মতো যে-জীবনপ্রণোদনা উৎপাদন করে বিপুল পরিমাণ শুক্রাণু, তা-ই পুংলিঙ্গে প্রকাশ পায় উজ্জ্বল পালকভারে, দ্যুতিময় আঁশ, শিং, শিংয়ের শাখা, কেশরে, তার কণ্ঠধ্বনিতে, তার প্রাণোচ্ছলতায়। আমরা আর বিশ্বাস করি না যে কামোত্তেজনার সময় পুংলিঙ্গ সাজে যে-’বিয়ের সাজসজ্জায়, সেগুলোর, বা তার প্রলুব্ধকর ঠাটঠমকের আছে কোনো নির্বাচনমূলক তাৎপর্য; তবে এগুলো প্রতীয়মান করে জীবনশক্তি, যা পুংলিঙ্গের মধ্যে উদ্ভিন্ন হয় অপ্রয়োজনীয় ও চমকপ্রদ মহিমায়। এ-জৈবনিক অতিপ্রাচুর্য, যৌনমিলনের উদ্দেশ্যে এসব কর্মকাণ্ড, আর সঙ্গমের সময় স্ত্রীলিঙ্গের ওপর তার ক্ষমতার আধিপত্যশীল দৃঢ় ঘোষণা–এ-সবই পুরুষটির জীবন্ত সীমাতিক্ৰমণতার স্বাধিকার জ্ঞাপন। এ-ক্ষেত্রে হেগেল পুরুষের মধ্যে দেখেছেন যে-আত্মগত উপাদান, তা ঠিকই, আর নারীটি মোড়া থাকে নিজের প্রজাতিতে। আত্মগততা ও পৃথকতা নির্দেশ করে বিরোধ। কামোত্তেজিত পুংলিঙ্গের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আক্রমণাত্মকতা; একে কামসঙ্গী লাভের প্রতিযোগিতা বলে ব্যাখ্যা করা যায় না, কেননা স্ত্রীলিঙ্গের সংখ্যা প্রায় পুংলিঙ্গের সমানই; বরং একে ব্যাখ্যা করতে হবে যুদ্ধ করার ইচ্ছের প্রতিযোগিতা হিশেবে। সঙ্গম একটি দ্রুত কর্ম এবং এতে পুরুষের শক্তি ক্ষয় হয় খুবই কম। সে পিতাসুলভ কোনো সহজাত প্রবর্তনাই দেখায় না অধিকাংশ সময়ই সে সঙ্গমের পরই বর্জন করে স্ত্রীলিঙ্গটিকে। যখন সে কোনো পরিবার সংঘের–একপতিপত্নীক পরিবার, হারেম, বা যূথের প্রধান হিশেবে স্ত্রীলিঙ্গটির কাছে থাকে, সে পালন ও রক্ষা করে সারাটি গোষ্ঠিকেই; খুব কম সময়েই সে কোনো শাবকের প্রতি পোষণ করে বিশেষ আগ্রহ।

যেমন প্রায় সব পশুর ক্ষেত্রে তেমনি মানুষের ক্ষেত্রেও নারীপুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান, পশ্চিমে লৈঙ্গিক অনুপাত হচ্ছে যেখানে ১০৫.৫টি পুরুষ আছে নারী আছে ১০০টি। দুটি লিঙ্গেরই ভ্রূণগত বিকাশ ঘটে একইভাবে; তবে, নারী ভ্রূণে আদিম জীবাণুজাত এপিথেলিয়ম (যা থেকে বিকাশ ঘটে অণ্ডকোষ বা ডিম্বাশয়ের) বেশি সময় ধরে থাকে নিরপেক্ষ, তাই এটি দীর্ঘতর সময় ধরে থাকে হরমোনের প্রভাবে। এর ফলে অনেক সময়ই এর বিকাশ সম্পূর্ণ উল্টে যেতে পারে। এজন্যেই হয়তো অধিকাংশ ছদ্মউভলিঙ্গ জিনের ধাচ-অনুসারে নারী, যারা পরে পুরুষে পরিণত হয়। মনে করতে পারি যে পুংলিঙ্গ সূচনায়ই তার রূপ পরিগ্রহ করে, আর স্ত্রীলিঙ্গ ভ্রূণ তার নারীত্ব গ্রহণ করে বেশ ধীরে; তবে জণজীবনের এ-আদিপ্রপঞ্চ সম্পর্কে আমরা আজো বেশ কমই জানি, তাই নিশ্চিতভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়া যায় না।

হরমোনের রাসায়নিক সূত্র বা শরীরসংস্থান দিয়ে নারীকে সংজ্ঞায়িত করা যাবে না। তার ভূমিকাগত বিকাশই নারীকে বিশেষভাবে পৃথক করে পুরুষ থেকে।

পুরুষের বিকাশ তুলনামূলকভাবে সরল। জন্ম থেকে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত তার বৃদ্ধির প্রায় পুরোটাই নিয়মিত; পনেরো-ষোলো বছর বয়সে শুরু হয় তার শুক্রাণু উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং চলে বুড়ো বয়স পর্যন্ত; এর উদ্ভবের সাথে উৎপাদন শুরু হয় সেহরমোনের, যা গড়ে তোলে তার দেহের পুরুষসূচক বৈশিষ্ট্য। এ-সময় থেকে পুরুষের যৌনজীবন সাধারণত সমম্বিত হয় তার ব্যক্তিক অস্তিত্বের সাথে : কামনায় ও সঙ্গমে প্রজাতির দিকে তার সীমাতিক্ৰমণতা অভিন্ন হয়ে ওঠে তার আত্মগততার সাথে সে হচ্ছে তার শরীর।

নারীর কাহিনী অনেক বেশি জটিল। তার জণজীবনেই সরবরাহ শুরু হয়ে যায় ওসাইট বা অপুষ্ট ডিম্বাণুর, ডিম্বাশয় ধারণ করে প্রায় ৪০,০০০ অপরিণত ডিম। এদের প্রতিটি থাকে একটি করে ফলিকল বা থলিতে, এবং এগুলোর মধ্যে হয়তো ৪০০টি পৌঁছে পরিণতিতে। জন্ম থেকেই প্রজাতিটি কবলিত করে নারীকে এবং তার মুঠো ক্রমশ শক্ত করতে থাকে। ওসাইটগুলো হঠাৎ বৃদ্ধি পায় বলে পৃথিবীতে আসার সময়ই নারী লাভ করে এক ধরনের বয়ঃসন্ধির অভিজ্ঞতা; তারপর এক সময় ডিম্বকোষটি হ্রাস পেয়ে হয়ে ওঠে আগের আকারের পাঁচ ভাগের একভাগ, বলা যায় যেনো স্থগিত করা হয় শিশুটির শাস্তি। যখন বিকাশ ঘটতে থাকে তার শরীরের, তখন তার কামসংশ্রয়টি থাকে প্রায় স্থিতিশীল; কিছু ফলিকল আয়তনে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু পরিণতি লাভ করে না। বালিকার বিকাশ বালকের বিকাশের মতোই; একই বয়সে বালিকা কখনো কখনো বেশি লম্বা থাকে বালকের থেকে এবং তার ওজন হয় বেশি। কিন্তু বয়ঃসন্ধির সময় প্রজাতিটি পুনরায় তোলে তার দাবি। ডিম্বাশয়ের নিঃসরণের প্রভাবে বিকাশমান ফলিকলের সংখ্যা বাড়ে, ডিম্বাশয়টি লাভ করে বেশি রক্ত এবং আকারে বাড়ে, পরিপক্কতা লাভ করে একটি ফলিকল, ঘটে ডিমনিঃসরণ, এবং শুরু হয় ঋতুস্রাবচক্র; কামসংশ্রয় ধারণ করে তার চূড়ান্ত আকার ও গঠন, শরীর ধারণ করে রমণীয় রূপরেখা, এবং প্রতিষ্ঠিত অন্তঃক্ষরণের ভারসাম্য।

এসব সংঘটন রূপ নেয় এক সংকটের। নারীর শরীর প্রতিরোধ ছাড়াই প্রজাতির হাতে নিজের অধিকার তুলে দেয় না, আর এ-যুদ্ধ দুর্বলকর ও ভয়ঙ্কর। বয়ঃসন্ধির আগে ছেলে ও মেয়ের মৃত্যুর হার সমান; চোদ্দো থেকে আঠারো বছর বয়সে যেখানে ১২৮টি মেয়ে মারা যায় সেখানে ছেলে মারা যায় ১০০টি, এবং আঠারো থেকে বাইশ বছর বয়সের মধ্যে যেখানে ১০৫টি মেয়ে মারা যায় সেখানে ছেলে মারা যায় ১০০টি। এ-সময়ে মাঝামাল্পৈলেখা দেয় পাণ্ডুরোগ, যক্ষ্মা, মেরুদণ্ডবক্রতা, অস্থিপ্রদাহ। অনেক ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি ঘটে অস্বাভাবিকভাবে অকালে, চার বা পাঁচ বছর বয়সে। অনেকের বেলা আবার বয়ঃসন্ধি ঘটেই না, তারা থেকে যায় শিশুসুলভ এবং ভোগে ঋতুস্রাবের বিশৃঙ্খলায় (রজঃরোধ বা ঋতুযন্ত্রণায়)। কিছু কিছু নারীর মধ্যে বৃক্কসংলগ্ন গ্রন্থি থেকে অতিরিক্ত রস ক্ষরণের ফলে দেখা দেয় পুরুষসূচকচিহ্ন।

এসব অস্বাভাবিকতা নিজের প্রজাতির ওপর ব্যক্তিসত্তার বিজয় নির্দেশ করে না; মুক্তির কোনো পথ নেই, যেহেতু এটা দাসত্বে বন্দী করে ব্যক্তিকে, তাই প্রজাতিটি একে যুগপৎ সমর্থন ও পরিতোষণ করে। এ-দ্বৈততা প্রকাশ পায় ডিম্বাশয়ের। ক্রিয়াকর্মের স্তরে, যেহেতু নারীর প্রাণশক্তির মূল রয়েছে ডিম্বাশয়ে, যেমন পুরুষের রয়েছে তার অণ্ডকোষে। উভয় লিঙ্গেই খোজা ব্যক্তিসত্তা শুধুমাত্র বন্ধ্যা নয়; সে ভোগে প্রত্যাবৃত্তিতে, সে অধঃপতিত হয়। ঠিকমতো গঠিত না হওয়ার ফলে সম্পূর্ণ জীবটিই হয় নিঃস্ব এবং হয়ে পড়ে ভারসাম্যহীন; এটি বাড়তে ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে শুধু তখনই যদি বাড়ে ও সমৃদ্ধি লাভ করে তার কামপ্রত্যঙ্গসংশ্রয়। আবার অনেক প্রজননগত প্রপঞ্চ তার জীবনের প্রতি নির্বিকার এবং হয়ে উঠতে পারে নানা বিপদের উৎস। স্তনগ্রন্থি, যার বিকাশ শুরু হয় বয়ঃসন্ধির সময়, নারীর ব্যক্তিগত কোনো কাজেই আসে না : জীবনের যে-কোনো সময়ে সেগুলো কেটে ফেলে দেয়া যায়। ডিম্বাশয়ের কিছু নিঃসরণ কাজ করে ডিমের কল্যাণে, সাহায্য করে তার পরিণতি লাভে এবং জরায়ুকে গড়ে তোলে তার চাহিদা অনুসারে; জীবটিকে সব মিলিয়ে ধরলে দেখা যায় এগুলো শৃঙ্খলার বদলে সৃষ্টি করে ভারসাম্যহীনতা–নারী নিজের চাহিদা অনুসারে নিজেকে না গড়ে নিজেকে খাপ খাওয়ায় ডিমের চাহিদার সাথে।

বয়ঃসন্ধি থেকে ঋতুবন্ধ পর্যন্ত নারী হচ্ছে তার ভেতরে অভিনীত এক নাটকের রঙ্গমঞ্চ এবং তার সাথে সে ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট নয়। অ্যাংলো-স্যাক্সনরা ঋতুস্রাবকে বলে অভিশাপ’; সত্যিই ঋতুস্রাবচক্র একটি বোঝা, এবং ব্যক্তিটির দৃষ্টিকোণ থেকে এটা এক নিরর্থক বোঝ। আরিস্ততলের সময়ে বিশ্বাস করা হতো যে প্রত্যেক মাসে রক্তস্রাব ঘটে এ-কারণে যে যদি গর্ভসঞ্চার হয়, তাহলে ওই রক্তে গড়ে উঠবে শিশুর রক্তমাংস; এবং এ-পুরোনো বিশ্বাসের মধ্যে সত্যটা এখানে যে নারী বারবার অঙ্কন করে গর্ভধারণের ভিত্তিমূলের রূপরেখা। নিম্নস্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে গর্ভসঞ্চারচক্র সীমিত থাকে বিশেষ ঋতুতে, এবং এর সাথে কোনো রক্তস্রাব ঘটে না; সর্বোচ্চ শ্রেণীর স্তন্যপায়ীদের (বানর, বনমানুষ, এবং মানবজাতি) ক্ষেত্রেই শুধু প্রতি মাসে কম-বেশি যন্ত্রণার সাথে ঘটে রক্তক্ষরণ। যে- গ্রাফীয় থলি ডিমগুলোকে ঢেকে রাখে, প্রায় চোদ্দো দিনে তার একটি আয়তনে বাড়ে ও পরিপক্ক হয়, এর ফলে নিঃসরণ ঘটে ফোলিকিউলিন (এস্ট্রিন) হরমোনের। ডিম্বনিঃসরণ ঘটে মোটামুটিভাবে চোদ্দো দিনের দিন : একটি থলি ডিম্বাশয়ের ভেতর দিয়ে বাইরে বেরোতে শুরু করে এবং ভেঙে বেরিয়ে যায় (এতে সামান্য রক্তক্ষরণ ঘটে), ডিমটি গিয়ে পড়ে ডিম্বনালিতে; এবং ক্ষতটি পরিণত হয় হলুদ বস্তুতে। হলুদ বস্তুটি নিঃসরণ ঘটাতে শুরু করে প্রোজেসটেরোন হরমোন, যা ঋতুচক্রের দ্বিতীয় পর্বে কাজ করতে থাকে জরায়ুর ওপর। জরায়ুর দেয়াল-আস্তরণ হয়ে ওঠে পুরু ও গ্রন্থিল ও রক্তনালিতে পূর্ণ, একটি নিষিক্ত ডিমকে গ্রহণ করার জন্যে জরায়ুর ভেতর তৈরি করে একটি দোলনা। কোষের এ-বিস্তার যেহেতু উল্টোনো অসম্ভব, তাই ডিম্বনিষিক্তি না ঘটলে এ-সৌধ টিকিয়ে রাখা হয় না। নিম্নস্তরের স্তন্যপায়ীতে এ-আবর্জনা ক্রমশ বেরিয়ে যায়; কিন্তু নারী ও অন্যান্য উচ্চস্তন্যপায়ীতে এ-পুরু দেয়াল-আস্তরণ (এন্ডোমেট্রিয়াম) হঠাৎ ভেঙে পড়ে, খুলে যায় রক্তনালি ও রক্তের এলাকা, এবং রক্তিম বস্তুরাশি রক্তপ্রবাহরূপে চুইয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর যখন প্রত্যাবৃত্ত হয় হলুদ বস্তু, তখন আবার গড়ে ওঠে জরায়ুর আস্তরণের ঝিল্লি এবং শুরু হয় চক্রের আরেক ডিম্বথলীয় পর্ব।

এ-জটিল প্রক্রিয়া, যা আজো তার নানা এলাকায় রহস্যপূর্ণ, চলে নারীর সম্পূর্ণ সত্তাটিকে জড়িয়ে। অধিকাংশ নারী–শতকরা ৮৫জনেরও বেশি–ঋতুস্রাবের সময় ভোগে কম-বেশি যন্ত্রণায়। ঋতুস্রাব শুরুর আগে বাড়ে নারীর রক্তচাপ এবং পরে যায় কমে; বাড়ে ধমনীর স্পন্দন ও মাঝেমাঝে শরীরের তাপ, তাই মাঝেমাঝেই দেখা দেয় জ্বর; তলপেট ব্যথা করে; কখনো কখনো দেখা দেয় কোষ্ঠকাঠিন্য ও তারপর। উদরাময়; মাঝেমাঝে দেখা দেয় যকৃতে প্রদাহ; অনেকের গলা জ্বালা করে ও অনেকে কানে কম শোনে চোখে কম দেখে; ঘাম বাড়ে, এবং রক্তস্রাবের শুরুতে দেখা দেয়। একটা দুর্গন্ধ সুই গেনেরিস, যা খুবই তীব্র এবং থাকতে পারে সারা ঋতুচক্র ভ’রে। বৃদ্ধি পায় মৌলবিপাকের হার। রক্তের লাল কণিকা হ্রাস পায়। আক্রান্ত হয় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, তার ফলে মাথা ধরে মাঝেমাঝেই, বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র স্নায়ুতন্ত্র; কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সাহায্যে অসচেতন নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পায়, দেখা দেয় খেঁচুনিপূর্ণ। প্রতিবর্ত, যার ফলে ঘটে মেজাজের খামখেয়ালিপনা। এ-সময়ে নারী হয় স্বাভাবিকের থেকে বেশি আবেগপরায়ণ, বেশি বিচলিত, বেশি খিটখিটে, এবং তার দেখা দিতে পারে মারাত্মক মানসিক বিকলন। ঋতুস্রাবের সময়ই নারী তার শরীরকে তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে অনুভব করে এক অবোধ্য, বিরোধী জিনিশ হিশেবে; এটা এমন এক একগুঁয়ে ও বাহ্যিক জীবনের শিকার, যে প্রতিমাসে তার ভেতরে তৈরি করে ও ভেঙে ফেলে একটি দোলনা; প্রতিমাসেই সব কিছু প্রস্তুত করা হয় একটি শিশুর জন্যে, তারপর নিঃসরণ করে দেয় রক্তিম ধারায়। নারী, পুরুষের মতোই, নিজের শরীর; তবে তার শরীর তার নিজের থেকে ভিন্ন এক জিনিশ।

নারী অভিজ্ঞতা অর্জন করে আরো গভীর এক বিচ্ছিন্নতাবোধের, যখন ঘটে গর্ভাধান এবং বিশ্লিষ্ট ডিম এসে পড়ে জরায়ুতে ও বিকশিত হতে থাকে। এটা সত্য যে স্বাস্থ্য ভালো থাকলে গর্ভধারণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এটা মায়ের জন্যে ক্ষতিকর নয়; তখন তার ও ভ্রূণের মধ্যে ঘটে কিছু পারস্পরিক ক্রিয়া, যা তার জন্যে বেশ উপকারী। তবে সামাজিক প্রয়োজন থাকলেও গর্ভধারণ অবসাদের কাজ, যা শারীরিকভাবে নারীর ব্যক্তিগত কোনো উপকারে আসে না, বরং তার কাছে দাবি করা হয় বড়ো রকমের ত্যাগস্বীকার। প্রথম মাসগুলোতে মাঝেমাঝেই দেখা দেয় ক্ষুধাহীনতা ও বমনপ্রবণতা, যা কোনো গৃহপালিত স্ত্রীলিঙ্গ পশুতে দেখা যায় না; এটা নির্দেশ করে আক্রমণকারী প্রজাতিরবিরুদ্ধে নারীর বিদ্রোহ। প্রসবের সময় মাঝেমাঝে ঘটে নানা মারাত্মক দুর্ঘটনা বা গর্ভধারণের কালে তার মধ্যে ঘটে নানা বিকলন; আর নারীটি যদি শক্তিশালী না হয়, যদি না নেয়া হয় স্বাস্থ্যগত সাবধানতা, তাহলে বারবার গর্ভধারণের ফলে নারীটি হয়ে ওঠে অকালে বৃদ্ধ, বা ঘটে মৃত্যু, যা গ্রামের দরিদ্র নারীদের ক্ষেত্রে প্রায়ই ঘটে। প্রসবের ব্যাপারটি যন্ত্রণাদায়ক ও ভয়ঙ্কর। এ-সংকটের সময় দেখা যায় যে নারীর শরীরটি সব সময় প্রজাতি ও ব্যক্তি উভয়েরই জন্যে সুবিধাজনক রীতিতে কাজ করে না; নবজাতকের মৃত্যু ঘটতে পারে, এটি জন্ম নিতে গিয়ে হত্যা করতে পারে মাকে বা তার মধ্যে জন্মাতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি। বলা হয়ে থাকে যে নারীর ‘তলপেটে আছে দুর্বলতা’; এবং এটা সত্য যে তাদের অভ্যন্তরে থাকে এক বিরূপ উপাদান–তার মর্মস্থানে প্রজাতির এক ধারাবাহিক দংশন।

পরিশেষে নারী তার প্রজাতির লৌহমুষ্টি থেকে মুক্তি পায় আরেক গুরুতর সংকটের মধ্য দিয়ে : সেটি হচ্ছে ঋতুবন্ধ, বয়ঃসন্ধির যা বিপ্রতীপ, যা দেখা দেয় পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সের মধ্যে। কমতে কমতে থেমে যায় ডিম্বাশয়ের ক্রিয়াকলাপ, যার ফলে হ্রাস পায় নারীটির জীবনশক্তি। দেখা দেয় উত্তেজনার নানা চিহ্ন, যেমন, উচ্চ রক্তচাপ, মুখের হঠাৎ তপ্ত রক্তিমাভা, বিচলন, এবং কখনো কখনো কামাবেগ বৃদ্ধি। অনেক নারীর শরীরে এ-সময় বাড়ে মেদ; অনেকে হয়ে ওঠে পুরুষধর্মী। অনেকের মধ্যে স্থাপিত হয় এক নতুন অন্তঃক্ষরণের ভারসাম্য। নারী এখন মুক্তি পায় তার নারীপ্রকৃতি কর্তৃক তার ওপর চাপিয়ে দেয়া দাসত্ব থেকে, কিন্তু তাকে খোজার সাথে তুলনা করা যায় না, কেননা তার জীবনশক্তি নষ্ট হয়ে যায় নি। তাছাড়াও, সে আর শিকার নয় বিপর্যয়কর শক্তিরাশির; সে হচ্ছে নিজে, সে আর তার শরীর এখন। অভিন্ন। কখনো কখনো বলা হয় যে বিশেষ বয়সে নারী হয়ে ওঠে একটি তৃতীয় লিঙ্গ’; এবং সত্য হচ্ছে এ-সময়ে তারা পুরুষ না হলেও তারা আর নারীও নয়। নারীশারীরবৃত্ত থেকে এ-মুক্তি কখনো কখনো প্রকাশ পায় তার স্বাস্থ্যে, ভারসাম্যে, বলিষ্ঠতায়, যা আগে তার ছিলো না।

প্রধান লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছাড়াও নারীর আছে কতকগুলো অপ্রধান লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য, যা হরমোনের ক্রিয়ার ফলে প্রত্যক্ষভাবে কিছুটা কম-বেশি প্রথমটিরই। পরিণতি। সাধারণত নারী পুরুষের থেকে খাটো ও কম ভারি, তার কঙ্কাল অনেক বেশি ভঙ্গুর, এবং গর্ভধারণ ও প্রসবের প্রয়োজনে শ্রোণীদেশ বৃহত্তর; তার সংযোগী কলাতন্তুরাশি জমায় বেশি মেদ আর তার দেহরেখা পুরুষের থেকে বেশি গোলগাল। সাধারণভাবে আকৃতি গঠন, ত্বক, চুল–দু-লিঙ্গে স্পষ্টভাবে ভিন্ন। নারীর মধ্যে পেশিশক্তি অনেক কম, প্রায় পুরুষের তিন ভাগের দু-ভাগ, ফুসফুল ও শ্বাসনালি ছোটো বলে তার শ্বাসপ্রশ্বাসের শক্তিও কম। তার স্বরযন্ত্র তুলনামূলকভাবে ছোটো, এর ফলে নারীর কণ্ঠস্বর উচ্চ। নারীর রক্তের আপেক্ষিক গুরুত্ব কম এবং তাতে হিমোগ্লোবিন, লাল কণিকা, কম; তাই নারীরা কম বলিষ্ঠ এবং পুরুষের থেকে বেশি ভোগে রক্তাল্পতায়। তাদের ধমনীর স্পন্দন বেশি দ্রুত, তাদের সংবহনতন্ত্র কম সুস্থিত, তাই সহজেই গাল রাঙা হয়ে ওঠে, সাধারণভাবে অস্থিতিশীলতা নারীর সংস্থানের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য। এ-সুস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণের অভাবই রয়েছে নারীর আবেগপরায়ণতার মূলে, যা জড়িয়ে আছে তার রক্তসংবহনের ওঠানামার সাথে–হৎপিণ্ডের কম্পন, গাল রঙ দুওেঠা ইত্যাদি–আর এজন্যেই নারী দেখিয়ে থাকে নানা উত্তেজনা, যেমন অশ্রুপাত, উন্মত্ত হাস্য, এবং নানা স্নায়বিক সংকট।

চারিত্রিক এসব বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলোই উদ্ভূত হয় নিজের প্রজাতির কাছে নারীর অধীনতার কারণে; এবং এখানেই আমরা পাই এ-জরিপের সবচেয়ে চমকপ্রদ উপসংহার : উদাহরণস্বরূপ, নারী সব স্তন্যপায়ী স্ত্রীলিঙ্গের মধ্যে এমন একজন, যে সবচেয়ে গভীরভাবে বিচ্ছিন্ন (তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র বাহ্যিক শক্তির শিকার), এবং যে এবিচ্ছিন্নবোধকে প্রতিরোধ করে সবচেয়ে প্রচণ্ডভাবে; আর কারো মধ্যেই প্রজননের কাছে দাসত্বের ব্যাপারটি এতো বেশি কর্তৃত্বব্যঞ্জক নয় বা আর কেউ এতো অনিচ্ছায় গ্রহণ করে না একে। বয়ঃসন্ধি ও ঋতুবন্ধের সংকট, মাসিক অভিশাপ’, দীর্ঘ ও অনেক সময় কষ্টকর গর্ভধারণ, বেদনাদায়ক ও অনেক সময় ভয়ঙ্কর সন্তানপ্রসব, অসুখ, অপ্রত্যাশিত রোগের লক্ষণ ও জটিলতা–এসব হচ্ছে মানব স্ত্রীলিঙ্গের বৈশিষ্ট্য। তার সাথে তুলনায় পুরুষ পেয়েছে অসীম সুবিধা : ব্যক্তি হিশেবে তার কামজীবন তার অস্তিত্বের বিরোধী নয়, এবং জৈবিকভাবে এর বিকাশ নিয়মিত, এর কোনো সংকট নেই এবং সাধারণত নেই কোনো দুর্ঘটনা। গড়ে নারী বাঁচে পুরুষেরই সমান, বা বেশি; কিন্তু তারা অসুস্থ থাকে বেশি, এবং অনেক সময় তাদের নিজেদের ওপর থাকে না তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ।

এ-জৈবিক ব্যাপারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীর ইতিহাসে এগুলো পালন করে প্রধান ভূমিকা এবং হয়ে ওঠে তার পরিস্থিতির এক অত্যাবশ্যক উপাদান। আমাদের পরবর্তী আলোচনা ভ’রে এগুলোকে আমরা সব সময় মনে রাখবো। কেননা, শরীর যেহেতু বিশ্বকে উপলব্ধি করার জন্যে আমাদের হাতিয়ার, তাই বিশ্বকে এক ধরনে উপলব্ধি করলে যেমন মনে হবে অন্য ধরনে উপলব্ধি করলে মনে হবে খুবই ভিন্ন জিনিশ বলে। এজন্যেই আমরা বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছি জৈবিক সত্যগুলো; এগুলো নারীকে বোঝার অন্যতম চাবি। তবে আমি স্বীকার করি না যে এগুলো তার জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছে এক চিরস্থির ও অবধারিত নিয়তি। কোনো লৈঙ্গিক স্তরক্রম সৃষ্টির জন্যে এগুলো যথেষ্ট নয়; এগুলো ব্যাখ্যা করতে পারে না নারী কেননা অপর; এগুলো নারীকে চিরকালের জন্যে অধীন ভূমিকায় থাকার দণ্ডে দণ্ডিত করে না।

মাঝেমাঝেই মনে করা হয়েছে যে শুধু শরীরসংগঠনেই খুঁজতে হবে এসব প্রশ্নের উত্তর : দু-লিঙ্গেরই কি ব্যক্তিগত সাফল্যের সুযোগ সমান? প্রজাতির মধ্যে কোনটি পালন করে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা? তবে মনে রাখতে হবে যে এসব পার্থক্যের মধ্যে প্রথমগুলো অন্যান্য স্ত্রীলিঙ্গের সাথে তুলনায় অনেক ভিন্ন নারীর বেলা; পশু প্রজাতিতে এগুলো স্থির এবং তাদের চিরস্থিরতার ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়–শুধু পর্যবেক্ষণ সংকলন করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারি অশ্বী অশ্বের সমান দ্রুতগামী কি না, বা বুদ্ধির পরীক্ষায় পুরুষ শিম্পাঞ্জি ছাড়িয়ে যায় কি না তাদের স্ত্রীলিঙ্গদের–কিন্তু মানবপ্রজাতি চিরকাল ধরে আছে পরিবর্তনশীল অবস্থায়, হয়ে উঠছে চিরকাল ধরে।

কিছু বস্তুবাদী পণ্ডিতপ্রবর সমস্যাটি আলোচনা করেছেন বিশুদ্ধ অনড় রীতিতে; মনোদৈহিক সমান্তরলতার তত্ত্ব দিয়ে প্রভাবিত হয়ে তাঁরা পুরুষ ও নারী প্রাণীসত্তার মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন গাণিতিক তুলনা–এবং তাঁরা কল্পনা করেছেন যে এসব পরিমাপ সরাসরিভাবে নির্দেশ করে দুটি লিঙ্গের ভূমিকাগত সামর্থ্য। উদাহরণস্বরূপ, পুরুষ ও নারীর মস্তিষ্কের ধ্রুব ও আপেক্ষিক ওজন সম্পর্কে বিস্তৃত তুচ্ছ আলোচনায় নিয়োজিত থেকেছে এসর ছাত্র–সব কিছু সংশোধনের পর পৌঁচেছে অসিদ্ধান্তমূলক ফলাফলে। তবে যা ঐসব সতর্ক গবেষণার আকর্ষণীয়তা নষ্ট করে, তা হচ্ছে মস্তিষ্কের ওজন ও বুদ্ধিমত্তার মাত্রার মধ্যে কোনো রকম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় নি। এবং পুরুষ ও নারী হরমোনের রাসায়নিক সূত্রের মানসিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়েও একই রকমে হতবুদ্ধি হতে হয়।

এ-পর্যেষণায় আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করি মনোদৈহিক সমান্তরলতার ধারণা, কেননা এটা এমন এক মতাদর্শ যার ভিত্তিমূলকে দীর্ঘকাল ধরে পুরোপুরিভাবে ধসিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি যে আদৌ এর উল্লেখ করছি, তার কারণ হচ্ছে এর দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক দেউলেত্ব সত্ত্বেও আজো অনেকের মনে এটা প্রেতের মতো আনাগোনা করে। আমি সে-সব তুলনামূলক সংশ্রয়কেও প্রত্যাখ্যান করি, যেগুলো ধরে নেয় যে মূল্যবোধের আছে একটা প্রাকৃতিক স্তরক্ৰম বা মানদণ্ড–যেমন, একটা বিবর্তনমূলক স্তরক্রম। নারীশরীর কি পুরুষের শরীরের থেকে অধিকতর বালধর্মী বা বালধর্মী নয়, এটা কি কম-বেশি বানরের দেহের সদৃশ ইত্যাদি জিজ্ঞেস করা নিরর্থক এসব নিবন্ধ, যেগুলো একটা অস্পষ্ট প্রাকৃতবাদকে মিশ্রিত করে আরো অস্পষ্ট কোনো নীতিশাস্ত্র বা নন্দনতত্ত্বের সাথে, সেগুলো খাঁটি শব্দবাচালতা মাত্র। মানবপ্রজাতির নারী ও পুরুষের মধ্যে আমরা তুলনা করতে পারি শুধু মানবিক পরিপ্রেক্ষিতে। তবে পুরুষের সংজ্ঞা দেয়া হয় এমন একজনরূপে, যে চিরস্থির নয়, সে তা যা সে সৃষ্টি করে নিজেকে। মারলিউ-পোন্তি যথার্থই বলেছেন যে মানুষ কোনো প্রাকৃতিক প্রজাতি নয় : সে একটি ঐতিহাসিক ধারণা। নারী কোনো পরিসমাপ্ত বাস্তবতা নয়, বরং সে এক হয়ে ওঠা, এবং তার হয়ে ওঠার সাথেই তুলনা করতে হবে পুরুষকে; অর্থাৎ সংজ্ঞায়িত করতে হবে তার সম্ভাবনারাশিকে।

তবু এটা বলা হবে যে শরীর যদি কোনো বস্তু নাও হয়, তবে এটা একটি পরিস্থিতি, আমি আলোচনায় নিয়েছি এ-দৃষ্টিভঙ্গিই–হাইডেগার, সাত্র, ও মারলিউপোন্তির দৃষ্টিভঙ্গি : এটা বিশ্বের ওপর আমাদের অধিকার বিস্তারের হাতিয়ার, আমাদের প্রকল্পের জন্যে এটা একটি সীমাবদ্ধকর উপাদান। নারী পুরুষের থেকে দুর্বল, তার পেশিশক্তি কম, তার লাল রক্তকণা কম, ফুসফুসের শক্তি কম, সে। দৌড়োয় পুরুষের থেকে ধীরে, তুলতে পারে কম ওজন, পুরুষের সাথে কোনো খেলায়ই পেরে ওঠে না; সে পুরুষের সাথে মারামারিতে পারে না। এসব দুর্বলতার সাথে যোগ করতে হবে তার অস্থিতিশীলতাকে, তার নিয়ন্ত্রণের অশক্তি, এবং তার ভঙ্গুরতা : এগুলো সত্য। পৃথিবীর ওপর তার অধিকার তাই সীমিত; কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যে তার দৃঢ়তা কম ও স্থিরতা কম, তাই সাধারণত সে ওগুলো বাস্তবায়নের জন্যে কম সামর্থ্যসম্পন্ন। অন্যভাবে বলা যায় যে পুরুষের তুলনায় তার ব্যক্তিজীবন কম ঐশ্বর্যপূর্ণ।

নিশ্চয়ই এসব সত্য অস্বীকার করা যায় না–তবে এগুলোর নেই কোনো বিশেষ তাৎপর্য। একবার যদি আমরা গ্রহণ করি মানবিক পরিপ্রেক্ষিত, শরীরকে ব্যাখ্যা করি অস্তিত্বের ভিত্তিতে, তাহলে জীববিজ্ঞান হয়ে ওঠে এক বিমূর্ত বিজ্ঞান; যখন। শারীরবৃত্তিক তথ্য (উদাহরণস্বরূপ, পেশীয় নিকৃষ্টতা) অর্থ গ্রহণ করে, তখন এ-অর্থকে দেখা হয় সম্পূর্ণ পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল বলে; এ-দুর্বলতা প্রকাশ পায় শুধু পুরুষ কোন লক্ষ্য নিশে করছে, তার আছে কী কী হাতিয়ার, এবং সে কী বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করছে, তার আলোকে। যদি সে বিশ্বকে অধিকার করতে না চায়, তাহলে বস্তুর ওপর অধিকারের ধারণার কোনো তাৎপর্য থাকে না; এ-অধিকারের কাজে যখন নূ্যনতম বলের থেকে বেশি শারীরিক বলের সম্পূর্ণ প্রয়োগ দরকার হয় না, তখন বলের পার্থক্যগুলো বাতিল হয়ে যায়; যেখানে হিংস্রতা রীতিবিরোধী, সেখানে পেশিশক্তি আধিপত্যের ভিত্তি হতে পারে না। সংক্ষেপে দুর্বলতার ধারণাটিকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে শুধু অস্তিত্ব, অর্থনীতি ও নৈতিক বিবেচনা অনুসারে। বলা হয়েছে যে মানবপ্রজাতিটি অ-প্রাকৃতিক, এটা ঠিক মন্তব্য নয়, কেননা মানুষ সত্য অস্বীকার করতে পারে না; তবে সে যেভাবে তাদের সাথে আচরণ করে সে-অনুসারেই প্রতিষ্ঠা করে তাদের সত্য : তার কাজের মধ্যে প্রকৃতি যতোখানি জড়িত প্রকৃতি তার কাছে ততোখানি বাস্তব–বাদ দেয়া হচ্ছে না এমনকি তার নিজের প্রকৃতিকেও। নিজের প্রজাতির কাছে নারীর দাসত্ব কম-বেশি প্রচণ্ড, সেটা ঘটে সমাজ তার কাছে কতোগুলো সন্তানপ্রসব চায়, সে-অনুসারে। উচ্চস্তরের পশুদের বেলা এটা সত্য যে ব্যক্তিগত অস্তিত্বের ব্যাপারটি স্ত্রীলিঙ্গের থেকে পুংলিঙ্গের পশুটিই জ্ঞাপন করে প্রবলতরভাবে, কিন্তু মানবপ্রজাতিতে ব্যক্তির সম্ভাবনা নির্ভর করে আর্থনীতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর।

আবার এখানে মানবিক পরিস্থিতিকে অন্য কোনো পরিস্থিতিতে পর্যবসিত করা যাবে না; প্রথমত মানুষদের একক ব্যক্তিসত্তারূপে সংজ্ঞায়িত করা যাবে না; পুরুষেরা ও নারীরা কখনো পরস্পরের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হয় নি; যুগলটি হচ্ছে এক আদি মিটজাইন, এক মৌল সমবায়; এবং কোনো বৃহৎ যৌথতায় এটা সব সময়ই দেখা দিয়েছে একটি স্থায়ী বা অস্থায়ী উপাদানরূপে।

এমন এক সমাজে প্রজাতির কাছে কোনটি বেশি দরকারি, পুরুষ না নারী? জননকোষের স্তরে, সঙ্গম ও গর্ভধারণের জৈবিক ভূমিকার স্তরে, আমরা যেমন দেখেছি পুরুষনীতি রক্ষণের জন্যে সৃষ্টি করে, নারীনীতি সৃষ্টির জন্যে রক্ষণ করে; তবে সামাজিক জীবনের বিভিন্ন রূপে এ-শ্রমবিভাজনের বিচিত্র বৈশিষ্ট্য কী? এ-সহযোগিতা চূড়ান্তভাবে অপরিহার্য হয়ে ওঠে সে-প্রজাতিতে, যাতে শাবকেরা দুধ ছাড়ার পর দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে অসমর্থ;  এখানে পুরুষটির সহায়তা হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা যে-সব জীবন সে জন্ম দিয়েছে, তাকে ছাড়া সে-সব জীবন রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় না। একটি পুরুষ প্রতিবছর গর্ভবতী করতে পারে অনেকগুলো নারীকে; তবে সন্তানদের জন্মের পর তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্যে, শক্রদের থেকে তাদের রক্ষা করার জন্যে, তাদের চাহিদা মেটানোর জন্যে প্রকৃতি থেকে সামর্থ্য ছিনিয়ে আনার জন্যে প্রতিটি নারীর দরকার পড়ে একটি পুরুষ।

এভাবে জীববিজ্ঞানের সত্যগুলো আমাদের দেখতে হবে অস্তিত্বের স্বরূপগত, আর্থনীতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবেশের আলোকে। প্রজাতির কাছে নারীকে দাসত্বে বন্দী করা আর ভারসক্তির নানা রকম সীমাবদ্ধতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য; নারীর শরীর পৃথিবীতে তার পরিস্থিতির মধ্যে একটি অত্যাবশ্যক উপাদান। তবে তাকে নারী হিশেবে সজ্ঞায়িত করার জন্যে তার শরীরই যথেষ্ট নয়; একজন সচেতন ব্যক্তি তার নিজের কাজের ভেতর দিয়ে যা প্রকাশ করে, তা ছাড়া আর কোনো সত্যিকার জীবন্ত বাস্তবতা নেই। আমাদের সামনে যে-প্রশ্নটি : নারী কেনো অপর?, তার উত্তর দেয়ার জন্যে জীববিজ্ঞান যথেষ্ট নয়। আমাদের দায়িত্ব কীভাবে। ইতিহাসব্যাপী নিয়ন্ত্রিত হয়েছে নারীর প্রকৃতি, তা আবিষ্কার করা; আমাদের খুঁজে বের করার বিষয় হচ্ছে মানবজাতি কী করে তুলেছে নারীকে।

মনোবিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ

মনোবিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ
প্রথম খণ্ড । ভাগ ১ – নিয়তি । পরিচ্ছেদ ২

মনোদেহতত্ত্বের থেকে মনোবিশ্লেষণ যে প্রচণ্ড অগ্রগতি লাভ করেছে তা এ-দৃষ্টিতে যে মানবিক তাৎপর্য গ্রহণ না করে কোনো কারণই মানসিক জীবনে জড়িত হয় না; জীববিজ্ঞানীরা যে-দেহ-বস্তু বর্ণনা করেন, তা যে আসলেই অস্তিত্বশীল, এমন নয়, আছে সেই দেহটি বিষয়ী যা যাপন করে। নারী ততোখানি নারী যতোখানি সে নিজেকে নারী মনে করে। তার আছে জৈবিকভাবে অত্যাবশ্যক বৈশিষ্ট্য, তবে সেগুলো তার সত্য, অভিজ্ঞ পরিস্থিতির অংশ নয় : তাই এতে প্রতিফলিত হয় না ডিমের গঠন, বরং জৈবিকভাবে বিশেষ গুরুতপূর্ণ নয় এমন একটি প্র্ত্যঙ্গ, যেমন ভগাঙ্কুর, এতে পালন করে প্রধান পর্যায়ের ভূমিকা। প্রকৃতি নারীকে সংজ্ঞায়িত করে না; তার আবেগগত জীবনে প্রকৃতির সাথে নিজের মতো করে কাজ করতে গিয়ে সে নিজেই সংজ্ঞায়িত করে নিজেকে।

এ-পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠেছে একটি সম্পূর্ণ সংশ্রয়, যার পুরোটাকে আমি সমালোচনা করতে চাই না, শুধু দেখতে চাই নারীবিশ্লেষণে এর অবদানটুকু। মনোবিশ্লেষণবিদ্যাকে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা সহজ কাজ নয়। সব ধর্মের মতোই–যেমন খ্রিস্টধর্ম বা মার্কবাদ–কিছু অনড় ধারণার ভিত্তির ওপর এটা প্রদর্শন করে থাকে এক বিব্রতকর নমনীয়তা। বহু শব্দ অনেক সময় ব্যবহৃত হয় চরম আক্ষরিক অর্থে, যেমন ফ্যালাস (শিশ্ন) শব্দটি বুঝিয়ে থাকে মাংসের সে-উত্থান, যা নির্দেশ করে পুরুষকে; তারপর এগুলোকে সম্প্রসারিত করা হয় সীমাহীনভাবে এবং দেয়া হয়। প্রতীকী অর্থ, তাই শিশ্ন এখন বুঝিয়ে থাকে পৌরুষ ও তার পরিস্থিতি। যদি আপনি এ-মতবাদকে আক্রমণ করেন, তাহলে মনোবিশ্লেষক প্রতিবাদ করেন যে আপনি ভুল বুঝেছেন এর মূলচেতনাকে; আর আপনি যদি প্রশংসা করেন এর মূলচেতনার, তাহলে তিনি তৎক্ষণাৎ আপনাকে বন্দী করতে চান ওই মতবাদে। মতবাদের কোনো গুরুত্ব নেই, কেউ কেউ বলেন, মনোবিশ্লেণ হচ্ছে একটি পদ্ধতি; কিন্তু পদ্ধতির সাফল্য মতবাদীর বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করে তোলে। সব সত্ত্বেও কোথায় পাওয়া যাবে মনোবিশ্লেষণের প্রকৃত মুখাবয়ব যদি না পাওয়া যায় মনোবিশ্লেষকদের মধ্যে? কিন্তু এঁদের মধ্যেও আছেন বিরুদ্ধ মতাবলম্বী, যেমন আছেন খ্রিস্টধর্মাবলম্বী ও মার্ক্সবাদীদের মধ্যে; এবং একাধিক মনোবিশ্লেষক ঘোষণা করেছেন মনোবিশ্লেষণের নিকৃষ্টতম শত্রু হচ্ছে মনোবিশ্লেষকেরা। মধ্যযুগীয় বিদ্যাধর্মীয় যথাযথতা সত্ত্বেও যা প্রায়ই হয়ে ওঠে পণ্ডিতিসুলভ, রয়ে যায় বহু অস্পষ্টতা, যেগুলো দূর করা দরকার। সার্ত্র ও মারলিউ-পোন্তি যেমন লক্ষ্য করেছেন যে যৌনতা অস্তিত্বের সাথে সমবিস্তৃত, এ-প্রস্তাবটিকে দুটি অত্যন্ত ভিন্ন উপায়ে বোঝা সম্ভব; এটা বোঝাতে পারে যে অস্তিত্বশীলের প্রতিটি অভিজ্ঞতারই রয়েছে একটি যৌন তাৎপর্য, বা প্রতিটি যৌন প্রপঞ্চেরই আছে একটি আস্তিত্বিক তাৎপর্য। এ-দুটি বিবৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব, তবে প্রায়ই আমরা একটি থেকে পিছলে গিয়ে পড়ি আরেকটিতে। এছাড়াও, যখনই যৌনকে ভিন্ন করা হয় যৌনাঙ্গীয় থেকে, তখনই যৌনতার ধারণাটি হয়ে ওঠে খুবই অস্পষ্ট।

ফ্রয়েড নারীর নিয়তির প্রতি কখনো বেশি আগ্রহ দেখান নি; তিনি পুরুষের নিয়তি সম্পর্কে তার বিশ্লেষণকে সামান্য সংশোধন করে খাপ খাইয়ে দিয়েছেন নারীর নিয়তির সাথে। এর আগে যৌনবিজ্ঞানী মারানো বলেছিলেন যে বিশেষ শক্তি হিশেবে, আমরা বলতে পারি লিবিডো পুরুষধর্মী শক্তি। আমরা পুলক সম্পর্কেও একথাই বলবো। তাঁর মতে, যে-সব নারী পুলক অনুভব করে, তারা পুরুষধর্মী নারী; কামপ্রণোদনা একমুখি আর নারী এগিয়েছে এর মাত্র অর্ধেক পথে। ফ্রয়েড কখনো এতোটা চরমে যান নি; তিনি স্বীকার করেন যে পুরুষের মতো নারীর কামও পুরোপুরি বিকশিত; তবে তিনি বিশেষভাবে এ নিয়ে কাজ করেনি। তিনি লিখেছেন : সারসত্তায় লিবিডো অবিরত ও নিয়মিতভাবে পুরুষ, তা পুরুষের মধ্যেই দেখা যাক বা দেখা যাক নারীর মধ্যে। তিনি স্বীকার করেন না যে নারী-লিবিডোর আছে নিজস্ব মৌলিক স্বভাব, তাই তাঁর কাছে একে মনে হবে সাধারণ মানবলিবিডোর এক জটিল বিকৃতি বলে। তার মতে এটা শুরুতে দু-লিঙ্গে অভিন্নভাবে বিকশিত হয়। প্রতিটি শিশু প্রথমে যায় মুখগহ্বর পর্বের ভেতর দিয়ে, যা তাকে নিবদ্ধ করে মায়ের স্তনের প্রতি, এবং তারপর যায় পায়ু পর্বের ভেতর দিয়ে; পরিশেষে পৌঁছে কামপ্রত্যঙ্গ পর্বে, যখন ভিন্ন হয়ে ওঠে দুটি লিঙ্গ।

ফ্রয়েড এছাড়াও প্রকাশ করেছেন একটি তথ্য, যার গুরুত্ব এখনো ভালোভাবে অনুধাবন করা হয় নি : সেটা হচ্ছে পুরুষের কাম যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে স্থিত শিশ্নে, সেখানে নারীর রয়েছে দুটি সুস্পষ্ট পৃথক কামসংশ্রয় : একটি ভগাঙ্কুরীয়, যা বিকশিত হয় শৈশবে, আরেকটি যোনীয়, যার বিকাশ ঘটে বয়ঃসন্ধির পর। কোনো ছেলে যখন পৌঁছে তার কামপ্রত্যঙ্গ পর্বে, তখন সম্পূর্ণ হয় তার বিকাশ; তবে তাকে পেরিয়ে যেতে হয় তার স্বতঃকামী প্রবণতা, যাতে সুখ আত্মগত, থেকে বিষমকামী প্রবণতার দিকে, যাতে সুখ জড়িত হয় অন্য কোনো বস্তুর সাথে, যা সাধারণত নারী। বয়ঃসন্ধির কালে একটি আত্মপ্রেমমূলক পর্বের ভেতর দিয়ে ঘটে এ-উত্তরণ। কিন্তু শিশ্ন থাকে, যেমন শৈশবে ছিলো, কামের সুনির্দিষ্ট প্রত্যঙ্গ। নারীর লিবিডোও আত্মপ্রেমমূলক একটি পর্ব পেরিয়ে এগোয় বস্তুর দিকে, সাধারণত পুরুষের দিকে; তবে এ-প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি জটিল, কেননা নারীকে ভগাঙ্কুরীয় সুখ থেকে পৌঁছোতে হয় যোনীয় সুখের দিকে। পুরুষের আছে মাত্র একটি কামপ্রত্যঙ্গ পর্ব, কিন্তু নারীর আছে দুটি; তার একটি বড়ো ঝুঁকি আছে যে সে তার কামবিকাশের শেষ পর্যায়ে নাও পৌঁছোতে পারে, থেকে যেতে পারে শিশুপর্বে, এবং তার মধ্যে দেখা দিতে পারে মনোবিকলন।

স্বতঃকামী পর্বে থাকা অবস্থায় শিশু কমবেশি জড়িত হয় কোনো বস্তুর সাথে। বালক জড়িত হয় তার মায়ের সাথে এবং নিজেকে অভিন্ন করে তুলতে চায় পিতার সাথে; এ-ধৃষ্টতা তাকে ভীত করে, সে ভয় পেতে থাকে যে শাস্তি হিশেবে পিতা। হয়তো তার অঙ্গচ্ছেদ করবে। এভাবে ইডিপাসগূঢ়ৈষা থেকে তার মধ্যে দেখা দেয়। খোজাগূঢ়ৈষা। পিতার প্রতি বাড়ে তার হিংস্রতা, তবে একই সময়ে বালক আত্মস্থ করে নেয় পিতার কর্তৃত্ব; এভাবে বালকের মধ্যে গড়ে ওঠে সুপার ইগো, অধি অহং, যা দমন করে তার অজাচারী প্রবণতা। এগুলো দমিত হয়, গূঢ়ৈষাটি ধ্বংস হয়, এবং পুত্র মুক্তি পায় পিতার ভীতি থেকে। এ-সময় সে নৈতিক উপদেশের সাহায্যে মনের মধ্যে অধিষ্ঠিত করে পিতাকে। সুপার ইগো অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, কেননা ইডিপাসগূঢ়ৈষাকে প্রতিরোধ করা হয় কঠোরভাবে।

ফ্রয়েড প্রথমে বালিকার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন পুরোপুরি একইভাবে, পরে বিকাশের এ-নারীরূপের নাম দিয়েছেন তিনি ইলেক্টাঢ়ৈষা; তবে এটা স্পষ্ট যে তিনি একে এর নিজের ওপর ভিত্তি করে সংজ্ঞায়িত করার বদলে বর্ণনা করেছেন পুংলিঙ্গের বিন্যাসের অনুকরণে। তিনি এ-দুয়ের মধ্যে আবিষ্কার করেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য : বালিকা প্রথমে বোধ করে মায়ের প্রতি সংবন্ধন, কিন্তু বালক কখনোই তার পিতার প্রতি কামানুরাগ বোধ করে না। বালিকার এ সবন্ধন নির্দেশ করে যে তার ভেতরে টিকে আছে মুখ-পর্ব। তারপর বালিকা পিতার সাথে অভিন্ন ভাবতে শুরু করে নিজেকে; তবে পাঁচ বছর বয়সের দিকে সে আবিষ্কার করে দু-লিঙ্গের দেহসংস্থানের পার্থক্য; তার শিশ্ন নেই বলে সে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, এবং অর্জন করে খোজাগূঢ়ৈষাসে কল্পনা করতে থাকে যে তার অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছে, এবং এ-ভাবনা তাকে পীড়িত করতে থাকে। তখন সে পুরুষসুলভ অভিমান ছেড়ে দিয়ে মায়ের সঙ্গে অভিন্ন করে তোলে নিজেকে এবং কামে প্রলুব্ধ করতে চায় পিতাকে। এভাবে খোজাগূঢ়ৈষা ও ইলেক্টাগূঢ়ৈষা পরস্পরকে করে শক্তিশালী। তার হতাশার অনুভূতি হয় তীব্র, কেননা পিতাকে ভালোবেসে বৃথাই সে চায় পিতার মতো হতে; আবার, তার মনস্তাপ বাড়িয়ে তোলে তার প্রেম, কেননা পিতার ভেতরে জাগিয়ে তোলা প্রীতির সাহায্যেই শুধু সে ক্ষতিপূরণ করতে পারে নিজের নিকৃষ্টতার। ছোটো বালিকা তার মায়ের প্রতি পোষণ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈরিতার বোধ। তারপর তার মধ্যেও গড়ে ওঠে সুপার ইগো, দমিত হয় অজাচারী প্রবণতাগুলো; তবে তার সুপার ইগো বেশি শক্তিশালী নয়। তার কামপ্রত্যঙ্গগুলোর বিকাশের মতোই বালিকার সম্পূর্ণ কামনাট্যটি তার ভাইদের থেকে অনেক বেশি জটিল। এর পরিণতিতে সে বিরূপ হয়ে উঠতে পারে খোজাগূঢ়ৈষার প্রতি এবং অস্বীকার করতে পারে তার নারী, ধারাবাহিকভাবে কামনা করতে পারে একটি শিশ্ন, নিজেকে অভিন্ন বোধ করতে পারে পিতার সাথে। এ-প্রবণতা তাকে রেখে দেয় ভগাঙ্কুরীয় পর্বে, তাকে করে তোলে কামশীতল, বা লিপ্ত করতে পারে সমকামে।

এ-দৃষ্টিকোণের বিরুদ্ধে যে-দুটি অত্যাবশ্যক আপত্তি তোলা যেতে পারে, তার উৎস হচ্ছে এ-ঘটনা যে ফ্রয়েড একে দাঁড় করিয়েছেন এক পুরুষভিত্তিক কাঠামোর ওপর। তিনি ধরে নিয়েছেন যে নারী অনুভব করে সে একটি অঙ্গচ্ছেদ-করা পুরুষ। তবে অঙ্গচ্ছেদের ধারণাটি জ্ঞাপন করে তুলনা ও মূল্যায়ন। অনেক মনোবিশ্লেষক। আজকাল স্বীকার করেন যে অনেক মেয়ে শিশ্ন নেই বলে মনস্তাপে ভুগতে পারে, তবে তারা বিশ্বাস করে না শিশ্নটি কেটে নেয়া হয়েছে তাদের শরীর থেকে; আবার এমনস্তাপও সকলের নয়। একটা সরল দেহসংস্থানগত তুলনা থেকে এর উৎপত্তি ঘটতে পারে না; আসলে বহু বালিকাই অনেক দেরিতে আবিষ্কার করে পুরুষের দেহসংগঠন। ছোটো ছেলে তার শিশ্ন দিয়ে অর্জন করে জীবন্ত অভিজ্ঞতা, এটা তার কাছে হয়ে ওঠে গর্বের বস্তু; তবে এ-গর্ব বোঝায় না যে তার বোনেরা এতে বোধ করে অপমান, কেননা তারা পুরুষাঙ্গটিকে চেনে শুধু তার বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে–এ-উপবৃদ্ধি, মাংসের এই ছোটো দণ্ডটি শুধু তাদের মনে জাগাতে পারে ঔদাসীন্য, এমনকি ঘেন্না। বালিকার লালসা, যখন থাকে, জন্ম নেয় পৌরুষের এক পূর্ববর্তী মল্যায়ন থেকে। ফ্রয়েড একে ধরে নিয়েছেন স্বতঃসিদ্ধ বলে। অন্যদিকে, ইলেক্টাগূঢ়ৈষা ধারণাটি খুবই অস্পষ্ট, কেননা নারী লিবিডোর কোনো প্রাথমিক বর্ণনা দিয়ে এটাকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন নি। এমনকি ছেলেদের মধ্যেও সুস্পষ্ট কোনো কামপ্রত্যঙ্গগত ইডিপাসগূঢ়ৈষা সাধারণ ঘটনা নয়; আর কিছু ব্যতিক্রম বাদে একথা বলা যায় না যে ব্ৰিহাই হচ্ছে শিশুকন্যার কামোত্তেজনার উৎস। নারীকামের একটি বড়ো সমস্যা হচ্ছে যে ভগাঙ্কুরীয় সুখ সীমাবদ্ধ বিশেষ স্থানে; আর বয়ঃসন্ধির কাছাকাছি সময়েই শুধু যোনীয় অনুভূতির সাথে শরীরের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিতে থাকে কয়েকটি কামোত্তেজক এলাকা। তাই দশ বছর বয়সের কন্যাকে পিতা চুমো খেলে ও আদর করলে তার ভেতর জেগে ওঠে ভগাঙ্কুরীয় সুখ, এটা হচ্ছে বাজে কথা। পিতার সার্বভৌমত্বের ব্যাপারটি উদ্ভূত হয়েছে সমাজ থেকে, যা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন ফ্রয়েড।

অ্যাডলার বিতর্কে লিপ্ত হন ফ্রয়েডের সাথে, কেননা তিনি তত্ত্বটির সীমাবদ্ধতা দেখতে পান এখানে যে এটি মানুষের জীবন ব্যাখ্যা করতে চায় শুধু কাম ভিত্তি করে; তিনি মনে করেন কামকে সমন্বিত করতে হবে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্বের সাথে। ফ্রয়েডের কাছে মানুষের সমস্ত আচরণই তার কামনাবাসনার ফল–অর্থাৎ সুখান্বেষণের ফল–কিন্তু অ্যাডলারের কাছে মানুষের আছে কিছু লক্ষ্য; যৌন কামনার বদলে তিনি দেখতে পান অভিপ্রায়, উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা। তিনি বুদ্ধিমত্তাকে এতো বড়ো জায়গা দেন যে তার চোখে কাম লাভ করে শুধু একটা প্রতীকী মূল্য। তার মতে মানবনাট্যকে সংহত করে আনা যায় তিনটি মৌল উপাদানে : প্রতিটি ব্যক্তির রয়েছে ক্ষমতার ঈপ্সা, যার সঙ্গে থাকে এক হীনম্মন্যতা গূঢ়ৈষা, এর ফলে যে-বিরোধ বাধে তাতে বাস্তবতা থেকে পলায়নের জন্যে ব্যক্তিটিকে প্রয়োগ করতে হয় হাজারো কৃটচাল। নারীর মধ্যে হীনম্মন্যতা গূঢ়ৈষা এমন রূপ নেয় যে লজ্জায় সে প্রত্যাখ্যান করে তার নারীত্ব। শিশ্নের অভাবে ঘটে না এ-গূঢ়ৈষা, ঘটে নারীর সমগ্র পরিস্থিতির ফলে; বালিকা যদি শিশ্নের প্রতি ঈর্ষা বোধ করে, তাহলে সে এটিকে ঈর্ষা করে বালকদের লাভ করা সুযোগসুবিধার প্রতীক হিশেবে। পরিবারে পিতা অধিকার করে থাকে যে-স্থান, পুরুষদের সর্বজনীন আধিপত্য, তার নিজের শিক্ষা–সব কিছু তার মনে সৃষ্টি করে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের বোধ। পরে, সে যখন অংশ নেয় যৌন সম্পর্কে, সঙ্গমের আসনের মধ্যে সে দেখতে পায় এক নতুন অবমাননা যে নারী শোয় পুরুষের নিচে। সে প্রতিক্রিয়া জানায় পুরুষালি প্রতিবাদ-এর সাহায্যে : হয়তো সে নিজেকেই পুরুষায়িত করে তুলতে চায়, বা সে তার নারীসুলভ অস্ত্রগুলো দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে পুরুষের বিরুদ্ধে। মাতৃত্বে সে তার সন্তানের মধ্যে পায় একটা কিছু, যা শিশ্নের সমতুল্য। কিন্তু এটা স্বীকার করতে হলে ধরে নিতে হয় যে নারী হিশেবে সে সম্পূর্ণরূপে মেনে নিয়েছে তার ভূমিকা; এবং স্বীকার করে নিয়েছে নিজের নিকৃষ্টতা। পুরুষের তুলনায় সে অনেক গভীরভাবে নিজের বিরুদ্ধে বিভক্ত।

যে-তাত্ত্বিক ভিন্নতা পার্থক্য নির্দেশ করে অ্যাডলার ও ফ্রয়েডের মধ্যে, এখানে আমি সে-সম্পর্কে আর বিস্তৃত আলোচনায় যাবো না, তাঁদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের সম্ভবপরতাগুলোও আলোচনা করবো না; তবে একথা বলা যেতে পারে যে যৌন কামনাভিত্তিক ব্যাখ্যা আর অভিপ্রায়ভিত্তিক ব্যাখ্যার কোনোটিই যথেষ্ট নয়, কেননা প্রতিটি কামনাই নির্দেশ করে কোনো অভিপ্রায়, কিন্তু কামনার মধ্য দিয়েই বোঝা সম্ভব অভিপ্রায়কে–তাই অ্যাডলারীয়বাদ ও ফ্রয়েডীয়বাদের একটা সমন্বয় সম্ভবত সম্ভব। সব মনোবিশ্লেষকই সাধারণভাবে গ্রহণ করে থাকেন যে-স্বতঃসিদ্ধ প্রস্তাবটি, সেটি হচ্ছে : কিছু নির্ধারিত উপাদানের পারস্পরিক ক্রিয়ার সাহায্যেই ব্যাখ্যা করতে হবে মানবোপাখ্যান। এবং সব মনোবিশ্লেষকই নারীর জন্যে নির্দিষ্ট করে একই ভাগ্য। তার নাটক রূপায়িত হয় তার পুরুষধর্মী ও নারীসুলভ প্রবণতার সংঘাতের মধ্য দিয়ে, প্রথমটি প্রকাশ পায় ভগাঙ্কুরীয় সংশ্রয়ে, দ্বিতীয়টি যোনীয় কামে। শৈশবে সে নিজেকে অভিন্ন করে তোলে পিতার সঙ্গে; তারপর পুরুষের তুলনায় বোধ করে এক ধরনের হীনম্মন্যতা এবং মুখোমুখি হয় এক উভয়-সংকটের : তাকে জ্ঞাপন করতে হয় তার স্বাধীনতা এবং হয়ে উঠতে হয় পুরুষধর্মী; এটা তার হীনম্মন্যতা গূঢ়ৈষার সঙ্গে মিলেমিশে তার মধ্যে তৈরি করে স্নায়ুবিক চাপ, ফলে দেখা দেয় বিকলন, অথবা তাকে প্রণয়াকুল অধীনতার মধ্যে লাভ করতে হয় সুখী পরিপূর্ণতা। এ-সমাধান সহজ হয়ে ওঠে সার্বভৌম পিতার প্রতি তার ভালোবাসার ফলে। প্রেমিক বা স্বামীর মধ্যে সে খোঁজে পিতাকেই, তাই তার যৌন প্রেম মিলেমিশে যায় তার পরাধীন হওয়ার বাসনার সাথে। মাতৃত্বে সে লাভ করে এর ক্ষতিপূরণ, কেননা এটা তাকে দেয় এক নতুন ধরনের স্বাধীনতা। এ-নাটক যেনো ধারণ করে নিজের এক ধরনের শক্তি, এক ধরনের গতিশীলতা; প্রতিটি ও সমস্ত বিকৃতিসাধক ঘটনার মধ্য দিয়ে এটা ধীরভাবে এগোয় নিজের যাত্রাপথে, এবং প্রতিটি নারী অক্রিয়ভাবে ভেসে যায় এর সাথে।

নিজেদের তত্ত্বের পক্ষে উপাত্তগত প্রমাণ পেতে মনোবিশ্লেষকদের সামান্যও কষ্ট হয় নি। আমরা জানি যে বহু কাল ধরে টলেমীয় পদ্ধতি অনুসারে গ্রহগুলোর অবস্থান ব্যাখ্যা করা গেছে সহজেই, শুধু ব্যাখ্যা করার জন্যে যখন-তখন কোনো-না-কোনো সূক্ষ্ম জটিলতা যোগ করতে হয়েছে; এবং ইডিপাস গূঢ়ৈষার ওপর আরেকটি বিপ্রতীপ ইডিপাস গূঢ়ৈষা চাপিয়ে দিয়ে, সব উদ্বেগের মধ্যে কামনা আরোপ করে সে-সব তথ্যকে সমন্বিত করা হয়েছে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে, যেগুলো সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করে তঁার তত্ত্বের বৈধতার। সব মনোবিশ্লেষকই সুশৃঙ্খলভাবে প্রত্যাখ্যান করেন বাছাই-এর ধারণাটি এবং এর সাথে সম্পর্কিত মূল্যের ধারণাটি, এবং এখানেই নিহিত এসংশ্রয়ের সহজাত দুর্বলতা। অস্তিত্বশীলের স্বাধীন বাছাই থেকে বাধ্যবাধকতা ও নিষিদ্ধকরণকে বিচ্ছিন্ন করে ফ্রয়েড তাদের উদ্ভবের ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন। তিনি সেগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে গণ্য করেন। তিনি মূল্যের ধারণাটির বিকল্পে চেষ্টা করেছেন কর্তৃত্বের ধারণাটি গ্রহণ করতে; তবে তিনি মোজেস অ্যান্ড মনোথিজম-এ স্বীকার করেছেন যে কর্তৃত্বের ব্যাপারটির কোনো ব্যাখ্যা তার নেই। অজাচার, উদাহরণস্বরূপ, নিষিদ্ধ, কেননা পিতা একে নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু তিনি কেননা একে নিষিদ্ধ করলেন? এটা এক রহস্য। সুপার ইগো আত্মস্থ করে নেয় এক স্বেচ্ছাচারী স্বৈরাচার থেকে উদ্ভূত বিধান ও নিষেধ, এবং সেখানে আছে প্রবৃত্তিগত প্রেষণাগুলো, কেননা আছে তা অবশ্য আমরা জানি না : এ-বাস্তবতা দুটি সম্পর্কহীন, কেননা নৈতিকতাকে মনে করা হয় কামের প্রকৃতিবিরুদ্ধ বলে। মানুষের ঐক্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ব্যক্তি থেকে সমাজে ঢোকার কোনো পথ নেই; তাদের মিলন ঘটানোর জন্যে ফ্রয়েড বাধ্য হয়েছিলেন কিছু অদ্ভুত গল্প বানাতে, যেমন বানিয়েছেন তিনি টোটেম ও ট্যাবুতে। অ্যাডলার স্পষ্ট দেখেছেন যে শুধু সামাজিক পরিস্থিতিতে খোজাগূঢ়ৈষা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়; তিনি মূল্যায়নের সমস্যার মধ্যে খুঁজেছিলেন এর সমাধান, কিন্তু তিনি সমাজস্বীকৃত মূল্যবোধের উৎস খোঁজেন নি ব্যক্তির মাঝে, যার ফলে তিনি ভুল করেন কামের গুরুত্ব বিচারে।

জীবনে কাম নিশ্চিতভাবেই পালন করে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; বলা যেতে পারে কাম থাকে জীবনকে সম্পূর্ণরূপে পরিব্যাপ্ত করে। শারীরবিজ্ঞান থেকে আমরা জেনেছি যে অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়ের সক্রিয়তা সাধারণতভাবে সমন্বিত হয় শরীরের সক্রিয়তার সাথে। মানুষ কামজ, মানুষ এক যৌন শরীর, এবং অন্যান্য মানুষ, যারা নিজেরাও যৌন শরীর, এর পরিণতিরূপে তাদের সঙ্গে তার সম্পর্কে সব সময়ই জড়িয়ে থাকে কাম। কিন্তু শরীর ও কাম যদি হয় অস্তিত্বের মূর্ত প্রকাশ, তাহলে অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত করেই আবিষ্কার করা যেতে পারে এদের তাৎপর্য। এ-পরিপ্রেক্ষিতের অভাবে মনোবিশ্লেষণ অব্যাখ্যাত সত্যকে গ্রহণ করে স্বতঃসিদ্ধ বলে। উদাহরণস্বরূপ, বলা হয় যে পাছার কাপড় তুলে উবু হয়ে বসে প্রস্রাব করতে বালিকা লজ্জা পায়–কিন্তু কোথা থেকে আসে এ-লজ্জা? এবং পুরুষ তার শিশ্নের জন্যে গর্বিত কি না বা তার গর্ব শিশ্নে প্রকাশিত হয় কি না, এ প্রশ্ন করার আগে জেনে নেয়া দরকার যে গর্ব কী এবং কারো উচ্চাকাঙ্গ কীভাবে মূর্ত হতে পারে কোনো বস্তুতে। মনোবিশ্লেষকেরা মনে করেন মানুষ সম্বন্ধে প্রধান সত্য হচ্ছে তার নিজের শরীর এবং তার গোষ্ঠির সহবাসীদের শরীরের সাথে তার সম্পর্ক; কিন্তু যে-প্রাকৃতিক বিশ্ব তাকে ঘিরে আছে, তার বন্ধুরাশির প্রতি মানুষের রয়েছে এক আদিম ঔৎসুক্য এবং তাকে সে আবিষ্কার করতে চায় কাজে, খেলায়, এবং গতিময় কল্পনার সমস্ত অভিজ্ঞতায়। মানুষ বস্তুগতভাবে একাত্ম হতে চায় সম্পূর্ণ বিশ্বের সাথে, তাকে বুঝতে চায় সব দিকে। মাটি কেটে বাঁধ বাঁধা, গর্ত খোড়া প্রভৃতি আলিঙ্গন, সঙ্গমের মতোই মৌলিক কাজ; এবং তাঁরা প্রতারিত করেন নিজেদের যারা এগুলোতে যৌন প্রতীক ছাড়া আর কিছু দেখতে পান না। গর্ত, নরম পিচ্ছিল কাদা, গভীর ক্ষত, কাঠিন্য, শুদ্ধতা প্রভৃতি হচ্ছে প্রধান বাস্তবতা; এবং এগুলোর প্রতি মানুষের যে-আগ্রহ, তা লিবিডোর আদেশে ঘটে না। শুদ্ধতা নারীর কুমারীত্বের প্রতীক বলে পুরুষ শুদ্ধতার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে; বরং শুদ্ধতার প্রতি তার অনুরাগের ফলেই সে মূল্যবান মনে করে কুমারীত্বকে। কাজ, যুদ্ধ, খেলা, শিল্পকলা নির্দেশ করে বিশ্বের সাথে জড়িত হওয়ার উপায়, যাকে অন্য কিছুতে পর্যবসিত করা সম্ভব নয়; এগুলো প্রকাশ করে সে-সব গুণ, যেগুলো সংঘর্ষে আসে যৌনতার প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যের সাথে। যুগপৎ ওগুলোর আলোকে ও এসব যৌন অভিজ্ঞতার আলোকেই প্রতিটি ব্যক্তি প্রয়োগ করে তার বাছাই করার। ক্ষমতা। তবে শুধু অস্তিত্বের স্বরূপবিষয়ক একটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ, সত্তাসম্পর্কিত একটি সাধারণ বোধ, আমাদের সাহায্য করে এ-বাছাইয়ের ঐক্য পুনরুদ্ধার করতে।

এ-বাছাইয়ের ধারণাটিকেই, বস্তুত, মনোবিশ্লেষণ প্রচণ্ডভাবে প্রত্যাখ্যান করে নিয়ন্ত্ৰণবাদ ও যৌথ অচৈতন্য-এর নামে; এবং ধারণা করা হয় যে এ-অচৈত্যনই মানুষকে সরবরাহ করে প্রাকগঠিত চিত্রকল্প ও একটা সর্বজনীন প্রতীক। এভাবেই এটা ব্যাখ্যা করে স্বপ্নের, উদ্দেশ্যহীন কার্যকলাপের, চিত্তবৈকল্যজাত স্বপ্নবিভাবের, রূপকের, এবং মানুষের নিয়তির পর্যবেক্ষিত সাদৃশ্যগুলো। শরীরসংস্থানই নিয়তি, বলেছেন ফ্রয়েড; আর এ-পদটিকেই প্রতিধ্বনিত করে মারলিউ-পোন্তির এ-পদটি :

শরীর হচ্ছে সাধারণত্ব।

প্রতীক স্বর্গ থেকে নেমে আসে নি আবার রসাতলের গভীরতা থেকেও উঠে আসে নি–একে, ভাষার মতোই, বিশদভাবে নির্মাণ করা হয়েছে মানুষের সে-বাস্তবতা দ্বারা যা যুগপৎ মিটজাইন ও বিচ্ছিন্নতা; এবং এটাই ব্যাখ্যা করে কেননা ব্যক্তিক উদ্ভাবনেরও একটি স্থান আছে, যা মতবাদের কথা বিবেচনা না করে বাস্তবিকভাবে মেনে নিতে হয় মনোবিশ্লেষণকে। শিশ্নের ওপর যে-ব্যাপক মূল্য আরোপ করা হয়ছে, আমাদের পরিপ্রেক্ষিত সাহায্য করে সেটা বুঝতে। অস্তিত্বের একটি সত্য থেকে প্রস্থান না করে এটা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব : সেটি হচ্ছে বিচ্ছিন্নতার প্রতি বিষয়ীর প্রবণতা। তার স্বাধীনতা তার মধ্যে সঞ্চার করে যে-উদ্বেগ, তা তাকে পরিচালিত করে বস্তুর মধ্যে নিজেকে খুঁজে দেখতে, এটা নিজের থেকে এক ধরনের পলায়ন। এ-প্রবণতা এতো মৌলিক যে মারের দুধ ছাড়ার সাথেসাথেই, যখন সে পৃথক হয়ে যায় অখণ্ড থেকে, শিশু বাধ্য হয় নিজের বিচ্ছিন্ন সত্তাকে দর্পণে এবং পিতামাতার দৃষ্টিপাতের মধ্যে দেখতে। আদিম মানুষেরা বিচ্ছিন্নতা বোধ করে মানায়, টোটেমে; সভ্য মানুষেরা তাদের স্বতন্ত্র আত্মায়, তাদের অহংয়ে, তাদের নামে, তাদের সম্পত্তিতে, তাদের কাজে। শিশুর বেলা শিশ্ন নিজের অবিকল নকল হিশেবে কাজ করতে সমর্থ এটা তার কাছে একই সঙ্গে এক পৃথক জিনিশ ও সে নিজে; এটা একটি খেলনা, একটি পুতুল, এবং তার নিজের মাংস; আত্মীয়রা আর সেবিকারা এটির প্রতি এমন আচরণ করে যে মনে হয় এটি এক ছোট্ট মানুষ। তাই দেখা সহজ কীভাবে এটি শিশুর জন্যে হয়ে ওঠে একটি বিকল্প সত্তা সাধারণত বেশি চতুর, বেশি বুদ্ধিমান, এবং বেশি ধূর্ত (এলিস বালিঁ, লা ভি এঁতিম দ্য ল’আঁফাঁ: শিশুর অন্তরঙ্গ জীবন, প ১০১)। শিশ্নধারী শিশ্নকে একই সাথে গণ্য করে নিজেকে বলে এবং অন্য কেউ বলে, কেননা প্রস্রাব ও পরে শিশ্নের দাঁড়ানোর ব্যাপারগুলো স্বেচ্ছাকৃত ও অস্বেচ্ছাকৃত কর্মের মাঝামাঝি প্রক্রিয়া, এবং যেহেতু এটিকে মনে হয় চপল এবং আনন্দের এক বাহ্যিক উৎস বলে। ব্যক্তির বিশেষ সীমাতিক্ৰমণতা মূর্ত হয় শিশ্নে এবং এটা গর্বের এক উৎস। শিশ্নকে এভাবে পৃথক করে রেখে পুরুষ তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের সাথে। সমন্বিত করতে পারে এটির থেকে উৎসারিত জীবনকে। এটা দেখা সহজ যে শিশ্নের দৈর্ঘ্য, প্রস্রাবের বেগ, দাঁড়ানোর ও বীর্যপাতের শক্তি শিশ্নধারীর কাছে হয়ে ওঠে তার নিজের মোগ্যতার মানদণ্ড।

এভাবে শিশের মধ্যে সীমাতিক্ৰমণতা মূর্ত হয়ে ওঠা একটি ধ্রুবক; এবং নিজের সীমাতিক্ৰমণতা অনুভব করার জন্যে শিশুর কাছেও এটা যেহেতু একটি ধ্রুবক–যার সীমাতিক্ৰমণতা খর্ব করে পিতা–তাই আমরা ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ করি। খোজাগুঢ়ৈষা নামের ফ্রয়েডীয় ধারণাটিকে। কোনো বিকল্প সত্তা নেই বলে বালিকা কোনো বস্তুতে বোধ করে না বিচ্ছিন্নতা এবং সে তার সংহতি পুনরুদ্ধার করতে পারে

। এজন্যে সে তার সমস্ত সত্তাকে পরিণত করে একটি বস্তুতে, নিজেকেই প্রতিষ্ঠিত করে অপর রূপে। সে বালকের সাথে তুলনার যোগ্য কি অযোগ্য, তা সে জানুক বা না জানুক, সেটা গৌণ; গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যদি সে তা নাও জানে, তবু শিশ্নের অভাব তাকে বাধা দেয় নিজেকে একটি যৌনসত্তা হিশেবে ভাবতে। এর পরিণাম অনেক। কিন্তু যেধ্রুবকগুলোর কথা আমি বলেছি, এজন্যে সেগুলো কোনো চিরস্থির নিয়তি প্রতিষ্ঠা করে না–শিশ্ন যে এতো মহিমা ধারণ করে, তার কারণ হচ্ছে এটি হয়ে ওঠে অন্যান্য। এলাকায় প্রয়োগ করা আধিপত্যের প্রতীক। নারী যদি নিজেকে কর্তা হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতো, তাহলে সেও উদ্ভাবন করতো শিশ্নের সমতুল্য কিছু; আসলে, পুতুল, যা হচ্ছে ভবিষ্যতে যে শিশু আসবে, সে-প্রতিশ্রতির প্রতিমূর্তি, তাও হয়ে উঠতে পারে শিশ্নের থেকে বেশি মূল্যবান সম্পদ। সত্য হচ্ছে শুধু মোট পরিস্থিতির ফলেই একটি দেহগত সুবিধার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি সত্যিকার মানবিক সুবিধা। মনোবিশ্লেষণ তার সত্যগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে পারে শুধু ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে।

সে একটি নারী, একথা বলে নারীকে যতোটা সংজ্ঞায়িত করা যায়, তার থেকে নিজের নারীত্ব সম্পর্কে নারীর চেতনা দিয়ে নারীকে বেশি সন্তোষজনকভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না, কেননা সে এ-চেতনা অর্জন করে নিজের সমাজের পরিস্থিতি থেকে, যে-সমাজের সে একজন সদস্য। অবচেতনা ও সম্পূর্ণ মনোজীবনকে আত্মস্থ করে মনোবিশ্লেষণের বিশেষ ভাষাই নির্দেশ করে যে ব্যক্তির নাটকটি উনন্মাচিত হয় তারই ভেতরে–গূঢ়ৈষা, প্রবণতা প্রভৃতি শব্দ এ-ই জ্ঞাপন করে। কিন্তু জীবন হচ্ছে বিশ্বের সাথে একটি সম্পর্ক, এবং প্রতিটি ব্যক্তি নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে চারপাশের বিশ্বে নিজের বাছবিচার দিয়ে। আমরা যে-সব প্রশ্ন নিয়ে ব্যস্ত, সেগুলোর উত্তর পাওয়ার জন্যে তাই আমাদের তাকাতে হবে বিশ্বের দিকে। মনোবিশ্লেষণ বিশেষভাবে ব্যর্থ নারী কেনো অপর, তা ব্যাখ্যা করতে। কেননা ফ্রয়েড নিজেই স্বীকার করেছেন যে। শিশ্নের মর্যাদা ব্যাখ্যা করা হয় পিতার সার্বভৌমত্ব দিয়ে, এবং, আমরা দেখেছি, তিনি স্বীকার করেছেন পুংলিঙ্গের আধিপত্যের উদ্ভব সম্পর্কে তিনি অজ্ঞ।

সুতরাং আমরা মনোবিশ্লেষণপদ্ধতিকে মেনে নিতে অস্বীকার করি, তবে এবিজ্ঞানের সব অবদান আমরা অস্বীকার করি না, বা অস্বীকার করি না এর কিছু অন্তদৃষ্টির উর্বরতাকে। প্রথমে, কামকে বিদ্যমান কিছু বলে গণ্য করে আমরা নিজেদের সীমাবদ্ধ করতে চাই না। এ-দৃষ্টিভঙ্গির দারিদ্র্য ধরা পড়ে নারীলিবিডো বর্ণনায়; আমি আগেই বলেছি মনোবিশ্লেষকেরা একে কখনো সরাসরি বিচার করেন নি, শুধু পুরুষ লিবিডো থেকে একটু সরে এসে বর্ণনা করেছেন একে। অক্রিয় লিবিডোর ধারণাটি বিভ্রান্তিকর, কেননা পুরুষ ভিত্তি করে লিবিডোর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে একটি প্রেষণা, একটি শক্তি হিশেবে। আমরা বাস্তবতাকে আরো বেশি করে ধারণ করতে পারবো যদি লিবিডোকে শক্তির মতো অস্বচ্ছ শব্দ দিয়ে সংজ্ঞায়িত না করে কামের তাৎপর্যকে সম্পর্কিত করি মানুষের অন্যান্য প্রবণতা–নেয়া, ধরা, খাওয়া, তৈরি করা, আনুগত্য স্বীকার করা প্রভৃতির সাথে। কামসামগ্রিগুলোর গুণাবলি শুধু সঙ্গমের সময় নয়, সাধারণভাবেও বিচার করা আমাদের দায়িত্ব। এমন অনুসন্ধান ছাড়িয়ে যাবে মনোবিশ্লেষণের কাঠামো, যার বিবেচনায় কাম অপর্যসেয়।

উপরন্তু, নারীনিয়তির সমস্যাটি আমি তুলবো সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে : আমি নারীকে স্থাপন করবো এক মূল্যবোধের বিশ্বে, এবং তার আচরণকে দেবো এক স্বাধীনতার মাত্রা। আমি বিশ্বাস করি নিজের সীমাতিক্ৰমণতা জ্ঞাপন ও বস্তু হিশেবে তার বিচ্ছিন্নতাবোধের মধ্যে কোনটিকে নিতে হবে, তা বাছাই করার শক্তি তার আছে; সে পরম্পবিরোধী উদ্যমের খেলার পুতুল নয়; সে নৈতিক মানদণ্ডে সমাধান করে বিচিত্র মূলবোধের সমস্যা। মূল্যবোধের বদলে আধিপত্যকে বাছাইয়ের বদলে উদ্যমকে গ্রহণ করে মনোবিশ্লেষণ উপহার দিয়েছে এক এরসাট্‌জ্‌–নৈতিকতার এক বিকল্পস্বাভাবিকতার ধারণা। এ-ধারণা বিশেষ কার্যকর চিকিৎসাবিদ্যায়, কিন্তু মনোবিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে এক উদ্বেগজাগানো মাত্রায় এটি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। বর্ণনামূলক ছককে প্রস্তাব করা হচ্ছে সূত্ররূপে; এবং এটা সুনিশ্চিত যে একটি যান্ত্রিকতাবাদী মনোবিজ্ঞান স্বীকার করে নিতে পারে না নৈতিক উদ্ভাবনের ধারণাকে; কড়াকড়ির মধ্যে এটা বিবরণ দিতে পারে শুধু কম-এর এবং কখনোই বিবরণ দিতে পারে না বেশির; কড়াকড়ির মধ্যে এটা স্বীকার করতে পারে শুধু নিয়ন্ত্রণকে, কখনোই স্বীকার করে নিতে পারে না সৃষ্টিকে। যদি কোনো বিষয়ী তার সমগ্রতার মধ্যে সে-বিকাশ দেখাতে না পারে, যাকে গণধকার স্বাভাবিক বলে, তাহলে বলা হবে যে তার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে গেছে, এবং এ-রুদ্ধতাকে ব্যাখ্যা করা হবে একটি ন্যূনতারূপে, একটি নেতিরূপে, কখনোই একে ইতিবাচক সিদ্ধান্তরূপে ব্যাখ্যা করা হবে না। এটাই, আরো বহু কিছুর সঙ্গে, মহাপুরুষদের মনোবিশ্লেষণকে করে তোলে মর্মান্তিক : আমাদের বলা হয় যে এই-এই সংক্রম, এই-ওই উগতি তাঁদের মধ্যে সংঘটিত হয় নি; জ্ঞাপন করা হয় না যে হয়তো নিজেদের জন্যে যথাযথ কারণবশত তাঁরা এ-প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে রাজি হন নি। তাই মনোবিশ্লেষকেরা কখনোই একটি অসত্য চিত্রের বেশি কিছু দেন না; এবং অসত্যের জন্যে স্বাভাবিকতা ছাড়া আর কোনো মানদণ্ড পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। নারীনিয়তি সম্পর্কে তাদের বিবৃতি এর সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। মনোবিশ্লেষকেরা যে-অর্থে বুঝে থাকেন পরিভাষাটি, এক কাঠামোতে মাতা বা পিতার সাথে নিজেকে অভিন্ন বোধ করা হচ্ছে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা, এটা হচ্ছে কারো নিজের অস্তিত্বের স্বতস্ফূর্ত প্রকাশের থেকে বাইরের কোনো মূর্তিকে বেশি পছন্দ করা, এটা হচ্ছে সত্তা সত্তা খেলা। আমাদের কাছে নারীদের দেখানো হয় দু-ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ দ্বারা প্ররোচিতরূপে। স্পষ্টত পুরুষ পুরুষ খেলা নারীর জন্যে হবে এক হতাশার উৎস; তবে নারী নারী খেলাও এক মতিবিভ্রম : নারী হওয়ার অর্থ বস্তু হওয়া, অপর হওয়া–এ-সত্ত্বেও তার হালছাড়া ভাবের মধ্যেও অপর থেকে যায় কর্তা।

নারীর জন্যে সত্যিকার সমস্যা হচ্ছে বাস্তবতা থেকে এসব পলায়নকে প্রত্যাখ্যান করা এবং সীমাতিক্ৰমণতার মধ্যে আত্মসিদ্ধি খোজা। তাই যা করতে হবে, তা হচ্ছে দেখতে হবে যাকে বলা হয় পুরুষসুলভ ও মেয়েলি প্রবণতা, তার ভেতর দিয়ে তার জন্যে খোলা আছে কী কী পথ। এমনকি অ্যাডলারও মনে করেন ক্ষমতা লাভের ঈপ্সা একটা উদ্ভট ধরনের শক্তি; সীমাতিক্ৰমণতার সবগুলো পরিকল্পনাকে তিনি বলেন। পুরুষসুলভ প্রতিবাদ। যখন কোনো বালিকা গাছে চড়ে, অ্যাডলারের মতে সে দেখাতে চায় যে সে বালকদের সমকক্ষ; এটা তার মনে পড়ে না যে বালিকাটি গাছে চড়তে পছন্দ করে। মায়ের কাছে তার শিশু শিশ্নের সমতুল্য কিছুর থেকে ভিন্ন। জিনিশ। ছবি আঁকা, লেখা, রাজনীতি করা–এগুলো হচ্ছে নিতান্তই উদাতি; আমরা মনে করি এসব কাজ করা হয় এসব কাজ করার জন্যেই। এটা অস্বীকার করা হচ্ছে। মানবিক সব ইতিহাসের অসত্যীকরণ।।

পাঠক এ-বিবরণ ও মনোবিশ্লেষকদের বিবরণের মধ্যে এক ধরনের সমান্তরলতা লক্ষ্য করবেন। সত্য হচ্ছে যে পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে–পুরুষ ও নারী মনোবিশ্লেষকেরা উভয় শ্ৰেণীই যা গ্রহণ করেছেন–বিচ্ছিন্নতার সাথে সংশ্লিষ্ট আচরণকে গণ্য করা হয় নারীধর্মী বলে, আর বিষয়ী যে-আচরণের সাহায্যে জ্ঞাপন করে তার সীমাতিক্ৰমণতা, তাকে গণ্য করা হয় পুরুষধর্মী বলে। ডোনাল্ডসন, নারীর এক ঐতিহাসিক, মন্তব্য করেছেন যে : পুরুষ  হচ্ছে একজন পুংলিঙ্গ মানুষ, নারী হচ্ছে একজন স্ত্রীলিঙ্গ মানুষ, এ-সংজ্ঞাগুলোকে বিকৃত করা হয়েছে বিষমরূপে; এবং বিশেষভাবে মনোবিশ্লেষকদের মধ্যেই পুরুষকে সংজ্ঞায়িত করা হয় একজন মানুষ হিশেবে এবং নারীকে স্ত্রীলিঙ্গ হিশেবে–যখনই সে মানুষরূপে আচরণ করে তখনই বলা হয় যে সে পুরুষের অনুকরণ করছে। আমাদের কাছে নারী হচ্ছে এমন একজন মানুষ, যে মূল্যবোধের বিশ্বে খুঁজছে মূল্যবোধ, এবং এ-বিশ্বটির আর্থ ও সামাজিক সংগঠন জানা অত্যাবশ্যক। আমরা নারীর সমগ্র পরিস্থিতির ওপর যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে নারীকে বিচার করবো অস্তিত্ববাদী পরিপ্রেক্ষিতে।

ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিকোণ

প্রথম খণ্ড । ভাগ ১ – নিয়তি । পরিচ্ছেদ ৩

ঐতিহাসিক বস্তুবাদের তত্ত্বটি প্রকাশ করেছে কিছু অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ সত্য। মানুষ কোনো পশুপ্রজাতি নয়, এটি এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা। মানব সমাজ এক অর্থে প্রকৃতির বিরোধী; এটা অক্রিয়ভাবে প্রকৃতির অধীনতা স্বীকার করে না, বরং নিজের পক্ষে হাতে তুলে নেয় প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ। এ-দখলকর্মটি অন্তর্গত, মন্ময় কাজ নয়; বাস্তব কাজের ভেতর দিয়ে বস্তুগতভাবে এটা সম্পন্ন করা হয়।

তাই নারীকে শুধু একটি লৈঙ্গিক প্রাণী হিশেবে বিবেচনা করা যেতে পারে না, কেননা জৈবিক বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে সেগুলোরই রয়েছে গুরুত্ব, যেগুলো কর্মকাণ্ডে পরিগ্রহ করে বাস্তব মূল্য। নারীর আত্মচেতনাকে শুধুই তার কাম দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না : এটা প্রতিফলিত করে এমন এক পরিস্থিতি, যা নির্ভরশীল সমাজের আর্থনীতিক সংগঠনের ওপর, যেটা আবার নির্দেশ করে মানবমণ্ডলি অর্জন করেছে। প্রযুক্তিগত বিবর্তনের কোন পর্যায়। আমরা দেখেছি জৈবিকভাবে নারীর দুটি মূল। বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : বিশ্বে তার আয়ত্তি পুরুষের থেকে কম বিস্তৃত, এবং সে তার প্রজাতির কাছে অধিকতর দাসত্বে বন্দী।

কিন্তু আর্থনীতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি অনুসারে এসব সত্য ধারণ করে বেশ ভিন্ন মূল্য। মানুষের ইতিহাসে বিশ্বের ওপর অধিকার কখনোই নগ্ন শরীর দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় নি : হাত, তার বিরোধসমর্থ বৃদ্ধাঙ্গুলি নিয়ে, হয়ে ওঠে হাতিয়ারের পূর্বরূপ, যা বৃদ্ধি করে ক্ষমতা; প্রাক-ইতিহাসের অতিপ্রাচীন দলিলেও মানুষকে দেখা যায় সশস্ত্ররূপে। যখন ভারি লাঠি উঁচিয়ে ধরে দূরে রাখা হতো বন্যপশুদের, তখনও নারীর শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিতে সুস্পষ্ট নিকৃষ্টতারূপে : যদি হাতিয়ারটি ব্যবহারের জন্যে দরকার হতো একটু বেশি শক্তি, তাহলে এটাই দেখিয়ে দিতো সে শোচনীয়ভাবে শক্তিহীন। তবে কৌশল হয়তো লোপ করে দিতে পুরুষ ও নারীর পেশিগত অসাম্য : বিশেষ প্রয়োজনেই উদ্ধৃষ্টতার অভাব পূরণ করা হয় প্রাচুর্য দিয়ে, এবং খুব বেশি থাকা পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকার থেকে ভালো নয়। তাই আধুনিক অনেক যন্ত্র চালানোর জন্যে দরকার পড়ে পেশিশক্তির অতিসামান্য অংশ; এবং যা ন্যূনতম দরকার, তা যদি নারীর সামর্থ্যের থেকে বেশি না হয়, তাহলে সে হয়ে ওঠে, একাজের ক্ষেত্রে, পুরুষের সমান। আজ অবশ্য একটি বোতাম টিপেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বিপুল শক্তি। বিভিন্ন দেশের প্রথানুসারে মাতৃত্বের ভার এখন ধারণ করে বিভিন্ন রকম গুরুত্ব : এটা দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার মতো হয় যদি নারীটি বাধ্য হয় ঘনঘন গর্ভধারণে ও কারো সাহায্য ছাড়াই সন্তান লালনপালনে; কিন্তু সে যদি স্বেচ্ছায় সন্তান ধারণ করে এবং গর্ভধারণের কালে যদি সমাজ এগিয়ে আসে তার সাহায্যে ও উদ্যোগী থাকে সন্তানের কল্যাণের ব্যাপারে, তাহলে মাতৃত্বের ভার হয় লঘু এবং কাজের অবস্থাগুলোর সুবিধামতো বিন্যাস করে পুষিয়ে নেয়া যায়।

এ-পরিপ্রেক্ষিতেই এঙ্গেলস নারীর ইতিহাস বর্ণনা করেছেন পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তিতে, এবং দেখিয়েছেন যে এ-ইতিহাস প্রধানত নির্ভর করেছে কৌশলের ওপর। প্রস্তর যুগে, যখন যৌথভাবে জমির মালিক ছিলো গোত্রের সমস্ত সদস্য, আদিম কোদাল ও নিড়ানির অবিকশিত অবস্থার জন্যেই কৃষির সম্ভাবনা ছিলো সীমিত, তাই নারীর শক্তি ছিলো উদ্যানপালনের উপযুক্ত। আদিম এ-শ্রমবিভাজনে দুটি লিঙ্গ গড়ে তুলেছিলো দুটি শ্রেণী, এবং এ-দুটি শ্রেণীর মধ্যে ছিলো সাম্য। পুরুষ যখন শিকার করে ও মাছ ধরে, নারী তখন থাকে বাড়িতে; তবে গৃহস্থালির কাজের মধ্যেও থাকে উৎপাদনশীল শ্রম—হাঁড়িপাতিল তৈরি, তাঁত বোনা, বাগান করা এবং ফলত আর্থনীতিক জীবনে নারী পালন করে বৃহত্তর ভূমিকা। তামা, টিন, ব্রোঞ্জ, ও লোহা আবিষ্কার ও লাঙলের উদ্ভবের ফলে কৃষিকর্মের সীমা বৃদ্ধি পায়, এবং বনপরিষ্কার ও জমি চাষের জন্যে দরকার হয়ে পড়ে নিরবচ্ছিন্ন শ্রম। তখন পুরুষ আদায় করে নেয় অন্য পুরুষের শ্রম, যাদের সে পরিণত করে দাসে। দেখা দেয় ব্যক্তিগত মালিকানা : দাসের ও জমির প্রভু, পুরুষ হয়ে ওঠে নারীরও মালিক। এটা ছিলো নারীজাতির ঐতিহাসিক মহাপরাজয়। নতুন হাতিয়ার আবিষ্কারের ফলে পুরোনো শ্রমবিভাজন বিপর্যস্ত করে এটা ঘটে। সে-একই কারণ, যা নারীকে দেয় গৃহের কর্তৃত্ব–যেমন, গৃহস্থালিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া–সেই একই কারণ পুরুষকে দেয় আধিপত্য, কেননা এর পর নারীর গৃহস্থালির কাজ পুরুষের উৎপাদনশীল কাজের পাশে হয়ে ওঠে তুচ্ছ–পরেরটি হয় সব কিছু, আগেরটি হয়ে ওঠে তুচ্ছরূপে গৌণ তখন মাতৃ-কর্তৃত্ব নিজের অধিকার তুলে দেয় পিতৃ-কর্তৃত্বের কাছে, কেননা পিতার কাছে থেকে পুত্র পেতে থাকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার; আগের মতো আর নারীর কাছে থেকে তার গোত্র পায় না সম্পত্তির উত্তরাধিকার। এখানেই আমরা দেখতে পাই সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তি করে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের উদ্ভব। এ-ধরনের পরিবারে নারী হয় পরাভূত। নিজের সার্বভৌমত্বের মধ্যে পুরুষ, আরো অনেক কিছুর সাথে, নিজেকে লিপ্ত করে কামলীলায়–সে সঙ্গম করতে থাকে দাসীর বা বারবনিতার সাথে বা করতে থাকে বহুবিবাহ। যেখানে সম্ভব হয়, স্ত্রীরা প্রতিশোধ নিতে থাকে অসতীত্বের মধ্য দিয়ে বিয়ে তার স্বাভাবিক সার্থকতা লাভ। করে ব্যভিচারে। যে-গার্হস্থ্য দাসীত্বে বন্দী নারী, তার বিরুদ্ধে এটাই তার আত্মরক্ষার একমাত্র উপায়; এবং এ-আর্থনীতিক পীড়ন থেকেই উদ্ভূত হয় সামাজিক পীড়ন, যা ভোগ করতে হয় তাকে। যে-পর্যন্ত না এই দু-লিঙ্গ আইনে সমান অধিকার পাবে, সেপর্যন্ত সাম্য পুনপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে না; কিন্তু এ-সমানাধিকারের জন্যে দরকার সাধারণ শ্রমে নারীর অংশগ্রহণ। তখনই শুধু নারীর মুক্তি ঘটতে পারে, যখন সে বৃহৎ সামাজিক মাত্রায় অংশ নিতে পারবে উৎপাদনে এবং গৃহস্থালির কাজে অংশ নেবে খুবই কম মাত্রায়। এবং এটা সম্ভব হয়েছে শুধু আধুনিক কালের বৃহৎ শিল্পে, যেটা শুধু ব্যাপক হারে নারীশ্রম কাজেই লাগায় না, বরং এটা আনুষ্ঠানিক ভাবে চায়…

তাই নারীর নিয়তি ও সমাজতন্ত্রের নিয়তি পরস্পরের সাথে গভীরভাবে বাধা, যা বেবেলের নারী সম্পর্কিত মহাগ্রন্থেও দেখানো হয়েছে। নারী ও সর্বহারা, তিনি বলেন, উভয়ই উৎপীড়িত। উভয়কেই মুক্ত করতে হবে আর্থনীতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে, যা ঘটবে শিল্পযন্ত্রপাতির মধ্য দিয়ে সংঘটিত সামাজিক অভ্যুত্থানের ফলে। নারীর সমস্যাকে পরিণত করা হয়েছে শ্রমে তার সামর্থ্যের সমস্যার পর্যায়ে। যখন কৌশল ছিলো তার সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তখন প্রভাবশালী থেকে, যখন সে তা ব্যবহার করতে পারে নি তখন সিংহাসনচ্যুত হয়ে, আধুনিক কালে নারী পুনরুদ্ধার করে পুরুষের সাথে তার সাম্য। প্রাচীন পুঁজিবাদী পিতৃসুলভ শাসনের প্রতিরোধের ফলে অনেক দেশেই এ-সাম্য বাস্তবায়িত হতে পারছে না; যখন এ-প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে, তখন এটা বাস্তবায়িত হবে, সোভিয়েত প্রচার অনুসারে যা ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নে। এবং যখন সারা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হবে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, তখন আর কেউ পুরুষ বা নারী থাকবে না, সবাই হবে সমান মর্যাদার শ্রমিক।

এঙ্গেলস যে-চিন্তাধারার রূপরেখা তৈরি করেছেন, তা যদিও আমাদের আলোচিত চিন্তাধারাগুলো থেকে নির্দেশ করে অগ্রগতি, তবু এ আমাদের হতাশ করে–সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোকেই এখানে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। সব ইতিহাসের বাঁক নেয়ার বিন্দু হচ্ছে গোষ্ঠিগত মালিকানা থেকে ব্যক্তিগত মালিকানায় উত্তরণের পথটুকু, এটা কীভাবে ঘটেছে তা এতে কোনোভাবেই নির্দেশ করা হয় নি। এঙ্গেলস নিজে পরিবারের উদ্ভব-এ ঘোষণা করেছেন যে বর্তমানে আমরা এ-সম্বন্ধে কিছুই জানি না; ঐতিহাসিক বিস্তৃত বিবরণ সম্বন্ধে তিনি শুধু অজ্ঞই নন, এমনকি তিনি কোনো ব্যাখ্যাও দেন নি। একইভাবে, এটাও স্পষ্ট নয় যে ব্যক্তিগত মালিকানাই অবধারিতভাবে নারীদের বন্দী করেছে দাসত্বে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এমন সব ঘটনাকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নিয়েছে যেগুলোর ব্যাখ্যা দরকার : এঙ্গেলস আলোচনা না করেই ধরে নিয়েছেন যে স্বার্থের বন্ধনই পুরুষকে গ্রথিত করে সম্পত্তির সাথে; কিন্তু এ-স্বার্থ, যা সামাজিক সংস্থাসমূহের উৎস, তার উৎস কোথায়? তাই এঙ্গেলসের বিবরণ অগভীর, এবং যে-সব সত্য তিনি প্রকাশ করেছেন, সেগুলো আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাচক্ৰজাত, আকস্মিক। কিন্তু সত্য হচ্ছে যে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সীমা পেরিয়ে না গিয়ে আমরা ওগুলোর অর্থ নির্ণয় করতে পারি না। আমরা যেসব সমস্যা তুলেছি, এটা সেগুলোর সমাধান দিতে পারে না, কেননা এগুলোর বিষয় সম্পূর্ণ মানুষ, শুধু সে-বিমূর্তকরণ : হোমো ওএকোনোমিকাস নয়।

উদাহরণস্বরূপ, এটা স্পষ্ট যে ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণাটি বোধগম্য হতে পারে শুধু অস্তিত্বশীলের আদি অবস্থার প্রসঙ্গে। কেননা এটা বোঝা যায় যে প্রথমে এমন। একটা অবস্থা ঘটেছিলো, যখন অস্তিত্বশীল নিজের অস্তিত্বের স্বায়ত্তশাসন ও পার্থক্য ঘোষণার জন্যে নিজেকে মনে করেছিলো একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা। এ-ঘোষণা থেকে গিয়েছিলো মন্ময়, অন্তর্গত, বৈধতাহীন, যতো দিন তার এটা কাগতভাবে বাস্তবায়নের কৌশলগত উপায় ছিলো না। উপযুক্ত হাতিয়ার ছাড়া বিশ্বের ওপর সে নিজের কোনো ক্ষমতা বোধ করে নি, প্রকৃতিতে ও নিজের গোত্রে সুপ্ত অবস্থায় সে নিজেকে বোধ করেছে অক্রিয়, সন্ত্রস্ত, অবোধ্য শক্তিরাশির ক্রীড়নক। কঠিন ও উৎপাদনশীল শ্রমের অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্রোঞ্জ আবিষ্কারই মানুষকে সমর্থ করে নিজেকে স্রষ্টা হিশেবে আবিষ্কার করতে; প্রকৃতির ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার পর সে আর তাকে ভয় পায় নি, এবং নানা বাধা পেরিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সে সাহস পায় নিজেকে স্বায়ত্তশাসিত সক্রিয় শক্তি হিশেবে দেখার এবং ব্যক্তি হিশেবে আত্মসিদ্ধি অর্জনের।

আবার, তার নিজের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ঘোষণাই সম্পত্তি ব্যাখ্যার জন্যে যথেষ্ট নয় : প্রতিটি সচেতন ব্যক্তি কি, সংগ্রাম, এবং একক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে প্রয়াস চালাতে পারে নিজেকে সার্বভৌমত্বে উন্নীত করার।

সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার ফলেই ঘটেছে নারী উৎপীড়ন, এ-সিদ্ধান্তে পৌঁছোনোও অসম্ভব। এখানেও এঙ্গেলসের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। তিনি দেখেছেন যে নারীর পেশিগত দুর্বলতা প্রকৃত নিকৃষ্টতার ব্যাপার হয়ে ওঠে শুধু ব্রোঞ্জ ও লৌহ হাতিয়ারের সম্পর্কে এসে; কিন্তু তিনি দেখেন নি যে শ্রমের সীমিত সামর্থ্যই নারীর জন্যে বিশেষ পরিপ্রেক্ষিতে হয়ে ওঠে অসুবিধাজনক। নারীর অসামর্থ তার বিনাশ ডেকে আনে, কেননা পুরুষ নারীকে বিবেচনা করেছে তার সমৃদ্ধিলাভ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু কেননা নারী উৎপীড়িত হয়েছে, এ পরিকল্পনাও ব্যাখ্যা করার জন্যে যথেষ্ট নয়, কেননা দু-লিঙ্গের মধ্যে শ্রববিভাজন হয়ে উঠতে পারতো একটা প্রীতির সম্পর্ক। যদি মানুষের চেতনায় না থাকতো অপর নামে একটি আদি ধারণা এবং অপর-এর ওপর আধিপত্যের এক আদি আকাঙ্খা, তাহলে ব্রোঞ্জের হাতিয়ার উদ্ভাবনের ফলে নারীপীড়ন ঘটতো না।

এঙ্গেলস এ-পীড়নের বিশেষ ধরনটিও ব্যাখ্যা করেন নি। দু-লিঙ্গের বৈরিতাকে তিনি দিতে চেয়েছেন শ্রেণীসংগ্রামের রূপ, তবে এ-উদ্যোগে তিনি ছিলেন নিরুদ্যম; তাঁর তত্ত্ব একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। এটা সত্য যে লিঙ্গানুসারে শ্রমবিভাজন ও পরিণামে পীড়ন মনে জাগিয়ে তোলে শ্রেণী অনুসারে সমাজবিভাজনের ধারণাটি, তবে এ-দুটিকে গুলিয়ে ফেলা অসম্ভব। এক দিকে, শ্রেণীবিভক্তির কোনো জৈবিক ভিত্তি নেই। আবার, শ্রমিক তার অতিপরিশ্রমের মধ্যেও প্রভুর বিপরীতে সচেতন থাকে নিজের সম্বন্ধে; এবং সর্বহারারা বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে সব সময়ই পরখ করে নিয়েছে তাদের অবস্থা, এবং শোষকদের জন্যে তৈরি করে রেখেছে একটি হুমকি। এবং তারা চেয়েছে একটি শ্রেণী হিশেবে নিজেদের অবলুপ্তি। ভূমিকায় আমি দেখিয়েছি নারীর পরিস্থিতি কতো ভিন্ন।

যা আরো গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে সরল বিশ্বাসে নারীকে শুধু শ্রমিক হিশেবে গণ্য করা যায় না; কেননা তার প্রজননগত ভূমিকা তার উৎপাদন সামর্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, ব্যক্তিগত জীবনে যতোটা সামাজিক অর্থনীতিতেও তার থেকে কম নয়। কোনো কোনো পর্বে, সত্যিই, ভূমিকৰ্ষণের থেকে সন্তান প্রসব অনেক বেশি উপকারী। এঙ্গেলস সমস্যাটিকে উপেক্ষা করেছেন শুধু এ-মন্তব্য করে যে সমাজতান্ত্রিক। জনগোষ্ঠি লোপ করবে পরিবার প্রথাকে–এটা নিশ্চিতভাবেই একটি বিমূর্ত সমাধান। আমরা জানি উৎপাদনের অব্যবহিত প্রয়োজন ও জনসংখ্যাবৃদ্ধির প্রয়োজনের মধ্যে সম্পর্কের অদলবদলের ফলে কতো ঘনঘন এবং কতো মৌলভাবে সোভিয়েত রাশিয়াকে বদলাতে হয়েছে পরিবার সম্বন্ধে তার নীতি। তবে পরিবার প্রথা লোপ করা মানেই নারীর মুক্তি নয়। স্পার্টা ও নাটশি শাসনের উদাহরণ প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও পুরুষের দ্বারা নির্যাতিত হতে পারে নারী।

নারীর অবস্থা যে-সমস্যা তুলে ধরে, তাতে খুবই ব্ৰিত বোধ করবে একটি প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক নৈতিকতা, যা স্বাধীনতা খর্ব না করে সমর্থন করে ন্যায়বিচার এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র লুপ্ত না করে ব্যক্তির ওপর দেয় দায়িত্ব। গর্ভধারণকে কোনো দায়িত্ব, কোনো কাজ, বা সামরিক পেশার মতো কোনো পেশার সাথে সমীকরণ খুবই অসম্ভব নাগরিকদের চাকুরির বিধিমালার থেকে সন্তানের জন্যে দাবি নারীর জীবনকে বিপর্যস্ত করে অনেক তীব্রভাবে–কোনো রাষ্ট্রই কখনো বাধ্যতামূলক সঙ্গমের বিধান দেয় নি। সঙ্গমে ও মাতৃত্বে নারীর জন্যে জড়িত থাকে সময় ও শক্তির থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যবোধ। যৌক্তিক বস্তুবাদ বৃথাই চেষ্টা করে কামের এ-নাটকীয় বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করতে; কেননা কামপ্রবৃত্তিকে কোনো বিধিমালার অধীনে আনা অসম্ভব। সত্যিই, যেমন ফ্রয়েড বলেছেন, এটা নিশ্চিত নয় যে এটা নিজের ভেতরেই বহন করে কি না নিজের সন্তুষ্টির অস্বীকৃতি। যা নিশ্চিত, তা হচ্ছে এটা সমাজের সাথে সংহতির অনুমতি দেয় না, কেননা কামে আছে সময়ের বিরুদ্ধে এক বিশেষ মুহূর্তের দ্রোহ, আছে সর্বজনীনের বিরুদ্ধে ব্যক্তির দ্রোহ।

নারীকে প্রসবে সরাসরি বাধ্য করার কোনো উপায় নেই : যা সম্ভব, তা হচ্ছে তাকে ফেলতে হবে এমন পরিস্থিতিতে যেখানে তার জন্যে মাতৃত্বই একমাত্র পরিণতি–আইন বা লোকাচার দিতে পারে বিয়ের আবশ্যিক বিধান, নিষিদ্ধ করতে পারে জন্মনিয়ন্ত্রণ, বিবাহবিচ্ছেদকে করতে পারে অবৈধ। এসব প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক বিধিনিষেধ আজ আবার ফিরিয়ে আনছে সোভিয়েত ইউনিয়ন; রাশিয়া পুনরুজ্জীবিত করছে বিয়ের পিতৃশাসনসুলভ ধারণাকে। এটা করতে গিয়ে সে নারীকে আবার নির্দেশ দিচ্ছে নিজেকে কামসামগ্রি করে তুলতে : সাম্প্রতিক এক ঘোষণায় রাশিয়ার নারী নাগরিকদের অনুরোধ করা হয়েছে তাদের কাপড়চোপড়ের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে, প্রসাধন ব্যবহার করতে, স্বামীদের বশে রাখার জন্যে ছেনালিপনার আশ্রয় নিয়ে তাদের কামাগ্নি জাগিয়ে রাখতে। এ-ঘটনা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে নারীকে শুধু একটি উৎপাদনের শক্তি হিশেবে গণ্য করা অসম্ভব : পুরুষের জন্যে সে কামের সঙ্গী, প্রসবকারিণী, কামসামগ্রি–এক অপর, যার ভেতর দিয়ে পুরুষ খোঁজে নিজেকে। নারীর অবস্থা বোঝার জন্যে আমাদের তাকাতে হবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ পেরিয়ে, যা পুরুষ ও নারীকে আর্থ এককের বেশি কিছু বলে গণ্য করে না।

একই কারণে আমরা ফ্রয়েডের যৌন অদ্বৈতবাদ ও এঙ্গেলসের আর্থনীতিক অদ্বৈতবাদ উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করি। মনোবিশ্লেষক নারীর সমস্ত সামাজিক দাবিকে বিশ্লেষণ করেন পুরুষসুলভ প্রতিবাদ বলে; অন্য দিকে, মার্ক্সবাদীর কাছে নারীর কাম কম-বেশি জটিল, পরোক্ষভাবে, প্রকাশ করে তার আর্থনীতিক পরিস্থিতি। তবে ভগাঙ্কুরীয় ও যোনীয় ধারণাগুলো, বুর্জোয়া বা সর্বহারা ধারণাগুলোর মতোই বাস্তব নারীকে সার্বিকভাবে ব্যক্ত করতে সমান অসমর্থ। মানুষের আর্থনীতিক ইতিহাসের তলে যেমন থাকে, তেমনি সব ব্যক্তিগত নাটকের তলে আছে এক অস্তিত্ববাদী ভিত্তি, যা আমাদের পূর্ণরূপে বুঝতে সাহায্য করে সত্তার সে-বিশেষ রূপকে, যাকে আমরা বলি মানবজীবন। মানুষের সম্পূর্ণ বাস্তবতার সাথে জড়িত না করা হলে কাম ও প্রযুক্তি কিছুই ব্যাখ্যা করতে পারে না। এ-কারণেই ফ্রয়েডের সুপার-ইগোর নিষেধগুলো আর ইগোর উদ্যমগুলোকে ঘটনাচক্ৰজাত বলে মনে হয়, এবং এঙ্গেলসের নারীর ইতিহাসের বিবরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিকাশগুলো রহস্যময় ভাগ্যের খেয়ালখুশিতে ঘটেছে বলে মনে হয়। আমাদের নারী আবিষ্কারের উদ্যোগে জীববিজ্ঞান, মনোবিশ্লেষণ, ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কিছু কিছু অবদানকে আমরা। প্রত্যাখ্যান করবো না; তবে আমরা ধারণা পোষণ করবো যে শরীর, কামজীবন, ও প্রযুক্তির সম্পদগুলো মানুষের জন্যে ততোটাই আছে, তাদের সে যতোটা উপলব্ধি করে নিজের অস্তিত্বের সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতে। পেশিশক্তির, শিশ্নের, হাতিয়ারের মূল্য সংজ্ঞায়িত হতে পারে শুধু এক মূল্যবোধের বিশ্বে; এটা নিয়ন্ত্রিত হয় সে-মৌল পরিকল্পনা দিয়ে, যার সাহায্যে মানুষ খোঁজে সীমাতিক্রমণতা।

যাযাবর

প্রথম খণ্ড । ভাগ ২ – ইতিহাস । পরিচ্ছেদ ১

এটা চিরকালই পুরুষের বিশ্ব; এবং এ-ঘটনা ব্যাখ্যার জন্যে যে-সব কারণ প্রস্তাব করা হয়েছে এ-পর্যন্ত, তার কোনোটিই যথেষ্ট নয়। তবে লৈঙ্গিক স্তরক্ৰম কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, তা আমরা বুঝতে পারবো যদি অস্তিত্ববাদী দর্শনের আলোকে বিচার করি প্রাগৈতিহাসিক গবেষণা ও জাতিবিকাশতত্ত্বের তথ্যগুলো। আগেই আমি বলেছি যখন মানুষের দুটি দল একত্রে থাকে তখন একটি চায় অপরটির ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে। যদি উভয়েরই থাকে এ-চাপ প্রতিরোধের শক্তি, তাহলে তাদের মধ্যে স্থাপিত হয় পারস্পরিক সম্পর্ক, কখনো শত্রুতার, কখনো মিত্রতার, সব সময়ই থাকে এক উত্তেজনার অবস্থা। যদি একটি কোনো উপায়ে লাভ করে বিশেষ সুযোগ, পায় কিছু সুবিধা, তাহলে সেটিই আধিপত্য করে অপরটির ওপর, এবং চেষ্টা করে তাকে অধীনে রাখতে। তাই বোঝা যায় পুরুষ চাইবে নারীর ওপর আধিপত্য করতে; কিন্তু কী সুবিধা তাকে সাহায্য করেছে নিজের ইচ্ছে বাস্তবায়নে?

মানবজাতিবিদেরা মানবসমাজের আদিম রূপের যে-সব বিবরণ দিয়েছেন, সেগুলো পরস্পরবিরোধী। প্রাককৃষি পর্বে নারীর পরিস্থিতি কী ছিলো, সে-সম্পর্কে ধারণা করা বিশেষভাবেই কঠিন। নারীকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো, এবং বোেঝা বইতে হতো নারীকেই। নারীকে এ-কাজের ভার দেয়া হতো হয়তো এ-কারণে যে দুর্গম পথে চলার সময় আক্রমণকারী পশু বা মানুষের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্যে পুরুষকে মুক্ত রাখতে হতো তার হাত; তার ভূমিকা ছিলো অধিকতর ভয়ঙ্কর এবং এর জন্যে দরকার হতো বেশি শক্তি। তবে এও দেখা গেছে অনেক সময় অনেক নারী হতো শক্তসমর্থ, এবং তারা অংশ নিতে যোদ্ধাদের অভিযানে। নারী যে পুরুষের মতোই হিংস্র ও নিষ্ঠুরভাবে যুদ্ধবিগ্রহে অংশ নিতো, তা বোঝার জন্যে হিরোদোতাসের গল্প ও ডাহোমির আমাজনদের সাম্প্রতিক কাহিনী আমরা স্মরণ করতে পারি; তবুও সে-লাঠি ও বন্যপশুর যুগে পুরুষের অধিকতর শক্তি নিশ্চয়ই ছিলো প্রচণ্ডভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নারী যতোই শক্তিশালী হোক-না-কেনো বিরূপ বিশ্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তার প্রজননের দাসত্ব ছিলো একটা ভয়ানক প্রতিবন্ধকতা। গর্ভধারণ, প্রসব, ও ঋতুস্রাব কমাতে তাদের কাজের সামর্থ্য এবং কখনো কখনো খাদ্য ও নিরাপত্তার জন্যে তাদের করে তুলতে সম্পূর্ণরূপে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। মানবপ্রজাতির আদি সময়টা ছিলো। অত্যন্ত কঠিন; সহকারী, শিকারী, ও মৎস্যজীবী মানুষেরা জমি থেকে পেতে খুবই সামান্য শস্য, তার জন্যেও লাগতো কঠোর শ্রম; গোষ্ঠির সম্পদের জন্যে জন্ম দিতে হতো বেশি সন্তান; নারীর অতি-উর্বরতা তাকে বিরত রাখতে সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে, যদিও সে অনির্দিষ্ট মাত্রায় সৃষ্টি করতে নতুন চাহিদা। প্রজাতির স্থায়িত্বের জন্যে তাকে দরকার ছিলো, আর সে অতিশয় উদারভাবেই একে স্থায়িত্ব দিয়েছে; তাই পুরুষকেই ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হয়েছে প্রজনন ও উৎপাদনের মধ্যে। এমনকি সে-সময়েও যখন মানুষের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিলো সন্তান জন্মদান, যখন মাতৃত্ব ছিলো খুবই ভক্তির ব্যাপার, তখনও দৈহিক শ্রমই ছিলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর নারীদের কখনো প্রথম স্থানটি নেয়ার অনুমতি দেয়া হয় নি। আদিম যাযাবরদের কোনো স্থায়ী সম্পত্তি বা এলাকা ছিলো না, তাই উত্তরপুরুষের জন্যেও কিছু সংরক্ষণের কথা তারা ভাবে নি; সন্তান তাদের কাছে মূল্যবান সম্পদ ছিলো না, ছিলো বোঝা। শিশুহত্যা সাধারণ ঘটনা ছিলো যাযাবরদের মধ্যে, এবং বহু নবজাতক, যারা হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে যেতো, মারা যেতো যত্নের অভাবে।

তাই যে-নারী জন্ম দিতো, সে বোধ করতো না সৃষ্টির গৌরব; সে নিজেকে মনে করতো দুর্বোধ্য শক্তিরাশির খেলার পুতুল এবং সন্তানপ্রসবের যন্ত্রণাদায়ক অগ্নিপরীক্ষাকে তার মনে হতো এক অপ্রয়োজনীয় বা বিঘ্নকর দুর্ঘটনা। সন্তানপ্রসব ও স্তন্যদান কর্ম নয়, এগুলো প্রাকৃতিক কাজ; এতে কোনো পরিকল্পনা নেই; এজন্যেই। নারী এতে নিজের অস্তিত্বকে সগৌরবে ঘোষণার কোনো কারণ দেখে নি–অক্রিয়ভাবে সে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে তার জৈবিক নিয়তির। মাতৃত্বের সাথে মেলানো। সম্ভব বলে তার ভাগ্যে পড়েছে গৃহস্থালির কাজ, যা তাকে বন্দী করে ফেলেছে। পুনরাবৃত্তি ও সীমাবদ্ধতায়। এগুলো পুনরাবৃত্ত হয় দিনের পর দিন একই রূপে, যা অপরিবর্তিতরূপে চলেছে শতাব্দীপরম্পরায়; এগুলো নতুন কিছুই সৃষ্টি করে নি।

পুরুষের ব্যাপারটি মৌলভাবে ভিন্ন; সে রক্ষা করেছে নিজের দলকে, শ্রমিক মৌমাছির মতো জৈবপ্রক্রিয়ায় সরল জৈবিক আচরণ দিয়ে নয়, বরং সে-সব কর্ম দিয়ে, যা অতিক্রম করে গেছে তার পাশব স্বভাব। সময়ের আদি থেকে হোমো

ফাবের হচ্ছে আবিষ্কারক : ফল পাড়া ও পশু বধের জন্যে যে-লাঠি ও গদা দিয়ে সে নিজেকে অস্ত্রসজ্জিত করেছে, তাই পরে হয়ে উঠেছে বিশ্বের ওপর তার অধিকার বিস্তারের হাতিয়ার। সমুদ্রে সে যে-মাছ ধরেছে, তা বাড়িতে নিয়ে আসার মধ্যেই সে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে নি : প্রথমে তাকে জলের রাজ্য জয় করার জন্যে গাছের গুঁড়ি খুঁড়ে তৈরি করতে হয়েছে ক্যানো; বিশ্বের সম্পদ লাভের জন্যে সে অধিকার করেছে বিশ্বটিকেই। এসব কাজের মধ্যে সে পরখ করে নিয়েছে তার শক্তি; সে স্থির করেছে লক্ষ্য এবং তৈরি করেছে সেখানে পৌঁছোনোর পথ; সংক্ষেপে, অস্তিত্বশীল হিশেবে সে লাভ করেছে আত্মসিদ্ধি। রক্ষা করার জন্যে সে সৃষ্টি করেছে; সে বর্তমানকে ভেঙেচুরে বেরিয়ে গেছে, সে খুলেছে ভবিষ্যৎকে। এ-কারণেই মাছধরা ও শিকারের অভিযানগুলোর ছিলো পবিত্র চরিত্র। তাদের সাফল্য উদযাপিত হতো উৎসব ও বিজয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে, এবং এভাবে পুরুষ স্বীকৃতি দিয়েছে তার মানবিক গুণকে। আজো সে তার এ-গর্ব প্রকাশ করে যখন সে নির্মাণ করে একটি বাঁধ বা একটি আকাশচুম্বি অট্টালিকা বা একটি আণবিক চুল্লি। সে শুধু বিশ্বকে যেভাবে পেয়েছে সেভাবে রাখার জন্যে কাজ করে নি; সে সীমা ভেঙে বেরিয়ে গেছে, সে ভিত্তি স্থাপন করেছে নতুন ভবিষ্যতের।

আদিমানুষের কর্মের ছিলো আরেকটি মাত্রা, যা তাকে দিয়েছে পরম গৌরব : অধিকাংশ সময়ই এটা ছিলো ভয়ঙ্কর। রক্ত যদি হতো কোনো পুষ্টিকর তরল পদার্থ, তাহলে তা দুধের থেকে বেশি মূল্য পেতো না; তবে শিকারী কোনো কশাই ছিলো না, কেননা বন্যপশুর সাথে লড়াইয়ে তার ছিলো ভয়ঙ্কর ঝুঁকি। নিজের গোত্রের, যার সে ছিলো অন্তর্ভুক্ত, তার মর্যাদা বাড়ানোর জন্যে যোদ্ধা বিপন্ন করতো নিজের জীবন। এবং এর মধ্যে সে নাটকীয়ভাবে প্রমাণ করতে যে পুরুষের জন্যে জীবনই পরম মূল্যবান নয়, বরং এর বিপরীতে একে ব্যবহার করতে হবে সে সব লক্ষ্য সাধনে, যা জীবনের থেকে গুরুত্বপূর্ণ। নিকৃষ্টতম যে-অভিসম্পাতে অতিশপ্ত হয় নারী, তা হচ্ছে সে পরিত্যক্ত হয় যুদ্ধের সমতুল্য এসব হঠাৎ আক্রমণে অংশগ্রহণ থেকে। কেননা জীবন সৃষ্টি করে নয়, বরং বিপন্ন করে পুরুষ উন্নীত হয় পশুর উর্ধ্বে; এ-কারণেই মানবমণ্ডলির মধ্যে সে-লিঙ্গকেই দেয়া হয়েছে শ্রেষ্ঠত্ব, যে-লিঙ্গ জন্ম দেয় না, বরং হত্যা করে।

এখানেই আমরা পাচ্ছি পুরো রহস্যের চাবি। জৈবিক স্তরে কোনো প্রজাতি টিকে থাকে শুধু নিজেকে নতুনভাবে সৃষ্টি করে; কিন্তু এ-সৃষ্টি শুধু একই জীবনের পুনরাবৃত্তি ঘটায় অধিকতর ব্যক্তিত্ব মধ্যে। কিন্তু পুরুষ জীবনের পুনরাবৃত্তি নিশ্চিত করে যখন সে অস্তিত্বের মধ্য দিয়ে সীমাতিক্রমণ করে যায় জীবনের; এ-সীমাতিক্ৰমণ দিয়ে সে সৃষ্টি করে এমন মূল্যবোধ যা হরণ করে বিশুদ্ধ পুনরাবৃত্তির সমস্ত মূল্য। পশুর মধ্যে পুরুষটির স্বাধীনতা ও ক্রিয়াকলাপের বৈচিত্র্য সম্পূর্ণ নিরর্থক, কেননা তাতে কোনো লক্ষ্য জড়িত নেই। নিজের প্রজাতির প্রতি দায়িত্ব পালন ছাড়া সে আর যা কিছু করে, তার সবই তুচ্ছ। আর সেখানে মানব পুরুষ নিজের প্রজাতির প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বদলে দেয় পৃথিবীর মুখমণ্ডল, সে নতুন যন্ত্রপাতি সৃষ্টি করে, সে উদ্ভাবন করে, সে গঠন করে ভবিষ্যতের রূপ। পুরুষ নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পায় নারীর নিজের সহযোগিতার সমর্থন। কেননা নারী নিজেও এক অস্তিত্বশীল, সেও বোধ করে পেরিয়ে যাওয়ার প্রবর্তনা, এবং তার লক্ষ্য শুধু নিতান্তই পুনরাবৃত্তি করা। নয়, বরং একটি ভিন্ন ভবিষ্যতের দিকে সীমাতিক্ৰমণ–অন্তরের অন্তস্তলে নারী বোধ করে পুরুষের দাম্ভিকতার নিশ্চিত প্রমাণ। সে পুরুষের সাথে যোগ দেয় সে-সব উৎসবে, যা উদযাপন করে পুরুষের সাফল্য ও বিজয়। নারীর দুর্ভাগ্য সে জীবনের পুনরাবৃত্তির জন্যে জৈবিকভাবেই নিয়ন্ত্রিত, যদিও তার মতেই জীবন নিজের মধ্যে বহন করে না জীবনলাভের কারণ, যে-কারণগুলো জীবনের থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রভু ও দাসের সম্পর্ক সংজ্ঞায়িত করার জন্যে যে-সব যুক্তি দিয়েছেন হেগেল, সেগুলো বেশি ভালোভাবে কাজ করে পুরুষ ও নারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে। সত্য হচ্ছে যে নারী কখনো পুরুষের মূল্যবোধের বিপরীতে সৃষ্টি করে নি নারীর মূল্যবোধ; পুরুষের সুযোগসুবিধা সংরক্ষণের জন্যে পুরুষই উদ্ভাবন করেছে ওই বিচ্যুতি। পুরুষ সৃষ্টি করেছে নারীর জন্যে এক এলাকা–জীবনের রাজ্য, সীমাবদ্ধতার রাজ্য–নারীকে সেখানে বন্দী করে রাখার জন্যে। কিন্তু লিঙ্গনিরপেক্ষভাবেই প্রতিটি অস্তিত্বশীল চায় সীমাতিক্রমণের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিপন্ন করতে নারীদের বশ্যতাই হচ্ছে এবিবৃতির প্রমাণ। পুরুষ যে-অধিকারে অস্তিত্বশীল হয়েছে, সে-একই অধিকারে আজ নারীরা দাবি করে অস্তিত্বশীল হিশেবে নিজেদের স্বীকৃতি এবং অস্তিত্বকে অধীন করতে চায় না জীবনের, মানবসত্তাকে অধীন করতে চায় না তার পাশবিকতার।

অস্তিত্ববাদী পরিপ্রেক্ষিত আমাদের বুঝতে সমর্থ করেছে কীভাবে আদিম যাযাবরদের জৈবিক ও আর্থনীতিক অবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলো পুরুষাধিপত্য। স্ত্রীলিঙ্গ, পুংলিঙ্গের থেকে অনেক বেশি পরিমাণে, তার প্রজাতির শিকার, আর মানব জাতি সব সময়ই চেষ্টা করেছে তার বিশেষ নিয়তি থেকে মুক্তি পাওয়ার। জীবনসংরক্ষণ পুরুষের জন্যে হয়েছে একটি সক্রিয় কর্ম এবং হাতিয়ার আবিষ্কারের মাধ্যমে একটি কর্ম পরিকল্পনা; কিন্তু মাতৃত্বের মধ্যে নারী, পশুর মতোই দৃঢ়ভাবে বাঁধা রয়েছে তার দেহের সাথে। পুরুষ চেয়েছে কালপরম্পরায় নিজেকে শুধু পুনরাবৃত্ত না করতে : চেয়েছে বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ভবিষ্যত গড়তে। পুরুষের কর্মকাণ্ড মূল্যবোধ সৃষ্টি করতে গিয়ে অস্তিত্বকেই একটি মূল্যবোধে পরিণত করেছে; এ-কর্মকাণ্ড আধিপত্য বিস্তার করেছে জীবনের বিভ্রান্ত শক্তিগুলোর ওপর; এটাই পরাভূত করেছে প্রকৃতি ও নারীকে।

ভূমির আদিকৃষকেরা

প্রথম খণ্ড । ভাগ ২ – ইতিহাস । পরিচ্ছেদ ২

এইমাত্র আমরা দেখেছি যে আদিম যাযাবরদের মধ্যে নারীর ভাগ্য ছিলো খুবই কঠিন, এবং কোনো সন্দেহ নেই যে-নিষ্ঠুর অসুবিধাগুলো বিকল করে রেখেছিলো নারীকে, সেগুলো দূর করার কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয় নি। তবে পরে পিতৃসুলভ স্বৈরাচারের উদ্যোগে বলপ্রয়োগ করে নারীকে যেমন পীড়ন করা হয়েছে, তেমন পীড়নও করা হয় নি। কোনো সংস্থা দূর করে নি দু-লিঙ্গের অসাম্য, আসলে কোনো সংস্থাই ছিলো না–ছিলো না সম্পত্তি, ছিলো না উত্তরাধিকার, ছিলো না আইন। ধর্ম ছিলো ক্লীব : উপাসনা করা হতো কোনো অলিঙ্গ টোটেমের।

সংস্থা ও আইন দেখা দেয় যখন যাযাবররা বসতি স্থাপন করে হয়ে ওঠে কৃষিজীবী। পুরুষকে আর বিরূপ প্রাকৃতিক শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না; বিশ্বের ওপর সে যে-রূপ চাপিয়ে দিতে চায়, তার মধ্য দিয়ে সে নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করে ভাবতে শুরু করে বিশ্ব ও নিজের সম্পর্কে। এসময়ে লৈঙ্গিক পার্থক্য প্রতিফলিত হয় মানবগোষ্ঠির সংগঠনে, এবং এটি ধারণ করে এক বিশেষ রূপ। কৃষিসমাজে নারীকে মাঝেমাঝে ভূষিত করা হতো এক অসাধারণ মর্যাদায়। কৃষিভিত্তিক সভ্যতায় সন্তান যে-নতুন গুরুত্ব অর্জন করে, মূলত তার সাহায্যেই ব্যাখ্যা করতে হবে এ-মর্যাদাকে। বিশেষ এলাকায় বসতি স্থাপন করে পুরুষ তার ওপর প্রতিষ্ঠা করে নিজের মালিকানা, এবং সম্পত্তি দেখা দেয় যৌথরূপে। সম্পত্তির জন্যে দরকার পড়ে তার মালিকের থাকবে উত্তরপুরুষ, এবং মাতৃত্ব হয়ে ওঠে এক পবিত্র ভূমিকা।

বহু গোত্র বাস করতো সংঘের অধীনে, তবে এর অর্থ এ নয় যে নারীরা থাকতো সাধারণভাবে সব পুরুষের অধিকারে–এখন আর মোটেই মনে করা হয় না যে অবাধ যৌনতা কখনো ছিলো সাধারণ রীতি–তবে পুরুষ ও নারী ধর্মীয়, সামাজিক, ও আর্থনীতিক অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা লাভ করতে শুধু একটি দল হিশেবে : তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ছিলো নিতান্তই এক জৈবিক সত্য। বিবাহ–একপতিপত্নীক, বহুপত্নীক, বা বহুস্বামীক–তার রূপ যা-ই হোক-না-কেননা, ছিলো একটা ঐহিক আকস্মিকতা, এটা কোনো অতীন্দ্রিয় বন্ধন সৃষ্টি করতো না। এটা স্ত্রীটিকে কোনো দাসত্ববন্ধনে জড়াতো না, কেননা সে তখনো যুক্ত থাকতো তার নিজের গোত্রের সাথে।

এখন, অনেক আদিম মানবগোষ্ঠিই অজ্ঞ ছিলো সন্তান জন্মদানে পিতার ভূমিকা সম্বন্ধে (অনেক ক্ষেত্রে একে আজো সত্য বলে মনে হয়); সন্তানদের তারা মনে করতো তাদেরই পিতৃপুরুষদের প্রেতাত্মার পুনর্জন্মগ্রহণ বলে, যে-প্রেতাত্মারা বাস করতো কোনো গাছে বা প্রস্তরে, কোনো পবিত্র স্থানে, এবং নেমে এসে ঢুকতে নারীদের শরীরে। অনেক সময় মনে করা হতো যে এ-অনুপ্রবেশ যাতে সহজ হয়, তার জন্যে নারীদের কুমারী থাকা ঠিক হবে না; তবে অন্যান্য জনগোষ্ঠি বিশ্বাস করতো যে এটা নাক দিয়ে বা মুখ দিয়েও ঘটতে পারে। তা যা-ই হোক, এতে সতীত্বমোচন ছিলো গৌণ, এবং অতীন্দ্রিয় প্রকৃতির কারণে খুব কম সময়ই এটা ছিলো স্বামীর বিশেষাধিকার।

তবে সন্তান জন্মদানের জন্যে মা ছিলো সুস্পষ্টভাবে আবশ্যক; মা-ই ছিলো সেজন, যে নিজ দেহের ভেতরে জীবাণুটিকে রক্ষা করতে ও তার পুষ্টি যোগাতো, সুতরাং তার মাধ্যমেই গোত্রের জীবন বিস্তার লাভ করতে দৃশ্যমান বিশ্বে। এভাবে সে পালন করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অধিকাংশ সময়ই শিশুরা অন্তর্ভুক্ত হতে তাদের মায়ের গোত্রে, ধারণ করতো গোত্রের নাম, এবং পেন্সে গোত্রের অধিকার ও সুযোগসুবিধা, বিশেষ করে গোত্রের অধিকারে যে-জমি থাকতো, তা ব্যবহারের অধিকার। সংঘের সম্পত্তি উত্তরাধিকারীরা পেতো নারীদের কাছ থেকে : নারীদের মাধ্যমে ভূমি ও শস্যের মালিকানা নিশ্চিত করা হতো গোত্রের সদস্যদের মধ্যে, এবং বিপরীতভাবে এ-সদস্যরা তাদের মায়েদের মাধ্যমে নির্ধারিত হতো এই বা ওই এলাকার জন্যে। আমরা তাই অনুমান করতে পারি যে এক অতীন্দ্রিয় অর্থে মৃত্তিকার মালিক ছিলো নারীরা : ভূমি ও তার শস্যের ওপর নারীদের ছিলো অধিকার, যা ছিলো যুগপৎ ধর্মীয় ও আইনগত। নারী ও ভূমির মধ্যে বন্ধন ছিলো মালিকানার থেকেও ঘনিষ্ঠ, কেননা মাতৃধারার ব্যবস্থায় বৈশিষ্ট্যই ছিলো নারীকে মৃত্তিকার সাথে সত্যিকারভাবে সমীভূত করা; উভয়ের মধ্যেই জীবনের চিরস্থায়িত্ব–যা ছিলো মূলত প্রজনন–লাভ করা হতো তার ব্যক্তিক মূর্তপ্রকাশদের, অবতারদের জন্মদানের মাধ্যমে।

যাযাবরদের কাছে সন্তানের জন্মকে নিতান্ত আকস্মিক ঘটনার বেশি কিছু মনে হতো না, এবং মৃত্তিকার সম্পদের কথা ছিলো তাদের অজানা; কিন্তু কৃষিজীবী বিস্মিত হতে উৎপাদনশীলতার রহস্যে, যা দ্রুত বিকশিত হয়ে উঠতো তার হলরেখায় ও মাতার শরীরের ভেতরে : সে বুঝতে পারতো সেও জন্মেছে ওই পশু ও শস্যের মতো, সে চাইতো তার গোত্র জন্ম দিক আরো পুরুষ, যারা তার গোত্রকে স্থায়িত্ব দেয়ার সাথে ভূমির উর্বরতাকেও দেবে স্থায়িত্ব; প্রকৃতিকে তার মনে হতো মায়ের মতো : ভূমি হচ্ছে নারী এবং নারীর ভেতরে বাস করে সে-একই দুর্বোধ্য শক্তিগুলো, যেগুলো বাস করে মাটির গভীরে। এ-কারণেই কৃষিকাজের ভার অনেকটা দেয়া হতো নারীর ওপর; পিতৃপুরুষদের প্রেতাত্মাদের যে ডেকে আনতে পারে নিজের শরীরের ভেতরে, তার সে-শক্তিও থাকার কথা যা দিয়ে সে রোপন করা জমিতে ফলাবে ফল ও শস্য। উভয় ক্ষেত্রেই কোনো সৃষ্টিশীল কাজের ব্যাপার ছিলো না, ছিলো ইন্দ্রজালের ব্যাপার। এ-পর্যায়ে শুধু মাটির শস্যরাজি সংগ্রহের মধ্যে পুরুষ আর নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে নি, তবে সে তখনো নিজের শক্তিকে বুঝতে পারে নি। নিজেকে অক্রিয় বোধ করে, যেপ্রকৃতি নির্বিচারে ঘটাতে জীবন ও মৃত্যু, তার ওপর নির্ভরশীল থেকে দ্বিধান্বিতভাবে সে দাঁড়িয়ে ছিলো কৌশল ও যাদুর মধ্যে। একথা সত্য, কম বা বেশি স্পষ্টভাবে সে বুঝতে পারে যৌনকর্মের এবং যে-সব কৌশলে সে ভূমিকে আবাদযোগ্য করে তুলছে, তার কার্যকারিতা। এ-সত্ত্বেও সন্তান ও শস্যকে দেবতাদের দান বলেই মনে করা হতো এবং বিশ্বাস করা হতো যে নারীর শরীর থেকে বয়ে আসা রহস্যময় প্রবাহগুলো এ-বিশ্বে নিয়ে আসে জীবনের রহস্যময় উৎসে নিহিত সম্পদরাশি।

এসব বিশ্বাসের মূল খুবই গভীরে প্রোথিত এবং আজো টিকে আছে ভারতি, অস্ট্রেলীয়, ও পলিনেশীয় অনেক গোত্রের মধ্যে। অনেক গোত্রে বন্ধ্যা নারীকে ভয়ঙ্কর মনে করা হয় বাগানের জনে, অনেক গোত্রে মনে করা হয় যে ফলন হবে প্রচুর যদি ফসল কাটে গর্ভবতী নারী; আগে ভারতে রাতের বেলা নগ্ন নারীরা জমির চারদিকে লাঙল চালাতো ইত্যাদি। এক উপবিষ্ট অস্তিত্বের মধ্যে বন্দী করে মাতৃত্ব ধ্বংস করে নারীকে; তাই এটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে যে যখন সে থাকে চুলোর ধারে তখন পুরুষ শিকার করে, মাছ ধরে, এবং যুদ্ধ করে। আদিম মানুষদের উদ ছিলো ছোটো, সেগুলোর অবস্থান ছিলো গ্রামের সীমার মধ্যেই; এবং তাদের কৃষিকাজ ছিলো একটা গৃহস্থালির কাজ; এবং প্রস্তুর যুগের হাতিয়ার ব্যবহারেো খুব বেশি শক্তির দরকার পড়তো না। অর্থনীতি ও ধর্ম কৃষিকাজের ভার ছেড়ে দিয়েছিলো নারীর হাতে। যখন গার্হস্থ্যশিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে, তাও হয় তাদের জন্যে দুর্ভাগ্য : তারা মাদুর বোনে ও কাঁথা সেলাই করে এবং বানায় হাঁড়িপাতিল। তাদের মধ্য দিয়েই গোত্রের জীবন সংরক্ষিত ও সম্প্রসারিত হতো; সন্তান, পশু, শস্য, হাঁড়িপাতিল, দলের সব ধরনের সমৃদ্ধি নির্ভর করতে তাদের শ্রম ও ঐন্দ্রজালিক শক্তির ওপর তারা ছিলো সমাজের আত্মা। এ-শক্তি পুরুষের মনে জাগাতো ভয়মেশানো ভক্তি, যা প্রতিফলিত হতো তাদের উপাসনায়। সমগ্র বিরুদ্ধ প্রকৃতির সারসংক্ষেপ ঘটেছিলো নারীতে।

যেমন ইতিমধ্যেই আমি বলেছি, পুরুষ কখনো অপর-এর কথা না ভেবে নিজের সম্পর্কে ভাবে না; সে বিশ্বকে দেখে দ্বৈততার প্রতীকে, যা প্রথমত যৌন ধরনের নয়। কিন্তু পুরুষের থেকে ভিন্ন হয়ে, যে-পুরুষ নিজেকে নির্দেশ করে পুরুষ বলেই, স্বাভাবিকভাবেই নারীকে নির্দেশ করা হয় অপর বলে; অপর হচ্ছে নারী। যখন নারীর ভূমিকা বৃদ্ধি পায়, তখন সে পুরোপুরিভাবে নির্দেশ করে অপর-এর এলাকা। তারপর দেখা দিতে থাকে সে-দেবীরা, যাদের মধ্য দিয়ে পুজো করা হয় উর্বরতার ধারণাকে। সুসায় পাওয়া গেছে মহাদেবীর, মহামাতার আদিতম মূর্তি, যার বস্ত্র দীর্ঘ এবং কেশবিন্যাস উচ্চ, অন্যান্য মূর্তিতে যাকে আমরা দেখতে পাই মিনারের মুকুটশোভিত। ক্রিটে খননকার্যের ফলে এমন কয়েকটি মূর্তি পাওয়া গেছে। কখনো কখনো সে স্কুল ও অবনত, কখনো কখনো তন্বী ও দণ্ডায়মান, কখনো বস্ত্রপরিহিত এবং প্রায়ই নগ্ন, তার দুই বাহু চেপে আছে তার স্ফীত স্তনযুগলের নিচে। সে স্বর্গের রাণী, তার প্রতীক কপোত; সে নরকেরও সম্রাজ্ঞী, যখন সে হামাগুড়ি দিয়ে চলে তখন সাপ তার প্রতীক। সে আবির্ভূত হয় পর্বতে ও অরণ্যে, সমুদ্রে, ঝরনাধারায়। সবখানেই সে সৃষ্টি করে জীবন; যদিও সে হত্যা করে, তবু সে আবার জীবন দেয় মৃতকে। চপলা, বিলাসিনী, প্রকৃতির মতো নির্মম, একই সাথে প্রসন্ন ও ভয়ঙ্করী সে রাজত্ব করে সমগ্র অ্যাজিয়ান দ্বীপপুঞ্জে, ফ্রিজিয়া, সিরিয়া, আনাতোলিয়ায়, সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায়। ব্যাবিলনিয়ায় তাকে বলা হতো ইশতার, সেমেটীয়রা বলতো আস্তারতে, এবং গ্রিকরা বলতো গাইয়া, বা সিবিলে। মিশরে তাকে আমরা দেখতে পাই আইসিস রূপে। পুরুষ দেবতারা ছিলো তার অধীনে।

সুদূর স্বর্গ ও নরকের পরম দেবীপ্রতিমা, নারী সব পবিত্র সত্তার মতোই মর্ত্যে পরিবৃত ছিলো ট্যাবুতে, সে নিজেই ট্যাবু; সে ধারণ করতো যে-শক্তি, তারই জন্যে তাকে দেখা হতো এক ঐন্দ্রজালিক, অভিচারিণীরূপে। প্রার্থনায় তার আবাহন করা হতো, কখনো সে হয়ে ওঠে যাজিকা, যেমন হতে প্রাচীন কেল্টদের ড্রইডদের মধ্যে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সে অংশ নেয় গোত্রীয় শাসনকর্মে, এমন কি হয় একক শাসক। এ-সুদূর যুগগুলো আমাদের জন্যে কোনো সাহিত্য রেখে যায় নি। কিন্তু পিতৃতন্ত্রের মহাপর্বগুলো তাদের পুরাণ, কীর্তিস্তম্ভ, ও ঐতিহ্যধারার মধ্যে সংরক্ষণ করেছে সেসময়ের স্মৃতি, যখন খুবই মহিমান্বিত অবস্থান অধিকার করে ছিলো নারীরা। নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে, ঋগ্বেদ-এর যুগের উঁচু অবস্থান থেকে নারীর পতন ঘটতে থাকে ব্রাহ্মণ্য যুগে, এবং ঋগ্বেদ-এর যুগে পতন ঘটেছিলো পূর্ববর্তী আদম স্তর থেকে। ইসলামপূর্ব যুগে বেদুইন নারীরা উপভোগ করতে কোরানে প্রদত্ত মর্যাদার থেকে অনেক উচ্চতর মর্যাদা। নিওবি, মিডিয়ার মহামূর্তিগুলো এমন এক যুগের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে, যখন মাতারা গর্ববোধ করতো তাদে্র সন্তানদের নিয়ে, মনে করতো সন্তানেরা একান্তভাবে তাদেরই সম্পদ। এবং হোমারের কাব্যে অ্যান্ড্রোমাকি ও হেকিউবার ছিলো এমন গুরুত্ব, যা ধ্রুপদী গ্রিস আর নারীকে দেয় নি।

এসব তথ্য এমন অনুমানের দিকে এগিয়ে দেয় যে আদিম কালে সত্যিই ছিলো নারীরাজত্বের একটা যুগ : মাতৃতন্ত্র। বাখোফেনের প্রস্তাবিত এ-প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন এঙ্গেলস, এবং মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণকে তিনি বলেছিলেন নারীজাতির ঐতিহাসিক মহাপরাজয়। তবে নারীর সে-স্বর্ণযুগ আসলে একটি কিংবদন্তি মাত্র। একথা বলা যে নারী ছিলো অপর, এর অর্থ হচ্ছে দুলিঙ্গের মধ্যে কখনোই পারস্পরিক সম্পর্ক বিরাজ করে নি; ভূমি, মাতা, দেবী–

পুরুষের চোখে সে কোনো সঙ্গী প্রাণী ছিলো না; তার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত ছিলো মানবিক এলাকার বাইরে, সুতরাং সে ছিলো ওই এলাকার বাইরের। সমাজ চিরকালই থেকেছে পুরুষের; রাজনীতিক শক্তি চিরকালই থেকেছে পুরুষের হাতে। সর্বসাধারণ বা সামাজিক কর্তৃত্ব সর্বদাই থাকে পুরুষের অধিকারে, আদিম সমাজ বিষয়ক এক গবেষণার শেষ দিকে ঘোষণা করেছেন লেভি-স্ট্রাউস।

পুরুষের কাছে সব সময়ই সহকর্মী হচ্ছে আরেকজন পুরুষ, আরেকজনও তারই মতো, যার সাথে গড়ে ওঠে তার পারস্পরিক সম্পর্ক। সমাজের মধ্যে এক রূপে বা অন্য রূপে গড়ে ওঠে যে-দ্বৈততা, তাতে এক দল পুরুষ বিপক্ষে যায় আরেক দল পুরুষের; নারীরা হয় তাদের সম্পত্তির অংশ, যা থাকে দু-দল পুরুষেরই দখলে এবং যা তাদের মধ্যে বিনিময়ের একটি মাধ্যম। নারী কখনোই নিজের পক্ষ থেকে পুরুষের বিপরীতে একটি পৃথক দল গড়ে তোলে নি। তারা কখনোই পুরুষের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ ও স্বায়ত্তশাসিত সম্পর্কে আসে নি। বিয়ের মধ্যে থাকে যে পারস্পরিক বন্ধন, তা পুরুষেরা ও নারীরা স্থাপন করে না, বরং নারীর মাধ্যমে তা স্থাপিত হয় পুরুষদের ও পুরুষদের মধ্যে, নারীরা তাতে থাকে শুধু প্রধান ব্যাপার, বলেছেন লেভি-স্ট্রাউস। নারীটি যে-সমাজের অন্তর্ভুক্ত, তার বংশধারা নির্দেশের রীতি যাই হোক-না-কোনো, তাতে নারীর প্রকৃত অবস্থার কোনো বদল ঘটে না; তা মাতৃধারাই হোক, বা পিতধারাই হোক, বা উভয়ধারাই হোক, বা অভিন্ন ধারাই হোক, সে সব সময়ই থাকে পুরুষদের অভিভাবকত্বে। একমাত্র প্রশ্ন হচ্ছে বিয়ের পর নারী থাকবে কার কর্তৃত্বে, পিতার না বয়োজ্যষ্ঠ ভ্রাতার–এমনকি এ-কর্তৃত্ব সম্পসারিত হতে পারে নারীর সন্তানদের পর্যন্ত না কি সে থাকবে তার স্বামীর কর্তৃত্বে। নারী, নিজের দিক দিয়ে, কখনোই তার ধারার প্রতীকের থেকে বেশি কিছু নয়… মাতৃধারার বংশধারা হচ্ছে নারীটির পিতা বা ভ্রাতার অভিভাবকত্ব, যা পেছনের দিকে সম্প্রসারিত হয়ে গিয়ে পৌঁছে ভাইয়ের গ্রামে, এটা লেভি-স্ট্রাউস থেকে আরেকটি উদ্ধৃতি। সে নিতান্তই অভিভাবকত্বের মধ্যস্থতাকারী, সে অভিভাবক নয়। সত্য হচ্ছে বংশধারার রীতি অনুসারে সম্পর্ক নির্ণীত হয় দুটি দলের পুরুষের মধ্যে, দুটি লিঙ্গের মধ্যে নয়।

বাস্তবিকভাবে নারীর প্রকৃত অবস্থা এক বা অন্য ধরনের কর্তৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত নয়। এমন হতে পারে যে মাতৃধারার পদ্ধতিতে তার অবস্থান অতি উচ্চে; তবু আমাদের সতর্কতার সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে কোনো গোত্রের  প্রধান বা রাণীরূপে কোনো নারী থাকলেই বোঝায় না যে সেখানে নারীরাই সার্বভৌম : মহান ক্যাথেরিনের সিংহাসন আরোহণের ফলে রাশিয়ার কৃষক নারীর ভাগ্যের কোনো বদল ঘটে নি; এবং এমন পরিস্থিতিতে নারী প্রায়ই বাস করে শোচনীয় অবস্থায়। উপরন্তু, এমন ঘটনা খুবই দুর্লভ যেখানে স্ত্রীটি বাস করে তার গোত্রের সঙ্গে, আর তার স্বামীকে দেয়া হয় তার সাথে স্বল্পকালীন, এমনকি সংগোপন সাক্ষাতের অনুমতি। অধিকাংশ সময়ই সে যায় স্বামীর করার জন্যে, এটি এমন ঘটনা যা পুরুষের প্রাধান্য প্রদর্শনের জন্যে যথেষ্ট।

অধিকতর ব্যাপক পরিবর্তনমূলক ব্যবস্থায় পরস্পরসংবদ্ধ হয় দু-রকম কর্তৃত্ব, একটি ধর্ম, আর অপরটি ওঠে পেশা ও ভূমিচাষ ভিত্তি করে। ঐহিক সংস্থা হওয়া সত্ত্বেও বিয়ের আছে এক বিশাল সামাজিক গুরুত্ব, এবং দাম্পত্য পরিবার, ধর্মীয় তাৎপর্যহীন হয়ে পড়লেও, মানবিক স্তরে যাপন করে এক তীব্র জীবন। এমনকি যে-সব জনগোষ্ঠিতে বিরাজ করে মহাযৌনস্বাধীনতা, সেখানেও যে-নারী পৃথিবীতে একটি শিশু আনে, তাকে বিবাহিত হওয়া সঙ্গত; সে একলা নিজের সন্তান নিয়ে একটি দল গঠনে অসমর্থ। এবং তার ভাইয়ের ধর্মীয় তত্ত্বাবধান অপ্রতুল : একটি স্বামীর উপস্থিতি দরকার। তার সন্তানের ব্যাপারে পুরুষটির প্রায়ই থাকে গুরুদায়িত্ব। তারা তার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হয় না, তবুও তাকেই তাদের ভরণপোষণ ও লালনপালন করতে হয়। স্বামী ও স্ত্রীর, পিতা ও পুত্রের মধ্যে স্থাপিত হয় সঙ্গমের, কর্মের, অভিন্ন স্বার্থের, প্রীতির বন্ধন।

অতীন্দ্রিয় ও আর্থনীতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য একটি অস্থির ব্যাপার। পুরুষ প্রায় সর্বদাই তার ভ্রাতপুত্রের থেকে নিজের পুত্রের সাথে অনেক বেশি দৃঢ়ভাবে লগ্ন থাকে; যখন সময় আসে সে নিজেকে পিতা হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করতেই বেশি পছন্দ করে। এ-কারণেই বিবর্তন যখন পুরুষকে আত্মসচেতনতা ও নিজের ইচ্ছে প্রয়োগের পর্যায়ে নিয়ে আসে, তখন প্রতিটি সমাজ পিতৃতান্ত্রিক রূপ ধারণ করতে থাকে। তবে একথাটিকে গুরুত্ব দিতে হবে যে এমনকি যখন সে বিহ্বল ছিলো জীবনের, প্রকৃতির, ও নারীর রহস্যের মুখখামুখি, তখনও সে কখনো শক্তিহীন ছিলো না; যখন, নারীর ভয়ঙ্কর ইন্দ্রজালে সন্ত্রস্ত হয়ে, সে নারীকে প্রতিষ্ঠিত করে অপরিহার্যরূপে, তখনও সেই নারীকে প্রতিষ্ঠিত করে এই রূপে এবং এভাবে এ-স্বেচ্ছাবিচ্ছিন্নতাবোধের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে সে-ই কাজ করে অপরিহার্যরূপে। নারীর উর্বরতাশক্তি সত্ত্বেও পুরুষই থেকেছে নারীর প্রভু, যেমন পুরুষই মালিক উর্বর ভূমির; যার ঐন্দ্রজালিক উর্বরতার সে প্রতিমূর্তি, সে-প্রকৃতির মতো পুরুষের অধীনে, অধিকারে, শশাষণের মধ্যে থাকাই নারীর নিয়তি। পুরুষের কাছে সে পায় যে-মর্যাদা, তা তাকে দিয়েছে পুরুষই; পুরুষ প্রণাম করে অপরকে, উপাসনা করে দেবী মাতার। তবে এভাবে নারীকে যতো শক্তিশালীই বলেই মনে হোক, সে এটা লাভ করেছে শুধু পুরুষের মনের ভাবনার মধ্য দিয়েই।

পুরুষ যতো মূর্তি তৈরি করেছে, সেগুলোকে যতোই করা মনে হোক-না-কোননা, আসলে সেগুলো পুরুষেরই অধীন; এবং এ-কারণে সেগুলোকে ধ্বংস করার শক্তিও সব সময় রয়েছে তার আয়ত্তে। আদিম সমাজে ওই অধীনতা স্বীকার করা হয় না এবং খোলাখুলিভাবে প্রয়োগ করা হয় না, তবে ঘটনার প্রকৃতি অনুসারে এর আছে অব্যবহিত অস্তিত্ব; এবং পুরুষ যখনই অর্জন করবে স্পষ্টতর আত্মসচেতনতা, যখনই সে সাহস পাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ও প্রতিরোধ করতে, তখনই প্রয়োগ করা হবে একে।

নারীর মধ্যে বহুবার পুনর্জন্ম নিতো যে-টোটেমি পিতৃপুরুষ, পশু বা বৃক্ষবাসী কারো নামে সে ছিলো এক পুরুষ-নীতি; নারী পিতৃপুরুষের অস্তিত্বকে স্থায়িত্ব দিতো দেহে, কিন্তু তার ভূমিকা ছিলো শুধুই পুষ্টিসাধনের, তা কখনো সৃষ্টিশীল ছিলো না। কোনো এলাকায়ই নারী সৃষ্টি করতো না; সন্তান ও অন্ন দিয়ে সে রক্ষা করতো গোত্রের জীবন, তবে এর বেশি কিছু নয়। সীমাবদ্ধতায় বন্দী হয়ে ধ্বংস হয় নারী, সে পুনর্জন্ম ঘটাতে থাকে শুধু সমাজের স্থিত বৈশিষ্ট্যের, আর আটকে থাকে তাতেই। তখন পুরুষ এগিয়ে যায় সে-সব কর্মকাণ্ডে, যা সমাজকে খুলে দেয় প্রকৃতি ও অন্য মনুষ্যমণ্ডলির দিকে। পুরুষের যোগ্য কাজ ছিলো যুদ্ধ, শিকার, মাছধরা; সে লুণ্ঠন করে সম্পদ নিয়ে এসে দান করতে নিজের গোত্রকে; যুদ্ধ, শিকার, ও মাছধরা বোঝাতা অস্তিত্বের প্রসারণ, অস্তিত্বকে বিশ্বের দিকে প্রসারিত করে দেয়া। পুরুষ একাই থাকতো সীমাতিক্ৰমণতার প্রতিমূর্তি। তখনও তার পৃথিবী-নারীর ওপর সম্পূর্ণ আধিপত্য করার বাস্তব উপায় ছিলো না; তখনও সে পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করে নি–তবে এর মাঝেই পুরুষের মনে বাসনা জাগে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার।

আমার মতে এ-বাসনার মধ্যেই খুঁজতে হবে বহির্বিবাহ নামক প্রসিদ্ধ প্রথাটির গভীরপ্রাথিত কারণ, যে-প্রথা মাতৃধারার সমাজগুলোতে যা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। পুরুষ যদি জন্মদানে তার ভূমিকা সম্পর্কে অজ্ঞও থাকে, তবু বিয়ে তার জন্যে এক বিশাল গুরুত্বের ব্যাপার : বিয়ের মধ্য দিয়েই সে অর্জন করে পুরুষের মর্যাদা, এবং একখণ্ড জমি হয় তার। গোত্রটির সাথে সে জড়িত তার মায়ের মাধ্যমে, তার মাধ্যমে সে জড়িত তার পূর্বপুরুষদের ও তার সমস্ত কিছুর সাথে; কি তার সমস্ত ঐহিক ভূমিকায়, কর্মে, বিবাহে, সে মুক্তি পেতে চায় এ-বৃত্ত থেকে, সীমাবদ্ধতার ওপর জ্ঞাপন করতে চায় সীমাতিক্ৰমণতা, সে উন্মুক্ত করতে চায় এক ভবিষ্যৎ, যা খুবই ভিন্ন সেঅতীতের থেকে, যার গভীরে লুপ্ত তার মূল। বিভিন্ন সমাজে স্বীকৃত সম্পর্কের রীতি অনুসারে অজাচার নিষিদ্ধকরণ নেয় বিভিন্ন রূপ, তবে আদিম কাল থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত এটা ধারণ করে আছে একই অর্থ : পুরুষ তা অধিকার করতে চায় সে যা নয়, সে তার সাথে মিলন চায় যাকে মনে হয় তার নিজেকে থেকে অপর। সুতরাং স্ত্রী তার স্বামীর মানার অংশী হবে না, তাকে হতে হবে স্বামীর কাছে অপরিচিত, এবং এভাবে তার গোত্রের কাছে অপরিচিত। আদিম বিবাহ অনেক সময় অনুষ্ঠিত হয়, সত্যিকার বা প্রতীকী, অপহরণের মধ্য দিয়ে, এবং নিশ্চিতভাবেই অপরের ওপর যেহিংস্রতা চালানো হয়, তা-ই হচ্ছে ওইজনের বিকল্পতার অতিশয় স্পষ্ট ঘোষণা। বলপ্রয়োগ করে নিজের স্ত্রীকে গ্রহণ করে যোদ্ধা দেখায় যে সে অপরিচিতদের সম্পদ নিজের অধিকারে আনতে এবং জন্মসূত্রে তার জন্যে নির্ধারিত হয়েছে যে-নিয়তি, তার সীমা ভেঙে ফেলতে সমর্থ। বিচিত্র রীতিতে স্ত্রী-ক্রয়–কর দান, সেবা দান–যদিও কম নাটকীয়, তবুও তার তাৎপর্য একই।

অল্প অল্প করে পুরুষ কাজ করতে থাকে তার অভিজ্ঞতা অনুসারে, এবং তার প্রতীকী উপস্থাপনে, যেমন তার বাস্তব জীবনে, যা জয়লাভ করে তা হচ্ছে পুরুষনীতি। চেতনা জয়ী হয় জীবনের ওপর, সীমাতিক্রমণতা জয়ী হয় সীমাবদ্ধতার ওপর, কৌশল জয় লাভ করে ইন্দ্রজালের ওপর, এবং যুক্তি জয় লাভ করে কুসংস্কারের। ওপর। মানুষের ইতিহাসে নারীর অবমূল্যায়ন হয়ে ওঠে একটি আবশ্যক পর্ব, কেননা নারীর মর্যাদা তার সদর্থক মূল্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, প্রতিষ্ঠিত পুরুষের দুর্বলতার ওপর। নারীতে মূর্তি পরিগ্রহ করে প্রকৃতির বিশৃঙ্খলাকর রহস্যগুলো, আর তখনই পুরুষ মুক্তি পায় নারীর অধিকার থেকে, যখন সে নিজেকে মুক্ত করে প্রকৃতি থেকে। লৌহ যুগ থেকে ব্রোঞ্জ যুগে অগ্রগতি তার শ্রমের মাধ্যমে তাকে সমর্থ করে মাটির ওপর তার প্রভুত্ব স্থাপনে ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। কৃষক মৃত্তিকার বাধাবিঘ্নের অধীন, বীজের অঙ্কুরোগমের অধীন, ঋতুর অধীন; সে অক্রিয়, সে প্রার্থনা করে, সে প্রতীক্ষা করে; এ-কারণেই একদা টোটেমি প্রেতাত্মারা ভিড় জমিয়েছিলো পুরুষের বিশ্বে; কৃষক তার চারপাশের এ-শক্তিগুলোর চপলতার অধীন। যন্ত্ৰকুশল পুরুষ, এর বিপরীতে, নিজের নকশা অনুসারে তৈরি করে তার যন্ত্রপাতি; তার পরিকল্পনা অনুসারে তার হাত দিয়ে একে সে গঠন করে; অক্রিয় প্রকৃতির মুখখামুখি হয়ে সে জয় করে প্রকৃতির প্রতিরোধ এবং দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে তার সার্বভৌম ইচ্ছা। যদি সে নেহাইয়ের ওপর তার আঘাত দ্রুততর করে, তাহলে কম সময়ের মধ্যে সে তৈরি করে তার হাতিয়ার, আর সেখানে কোনো কিছুই শস্যের পেকে ওঠাকে ত্বরান্বিত করতে পারে না। সে যা তৈরি করছে, তা তৈরিতে সে নিজের দায়িত্ব বুঝতে পারে : তার দক্ষতায় বা অপটুতায় এটি তৈরি হবে বা ভাঙবে; সতর্ক, চতুর, সে তার দক্ষতাকে এমন এক উৎকর্ষের স্তরে নিয়ে যায় যে সে তাতে গর্ববোধ করে : দেবতাদের অনুগ্রহের ওপর তার সাফল্য নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে নিজের ওপর। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে সে তার সহচরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান করে, সে তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়। এবং যদিও সে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কিছুটা জায়গা দেয়, তবু সে বোধ করে যে যথাযথ কৌশল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ; অতীন্দ্রিয় মূল্যবোধ গ্রহণ করে দ্বিতীয় স্থান এবং বাস্তব স্বার্থগুলো প্রথম স্থান। সে দেবতাদের থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত নয়। তবে সে তাদের নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, যেমন সে নিজেকে দূরে সরিয়ে আনে তাদের থেকে; সে তাদের হাতে ছেড়ে দেয় অলিম্পীয় স্বর্গের ভার এবং পার্থিব এলাকাটি রাখে নিজের হাতে। মহাদেবতা প্যান ম্রিয়মাণ হয়ে উঠতে থাকে, যখন বেজে ওঠে প্রথম হাতুড়ি ঘায়ের শব্দ এবং শুরু হয় পুরুষের রাজত্ব।

পুরুষ বুঝতে পারে তার শক্তি। তার সৃষ্টিশীল বাহুর সাথে তার তৈরি বস্তুর সম্বন্ধ থেকে সে বুঝতে পারে কার্যকারণ : বপন করা বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটতে পারে, আবার নাও পারে, কিন্তু আগুনের সংস্পর্শে পান দেয়ার সময়, যন্ত্রপাতি তৈরির সময় ধাতু সব সময়ই সাড়া দেয় একই ভাবে। যন্ত্রপাতির জগতটিকে বোঝা সম্ভব স্পষ্ট ধারণা অনুসারে : এখন দেখা দিতে পারে যৌক্তিক চিন্তা, যুক্তি ও গণিত। সম্পূর্ণ বর্জন করা হয় বিশ্ব সম্পর্কে পূর্ববর্তী ধারণা। নারীর ধর্ম অবদ্ধ ছিলো কৃষির রাজত্ব কালের সাথে, অপর্যবসেয় সময়কালের, আকস্মিকতার, সুযোগের, প্রতীক্ষার, রহস্যের রাজত্ব কালের সাথে; হোমো ফাবের-এর রাজত্বকাল হচ্ছে স্থান অনুসারে সময়কে নিয়ন্ত্রণের, প্রয়োজনীয় ফলাফলের, পরিকল্পনার, কর্মের, যুক্তির রাজত্বকাল। এমনকি যখন সে জমিতে কাজ করে, তখনও সে এতে কাজ করে যন্ত্রকুশল পুরুষরূপে; সে আবিষ্কার করে যে মাটিকে উর্বর করা যায়, জমিকে পতিত রাখা ভালো, এই-এই বীজ ব্যবহার করতে হবে এই-এইভাবে। সে শস্যকে ফলতে বাধ্য করে; সে খাল খোঁড়ে, জল সেঁচে বা নিষ্কাশন করে, সে রাস্তা বানায়, মন্দির তৈরি করে : সে সৃষ্টি করে এক নতুন বিশ্ব।

যে-সব মানবগোষ্ঠি থেকে যায় দেবী মহামাতার নিয়ন্ত্রণে, যারা রক্ষা করে চলে মাতধারার শাসন, তারা বন্দী হয়ে পড়ে সভ্যতার আদিম স্তরে। নারীকে ততোটা মাত্রায়ই ভক্তি করা হতো, পুরুষ যতোটা হয়ে পড়েছিলো নিজের ভয়ের দাস : পুরুষ নারীকে ভক্তি করতো প্রেমে নয়, ত্রাসে। পুরুষ তার নিয়তি অর্জন করতে পারতো শুধু নারীকে সিংহাসনচ্যুত করে। তারপর থেকে পুরুষ সার্বভৌমরূপে স্বীকার করে শুধু সৃষ্টিশীল শক্তি, আলো, মনন, শৃঙ্খলা প্রভৃতি পুরুষ-নীতিকেই। দেবী মহামাতার পাশে দেখা দেয় আরেকটি দেবতা, পুত্র বা প্রেমিক, যে তখনো ছিলো দেবী মহামাতার অধীনে, কিন্তু সব বৈশিষ্ট্যেই সে দেবী মহামাতার মতো, এবং তার সহচর। সেও প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে এক উর্বরতা নীতির, বৃষরূপে দেখা দেয় মিনোতাউর, নীল নদী উর্বর করে তোলে মিশরের নিম্নাঞ্চল। সে মারা যায় শরতে এবং পুনর্জীবন লাভ করে বসন্তে, যখন তার অবেধ্য কিন্তু সান্ত্বনাহীনভাবে শোকাতুর স্ত্রী-মাতা নিজের শক্তি নিয়োগ করে খুঁজে পায় তার মৃতদেহ এবং পুনর্জীবন দেয় তাকে। এ-যুগলকে আমরা প্রথম আবির্ভূত হতে দেখি ক্রিটে, এবং তারপর দেখতে পাই ভূমধ্যসাগরীয় সমস্ত উপকূলে : মিশরে এটা আইসিস ও হোরাস, ফিনিশিয়ায় আস্তারতে ও অ্যাডোনিস, এশিয়া মাইনরে সিবিলে ও আত্তিস, এবং হেলেনি গ্রিসে এটা রিয়া ও জিউস।

এবং এর পরই সিংহাসনচ্যুত করা হয় মাহামাতাকে। মিশরে, যেখানে নারীর পরিস্থিতি থাকে অসাধারণভাবে অনুকূল, সেখানে নাট, যে হয় আকাশমণ্ডলের প্রতিমূর্তি, এবং আইসিস, উর্বরতার প্রতিমূর্তি, নীলনদের পত্নী এবং ওসিরিস রয়ে যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেবী, কিন্তু তবুও সেখানে রা, যে দেবতা সূর্যের আলোর, পৌরুষ শক্তির, সে হয়ে ওঠে পরম প্রধান। ব্যাবিলনে ইশতার হয়ে ওঠে বেল-মার্দুকের পত্নী মাত্র। বেল-মার্দুক সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও সামঞ্জস্যবিধানকারী। সেমিটিদের দেবতাও পুরুষ। যখন সর্বশক্তি নিয়ে দেখা দেয় জিউস, তখন ক্ষমতাহীন হয়ে ওঠে গাইয়া, রিয়া, ও সিবিলে। দিমিতার থাকে একটি দ্বিতীয় মর্যাদার দেবী। বৈদিক দেবতাদের পত্নী আছে, কিন্তু স্বামীদের মতো পুজো পাওয়ার অধিকার তাদের নেই। রোমীয় জুপিটারের সমকক্ষ তো নেই কেউই।

তাই পিতৃতন্ত্রের বিজয় কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিলো না, আর তা প্রচণ্ড কোনো বিপ্লবের ফলও ছিলো না। মানবজাতির সূচনা থেকেই নিজেদের জৈবিক সুবিধা পুরুষকে দিয়েছে নিজেদের সর্বেসর্বা ও সার্বভৌমরূপে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষমতা; তারা এ-অবস্থান কখনো ছেড়ে দেয় নি; তারা একদা তাদের স্বাধীন অস্থিত্বের একটি অংশ ছেড়ে দিয়েছিলো প্রকৃতি ও নারীর কাছে; কিন্তু পরে তারা তা আঁবার অধিকার করে নেয়। অপর-এর ভূমিকা পালনের জন্যে দণ্ডিত নারী এছাড়াও দণ্ডিত হয় শুধু অনিশ্চিত শক্তি ধারণে : দাসী অথবা দেবী, নারী কখনো নিজের ভাগ্য নিজে বেছে নেয় নি। পুরুষ দেবতা সৃষ্টি করে; নারীরা তাদের পুজো করে, বলেছেন ফ্রেজার; পুরুষই ঠিক করে তাদের পরম দেবতা পুরুষ হবে না নারী হবে; পুরুষ নারীর জন্যে যা ঠিক করেছে, নারীর অবস্থা সব সময়ই হয়েছে তা-ই; নারী কখনোই তার নিজের বিধান আরোপ করে নি।

তবে যদি নারীর শক্তির মধ্যে থাকতো উৎপাদনশীল শ্রম, তাহলে হয়তো পুরুষের সাথে নারীও জয়ী হতো প্রকৃতির ওপর; তাহলে মানবপ্রজাতি দেবতাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতো পুরুষ ও নারী উভয়েরই মধ্য দিয়ে; কিন্তু নারী নিজের জন্যে হাতিয়ারের প্রতি সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে পারে নি। এঙ্গেলস নারীর মর্যাদাহানির একটি অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন মাত্র : একথা বলা যথেষ্ট নয় যে ব্রোঞ্জ ও লোহা আবিষ্কার উৎপাদনের শক্তিগুলোর ভারসাম্য নষ্ট করেছিলো গভীরভাবে এবং এর ফলেই নারী পতিত হয়েছিলো নিম্নাবস্থানে; নারী যে-পীড়ন ভোগ করেছে, তা ব্যাখ্যার জন্যে এনিম্নতার ধারণা যথেষ্ট নয়। নারীর জন্যে যা ছিলো দুর্ভাগ্যজনক, তা হচ্ছে সে শ্রমিকের সহকর্মী না হওয়ার ফলে সে বাদ পড়ে যায় মানবিক মিটজাইন থেকেও। নারী দুর্বল এবং তার উৎপাদন শক্তি কম, এটা তার বাদ পড়া ব্যাখ্যা করতে পারে না; নারী যেহেতু পুরুষের কর্মপদ্ধতি ও চিন্তারীতিতে অংশ নেয় নি, যেহেতু নারী দাসত্বের বন্ধনে রয়ে গেছে জীবনের রহস্যময় প্রক্রিয়ার কাছে, তাই পুরুষ নারীর মধ্যে নিজের মতো কোনো সত্তাকে দেখতে পায় নি। যেহেতু সে গ্রহণ করে নি নারীকে, তার চোখে যেহেতু নারীকে মনে হয়েছে অপর-এর বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বলে, তাই পুরুষের পক্ষে নারীর পীড়নকারী ছাড়া আর কিছু হয়ে ওঠা সম্ভব হয় নি। পুরুষের ক্ষমতা লাভের ও সম্প্রসারণের ঈলা নারীর অশক্তিকে পরিণত করেছে একটি অভিসম্পাতে।

নতুন কৌশলগুলো খুলে দিয়েছিলো যে-সব সম্ভাবনা, পুরুষ চেয়েছিলো সেগুলো চূড়ান্তরূপে বাস্তবায়িত করতে : সে কাজে লাগাতে থাকে দাসশ্রমশক্তি, সহকর্মী পুরুষদের সে পরিণত করে দাসে। নারীদের শ্রমের থেকে দাসদের শ্রম যেহেতু ছিলো অনেক বেশি কার্যকর, তাই গোত্রের মধ্যে নারী যে-আর্থনীতিক ভূমিকা পালন করতো, তা সে হারিয়ে ফেলে। নারীর ওপর সীমিত কর্তৃত্বের থেকে দাসের সাথে তার সম্পর্কের মধ্যে প্রভু পেতো তার সার্বভৌমত্বের অনেক বেশি আমূল স্বীকৃতি। তার। উর্বরতার কারণে পুরুষ তাকে ভক্তি ও ভয় করতে বলে, পুরুষের কাছে সে অপর ছিলো বলে, এবং অপর-এর উদ্বেগজাগানো চরিত্রের সে অংশী ছিলো বলে, নারী এক রকমে তার ওপর নির্ভরশীলতায় আবদ্ধ রাখতো পুরুষকে, এবং একই সময়ে সে নির্ভরশীল থাকতো পুরুষের ওপর; প্রকৃতপক্ষে সে উপভোগ করতে প্রভু-দাসের সম্পর্কের পারস্পরিকতা, এবং এভাবে সে এড়িয়ে যায় দাসত্বকে। এবং দাস কোনো ট্যাবু দিয়ে সুরক্ষিত ছিলো না, দাসত্ববন্ধনে আবদ্ধ একটি পুরুষ ছাড়া সে আর কিছু ছিলো না, ভিন্ন নয় তবে নিকৃষ্ট : তার প্রভুর সাথে তার সম্পর্কের দ্বান্দ্বিক প্রকাশ পেতে বহু শতাব্দী কেটি যায়। সুসংগঠিত পিতৃতান্ত্রিক সমাজে দাস ছিলো মানুষের মুখধারী এক ভারবাহী পশু; প্রভু তার ওপর প্রয়োগ করতো স্বেচ্ছাচারী কর্তৃত্ব, যা মহিমান্বিত করতে তার গর্বকে–এবং সে দাঁড়ায় নারীর বিরুদ্ধে। পুরুষ যা কিছু অর্জন করে, তা অর্জন করে নারীর বিরুদ্ধে, পুরুষ যতো শক্তিশালী হয়, ততো পতন ঘটে নারীর।

বিশেষ করে, সে যখন হয়ে ওঠে ভূমির মালিক, তখন সে দাবি করে নারীরও মালিকানা। আগে সে আবিষ্ট ছিলো মানা দিয়ে, ভূমি দিয়ে; এখন তার আছে একটি আত্মা, তার আছে কিছুটা ভূমি; নারীর থেকে মুক্তি পেয়ে এখন সে নিজের জন্যে দাবি করে নারী এবং উত্তরপুরুষ। সে চায় যে সাংসারিক কাজকর্ম সবই হবে তার নিজের, এর অর্থ হচ্ছে সব কর্মীর মালিক হবে সে নিজে; সুতরাং সে দাস করে তোলে তার স্ত্রী ও সন্তানদের। উত্তরাধিকারী তার প্রয়োজন, যাদের মধ্য দিয়ে দীর্ঘায়িত হবে তার পার্থিব জীবন, কেননা সে তাদের হাতে দিয়ে যাবে তার সম্পত্তি; এবং মৃত্যুর পর তার আত্মার শান্তির জন্যে তারা পালন করবে নানা কৃত্যানুষ্ঠান। ব্যক্তিমালিকানার ওপর স্থাপিত হয় গৃহদেবতাপ্রথা, এবং উত্তরাধিকারী সম্পন্ন করে এমন একটি কাজ, যা একই সঙ্গে আর্থনীতিক ও অতীন্দ্রিয়। তাই যেদিন কৃষিকাজ আর ঐন্দ্রজালিক কর্ম থাকে না, হয়ে ওঠে এক সৃষ্টিশীল কাজ, পুরুষ বুঝতে পারে সে এক সৃষ্টিশীল শক্তি, সেদিন একই সাথে সে অধিকার দাবি করে নিজের সন্তান ও শস্যের ওপর।

আদিম কালে মাতৃধারার স্থানে পিতধারার প্রতিষ্ঠার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভাবাদর্শগত বিপ্লব ঘটে নি; তারপর মাতা পতিত হয় ধাত্রী ও দাসীর শ্রেণীতে, কর্তৃত্ব ও অধিকার থাকে পিতার হাতে, যা সে অর্পণ করে যায় উত্তরাধিকারীদের হাতে। সন্তান উৎপাদনে পুরুষের ভূমিকা তখন বোঝা হয়ে গেছে, তবে এছাড়াও দৃঢ়ভাবে জ্ঞাপন করা হয় যে শুধু পিতাই জন্ম দেয়, মা শুধু তার দেহের ভেতরে প্রাপ্ত জীবাণুটির পুষ্টি যোগায়, যেমন এস্কিলুস বলেছেন ইউমেনিদেস-এ। আরিস্ততল বলেছেন নারী বস্তুমাত্র, আর সেখানে পুরুষ-নীতি হচ্ছে গতি, যা উক্তৃষ্টতর ও অধিক স্বর্গীয়। উত্তরপুরুষকে একান্তভাবে নিজের করে নিয়ে পুরুষ অর্জন করে পৃথিবীর ওপর আধিপত্য ও নারীর ওপর প্রভুতু। যদিও প্রাচীন পুরাণে ও গ্রিক নাটকে এটাকে দেখানো হয়েছে একটি প্রচণ্ড সগ্রামের পরিণতি হিশেবে, কিন্তু আসলে পিতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ছিলো একটি ক্রমসংঘটিত পরিবর্তন। পুরুষ শুধু তাই পুনরায় জয় করে নেয়, যা একদা ছিলো তারই অধিকারে, সে আইনপদ্ধতিকে করে তোলে বাস্তবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনো যুদ্ধ হয় নি, কোনো জয় ছিলো না, পরাজয় ছিলো না।

তবে এ-প্রাচীন কিংবদন্তিগুলোর আছে সুগভীর অর্থ। যে-মুহূর্তে পুরুষ দৃঢ়ভাবে নিজেকে ঘোষণা করে কর্তা ও স্বাধীন ব্যক্তিরূপে, তখনই দেখা দেয় অপর ধারণাটি। সেদিন থেকেই অপর-এর সাথে সম্পর্কটি হয় নাটকীয় : অপর-এর অস্তিত্ব হচ্ছে একটি হুমকি, একটি বিপদ। প্রাচীন গ্রিক দর্শন দেখিয়েছে যে বিকল্পতা, অপরত্ব হচ্ছে নেতির মতোই জিনিশ, তাই অশুভ। অপরকে উত্থাপন করাই হচ্ছে এক ধরনের ম্যানিকীয়বাদ সংজ্ঞায়িত করা। এ-কারণেই ধর্মগুলো আর আইনের বিধানগুলো এতো বৈরী আচরণ করে নারীর সাথে। মানবজাতি যে-সময়ে লিপিবদ্ধ করতে শুরু করে পুরাণ ও আইন, তখন চূড়ান্তরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা : পুরুষই বিধিবদ্ধ করতে থাকে নানা বিধান। নারীকে অধীন অবস্থান দেয়া তাদের জন্যে ছিলো খুবই স্বাভাবিক, তবু ভাবতে পারি যে পুরুষ সন্তান ও গবাদিপশুর প্রতি যতোটা সদয়তা দেখিয়েছে, তা সে দেখাতে পারতো নারীর প্রতিও–কিন্তু একটুও দেখায় নি। নারীপীড়নের বিধিবিধান প্রণয়ন করতে করতে বিধানকর্তারা ভয় পায় নারীকে। নারীর ওপর এক সময় আরোপ করা হয়েছিলো যে-দুটি বিপরীত শক্তি, তার থেকে এখন তার জন্যে রাখা হয় শুধু অশুভ বৈশিষ্ট্যগুলো : একদা পবিত্র, এখন সে হয় দূষিত। আদমের সহচরীরূপে দেয়া হয়েছিলো যে-হাওয়াকে, সে সম্পন্ন করে মানবজাতির বিনাশ; পৌত্তলিক দেবতারা যখন মানুষের ওপর চরিতার্থ করতে চেয়েছিলো প্রতিহিংসা, তখন তারা উদ্ভাবন করেছিলো নারী; এবং নারীজীবদের মধ্যে প্রথম জন্ম নিয়েছিলো যে, সেই প্যান্ডোরা মানুষের জন্যে খুলে দিয়েছিলো সমস্ত দুর্ভোগগুলো। তাই নারী অশুভের কাছে উৎসর্গিত। আছে এক শুভ নীতি, যা সৃষ্টি করেছে শৃঙ্খলা, আলোক, ও পুরুষ; এবং এক অশুভ নীতি, যা সৃষ্টি করেছে বিশৃঙ্খলা, অন্ধকার, ও নারী, বলেছেন পিথাগোরাস। মনুর বিধানে নারী গর্হিত সত্তা, যাকে করে রাখতে হবে দাসী। লেভিটিকাস নারীকে তুলনা করেছে গৃহপতির ভারবাহী পশুর সাথে। সোলোনের বিধানে নারীকে কোনো অধিকার দেয়া হয় নি। রোমান বিধি তাকে রেখেছে অভিভাবকের অধীনে, তার মধ্যে দেখেছে মৃঢ়তা। গির্জার বিধান তাকে নির্দেশ করেছে শয়তানের প্রবেশপথ বলে। কোরানে নারীকে করা হয়েছে প্রচণ্ড তিরষ্কার।

এবং তবুও শুভর দরকার অশুভ, ভাবের দরকার, এবং আলোর দরকার অন্ধকার। পুরুষ জানে তার বাসনা চরিতার্থ করার জন্যে, তার জাতিকে স্থায়িত্ব দেয়ার জন্যে নারী অপরিহার্য; নারীকে তার দিতে হবে সমাজে একটি অবিচ্ছেদ্য স্থান : পুরুষ যে-শৃঙ্খলা স্থাপন করেছে, নারী তা যতোটা মেনে চলবে, তাকে ততোটা মুক্ত করা হবে তার আদিকলঙ্ক থেকে। এ-ধারণাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে মনুর বিধানে : বৈধ বিবাহের মাধ্যমে নারী অর্জন করে তার স্বামীর গুণাবলি, নদী যেমন সমুদ্রে হারায় নিজেকে, এবং মৃত্যুর পর তাকে স্থান দেয়া হয় একই স্বর্গে। একইভাবে বাইবেলেও অঙ্কিত হয়েছে সতীনারীর এক প্রশংসিত চিত্র (প্রবাদ ২১, ১০-৩১)। খ্রিস্টধর্ম মাংসকে ঘৃণা করলেও শ্রদ্ধা করে পবিত্র কুমারীকে, সতী ও অনুগত স্ত্রীকে। ধর্মসাধনে সহচরী হিশেবে নারী পালন করতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ভূমিকা : ভারতে ব্রাহ্মণী, রোমে ফ্ল্যামিনিকা উভয়ই তাদের পতিদের মতো পবিত্র। যুগলের মধ্যে পুরুষটিই প্রাধান্য করে, তবে প্রজননের জন্যে, জীবন নির্বাহের জন্যে, এবং সমাজের শৃঙ্খলার জন্যে দরকার হয় পুরুষ ও নারী নীতির মিলন।

অপর-এর, নারীর, এ-পরস্পর বিপরীত মূল্যই প্রতিফলিত হবে তার বাকি ইতিহাসে; আমাদের কাল পর্যন্ত তাকে রাখা হবে পুরুষের ইচ্ছের অধীনে। তবে এটা হবে দ্ব্যর্থক : সম্পূর্ণরূপে অধিকারে ও নিয়ন্ত্রণে এনে নারীকে নামিয়ে দেয়া হবে বস্তুর পর্যায়ে; তবে পুরুষ যাই জয় ও অধিকার করে, তাকেই আবৃত করে দিতে চায় নিজের গৌরবে; পুরুষের কাছে মনে হয় যে অপর এখনো ধারণ করে আছে তার কিছুটা আদিম ইন্দ্রজাল। কী করে স্ত্রীকে একইসঙ্গে দাসী ও সঙ্গিনী করা যায়, এ-সমস্যাটিকে সে সমাধান করার চেষ্টা করবে, তার মানসিকতার বিবর্তন ঘটতে থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে; এবং ঘটাতে থাকবে নারীর নিয়তিরও বিবর্তন।

পিতৃতান্ত্রিক কাল ও ধ্রুপদী মহাযুগ

প্রথম খণ্ড । ভাগ ২ – ইতিহাস । পরিচ্ছেদ ৩

নারী সিংহাসনচ্যুত হয়েছিলো সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার আগমনে, এবং শতাব্দী পরম্পরায় তার ভাগ্য জড়িয়েআছে সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানার সঙ্গে : তার ইতিহাসের বড়ো অংশই জড়িত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিষয়সম্পত্তির ইতিহাসের সাথে। এ প্রথার মৌলিক গুরুত্ব বোঝা যায় সহজে যদি একথা মনে রাখি যে মালিক তার অস্তিত্ব স্থানান্তরিত, বিচ্ছিন্ন করে তার সম্পত্তির মধ্যে; সে একে নিজের জীবনের থেকেও বেশি মূল্য দেয়; এটা প্রবাহিত হয় এ-মরজীবনের সংকীর্ণ সীমা পেরিয়ে, এবং শরীর মাটিতে মিশে যাওয়ার পরও টিকে থাকে–ঘটে অমর আত্মার পার্থিব ও বস্তুগত একত্রীভবন। তবে এ-বেঁচে থাকা সম্ভব হয় যদি সম্পত্তি থাকে মালিকের হাতে : মৃত্যুর পরও এটা তার হতে পারে যদি এটা তাদের অধিকারে থাকে, যাদের মধ্যে সে নিজেকে প্রক্ষেপিত দেখতে পায়, যারা তার। সুতরাং পুরুষ নারীর সাথে তার দেবতা ও সন্তান ভাগাভাগি করে নিতে রাজি নয়। পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার কালে পুরুষ সম্পত্তির মালিকানা ও দানের সমস্ত অধিকার ছিনিয়ে নেয় নারীর কাছে থেকে।

সেদিক থেকে দেখতে গেলে, তার কাছে এটা যুক্তিসঙ্গতই মনে হয়েছিলো। যখন স্বীকার করা হয় যে নারীর সন্তানেরা আর তার নয়, ওই স্বীকৃতি অনুসারেই নারীটি যে-দল থেকে এসেছে, তার সাথে সন্তানদের কোনো বন্ধন থাকে না। বিয়ের মাধ্যমে নারী আর এক গোত্রের কাছে থেকে আরেক গোত্রের ঋণগ্রহণ নয় : সে যে-গোত্রে জন্মেছিলোসে-গোত্র থেকে সমূলে উৎপাটিত করে আনা হয় তাকে, এবং অন্তর্ভুক্ত করা হয় স্বামীর দলে; স্বামী তাকে কেনে যেমন কেউ কেনে গোয়ালের জন্যে পশু বা দাস; স্বামী তার ওপর চাপিয়ে দেয় তার গৃহদেবতাদের; এবং নারীটির গর্ভের সন্তানেরা অন্তর্ভুক্ত হয় স্বামীর পরিবারের। যদি নারী উত্তরাধিকারী হতো, তাহলে সে পিতার পরিবারের বেশ কিছু সম্পত্তি হস্তান্তরিত করতে স্বামীর পরিবারে; তাই সযত্নে তাকে বাদ দেয়া হয় উত্তরাধিকার থেকে। উল্টোভাবে, যেহেতু নারী কিছুর মালিক নয়, সে মানুষের মর্যাদাও পায় না; সে নিজেই হয়ে ওঠে পুরুষের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তির অংশ : প্রথমে পিতার, পরে স্বামীর। কঠোর পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পিতা জন্মের মুহূর্ত থেকে পুত্র ও কন্যা সন্তানদের হত্যা করতে পারে; কিন্তু পুত্রের বেলা সমাজ অস্বাভাবিকভাবে খর্ব করে তার ক্ষমতা : প্রতিটি সুস্থ নবজাতক পুত্রকে বাঁচতে দেয়া হয়, অন্যদিকে শিশুকন্যাদের অরক্ষিত রাখার রীতি ছিলো খুবই ব্যাপক। আরবদের মধ্যে শিশুহত্যা ছিলো ব্যাপক : জন্মের সাথে সাথেই কন্যাশিশুদের গর্তে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হতো। শিশু কন্যাকে বাঁচিয়ে রাখা ছিলোপিতার বিশেষ মহানুভবতা; এমন সমাজে পুরুষের বিশেষ দয়ায়ই নারী বেঁচে থাকতে পারে, পুত্রের মতো বৈধভাবে নয়। প্রসবের পর প্রসূতির অশৌচের কাল হয় দীর্ঘতর যদি শিশুটি হয় মেয়ে : হিব্রুদের মধ্যে, লেভিটিকাস নির্দেশ দিয়েছে পুত্র জন্ম নিলে যতো দিন অশৌচ পালন করতে হবে কন্যা জন্ম নিলে অশৌচ পালন করতে হবে তার থেকে দুমাস বেশি। যে-সব সমাজে ‘রক্তের মূল্য’-এর প্রথা আছে, সেখানে নিহত ব্যক্তিটি স্ত্রীলিঙ্গের হলে মূল্য হিশেবে দাবি করা হয়অল্প মুদ্রা : পুংলিঙ্গের সাথে তুলনায় তার মূল্য ততোটা একজন স্বাধীন পুরুষের তুলনায় একটি দাসের মূল্য যতোটা।

যখন সে কিশোরী হয়ে ওঠে, তার ওপর থাকে তার পিতার সমস্ত কর্তৃত্ব; যখন তার বিয়ে হয়, তখন তার পিতা সে-কর্তৃত্ব কড়ায়গন্ডায় হস্তান্তরিত করে স্বামীর হাতে। স্ত্রী যেহেতু দাসের মতো, ভারবাহী পশুর মতো, বা অস্থাবর সম্পত্তির মতো স্বামীর সম্পত্তি, তাই পুরুষ স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করতে পারে যত ইচ্ছে তত স্ত্রী; শুধু আর্থনীতিক বিবেচনার ফলেই বহুবিবাহ থাকে বিশেষ সীমার মধ্যে। স্বামী নিজের খেয়ালে ছেড়ে দিতে পারে স্ত্রীদের, সমাজ তখনতাদের কোনোই নিরাপত্তা দেয় না। অন্যদিকে, নারীকে রাখা হয় কঠোর সতীত্বের মধ্যে। ট্যাবু থাকা সত্ত্বেও মাতৃধারার সমাজে মেনে নেয়া হয় আচরণের ব্যাপক স্বাধীনতা; বিবাহপূর্ব কুমারীত্ব সেখানে বিশেষ দরকার হয় না, এবং ব্যভিচারকেও বিশেষ কঠোরতার সাথে শাসন করা হয় না। এর বিপরীতে, যখন নারী হয়ে ওঠে পুরুষের সম্পত্তি, স্বামী চায় স্ত্রীটি হবে কুমারী এবং সে কঠোর দণ্ডের ভয় দেখিয়ে স্ত্রীর কাছে দাবি করে সম্পূর্ণ সতীত্ব। কোনো উপপতির সন্তানকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করার ঝুঁকি নেয়া হচ্ছে চরম অপরাধ; তাই দোষী স্ত্রীকে হত্যা করার সমস্ত অধিকার আছে গৃহস্বামীর। যতোদিন ব্যক্তিমালিকানা প্রথা টিকে থাকবে, স্ত্রীর অসতীত্বকে ততোদিন গণ্য করা হবে রাজদ্রোহিতার মত অপরাধ বলে। আইনের সমস্ত বিধি, যেগুলো আজো ব্যভিচারের ক্ষেত্রে মেনে চলে অসাম্য, সবগুলোই যুক্তি দাঁড়করায় স্ত্রীর মহাঅপরাধের ওপর, যে পরিবারের মধ্যে নিয়ে আসে একটি জারজ। এবং যদিও নিজের হাতে আইন তুলে নেয়ার অধিকার অগাস্টাসের কাল থেকেই বিলুপ্ত, নেপোলিয়নি বিধি আজো জুরির অধিকার অর্পণ করে স্বামীর হাতে, যে নিজেই প্রয়োগ করেছে ন্যায়বিচার।

যখন স্ত্রীটি একই সময়ে অন্তর্ভুক্ত হতো পৈতৃক গোত্রে ও দাম্পত্য পরিবারের, তখন সে দু-ধরনের বন্ধনের মধ্যে বেশ খানিকটা স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারতো; এবন্ধন দুটি ছিলো বিশৃঙ্খল ও এমনকি পরস্পরবিরোধী, যার একটি স্ত্রীটিকে রক্ষা করতো অন্যটি থেকে : উদাহরণস্বরূপ, প্রায়ই সে নিজের পছন্দমতো স্বামী গ্রহণ করতে পারতো, কেননা বিয়ে ছিলো একটা ঐহিক ঘটনা মাত্র, যা সমাজের মৌল সংগঠনের ক্ষতি করতো না। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সে তার পিতার সম্পত্তি, যে তার সুবিধামতো মেয়েকে বিয়ে দিতো। তারপর স্বামীর চুলোর সাথে জড়িয়ে থেকে সে স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তির বেশি কিছু হতো না এবং হতো সে-গোত্রের অস্থাবর সম্পত্তি, যাতে ফেলা হয়েছে তাকে।

যখন পরিবার ও ব্যক্তিমালিকানানির্ভর উত্তরাধিকার প্রশ্নহীনভাবে থাকে সমাজের ভিত্তি, তখন নারী থাকে সম্পূর্ণরূপে অধীনস্থ। এটা ঘটে মুসলমান জগতে। এর সংগঠন সামন্ততান্ত্রিক; অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্রই বিভিন্ন গোত্রকে সমন্বিত ও শাসন করার মতো শক্তি অর্জন করেনি : পিতৃতান্ত্রিক প্রধানের ক্ষমতা খর্ব করার মতো কারো শক্তি নেই। আরবরা যখন রণলিপ্সু ও বিজয়ী ছিলো তখন সৃষ্টি হয়েছিলো ধর্মটি, সেটি নারীকে করেছে প্রচন্ড অবজ্ঞা। কোরানঘোষণা করেছে : ‘পুরুষ নারীর থেকে শ্রেষ্ঠ কেননা আল্লা তাকে বিশেষ গুণ দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বে ভূষিত করেছে এবং এজন্যে যে তারা নারীদের উপঢৌকন দেয়’; সেখানে নারীদের কখনো প্রকৃত ক্ষমতা ছিলো না। অতীন্দ্রিয় মর্যাদাও ছিলো না। বেদুইন নারী কঠোর পরিশ্রম করে, সে হাল চাষ করে ও বোঝা বহন করে : এভাবে সে তার স্বামীর সাথে স্থাপন করে একটা পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক; সে মুখ খোলা রেখে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে। বোরখায় ঢাকা ওঅবরোধবাসিনী মুসলমান নারী আজো অধিকাংশ সামাজিক স্তরে একধরনের দাসী।

তিউনিশিয়ার এক আদিম পল্লীর ভূগর্ভস্থ এক গুহার ভেতরে বসে থাকা চারটি নারীকে আমি দেখেছিলাম, তাদের কথা আমার মনে পড়ছে : বৃদ্ধা এক চোখ কানা দাঁতহীন স্ত্রীটি, যার মুখমণ্ডল ভীষণভাবে বিধ্বস্ত, একটি ছোট্ট মালশার ওপরে তীব্র ঝাঁজালো ধোঁয়ার মধ্যে রাঁধছিলো ময়দার পিণ্ড; আরো দুটি স্ত্রী, কিছুটা কম বয়সের, কিন্তু একই রকমে বিধ্বস্ত, শিশু কোলে নিয়ে বসে ছিলো, একজন বুকের দুধ দিচ্ছিলো শিশুকে; আর তাঁতের সামনে বসে রেশম, সোনা, আর রুপোতে অলঙ্কৃত প্রতিমার মতো এক তরুণী বুনছিলো পশম। আমি যখন সেই বিষাদাচ্ছন্ন গুহাসীমাবদ্ধতা, জরায়ু, ও সমাধির রাজ্য-ছেড়ে বারান্দা দিয়ে ওপরে দিনের আলোর দিকে এলাম, তখন দেখলাম পুরুষটিকে, সে পরেছে শুভ্র পোশাক, অত্যন্ত সুসজ্জিত, মুখে হাসি, ঝলমলে। সে বাজার থেকে ফিরছিলো, যেখানে সে অন্যান্য পুরুষের সাথে বিশ্বের নানা কথা বলেছে; সে যে-বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত, যে-বিশ্ব থেকে সে বিচ্ছিন্ন নয়, তার সে-বিশাল বিশ্বের কেন্দ্র অবস্থিত এ-বিশ্রামস্থলে সে কয়েক ঘন্টা কাটাবে। ওই বৃদ্ধা জীর্ণ নারীদের জন্যে, আর ওই তরুণীটির জন্যে, যে ওই বৃদ্ধাদের মতোই দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাবে, এ-ধোঁয়াচ্ছন্ন গুহা ছাড়া আর কোনো বিশ্ব নেই; এ-গুহা থেকে তারা বেরোয় শুধু রাতে, নিঃশব্দে, বোরখায় ঢেকে।

বাইবেলের সময়ের ইহুদিদের ছিলো এ-আরবদের মতো একই প্রথা। গৃহপতিরা ছিলো বহুবিবাহকারী; আর তারা খেয়ালখুশি মতো ছেড়ে দিতে পারতো স্ত্রীদের; বিয়ের সময় তরুণী স্ত্রীকে অবশ্যই হতে হতো কুমারী, নইলে বিধান ছিলো কঠোর শাস্তির; ব্যভিচার ঘটলে স্ত্রীকে হত্যা করা হতো পাথর ছুঁড়ে; স্ত্রীকে রাখা হতো গৃহস্থালির কাজের মধ্যে বন্দী, যেমন প্রমাণ করে বাইবেলের সতী ভার্যার চিত্র : ‘সে চায় পশম ও শণ… সে রাত থাকতে ওঠে… রাতেও তার প্রদীপ নেভে না… সে আলস্যের অন্ন গ্রহণ করে না’। যদিও সে সতী ও পরিশ্রমী, কিন্তু অনুষ্ঠানাদিতে সে অশুচি, ট্যাবুতে ঢাকা; বিচারালয়ে তার সাক্ষ্য গৃহীত হয় না। ইক্লিজিয়াসটেস নারী সম্পর্কে প্রকাশ করেছে জঘন্যতম ঘৃণা : ‘আমি নারীকে মৃত্যুর থেকেও বিষাক্ত দেখি, যার মন হচ্ছে ফাঁদ ও জাল, এবং তার হাত হচ্ছে পাশ… সহস্রের মধ্যে আমি অন্তত একটি পুরুষ পেয়েছি; কিন্তু ওই সবগুলোর মধ্যেও আমি একটি নারী পাই নি’। ধর্মের বিধান না হলেও সামাজিক প্রথা ছিলো যে স্বামীর মৃত্যু হলে বিধবাটি তার ভাইদের কোনো একজনের কাছে বিয়ে বসবে।

প্রাচ্যদেশীয় অনেক সমাজে লেভিয়েট নামে একটি প্রথা আছে। সব ব্যবস্থায়ই, যেখানে নারী থাকে কারোঅভিভাবকত্বে, সেখানে একটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যে কী করতে হবে বিধবাদের নিয়ে? চরম সমাধান হচ্ছে তাদের স্বামীর সমাধিতে উৎসর্গ করা। তবে ভারতেও এ-বিধান এমন ধ্বংসযজ্ঞকে অত্যাবশ্যক করে তোলে নি; মনুর বিধানে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবার বেঁচে থাকার অনুমতি আছে। সমারোহপূর্ণ আত্মহত্যাগুলো কখনোই অভিজাতদের একটা ঢঙ ছাড়া বেশি কিছু ছিলো না। সাধারণত বিধবাদের তুলে দেয়া হতো স্বামীর উত্তরাধিকারীদের হাতে। লেভিরেট প্রথা অনেক সময় রূপ নেয় একপত্নীবহুস্বামী বিয়ের; বিধবার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা দূর করার জন্যে একটি পরিবারের সব ভাইকে করা হতো একটি নারীর স্বামী, এ-প্রথা গোত্রকে স্বামীর সম্ভাব্য বন্ধ্যাত্বের সমস্যা থেকেও রক্ষা করতো। সিজারের এক বিবরণে পাওয়া যায় যে ব্রিটানিতে পরিবারের সব পুরুষের থাকতো কয়েকটি সাধারণ স্ত্রী।

সর্বত্র অবশ্য পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা চরমরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। ব্যাবিলনে হাম্মুরাবির বিধানে নারীদের দেয়াহয়েছিলো কিছু অধিকার; সে পৈর্তৃক সম্পত্তির কিছু অংশ পেতো, এবং তার বিয়ের সময় পিতা পণ দিতো। পারস্যে বহুবিবাহ ছিলো সামাজিক রীতি; সেখানে চাওয়া হতো যে স্ত্রী হবে স্বামীর একান্ত বাধ্য, বিয়ের বয়স হলে তার পিতা ঠিক করতো পাত্র; তবে অধিকাংশ প্রাচ্য সমাজের তুলনায় সেখানে স্ত্রী পেতো অনেক বেশি মর্যাদা। অজাচার নিষিদ্ধ ছিলো না, এবং ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে হতো প্রায়ই। স্ত্রী পালন করতো সন্তানদের শিক্ষার দায়িত্ব–ছেলেদের সাত বছর বয়স, আর মেয়েদের বিয়ে পর্যন্ত। পুত্র অযোগ্য হলে সে স্বামীর সম্পত্তির একটি অংশ পেতো; আর সে যদি হতো‘সুবিধাপ্রাপ্ত স্ত্রী’, তাহলে পেতো অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের কর্তৃত্ব এবং যদি স্বামী কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র না রেখে মারা যেতো, তাহলে ব্যবসা চালানোর দায়িত্বও পেতো। বিয়ের বিধান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করতো যে গৃহস্বামীর উত্তরপুরুষ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে প্রচলিত ছিলো পাঁচ ধরনের বিয়ে : (১) নারীর যদি পিতামাতার সম্মতিতে বিয়ে হতো, তাহলে তাকে বলা হতো ‘সুবিধাপ্রাপ্ত স্ত্রী’; তার সন্তানেরা হতো তার স্বামীর। (২) যদি নারীটি পিতামাতার একমাত্র সন্তান হতো, তাহলে তার প্রথম সন্তানকে পাঠিয়ে দেয়া হতো তার পিতামাতার কাছে, যাতে সে তাদের মেয়ের স্থান নিতে পারে; এর পর স্ত্রীটি হতো ‘সুবিধাপ্রাপ্ত স্ত্রী’। (৩) যদি কোনো পুরুষ অবিবাহিত অবস্থায় মারা যেতো, তার পরিবার পণ দিয়ে বিয়ের মাধ্যমে বাইরে থেকে গ্রহণ করতে কোনো নারীকে, তাকে বলা হতো ‘পোষ্য স্ত্রী’; তার অর্ধেক সন্তান হতো মৃতের, অর্ধেক হতো তার জীবিত স্বামীর। (৪) নিঃসন্তান কোনো বিধবা যদি বিয়ে বসতো, তাকে বলা হতো ‘বাঁদী স্ত্রী’; তার সন্তানদের অর্ধেক দিতে হতো তার মৃত স্বামীকে। (৫) যদি কোনো নারী পিতামাতার সম্মতি ছাড়া বিয়েবসতো, তাহলে সে পিতামাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো না, যতো দিন না তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বয়োপ্রাপ্ত হয়ে নিজের মাকে তার পিতার কাছে ‘সুবিধাপ্রাপ্ত স্ত্রী’ হিসেবে দান করতো; এর আগেই স্বামী মারা গেলে তাকে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে গণ্য করা হতো এবং রাখা হতো কারো কর্তৃত্বে। প্রত্যেক পুরুষই যাতে উত্তরাধিকারী রেখে যেতে পারে পোষ্য স্ত্রী ও বাঁদী স্ত্রীর প্রথা সে-ব্যবস্থা করে, ওই সন্তানদের সাথে সে যদিও রক্তের সম্পর্কে জড়িত নয়। আমি ওপরে যা বলছিলাম এটা সেকথা প্রমাণ করে; পুরুষেরা যাতে মৃত্যুর পরও পৃথিবীতে ও পাতাললোকে অর্জন করতে পারে অমরতা, সেজন্যেই পুরুষেরা উদ্ভাবনা করেছিলো এ-সম্পর্কটি।

মিশরেই শুধু নারীরা ছিলো সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায়। দেবী মাতারা স্ত্রী হওয়ার পরেও রক্ষা করতো তাদের মর্যাদা; দম্পতি ছিলো ধর্মীয় ও সামাজিক একক; নারীদের মনে করা হতো পুরুষের সঙ্গী ও পরিপূরক। তার ইন্দ্রজাল এতো কম বৈরি ছিলো যে এমনকি অজাচারের ভীতিকেও জয় করা হয়েছিলো এবং নির্দ্বিধায় সম্মিলিত করা হয়েছিলো বোন ও স্ত্রীকে। নারীদের ছিলো পুরুষদের মতো একই অধিকার, বিচারালয়ে ছিলো একই ক্ষমতা; নারী উত্তরাধিকারী হতো, সম্পত্তির মালিক হতো। এ-অসাধারণ সৌভাগ্যজনক পরিস্থিতি অবশ্য আকস্মিকভাবে ঘটে নি : এটা ঘটেছে এ-কারণে যে প্রাচীন মিশরে ভূসম্পত্তির মালিক ছিলো রাজা এবং  উচ্চবর্ণের পুরোহিত ও সৈনিকেরা; সাধারণ মানুষেরা শুধু ভূমি ব্যবহার করতে এবার শস্য ভোগ করতে পারতো–ভূমি থাকতো মালিকদের সাথে অচ্ছেদ্য। উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত সম্পত্তির বিশেষ মূল্য ছিলো না, এবং ভাগ করে দিতে কোনো অসুবিধা হতো না। উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তি না থাকায় নারী রক্ষা করতে পারতো মানুষের মর্যাদা। বাধ্যবাধকতা ছাড়াই সে বিয়ে করতো এবং বিধবা হয়ে গেলে আবার নিজের ইচ্ছেমতো বিয়ে করতো। পুরুষেরা বহুবিবাহ করতো; সব সন্তানই যদিও ছিলো বৈধ, তবু একজনই থাকতোপ্রকৃত স্ত্রী, যে একা স্বামীর সাথে ধর্মকর্মে সঙ্গী ছিলো ও বৈধভাবে বিবাহিত ছিলো; অন্যরা ছিলো অধিকারহীন দাসী মাত্র। বিয়ের ফলে প্রধান স্ত্রীর মর্যাদা বদল ঘটতো না : সে মালিক থাকতো তার সম্পত্তির এবং স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারতো। যখন ফারাও বোখোরিস ব্যক্তিমালিকানা প্রবর্তন করে, তখন নারীরা এতো শক্তিশালী অবস্থানে ছিলো যে সে তাদের উৎখাত করতে পারে নি; বোখোরিস সূচনা করে চুক্তির কালের, এবং বিয়ে হয়ে ওঠে একটি চুক্তি।

ছিলো তিন ধরনের বিয়ের চুক্তি : একটি ছিলো দাসীত্বমূলক বিয়ে; নারীটি হতে পুরুষটির সম্পত্তি, তবে অনেক সময় নির্দেশিত থাকতো যে পুরুষটির আর কোনো উপপত্নী থাকবে না; একই সময়ে বৈধ স্ত্রীকে গণ্য করা হতোপুরুষটির সমান, এবং তাদের সমস্ত সম্পত্তিতে ছিলো তাদের সমান অধিকার; প্রায়ই বিবাহবিচ্ছেদের সময় স্বামীটি স্ত্রীকে কিছু অর্থ দিতে সম্মত হতো। এ-প্রথা থেকে পরে উদ্ভূত হয় এক ধরনের চুক্তি, যা বিশেষভাবে সুবিধাজনক ছিলোস্ত্রীটির জন্যে : স্বামীটি স্ত্রীটির ওপর পোষণ করতো এক কৃত্রিম আস্থা। ব্যভিচারের দণ্ড ছিলো কঠোর, কিন্তু উভয়পক্ষেরই ছিলো বিবাহবিচ্ছেদের স্বাধীনতা। এসব চুক্তি প্রয়োগ প্রবলভাবে হ্রাস করে বহুবিবাহ; নারীরা সম্পদের ওপর একচেটে অধিকার ভোগ করে ও উত্তরাধিকারসূত্রে দিয়ে যায় তাদের সন্তানদের, যার ফলে দেখা দেয় একটি ধনিকতান্ত্রিক শ্ৰেণী। টলেমি ফিলোপাতের আদেশ জারি করে যে নারীরা আর তাদের স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতা ছাড়াসম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবে না, এটা তাদের পরিণত করে চিরঅপ্রাপ্তবয়স্ক মানুষে। তবে এমনকি যখনও তাদের ছিলো একটি বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত মর্যাদা, প্রাচীন বিশ্বে যা ছিলো অনন্য, তখনও নারীরা সামাজিকভাবে পুরুষের সমতুল্য ছিলো না। ধর্মে ও শাসনকার্যে অংশী হয়ে তারা রাজপ্রতিভূ হিসেবে কাজ করতে পারতো, তবে ফারাও ছিলো পুরুষ; পুরোহিত ও সৈনিকেরা ছিলো পুরুষ; বাইরের কর্মকাণ্ডে তারা পালন করতো গৌণ ভূমিকা; এবং পারিবারিক জীবনে তাদের কাছে দাবি করা হতো পারস্পরিকতাহীন আনুগত্য।

গ্রিকদের রীতি ছিলো অনেকটা প্রাচ্যদেশের মতোই; তবে তাদের মধ্যে বহুবিবাহ ছিলো না। কিন্তু কেনো, তা অজ্ঞাত। এটা সত্য যে একটা হারেম রাখা সব সময়ই ব্যয়বহুল : এটা সম্ভব মহিমামণ্ডিত সলোমনের পক্ষে, আরব্যরজনীর সুলতানদের পক্ষে, সেনাপতি, ধনিকদের পক্ষে, যারা মত্ত হতে পারতো কোনো বিশাল হারেমের বিলাসব্যসনে; গড়পরতা মানুষ তিন-চারটি স্ত্রী নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলো; চাষীদের খুব কম সময়ই থাকতো দুটির বেশি স্ত্রী। এছাড়াও– মিশর বাদে, যেখানে কোনো বিশেষ ব্যক্তিমালিকানাধীন বিষয়সম্পত্তি ছিলো না–উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তিকে অখণ্ডিত রাখার জন্যে পৈতৃক সম্পত্তিতে জ্যেষ্ঠ পুত্রকে দেয়া হয় বিশেষ অধিকার। এর ফলে স্ত্রীদের মধ্যে গড়ে ওঠে একটা স্তরক্রম, অন্যদের তুলনায় প্রধান উত্তরাধিকারীর মাতা লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। যদি স্ত্রীর নিজের থাকতো কোনো সম্পত্তি, যদি সে পেতো কোনো পণ, তাহলে স্বামীর কাছে সে গণ্য হতো একজন ব্যক্তি হিশেবে : স্বামীটি স্ত্রীর সাথে জড়িত হতো এক ধর্মীয় ও একান্তু বন্ধনে।

সন্দেহ নেই এ-পরিস্থিতির ফলেই মাত্র একটি স্ত্রীকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রথা গড়ে উঠেছিলো। কিন্তু সত্য হচ্ছে যে গ্রিক নাগরিকেরা বাস্তবে ছিলো বহুবিবাহী, কেননা তারা তাদের কামনা চরিতার্থ করতে পারতো নগরের বেশ্যাদের সাথে এবং তাদের গাইনিকিউমের দাসীদের সাথে। ‘আত্মার সুখের জন্যে আমাদের আছে গণিকা,’ বলেছেন দিমোসথিনিস, ‘কামসুখের জন্যে আছে উপপত্নী, এবং পুত্রলাভের জন্যে আছে স্ত্রীরা।‘ স্ত্রী যখন রুগ্ন, অসুস্থ, গর্ভবতী, বা প্রসবের পর সেরে উঠতে থাকতো, তখন গৃহস্বামীর শয্যায় স্ত্রীর বদলে স্থান পেতো উপপত্নী; তাই গাইনিকিউম আর হারেমের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিলো না। অ্যাথেন্সে স্ত্রী বন্দী থাকতো অবরোধের মধ্যে, বন্দী থাকতো কঠোর আইনের বিধানে, এবং তাদের ওপর চোখ রাখতো বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটরা। সে সারাজীবনভর থাকতো চির-অপ্রাপ্তবয়স্ক, থাকতো একজনঅভিভাবকের কর্তৃত্বে; সে তার পিতা হতে পারতো, স্বামী হতে পারতো, স্বামীর উত্তরাধিকারী হতে পারতো, আর এসবের অবর্তমানে অভিভাবক হতো রাষ্ট্র, যার প্রতিনিধিত্ব করতো সরকারি কর্মকর্তারা। এরা ছিলো তার প্রভু, এবং কোনো বস্তুর মতো সে ছিলো তাদের অধিকারে; আর অভিভাবকদের কর্তৃত্ব প্রসারিত ছিলো তার শরীর ও সম্পত্তি পর্যন্ত। অভিভাবক ইচ্ছেমতো কর্তৃত্ব হস্তান্তরিত করতে পারতো : পিতা তার মেয়ের বিয়ে দিতে পারতো বা মেয়েকে দত্তক দিতে পারতো; স্বামী তার স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়ে আরেক স্বামীর কাছে হস্তান্তরিত করতে পারতো। তবে গ্রিক আইন স্ত্রীর জন্যে একটা পণের ব্যবস্থা করতো, যা ব্যয় হতো তার ভরণপোষণে এবং বিয়ে ভেঙে গেলে সেটার সবটা তাকে ফিরিয়ে দিতে হতো; আইন বিশেষ ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার দিতে স্ত্রীকে; তবে এগুলোই ছিলো তাকে দেয়াসমাজের  একমাত্র নিশ্চয়তা। সমস্ত ভূসম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পেতো পুত্ররা।

পুরুষপরম্পরা অনুসারে উত্তরাধিকারভিত্তিক সমাজে একটি সমস্যা দেখা দেয়, তা হচ্ছে যদি কোনো পুরুষের উত্তরাধিকারী না থাকে তখন ভূসম্পত্তির কী ব্যবস্থা হবে। গ্রিকরা এপিক্লেরেৎ নামে একটি প্রথা তৈরি করে : নারী উত্তরাধিকারীকে অবশ্যই তার পিতার পরিবারের জ্যেষ্ঠতম আত্মীয়কে বিয়ে করতে হতো; এভাবে পিতা তার জন্যে যে-সম্পত্তি রেখে যেতো, তা থেকে যেতো একই দলের সন্তানদের মধ্যে। এপিক্লেরে নারী উত্তরাধিকারী ছিলো না। ছিলোপুরুষ উত্তরাধিকারী উৎপাদনের উপায় মাত্র। এ প্রথা তাকে নিক্ষেপ করে পুরুষের দয়ার তলে, কেননা তাকে যান্ত্রিকভাবে দান করা হতো পরিবারের প্রথম জন্মপ্রাপ্ত পুরুষটির কাছে, যে অধিকাংশ সময়ই হতো বৃদ্ধ।

যেহেতু নারীপীড়নের কারণ নিহিত পরিবারকে স্থায়িত্ব দেয়ার ও উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তি অখণ্ড রাখার বাসনার মধ্যে, তাই নারী পরিবার থেকে যতোখানি মুক্তি পায় ততোখানি মুক্তি পায় পরাধীনতা থেকে; যদি কোনোসমাজ ব্যক্তিমালিকানা নিষিদ্ধ করার সাথে পরিবার প্রথাও অস্বীকার করে, তাহলে তাতে নারীর ভাগ্য বেশ উন্নত হতে বাধ্য। স্পার্টায় প্রচলিত ছিলো সংঘব্যবস্থা এবং এটাই ছিলো একমাত্র গ্রিক নগর, যেখানে নারীর অবস্থা ছিলো প্রায়পুরুষের অবস্থার সমান। মেয়েদের লালনপালন করা হতো ছেলেদের মতো; স্ত্রী তার ঘরে বন্দী থাকতো না; আর স্বামী স্ত্রীর সাথে দেখা করতে পারতো চুপিসারে, রাতের বেলা; এবং স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার এতো কম ছিলো যে সুসন্তান জন্মানোর প্রয়োজনে অন্য যে-কোনো পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের দাবি করতে পারতো। যখন উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তি লোপ পায়, তখন ব্যভিচারের ধারণাও লোপ পায়; সব সন্তানের মালিক হয় নগর; আর নারীদের তখন উৎসাহের সঙ্গে এক প্রভুর দাসী করে রাখা হয় না; বা, উল্টোভাবে, বলা যায় নাগরিকদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও বিশেষ পূর্বপুরুষ না থাকায় তাদের মালিকানায় কোনো নারীও থাকে না। নারীদের ভোগ করতে হয়েছে মাতৃত্বের দাসত্বশৃঙ্খল, যেমন পুরুষদের ভোগ করতে হয়েছে যুদ্ধের দাসত্বশৃঙ্খল; তবে এ-নাগরিক দায়িত্ব পূরণের বাইরে তাদের স্বাধীনতার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় নি।

যে-মুক্ত নারীদের কথা বলা হলো, তাদের ও পরিবারের দাসীদের পাশাপাশি গ্রিসে ছিলো বেশ্যারাও। প্রাচীন মানুষেরা অতিথিবৎসল বেশ্যাবৃত্তিও পালন করতো—অচেনা অতিথিদের আপ্যায়ন করা হতো নারী দিয়ে, নিঃসন্দেহে এর ছিলো অতীন্দ্রিয় যৌক্তিকতা–এবং ছিলো ধর্মীয় বেশ্যাবৃত্তি, যার লক্ষ্য ছিলো উর্বরতার রহস্যময় শক্তি সবার মঙ্গলের জন্যে অবারিত করে দেয়া। প্রথাটি প্রচলিত ছিলো ধ্রুপদী মহাযুগে। হিরোদোতাস বর্ণনা করেছেন যে খ্রিপূ পঞ্চম শতকে ব্যাবিলনের প্রতিটি নারী বাধ্য ছিলো জীবনে একবার মুদ্রার বিনিময়ে মাইলিত্তার মন্দিরে কোনো অচেনা পুরুষের কাছে দেহদানে, যে-অর্থ সে দান করতো মন্দিরে; তারপর সে ঘরে ফিরে যেতো সতীজীবন যাপনের জন্যে। আধুনিক কালেও ধর্মীয় বেশ্যাবৃত্তি প্রচলিত ছিলো মিশরের নর্তকীদের মধ্যে ও ভারতের বাঈজিদের মধ্যে, যারা ছিলো সম্ভ্রান্ত অভিজাত গায়িকা ও নর্তকী। তবে সাধারণত মিশরে, ভারতে, পশ্চিম এশিয়ায় ধর্মীয় বেশ্যাবৃত্তি পরিণত হয় বৈধ ভাড়াটে বেশ্যাবৃত্তিতে, কেননা যাজকতন্ত্র দেখতে পায় যে ব্যবসাটা বেশ লাভজনক। এমনকি হিব্রুদের মধ্যেও ভাড়াটে বেশ্যাবৃত্তি প্রচলিত ছিলো।

গ্রিসে, বিশেষ করে সমুদ্র-উপকূল ধরে, দ্বীপগুলোতে, ও ভ্রমণকারীতে পরিপূর্ণ নগরগুলোতে, ছিলো অনেক মন্দির, যেখানে পাওয়া যেতো পিন্ডারের ভাষায় ‘আগন্তুকদের প্রতি আতিথ্যপরায়ণ যুবতীদের’। তাদের উপার্জিত অর্থ যেতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে–অর্থাৎ, পুরোহিতদের কাছে ও পরোক্ষভাবে তাদের ব্যয়নির্বাহের জন্যে। বাস্তবে ছিলো–কোরিন্থ ও অন্যান্য স্থানে নাবিকদের ও ভ্রমণকারীদের কামক্ষুধা মেটানোর ভণ্ডামো, এবং এটা পরিণত হয়েছিলো অর্থগৃধ্নু বা ভাড়াটে বেশ্যাবৃত্তিতে। সোলোন একে পরিণত করে বেশ্যাবৃত্তির প্রতিষ্ঠানে। সে এশীয় ক্রীতদাসী কিনতে থাকে এবং তাদের আটকে রাখে অ্যাথেন্সে অবস্থিত ভেনাসের মন্দিরের কাছাকাছি ‘সংকেতস্থল’-এ, যেগুলো বন্দর থেকে বেশি দূরে ছিলো না এর পরিচালনার ভার ছিলো পর্নোত্রোপোই-এর হাতে, যারা পালন করতো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিচালনার দায়িত্ব। প্রতিটি মেয়ে মজুরি পেতো, আর শুদ্ধ লাভটুকু যেতো রাষ্ট্রের কোষে। পরে খোলা হয় ব্যক্তিমালিকানাধীন বেশ্যালয়, কাপেইলিম্বা, যাতে একটি লাল উল্কি ব্যবহৃত হতো ব্যবসার চিহ্ন হিসেবে। অনতিপরেই ক্রীতদাসী ছাড়াও নিম্ন শ্রেণীর গ্রিক নারীদেরও গ্রহণ করা হয় সেখাকার বাসিন্দা হিশেবে। ওই ‘সংকেতস্থল’গুলোকে এতো আবশ্যক গণ্য করা হয় যে সেগুলো স্বীকৃতি পায় শরণলাভের অলঙ্ঘনীয় স্থান বলে। তবে বেশ্যারা ছিলো মর্যাদাহীন, তাদের কোনোসামাজিক অধিকার ছিলো না, তাদের সন্তানদের অব্যাহতি দেয়া হতো তাদের ভরণপোষণ থেকে, তাদের পরতে হতোনানা রঙের একটি বিশেষ পোশাক, সাজতে হতো কুসুমস্তবকে, এবং কুঙ্কুম দিয়ে চুল রাঙাতে হতো।

ওই ‘সংকেতস্থল’-এর নারীরা ছাড়াও ছিলো স্বাধীন বারবনিতারা, যাদের ফেলা যায় তিনটি শ্রেণীতে। পতিতারা, যারা ছিলো আজকের অনুমতিপ্রাপ্ত বেশ্যাদের মতো; বাঈজিরা, যারা ছিলো নর্তকী ও বংশীবাদক; এবং অভিজাত গণিকারা, বিলাসিনী নারীরা, যাদের অধিকাংশই আসতো কোরিন্থ থেকে, যারা গ্রিসের সুবিখ্যাত পুরুষদের সাথে গড়েতুলতো স্বীকৃত সম্পর্ক, পালন করতো আধুনিক কালের ‘বিশ্বরমণীর’ মতো ভূমিকা। প্রথম শ্রেণীটি সংগৃহীত হতো মুক্তিপ্রাপ্ত নারীদের ও নিম্ন শ্রেণীর গ্রিক মেয়েদের মধ্য থেকে; তারা শোষিত হতো দালালদের দ্বারা এবং যাপন করতোদুর্বিষহ জীবন। দ্বিতীয় শ্রেণীটি গায়িকা হিসেবে প্রতিভার জন্যে কখনো কখনো ধনাঢ্য হয়ে উঠতো; এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত লামিয়া, যে ছিলো মিশরের এক টলেমির উপপত্নী, পরে যে হয় টলেমিকে পরাস্তকারী মেসিদনিয়ার রাজা দিমিত্রিয়াস পোলিওরকেতেসের উপপত্নী। তৃতীয় ও শেষ শ্ৰেণীটির অনেকে গৌরব অর্জন করেছে তাদের প্রেমিকদের সাথে। নিজেদের ও তাদের ভাগ্যকে স্বাধীনভাবে চালানোর অধিকারী ছিলো তারা, ছিলো বুদ্ধিমান, সুসংস্কৃত, কলানিপুণ; তাদের সঙ্গদানের মোহিনীশক্তিতে মুগ্ধ ছিলো যারা, তাদের কাছে তারা গণ্য হতো ব্যক্তিরূপে। তারা যেহেতু মুক্তি পেয়েছিলো পরিবার থেকে এবং বাস করতো সমাজের প্রান্তিক এলাকায়, তারা মুক্তি পেয়েছিলো পুরুষ থেকেও; তাই পুরুষদের কাছে তারা গণ্য হতো সহচর, প্রায় সমতুল্য, মানুষ হিসেবে। আস্পাসিয়া, ফ্রাইনে, লায়াসের মধ্যে রূপ লাভ করেছিলো পরিবারের শ্রদ্ধেয় মাতার ওপর স্বাধীন নারীর শ্রেষ্ঠত্ব।

এসব উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাদ দিলে, গ্রিসের নারীদের পরিণত করা হয়েছিলো আধাক্রীতদাসীতে, যাদের এমনকি অভিযোগ করার স্বাধীনতাও ছিলো না। ধ্রুপদী মহাযুগে নারীদের কঠোরভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হতো গাইনিকিউমে, নারীমহলে; পেরিক্লেস বলেছিলো সে-ই শ্রেষ্ঠ নারী, যার সম্পর্কে পুরুষেরা সবচেয়ে কম কথা বলে। প্লাতোরাষ্ট্রপরিচালনায় মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করার ও মেয়েদের মানবিক শিক্ষা দেয়ার প্রস্তাব দিলে আরিস্তোফানেস তীব্র গালিগালাজ করেন তাঁকে। তবে জেনোফোনের মতে স্বামী ও স্ত্রীরা ছিলো পরস্পরের অচেনা, এবং সাধারণত স্ত্রীদের হতে হতো সদাসজাগ গৃহিণী–সতর্ক, মিতব্যয়ী, মৌমাছির মতো পরিশ্রমী, এক আদর্শ তত্ত্বাবধায়ক। নারীদের এ-হীনাবস্থা সত্ত্বেও গ্রিকরা ছিলো প্রচণ্ড নারীবিদ্বেষী। প্রাচীন প্রবচনরচয়িতাদের থেকে ধ্রুপদী লেখকেরা পর্যন্ত, নারী ছিলোধারাবাহিক আক্রমণের বিষয়; তবে তারা চরিত্রহীনতার জন্যে আক্রান্ত হতো না। কেননা এদিকে প্রচন্ডভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিলো নারী এবং আক্রান্ত হতো না তাদের কামক্ষুধার জন্যেও; বিয়ে যে-বোঝা ও ঝামেলা চাপিয়ে দেয় পুরুষদের ওপর, তারই জন্যে আক্রান্ত হতো নারীরা। দজ্জাল স্ত্রী ও বিবাহিত জীবনের দুঃখযন্ত্রণার বিরুদ্ধে গ্রিগ নাগরিকদের সমস্ত ক্ষোভ রূপায়িত হয়েছে জানতিপ্পির মধ্যে।

রোমে পরিবার ও রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধই নির্ধারণ করে দেয় নারীর ইতিহাস। এত্রুস্কান সমাজ ছিলো মাতৃধারার, এবং সম্ভবত রাজতন্ত্রের কালেও রোমে প্রচলিত ছিলো মাতৃধারা ব্যবস্থায় গোত্রবহির্ভুত বিবাহ : লাতিন রাজারা উত্তরাধিকারসূত্রে একে অন্যের হাতে ক্ষমতা দেয়নি। এটা নিশ্চিতভাবে ঠিক যে তারকুইনের মৃত্যুর পরই প্রতিষ্ঠিত হয়পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্ব; কৃষিসম্পত্তি, ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি–সুতরাং পরিবার–হয় সমাজের ভিত্তির একক। নারীকে শক্তভাবে জড়িত করা হয় উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তির সাথে এবং তাই পরিবারের বংশের সাথে। গ্রিক নারীদের যতোটুকু নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিলো, রোমের আইন সেটুকু থেকেও বঞ্চিত করে নারীদের; সে যাপন করে আইনগতভাবে সামর্থহীনের ও দাসত্বের জীবন। তাকে বাদ দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় ব্যাপার থেকে, তার জন্যে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হয় সমস্ত ‘পুরুষসুলভ’ পদ; এবং সামাজিক জীবনে সে হয় স্থায়ীভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাকে রাখা হয় একজন অভিভাবকের কর্তৃত্বে।

নারীর প্রথম অভিভাবক ছিলো তার পিতা; পিতার অনুপস্থিতিতে পুরুষ আত্মীয়রা পালন করতো এ-দায়িত্ব। যখন নারীর বিয়ে হতো, সে চলে যেতো স্বামীর হাতে; ছিলো তিন ধরনের বিয়ে : কনফেরাতিও, এতে দম্পতিটি ফ্লেমেন দায়ালিস-এর সামনে জুপিটারের বেদিমূলে উৎসর্গ করতো একটি আটার পিঠে; কোএম্পতিও, এটা ছিলো এক কাল্পনিক বিক্রয়, যাতে কৃষিজীবী পিতা স্বামীর কাছে বিক্রি করতো মেয়েকে; এবং উসুস, এটা ছিলো এক বছরব্যাপী সহবাসের ফল। এসবই ছিলো ‘মানু’, যার অর্থ হচ্ছে পিতা বা অন্য কোনো অভিভাবকের বদলে স্বামীর কর্তৃত্ব লাভ; স্ত্রী হয়ে উঠতো তার কোনো কন্যার মতোই, এবং এরপর স্ত্রীর দেহ ও সম্পত্তির ওপর স্বামীর থাকতো পূর্ণ অধিকার। কিন্তু যেহেতু রোমের নারীরা একই সাথে অন্তর্ভুক্ত ছিলো পিতার ও স্বামীর বংশে, তাই দ্বাদশ বিধি আইনের কাল থেকে দেখা দেয় বিরোধ, যা ছিলো তাদের আইনগত মুক্তির মূলে। আসলে মানু সম্বলিত বিয়ে নারীর পৈতৃক অভিভাবকদের সর্বস্বান্ত করে তোলে। পৈতৃক অভিভাবকদের রক্ষার জন্যে প্রবর্তিত হয় সিনে মানু নামে এক ধরনের বিয়ে; এতে নারীর সম্পত্তি থেকে যায় তার অভিভাবকের কর্তৃত্বে, স্বামী শুধু পায় নারীটির দেহের অধিকার। এমনকি এ-ক্ষমতাও স্বামীকে ভাগ করে নিতে হতো স্ত্রীর পিতার সাথে, যার ছিলো কন্যার ওপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব। গার্হস্থ্য বিচারপরিষদকে ক্ষমতা দেয়াহয়েছিলো সে-সব বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার, যেগুলোর ফলে স্বামী ও পিতার মধ্যে বিরোধ বাঁধতে পারতো; এ-বিচারপরিষদ স্ত্রীকে অনুমতি দিতো পিতার পক্ষ থেকে স্বামীর প্রতি বা স্বামীর পক্ষ থেকে পিতার প্রতি পুনর্বিচার প্রার্থনার; এবং নারী এদের কারো অস্থাবর সম্পত্তি ছিলো না। এছাড়াও, যদিও পরিবারসংস্থা ছিলো খুবই শক্তিশালী, পিতা ও গৃহস্বামী সবার কাছে সে গণ্য হতো নাগরিক বলে। তার কর্তৃত্ব ছিলো অসীম, সে ছিলো স্ত্রী ও সন্তানদের নিরঙ্কুশ শাসক; তবে এরা তার সম্পত্তি ছিলো না; বরং সর্বসাধারণের মঙ্গলের জন্যে সে নিয়ন্ত্রণ করতো তাদের জীবন। স্ত্রী, যে পৃথিবীতে আনতো সন্তান এবং যার গৃহস্থালির কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলো খামারের কাজ, সে ছিলো দেশের জন্যে অত্যন্ত মঙ্গলজনক এবং তাকে ভক্তি করা হতো গভীরভাবে।

এখানে আমরা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সত্য লক্ষ্য করি, যার মুখোমুখি হবো আমরা ইতিহাসের ধারাব্যাপী : বিমূর্ত অধিকার নারীর বাস্তব পরিস্থিতি নির্দেশের জন্যে যথেষ্ট নয়; এটা বড়ো অংশে নির্ভর করে তার অর্থনীতিক ভূমিকার ওপর; এবং অনেক সময় বিমূর্ত অধিকার ও বাস্তুব ক্ষমতার ভিন্নতা ঘটে ব্যস্তানুপাতিকভাবে। আইনে গ্রিক নারীদের থেকে বেশি দাসত্ববন্ধনে আবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে রোমের নারীরা অনেক বেশি গভীরভাবে অঙ্গীভূত ছিলোসমাজের সাথে। গাইনিকিউমে গুপ্ত থাকার বদলে গৃহে সে বসতো বসতবাড়ির কেন্দ্রস্থলে; সে দাসদের কাজ পরিচালনা করতো; সে সন্তানদের শিক্ষা দেখাশুনো করতো, এবং বিশেষ বয়স পর্যন্ত তাদের প্রভাবিত করতো। সে স্বামীর সঙ্গে ভাগ করে নিতো শ্রম, তাকে গণ্য করা হতো সম্পত্তির সহমালিক। স্যাবাইন নারী লুক্ৰেতিয়া ও ভার্জিনিয়ার মতো কিংবদন্তি থেকে বোঝা যায় নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো ইতিহাসে; কোরিওলানাস আত্মসমর্পণ করেছিলো তার মা ও স্ত্রীর অনুনয়ের কাছে; রোমান গণতন্ত্রের বিজয় অনুমোদন করে লুকিনিয়াসের আইন তৈরি হয়েছিলো তার স্ত্রীর প্রেরণায়। ‘সর্বত্র পুরুষেরা শাসন করে নারীদের ওপর’, বলেছিলেন কাতো, ‘আর আমরা যারা শাসন করি সব মানুষকে, তারাই শাসিত হই আমাদের নারীদের দিয়ে’।

নারী পেয়েছিলো তার স্বাধীনতার একটি নিশ্চয়তাও; পিতা তাকে পণ দিতে বাধ্য ছিলো। বিয়ে ভেঙে গেলে এ-পণ তার পুরুষ আত্মীয়দের কাছে ফেরত যেতো না, এবং এটা তার স্বামীর অধিকারেও কখনো থাকতো না; নারীটি যে-কোনো সময় বিবাহচ্ছেদের মাধ্যমে এটা স্বামীর কাছে থেকে ফেরত চাইতে পারতো, ফলে তার কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা ছাড়া স্বামীর কোনো উপায় থাকতো না। প্লউতুসের মতে, ‘পণ গ্রহণ করে, সে বিক্রি করে দিয়েছে তার ক্ষমতা’। প্রজাতন্ত্রের সমাপ্তি থেকে মাতাও সন্তানদের কাছে পিতার সমান মর্যাদার অধিকারী হয়ে ওঠে; কর্তৃত্ব লাভ করে বা স্বামী যদি হতো দুরাচারী, সে পেতে সন্তানদের অধিকার। হাদ্রিয়ানের কালে সেনেটের একটি আইনে তাকে ক্ষমতা দেয়া হয়। যদি তার তিনটি সন্তান থাকে এবং তাদের কেউ সন্তানহীন মারা যায়–যদি তারা মৃত্যুর আগে ইচ্ছেপত্র রেখে না যায়, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার সে পায়। মার্কুস অউরেলিউসের শাসনকালে রোমন পরিবারের বিবর্তন পূর্ণতা লাভ করে : ১৭৮ অব্দ থেকে, পুরুষ আত্মীয়দের ওপর জয়ী হয়ে, সন্তানেরা হয় তাদের মায়ের উত্তরাধিকারী; তারপর থেকে পরিবার গড়ে ওঠে কনইউঙ্কতিও সাঙ্গিউনিস-এর ভিত্তির ওপর; এবং মায়ের মর্যাদা হয় পিতার সমান; কন্যারা উত্তরাধিকারী হয় ভাইদের মতোই।

তবে ওপরে আমি যে-বর্ণনা দিয়েছি, তার বিরোধী একটি প্রবণতা দেখতে পাই রোমান আইনের ইতিহাসে; পরিবারের মধ্যে নারীদের স্বাধীন করেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাকে আবার নিয়ে নেয় নিজের কর্তৃত্বে; এটা তাকে আইনগত অধিকারহীন করে তোলে নানাভাবে।

এটা সত্য যদি নারী হয় ধনী ও স্বাধীন, তাহলে লাভ করে এক পীড়াদায়ক গুরুত্ব; তাই দরকার হয়ে পড়ে তার কাছে থেকে এক হাত দিয়ে তা ফিরিয়ে নেয়া, অন্য হাত দিয়ে তাকে যা দেয়া হয়েছে। যখন হানিবল হুমকি দিচ্ছিলো রোম আক্রমণের, তখন রোমের নারীদের বিলাসিতা নিষিদ্ধ করে গৃহীত হয় ওপ্পিয়ান আইন; বিপদ কেটে গেলে রোমেরা ওই আইন বাতিলের দাবি জানায়। এক বক্তৃতায় কাতো এটা রাখার দাবি করেন; কিন্তু ময়দানে মাতৃদের উপস্থিতিতে দিনটি যায় তাঁর বিপক্ষে। পরে কঠোরতর নানা আইন প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়, কিন্তু তাতে তারা সফল হয় নি। এগুলো ধাপ্পাবাজির থেকে বেশি কিছু করতে পারে নি। শুধু বিজয়ী হয় সেনেটের ভেল্লেয়ীয় আইন, যাতে নারীদের নিষিদ্ধ করা হয় অন্যদের ‘মাধ্যস্থ করা’–অর্থাৎ অন্যদের সাথে চুক্তি করা নিষিদ্ধ করা হয়–যা তাকে বঞ্চিত করে প্রায় সব আইনসঙ্গত অধিকার থেকে। এভাবে যখন নারী লাভ করছিলো সম্পূর্ণ মুক্তি, তখনই দৃঢ়ভাবে জ্ঞাপন করা হয় তার লৈঙ্গিক নিকৃষ্টতা, যাতে পাই পুরুষপ্রাধান্যের যৌক্তিকতা প্রতিপাদনের এক অসাধারণ উদাহরণ, যে সম্পর্কে আমি বলেছি : যখন কন্যা, স্ত্রী, বা বোন হিসেবে খর্ব করা হয় নি নারীর অধিকার, তখন লিঙ্গানুসারে অস্বীকার করা হয়পুরুষের সাথে তার সাম্য; প্রভুত্বমূলক দাম্ভিক রীতিতে অভিযুক্ত করা হয় ‘মূঢ়তা, লিঙ্গের দুর্বলতা’কে।

সত্য হচ্ছে যে মাতৃরা তাদের নতুন স্বাধীনতার বিশেষ সদ্ব্যবহার করতে পারে নি; তবে এও সত্য যে একে একটি সদর্থক ব্যাপারে পরিণত করার অধিকার তাদের দেয়া হয় নি। এ-দুটি বিরোধী প্রবণতার ফলাফল- একটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী প্রবণতা, যা নারীকে মুক্ত করে পরিবার থেকে এবং স্থিতিমূলক প্রবণতা, যা ব্যক্তি হিশেবে তার স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করে, তার পরিস্থিতিকে করে তোলে ভারসাম্যহীন। উত্তরাধিকারসূত্রে সে সম্পত্তি লাভ করতে পারতো, পিতার সাথে সন্তানদের ওপর তার ছিলো সমান অধিকার, সে সাক্ষ্য দিতে পারতো। পণপ্রথার কল্যাণে সে মুক্তি পেতো দাম্পত্য পীড়ন থেকে, নিজের ইচ্ছেয় সে বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ করতে পারতো; তবে সে মুক্তি পেয়েছিলো শুধু নেতিবাচক রীতিতে, কেননা তার শক্তিকে প্রয়োগ করার মতো কোনো বাস্তব কাজ তাকে দেয়া হয় নি। আর্থনীতিক স্বাধীনতা থেকে যায় বিমূর্ত, কেননা এটা কোনো রাজনীতিক ক্ষমতা সৃষ্টি করে না। এভাবে এমন ঘটে যে, কর্ম করার সমান সামর্থ্যের অভাবে রোমের নারীরা শুধু বিক্ষোভ প্রদর্শন করে : তুমুল কোলাহলের মধ্যে জড়ো হয় তারা নগর ভরে, বিচারালয় অবরোধ করে, ষড়যন্ত্রের ইন্ধন জোগায়, প্রতিবাদ করে, গৃহযুদ্ধ বাঁধায়; শোভাযাত্রার সময় তারা খুঁজে বের করে দেবমাতার মূর্তি এবং টাইবারের তীর ধরে তাকে বহন করে, এভাবে তারা রোমে চালু করে প্রাচ্য দেবদেবীদের; ১১৪ অব্দে দেখা দেয় ভূষিত কুমারীদের কেলেঙ্কারি এবং তাদের সংঘকে নিষিদ্ধ করা হয়।

যখন পরিবারের বিলুপ্তি পারিবারিক জীবনের প্রাচীন গুণাবলিকে নিরর্থক করে তোলে ও বাতিল করে দেয়, তখন আর নারীর জন্যে থাকে না কোনো প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা, কেননা বাইরের জীবন ও তার নৈতিকতা তার কাছে রয়ে যায়অগম্য। নারীরা বেছে নিতে পারতো দুটি সমাধানের, একটি : তাদের পিতামহীদের মূল্যবোধকে একগুয়েভাবে শ্রদ্ধা করে যেতে পারতো বা কোনো মূল্যবোধকেই স্বীকার

না করতে পারতো। প্রথম শতকের শেষ দিকে ও দ্বিতীয় শতকের শুরুর দিকে আমরা দেখতে পাই যে প্রজাতন্ত্রের কালে যেমন তারা ছিলো তাদের স্বামীদের সঙ্গী ও সহযোগী তেমনভাবেই জীবন চালাচ্ছে বহু নারী : প্লোতিনা অংশী ছিলেন ত্রাজানের গৌরব ও দায়িত্বের; সাবিনা তাঁর জনহিতকর কাজের সাহায্যে নিজেকে এতোটা বিখ্যাত করে তোলেন যে জীবেকালেই মূতিতে মূর্তিতে তাঁকে দেবীত্বে উন্নীত করা হয়; তাইবেরিউসের অধীনে আমির্লিউস স্কারুসের মৃত্যুর পর বেঁচে থাকতে অস্বীকার করেন সেক্সতিনা, এবং পোম্পোনিউস লাবিউসের মৃত্যুর পর পাস্কিয়া; সেনেকার সাথে নিজের রগ কেটে ফেলে পাউলিন; অনুজ প্লিনি বিখ্যাত করে তুলেছেন আরিয়ার ‘এতে ব্যথা লাগছে না পায়েতুস’কে; অনিন্দ্য স্ত্রী ও অনুরক্ত মাতা হিশেবে ক্লদিয়া রিউফিনা, ভার্জিনিয়া, ও সুলপিকিয়াকে প্রশংসা করেছেন মার্তিয়াল। তবে বহু নারী ছিলো, যারা মাতৃত্ব অস্বীকার করেছিলো এবং বিবাহবিচ্ছেদের হার বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করেছিলো। আইন তখনও নিষিদ্ধ করেছে ব্যভিচারকে, তাই অনেক মাতৃ এতো দূর পর্যন্ত গিয়েছিলো যে তারা বেশ্যা হিশেবে তাদের নাম লিখিয়েছে, যাতে তারা চালিয়ে যেতে পারে তাদের ইন্দ্রিয়পরতন্ত্রতা।

ওই সময় পর্যন্ত লাতিন সাহিত্য সব সময়ই নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছে, কিন্তু তার পর ব্যঙ্গলেখকেরা উঠে-পড়ে লাগে তাদের বিরুদ্ধে। আদি প্রজাতন্ত্রে রোমের নারীদের পৃথিবীতে একটা স্থান ছিলো, তবে বিমূর্ত অধিকার ও আর্থনীতিক মুক্তির অভাবে তারা শৃঙ্খলিত ছিলো; পতনের কালের রোমের নারীরা ছিলো ভ্রান্ত মুক্তির উৎপাদন, তাদের ছিলো শূন্যগর্ভ স্বাধীনতা এমন এক বিশ্বে, যেখানে পুরুষেরা ছিলো সর্বময় প্রভু : নারী মুক্ত ছিলো– কিন্তু অহেতুক।

মধ্যযুগব্যাপী থেকে আঠারো শতকের ফ্রান্স পর্যন্ত

প্রথম খণ্ড । ভাগ ২ – ইতিহাস । পরিচ্ছেদ ৪

নারীর অবস্থার বিবর্তন কোনো ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ছিলো না। যখন ঘটতো বড় ধরনের বহিরাক্রমণ, তখন সন্দেহ দেখা দিতো সব সভ্যতা সম্বন্ধেই।রোমন আইন নিজেই পড়ে এক নতুন ভাবাদর্শের, খ্রিস্টধর্মের, প্রভাবে; এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে বর্বররা সফল হয় তাদের আইন চাপিয়ে দিতে। আর্থনীতিক, সামাজিক, ও রাজনীতিক পরিস্থিতিকে একেবারে উল্টে দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়া অনুভূত হয় নারীর পরিস্থিতিতে।

খ্রিস্টীয় ভাবাদর্শ নারীপীড়নে কম ভূমিকা পালন করে নি। সন্দেহ নেই সুসমাচারে আছে একটু সদয়তার শ্বাস, যা প্রসারিত যেমন নারীদের প্রতি তেমনি কুষ্ঠরোগীদের প্রতিও; এবং সে-হীনজনেরাই, দাসেরা ও নারীরা, চরম সংরাগে আঁকড়ে ধরেছিলো এ-নতুন আইন। আদিখ্রিস্টীয় পর্বে নারীদের বেশ কিছুটা মর্যাদা দেয়া হতো, যখন তারা আত্মসমর্পণ করতো দাসত্বের কাছে; পুরুষের পাশাপাশি শহিদ হিশেবে তারাও সাক্ষ্য দিতো। কিছু উপাসনায় তারা নিতে পারতো শুধু গৌণ স্থান, ‘ডিকনিস’রা অধিকার পেতো শুধু রোগীর সেবা ও দরিদ্রদের সাহায্য করার মতো অযাজকীয় কাজের। আর বিয়েকে যদি ধরি এমন একটি প্রথা বলে যাতে দরকার পারস্পরিক বিশ্বস্ততা, তাহলে স্পষ্ট দেখা যায় যে স্ত্রীকে পুরোপুরি অধীন করা হয় স্বামীর : সেইন্ট পলের মাধ্যমে বর্বরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নারীবিদ্বেষী ইহুদি ঐতিহ্য।

সেইন্ট পল নারীদের আদেশ দেন আত্মবিলোপের ও সতর্কতার সাথে চলার; তিনি পুরোনো ও নতুন উভয় টেস্টামেন্ট অনুসারে নারীকে করেতোলেন পুরুষাধীন। ‘যেহেতু নারীর থেকে পুরুষ নয়; কিন্তু পুরুষের থেকে নারী। নারীর জন্যে পুরুষ সৃষ্টি হয় নি; কিন্তু নারী পুরুষের জন্যে’। এবং আরেক স্থানে : ‘কেননা স্বামী হচ্ছে স্ত্রীর মাথা, যেমন খ্রিস্ট হচ্ছে গির্জার মাথা… সুতরাং গির্জা যেমন খ্রিস্টের অধীনে, তেমনি নারীরা সব কিছুতে তাদের স্বামীদের অধীনে’। যে-ধর্মে দেহকে মনে করা হয় অভিশপ্ত, সেখানে নারীরা হয়ে ওঠে শয়তানের ভয়াবহতম প্রলোভন। তারতুলিয়ান লিখেছেন : ‘নারী, তুমি শয়তানের প্রবেশদ্বার। তুমি এমন একজনকে নষ্ট করেছো, যাকে শয়তানও সরাসরি আক্রমণ করার সাহস করতো না। তোমার জন্যেই ঈশ্বরের পুত্রকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে; তোমাকে সব সময় থাকতে হবে শোকে এবং ছিন্নবস্ত্রে’। সেইন্ট অ্যান্ড্রোস : ‘আদমকে পাপে প্রলুব্ধ করেছিলো হাওয়া এবং আদমপ্রলুব্ধ করে নি হাওয়াকে। এটা ন্যায়সঙ্গত ও ঠিক যে নারী তাকে মানবে প্রভু ও মালিক হিশেবে, যাকে সে পাপিষ্ঠ করেছিলো’। এবং সেইন্ট জন ক্রাইসোস্টম : ‘বন্যপশুদের মধ্যেও নারীদের মতো ক্ষতিকর কাউকে পাওয়া যায় না’। চতুর্থ শতকে যখন গির্জীয় আইন বিধিবদ্ধ হয়, বিয়েকে গণ্য করা হয় মানুষের নৈতিক দুর্বলতার প্রতি একটি স্বীকৃতিরূপে, যা খ্রিস্টীয় শুদ্ধতার সাথে অসমঞ্জস। ‘এসো আমরা হাতে তুলে নিই কুড়োল এবং বিয়ের নিষ্ফল গাছকে কেটে ফেলি গোড়া থেকে,’ লিখেছেন। সেইন্ট জেরোম। গ্রেগরি ৬-এর সময় থেকে, যখন পুরোহিতদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় কৌমার্যব্রত, অধিক প্রচণ্ডতার সাথে জোর দেয়া হতে থাকে নারীপ্রকৃতির ভয়ঙ্করতার ওপর : গির্জার সব পিতাই নিন্দা করেন নারীর হীনতাপূর্ণ অশুভ প্রকৃতির। সেইন্ট টমাস এ-ঐতিহ্যের প্রতিই ছিলেন বিশ্বস্ত, যখন তিনি ঘোষণা করেন যে নারী হচ্ছে শুধু এক ‘আকস্মিক’ ও অসম্পূর্ণ সত্তা, এক ধরনের অশুদ্ধ পুরুষ। ‘পুরুষ নারীর ওপরে, যেমন খ্রিস্ট মানুষের ওপরে,’ তিনি লিখেছেন। ‘এটা অপরিবর্তনীয় যে নারীর নিয়তিই হচ্ছে পুরুষের অধীনে বাস করা, এবং তার প্রভুর কাছে থেকে সে কোনো কর্তৃত্ব পায় নি’। তাছাড়া, গির্জীয় বিধি পণ ছাড়া নারীর জন্যে আর কোনো বৈবাহিক সুবিধার ব্যবস্থা করে নি, ফলে নারী হয়ে ওঠে আইনতভাবে অযোগ্য ও শক্তিহীন। পুরুষসুলভ পেশাগুলোই শুধু তার জন্যে বন্ধ হয়ে যায় না, এমনকি বিচারালয়ে তার সাক্ষ্য দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়, এবং তার প্রামাণিক সাক্ষ্যেরও কোনো গুরুত্ব থাকে না। গির্জার পিতাদের প্রভাব কিছুটা পড়েছিলো সম্রাটদের ওপরও। জাস্টিনিয়ানের বিধান নারীকে স্ত্রী ও মাতা হিশেবে মর্যাদা দেয়, কিন্তু তাকে এ-ভূমিকারই অধীন করে রাখে; লিঙ্গের জন্যে নয়, পরিবারের মধ্যে তার পরিস্থিতির জন্যেই নারী অর্জন করে আইনগত অযোগ্যতা। বিবাহবিচ্ছেদ নিষিদ্ধ হয় এবং বিবাহ অনুষ্ঠিত হতে হয় প্রকাশ্যে। সন্তানদের ওপর মাতার কর্তৃত্ব পিতার সমানই থাকে; স্বামী মারা গেলে সে হয় সন্তানদের বৈধ অভিভাবক। সেনেটের ভেল্লিয়ীয় বিধি সংশোধন করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে নারী তৃতীয় পক্ষের মঙ্গলের জন্যে চুক্তি করতে পারে; তবে সে তার স্বামীর পক্ষে চুক্তি করতে পারতো না; তার পণ হয়ে ওঠে অচ্ছেদ্য–এটা হয় উত্তরাধিকার সূত্রে সন্তানদের প্রাপ্য বিষয়সম্পত্তি এবং তার জন্যে নিষিদ্ধ করা হয় এটা বিক্রি বা হস্তান্তরিত করা।

এসব আইন বর্বরদের অধিকৃত এলাকাগুলোতে সংস্পর্শে আসে জর্মনীয় প্রথার। শান্তিকালে জর্মনদের কোনো দলপতি থাকতো না, পরিবার ছিলোএক স্বাধীন সমাজ, যাতে নারীরা সম্পূর্ণভাবে ছিলো পুরুষের অধীন, তবে তাকে ভক্তি করা হতো, কিছু অধিকারও তার ছিলো। বিয়ে ছিলোএকপতিপত্নীক; এবং ব্যভিচারের শাস্তি ছিলো কঠোর। যুদ্ধকালে স্ত্রী স্বামীর সাথে যেতো যুদ্ধে, জীবনে ও মৃত্যুতে তার সাথে ভাগ্যের অংশী হয়ে, জানিয়েছেন তাসিতুস। নারীর নিকৃষ্টতার কারণ ছিলো তার দৈহিক দুর্বলতা, ওটি নৈতিক ছিলো না, এবং যেহেতু নারীরা ভূমিকা পালন করতো যাজিকার ও দৈবজ্ঞার, তাই তারা হয়তো ছিলো পুরুষদের থেকে শিক্ষিত।

এসব প্রথাই চলে মধ্যযুগে, নারী থাকে চূড়ান্তরূপে পিতা ও স্বামীনির্ভর। ফ্র্যাংকরা রক্ষা করতো না জর্মনীয় সতীত্ববোধ : বহুবিবাহের প্রচলন ছিলো; সম্মতি ছাড়া নারীকে বিয়ে দেয়া হতো; ছেড়ে দেয়া হতো স্বামীর খেয়ালখুশিতে; এবং তাকে গণ্য করা হতো চাকরানি বলে। আইন তাকে রক্ষা করতোজখম ও তিরষ্কার থেকে, তবে সেটা পুরুষের সম্পত্তি ও তার সন্তানদের মাতা হিশেবে। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন শক্তিশালী হয়ে ওঠে, একই বদল ঘটে যেমন ঘটেছেরোমে : অভিভাবকত্ব হয় রাষ্ট্রীয়, তা নিরাপত্তা দেয় নারীকে, তবে চলতে থাকে তার দাসীত্ব।

আদিমধ্যযুগের বিধ্বংসী উৎপ্লব থেকে যখন উদ্ভূত হয় সামন্তবাদ, নারীর অবস্থা হয়ে ওঠে অতিশয় অনিশ্চিত। সামন্তবাদ গোলমাল পাকিয়ে তোলে সার্বভৌমত্ব ও সম্পদের কর্তৃত্বের মধ্যে, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত অধিকার ও ক্ষমতার মধ্যে। এজন্যেই এ-ব্যবস্থায় একবার উন্নতি আবার অবনতি ঘটে নারীর অবস্থার। প্রথমে, নারীর ছিলো না কোনো ব্যক্তিগত অধিকার, যেহেতু তার ছিলো না রাজনীতিক ক্ষমতা; এর কারণ হচ্ছে একাদশ শতক পর্যন্ত সামাজিক বিন্যাস প্রতিষ্ঠিত ছিলো শুধু জোরের ওপর; ফিফ ছিলো সামরিক জোরে অধিকৃত ভূসম্পত্তি, যে-শক্তি নারীদের ছিলো না। পরে, পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে নারী উত্তরাধিকারী হতে পারতো; স্বামীই ছিলো ওই ফিফের রক্ষক ও অধিকারী, এবং আয়ের প্রাপক; নারী ছিল ওই ফিফেরই একটা অংশ।

সামন্তরাজ্য আর পারিবারিক ব্যাপার ছিলোনা; এর মালিক ছিলো সামন্তাধিপ, এবং সে ছিলো নারীরও মালিক। সামন্তাধিপ নারীর স্বামী ঠিক করতো, এবং তার সন্তানদের মালিক হতো, স্বামী মালিক হতো না, আর সন্তানদের নিয়তি হতো এই যে তারা হয়ে উঠতো সামন্তাধিপের দাস, যারা রক্ষা করতো তার ধনসম্পদ। তার ওপর একটি স্বামী চাপিয়ে দিয়ে তার নিরাপত্তা বিধানের জন্যে নারী হতো সামন্তরাজ্যের ও সামন্তরাজ্যের প্রভুর দাসী; খুব কম সময়ই এসেছে যখন নারীর ভাগ্য এর থেকে বেশি নির্মম ছিলো। উত্তরাধিকারিণী–এটা বোঝাতো ভূমি ও দুর্গ। বারো বা তার কম বয়সে তাকে বিয়েদেয়া হতো কোনো ব্যারনের সাথে। বেশি বিয়ে মানেই ছিলো বেশি সম্পত্তি, তাই ঘনঘন রদ হতো বিয়ে, গির্জা যা ভণ্ডামোর সাথে অনুমোদন করতো। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও দূরতম সম্পর্কিত দুজনের বিয়ের বিরুদ্ধে যে নিষেধ ছিলো, তাতে সহজেই পাওয়া যেতো বিয়ে রদের অজুহাত। একাদশ শতকের অনেক নারী এভাবে ত্যাজ্য হয়েছে চার পাঁচবার করে।

বিধবা হলে নারীর কাছে প্রত্যাশা হতো যে সে অবিলম্বে ধরবে একটি নতুন প্রভু। শাঁসোঁ দ্য জেস্ত-এ দেখতে পাই যে শার্লেমেন স্পেনে নিহত তার ব্যারনদের সব বিধবাকে দলবেঁধে বিয়ে করছে; এবং অনেক মহাকাব্যে পাওয়া যায় যে রাজা বা ব্যারন স্বেচ্চাচারিতার সাথে হস্তান্তরিত করে দিচ্ছে মেয়েদের ও বিধবাদের। স্ত্রীদের চুল ধরে টেনে পেটানো হতো, কঠোর শাস্তি দেয়া হতো। নাইটদের আকর্ষণ ছিলো না নারীর প্রতি; তাদের অশ্বকেই তাদের কাছে মনে হতো বেশি মূল্যবান। শাঁসোঁ দ্য জেস্ত-এ তরুণীরাই সব সময় প্রণয়ে উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তাদের কাছে চাওয়া হতো একপক্ষীয়একনিষ্ঠতা। কঠোর শারীরিক কাজের মধ্যে রূঢ়ভাবে লালনপালন করা হতো বালিকাদের, এবং দেয়া হতো না কোনো শিক্ষা। বড়ো হয়ে তারা শিকার করতো বন্যপশু, বিপজ্জনক তীর্থযাত্রা করতো, প্রভু রাজ্যের বাইরে থাকলে রক্ষা করতো ফিফ। এ-প্রভুপত্নীদের কেউ কেউ পুরুষদের মতোই হতো লোলুপ, দুরাচারী, নিষ্ঠুর, স্বেচ্ছাচারী; তাদের হিংস্রতার নানা ভয়াবহ গল্প ছড়িয়ে আছে। তবে এগুলো ব্যতিক্রম; সাধারণত প্রভুপত্নীরা জীবন কাটাতে চরকা কেটে, উপাসনা করে, পতির অপেক্ষায় থেকে, এবং অবসাদে মরে গিয়ে।

দ্বাদশ শতকে মিদিতে ‘নাইটসুলভ প্রেম’-এর আবির্ভাব হয়তো নারীর ভাগ্যকে একটু কোমল করে তুলেছিলো, এর উদ্ভব যেভাবেই হোক, প্রভুপত্নী ও তার তরুণ ভৃত্যের সম্পর্ক থেকেই হোক বা হোক কুমারীউপাসনা থেকে বা হোক সাধারণ ঈশ্বরপ্রীতি থেকে। ভদ্র প্রেমের ব্যাপারটি কখনো বাস্তবে ছিলো কি না সন্দেহ, তবে এটা নিশ্চিত যে গির্জা ত্রাতার মাতৃপুজোকে এমন এক স্তরে উন্নীত করেছিলো যে বলা যায় এয়োদশ শতকে ঈশ্বরকে পরিণত করা হয়েছিলো নারীতে। অভিজাত নারীদের স্বচ্ছল জীবনে সুযোগ আসে আলাপচারিতার, ভদ্ৰ আচরণের এবং ঘটে কবিতার বিকাশ। আকুইতেনের এলিনোর ও নাভারের ব্লাশের মতো বিদুষীরা পৃষ্ঠপোষকতা করেন কবিদের, এবং সংস্কৃতির বিপুল বিকাশ নারীদের দেয় এক নতুন মর্যাদা। নাইটসুলভ প্রেমকে অনেক সময় প্লাতোয়ী প্রেম বলে গণ্য করা হয়েছে; কিন্তু সত্য হচ্ছে সামন্ত স্বামীরা ছিলো কর্তৃত্বপরায়ণ ও স্বৈরাচারী, এবং স্ত্রীরা খুঁজতো পরকীয়প্রেমিক; নাইটসুলভ প্রেম ছিলো অপরিহার্য লোকাচারের বর্বরতার এক ধরনের ক্ষতিপূরণ। যেমন এঙ্গেলস বলেছেন, ‘প্রেম, শব্দটির আধুনিক অর্থে, উদ্ভূত হয়েছিলো প্রাচীন কালে প্রথাবদ্ধ সমাজের বাইরে। যৌন প্রেমের খোঁজে যেখানে থামে প্রাচীন কাল সেখানেই শুরু হয় মধ্যযুগ : ব্যভিচার’। যে-পর্যন্ত বিবাহপ্রথা টিকে থাকবে ততোদিন পর্যন্ত প্রেম ধরবে ওই রূপই।

তবে সামন্তবাদ যখন শেষ হয়ে আসে, তখন নাইটসুলভ প্রেম নয়, ধর্ম নয়, কবিতাও নয়, অন্য কিছু কারণ কিছুটা প্রতিষ্ঠা দেয় নারীদের। রাজকীয় ক্ষমতা বাড়ার সাথে সামন্ত প্রভুরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তাদের কর্তৃত্ব, হারিয়ে ফেলে তাদের ভৃত্যদের বিয়ে দেয়ার ক্ষমতা এবং তাদের সন্তানদের সম্পদ খরচের অধিকার। যখন থেকে ফিফ রাজাকে সামরিক সাহায্য দেয়ার বদলে অর্থ দিতে শুরু করে, তখন থেকে এটা হয়ে ওঠে নিছক উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি সম্পত্তি, এবং দু-লিঙ্গকে সমভাবে না দেখার আর কোনো কারণ থাকে না। ফ্রান্সে কুমারী ও বিধবা নারীদের ছিলোপুরুষদের মতো সমস্ত অধিকার; ফিফের স্বত্বাধিকারী হিশেবে নারী বিচারকার্য করতো, চুক্তিতে স্বাক্ষর করতো, আইন জারি করতো। এমনকি সে সামরিক দায়িত্বও পালন করতো, পরিচালনা করতো সৈন্য ও যুদ্ধে অংশ নিতো : জোয়ান অফ আর্কের আগেও ছিলো নারী সৈনিক, এবং যদিও এ-তরুণী বিস্ময়জাগিয়েছিলো, সে কোনো কেলেঙ্কারি সৃষ্টি করে নি।

এতো সব ব্যাপার সম্মিলিত হয়েছিলো নারীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যে ওগুলো একসাথে লোপ করা হয় নি। শারীরিক দুর্বলতা আর বিবেচনার বিষয়ছিলো না, তবে বিবাহিত নারীর অধীনতা সমাজের কাছে মঙ্গলজনক বলে মনে হয়। তাই সামন্তবাদ চলে যাওয়ার পরেও বৈবাহিক কর্তৃত্ব টিকে থাকে। দেখতে পাই একই অসঙ্গতি, যা টিকে আছে আজো : যে-নারী সমাজের সাথে সম্পূর্ণরূপে সংহত, তারই সুযোগসুবিধা সবচেয়ে কম। নাগরিক সামন্তবাদে বিয়ে তা-ই রয়ে যায়, যা ছিলো সামরিক সামন্তবাদে : স্বামী তখনও ছিলো স্ত্রীর অভিভাবক। যখন বুর্জোয়ারা দেখা দেয়, তারাও মেনে চলে একই আইন; মেয়ে ও বিধবার পুরুষের মতো একই অধিকার; কিন্তু বিয়ে হলেই নারী হয়ে ওঠে প্রতিপাল্য, যাকে পেটানো যায়, যার আচারব্যবহারের ওপর সারাক্ষণ চোখ রাখতে হবে, এবং যার টাকাপয়সা যথেচ্ছ ব্যয় করা যাবে। একলা নারীর দক্ষতা স্বীকার করা হয়েছে; তবে সামন্তবাদের কাল থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত বিবাহিত নারীকে পরিকল্পিতভাবে বলি দেয়া হয়েছে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তির কাছে। স্বামী যতো ধনী হতো স্ত্রী ততো বেশি নির্ভরশীল হতো স্বামীর ওপর; স্বামী নিজেকে যতো বেশি মনে করতো সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতাশীল, গৃহপতি হিশেবে সে হতো ততো বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ। অন্যদিকে, সাধারণ দারিদ্র্য দাম্পত্যবন্ধনকে করে তোলে পারস্পরিক বন্ধন। সামন্তবাদ নারীকে মুক্ত করে নি, ধর্মও করে নি। মধ্যযুগের উপাখ্যান ও উপকথাগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ও কৃষকদের এমন এক সমাজ, যাতে স্ত্রীকে পেটানোর শারীরিক জোর ছাড়া স্ত্রীর ওপর স্বামীর আর কোনো জোর ছিলো না; তবে স্ত্রীটি জোরের বিরুদ্ধে আশ্রয় নিতো ছলনার, এবং এভাবে দম্পতিটি বাস করতো সাম্যের মধ্যেই। তখন ধনী নারী তার আলস্যের মূল্য শোদধ করতো অধীনতা দিয়ে।

মধ্যযুগেও নারীর ছিলো কিছু সুযোগসুবিধা, কিন্তু ষোড়শ শতকে কিছু আইন করা হয়, যা টিকে থাকে প্রাচীন ব্যবস্থাব্যাপী; সামন্ত লোকাচার বিলুপ্ত হয়েছিলো এবং কিছুই আর চুলোর সাথে নারীকে বেঁধে রাখার পুরুষের বাসনা থেকে নারীকে রক্ষা করতে পারে নি। এ-বিধান নারীর জন্যে নিষিদ্ধ করে ‘পুরুষসুলভ’ পদ, তাকে বঞ্চিত করে সমস্ত নাগরিক যোগ্যতা থেকে কুমারীকালে তাকে রাখে পিতার কর্তৃত্বে, পরে তার বিয়ে না হলে যে তারে পাঠিয়েদিতো সন্ন্যাসিনীদের মঠে, এবং আর যদি বিয়ে হতো, তাহলে তাকে ও তার সম্পত্তিকে ও তার সন্তানদের পুরোপুরি রাখতো স্বামীর কর্তৃত্বে। স্বামীকে দায়ীকরা হতো স্ত্রীর সমস্ত ঋণভার ও আচরণের জন্যে, এবং জনশাসনমূলক কর্তৃপক্ষ ও তার পরিবারের কাছে অপরিচিতদের সাথে তার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিলো না। কাজে ও মাতৃত্বে সহযোগীর থেকে একটি দাসী বলেই তাকে মনে হতো : সে সৃষ্টি করতো যে-সব জিনিশ, মূল্য, মানুষ, সেগুলো তার সম্পদ হতো না, হতো পরিবারের, সুতরাং সে-পুরুষটির, যে ছিলো পরিবারের প্রধান। অন্যান্য দেশেও নারীর অবস্থা ভালো ছিলো না : তার কোনোরাজনীতিক অধিকার ছিলো না এবং লোকাচার ছিলো কঠোর। ইউরোপি সব আইনগত বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো গির্জীয় আইন, রোমীয় আইন, ও জর্মনীয় আইনের ভিত্তির ওপর–যার সবগুলোই ছিলো নারীবিরূপ। সব দেশেই ছিলো ব্যক্তিমালিকানা ও পরিবার এবং এগুলো চালানো হতো এসব সংস্থার দাবি অনুসারে।

এ-সব দেশেই পরিবারের কাছে সতীনারীদের দাসীত্বের অন্যতম ফল ছিলো বেশ্যাবৃত্তির অস্তিত্ব। ভণ্ডামোর সাথে সমাজের প্রান্তে লালিত বেশ্যারা সমাজে পালন করতো অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। খ্রিস্টধর্ম এদের ওপর বর্ষণ করেছে প্রচণ্ড তিরস্কার, কিন্তু মেনে নিয়েছে এক অপরিহার্য অশুভ বলে। সেইন্ট অগাস্টিন ও সেইন্ট টমাস উভয়েই বলেছেন বেশ্যাবৃত্তি বিলোপের অর্থ নীতিভ্রষ্টতা দিয়ে সমাজকে বিপর্যস্ত করা : ‘প্রাসাদের কাছে পয়ঃপ্রণালি যেমন নগরের কাছে বেশ্যারা তেমন’। আদিমধ্যযুগে লোকাচার এতো লাম্পট্যপূর্ণ ছিলো যে বেশ্যাদের দরকারই পড়তো না; কিন্তু যখন প্রতিষ্ঠিত হয়বুর্জোয়া পরিবার এবং কঠোর একপতিপত্নীক বিয়ে নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তখন পুরুষদের প্রমোদ খুঁজতে হয় ঘরের বাইরে।

বেশ্যাবৃত্তির বিরুদ্ধে শার্লেমেনের, এবং পরে ফ্রান্সে চার্লস ৯-এর, এবং আঠারো শতকে অস্ট্রিয়ায় মারিয়া তেরেসার সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়একইভাবে। সমাজসংস্থাই বেশ্যাবৃত্তিকে দরকারি করে তোলে। যেমন শপেনহায়ার সাড়ম্বরে বলেছিলেন : ‘একপতিপত্নীক বিয়ের বেদিতে বেশ্যারা হচ্ছে নরবলি’। লেকি, ইউরোপি নৈতিকতার ঐতিহাসিক, একই ভাবনা ব্যক্ত করেছিলেন কিছুটা ভিন্নভাবে : ‘চূড়ান্ত রকমের পাপ, তারাই হচ্ছে সদগুণের শ্রেষ্ঠতম অভিভাবক’। গির্জা এবং রাষ্ট্র একইভাবে নিন্দা করেছে ইহুদিদের সুদের কারবার ও বেশ্যাদের বিবাহবহির্ভূত কামের; কিন্তু আর্থিক ফটকাবজি ও বিয়ের বাইরের প্রেম ছাড়া সমাজ চলতে পারে নি; তাই এসব কাজ ছেড়ে দেয়া হয় হীনবর্ণদের ওপর, যাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় ঘেটোতে বা নিষিদ্ধপল্লীতে। ইহুদিদের মতো বেশ্যাদেরও বাধ্য করা হয় পোশাকের ওপর পরিচয়সূচক চিহ্ন ধারণ করতে; পুলিশের কাছে তারা ছিলো অসহায়; তাদের অধিকাংশের জীবন ছিলো কঠিন। তবে অনেক বেশ্যা ছিলো স্বাধীন; অনেকে বেশ ভালো আয় করতো। যেমন ঘটেছিলো গ্রিক অভিজাত গণিকাদের কালে বীরত্বব্যঞ্জকতার কালের বিলাসবহুল জীবনযাত্রাও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যপূর্ণ নারীর সামনে খুলে দিয়েছিলো সুযোগসুবিধার নানা দরোজা, যা দিতে পারতো না ‘সতীনারী’র জীবন।

ফ্রান্সে অবিবাহিত নারীর অবস্থা ছিলো একটু অদ্ভুত : দাসীত্বে আবদ্ধ স্ত্রীর সাথে তার স্বাধীনতা ছিলো চমকপ্রদভাবে বিপরীত; সে ছিলো একজন অসামান্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তবে আইন তাকে যা দিয়েছিলো, লোকাচার তাকে বঞ্চিত করে তার সব কিছু থেকে; তার ছিলো সব নাগরিক অধিকার। তবে এগুলো ছিলো বিমূর্ত ও শূন্যগর্ভ; তার আর্থনীতিক স্বাধীনতা ছিলো না, সামাজিক মর্যাদাও ছিলো না; সাধারণত বয়স্ক অবিবাহিত কন্যাটি জীবন কাটিয়েদিতো পিতার পরিবারের ছায়ায় বা তার মতোদের সাথে যোগ দিতে সন্ন্যাসিনীদের মঠে, যেখানে সে আনুগত্য ও পাপ ছাড়া আর কোনো রকমের স্বাধীনতার দেখা পেতো না–যেমন অবক্ষয়ের কালের রোমের নারীরা স্বাধীনতা পেয়েছিলো শুধু পাপের মধ্য দিয়ে। নেতিবাচকতা তখনও ছিলো নারীর নিয়তি, যেহেতু তাদের মুক্তি ছিলো নেতিবাচক।

এমন অবস্থায় নারীর পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা নেয়া, বা নিতান্ত তার উপস্থিতি জ্ঞাপন করাও ছিলো স্পষ্টতই বিরল। শ্রমজীবী শ্ৰেণীদের মধ্যে অর্থনীতিক পীড়ন দূর করে দিয়েছিলো লিঙ্গের অসাম্য, তবে এটা ব্যক্তিকে বঞ্চিত করেছিলো সব সুযোগ থেকে; অভিজাত ও বুর্জোয়াদের মধ্যে নারীরা ছিলো চোখ রাঙানির তলে : নারীর ছিলো শুধু পরগাছার জীবন; তার কোনো শিক্ষা ছিলো না; শুধুমাত্র অত্যন্ত অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই সে পারতোকোনো বাস্তব পরিকল্পনা নিতে ও বাস্তবায়িত করতে। রাণীদের ও রাজপ্রতিভূদেরই ছিলো এ-দুর্লভ সুখ; তাদের সার্বভৌমত্ব তাদের উন্নীত করতোনিজেদের লিঙ্গ থেকে ওপরে। ফ্রান্সে সালিক আইন নারীদের নিষিদ্ধ করে সিংহাসনের উত্তরাধিকার থেকে; তবে স্বামীদের পাশে থেকে, বা স্বামীদের মৃত্যুর পরে, তারা কখনো কখনো মহাভূমিকা পালন করেছে, যেমন, পালন করেছেন সেইন্ট ক্লোতিলদা, সেইন্ট রাদেগোঁদ, এবং কাস্তিলের ব্লাশ। সন্ন্যাসিনীদের মঠে বাস নারীদের মুক্ত করতো পুরুষ থেকে : কিছু মঠাধ্যক্ষা ছিলেন খুবই ক্ষমতাশালী। এলোইজ মঠাধ্যক্ষা হিশেবে যতোটা খ্যাতি অর্জন করেছিলেন ততোটা খ্যাতিই অর্জন করেছিলেন প্রেমের জন্যে। যে-অতীন্দ্রিয় সম্পর্ক তাদের জড়িয়ে রাখতো ঈশ্বরের সাথে, তার থেকে নারী-আত্মা লাভ করতে সব প্রেরণা ও পুরুষ-আত্মার শক্তি; এবং সমাজ তাদের প্রতি যে-ভক্তি দেখাতো, তা তাদের শক্তি যোগাতো কঠিন সব কাজ সম্পন্ন করতে। জোয়ান অফ আর্কের দুঃসাহসিক কাজে রয়েছে কিছুটা অলৌকিকতা; এছাড়া এটা ছিলো এক সংক্ষিপ্ত ঝুঁকিপূর্ণ দুঃসাহসিক কাজ। তবে সিয়েনার সেইন্ট ক্যাথেরিনের কাহিনী তাৎপর্যপূর্ণ; এক স্বাভাবিক জীবনের মধ্যে বাস করে সিয়েনায় তিনি অর্জন করেন মহাসুখ্যাতি তার সক্রিয় হিতসাধনের সংকল্পের মধ্য দিয়ে। ঐশ্বরিক অধিকার বলে রাণীরা এবং উজ্জ্বল গুণাবলির জন্য সন্তরা লাভ করতেন এমন সামাজিক সমর্থন, যা তাদের সমর্থ করতো পুরুষের সমান হয়েকাজ করতে। এর বিপরীতে অন্য নারীদের কাছে চাওয়া হতো বিনীত নিশ্চুপতা।

মোটামুটিভাবে, মধ্যযুগের পুরুষ নারী সম্পর্কে পোষণ করতো বিরূপ ধারণা। প্রণয়াবেদনমূলক কবিতার কবিরা প্রেমকে করে তুলেছিলেন মর্যাদাসম্পন্ন; রম্যা দ্য লা রোজ-এ তরুণদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে দয়িতাদের তুষ্টিতে আত্মনিয়োগ করার জন্যে। তবে এ-সাহিত্যের (ক্রবাদুরদের সাহিত্য দিয়ে অনুপ্রাণিত) বিপরীতে ছিলো বুর্জোয়াপ্রেরণার সাহিত্য যাতে নারীদের আক্রমণ করা হয়েছে হিংস্রভাবে : উপকথা, রম্যোপাখ্যান এবং গাথায়তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে আলস্যের, ছেনালিপনার এবং কামুকতার। তাদের নিকৃষ্টতম শত্রু ছিলো যাজকেরা, যারা দোষ চাপাতো বিয়ের ওপর। গির্জা বিয়েকে পরিণত করেছিলো এক পবিত্র ভাবগম্ভীর ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, আবার তা নিষিদ্ধ করেছিলো খ্রিস্টীয় অভিজাতদের জন্যে : ‘নারী নিয়েঝগড়া’র মূলেই ছিলো একটা অসঙ্গতি। বহু যাজক নারীদের দোষত্রুটি, বিয়ের মধ্যে পুরুষের শহিদত্বের যন্ত্রণা, ও আরো বহু কিছু সম্পর্কে লিখেছে’ বিলাপ’ ও তীব্র ভৎসনা; এবং তাদের বিরোধীপক্ষ দেখাতে চেয়েছে নারীর শ্রেষ্ঠত্ব। এ-ঝগড়া চলেছে পঞ্চদশ শতক ধরে, যতোদিন না আমরা দেখতে পাই প্রথম একজন নারী তার লিঙ্গের পক্ষে কলম ধরেছেন, যখন ক্রিস্তিন দ্য পিসা তাঁর এপিত্র ও দিয়ো দ’আমুর-এ চালান যাজকদের বিরুদ্ধে এক প্রাণবন্ত আক্রমণ। পরে তিনি মত দেন যে যদি বালিকাদের ঠিকভাবে শিক্ষা দেয়া হতো, তাহলে তারাও ছেলেদের মতো ‘বুঝতে পারতো সব কলা ও বিজ্ঞানের সূক্ষতা’। ওই সাহিত্যিক যুদ্ধের ফলে নারীদের অবস্থার কোনোই বদল ঘটে নি; ওই ‘ঝগড়া’ ছিলো এমন এক প্রপঞ্চ, যা সামাজিক প্রবণতাকে বদলে দেয়নি, বরং ঘটিয়েছে তার প্রতিফলন।

পনেরো শতকের শুরু থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত নারীর আইনগত মর্যাদা থাকে অপরিবর্তিত, তবে সুবিধাভোগী শ্ৰেণীগুলোতে তার বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। লিঙ্গ নির্বিশেষে শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের বিকাশের জন্যে ইতালীয় রেনেসাঁস ছিলো একটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী অনুকূল পর্ব। নারীরা হয় ক্ষমতাশালী রাজ্ঞী, সামরিক যোদ্ধা, এবং নেত্রী, শিল্পী, লেখক, ও সুরস্রষ্টা। এ-নারীদের অধিকাংশই চেতনা, রীতিনীতি, ও অর্থসম্পদে ছিলেন স্বাধীন অভিজাত গণিকা, এবং তাদের অপরাধ ও প্রমত্ত আনন্দোৎসবগুলো পরিণত হয়েছে কিংবদন্তিতে। পরের শতাব্দীগুলোতে যে-নারীরা মুক্ত থাকতে পেরেছিলেন ওই সময়ের কঠোর সাধারণ নৈতিকতা থেকে, মর্যাদা ও ধন অনুসারে তারা ভোগ করেন একই স্বাধীনতা। ক্যাথেরিন দ্য মেদিচি, এলিজাবেথ, ইসাবেলা প্রমুখ রাণী এবং তেরেসা ও ক্যাথেরিনের মতো সন্তরা দেখিয়েছিলেন অনুকূল পরিস্থিতিতে নারীরা কী অর্জন করতে পারে; তবে এঁদের ছাড়া নারীদের ইতিবাচক অর্জন ছিলো খুবই কম, কেননা ষোড়শ শতক ভরেও তাদের দেয়া হয় নি শিক্ষা ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা।

সতেরো শতকে অবকাশপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদের নিয়োগ করেন শিল্পসাহিত্য চর্চায়, উচ্চ সামাজিক স্তরে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে থাকে বলে তাঁরা সালগুলোতে পালন করতে থাকেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফ্রান্সে মাদাম দ্য রবিলে, মাদাম দ্য সেভিয়ে, ও অন্যান্য বিপুল খ্যাতিলাভ করেন, এবং অন্যত্র রাণী ক্রিস্তিন, দ্য শুরমান, ও অন্যান্য ছিলেন সমান বিখ্যাত। এসব গুণ ও মর্যাদার ভেতর দিয়ে উচ্চ শ্রেণীর বা খ্যাতিমান নারীরা ঢুকতে শুরু করেন পুরুষের জগতে, শেষে মাদাম দ্য মাইয়তেনর মধ্যে দেখতে পাই সে-পরিস্থিতিতে এ কুশলী নারীর পক্ষে দৃশ্যের আড়ালে থেকে কতোটা প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। এবং আরো কিছু ব্যক্তিত্ব বাইরের জগতে খ্যাতি লাভ করে মুক্তি পেয়েছিলেন বুর্জোয়া পীড়ন থেকে; দেখা দেয় তখন পর্যন্ত অজ্ঞাত একটি প্রজাতি : অভিনেত্রী। মিঞ্চে প্রথম নারী দেখা গিয়েছিলো ১৫৪৫-এ। এমনকি সতেরো শতকের শুরুতেও অধিকাংশ অভিনেত্রীই ছিলেন অভিনেতাদের স্ত্রী, কিন্তু পরে তারা কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীন হয়ে ওঠেন। নিনো দ্য লেক্ল ছিলেন অভিজাত গণিকার পরম প্রতিমূর্তি, যিনি তাঁর স্বাধীনতা ও মুক্তিকে নিয়েগিয়েছিলেন চূড়ান্তে, যা অনুমোদিত ছিলো না নারীদের জন্যে।

আঠারো শতকে বাড়তে থাকে নারীস্বাধীনতা। লোকাচার তখনও ছিলো কঠোর : বালিকারা পেতো সামান্য শিক্ষা; তার সাথে কথা না বলেই তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো বা পাঠিয়ে দেয়া হতো সন্ন্যাসিনীদের মঠে। উঠতি মধ্যবিত্তশ্রেণীটি স্ত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেয় কড়া নৈতিকতা। তবে বিশ্বরমণীরা যাপন করতে অত্যন্ত কামময় জীবন, এবং উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীটি সংক্রামিত হয়েছিলো এসব উদাহরণ দিয়ে; সন্ন্যাসিনীদের মঠ বা গৃহ কিছুই আর দমন করতে পারতো না নারীদের। আবারও, এসব স্বাধীনতার বড়ো অংশই ছিলো বিমূর্ত ও নঞর্থক : বিনোদন খোঁজার বেশি কিছু ছিলো না। তবে বুদ্ধিমান ও উচ্চাভিলাষীরা সুযোগ সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন। সাল অর্জন করে নতুন গৌরব; নারীরা লেখকদের দিতেন নিরাপত্তা ও প্রেরণা, সৃষ্টি করতেন তাদের পাঠক; তারা পড়তেন দর্শন ও বিজ্ঞান, এবং পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নবিজ্ঞানের জন্যে স্থাপন করেন গবেষণাগার। রাজনীতিতে মাদাম দ্য পপাদর ও মাদাম দু বার-এর নাম দুটি নির্দেশ করে নারীর ক্ষমতা : তাঁরাই আসলে চালাতেন রাষ্ট্র। অভিনেত্রীরা ও নাগরালি করা নারীরা উপভোগ করতেন বিপুল খ্যাতি। এভাবে প্রাচীন ব্যবস্থা জুড়ে যে-নারীরা কিছু করতে চাইতেন, তাঁদের জন্যে সাংস্কৃতিক মণ্ডলই ছিলো সবচেয়ে সুগম্য। তবে তাঁদের কেউই দান্তে বা শেক্সপিয়রের উচ্চতায় পৌছোন নি, এর কারণ তাঁদের পরিস্থিতির সাধারণ নিম্নতা। এ রুম অফ ওয়ান্স অৌন-এ ভার্জিনিয়া উম্ফ শেক্সপিয়রের এক কল্পিত বোনের তুচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত জীবনের সাথে তুলনা করেছেন শেক্সপিয়রের শিক্ষা ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জীবনের। মাত্র আঠারো শতকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এক নারী, মিসেস আফ্রা বেন, একজন বিধবা, পুরুষের মতো লিখে অর্জন করেন জীবিকা। অন্যরা অনুসরণ করেন তার উদাহরণ, তবে এমনকি উনিশ শতকেও তাঁদের অনেকে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হতেন। তাদের এমনকি ‘একটি নিজের ঘরও’ ছিলো না; অর্থাৎ তাঁদের ছিলো না সে-বস্তুগত স্বাধীনতা, যা আন্তর মুক্তির অন্যতম আবশ্যক শর্ত। ভার্জিনিয়া উম্ফ বলেছেন ইংল্যান্ডে নারী লেখকেরা সব সময়ই জাগিয়েছেন শত্রুতা।

সামাজিক ও মননশীল জীবনের মৈত্রির ফলে ফ্রান্সে অবস্থা ছিলো কিছুটা অনুকূল; তবে, সাধারণভাবে, জনমত ছিলো ‘নীলমুজোদের’ প্রতি বিরূপ রেনেসাঁস থেকেই উচ্চবংশীয় ও বুদ্ধিমান নারীরা, এরাসমুস ও অন্যান্য পুরুষের সঙ্গে, নারীদের পক্ষে লিখে এসেছেন। নারীর শত্রুরা অবশ্য চুপ ছিলো না। তারা আবার জাগিয়ে তোলে মধ্যযুগের পুরোনো যুক্তিগুলো, এবং প্রকাশ করে বর্ণমালা, যার প্রতিটি অক্ষরে নির্দেশ করা হয় নারীর একেকটি দোষ। নারীদের মূঢ়তাকে আক্রমণ করার জন্যে দেখা দেয় এক ধরনের লম্পট সাহিত্য–কাবিনে সাতিরিক ইত্যাদি। আর ধার্মিকেরা নারীদের অবজ্ঞা করার জন্যে উদ্ধৃত করতে থাকে সেইন্ট পলকে, গির্জার পিতাদের ও ধর্মযাজকদের।

নারীদের সাফল্যই তাদের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলে নতুন আক্রমণ : প্রেসিওজ নামের আক্রান্ত নারীরা জনমতকে বিরূপ করে তোলেন; প্রেসিওজ রিদিকিল ও ফাম সভাঁতেদের করতালি দিয়ে সমর্থন জানানো হতো, যদিও মলিয়ের নারীদের শত্রু ছিলেন না : তিনি জোর করে বিয়ে দেয়াকে কঠোরভাবে আক্রমণ করেন, দাবি করেন তরুণীর হৃদয়ানুভূতির স্বাধীনতা এবং স্ত্রীর মর্যাদা ও স্বাধীনতা। বোসে প্রচারণা চালাতেন নারীদের বিরুদ্ধে, বোইলো লেখেন প্রহসন। পোলাঁ দ্য ল বার, ওই সময়ের প্রধান নারীবাদী, ১৬৭৩-এ প্রকাশ করেন দ্য লেগালিতে দে দো সেক্স। পুরুষেরা, তিনি মনে করেন, তাদের বিপুল শক্তিকে ব্যবহার করে নিজেদের লিঙ্গকে সুবিধা দেয়ার জন্যে, এবং নারী অভ্যাসবশত সায় দেয় তাদের অধীনতার প্রতি। তারা কখনো সুযোগ পায় নি, স্বাধীনতাও নয় শিক্ষাও নয়। তাই তাদের অতীতের কাজ দিয়ে তাদের বিচার করা যাবে না, তিনি যুক্তি দেন, এবং কিছুই নির্দেশ করে না যে তারা পুরুষের থেকে নিকৃষ্ট। তিনি নারীর জন্যে দাবি করেন প্রকৃত শিক্ষা।

এ-বিষয়েও দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলো আঠারো শতক। কিছু লেখক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন নারীদের আত্মা অমর নয়। রুশো নারীদের বলি দেন স্বামী ও মাতৃত্বের কাছে, এভাবে তিনি কথা বলেন মধ্যবিত্তের পক্ষে। ‘নারীর সমস্ত শিক্ষা হতে হবে পুরুষাপেক্ষী,’ তিনি বলেন; ‘… নারীকে তৈরি করা হয়েছিলো পুরুষের অধীন হওয়ার জন্যে এবং তার অবিচার সহ্য করার জন্যে’। আঠারো শতকের গণতান্ত্রিক ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ভাবাদর্শ অবশ্য ছিলোনারীর প্রতি অনুকূল; অধিকাংশ দার্শনিকের কাছেই মানুষ বলে মনে হতো নারীকে, যারা শক্তিশালী লিঙ্গের অন্তর্ভুক্তদের সমতুল্য। ভলতেয়ার নারীর ভাগ্যের অবিচারকে নিন্দা করেছেন। দিদরো মনে করতেন নারীর নিকৃষ্টতার বেশির ভাগই সমাজের তৈরি। হেলভেতিউ দেখান যে নারীর শিক্ষার উদ্ভটত্বই সৃষ্টি করে নারীর নিকৃষ্টতা। তবে মার্সিয়ে হচ্ছেন সেই একক পুরুষ, যিনি তাঁর তাবলো দ্য পারিতে ক্ষুব্ধ বোধ করেছেন শ্রমজীবী নারীর দুর্দশায় এবং নারীশ্রম সম্পর্কে তুলেছেন মৌলিক প্রশ্ন। নারীকে পুরুষের সমান শিক্ষা দেয়া হলে নারী হবে পুরুষের সমতুল্য, এটা বিবেচনা করে কঁদরসে চেয়েছেন নারীরা প্রবেশ করুক রাজনীতিতে। ‘আইন দ্বারা নারীকে যতো বেশি দাসত্বে বন্দী করা হয়েছে,’ তিনি বলেন, ‘ততো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তাদের সাম্রাজ্য…’

ফরাশি বিপ্লব থেকে : চাকুরি ও ভোট

প্রথম খণ্ড । ভাগ ২ – ইতিহাস । পরিচ্ছেদ ৫

এটা প্রত্যাশা করা খুবই স্বাভাবিক ছিলো যে বিপ্লব বদলে দেবে নারীর ভাগ্য। কিন্তু এটি তেমন কিছুই করে নি। মধ্যবিত্তের বিপ্লব শ্রদ্ধাশীল ছিলো মধ্যবিত্তের সংস্থাগুলো ও মূল্যবোধের প্রতি, এবং এটা সম্পন্ন হয়েছিলো প্রায়-পুরোপুরিই পুরুষদের দ্বারা। এ-সত্যটির ওপর জোর দেয়া দরকার যে প্রাচীনব্যবস্থা ভরে শ্রমজীবী শ্ৰেণীগুলোর নারীরাই স্ত্রীলিঙ্গদের মধ্যে উপভোগ করেছে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা। তারা ব্যবসা চালাতে পারতো এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সব আইনগত অধিকার তাদের ছিলো। তাদের বস্তুগত স্বাধীনতা তাদের অধিকার দিতে বিপুল স্বাধীন আচরণের : জনগণের নারী বাইরে যেতে পারতো, যেতে পারতো সরাইখানায়, পুরুষদের মতো ইচ্ছেমতো সম্ভোগ করতে পারতো নিজেদের দেহ;  তারা ছিলো স্বামীদের সহচর ও সমান। লৈঙ্গিক স্তরে নয়, তারা পীড়ন ভোগ করতো আর্থনীতিক স্তরে। পল্লীতে চাষীনারীরা খামারের কাজে বেশ বড়ো অংশ নিতো; তাদের গণ্য করা হতো ভৃত্য বলে; অনেক সময় তারা স্বামী ও পুত্রদের সাথে বসে খেতে পেতো না, যদিও খাটতো তাদের থেকে বেশি, এবং তাদের অবসাদের সঙ্গে যুক্ত হতো মাতৃত্বের বোঝা। তবে প্রাচীন কৃষিসমাজের মতোই পুরুষের কাছে তারা দরকারি ছিলো বলে মর্যাদা পেতো স্বামীর কাছে; ঘরে তাদের ছিলো প্রবল কর্তৃত্ব। তবে সাধারণ মানুষেরা বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয় নি এবং তার ফলও ভোগ করে নি।

মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারীদের কথা বলতে গেলে, তাদের কিছু প্রবল উৎসাহে কাজ করেছেন মুক্তির পক্ষে, যেমন মাদাম রোলা এবং লুসিল দেসমুলি। এঁদের মধ্যে একজন ঘটনাক্রমের ওপর ফেলেছিলেন গভীর প্রভাব, তিনি শার্লৎ কোর্দা, যখন তিনি আততায়িত করেন মারাৎকে। নারীদের কিছু বিক্ষোভও প্রদর্শিত হয়েছিলো, অলিম্প দ্য গজে ১৭৮৯-এ প্রস্তাব করেছিলেন ‘নারীর অধিকার ঘোষণা’, যেটি সমতুল্য ছিলো ‘মানবাধিকার ঘোষণা’র, যাতে তিনি পুরুষের সমস্ত সুযোগসুবিধা লোপের দাবি করেন; এবং অবিলম্বে শেষ হন বধ্যমঞ্চে। তখন নানা ক্ষীণায়ু সাময়িকী বেরোয়, এবং কিছু নারী চালান রাজনীতিক কর্মকাণ্ডের নিস্ফল প্রয়াস।

১৭৯০-এ উত্তরাধিকার লাভে বয়োজ্যষ্ঠ পুরুষের বিশেষ অধিকার লোপ পায়; এক্ষেত্রে ছেলেমেয়েরা সমান হয়ে ওঠে। ১৭৯২-এ গৃহীত হয় বিবাহবিচ্ছেদ আইন; এতে শিথিল হয় বৈবাহিক দাসত্ব। তবে এগুলো ছিলো তুচ্ছ বিজয়। মধ্যবিত্ত নারীরা পরিবারে এতো খাপ খেয়ে গিয়েছিলো যে তারা নিজেদের মধ্যে লিঙ্গ হিশেবে কোনো সংহতি বোধ করে নি; তারা অধিকারের দাবি আরোপ করার মতো কোনো স্বতন্ত্রজাত ছিলো না : আর্থনীতিকভাবে তারা যাপন করতে পরগাছার অস্তিত্ব। আর্থিক ক্ষমতা যখন আসে শ্রমিকদের হাতে, তখন শ্রমজীবী নারীদের পক্ষে সম্ভব হয় এমন সব অধিকার ও সুবিধা আদায় করে নেয়া, যা কখনো সম্ভব হয় নি ওই পরগাছা নারীদের, অভিজাত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, পক্ষে অর্জন করা।

বিপ্লবের সময় নারীরা পেয়েছিলো এক ধরনের নৈরাজ্যমূলক মুক্তি। কিন্তু সমাজ যখন আবার সংগঠিত হয়, নারী নতুনভাবে আবদ্ধ হয় কঠোর দাসত্ববন্ধনে। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ফ্রান্স এগিয়ে ছিলোঅন্যান্য দেশ থেকে; কিন্তু আধুনিক ফরাশি নারীর দুর্ভাগ্য এই যে তার মর্যাদা স্থির হয় এক সামরিক একনায়কত্বের কালে; নেপলিয়নি বিধি, তার ভাগ্যকে এক শতাব্দীর জন্যে বিধিবদ্ধ করে, তার মুক্তিকে বিপুলভাবে শ্লথ করে দেয়। সব সামরিক ব্যক্তির মতো নেপলিয়ন নারীর মধ্যে দেখতে পছন্দ করতে একটি মা; কিন্তু একটি বুর্জোয়া বিপ্লবের উত্তরাধিকারীরূপে সে এমন লোক ছিলো না যে বিপর্যস্ত করবে সমাজের সংস্থিতি, এবং মাকে দেবে স্ত্রীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব। সে পিতৃত্ব খোঁজা নিষিদ্ধ করে; অবিবাহিত মা ও অবৈধ সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেয় কঠোর শর্ত। তবে বিবাহিত নারী নিজে কোনো মর্যাদা পায় নি মা হিশেবে; সামন্ততান্ত্রিক অসঙ্গতিকে দেয়া হয় স্থায়িত্ব। বালিকা ও স্ত্রীকে বঞ্চিত করা হয় নাগরিক অধিকার থেকে, যার ফলে তার পক্ষে সম্ভব হয় না আইনব্যবসা ও অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করা। তবে কুমারী নারী, চির-আইবুড়ো, ভোগ করতো সমস্ত নাগরিক অধিকার, কিন্তু বিয়েতে বজায় থাকতো সে-পুরোনো পরনির্ভরতা। স্ত্রী বাধ্য থাকতো স্বামীর অনুগত থাকতে; ব্যভিচারের অপরাধে স্বামী তাকে একলা ঘরে বন্দী করে রাখতে পারতো এবং বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারতো; যদি ব্যভিচারের কাজের সময় স্বামী ধরতে পারতো স্ত্রীকে, খুন করতো স্ত্রীকে, আইনের চোখে সে ক্ষমার্হ হতো; আর স্বামী যদি বাড়িতে নিয়ে আসতো রক্ষিতা, তাহলে তার হতো সামান্য দণ্ড; এবং এ-ঘটনার জন্যেই শুধু স্ত্রী স্বামীর কাছে থেকে পেতে পারতো বিবাহবিচ্ছেদ। স্ত্রীর দেহ ও সম্পদ ছিলো কঠোর বৈবাহিক নিয়ন্ত্রণের অধীন।

উনিশ শতকে আইনশাস্ত্র চাপিয়ে দেয় ওই বিধির কঠোর প্রয়োগ। ১৮২৬-এ লুপ্ত হয় বিবাহবিচ্ছেদ, এবং ১৮৮৪-র আগে আর পুনপ্রবর্তিত হয় নি; তখনও এটা ছিলো কঠিন। ঘোষণা করা হয় যে নারী তৈরি হয়েছে পরিবারের জন্যে, রাজনীতির জন্যে নয়; গৃহস্থালির জন্যে, সামাজিক কাজের জন্যে নয়। অগাস্ত কোঁৎ ঘোষণা করেন বিশেষভাবে মানবপ্রজাতিতে, শারীরিক ও নৈতিকভাবে, নারী ও পুরুষের মধ্যে রয়েছে মৌল পার্থক্য, যা তাদের করে তুলেছে গভীরভাবে ভিন্ন। নারীত্ব ছিলো এক ধরনের ‘প্রলম্বিত শৈশব’, যা তাকে পৃথক করে তুলেছে ‘জাতির আদর্শরূপ থেকে’ এবং তার মনকে করেছে দুর্বল। তিনি গৃহের বাইরে নারীর শ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। নৈতিকতা ও প্রেমে নারীকে মনে করা যেতে পারে শ্রেষ্ঠতর; কিন্তু পুরুষ করতো কাজ, যখন নারী আর্থিক বা রাজনীতিক অধিকারহীন হয়ে থাকতো বাড়িতে।

বালজাক আরো নৈরাশ্যজনক ভাষায় প্রকাশ করেছেন একই বিশ্বাস। ফিজিয়লজি দি মারিয়াজ-এ তিনি লিখেছেন : ‘পুরুষের হৃদয়কে স্পন্দিত করাই নারীর নিয়তি ও একমাত্র গৌরব… সে এক অস্থাবর সম্পত্তি এবং ঠিকভাবে বললে সে পুরুষের পাশে এক গৌণ জিনিশ’। এখানে তিনি আঠারো শতকের অনুমোদন ও এ-সময়ের ভীতিকর প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে কথা বলছেন নারীবিরোধী মধ্যবিত্ত শ্ৰেণীটির পক্ষে। বালজাক দেখিয়েছেন প্রেমহীন বুর্জোয়া বিয়ে স্বাভাবিকভাবেই এগোয় ব্যভিচারের দিকে, এবং তিনি স্বামীদের পরামর্শ দিয়েছেন শক্তহাতে বল্গা ধরে রাখতে, স্ত্রীদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি না দিতে, তাদের যতোখানি সম্ভব অসুন্দর রাখতে। মধ্যবিত্ত শ্ৰেণীটি নারীদের রান্নাঘরে ও বাড়িতে বন্দী করে রেখে, তাদের আচরণের ওপর সতর্ক চোখ রেখে, তাদের পুরোপুরি নির্ভরশীল করে রেখে মেনে চলেছে এ-কর্মসূচি। ক্ষতিপূরণ হিশেবে তাদের দেয়া হতো সম্মান এবং তাদের সঙ্গে করা হতো চরম ভদ্র ব্যবহার। ‘বিবাহিতা নারী এক দাসী, যাকে বসিয়ে রাখতে হবে সিংহাসনে’, বলেছেন বালজাক। অধিকাংশ বুর্জোয়ানারী গ্রহণ করেছিলো এ-কারুকার্যমণ্ডিত বন্দীত্ব; আর অল্পসংখ্যক যারা প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের কথা শোনা হয় নি। বার্নার্ড শ বলেছেন মানুষকে শেকলমুক্ত করার থেকে শৃঙ্খলিত করা সহজ, যদি শেকল হয় লাভজনক। মধ্যবিত্ত নারী আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো তার শেকল, কেননা সে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো তার শ্ৰেণীর সুযোগসুবিধা। পুরুষের হাত থেকে মুক্ত হয়ে নিজের জীবিকার জন্যে কাজ করতে হতোতাকে; সে শ্রমজীবী নারীর সাথে কোনা সংহতি বোধ করে নি, এবং তার বিশ্বাস ছিলো বুর্জোয়া নারীর মুক্তির অর্থ হচ্ছে তার শ্রেণীর বিনাশ।

তবে ইতিহাসের অগ্রগতি এসব একগুঁয়ে প্রতিরোধে থেমে থাকে নি; যন্ত্রের আগমন ধ্বংস করে ভূসম্পত্তিশালীদের এবং নারীদের সাথে শ্রমজীবীদের মুক্তিকেও ত্বরান্বিত করে। সব ধরনের সমাজতন্ত্র, পরিবার থেকে নারীদের জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে, প্রশস্ত করে নারীর মুক্তি। প্লাতো স্বপ্ন দেখেছিলেন এক ধরনের সংঘব্যবস্থার এবং তাদের দিতে চেয়েছিলেন এমন স্বায়ত্তশাসন, যা উপভোগ করতো স্পার্টার নারীরা। সাৎ-সিমো, ফুরিয়ে, ও কাবের ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রের সাথে জন্ম নেয় ‘মুক্তনারী’র ইউটোপিয়া; বিলুপ্ত করা হয় শ্রমিক ও নারীর দাসত্ব, কেননা নারীরাও পুরুষের মতো মানুষ। দুর্ভাগ্যক্রমে এ-যৌক্তিক ভাবনা সাৎ-সিমোবাদী ধারায় প্রাধান্য লাভ করে নি। ফুরিয়ে, উদাহরণস্বরূপ, গোলমাল পাকিয়ে তোলেন নারীমুক্তি ও মাংসের পুনর্বাসনের মধ্যে, তিনি দাবি করেন যে প্রতিটি মানুষকে সাড়া দিতে হবে তার কামনার ডাকে এবং বিয়ের স্থান নেবে প্রেম; তিনি নারীকে মানুষ হিশেবে গণ্য করে দেখেছেন শুধু তার কামমূলক ভূমিকা। কাবে নারীপুরুষের সম্পূর্ণ সাম্যের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু তিনি নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে বাধা দেন। অন্যরা নারীমুক্তি না চেয়ে দাবি করেন নারীদের সুশিক্ষা। নারী যে এক পুনর্জীবনদাত্রী শক্তি, এ-ধারণা টিকে ছিলো উনিশ শতক ভরে এবং আবার দেখা দেয় ভিক্তর উগোতে। নারীপক্ষীয়দের অযোগ্যতার ফলে নারীর আন্দোলন হারিয়ে ফেলে তার সুনাম। বিভিন্ন সংঘ, সাময়িকী, প্রতিনিধিদল, ‘ব্লুমারবাদ’-এর মতো আন্দোলনগুলো–সবই হয়ে ওঠে হাস্যাস্পদ। তখনকার সবচেয়েমেধাবী নারী মাদাম দ্য স্তেল ও জর্জ সাঁ নিজেদের স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করে দূরে থাকেন এসব আন্দোলন থেকে। তবে উনিশ শতকের সংস্কার আন্দোলন সাধারণভাবে ছিলো নারীবাদের পক্ষে, কেননা এটা চেয়েছিলো সাম্যের মধ্যে সুবিচার। প্রধো ছিলো এক অসাধারণ ব্যতিক্রম। সে নারীদের নিকৃষ্টতা দেখাতে চেয়ে ভঙ্গ করে নারীবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে মৈত্রি, সতীনারীকে ঠেলে দেয় গৃহে, ও পুরুষনির্ভরতায়। সে বেছে নিতে বলে ‘গৃহিণীকে অথবা বেশ্যা’কে। তবে সব নারীবিরোধীর মতোই পুরুষের দাসী ও দর্পণ ‘প্রকৃত নারী’র প্রতি সে নিবেদন করে অতি আকুল প্রার্থনাগীতি। তবে এ-গভীর ভক্তি সত্ত্বেও সে ব্যর্থ হয়নিজের স্ত্রীকে সুখী করতে : মাদাম প্রধোর পত্রাবলি এক দীর্ঘ বিলাপ।

এসব তাত্ত্বিক বিতর্ক ঘটনাক্রমের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে নি : এগুলো বরং যা ঘটছিলো, এগুলো ছিলো তার দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিফলন। নারীরা পুনরুদ্ধার করে এমন এক আর্থিক গুরুত্ব, যা তারা হারিয়েফেলেছিলো প্রাগৈতিহাস কাল থেকে, কেননা তারা মুক্তি পায় চুলো থেকে এবং কারখানায় উৎপাদনের ক্ষেত্রে পায় একটি নতুন ভূমিকা। যন্ত্রই সম্ভব করে তোলে এ-অভ্যুত্থানকে, কেননা অনেকাংশেই লোপ পায়নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের শারীরিক বলের পার্থক্য। কলকারখানার দ্রুত বৃদ্ধির ফলে দরকার পড়ে অনেক বড়ো শ্রমশক্তি, যা শুধু পুরুষের পক্ষে যোগানো সম্ভব হয় নি, তাই দরকার হয়ে পড়ে নারীদের সহযোগিতা। এটাই ছিলো উনিশ শতকের মহাবিপ্লব, যা রূপান্তরিত করে দেয় নারীদের ভাগ্য, এবং তাদের জন্য সূচনা করে এক নতুন যুগের। মার্ক্স ও এঙ্গেলস পরিমাপ করেন এর সম্পূর্ণ বিস্তারটি, এবং তারা সর্বহারার মুক্তির মধ্যে দেখতে পান নারীর মুক্তি। আসলে, ‘নারীও শ্রমিকদের এখানেই মিল : তারা উভয়ই নির্যাতিত’, বলেছেন বেবেল। এবং প্রাযুক্তিক বিবর্তনের ফলে তাদের শ্ৰম যে-গুরুত্ব পাবে, তাতে উভয়েই নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে একই সাথে। এঙ্গেলস দেখিয়েছেন যে নারীর ভাগ্য শক্তভাবে বাঁধা ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তির সাথে; একটি বিপর্যয় মাতৃধারার স্থানে বসিয়েছিলো পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এবং নারীকে বেঁধে ফেলেছিলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তির দাসত্বে। তবে শিল্পবিপ্লব ছিলো ওই অধিকারহানির বিপ্রতীপমূর্তি এবং যা নিয়ে যায় নারীমুক্তির দিকে।

উনিশ শতকের শুরুতে নারীদের লজ্জাকরভাবে শোষণ করা হয়েছে পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায়। ঘরে নারীশ্রমকে ইংরেজেরা বলতো ‘ঘর্মায়ণ পদ্ধতি’; নিরন্তর শ্রম সত্ত্বেও নারীশ্রমিকেরা তাদের অভাব মেটানোর মতো আয় করতে পারতো না। জুলে সিমো তাঁর লইউভরিয়েতে এবং এমনকি রক্ষণশীল লিয়োয়-বয়লো ১৮৭৩-এ প্রকাশিত তাঁর ল্য ত্রাভেল দে ফেমে ও ১৯-এ, নিন্দা করেছেন এ-হীন পীড়নের; পরেরজন বলেছেন যে ফ্রান্সের দু-লক্ষেরও বেশি নারীশ্রমিক দিনে পঞ্চাশ সাঁতিমের থেকেও কম আয় করে। মালিকেরা অনেক সময় পুরুষদের থেকে বেশি পছন্দ করতো নারীদের। ‘তারা কম মজুরিতে বেশি কাজ করে’। এ-নিরাশাজনক সূত্র আলোকিত করে তোলে নারীশ্রমের নাটকটিকে। কেননা শ্রমের মধ্য দিয়েই মানুষ হিশেবে নারী জয় করেছে তার মর্যাদা; তবে এটা ছিলো একটা অতি কষ্টার্জিত ও প্রলম্বিত বিজয়।

সুতো কাটা ও কাপড় বোনার কাজ করতে হতো শোচনীয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। ব্লকু লিখেছেন, ‘লায়নে ফিতার কারখানায় নারীদের কাজ করতে হয় অনেকটা দোয়ালে ঝুলে থেকে, যখন তারা উভয় পা ও হাত দিয়ে কাজ করে’। ১৮৩১-এ রেশম শ্রমিকেরা গ্রীষ্মকালে কাজ করতো ভোর তিনটে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, শীতকালে কাজ করতে ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত, দৈনিক সতেরো ঘন্টা; ‘এমনকারখানায় যা অধিকাংশ সময়ই হতো অস্বাস্থ্যকর, যেখানে কখনো সূর্যালোক ঢুকতো না,’ বলেছেন নৰ্বার ত্রুকি।

তাছাড়া, পুরুষ শ্রমিকের বিশেষ সুবিধা আদায় করে নিতে তরুণী শ্রমিক মেয়েদের ওপর। অনেক সময় নারীরা কারখানায় কাজের সাথে খামারের কাজও করতো। তারা শোষিত হতো পীড়াদায়কভাবে। ডাস কাপিটাল-এর এক টীকায় মার্ক্স বর্ণনা করেছেন এটা : ‘উৎপাদনকারী, মিঃ ই., আমাকে জানিয়েছেন তিনি তার তাঁতকলে শুধু নারীদেরই নিয়োগ করেন, তিনি অগ্রাধিকার দেন বিবাহিত নারীদের, আবার তাদের মধ্যে সে-নারীদের, বাড়িতে যাদের ভরণপোষণের জন্যে আছে পরিবার, কেননা তারা অবিবাহিতদের থেকে বেশি মনোযোগী আর বশমানা; এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্যে তারা তাদের শক্তির শেষকণাটি ক্ষয় করে কাজ করে’। জি দারভিল লিখেছেন : ‘পোষাপ্রাণী বা ভারবাহী পশু : এই হচ্ছে আজকাল নারী। যখন সে কাজ করে না তখন তার প্রতিপালন করে পুরুষ আর সে এখনও প্রতিপালিত হয়পুরুষ দিয়ে যখন সে কাজ করতে করতে মারা যাচ্ছে’। তাদের এ অবস্থার আংশিক কারণ হচ্ছে নারীরা প্রথমে বুঝতে পানি কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয় এবং নিজেদের সংগঠিত করতে হয় সংঘে।

১৮৮৯-৯৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় যে ফ্রান্সে নারীশ্রমিকেরা দৈনিক মজুরি হিশেবে পেতে পুরুষের মজুরির অর্ধেক। ১৯০৮-এর এক অনুসন্ধান অনুসারে ঘণ্টাপ্রতি শ্রমিকদের সর্বোচ্চ মজুরি বিশ সাতিমের বেশি হতো না এবং কখনো কখনো কমে দাঁড়াতে পাঁচ সাতিম; তাই এভাবে শোষিত কোনো নারীর পক্ষে ভিক্ষা করা বা কোনো রক্ষক ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না। ১৯১৮তে আমেরিকায়একজন নারীশ্রমিক পেতো পুরুষ শ্রমিকের অর্ধেক মজুরি। এ-সময়ে জর্মন কয়লাখনিতে একজন নারীশ্রমিক সমপরিমাণ কয়লা খোঁড়ার জন্যে মজুরি পেতো একজন পুরুষ শ্রমিকের থেকে শতকরা পঁচিশ ভাগ কম। ১৯১১ থেকে ১৯৪৩-এর মধ্যে ফ্রান্সে নারীশ্রমিকদের মজুরি পুরুষ শ্রমিকদের থেকে অনেক বেশি দ্রুত বাড়ানো হয়, তারপরও তাদের মজুরি থাকে অনেক কম।

কম মজুরি নিতো বলে নারীশ্রমিকদের পছন্দ করতে নিয়োগদাতারা, আর এটাই জাগাতো পুরুষ শ্রমিকদের বিরোধিতা। বেবেল ও এঙ্গেলস যেমন দাবি করেছেন তেমন কোনো অব্যবহিত সংহতি ছিলো না সর্বহারার স্বার্থের সাথে নারীর স্বার্থের। একই সমস্যা দেখা দেয় যুক্তরাষ্ট্রে নিগ্রো শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। শোষণকারীরা সাধারণত অস্ত্র হিশেবে তাদের নিজেদের শ্রেণীরই বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সমাজের সবচেয়ে শোষিত সংখ্যালঘুদের; তাই তাদের শ্রেণীর কাছে প্রথমে সংখ্যালঘুদের মনে হয় শত্রু; কালো ও শাদাদের স্বার্থ, নারীশ্রমিক ও পুরুষ শ্রমিকদের স্বার্থ, পরস্পরের বিরোধী না হয়ে যে লাভ করতে পারে সংহতি, এর জন্যে দরকার পরিস্থিতিকে অনেক বেশি গভীরভাবে অনুধাবন করা। এটা সহজবোধ্য যে পুরুষ শ্রমিকেরা প্রথমে এই হ্রাসমূল্যে ছাড়া প্রতিযোগিতার মধ্যে দেখেছিলো এক প্রচণ্ড বিপদ, তাই তারা দেখিয়েছিলো এর বিরুদ্ধে শত্রুতা। শুধু যখন নারীরা শ্রমিক সংগঠনে সুসংহত হয়েছে, তখনই শুধু তারা রক্ষা করতে পেরেছে নিজেদের স্বার্থ এবং সমগ্র শ্রমিক শ্রেণীর জন্যে বিপজ্জনক হওয়া থেকে বিরত করতে পেরেছে নিজেদের।

নারীর এক মৌলিক সমস্যা হচ্ছে প্রজননগত ভূমিকার সাথে তার উৎপাদনশীল শ্রমের সামঞ্জস্যবিধান। ইতিহাসের সূচনা থেকে যে-মৌল সত্য গৃহকর্মে নিযুক্ত করে শেষ করে দিয়েছে নারীকে এবং তাকে বাধা দিয়েছে বিশ্বকে বদলে দেয়ার কাজে অংশ নিতে, সেটা হচ্ছে প্রজননগত ভূমিকার কাছে তার দাসত্ব। স্ত্রীপশুদের আছে একটা জৈবিক ও ঋতুগত স্পন্দ, যা তাদের রক্ষা করে শক্তি ক্ষয় থেকে; কিন্তু নারী, বয়ঃসন্ধি থেকে ঋতুবিরতি পর্যন্ত, কতোবার গর্ভবতী হবে তার কোনো সীমা ঠিক করে দেয় নি প্রকৃতি। কোনো কোনো সভ্যতা বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করে, এবং কথিত আছে যে কিছু ভারতি গোত্রে রীতি আছে দুটি প্রসবের মধ্যে অন্তত দু-বছরের জন্যে নারীদের বিশ্রাম দেয়ার; তবে সাধারণভাবে বহু শতাব্দী ধরে নারীর উর্বরতা থেকেছে অনিয়ন্ত্রিত। প্রাচীন কাল থেকেই অস্তিত্ব আছে জন্মনিরোধকের, যা সাধারণত গ্রহণ করে নারীরা : বিষোপচার, ভেষজ নিবেশ্য, যোনিপটি; তবে ওগুলো থেকে গেছে বেশ্যা ও চিকিৎসকদের গুপ্তকথা। সম্ভবত এসব গুপ্তকথা অবক্ষয়ের কালের রোমের নারীদের জানা ছিলো, যাদের বন্ধ্যাত্ব ছিলোব্যঙ্গলেখকদের আক্রমণের লক্ষ্য। তবে মধ্যযুগের ইউরোপে অজানা ছিলো জন্মনিরোধক; আঠারো শতক পর্যন্ত ওগুলোর একটি টুকরোও পাওয়া যায় নি। ওই সময়ে নারীর জীবন ছিলো অব্যাহত গর্ভের পর গর্ভ; এমনকি সহজ সতীত্বের নারীরাও তাদের অবাধ প্রেমের মূল্য শোধ করতো ঘনঘন গর্ভধারণ করে।

কোনো কোনো পর্বে মানুষ জনসংখ্যা কমানোর তীব্র প্রয়োজন বোধ করেছে; তবে একই সময়ে রাষ্ট্র ভয় পেয়েছে দুর্বল হয়ে যাওয়ার। সংকট ও দুর্যোগের সময় হয়তো জন্মহার কমিয়েছে দেরিতে বিয়েরমাধ্যমে, তবে সাধারণ নিয়ম থেকেছে অল্প বয়সে বিয়ে করা এবং নারীর পক্ষে যতো বেশি সন্তান উৎপাদন সম্ভব ততো সন্তান উৎপাদন; শিশুমৃত্যুই শুধু হ্রাস করতো জীবিত সন্তানের সংখ্যা। সতেরো শতকেই আবে দ্য পির প্রতিবাদ করেছিলেন নারীদের ‘প্রেমে পেটফোলা রোগ’-এ দণ্ডিত করার বিরুদ্ধে; এবং মাদাম দ্য সেভিএ তাঁর কন্যাকে উপদেশ দিয়েছিলেন ঘনঘন গর্ভবতী না হওয়ার। তবে আঠারো শতকে ফ্রান্সে বিকশিত হয় মালথাসীয়বাদ। প্রথমে উচ্চবিত্ত শ্রেণীগুলো, তারপর সাধারণ জনগণ পিতামাতার অবস্থানুসারে সন্তানের সংখ্যা কমানোকে যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করে, এবং শুরু হয় জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া। প্রথমে বহিরপাত রীতি ছড়িয়ে পড়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে, তারপর গ্রামবাসী ও শ্রমিকদের মধ্যে। ফ্রান্সে নিষিদ্ধ ছিলো জন্মনিয়ন্ত্রণমূলক প্রচারণা ও যোনিপটি ও এধরনের অন্যান্য জিনিশ বিক্রি; তবে বেশ ব্যাপকভাবেই চলতো ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’।

গর্ভপাত কোথাও আইনে সরকারিভাবে অনুমোদিত ছিলো না। রোমান আইন ভ্রূণজীবনের জন্যে কোনো বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নি; এ-আইন প্রসব্যকে মায়ের শরীরের অংশ বলেই গণ্য করতো, মানুষ হিশেবে নয়। অবক্ষয়ের কালে গর্ভপাত এক স্বাভাবিক প্রচল হয়ে উঠেছিলো। যদি স্বামীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গর্ভপাত ঘটাতো স্ত্রী, সে স্ত্রীকে শাস্তি দিতো, তবে ওটা তার অবাধ্যতার অপরাধের জন্যে। সমগ্র প্রাচ্যদেশীয় ও গ্রেকো-রোমান সভ্যতায় গর্ভপাত অনুমোদিত ছিলো।

খ্রিস্টধর্ম ভ্রূণকে একটি আত্মা দিয়ে নৈতিক বিপ্লব ঘটায়; এর পর থেকে গর্ভপাত হয়ে ওঠে ভ্রূণের বিরুদ্ধে অপরাধ। সেইন্ট অগাস্টিনের মতে, ‘যে-নারী তার পক্ষে যতোগুলো সন্তান জন্ম দেয়া সম্ভব ততোগুলো সন্তান জন্ম দেয় না, সে ততোগুলো হত্যাকাণ্ডের অপরাধে অপরাধী, ঠিক তেমনই অপরাধী সে-নারী, যে গর্ভধারণের পর আহত করে নিজেকে’। যাজকীয় আইন বিকশিত হয় ধীরেধীরে, তারা অন্তহীন আলোচনা করে এ-প্রশ্ন নিয়ে যে আসলে ঠিক কখন আত্মা প্রবেশ করে ভ্রূণের দেহে। সেইন্ট টমাস ও অন্যরা ঠিক করেন পুরুষের বেলা আত্মা ঢোকে চল্লিশ দিনের দিন আর মেয়ের বেলা ঢোকে আশি দিনের দিন। মধ্যযুগে গর্ভপাতের জন্যে নানা মাত্রার অপরাধ নির্দিষ্ট হয় গর্ভপাতের সময় ও কারণ অনুসারে : ‘যে-গরিব নারী প্রতিপালন করতে পারবে না বলে শিশু ধ্বংস করে এবং যার লাম্পট্যের অপরাধ লুকোনো ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই, তাদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে,’ প্রায়শ্চিত্ত পুস্তক বলেছে একথা। উনিশ শতকে গর্ভপাত হত্যাকাণ্ড এ-ধারণা লোপ পায়; একে গণ্য করা হয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ বলে। ক্যাথলিক গির্জা তাঁর কঠোরতা হ্রাস করে নি; ১৯১৭তে গির্জা গর্ভপাতে জড়িত সবাইকে ধর্ম থেকে বহিষ্কার করার বিধান দেয়। পোপ এই সম্প্রতিও ঘোষণা করেছেন যে মায়ের জীবন ও শিশুর জীবনের মধ্যে উৎসর্গ করতে হবে আগেরটিকে : অবশ্য মায়ের যেহেতু অপ্সুদীক্ষা হয়েছে, সে স্বর্গে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। কিন্তু মজার কথা যে নরক কখনো এসব হিশেব করে না। আর ভ্রূণ অনন্তকাল কাটাতে থাকবে লিম্বোতে। গর্ভপাত সরকারিভাবে স্বীকৃত হয়েছিলো শুধু অল্পকালের জন্যে : জর্মানিতে নাটশিবাদের আগে, এবং ১৯৩৬-এর আগে রাশিয়ায়। কিন্তু ধর্ম ও আইস সত্ত্বেও সব দেশেই এটা অধিকার করে আছে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

নারীর অবস্থার বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে হবে দুটি কারণের একযোগে কাজ হিশেবে : উৎপাদনশীল শ্রমে অংশগ্রহণ ও প্রজননের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ। এঙ্গেলস যেমন আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, রূপান্তরিত করে দিতে হবে নারীর সামাজিক ও রাজনীতিক মর্যাদা। নারীবাদী আন্দোলন, ফ্রান্সে যার রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন কদরসে, ইংল্যান্ডে মেরি ওলস্টোনক্র্যাফট তার ভিন্ডিকেশন অফ দি রাইটস অফ ওম্যান-এ, এবং উনিশ শতকের শুরুতে যা আবার শুরু করেছিলেন সাৎ-সিমোবাদীরা, তা কোনো সুস্পষ্ট ফল লাভ করতে ব্যর্থ হয়, কেননা তার অভাব ছিলো বাস্তব ভিত্তির। কিন্তু এখন, যখন নারীরা স্থান নিয়েছে কলকারখানায় এবং বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে, তখন তাদের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তির মাধ্যমেই নারী শক্তভাবে বাঁধা ছিলো স্বামীর সঙ্গে; বিষয়সম্পত্তি অতীতের ব্যাপার হয়ে ওঠায় স্বামী-স্ত্রী শুধুই স্থাপিত হয় পাশাপাশি; এমনকি সন্তানেরাও তাদের ততোটা শক্তভাবে বেঁধে রাখতে পারে না যেমন বেঁধে রাখতে সম্পত্তির স্বার্থ। এভাবে ব্যক্তি মুক্তি পায়দল থেকে।

এ-প্রক্রিয়াটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় আমেরিকায়, যেখানে জয়ী হয়েছে আধুনিক পুঁজিবাদ : বিবাহবিচ্ছেদ বাড়তে থাকে এবং স্বামীস্ত্রীরা সাময়িক সহচরের বেশি কিছু থাকে না। ফ্রান্সে এ-বিবর্তন শ্লথগতিতে ঘটতে বাধ্য হয়, কেননা এখানে পল্লীর জনগণ এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এবং নেপলিয়নি বিধি বিবাহিত নারীকে রেখেছে অন্যের কর্তৃত্বে। ১৮৮৪তে পুনপ্রবর্তিত হয় বিবাহবিচ্ছেদ; স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদ পেতে পারতোযদি স্বামী ব্যভিচার করতো। তবে দণ্ডশাস্ত্রে রক্ষিত হয় লিঙ্গভিন্নতা : ব্যভিচার ছিলো আইনত অপরাধ, যদি করে স্ত্রী। ১৯০৭-এ দেয়া হয় ন্যাসরক্ষকের কিছুটা ক্ষমতা, যা পুরোপুরি দেয়া হয় ১৯১৭তে। ১৯১২তে অনুমোদিত হয় স্বাভাবিক পিতৃত্ব নির্ণয়ের অধিকার। ১৯৩৮ ও ১৯৪২-এ সংশোধিত হয় বিবাহিত স্ত্রীর মর্যাদা : আনুগত্যের কর্তব্য বাতিল করা হয়, যদিও পিতাই থাকে পরিবারের প্রধান। সে-ই ঠিক করে। বাসস্থান, যদি যথেষ্ট কারণ থাকে তাহলে স্ত্রী তার পছন্দের বিরোধিতা করতে পারে। তার আইনগত ক্ষমতা বাড়ানো হয়; কিন্তু এ-গোলমেলে বিবৃতিতে : ‘বিবাহিত স্ত্রীর সমস্ত আইনগত ক্ষমতা রয়েছে। শুধু বিয়ের চুক্তি ও আইনানুসারেই এসব ক্ষমতা খর্ব করা সম্ভব,’ এ-ধারার শেষাংশ প্রথমাংশের বিরোধী। স্বামীস্ত্রীর সাম্য তখনও অর্জিত হয় নি।

বলতে পারি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতিক অধিকার সহজে অর্জিত হয় নি। ১৮৬৭ অব্দে জন স্টুয়ার্ট মিল ইংরেজি সংসদে নারীদের ভোটাধিকারের পক্ষে প্রথম বক্তৃতা করেন, এটাই নারীরভোটাধিকারের পক্ষে প্রথম সরকারিভাবে প্রদত্ত বক্তৃতা। তাঁর লেখায় তিনি পরিবারে ও সমাজেষীপুরুষের সাম্যের জন্যে প্রবলভাবে দাবি জানান। ‘আমি নিশ্চিত যে-সামাজিক ব্যবস্থা আইনের দ্বারা এক লিঙ্গকে অধীন করে আরেক লিঙ্গের, সেটা সহজাতভাবেই খারাপ এবং সেটা মানুষের প্রগতির বিরুদ্ধে একটা বড়ো বাধা; আমি নিশ্চিত ওগুলো স্থান ছেড়ে দেবে বিশুদ্ধ সাম্যের জন্যে’। তাঁর অনুসরণে মিসেম ফসেটের নেতৃত্বে ইংরেজ নারীরা নিজেদের রাজনীতিকভাবে সংগঠিত করে, ফরাশি নারীরা জড়ো হয় মারিয়া দারাইসেঁর পেছনে, যিনি ১৮৬৮ থেকে ১৮৭১ র মধ্যে একরাশ সম্মেলনে আলোচনা করেন নারীর অবস্থা। লিয়ো রিশিয়ে, যিনি ছিলেন নারীবাদের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা, ১৮৬৯-এ প্রকাশ করেন ‘নারীর অধিকার’, এবং ১৮৭৮-এ এ-সম্পর্কে আয়োজন করেন আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলনের। তখনও নারীদের ভোটাধিকারের প্রশ্নটি তোলা হয় নি, নারীরা নাগরিক অধিকার দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে নিজেদের। তিরিশ বছর ধরে ফ্রান্সে ও ইংল্যান্ডে এ-আন্দোলন থেকেছে খুবই ভীরু। স্থাপিত হয়েছে অসংখ্য সংঘ, কিন্তু অর্জন হয়েছে সামান্যই, কেননা লিঙ্গ হিশেবে নারীদের ছিলো সংহতির অভাব।

ভোটাধিকার পেতে ফরাশি নারীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৪৫ পর্যন্ত।

নিউজিল্যান্ড নারীদের পূর্ণ অধিকার দেয় ১৮৯৩-এ; অস্ট্রেলিয়া ১৯০৮-এ। ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় ভোটাধিকার লাভ ছিলো খুবই কঠিন। ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ড নারীদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলো গৃহের ভেতরে; জেন অস্টিন লেখার জন্যে গোপনে লুকিয়ে রেখেছিলেন নিজেকে; বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেছিলেন নারীরা ‘এক উপপ্রজাতি, যাদের কাজ হচ্ছে প্রসব করা’। সেখানে ১৯০৩ পর্যন্ত নারীবাদ ছিলো ভীরু, যখন প্যাংখারস্ট পরিবার লন্ডনে স্থাপন করে নারীদের সামাজিক ও রাজনীতিক সংঘ, এবং নারীবাদী আন্দোলন ধরে এক অনন্য ও উগ্র রূপ। ইতিহাসে এই প্রথম নারীদের দেখা যায় নারী হিশেবে কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করতে। ১৯১২তে গৃহীত হয় আরো হিংস্র কৌশল : তারা বাড়িতে আগুন লাগায়, চিত্রকলা নষ্ট করে, পায়ে পিষে লণ্ডভণ্ড করে ফুলের কেয়ারি, পুলিশের দিকে পাথর ছোড়ে, বারবার প্রতিনিধিদল পাঠিয়েঅ্যাসকুইথ ও স্যার অ্যাডওয়ার্ড গ্রেকে ঘিরে ফেলে, জনসভার বক্তৃতায় ব্যাঘাত ঘটায়। মাঝখানে ঘটে মহাযুদ্ধ। ১৯১৮ অব্দে ইংরেজ নারীরা পায় নিয়ন্ত্রিত ভোটাধিকার, এবং ১৯২৮এ অনিয়ন্ত্রিত ভোটাধিকার। তাদের সাফল্য অনেকাংশে সম্ভব হয়েছিলো যুদ্ধের সময় দায়িত্ব পালনের ফলে।

শুরু থেকেই আমেরিকার নারীরা অনেক বেশি মুক্ত ছিলো ইউরোপীয় বোনদের থেকে। উনিশ শতকের শুরুতে পুরুষদের সঙ্গে নারীদের করতে হয়েছিলো নতুন দেশে বসতি স্থাপনের কঠোর কাজ; পুরুষের পাশে থেকে তারা লড়াই করেছে; পুরুষের থেকে সংখ্যায় তারা ছিলো অনেক কম, এবং এটা তাদের খুব মূল্যবান করে তুলেছিলো। তবে ক্রমশ তাদের অবস্থা হয়ে ওঠে তাদের পুরোনো বিশ্বের নারীদের মতোই; তাদের খুব ভক্তি করা হতো এবং তারা পরিবারে ছিলো কর্তৃত্বশীল, তবে সামাজিক কর্তৃত্ব পুরোপুরিই ছিলো পুরুষের হাতে। ১৮৩০ এর দিকে কিছু নারী রাজনীতিক অধিকার দাবি করতে থাকে; এবং তারা প্রচারাভিযান চালাতে থাকে নিগ্রোদের পক্ষে। কুয়েকারনেত্রী লুক্রেশিয়া মোট স্থাপন করেন আমেরিকান নারীমুক্তি সংঘ, এবং ১৮৪০-এর এক সম্মেলনে ঘোষণা করেন কুয়েকার-অনুপ্রাণিত এক ইশতেহার, যা ঠিক করে দেয় আমেরিকার সব নারীমুক্তি আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। ‘পুরুষ ও নারীকে সমানভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, স্রষ্টা তাদের ভূষিত করেছে কতিপয় হস্তান্তরঅযোগ্য অধিকারে.. সরকার স্থাপিত হয়েছে শুধু এসব অধিকার রক্ষা করার জন্যে… পুরুষ বিবাহিত নারীকে এক নাগরিক শবে পরিণত করেছে… সে জোর করে নিজে অধিকার করেছে জিহোভার সমস্ত অধিকার, দাবি করেছে যে নারীর জন্যে এক পৃথক এলাকা বরাদ্দ করা তার অধিকার’। তিন বছর পরে হ্যারিয়েট বিশার স্টো লেখেন আংকেল টমস কেবিন, যা নিগ্রোদের পক্ষে গড়ে তোলে জনমত। এমার্সন ও লিংকন নারীমুক্তি আন্দোলন সমর্থন করেন। গৃহযুদ্ধের পর নারীবাদীরা নিষ্ফলভাবে দাবি করেন যে-সংশোধনী নিগ্রোদের ভোটাধিকার দিয়েছে সেটা যেনো নারীদেরও ভোটাধিকার দেয়; দ্ব্যর্থকতার সুযোগ নিয়ে সুজ্যান বি অ্যান্থনি ও তার চোদ্দোজন সঙ্গী রস্টারে ভোট দেন; তাঁকে একশো ডলার দণ্ডিত করা হয়। ১৮৬৯-এ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নারী ভোটাধিকারের জন্যে জাতীয় সংঘ; এবং একই বছরে ওইমিংগে নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হয়। ১৮৯৩-এ ভোটাধিকার দেয়া হয়কোলোরাডোতে, তারপর ১৮৯৬-এ আইডাহো ও ইউটাতে।

তারপর অগ্রগতি ঘটে খুব ধীরে; তবে আর্থিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা ইউরোপের নারীদের থেকে অনেক বেশি সাফল্য লাভ করে। ১৯২০-এ নারীর ভোটাধিকার দেশের আইনে পরিণত হয়।

লাতিন দেশগুলো, প্রাচ্যদেশগুলোর মতো, আইন দিয়ে যতোটা অধীনে রাখে। নারীদের তারচেয়ে বেশি রাখে প্রথার কঠোরতা দিয়ে। ইতালিতে ফ্যাশিবাদ যথারীতি বাধা দিয়েছে নারীবাদের অগ্রগতিতে। গির্জার সাথে মৈত্রি চেয়ে, পরিবারকে যেমন ছিলো তেমন রেখে, নারীদাসত্বের ধারা বজায় রেখে ফ্যাশিবাদী ইতালি নারীকে বন্দী করে দ্বিগুণ দাসত্বে : শাসক কর্তৃপক্ষের কাছে এবং তার স্বামীর কাছে। জর্মনিতে ঘটনাক্রম ছিলো খুবই ভিন্ন। হিপেল নামক এক ছাত্র ১৭৯০-এ জোরে ছুঁড়ে দিয়েছিলো প্রথম নারীবাদী ইশতেহার, এবং উনিশ শতকের শুরুতে বিকশিত হতে থাকে এক ধরনের ভাবালুতাপূর্ণ নারীবাদ, যা স্বভাবে ছিলো জর্জ সার নারীবাদের সগোত্র। ১৮৪৮-এ প্রথম জন নারীবাদী নারী লুইজা ওটো জাতীয়বাদের চরিত্র সংস্কারে নারীর অংশগ্রহণের অধিকার দাবি করেন এবং ১৮৬৫তে স্থাপন করেন নারীসংঘ। জর্মন সমাজতন্ত্রবাদীরা অনুকূলে ছিলো নারীবাদের, এবং ১৮৯২-এ দলের নেতাদের মধ্যে ছিলেন ক্লারা জেটকিন। নারীরা ১৯১৪তে যুদ্ধে অংশ নেয়; এবং জর্মনির পরাজয়ের পর নারীরা পায় ভোটাধিকার এবং সক্রিয়হয় রাজনীতিতে। রোজা লুক্সেমবার্গ স্পার্টাকাস সংঘে লড়াই করেন এবং আততায়িত হন ১৯১৯-এ। অধিকাংশ জর্মন নারী সমর্থন করে শৃঙ্খলার দলকে; অনেকে রাইসস্টাগেও আসন গ্রহণ করেন। এ-মুক্তনারীদের ওপর হিটলার নতুনভাবে চাপিয়ে দেয় নেপলিয়নি আদর্শ : কাইস, কির্স, কিন্টার–রান্নাঘর, গির্জা, শিশু। এবং সে ঘোষণা করে যে ‘নারীর উপস্থিতি রাইসস্টাগকে অপমানিত করবে’। নাটশিবাদ ছিলো ক্যাথলিকবিরোধী ও বুর্জোয়াবিরোধী, তাই এটা মাতৃত্বকে দেয় এক সুবিধাপ্রাপ্ত স্থান, অবিবাহিত মাদের ও অবৈধ সন্তানদের বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে এটা নারীকে বিয়ের বন্ধন থেকে অনেকটা বের করে আনে। স্পার্টায় যেমন, এখানে নারী কোনো বিশেষ পুরুষের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নির্ভরশীল ছিলো রাষ্ট্রের ওপর; এটা তাকে পুঁজিবাদী সমাজের মধ্যবিত্ত নারীর থেকে বেশি স্বাধীনতা দিয়েছিলো।

সোভিয়েত রাশিয়ায় নারীবাদী আন্দোলন লাভ করেছে ব্যাপকতম অগ্রগতি। উনিশ শতকের শেষভাগে এটা দেখা দেয় শিক্ষার্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে, এমনকি তখনই তারা জড়িত ছিলো হিংস্র বিপ্লবাত্মক কর্মকাণ্ডের সাথে। রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় অনেক কাজে নারীরা দখল করে পুরুষের স্থান এবং সাম্যের জন্যে সংঘবদ্ধ দাবি জানায়। ১৯০৫-এর পর তারা অংশ নেয় রাজনীতিক ধর্মঘটে, সৃষ্টি করে অবরোধ; এবং বিপ্লবের কিছু দিন আগে ১৯১৭তে তারা পিটার্সবার্গে প্রদর্শন করে এক গণবিক্ষোভ, দাবি করে রুটি, শান্তি, ও তাদের পুরুষদের প্রত্যাবর্তন। অক্টোবর অভ্যুত্থানে এবং পরে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, তারা পালন করে এক বড় ভূমিকা। মার্ক্সীয় ধারার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে লেনিন শ্রমিকের মুক্তির সাথে যুক্ত করেন নারীর মুক্তিকে; তিনি তাদের দেন রাজনীতিক ও আর্থনীতিক সাম্য।

নারীর মর্যাদা বিষয়ক জাতিসংঘ কমিশন সম্প্রতি এক বৈঠকে সব দেশে দু-লিঙ্গের সাম্যকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছে, এবং এটি এ-আইনি ধারাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্যে গ্রহণ করেছে কয়েকটি প্রস্তাব। তাই মনে হতে পারে যে খেলায় জিৎ হয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ আরো গভীর গভীরতরভাবে নারীদের অঙ্গীভূত করবে আমাদের একদা পুংলৈঙ্গিক সমাজে।

এ-ইতিহাসের দিকে সাধারণভাবে তাকালে আমরা দেখতে পাই এর থেকে বেরিয়ে আসছে কয়েকটি সিদ্ধান্ত। সবার আগে আছে এটি : নারীর সম্পূর্ণ ইতিহাস পুরুষের তৈরি। ঠিক যেমন আমেরিকায়কোনো নিগ্রো সমস্যা নেই, বরং আছে এক শাদা সমস্যা; ঠিক যেমন ‘ইহুদিবিদ্বেষ ইহুদির সমস্যা নয়; এটা আমাদের সমস্যা’; ঠিক তেমনি নারী সমস্যা সব সময়ই ছিলো একটি পুরুষের সমস্যা। আমরা দেখেছি শুরু থেকেই কেননা পুরুষের শারীরিক শক্তির সাথে ছিলো নৈতিক শক্তি; তারা সৃষ্টি করেছে মূল্যবোধ, লোকাচার, ধর্ম; ওই সাম্রাজ্য নিয়ে নারী কখনো পুরুষের সাথে বিবাদ করে নি। কয়েকজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি–সাফো, ক্রিস্তিন দ্য পিসা, মেরি ওলস্টোনক্রাফট, অলিপ দ্য গজে–তাদের নিয়তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, এবং কখনো কখনো গণবিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে; তবে রোমান মাতৃরা সফল হয় নি ওপ্পিয়ান আইনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়ে, অ্যাংলো-স্যাক্সন ভোটাধিকার দাবিকারীরাও চাপ দিয়ে সফল হয় নি, যতোদিন না পুরুষকে বাধ্য করা হয়েছে নতি স্বীকারে। পুরুষ সব সময়ই নিজ হাতে ধরে রেখেছে নারীর ভাগ্য; এবং এটা কী হওয়া উচিত তা ঠিক করেছে পুরুষ, তবে তা নারীর স্বার্থে করে নি, করেছে নিজেদের পরিকল্পনা, ভীতি, ও প্রয়োজন অনুসারে। যখন তারা দেবী মহামাতাকে ভক্তি করেছে, তারা তা করেছে প্রকৃতিকে ভয় করেছে বলে; যখন ব্রোঞ্জের হাতিয়ার আবিষ্কারের ফলে তারা দৃপ্তভাবে প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়ায়, তারা প্রতিষ্ঠা করে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা; তারপর পরিবার ও রাষ্ট্রের বিরোধ স্থির করে দেয়নারীর মর্যাদা; খ্রিস্টানের ঈশ্বর, বিশ্ব, ও নিজ দেহের প্রতি তার মনোভাব প্রতিফলিত হয় নারীর পরিস্থিতিতে, যা সে নির্ধারিত করে নারীর জন্যে; মধ্যযুগে যাকে বলা হতো ‘নারী নিয়ে ঝগড়া’, সেটা ছিলোযাজকশ্রেণী ও সাধারণ পুরুষের মধ্যে বিবাহ ও কৌমার্য নিয়ে ঝগড়া : সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানা অনুসারে যে-সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তা বিবাহিত নারীর জন্যে নিয়োগ করে অভিভাবক, এবং আজ পুরুষের অর্জিত প্রযুক্তিগত বিবর্তন মুক্ত করেছে নারীকে। পুরুষের নীতিবোধের রূপান্তরের ফলেই জন্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিবারের আকার কমানো সম্ভব হয়েছে, এবং নারী আংশিক মুক্ত হয়েছে মাতৃত্বের দাসত্ব থেকে। নারীবাদ কখনই কোনো স্বায়ত্তশাসিত আন্দোলন ছিলো না : অংশত এটা ছিলো রাজনীতিবিদদের হাতের এক হাতিয়ার, অংশত ছিলো একটি অন্তপ্রপঞ্চ, যা প্রতিফলিত করে গভীর সামাজিক নাটককে। নারী কখনো কোনো পৃথক জাত সৃষ্টি করে নি, সত্য কথা বলতে কী লিঙ্গ অনুসারে তারা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের কথাও ভাবে নি। অধিকাংশ নারী কোনো কর্মোদ্যোগ গ্রহণের বদলে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছে নিজেদের; আরা যারা এটা বদলে দিতে চেয়েছেন, তাঁরা নিজেদের বিশেষ অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে বন্দী থেকে একে জয়ী করতে চান নি, বরং এর থেকে ওপরে উঠতে চেয়েছেন। যখন তারা বিশ্বের কর্মকাণ্ডে ঢুকেছেন, তারা তা করেছেন পুরুষের সাথে খাপ খাইয়ে, পুরুষের প্রেক্ষাপটে।

যে-শ্ৰেণীগুলোর মধ্যে নারী কিছুটা আর্থিক স্বাধীনতা ভোগ করেছে এবং অংশ নিয়েছে উৎপাদনে, সেগুলো ছিলো শোষিত শ্রেণী, এবং নারীশ্রমিক বেশি দাসত্বে বন্দী হয়েছিলো পুরুষ শ্রমিকদের থেকে। শাসক শ্রেণীগুলোর মধ্যে নারী ছিলো পরগাছা এবং এজন্যে অধীনে ছিলো পুরুষের বিধিবিধানের। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর পক্ষে কোনো কর্মোদ্যোগ গ্রহণ ছিলো বাস্তবিকভাবে অসম্ভব। আইন আর লোকাচার অনেক সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো না, এবং এ-দুয়ের মধ্যে এমনভাবে স্থাপিত হতো ভারসাম্য যে নারী কখনোই বস্তুগতভাবে মুক্ত থাকতো না। প্রাচীন রোমান প্রজাতন্ত্রে আর্থিক অবস্থা মাতৃদের দিয়েছিলো বস্তুগত ক্ষমতা, কিন্তু তাদের কোনো আইনগত স্বাধীনতা ছিলো না। কৃষিসভ্যতায় ও নিম্ন ব্যবসায়ী মধ্যবিত্ত শ্রেণীতেও নারীর অবস্থা ছিলো অনেক সময় একই রকম : গৃহিণী, গৃহের দাসী, কিন্তু সামাজিকভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক।বিপরীতভাবে, সামাজিক বিপর্যয়ের পর্বগুলোতে নারী পেয়েছে মুক্তি, কিন্তু পুরুষের অনুগত দাসী না হওয়ায় সে হারিয়েছে তার ফিফ; সে পেয়েছে শুধু এক নেতিবাচক স্বাধীনতা, যা প্রকাশ পেয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষতিকর আমোদপ্রমোদে। একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে সমাজে বিবাহিত নারীর একটি স্থান ছিলো, কিন্তু তার কোনো অধিকার ছিলো না; কিন্তু অবিবাহিত নারীর, সতী হোক বা বেশ্যা হোক, ছিলোপুরুষের মতো সব আইনগত অধিকার, তবে এ-শতাব্দী পর্যন্ত তারা ছিলো সামাজিক জীবন থেকে বর্জিত।

আইনগত অধিকার ও সামাজিক প্রথার এ-বিরোধ থেকে, আরো অনেক কিছুর সাথে, দেখা দিয়েছে এ-অসঙ্গতিটি : অবাধ যৌনপ্রেম আইনে নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু ব্যভিচার অপরাধ; কিন্তু যে-তরুণী ‘ভুল পথ’-এ গেছে,তাকে অনেক সময়ই নিন্দিত করা হয়, কিন্তু স্ত্রীর অসদাচরণকে দেয়া হয় প্রশ্রয়; এবং এজন্যে সতেরো শতক থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত অনেক তরুণী বিইয়ে করেছে শুধু অবাধে প্রেমিক নেয়ার জন্যে। যে-সব নারী পুরুষের সমতুল্য সাফল্য অর্জন করেছেন, তাঁরা উন্নীত হয়েছেন সব ধরনের লৈঙ্গিক বৈষম্যের উর্ধে অবস্থিত সামাজিক সংস্থাগুলোর শক্তি দিয়ে। রাণী ইসাবেলা, রাণী এলিজাবেথ, মহান ক্যাথেরিন পুরুষও ছিলেন না নারীও ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন সার্বভৌম শাসক। ধর্মও ঘটায় একই ধরনের রূপান্তর : সিয়েনার ক্যাথেরিন, সেইন্ট তেরেসা তাঁদের শারীরবৃত্তিক বিবেচনা পেরিয়ে ছিলেন সন্ত আত্মা।

বোঝা যায় অন্য নারীরা যে বিশ্বে গভীর ছাপ ফেলতে পারে না, তার কারণ তারা তাদের পরিস্থিতির সাথে শক্তভাবে বাঁধা। তারা নঞর্থক ও পরোক্ষভাবে ছাড়া কোনো কিছুতেই হাত দিতে পরে না। জুডিথ, শার্লট কর্দি, ফেরা জাসুলিস ছিলেন আততায়ী; ফ্রদোসরা ছিলেন ষড়যন্ত্রকারী; বিপ্লবের সময়, কমিউনের কালে নারীরা পুরুষের সাথে লড়াই করেছে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অধিকারহীন, ক্ষমতাহীন মুক্তির বিরুদ্ধে প্রত্যাখ্যানে ও বিপ্লবে অংশ নিতে দেয়া হয়েছে নারীদের, কিন্তু নিষিদ্ধ করা হয়েছে সদর্থক গঠনমূলক কাজে; বেশি হলে পরোক্ষ পথে তারা পুরুষের কাজে অংশ নিয়ে সফল হতে পেরেছে। আম্পাসিয়া, মাদাম দ্য মতেনো, রাজকন্যা দেস উরসি ছিলেন উপদেষ্টা, যাদের কথা গুরুত্বের সাথে শোনা হতো। তবে যদি এমন কেউ থাকতো, যে তাদের কথা শুনতে চাইতো। নারীরা যুদ্ধ বাধানোর উশকানি দিতে পেরেছে, যুদ্ধের কৌশল প্রস্তাব করতে পারে নি; তারা তখনই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে রাজনীতি যখন রাজনীতি নেমে গেছে যড়যন্ত্রের স্তরে; বিশ্বের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কখনোই নারীর হাতে আসে নি; তারা কৌশল বা অর্থব্যবস্থার ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে নি, তারা রাষ্ট্র ভাঙে নি গড়ে নি, তারা নতুন বিশ্ব আবিষ্কার করে নি। তাদের মধ্য দিয়ে ঘটেছে কিছু ঘটনার সূত্রপাত, তবে তাতে নারীরা ছিলো অজুহাত, সংঘটক নয়। লুক্ৰেতিয়ার আত্মহত্যার ছিলো শুধু প্রতীকী মূল্য। শহিদত্ব খোলা শোষিতের জন্যে; খ্রিস্টানদের পীড়নের কালে, সামাজিক বা জাতীয় পরাজয়ের প্রভাতে, নারীরা সাক্ষ্য দেয়ার এ-কাজটি করেছে; কিন্তু কখনোই কোনো শহিদ বিশ্বের মুখমণ্ডল বদলে দেয় নি। এমনকি নারী যখন কিছু শুরু করেছে এবং প্রদর্শন করেছে বিক্ষোভ, এসব কার্যক্রম তখনই গুরুত্ব লাভ করেছে যখন কোনো পুরুষের সিদ্ধান্ত তা সম্প্রসারিত করেছে। হ্যারিয়েট বিশার স্টোকে ঘিরে সমবেত নারীরা দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সৃষ্টি করেছে তীব্র জনমত; তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধের সত্যিকার কারণগুলো ভাবালুতাধর্মী ছিলো না। ১৯১৭ অব্দের ৮ মার্চের ‘নারীদিবস’ হয়তো রুশবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে ওটা ছিলো একটি সংকেত মাত্র।

অধিকাংশ নারী বীরাঙ্গনারাই অস্বাভাবিক : সাহসিকারা ও আদিতমারা যতোটা উল্লেখযোগ্য তাদের কাজের গুরুত্বের জন্যে, তার চেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য তাদের নিয়তির অনন্যতার জন্যে। তাই আমরা যদি জোয়ান অফ আর্ক, মাদাম রোলা, ফ্লোরা লিস্তানকে তুলনা করি রিশলো, দাঁতো, লেনিনের সাথে, দেখতে পাই যে তাঁদের মহত্ত্ব প্রধানত আত্মগত : তারা ঐতিহাসিক সংঘটক নন, তার দৃষ্টান্তমূলক মানবমূর্তি। মহাপুরুষ উঠে আসেন জনগণ থেকে এবং পরিস্থিতি তাকে চালিয়ে নেয় সামনের দিকে; নারী জনমণ্ডলি থাকে ইতিহাসের প্রান্তদেশে এবং পরিস্থিতি প্রতিটি নারীর জন্যে প্রতিবন্ধক, স্প্রিংবোর্ড নয়। বিশ্বের মুখমণ্ডল বদলানোর জন্যে প্রথম দরকার সেখানে দৃঢ়ভাবে নোঙর পাতা; কিন্তু যে-নারীদের শেকড় সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত, তারা সমাজের অধীনস্থ; কোনো ঐশী শক্তি দিয়ে কর্মে প্রবর্তিত না হলে সেখানেই তারা নিজেদের দেখাতে পেরেছেন পুরুষের সমান বলে–উচ্চাভিলাষী নারী ও বীরাঙ্গনা হয়ে ওঠে অদ্ভুত দানব। যখন থেকে নারীরা পৃথিবীতে স্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছে, তখন থেকেই শুধু আমরা দেখত পাচ্ছি রোজা লুক্সেমবার্গ, মাদাম কুরির মতো নারীর আবির্ভাব। তাঁরা দীপ্তভাবে দেখিয়েছেন যে নারীর নিকৃষ্টতা নারীকে ঐতিহাসিকভাবে তুচ্ছ করে তোলে নি বরং তাদের ঐতিহাসিক তুচ্ছতাই তাদের করেছে নিকৃষ্ট।

এ-সত্যটি উজ্জ্বলভাবে স্পষ্ট সে-এলাকায়, যেখানে নারী সবচেয়ে সফল হয়েছে নিজেদের দৃঢ়ভাবে জ্ঞাপন করতে–অর্থাৎ, সংস্কৃতির এলাকায়। তাদের ভাগ্য গভীরভাবে জড়িয়ে আছে সাহিত্য ও শিল্পকলার ভাগ্যের সাথে; প্রাচীন জর্মনদের মধ্যে দৈবজ্ঞা ও যাজিকার ভূমিকা ছিলো একান্তভাবে নারীর যোগ্য কাজ। ইতালীয় রেনেসাঁসের কালে বিকশিত হয়েছিলো যে-প্রণয়মূলক অতীন্দ্রিয়তাবাদ, মানবতাবাদী ঔৎসুক্য, সৌন্দর্যম্পৃহা, সতেরো শতকের পরিমার্জিতি, আঠারো শতকের প্রগতিশীল আদর্শবাদ–সবগুলোই বিভিন্ন রূপে নারীত্বকে করেছে পরমায়িত। এভাবে নারী হয়ে ওঠে কবিতার ধ্রুবতারা, শিল্পকলার বিষয়বস্তু; অবসর তাকে সুযোগ দেয় চেতনার আনন্দের কাছে আত্মোৎসর্গ করতে; লেখকের প্রেরণা, সমালোচক, ও পাঠকগোষ্ঠি, সে হয়ে ওঠে তার প্রতিপক্ষ; নারীই মাঝেমাঝে সংবেদনশীলতার কোনো একটি রীতিকে প্রধান করে তোলে, তৈরি করে এমন নীতি, যা তৃপ্ত করে পুরুষচিত্তকে, এবং এভাবে সে হস্তক্ষেপ করে নিজের নিয়তির ওপর নারীর শিক্ষা ছিলো বৃহদংশে নারীর এক বিজয়। তবে বুদ্ধিজীবী নারীদের যৌথ ভূমিকা যতোই গুরুত্বপূর্ণ হোক-না-কেনো, তাদের ব্যক্তিগত অবদান সাধারণভাবে হয়েছে কম মূল্যবান। যে কিছু সৃষ্টি করতে চায় নতুনভাবে, তার জন্যে বিশ্বের প্রান্তদেশে বাস করাটা অনুকূল অবস্থান নয়: এখানে আবার, বিদ্যমান অবস্থা থেকে উঠে আসার জন্যে, প্রথম দরকার অবস্থার মাঝে গভীরভাবে মূল প্রোথিত করা। যাদের সম্মিলিতভাবে রাখা হয়েছে নিকৃষ্ট পরিস্থিতিতে সে-মানব গোষ্ঠির মধ্যে থেকে ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন প্রায় অসম্ভব। মারি বাশকির্তসেভ জানতে চেয়েছিলেন, ‘একজন কোথায় যেতে পারে, স্কার্ট পরে?’ স্তেদাল বলেছিলেন : ‘সব প্রতিভা, যারা জন্মেছেন নারী হয়ে, নষ্ট হয়েছেন জনগণের কল্যাণে’। সত্য বলতে কী, কেউ প্রতিভা হয়ে জন্মায় না : প্রতিভা হয়ে ওঠে; আজ পর্যন্ত নারীর পরিস্থিতি এই হয়ে ওঠাকে করে রেখেছে বাস্তবিকভাবে অসম্ভব।

নারীর ইতিহাস থেকে নারীমুক্তিবিরোধীরা বের করেন করেন দুটি পরস্পরবিরোধী যুক্তি : (১) নারী কখনো মহৎ কিছু সৃষ্টি করে নি; এবং (২) নারীর পরিস্থিতি মহৎ নারী ব্যক্তিত্বের বিকাশে কখনো বাধা দেয় নি। এ-মন্তব্য দুটিতে রয়েছে প্রতারণা; সুবিধাপ্রাপ্ত গুটিকয়েকের সাফল্য সম্মিলিত মানের নিম্নায়নের সাথে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে না বা তাকে অব্যাহতি দেয় না; এবং এ-সাফল্য যে এতো দুর্লভ ও সীমাবদ্ধ, তা-ই নির্ভুলভাবে প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি ছিলো তাদের প্রতিকূলে। ক্রিস্তিন দ্য পিসা, পোলি দ্য লা বার, কদরসে, জন স্টুয়ার্ট মিল,-এবং স্তেদাল যেমন মনে করেছেন, নারী সুযোগ পায় নি কোনোএলাকায়ই। এ-কারণেই আজকাল অসংখ্য নারী দাবি করে নতুন মর্যাদা; এবারও তারা দাবি করে না যে তাদের গৌরব দিতে হবে নারীত্বের জন্যে; তারা চায় তাদের মধ্যে, যেমন সমগ্র মানবমণ্ডলিতে, সীমাবদ্ধতার ওপর আধিপত্য করবে সীমাতিক্ৰমণতা; তারা চায় অবশেষে তাদের দিতে হবে বিমূর্ত অধিকার ও সম্ভবপরতা, যা একযোগে না মিললে মুক্তি হয়ে ওঠে একটা পরিহাস।

এ-বাসনা পূর্ণ হওয়ার পথে। কিন্তু যে-সময়ে আছি আমরা, সেটা এক ক্রান্তিকাল; এ-বিশ্ব, যা সব সময়ই ছিলো পুরুষের অধিকারে, আজো আছে তাদেরই অধিকারে; আজো টিকে আছে পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার সংস্থা ও মূল্যবোধগুলোর বড়ো অংশ। সবখানে নারীকে সবগুলো বিমূর্ত অধিকার সম্পূর্ণরূপে দেয়া হয় নি : সুইজারল্যান্ডে এখনো তারা ভোট দিতে পারে না; ফ্রান্সে ১৯৪২-এর আইন আজো শীর্ণরূপে রক্ষা করে স্বামীর সুযোগসুবিধা। বিমূর্ত অধিকার, আমি একটু আগেই বলেছি, কখনোই নারীকে পৃথিবীর ওপর নিশ্চিত অধিকার দিতে সমর্থ হয় নি : আজো দু-লিঙ্গের মধ্যে সত্যিকার সাম্য বিরাজ করে না।

প্রথমত, বিয়ের বোঝার ভার পুরুষের থেকে নারীর ওপর অনেক বেশি। আমরা লক্ষ্য করেছি যে স্বীকৃত বা গুপ্ত জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে মাতৃত্বের কাছে দাসত্ব কমেছে; তবে এটা সর্বত্র ছড়ায় নি। গর্ভপাত যেহেতু সরকারিভাবে নিষিদ্ধ, তাই অনেক নারী তত্ত্বাবধানহীন গর্ভপাত করে নেয় স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বা বিধ্বস্ত হয় অসংখ্য গর্ভধারণে। গৃহকর্মের মতো সন্তান লালনপালনের কাজও প্রায় সবটাই করে নারী। বিশেষ করে ফ্রান্সে নারীমুক্তিবিরোধী ঐতিহ্য আজো এতো নাছোড়বান্দা যে পুরুষেরা আজো মনে করে নারীর কাজে সাহায্য করে তারা নিজেদের নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। এর ফল হচ্ছে পারিবারিক জীবনের সাথে কর্মজীবনের সামঞ্জস্য স্থাপন পুরুষের থেকে নারীর পক্ষে অনেক কঠিন। সমাজ যখন দাবি করে এ-প্রয়াস, তখন নারীর জীবন হয়ে ওঠে তার স্বামীর জীবনের থেকে অনেক কষ্টকর।

যে-সত্য নারীর বাস্তবিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা হচ্ছে অস্পষ্ট রূপরেখা নিয়ে দেখা দিচ্ছে যে-নতুন সভ্যতা, তার ভেতরে একগুঁয়েভাবে অতিশয় পুরোনো ঐতিহ্যের টিকে থাকা। এটাই সে-জিনিশ, যাকে ভুল বোঝে চটজলদি দর্শকেরা, যারা মনে করে নারীকে এখন দেয়া হচ্ছে যে-সব সম্ভাবনা, নারী তার উপযুক্ত নয়, অথবা আবার তারা, যারা এসব সম্ভাবনার মধ্যে দেখতে পায় শুধু ভয়ঙ্কর প্রলোভন। সত্য হচ্ছে নারীর পরিস্থিতি হয়ে পড়েছে ভারসাম্যহীন, এবং এ-কারণে তার সাথে খাপ খাওয়ানো নারীর পক্ষে খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা নারীর জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছি কলকারখানা, কর্মস্থল, অনুষদ, কিন্তু আমরা আজো বিশ্বাস করে চলছি যে বিয়েই নারীর জন্যে সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা। যেমন আদিম সভ্যতাগুলোতে, আনন্দে নারী যে-সব কাজ করে, সে-কাজগুলোর জন্যে কমবেশি প্রত্যক্ষভাবে পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার তার আছে। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া, অন্তত রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ অনুসারে, সবখানেই আধুনিক নারীকে অনুমতি দেয়া হয় তার দেহকে শোষণের পুঁজি হিশেবে গণ্য করতে। বেশ্যাবৃত্তি সহ্য করা হয়, বীরপুঙ্গবতাকে উৎসাহিত করা হয়। এবং বিবাহিত নারীকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে এটা দেখতে যে স্বামী তার ভরণপোষণ করছে কি না; এর সাথে তাকে দেয়া হয়েছে অবিবাহিত নারীর থেকে বেশি সামাজিক মর্যাদা। লোকাচার অবিবাহিত পুরুষকে কামচরিতার্থ করতে যতোটা সম্মতি দেয় তার সামান্য দেয় না অবিবাহিত নারীকে; বিশেষভাবে তার জন্যে মাতৃত্ব বাস্তবিকভাবে নিষিদ্ধ অবিবাহিত মাতা থাকে এক কেলেঙ্কারির বস্তুরূপে। কীভাবে সিন্ডেরেলার কিংবদন্তি হারাবে তার সব বৈধতা? আজো সব কিছুই তরুণীকে কঠিন ও অনিশ্চিত বিজয়ের চেষ্টার থেকে উৎসাহিত করে কোনো সুদর্শন রাজকুমারের কাছে থেকে সৌভাগ্য ও সুখ লাভ করতে। বিশেষ করে সে আশা করতে পারে ওই রাজকুমারের বদৌলতে সে উন্নতি লাভ করবে নিজের বর্ণের থেকে উচ্চবর্ণে, সারাজীবনের শ্রম দিয়েও সে কিনতে পারবে না যে-অলৌকিক ব্যাপারকে। তবে এ-আশা এক চরম অশুভ, কেননা এটা খণ্ডিত করে তার শক্তি ও তার স্বার্থকে, এ-বিভাজনই সম্ভবত নারীর প্রধানতম প্রতিবন্ধকতা। পিতামাতারা আজো কন্যাদের তাদের বিকাশের জন্যে বড়ো না করে বড়ো করে বিয়ের জন্যে; তারা এর মাঝে এতো বেশি সুবিধা দেখতে পায় যে তারা নিজেরাই এটা চাইতে থাকে; এর ফল হচ্ছে তারা সাধারণত হয় কম প্রশিক্ষিত, ভাইদের থেকে তাদের ভিত্তি হয় কম দৃঢ়, তারা তাদের পেশায় মন দেয় অনেক কম। এভাবে তারা নিজেদের নষ্ট করে, থেকে যায় নিম্ন স্তরে, হয় নিকৃষ্ট; এবং গড়ে ওঠে দুষ্টচক্র : পেশাগত নিকৃষ্টতা তাদের ভেতরে বাড়িয়ে তোলে একটি স্বামী লাভের আকাঙ্খা।

প্রতিটি সুবিধারই খারাপ দিক হিশেবে সব সময় থাকে কিছু ভার; তবে ভারটা যদি হয় খুবই বেশি, তখন ওই সুবিধাটিকে আর দাসত্বশৃঙ্খলের থেকে অন্য কিছু মনে হয় না। অধিকাংশ শ্রমিকের জন্যে আজ শ্রম হচ্ছে একঘেয়ে ধন্যবাদহীন ক্লান্তিকর খাটুনি, আর নারীর বেলা সুনির্দিষ্ট সামাজিক মর্যাদা, তার আচরণের স্বাধীনতা, বা আর্থিক মুক্তি লাভের মধ্যে দিয়ে এর ক্ষতিপূরণ ঘটে না; তাই অনেক নারী শ্রমিক ও কর্মচারীর পক্ষে কর্মের অধিকারকে মনে হতে পারে বাধ্যবাধকতা, যা থেকে বিয়ে তাদের পরিত্রাণ করবে। এ-কারণে যে নারী সচেতন হয়ে উঠেছে নিজের সম্পর্কে এবং যেহেতু সে একটি চাকুরি নিয়েনিজেকে মুক্ত রাখতে পারে বিয়ে থেকে, তাই সে আর ভীরুতার সাথে গার্হস্থ্য অধীনতা মেনে নেয় না। সে যা আশা করে, তা হচ্ছে পারিবারিক জীবন ও চাকুরির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে তাকে নিঃশেষকর, কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে না। তার পরও, যতো দিন থাকবে সুবিধার প্রলোভন আর্থনীতিক অসাম্য, যা বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করে এবং এ-সুবিধাপ্রাপ্ত কোনো একটি পুরুষের কাছে নারীর নিজেকে বিক্রি করার স্বীকৃত অধিকার। স্বাধীনতার পথ বেছে নেয়ার জন্যে পুরুষের থেকে নারীর দরকার হয় অনেক বেশি নৈতিক উদ্যোগ। এটা যথেষ্টরূপে অনুধাবন করা হয় নি যে প্রলোভনও প্রতিবন্ধকতা, এবং অতিশয় ভয়ঙ্করগুলোর একটি। এখানে আছে একটা ধোঁকাবাজি, কেননা প্রকৃতপক্ষে বিয়ের লটারিতে হাজার হাজারের মধ্যে বিজয় হবে একজন। আধুনিক কাল নারীদের আমন্ত্রণ জানায়, এমনকি বাধ্য করে কাজ করতে; কিন্তু এটি তাদের চোখের সামনে মেলে রাখে আলস্য ও প্রমোদের স্বর্গের সূলিক : যারা বাঁধা থাকে মাটির সাথে, তাদের থেকে এটা জয়ীদের উন্নত করে অনেক উর্ধ্বে।

আর্থিক জীবন, তাদের সামাজিক উপযোগিতা, বিয়ের মর্যাদা প্রভৃতিতে পুরুষ অধিকার করে আছে যে-সুবিধাজনক স্থান তাতে নারীরা উৎসাহ বোধ করে পুরুষদের খুশি করতে। নারীরা এখনো, অধিক অংশে, আছে অধীন অবস্থায়। তাই নারী নিজেকে দেখে না এবং তার পছন্দগুলোও করে না তার প্রকৃত স্বভাব অনুসারে বরং করে যেভাবে পুরুষ তাকে সংজ্ঞায়িত করে। তাই আমরা প্রথম নারীকে বর্ণনা করবোপুরুষ নারীকে স্বপ্নে যেমন দেখতে চেয়েছে, কেননা তার বাস্তব পরিস্থিতির একটি আবশ্যক কারণ হচ্ছে পুরুষের-চোখে-তাকে-কেমন-দেখায়।

স্বপ্ন, ভয়, প্রতিমামধ্য

প্রথম খণ্ড । ভাগ ৩ – কিংবদন্তি। পরিচ্ছেদ ১

ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে পুরুষেরা সব সময় নিজেদের হাতে ধরে রেখেছে সব বস্তুগত ক্ষমতা; পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার আদিকাল থেকে তারা নারীকে পরনির্ভর অবস্থায় রাখাকেই মনে করেছে সবেচেয়ে ভালো, তাদের আইনগত বিধিবিধান তৈরি হয়েছে নারীর বিরুদ্ধে; এবং এভাবে তাকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অপররূপে। এ-ব্যবস্থা হয়েছে পুরুষের আর্থিক-স্বার্থের উপযোগী; এবং এটা খাপ খেয়েছে তাদের অস্তিত্বস্বরূপতাত্ত্বিক ও নৈতিক আত্মাভিমানের সাথেও। একবার কর্তা যখন নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তখন অপর, যে কর্তাকে সীমাবদ্ধ ও অস্বীকার করতে চায়, সেও কর্তার কাছে হয়ে ওঠে আবশ্যক : সে আত্মসিদ্ধি লাভ করে সে-সত্যের মাধ্যমে সে যা নয়, যা তার থেকে ভিন্ন কিছু। এজন্যেই পুরুষের জীবন কখনো প্রাচুর্য ও প্রশান্তি নয়; তা অভাব ও সক্রিয়তা, তা সংগ্রাম। নিজের সামনে, পুরুষ মুখোমুখি হয় প্রকৃতির; তার কিছু ক্ষমতা আছে প্রকৃতির ওপর, সে চায় নিজের বাসনা অনুসারে প্রকৃতিকে রূপ দিতে। তবে প্রকৃতি তার অভাব পূরণ করতে পারে না। হয়তো প্রকৃতি দেখা দেয় এক বিশুদ্ধ নৈর্ব্যক্তিক বিরোধিতারূপে, সে একটি বাধা এবং থেকে যায় আগন্তকরূপে; বা সে অক্রিয়ভাবে পুরুষের ইচ্ছের কাছে ধরা দেয় এবং সম্মত হয় সামঞ্জস্য লাভ করতে, তাই পুরুষ তাকে শুধু গ্রাস করে। অর্থাৎ, তাকে ধ্বংস করে–অধিকার করে। উভয় ক্ষেত্রেই পুরুষ থেকে যায় নিঃসঙ্গ; সে। নিঃসঙ্গ যখন সে ছোঁয় একটি পাথর, নিঃসঙ্গ যখন সে খায় একটি ফল। অপর-এর উপস্থিতি ঘটতেই পারে না যদি না অপর উপস্থিত থাকে তার ভেতরে এবং তার জন্যে : তাই বলা যায় সত্যিকার বিকল্পতা–অপরত্ব হচ্ছে আমার চেতনার থেকে পৃথক এক চেতনা এবং আমার চেতনার সাথে বস্তুত অভিন্ন এক চেতনা।

প্রত্যেক স্বতন্ত্র সচেতন সত্তা চায় একমাত্র নিজেকে সার্বভৌম কর্তা হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। প্রত্যেকেই নিজেকে চরিতার্থ করতে চায় অন্যকে দাসে পরিণত করে। তবে দাস যদিও কাজ করে এবং ভয়পায়, তবু সে একরকমে নিজেকে বোধ করে প্রয়োজনীয়; এবং এক দ্বান্দ্বিক বিপ্রতীপ রীতিতে প্রভুই নিজেকে বোধ করে অপ্রয়োজনীয়। পুরুষ নির্জনতার মধ্যে নিজেকে চরিতার্থ করতে পারে না, তাই পুরুষ তার সহচরদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে থাকে নিরন্তর বিপদের মধ্যে; তার জীবন এক কঠিন সাহসী উদ্যোগ, যাতে সাফল্য কখনোই নিশ্চিত নয়।

অন্যান্য পুরুষের অস্তিত্ব প্রতিটি পুরুষকে ছিন্ন করে আনে তার সীমাবদ্ধতা থেকে এবং তাকে সমর্থ করে তার সত্তার সত্যতাকে পূর্ণ করে তুলতে, সীমাতিক্ৰমণতার মধ্য দিয়ে, কোনো লক্ষ্যের দিকে যাত্রার মধ্য দিয়ে, কর্মের মধ্য দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ করতে। তবে এ-স্বাধীনতা আমার নিজের নয়, আমার স্বাধীনতার আশ্বাস দিয়েও এটি তার বিরোধিতা করে : হতভাগ্য মানব চৈতন্যের ট্র্যাজেডি এখানেই; প্রতিটি সচেতন সত্তা শুধু একলা নিজেকে সার্বভৌম কর্তারূপে প্রতিষ্ঠিত করার অভিকাঙ্খী। অপরকে দাসে পরিণত করে প্রত্যেকে পরিপূর্ণ করতে চায় নিজেকে। কিন্তু দাস, যদিও সে কাজ করে ও ভয় পায়, কোনো-কোনো রকমে নিজেকে বোধ করে অপরিহার্যরূপে; এবং একটা দ্বান্দ্বিক বিপর্যাসের ফলে প্রভুকেই মনে হয় অপ্র্যোজনীয় বলে। যদি প্রতিটি ব্যক্তি খোলাখুলিভাবে অপরকে স্বীকার করে নেয়, যদি প্রত্যেকে যুগপৎ নিজেকে ও অপরকে পারস্পরিক রীতিতে গণ্য করে কর্ম ও কর্তারূপে, তাহলে এবিরোধ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সুতরাং নির্জনতার মধ্যে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে অসমর্থ হয়ে পুরুষ তার সহচরদের সাথে সম্পর্কের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে বিপদগ্রস্ত : তার জীবন এক দুঃসাধ্য কর্মোদ্যোগ, যাতে সাফল্যলাভ কখনোই নিশ্চিত নয়।

তবে সে বাধাবিপত্তি পছন্দ করে না, ভয় করে বিপদকে। পরস্পরবিরোধী রীতিতে সে অভিকাঙ্খী হয় জীবন ও বিশ্রাম, অস্তিত্ব ও নিতান্ত জীবনধারণ উভয়েরই; সে ভালোভাবেই জানে যে ‘আত্মার ঝঞাট’ হচ্ছে বিকাশের দাম, জানে যে অভীষ্ট বস্তু থেকে দূরত্ব হচ্ছে তার নিজের কাছে নৈকট্যের মূল্য; তবে সে স্বপ্ন দেখে উদ্বেগের মধ্যে শান্তির এবং এক অনচ্ছ পরিপূর্ণতার, যা ভূষিত থাকবে চৈতন্যে। এ-স্বপ্নের সম্যক প্রতিমূর্তি নারী; সে প্রকৃতির সাথে আকাঙ্খিত যোগাযোগের মাধ্যম, পুরুষের কাছে অপরিচিত, এবং সহচর সত্তা, যে অত্যন্ত অভিন্ন। প্রকৃতির বিরূপ নৈঃশব্দ দিয়েও সে পুরুষের বিরোধিতা করে না, আবার পারস্পরিক সম্পর্কের কঠোর আবশ্যকতা দিয়েও বিরোধিতা করে না; এক অনন্য বিশেষাধিকারের মাধ্যমে সে এক চৈতন্যসম্পন্ন সত্তা এবং তবুও মনে হয় যেনো তাকে শারীরিকভাবে অধিকার করা সম্ভব।

আমরা দেখেছি যে প্রথম দিকে ছিলো না মুক্ত নারীরা, পুরুষেরা যাদের পরিণত করেছিলো দাসীতে, এমনকি লিঙ্গভিত্তিক কোনো জাতও ছিলো না। নারীকে শুধু দাসী হিশেবে গণ্য করা ভুল; এটা ঠিক যে দাসদের মধ্যে অনেকে ছিলো নারী, কিন্তু সবসময়ই ছিলো মুক্ত নারী–অর্থাৎ ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন নারী। তারা মেনে নিয়েছিলো পুরুষের সার্বভৌমত্ব এবং পুরুষ এমন কোনো বিদ্রোহের হুমকি বোধ করে নি, যা তাকে কর্মে পরিণত করতে পারতো। এভাবে নারীকে মনে হয় সে অপ্রয়োজনীয়, পারস্পরিকতা ছাড়া যে আবার অপরিহার্য হয়ে ধ্রুব অপর হতে চায় না। এ-বিশ্বাস পুরুষের কাছে প্রিয়, এবং প্রতিটি সৃষ্টিপুরাণ এটা প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে আছে জেনেসিস, যাকে খ্রিস্টধর্মের মধ্য দিয়ে জীবন্ত করে রাখা হয়েছে পাশ্চাত্য সভ্যতায়। হাওয়াকে পুরুষের সাথে একই সময়ে নির্মাণ করা হয় নি; তাকে কোনো ভিন্ন পদার্থেও তৈরি করা হয় নি, আদমকে যে-মাটিতে তৈরি করা হয়েছিলো তাতেও তৈরি করা হয় নি তাকে; তাকে নেয়া হয়েছিলো প্রথম পুরুষের পার্শ্বাঙ্গ থেকে। তার জন্মও স্বাধীন ছিলো না; বিধাতা তাকে তারই জন্যে স্বতস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি করে নি এবং প্রতিদানরূপে সরাসরি তার উপাসনা লাভের জন্যেও সৃষ্টি করে নি। সে তার নিয়তি নির্ধারণ করেছিলো পুরুষের জন্যে; আদমকে নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্ত করার জন্যে সে হাওয়াকে দান করেছিলো আদমকে, তার সহচরের মধ্যেই ছিলো তার। উৎপত্তি ও উদ্দেশ্য; হাওয়া ছিলো অপ্রয়োজনীয়দের বিন্যাসের মধ্যে আদমের পরিপূরক। তাই সে দেখা দেয় সুবিধাপ্রাপ্ত শিকারের বেশে। সে ছিলো চেতনার স্তরে উন্নীত প্রকৃতি; সে সচেতন সত্তা ছিলো, কিন্তু প্রাকৃতিকভাবেই ছিলো অনুগত। এবং এখানেই রয়েছে সে-বিস্ময়কর আশাটি, পুরুষ যা পোষণ করেছে নারীর মধ্যে : সে সত্তা হিশেবে নিজেকে চরিতার্থ করতে চায় অন্য একটি সত্তাকে দৈহিকভাবে দখল করে, এবং একই সময়ে একটি মুক্ত মানুষের বাধ্যতার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করতে চায় তার স্বাধীনতাবোধ। কোনো পুরুষই কখনো নারী হতে সম্মত হবে না, তবে প্রতিটি পুরুষই চায় নারী থাকুক। ‘নারী সৃষ্টির জন্যে বিধাতাকে ধন্যবাদ’। ‘প্রকৃতি শুভ, কেননা সে পুরুষকে দিয়েছে নারী’। এসব উক্তির মধ্যে পুরুষ পুনরায় স্থূল উগ্রতার সাথে জ্ঞাপন করে যে এ-বিশ্বে তার উপস্থিতি এক অবধারিত ঘটনা ও অধিকার, নারীরটা এক দুর্ঘটনা মাত্র, তবে খুবই সুখকর দুর্ঘটনা। অপররূপে দেখা দিয়ে একই সময়ে নারী দেখা দেয় সত্তার এক প্রাচুর্যরূপে, যা বিপরীত সে-অস্তিত্বের, যার শূন্যতা পুরুষ বোধ করে নিজের মধ্যে; কর্তার চোখে কর্মরূপে গণ্য হয়ে ওই অপর গণ্য হয় আঁ সুওঅ রূপে; সুতরাং একটি সত্তারূপে। পুরুষ যে-অভাব বহন করে তার অন্তরে, তা সদর্থকরূপে প্রতিমূর্তিত হয় নারীতে, এবং তার মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়ে পুরুষ আশা করে আত্মসিদ্ধি অর্জনের।

তবে নারী পুরুষের কাছে শুধু অপর-এর প্রতিমূর্তি উপস্থাপন করে নি, এবং ইতিহাসের যাত্রাপথ ভরে সে সমান গুরুত্ব ধারণ করে নি। অনেক মুহুর্ত এসেছে যখন সে গ্রস্ত হয়েছে অন্যান্য প্রতিমা দিয়ে। যখন নগর বা রাষ্ট্র গিলে খায় নাগরিকদের, তখন পুরুষের পক্ষে ব্যক্তিগত নিয়তি নিয়ে বিভোর থাকা সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রের কাছে উৎসর্গিত হয়ে স্পার্টার নারীদের অবস্থা ছিলো গ্রিসের অন্যান্য নারীদের ওপরে। তবে এটা সত্য যে নারী কোনো পুরুষসুলভ স্বপ্নের ফলে রূপান্তরিত হয় নি। নেতাতন্ত্র, তা সে নেপলিয়ন, মুসোলিনি, বা হিটলারই হোক, বর্জন করে অন্য সব তন্ত্র। সামরিক স্বৈরতন্ত্রে, একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, নারী আর সুবিধাপ্রাপ্ত বস্তু থাকে না। এটা বোঝা যায় যে নারীকে দেবীতে উন্নীত করা হয় এমন ধনী দেশে, যেখানে নাগরিকেরা জীবনের অর্থ সম্পর্কে বিশেষ নিশ্চিত নয় : যেমন হয় আমেরিকায়। অন্য দিকে, সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শগুলো, যা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে সব মানুষের সাম্য, সেগুলো এখন ও ভবিষ্যতে কোনো মানবশ্রেণীকে বস্তু বা দেবতা বলে গণ্য করতে অস্বীকার করে : মার্ক্সের ঘোষিত খাঁটি গণতান্ত্রিক সমাজে অপর-এর কোনো স্থান নেই। ফরাসি বেশ্যাদের কাছে লেখা জর্মন সৈন্যদের চিঠি আমি দেখেছি, যাতে, নাটশিবাদ সত্ত্বেও, স্থূলভাবে জ্ঞাপন করা হয়েছে কুমারীর শুদ্ধতার অন্তর্নিহিত ঐতিহ্য। ফ্রান্সে আরাগ, আর ইতালিতে ভিত্তোরিনির মতো সাম্যবাদী লেখকেরা নিজেদের লেখায় নারীদের স্থান দিয়েছেন প্রথম সারিতে, তারা রক্ষিতা বা মাতা যা-ই হোক। হয়তো কোনোদিন নির্বাপিত হবে নারী-কিংবদন্তি, যতো বেশি নারীরা নিজেদের দাবি করবে মানুষ হিশেবে। তবে আজো তা আছে প্রতিটি মানুষের মনে।

প্রতিটি কিংবদন্তি ইঙ্গিত করে একটি কর্তার প্রতি, যে তার আশা ও ভয়গুলোকে বিস্তীর্ণ করে দেয় এক সীমাতিক্ৰমণতার আকাশের দিকে। নারীরা নিজেদের কর্তারূপে প্রতিষ্ঠিত করে না এবং সেজন্যে তারা এমন কোনো পুরুষপুরাণ সৃষ্টি করে নি, যাতে প্রতিফলিত হয়েছে তাদের পরিকল্পনা; তাদের নিজেদের কোনো ধর্ম বা কবিতা নেই : তারা আজো পুরুষের স্বপ্নের ভেতর দিয়ে স্বপ্ন দেখে। পুরুষের তৈরি দেবতারাই তাদের দেবতা, যাদের তারা পুজো করে। পুরুষেরা নিজেদের পরমে উন্নীত করার জন্যে সৃষ্টি করেছে বীরপ্রতিমা : হারকিউলিস, প্রেমিথিউস, পার্সিফাল; এ-বীরদের নিয়তিতে নারীরা পালন করেছে শুধুই গৌণ ভূমিকা। সন্দেহ নেই যে আছে নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িত পুরুষের নানা প্রথাগত প্রতিমা : পিতা, প্রলুব্ধকারী,স্বামী, ঈর্ষাকাতর প্রেমিক, সুবোধ পুত্র, নষ্ট পুত্র; তবে এদের সবাইকে প্রতিষ্ঠিত করেছে পুরুষেরা, এবং এগুলোর নেই পুরাণের মহিমা, এগুলো শস্তা গতানুগতিকের বেশি কিছু নয়। আর সেখানে নারীকে একান্তভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় পুরুষের সাথে তার সম্পর্ক অনুসার। পুরুষ ও নারী–এ-ধারণা দুটির অপ্রতিসাম্যকে প্রকাশ করা হয়েছে কামপুরাণগুলোর একপাক্ষিক গঠনের মধ্য দিয়ে। আমরা অনেক সময় নারী বোঝানোর জন্যে বলি ‘লিঙ্গ’; নারী হচ্ছে মাংস, মাংসের সুখ ও বিপদ। নারীর জন্যে পুরুষও যে লিঙ্গ ও মাংস, তা কখনো ঘোষিত হয় নি, কেননা ঘোষণা করার কেউ নেই। বিশ্বের উপস্থাপন, বিশ্বের মতোই, পুরুষেরই কাজ; তারা একে বর্ণনা করে নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে, যাকে তারা গুলিয়ে ফেলে ধ্রুবসত্যের সাথে।

কোনো একটি পুরাণ বর্ণনা করা সব সময়ই কঠিন; একে ধরা বা বেষ্টন করা যায় না; এটি কোনো স্থির রূপে উপস্থিত না হয়ে মানুষের চেতনায় ঘুরে ফিরে হানা দেয়। পুরাণ এতো বিচিত্র, এতোপরস্পরবিরোধী যে প্রথমে উপলব্ধি করা যায় না এর ঐক্য : ডেলাইলা ও জুডিথ, আস্পাসিয়া ও লুক্ৰেতিয়া, প্যান্ডোরা ও অ্যাথেনা–নারী একই সময়ে হাওয়া ও কুমারী মেরি। সে প্রতিমা, ভৃত্য, জীবনের উৎস, অন্ধকারের শক্তি; সে সত্যের আদি নৈঃশব্দ্য, সে ছল, গুজব, ও মিথ্যাচার; সে শুশ্রুষাকর উপস্থিতি ও মায়াবিনী; সে পুরুষের শিকার, তার পতন, সে সব কিছু পুরুষ যা নয় এবং পুরুষ যা কামনা করে, সে পুরুষের নেতি এবং তার লক্ষ্য ও সত্যতাপ্রতিপাদন।

‘নারী হওয়া,’ স্টেজেজ অন দি রোড অফ লাইফ-এ বলেছেন কিয়ের্কেগার্ড, ‘এমন অদ্ভুত, এতো গোলমেলে, এতো জটিল যে কোনো বিধেয় একে প্রকাশ করার কাছাকাছিও আসে না এবং প্রয়োগ করতে হয় যে-বহুসংখ্যক বিধেয়, সেগুলো এতো পরস্পরবিরোধী যে শুধু নারীর পক্ষেই সেগুলো সহ্য করা সম্ভব’। নারীর নিজেকে নিজের কাছে যেমন মনে হয়, এটা তেমন সদর্থকভাবে গণ্য করা থেকে বেরিয়ে আসে নি, এসেছে নঞর্থকভাবে, তবে একথা সত্য যে নারীকে সব সময় সংজ্ঞায়িত করা হয় অপররূপে। আগেই বলেছি অপর হচ্ছে অশুভ; তবে তা শুভর জন্যে আবশ্যক হয়ে হয়ে ওঠে শুভ। নারী কোনো স্থির ধারণা রূপায়িত করে না, এখানেই রয়েছে তার। কারণটি; তার মাধ্যমে নিরন্তর যাতায়াত চলে আশা থেকে নিরাশায়, ঘৃণা থেকে প্রেমে, শুভ থেকে অশুভে, অশুভ থেকে শুভে। যে-বৈশিষ্ট্যেই নারীকে বিবেচনা করি না কেননা, পরস্পরবিপরীত এ-মূল্যই প্রথম ঘা দেয় আমাদের মনে।

পুরুষ নারীর মধ্যে অপরকে খোঁজে প্রকৃতিরূপে এবং তার সহচর সত্তারূপে। তবে আমরা জানি পুরুষের মধ্যে প্রকৃতি জাগিয়ে তোলে কোন পরস্পরবিপরীত মূল্যসম্পন্ন অনুভূতিরাশি। পুরুষ নারীকে শোষণ করে, নারী পুরুষকে চুরমার করে, পুরুষ নারী থেকে জন্ম নেয় এবং নারীর মধ্যে মৃত্যুবরণ করে; নারী তার সত্তার উৎস এবং সে-এলাকা, যা সে নিজের ইচ্ছের অধীন করে; প্রকৃতি হচ্ছে অমার্জিত বস্তুর মিশ্রণ, যাতে বন্দী হয়ে আছে আত্মা, আর নারী হচ্ছে পরম বাস্তবতা; নারী আকস্মিকতা ও ভাব, সসীম ও সম্পূর্ণ; সে আত্মার বিপরীত, এবং আত্মা নিজে। এখন মিত্র, পরক্ষণেই শত্রু, সে প্রতিভাত হয় সে-অন্ধকার বিশৃঙ্খলারূপে যেখান থেকে জীবন উৎসারিত হয়, প্রতিভাত হয় এ-জীবনরূপে, এবং ওই সুদূররূপে, যার দিকে ঝুঁকে আছে জীবন। জননী, স্ত্রী, ও ভাবরূপে নারী প্রকাশ করে প্রকৃতির সার; এরূপগুলো কখনোমিলেমিশে যায় এবং কখন্যে সংঘর্ষে আসে, এবং এদের প্রত্যেকে ধারণ করে দ্বৈত মুখাবয়ব।

পুরুষের শেকড় প্রকৃতির ভেতর গভীরভাবে ছড়ানো; তার জনন ঘটেছে পশু ও উদ্ভিদের মতো; সে ভালোভাবেই জান্র সে ততোদিনই অস্তিত্বশীল, যতোদিন সে বেঁচে আছে। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার আগমনের পর থেকে তার চোখে জীবন গ্রহণ করেছে দুটি বৈশিষ্ট্য : জীবন হচ্ছে চেতনা, ইচ্ছা, সীমাতিক্ৰমণতা, এটি চৈতন্য; এবং জীবন হচ্ছে বস্তু, অক্রিয়তা, সীমাবদ্ধতা, এটি মাংস। এস্কিলুস, আরিস্ততল, হিপোক্রেতিস ঘোষণা করেছিলেন অলিম্পাসে যেমন পৃথিবীতেও তেমনি পুরুষ-নীতিই সত্যিকারভাবে সৃষ্টিশীল : এর থেকে এসেছে গঠন, সংখ্যা, গতি; দিমিতারের প্রযত্নে শস্য জন্মে ও সংখ্যায় বাড়ে, কিন্তু শস্যের উদ্ভব ও সত্যিকার অস্তিত্বের মূলে আছে জিউস; নারীর উর্বরতাকে গণ্য করা হয় শুধু এক অক্রিয় গুণ হিশেবে। নারী হচ্ছে মাটি, আর পুরুষ বীজ; নারী জল এবং পুরুষ অগ্নি। সৃষ্টিকে অনেক সময় কল্পনা করা হয়েছে অগ্নি ও জলের বিবাহরূপে; উষ্ণতা ও আর্দ্রতা জন্ম দেয় জীবন্ত বস্তুদের; সূর্য হচ্ছে সমুদ্রের স্বামী; সূর্য, অগ্নি হচ্ছে পুরুষ দেবতা; এবং সমুদ্র মাতৃপ্রতীকগুলোর মধ্যে প্রায়-সর্বজনীন প্রতীকগুলোর একটি। জল অক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে জ্বলন্ত বিকিরণের উর্বরায়ণ ক্রিয়া। একইভাবে তৃণভূমির মাটি চাষীর শ্রমে বিচূর্ণ হয়ে তার হলরেখায় অক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে বীজ। তবে এটা পালন করে এক দরকারি ভূমিকা : এটা বাঁচিয়ে রাখে জীবন্ত জীবাণুটিকে, একে রক্ষা করে এবং এর বিকাশের জন্যে সরবরাহ করে বস্তু। এবং এ-কারণেই মহামাতার সিংহাসনচ্যুতির পরও পুরুষ পুজো করে এসেছে উর্বরতার দেবীর; পুরুষ তার শস্য, পশুপাল, ও তার সমস্ত সমৃদ্ধির জন্যে ঋণী সিবিলের কাছে। এমনকি সে তার জীবনের জন্যেও ঋণী তার কাছে। সে অগ্নির যতোটা স্তব করে, জলের স্তবও তারচেয়ে কম করে না। ‘সমস্ত প্রশংসা সমুদ্রের! সমস্ত প্রশংসা পবিত্র অগ্নিতে পরিবৃত তার তরঙ্গরাশির! সমস্ত প্রশংসা তরঙ্গরাশির! সমস্ত প্রশংসা অগ্নির! সমস্ত প্রশংসা এ-অদ্ভুত অভিযাত্রার,’ ফাউস্ট-এর দ্বিতীয় ভাগে এভাবে চিৎকার করেছেন গ্যেটে। পুরুষ পুজো করে মাটির : যেমন ব্লেক মাটিকে বলেছেন ‘মাতৃকা কর্দম’। ভারতবর্ষের এক ধর্মপ্রবর্তক তার ভক্তদের মাটিতে কোদাল না চালানোর উপদেশ দিয়েছেন, কেননা ‘চাষ করতে গিয়ে আমাদের সকলের জননীকে বিক্ষত করা বা কাটা বা ছিন্ন করা পাপ… আমি কি একটা ছোরা ঢুকিয়ে দেবো আমার জননীর বুকে?… আমি কি তাঁর মাংস টুকরো টুকরো করে ঢুকবো তাঁর অস্থিতে?… আমার কী সাহস যে আমি কাটবো আমার মাতার কেশ?’ মধ্যভারতে ‘মাতা বসুমতীর বুক লাঙল দিয়ে ছিন্নভিন্ন করাকে’ পাপ বলে গণ্য করেন বৈদ্য। উল্টোভাবে, ইদিপাস সম্পর্কে এস্কিলুস বলেছেন সে ‘বীজ বপন করেছিলো সেই পবিত্র হলরেখায়, যেখানে সে গঠিত হয়েছিলো’। সফোক্লিজ বলেছেন ‘পৈতৃক হলরেখা’র কথা এবং ‘সেই কৃষক, দূরের জমির যে প্রভু, যেন সে যায় মাত্র একবার, বীজ বপনের সময়’, তার কথা। একটি মিশরি গানে দয়িতা ঘোষণা করে : ‘আমিই মৃত্তিকা!’ ইসলামি ধর্মীয় রচনায় নারীকে বলা হয় ‘জমি… দ্রাক্ষাক্ষেত্র’। আসিসির সেইন্ট ফ্রান্সিস একটি স্তোত্রে বলেছেন তার কথা, যে ‘আমাদের ভগিনী, মাটি, আমাদের জননী, লালন করছে আমাদের, ফলাচ্ছে সব ধরনের ফল, ফোটাচ্ছে নানান রঙের ফুল ও জন্মাচ্ছে ঘাস’। মিশেলে আঁকুইয়ে কর্দমস্নানের পর, বিস্ময়ে বলে উঠেছিলেন : ‘সকলের প্রিয় জননী! আমরা এক। তোমার থেকে এসেছিলাম আমি, তোমার কাছে আমি ফিরে আসছি ..’ এবং এমনই ঘটে সে-সব পর্বে, যখন দেখা দেয় প্রাণবাদী রোম্যান্টিসিজযম যার কাম্য আত্মার ওপর জীবনের জয়; তখন ভূমির, নারীর ঐন্দ্রজালিক উর্বরতাকে বেশি বিস্ময়কর মনে হয় পুরুষের আবিষ্কৃত কৌশলগুলোর থেকে, তখন পুরুষ মাতৃছায়ায় নিজেকে নতুনভাবে হারিয়ে ফেলার স্বপ্ন দেখে, যাতে সেখানে আবার সে পেতে পারে তার সত্তার সত্যিকার উৎস। মা হচ্ছে মহাবিশ্বের অতলে লুপ্ত সে-শেকড়, যে টানতে পারে এর রস; সে হচ্ছে সেই ফোয়ারা যেখান থেকে ঝরে জীবন্ত জল, সেই জল যা পুষ্টিকর দুগ্ধও, এক উষ্ণ ঝরনাধারা, সঞ্জীবনী গুণাবলিতে সমৃদ্ধ মৃত্তিকা ও জলে তৈরি কর্দম।

তবে অধিকাংশ সময় পুরুষ লিপ্ত থাকে তার দৈহিক অবস্থার বিরুদ্ধে দ্রোহে; সে নিজেকে দেখে এক স্বর্গভ্রষ্ট দেবতা হিশেবে; তার অভিশাপ হচ্ছে এক দীপ্ত ও সুশৃঙ্খল স্বর্গ থেকে তার পতন ঘটেছে মাতৃগর্ভের বিশৃঙ্খল আঁধারে। এই অগ্নি, এই শুদ্ধ ও সক্রিয় নিঃসারণ, যার মধ্যে পুরুষ নিজেকে দেখতে পছন্দ করে, নারীর দ্বারা তা বন্দী হয়ে আছে মৃত্তিকার কর্দমে। বিশুদ্ধ ভাবের মতো, এক-এর মতো, সর্বশ্বের মততা, ধ্রুব আত্মার মতো অবধারিত হওয়ার কথা ছিলো তার; এবং সে দেখতে পায় সে বন্দী হয়ে আছে সীমিত ক্ষমতার একটি দেহের ভেতরে, এমন স্থানে ও কালে যা সে কখনো বেছে নেয় নি, যেখানে সে অনাহুত, অপ্রয়োজনীয়, দুর্বহ, উদ্ভট। তার পরিত্যক্তির মধ্যে, তার অপ্রতিপাদ্য অনাবশ্যকতার মধ্যে তাকেই ভোগ করা হয় সমগ্র শরীরের অনিশ্চয়তা। নারীও তাকে দণ্ডিত করে মৃত্যুতে। এই কম্পমান জেলি যা বিকশিত হয় জরায়ুতে (জরায়, সমাধির মতো সংগোপন ও রুদ্ধ) অতি স্পষ্টভাবে তার স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলে পূতিমাংসের কোমল গাঢ় তরলতা, কিন্তু ঘৃণায় তার থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়া যাবে না। যেখানেই জীবন প্রস্তুত হতে থাকে-বীজায়ন, গাজন–সেখানেই এটা জাগিয়ে তোলে ঘৃণাবোধ, কেননা ধ্বংসের ভেতর দিয়েই তৈরি হয় এটি; পিচ্ছিল ভ্রূণ শুরু করে সে-চক্র, যা সম্পূর্ণতা লাভ করে মৃত্যুর পচনের ভেতর দিয়ে। যেহেতু সে অনাবশ্যকতা ও মৃত্যুতে বিভীষিকা বোধ করে, তাই পুরুষ জন্মলাভের মধ্যেও বোধ করে বিভীষিকা; সে সানন্দে অস্বীকার করতে চায় তার পাশবিক বন্ধনরাশি; তার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে ঘাতক প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে তাকে।

আদিম জনগণের মধ্যে শিশুর জন্মকে ঘিরে থাকে চরম কঠোর ট্যাবু; বিশেষ করে গর্ভফুলটি পোড়াতে হয় যত্নের সাথে বা ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয় সমুদ্রে, কেননা যার হাতেই এটা পড়বে নবজাতকের ভাগ্য থাকবে তারই হাতে। সে-ঝিল্লিময় বস্তুরাশি, যার সাহায্যে বেড়ে ওঠে ভ্রূণটি, তাই হচ্ছে এর পরনির্ভরশীলতার চিহ্ন; যখন এটি ধ্বংস করা হয়, তখন ব্যক্তিটি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আনতে সমর্থ হয় জীবন্ত ম্যাগমা থেকে এবং হয়ে ওঠে স্বায়ত্তশাসিত সত্তা। জন্মের অশুচিতা চাপিয়ে দেয়া হয় মায়ের ওপর। লেভিটিকাস ও সমস্ত প্রাচীন বিধি শুচিতার সমস্ত কৃত্য চাপিয়ে দেয়া তার ওপর, যে জন্ম দিয়েছে; এবং অনেক পল্লী অঞ্চলে গির্জানুষ্ঠানে (শিশুজন্মের পর আশীর্বাদ) এখনো চলছে এ-প্রথা। আমরা জানি যে গর্ভিণীর পেট দেখে স্বতস্ফূর্তভাবে বিব্ৰত বোধ করে শিশুরা, বালিকারা, ও পুরুষেরা, অধিকাংশ সময় প্রকাশ পায়কৌতুকের হাসিতে। সমাজ এর প্রতি যতোই যুক্তি দেখাক না কেনো গর্ভধারণের ব্যাপারটি আজো জাগিয়ে তোলে স্বতর্ফূর্ত ঘেন্নার বোধ। আর ছোটো বালক যদিও শৈশবে ইন্দ্রিয়সুখে জড়িত থাকে মায়ের মাংসের সাথে, কিন্তু যখন সে বড়ো হয়, সামাজিকীকরণ হয় তার, এবং বোধ করে অস্তিত্বের স্বাতন্ত্র, তখন ওই একই মাংস সন্ত্রস্ত করে তাকে; সে এটা অস্বীকার করে এবং মায়ের মধ্যে সে দেখে শুধু এক নীতিপরায়ণ ব্যক্তিকে। সে যে মাকে শুদ্ধ ও সতী বলে বিশ্বাস করার জন্যে উদ্বিগ্ন থাকে, তা যতোটা যৌন ঈর্ষার কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি এ-কারণে যে সে মাকে একটি শরীর হিশেবে দেখতে রাজি নয়। যৌবনে সদ্য পা দেয়া কিশোর বিব্রত বোধ করে, লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে যদি সঙ্গীদের সাথে থাকার সময় সে হঠাৎ মুখোমুখি হয় মায়ের, বোনদের, বা কোনো আত্মীয়ার : এর কারণ তাদের উপস্থিতি তাকে মনে করিয়ে দেয় সে-সীমাবদ্ধতার কথা, যার থেকে সে পালিয়ে যেতে চায়, এটা মেলে ধরে সে-শেকড়, যার থেকে সে ছিন্ন করতে চায় নিজেকে। মায়ের চুম্বনে আদরে বালকের বিরক্তিরও একই তাৎপর্য; সে অস্বীকার করে পরিবার, মা, মায়ের বুক। তার ভালো লাগতো পৃথিবীতে হঠাৎ বিকশিত হতে পারলে, অ্যাথেনার মতোপরিপূর্ণগঠিত, সশস্ত্র, অপরাজেয়। মায়ের পেটে বিকশিত হওয়া ও তারপর শিশুরূপে জন্ম নেয়া হচ্ছে সে-অভিশাপ, যা ঝুলে আছে তার নিয়তির ওপর, সে-অশুচিতা, যা দূষিত করে তার সত্তাকে। এবং এটা তার মৃত্যুরও ঘোষণা। বীজায়ন তন্ত্রের সাথে সব সময়ই জড়িত হয়ে আছে মৃত্যুর তন্ত্র। মাতা বসুমতী গ্রাস করে তার সন্তানদের অস্থিপুঞ্জ। যারা বয়ন করে মানবজাতির নিয়তি–পারকেয়ে, মোইরাই–তারা নারী; আবার তারাই ছিড়ে ফেলে সুতো। অধিকাংশ জনপ্রিয় উপস্থাপনে মৃত্যু এক নারী, এবং মৃতের জন্যে বিলাপ নারীর কাজ, কেননা মৃত্যু তাদেরই কর্ম।

তাই নারী-মাতার মুখমণ্ডল ছায়াচ্ছন্ন : সে হচ্ছে সে-বিশৃঙ্খলা, যেখান থেকে সবাই এসেছে এবং একদিন যেখানে সবাইকে ফিরতে হবে; সে হচ্ছে শূন্যতা। রাত্রিতে বিশ্বের বহু রকমের বৈশিষ্ট্য বিভ্রান্তিজাগানো অবস্থায় থাকে, যা উদ্ভাসিত হয় দিনের আলোতে। সমুদ্রের গভীর তলদেশে আছে রাত্রি : নারী মারে তেনেব্রারুম, অন্ধকার সাগর, যাকে ভয় করেছে পুরোনো দিনের নাবিকেরা; পৃথিবীর অন্ত্রে আছে রাত্রি। পুরুষ এ-রাত্রি, যা উর্বরতার বিপরীত, যা তাকে গিলে খেতে চায়, তার ভয়ে ভীত। তার অভিকাঙ্খা হচ্ছে আকাশ, আলোক, রৌদ্রদীপ্ত শিখর, নীলাকাশের বিশুদ্ধ ও স্ফটিক কামশীতলতা; এবং তার পায়ের নিচে আছে এক আর্দ্র, উষ্ণ, ও আঁধারাচ্ছন্ন উপসাগর, যা প্রস্তুত হয়ে আছে তাকে তলদেশে টানার জন্যে; অজস্র উপকথায় আমরা দেখতে পাই নায়ক লুপ্ত হয়ে গেছে মাতৃধর্মী ছায়ায়–গুহায়, রসাতলে, নরকে।

আবার এখানে সে-পরস্পরবিপরীত মূল্যের খেলা : যদি বীজায়ন সব সময় জড়িত মৃত্যুর সাথে, তাহলে মৃত্যুও জড়িত উর্বরতার সাথে। ঘৃণ্য মৃত্যু দেখা দেয় নবজন্ম রূপে, এবং হয়ে ওঠে আশীর্বাদপ্রাপ্ত। মৃত নায়ক, ওসিরিসের মতো, পুনর্জীবিত হয় প্রত্যেক বসন্তে, এবং তাকে পুনর্সৃষ্টি করা হয় একটি নবজন্মের মাধ্যমে। মানুষের উচ্চতম স্বপ্ন, মেটামোরফোসেস অফ দি লিবিডোতে ইয়ুং বলেছেন, ‘হচ্ছে মৃত্যুর অন্ধকার জলরাশি হয়ে উঠুক জীবনের জলরাশি, মৃত্যু ও তার শীতল আলিঙ্গন হোক মায়ের বক্ষ, যা সমুদ্রের মতো সূর্যকে প্লাবিত করেও আবার তাকে জন্ম দেয় নিজের গভীরে’। অসংখ্য পুরাণে পাওয়া যায়একটি সাধারণ বিষয়, সেটি হচ্ছে সমুদ্রের বুকে সূর্যদেবতার সমাহিতি এবং তার প্রোজ্জ্বল পুনরাবির্ভাব। এবং পুরুষ একই সঙ্গে বেঁচে থাকতে চায়, তবে কামনা করে বিশ্রাম ও নিদ্রা ও শূন্যতা। সে অমর হবে এটা সে চায় না, এবং তাই সে মৃত্যুকে ভালোবাসতে শেখে।

সব সভ্যতায় এবং আজো আমাদের কালে পুরুষের বুকে নারী জাগিয়ে তোলে বিভীষিকা; এটা হচ্ছে তার নিজের দৈহিক অনিশ্চিত সম্ভাবনার বিভীষিকা, যা সে প্রক্ষেপ করে নারীর ওপর। ছোটো বালিকা, যে এখনো বয়ঃসন্ধিতে পৌছে নি, কোনো ভীতি প্রদর্শন করে না, তার ওপর কোনো ট্যাবু নেই এবং তার কোনো পবিত্র বৈশিষ্ট্য নেই। অনেক আদিম সমাজে তার লিঙ্গকে মনে করা হয় নিষ্পাপ : শৈশব থেকেই ছেলেমেয়েদের অনুমতি দেয়া হয় কামক্রীড়ার। কিন্তু যেদিন নারী ঋতুমতী হয়, সে হয়ে ওঠে অশুচি; এবং ঋতুমতী নারীকে ঘিরে থাকে কঠোর সব ট্যাবু। লেভিটিকাস দিয়েছে এর বিস্তৃত বিধিবিধান, এবং অনেক আদিম সমাজে বিচ্ছিন্নতা ও শুচিতা বিষয়ে আছে একই রকম বিধিবিধান। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে ঋতুস্রাবের সঙ্গে জড়িত শক্তিগুলোতে বিদ্যমান ছিলো পরস্পরবিপরীত মূল্য : ঋতুস্রাব বিপর্যস্ত করতে পারতোসামাজিক কর্মকাণ্ড এবং নষ্ট করতে শস্য; তবে এটা প্রণয়োপচার ও ঔষধ তৈরিতেও ব্যবহৃত হতো। এমনকি আজো কোনো কোনো ভারতি গোষ্ঠিতে নদীর দানবদের সাথে সংগ্রামের জন্যে নৌকোর সম্মুখ গলুইয়ে রাখা হয় ঋতুস্রাবে ভেজানো একদলা তন্তু। তবে পিতৃতান্ত্রিক কাল থেকে নারীর ঋতুস্রাবকে জড়ানো হয়েছে শুধু অশুভ শক্তির সাথে। প্লাইনি লিখেছেন যে ঋতুমতী নারী ফসল নষ্ট করে, বাগান ধ্বংস করে, মৌমাছি মেরে ফেলে ইত্যাদি; এবং সে যদি মদ স্পর্শ করে, সেটা ভিনেগারে পরিণত হয়; দুধ পচে যায় ইত্যাদি। এক প্রাচীন ইংরেজ কবি এ-ধারণাকেই ছন্দে বেঁধেছিলেন :

হায়! ঋতুমতী নারী, এক শয়তান তুমি

যার থেকে আড়ালে রাখতে হবে সমগ্র প্রকৃতিভূমি!

এসব বিশ্বাস আজো টিকে আছে বেশ শক্তিশালীরূপেই। ১৮৭৮-এ ব্রিটিশ মেডিক্যল জর্নাল-এ ঘোষণা করা হয়েছিলো ‘এটা নিঃসন্দেহ যে ঋতুমতী নারীর ছোঁয়ায় মাংস পচে’, এবং নানা ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছিলো ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে। এ-শতকের শুরুতে একটি বিধানে উত্তর ফ্রান্সের শোধনাগারগুলোতে ‘অভিশাপ’গ্রস্ত নারীদের ঢোকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো, কেননা তাতে চিনি কালো হয়ে যায়। এসব ধারণা আজো গ্রামাঞ্চলে টিকে আছে, যেখানে প্রতিটি পাচক জানে যদি ধারে-কাছে কোনো ঋতুমতী নারী থাকে, তাহলে মেইয়ানেইজ ঠিক হবে না; অনেক গ্রাম্যলোক মনে করে সাইডার গাজিয়ে উঠবে না, অনেকে মনে করে শুয়োরমাংস নোনা করা যাবে না এবং এমন পরিস্থিতিতে তা নষ্ট হয়ে যাবে। হয়তো কিছু অস্পষ্ট বিবরণ আছে এসব বিশ্বাসের পেছনে; তবে এগুলোর গুরুত্ত্ব ও সর্বজনীনতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে এগুলো উদ্ভূত হয়েছে কেবল কুসংস্কার বা অতীন্দ্রিয় বিশ্বাস থেকে। রক্ত পবিত্র, তাই এখানে সাধারণভাবে রক্তের প্রতি প্রতিক্রিয়ার থেকে বেশি কিছু আছে। তবে ঋতুস্রাব বিশেষ অদ্ভুত জিনিশ, এটা নির্দেশ করে নারীর সারসত্তা। তাই এটা ক্ষতি করতে পারে নারীরই যদি অন্য কেউ এর অপব্যবহার করে। সি লেভি-স্ট্রাউসের মতে শাগোদের মধ্যে মেয়েদের সাবধান করে দেয়া হয় যাতে কেউ ঋতুস্রাবের কোনো চিহ্নও দেখতে না পায়; বিপদ এড়ানোর জন্যে পোশাক ইত্যাদি অবশ্যই মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়। লেভিটিকাস ঋতুস্রাবকে অভিন্ন করে দেখেছে গনোরিয়ার সাথে, এবং ভিগনি এ-অসুস্থতার সাথে জড়িত দেখেছেন অশুচিতা, যখন তিনি লিখেছেন : ‘নারী, অসুস্থ শিশু এবং বারো গুণ অশুচি’।

নারীর রক্তক্ষরণের চক্রটি সময়ের দিক দিয়ে বিস্ময়করভাবে সঙ্গতিপূর্ণ চাঁদের চক্রের সাথে; এবং এও মনে করা হয় যে চাঁদেরও আছে ভয়ঙ্কর সব চপলতা। নারী সে-ভীতিপ্রদ কৌশলের অংশ, যা গ্রহগুলোকে ও সূর্যকে চালায় তাদের পরিক্রমার পথে, নারী শিকার সে-মহাজাগতিক শক্তিরাশির, যা নিয়ন্ত্রণ করে নক্ষত্ররাশির নিয়তি ও জোয়ারভাটা, এবং পুরুষ ভোগে যার পীড়াদায়ক বিকিরণে। তবে মনে করা হয় যে ঋতুস্রাব বিশেষভাবে ক্রিয়া করে সে-জৈব বস্তুদের ওপর, যা আছে পদার্থ ও জীবনের মাঝামাঝি পথে : মাখন টকায়, মাংস নষ্ট করে, গাজায়, পচায়; এবং এটা রক্ত বলে নয়, বরং এজন্যে যে এটা উৎসারিত হয় যৌনপ্রত্যঙ্গ থেকে। এর যথাযথ কাজ বুঝতে পেরেও মানুষ বুঝেছে এটা জড়িত জীবন সৃষ্টির সাথে : ডিম্বাশয় সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলো প্রাচীন মানুষ, তারা ঋতুস্রাবে এমনকি দেখতে পেয়েছে শুক্রাণুর পরিপূরক। তবে এ-রক্ত নারীকে অশুচি করে না; এটা নারীর অশুচিতার চিহ্ন। এটা জড়িত প্রজননের সাথে, যেখানে ভ্রূণ বিকশিত হয়, সেখান থেকে বেরিয়ে আসে এ-রক্ত। নারীর উর্বরতা বহু পুরুষের মনে জাগায় যে-ভয়, তা প্রকাশ পায় ঋতুস্রাবের মাধ্যমে।

অতিশয় কঠোর ট্যাবুগুলোর একটি নিষিদ্ধ করে ঋতুমতী অশুচি নারীর সাথে সব ধরনের যৌনসম্পর্ক। অনেক সমাজে এ-নিষেধভঙ্গকারীদেরই বিশেষ সময়ের জন্যে গণ্য করা হয়েছে অশুচি বলে, বা তাদের বাধ্য করা হয়েছে কঠোর প্রায়শ্চিত্ত করতে; মনে করা হতো যে পুরুষের শক্তি ও প্রাণবন্ততা ধ্বংস হয়ে যাবে, কেননা এ-সময়ে নারী-নীতি থাকে তার চূড়ান্ত ক্ষমতায়। আরো অস্পষ্টভাবে, তার অধিকারে যে-নারী তার মধ্যে মায়ের ভীতিকর সারসত্তার মুখোমুখি হতে ঘেন্না বোধ করে পুরুষ; সে নারীত্বের এ-দু-বৈশিষ্ট্যকে বিশ্লিষ্ট করার জন্যে বদ্ধপরিকর। তাই অজাচার নিষিদ্ধ। করে বিধিবদ্ধ হয়েছে সর্বজনীন আইন, যার প্রকাশ ঘটেছে গোত্রের বহির্ভূত বিয়ের বিধানে বা আরো আধুনিক নানা রূপে; এজন্যেই পুরুষ নারীর থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায় যখন নারী বিশেষভাবে থাকে তার প্রজননগত ভূমিকায় : তার ঋতুস্রাবের সময়, তার গর্ভের সময়, তার স্তন্যদানের সময়। ইদিপাস গূঢ়ৈষা, যাকে নতুনভাবে বর্ণনা করা দরকার, এ-প্রবণতাকে অস্বীকার করে না, বরং এটাই জ্ঞাপন করে। নারী যতোখানি প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্বের অস্পষ্ট উৎসের ও অবোধ্য জৈববিকাশের, পুরুষ নারীর বিরুদ্ধে ততোখানি থাকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে।

মহাবিশ্ব ও দেবতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও আজো নারী এ-বেশেই তার গোষ্ঠিকে সামর্থ্য দেয় তাদের সাথে যোগাযোগ রাখার। নারী আজো বেদুইন ও ইরোকুইদের মধ্যে নিশ্চয়তা দেয় জমির উর্বরতার; প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যে নারী শুনতে পেতো পাতালের স্বর; সে বুঝতে পারতো বায়ু ও বৃক্ষের ভাষা; সে ছিলো পাইথিয়া, সিবিলে, দৈবজ্ঞা; মৃতরা ও দেবতারা কথা বলতো তার মুখ দিয়ে। সে আজো ধারণ করেভবিষ্যৎবক্তার ক্ষমতা : সে মাধ্যম, হস্তরেখা ও তাস পাঠক, অলোকদ্রষ্টা, অনুপ্রাণিত; সে স্বর শুনতে পায়, দেখতে পায় প্রেতচ্ছায়া। যখন পুরুষ আবার দরকার বোধ করে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনের ভেতরে মগ্ন হওয়ার যেমন অ্যান্টিউস তার শক্তি নবায়নের জন্যে স্পর্শ করেছিলো মাটি–তারা আবেদন জানায় নারীর কাছে। গ্রিস ও রোমের যুক্তিপরায়ণ সমগ্র সভ্যতা ভরে অস্তিত্বশীল ছিলো গূহ্যধর্ম তন্ত্রগুলো। ওগুলোছিলো সরকারিভাবে স্বীকৃত ধর্মগুলোর থেকে প্রান্তিক অবস্থানে; ওগুলো অবশেষে, যেমন এলুসিসে, রূপ নেয় রহস্যের। পুরুষদের দ্বারা পুনরায় বিজিত এক বিশ্বে দেখা দেয় এক পুরুষ দেবতা, দিউনিসুস, যে দখল করে নেয় ইশতারের, আস্তারতের বন্য ও ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা; তবু তার মূর্তি ঘিরে উন্মত্ত আনন্দোৎসবে যারা মেতে উঠতো, তারা ছিলো নারী : মিনাদ, থাইয়াদ, বাকুসানুসারীরা মানুষদের আমন্ত্রণ জানাতো পবিত্র পানোন্মত্ততায়, পবিত্র উন্মত্ততায়। ধর্মীয় বেশ্যাবৃত্তি পালন করতো একই ভূমিকা : এটা ছিলো উর্বরতার শক্তিগুলোকে একযোগে বন্ধনমুক্ত ও প্রবাহিত করে দেয়া। লৌকিক উৎসবগুলোতে আজো দেখা যায়কামের তীব্র বহিঃপ্রকাশ; এতে নারী শুধু প্রমোদের বস্তু হিশেবে উপস্থিত থাকে না, বরং থাকে হাইব্রিস, বন্যতার অবস্থা অর্জনের উপায়রূপে, যাতে ব্যক্তি অতিক্রম করে যায় তার নিজের সীমা। ‘সেই লুপ্ত, বিয়োগান্তক, “অন্ধকারী বিস্ময়”-এর কী ধারণ করে একটি মানুষ তার গভীর ভেতরে, তা শয্যা ছাড়া আবার কোথাও পাওয়া যাবে না,’ লিখেছেন জি বাতাইল।

কামে পুরুষ আলিঙ্গন করে প্রিয়াকে এবং নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায় মাংসের অপার রহস্যে। তবে আমরা দেখেছি যে, উল্টোভাবে, তার স্বাভাবিক কাম মাতাকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় স্ত্রী থেকে। সে জীবনের রহস্যময় রসায়নের প্রতি বোধ করে ঘৃণা, যদিও তার নিজের জীবনই লালিত ও প্রফুল্ল হয় মৃত্তিকার সুস্বাদু ফলে; সে এগুলো অধিকার করে নিতে চায় নিজের জন্যে; সে প্রবলভাবে কামনা করে সদ্য ঢেউ থেকে উঠে আসা ভেনাসকে। নারীকে স্ত্রী হিশেবে প্রথম প্রকাশ করা হয়েছিলো পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, যেহেতু পরম সৃষ্টিকর্তাই পুরুষ। মানবজাতির মাতা হওয়ার আগে হাওয়া ছিলো আদমের সঙ্গিনী; তাকে দান করা হয়েছিলো পুরুষের কাছে, যাতে পুরুষ তাকে অধিকার ও উর্বর করতে পারে, যেমন সে অধিকার ও উর্বর করে ভূমি; এবং তার মাধ্যমে পুরুষ সমগ্র প্রকৃতিকে করে তোলে নিজের রাজ্য। পুরুষ যৌন ক্রিয়ায় শুধু ব্যক্তিগত ও ক্ষিপ্র আনন্দ খোঁজে না। সে চায় জয় করতে, দখল করতে, অধিকার করতে; একটি নারী পাওয়া হচ্ছে তাকে জয় করা; লাঙলের ফাল যেমন বিদ্ধ করে হলরেখাকে তেমনি সে বিদ্ধ করে নারীকে; নারীকে সে নিজের করে নেয় যেমন সে নিজের করে নেয় নিজের কর্ষিত জমি; সে চাষ করে, রোপণ করে, বপন করে : এসব চিত্রকল্প সাহিত্যের মতোই প্রাচীন; প্রাচীন কাল থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত উদ্ধৃত করা যায় সহস্র উদাহরণ : ‘নারী ক্ষেত্রের মতো, এবং পুরুষ বীজের মতো,’ বলেছে মনুর বিধান। আঁদ্রে মাসোর একটি রেখাচিত্রে আছে কোদাল হাতে একটি পুরুষ, সে কোদাল দিয়ে কোপাচ্ছে একটি নারীর যোনিদ্বারের উদ্যান। নারী তার স্বামীর শিকার, তার বিষয়সম্পত্তি।

ভয় ও কামনার মাঝে, নিয়ন্ত্রণক অসম্ভব শক্তিরাশিকে অধিকারে রাখার ভয় ও সেগুলোকে জয় করার বাসনার মধ্যে পুরুষের দ্বিধা চমকপ্রদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কুমারীপুরাণে। পুরুষ একে এই ভয়পাচ্ছে, আবার এই কামনা করছে বা এমনকি দাবি করছে, কুমারী তাই নারীরহস্যের নিখুঁততম পূর্ণাঙ্গ রূপের প্রতীক; তাই সে এর সবচেয়ে পীড়াদায়ক এবং একই সময়ে সবচেয়ে সুখদ রূপ। তাকে ঘিরে ফেলেছে যে-শক্তিরাশি, পুরুষ সেগুলো দিয়ে অভিভূত হচ্ছে বলে বোধ করছে, না কি সে সগর্বে বিশ্বাস করছে সে এসব নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ, সে-অনুসারে সে তার স্ত্রীকে কুমারী রূপে পেতে অস্বীকার করে অথবা দাবি করে। আদিমতম সমাজে, যেখানে নারীর শক্তি অত্যন্ত বেশি, সেখানে ভয়ই নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষকে; তাই বিয়ের রাতের আগেই নারীটির কুমারীত্বমোচন করাই সঙ্গত। মার্কো পোলো তিব্বতিদের সম্বন্ধে বলেছেন ‘তাদের কেউই কুমারী মেয়ে বিয়ে করতে রাজি নয়’। এ-অস্বীকৃতিকে অনেক সময় ব্যাখ্যা করা হয়েছে যুক্তিসঙ্গত রীতিতে : কোনো পুরুষ এমন স্ত্রী চায় না যে এরই মাঝে পুরুষের কামনা জাগায়নি। আরব ভূগোলবিদ আল বাকরি স্লাভদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানিয়েছেন ‘যদি কোনো পুরুষ বিয়ের পর দেখতে পায় তার স্ত্রী কুমারী, তাহলে সে স্ত্রীকে বলে : “যদি তোমার কোনো রূপ থাকতো, তাহলে পুরুষেরা তোমার সাথে শৃঙ্গার করতো এবং কোনো একজন হরণ করতো তোমার কুমারীত্ব।” তারপর সে স্ত্রীকে বের করে দেয় ঘর থেকে এবং তাকে ত্যাগ করে’। এও দাবি করা হয়েছে যে কিছু আদিম জাতির পুরুষ শুধু সে-নারীকেই বিয়ে করতে চায় যে ইতিমধ্যেই মা হয়েছে, এভাবেই সে প্রমাণ দেয় নিজের উর্বরতার।

কিন্তু সতীত্বমোচনের পেছনের ব্যাপকভাবে প্রচলিত এসব প্রথার সত্যিকার প্রেষণাগুলো অতীন্দ্রিয়। কিছু জনগোষ্ঠি কল্পনা করে যে যোনির ভেতরে আছে সাপ, যেটি সতীচ্ছদ ছিন্ন করার সাথে সাথে দংশন করবে স্বামীকে; অনেক জাতি মনে করে কুমারীর রক্তে আছে ভীতিকর শক্তি, যা ঋতুস্রাবের সাথে সম্পর্কিত, তাই একইভাবে তা বিনাশ ঘটাতে পারে পুরুষের বলের। এসব চিত্রকল্পে প্রকাশিত হয় এ-ধারণাটি যে নারী-নীতি তখনই বেশি বলশালী, বেশি হুমকিদায়ক, যখন সেটি থাকে অক্ষত।

অনেক ক্ষেত্রে কুমারীত্বমোচনের প্রশ্নই ওঠে না; উদাহরণস্বরূপ, ম্যালিনোস্কির বর্ণিত ট্রোব্রিয়ান্ড দ্বীপবাসীদের মধ্যে, মেয়েরা কখনোই কুমারী নয়, কেননা শৈশব থেকেই সেখানে কামক্রীড়া অনুমোদিত। কোনো কোনো সংস্কৃতিতে মা, বড়ো বোন, বা কোনো মাতৃকা যথারীতি মোচন করে বালিকার সতীত্ব এবং তার শৈশব ভরে প্রসারিত করে চলে যোনিমুখ। আবার, বয়ঃসন্ধিকালে ছিন্ন করা যেতে পারে সতীচ্ছদ, সেখানে নারীটি ব্যবহার করতে পারে কাঠি, হাড়, বা পাথর, এবং একে মনে করতে পারে শল্যচিকিৎসা। অন্য কিছু গোত্রে বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েকে বাধ্য করা হয় এক বর্বর দীক্ষায় : পুরুষেরা তাকে টেনেহেঁচড়েনিয়ে গ্রামের বাইরে এবং ধর্ষণ করে বা কোনো বস্তু দিয়ে তার চ্ছদ ছিন্ন করে। একটি সাধরণ প্রথা হচ্ছে অচেনা পথিকদের কাছে কুমারী দান–হয়তো তারা মনে কর যে ওই অচেনা পথিকেরা মানার বিরূপতার বাইরে, ওই মানা প্রযোজ্য শুধু তাদের গোত্রের পুরুষদের ক্ষেত্রে, বা হয়তো অচেনা পথিকদের বিপদের প্রতি তারা উদাসীন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরোহিত, বা কবিরাজ, বা কাশিক বা গোত্রপতি সাধারণত বিয়ের আগের রাতে মোচন করে বধুর সতীত্ব। মালাবার উপকূলে এ-দায়িত্ব পালন করে ব্রাহ্মণেরা, যা তারা কোনো সুখভোগ ছাড়াই সম্পন্ন করে এবং এর জন্যে বেশ ভালো দক্ষিণা দাবি করে। এটা সুবিদিত যে সমস্ত পবিত্র বস্তুই সাধারণের জন্যে ভয়ঙ্কর, তবে পূতপবিত্র ব্যক্তিরা ঝুঁকি ছাড়াই এসব করতে পারে; তাই বোঝা যায় পুরোহিতেরা আর গোত্রপতিরা জয় করতে পারে সে-অমঙ্গলজনক শক্তিগুলো, যাদের ক্ষোভ থেকে রক্ষা করতে হবে স্বামীকে। রোমে এমন প্রথার লেশ হিশেবে টিকে ছিলো শুধু একটি প্রতীকী অনুষ্ঠান : একটি পাথুরে প্রিয়াপাসের লিঙ্গের ওপর বসানো হতো বধুকে, যেটি পূরণ করতো দুটি উদ্দেশ্য যে এটা বাড়াবে তার উর্বরতা এবং শোষণ করে নেবে। তার ভেতরের অতি শক্তিশালী এবং এ-কারণে অশুভ–তরল পদার্থ। স্বামী নিজেকে আরেক উপায়ে রক্ষা করতে পারে : সে নিজে সতীত্বমোচন করতে পারে কুমারীটির, তবে এটা ঘটতে হবে উৎসবের মধ্যে, যা সংকটের মুহূর্তে তাকে করে তোলে অবেধ্য; উদাহরণস্বরূপ, সমগ্র পল্লীবাসীর উপস্থিতিতে সে এ-কাজটি করতে পারে কোনো কাঠি বা হাড় দিয়ে। সামোয়ায়সে ব্যবহার করে শাদা কাপড়ে মুড়ে তার। আঙুল, যে-কাপড় ছিন্নভিন্ন করে বিতরণ করা হয় উপস্থিতদের মধ্যে। বা স্বামীকে অনুমতি দেয়া যেতে পারে স্বাভাবিক রীতিতে স্ত্রীর সতীত্বমোচনের, তবে যাতে প্রজননশীল জীবাণু সতীচ্ছদের রক্তে দূষিত না হয়, তাই সে তিন দিন স্ত্রীর ভেতরে বীর্যপাত করতে পারবে না।

এক ধরনের মূল্যবদলের ফলে কম আদিম সমাজে কুমারীর রক্ত হয়ে ওঠে শুভ প্রতীক। ফ্রান্সে এখনো আছে অনেক গ্রাম, যেখানে বিয়ের পর দিন ভোরে, আত্মীয়স্বজনদের সামনে প্রদর্শন করা হয়রক্তরঞ্জিত বিছানার চাদর। যা ঘটেছে, তা হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরুষ হয়ে উঠেছে তার নারীর প্রভু; এবং যে-শক্তিরাশি বন্যপশুতে বা অবিজিত বস্তুতে থাকলে হয়ে ওঠে ভীতিকর, সে-একই শক্তিরাশি সেই মালিকের কাছে হয়ে ওঠে মূল্যবান গুণাবলি, যে তাদের পোষ মানাতে পারে। বন্য ঘোড়ার অগ্নি থেকে, বজ্রপাত ও জলপ্রপাতের হিংস্রতা থেকে পুরুষ বের করেছে সম্পদশালী হওয়ার উপায়। এবং তাই সে নারীকে তার সমস্ত সম্পদসহ অক্ষতরূপে আনতে চায় নিজের মালিকানায়। সন্দেহ নেই মেয়েটির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যে-সতীত্ব, সেটা দাবি করতে বেশ ভূমিকা পালন করে যুক্তিপরায়ণ প্রেষণা : স্ত্রীর সতীত্বের মতোই বাগদত্তার নিস্পাপতা প্রয়োজনীয়, যাতে পিতা পরে এমন ঝুঁকিতে না পড়ে যে তার সম্পত্তি দিয়ে যেতে হয় অন্য কারো সন্তানকে। তবে যখন পুরুষ নিজের স্ত্রীকে গণ্য করে ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে, তখন কুমারীত্ব দাবি করা হয় আরো জরুরি কারণে। প্রথমে, মালিকানার ধারণাটিকে সব সময়ই সদর্থকরূপে বোধ করা অসম্ভব; সত্য হচ্ছে, কখনোই কারো থাকে না কোনো জিনিস বা ব্যক্তি; মানুষ মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে নঞর্থকভাবে। কোনো কিছু আমার এটা সবচেয়ে নিশ্চিতভাবে জ্ঞাপন করার উপায় হচ্ছে অন্যদের সেটি ব্যবহার করতে না দেয়া। এবং যা কখনোই অন্য পুরুষের অধিকারে ছিলো না, তার থেকে বেশি কাম্য বস্তু পুরুষের কাছে আর কিছু হতে পারে না : তখন ওই বিজয়কে মনে হয় এক অনন্য ও ধ্রুব ঘটনা। অনাবাদী জমি সব সময়ই মুগ্ধ করেছে অভিযাত্রীদের; প্রত্যেক বছরই নিহত হয় পর্বতারোহীরা, কেননা তারা চায় অস্পৃষ্ট কোনো শিখরের হানি ঘটাতে বা এ-কারণে যে তারা চায় এক পাশে একটি নতুন পথ তৈরি করতে; এবং উৎসুক মানুষেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নামার চেষ্টা করে মাটির তলদেশের অজানা গুহায়। মানুষেরা যেবস্তু এরই মাঝে ব্যবহার করেছে, সেটি হয়ে উঠেছে একটি হাতিয়ার; প্রাকৃতিক বন্ধন থেকে ছিন্ন হয়ে সেটি হারিয়ে ফেলে তার গভীরতম গুণাবলি : গণফোয়ারার জলের থেকে প্রবল জলধারার অদম্য প্রবাহের মধ্যে আছে অনেক বেশি প্রতিশ্রুতি।

কুমারীর শরীরে আছে গোপন ঝরনাধারার সজীবতা, না-ফোটা ফুলের প্রভাতি আভা, মুক্তোর প্রাচ্য দ্যুতি, যার ওপর কখনো সূর্যের রশ্মি পড়ে নি। কৃত্রিম গুহা, মন্দির, পুণ্যস্থান, গোপন উদ্যান–শিশুর মতো পুরুষও মুগ্ধ হয় বেড়া দেয়া ও ছায়াচ্ছন্ন স্থান দিয়ে, যা কোনো চেতনার দ্বারা সজীব হয়ে ওঠে নি, যা অপেক্ষায় আছে যে তাকে দেয়া হবে একটি আত্মা : পুরুষ যা একা গ্রহণ এবং বিদ্ধ করবে, সত্যিকারভাবে মনে হয় তা যেনো সে নিজেই সৃষ্টি করেছে। সব কামনার একটি লক্ষ্য হচ্ছে কাম্যবস্তুকে ব্যবহার করে নিঃশেষ করে ফেলা, যা বোঝায় তার ধ্বংস। যে বিদ্ধকরণের পর সতীচ্ছদ অক্ষত থাকে, তার থেকে সতীচ্ছদ ছিন্ন করে পুরুষ নারীদেহ অধিকার করে অনেক বেশি অন্তরঙ্গভাবে; সতীচ্ছদ ছিন্নকরণের উল্টোনোঅসম্ভব কাজটি সম্পন্ন করে পুরুষ দেহটিকে সুস্পষ্টভাবে পরিণত করে একটি অক্রিয় বস্তুতে, সে এটিকে করায়ত্ত করার ব্যাপারটিকে করে প্রতিষ্ঠিত। এভাবনাটি যথাযথভাবে প্রকাশিত হয়েছে সে-নাইটের উপকথায়, যে বহু বাধা পেরিয়ে এগিয়েছে কাঁটাভরা ঝোপের ভেতর দিয়ে এমন একটি গোলাপ তোলার জন্যে, যার সুগন্ধ আজো অনাঘ্রাত; সে শুধু সেটি পায়ই নি, সে ডাটা ভেঙেছে, এবং এভাবেই সে সেটিকে করেছে নিজের। চিত্রকল্পটি এতো স্পষ্ট যে সাধারণ ভাষায় কোনো নারীর কাছে থেকে তার ফুল ছিড়েনেয়া বোঝায় তার কুমারীত্ব নষ্ট করা; এবং এপ্রকাশরীতি থেকেই উদ্ভূত হয়েছে ‘ডিফ্লোরেশন’ (সতীত্বমোচন) শব্দটি।

তবে সাথে যৌবন থাকলেই শুধু থাকে কুমারীত্বের যৌনাবেদন; নইলে তার রহস্য আবার হয়ে ওঠে পীড়াদায়ক। আজকের অনেক পুরুষ অতিশয় প্রলম্বিত কুমারীত্বের উপস্থিতিতে বোধ করে যৌন দৃণা; এবং শুধু মনস্তাত্ত্বিক কারণেই ‘আইবুড়ো’রা সংকীর্ণমনা ও তিক্ত নারীতে পরিণত হয় না। অভিশাপটি আছে তাদের মাংসের ভেতরেই, যে-মাংস কোনো কর্তার কর্ম নয়, যা কোনো পুরুষের কামনার কাছে হয়েওঠে নি কাম্য, পুরুষের পৃথিবীতে একটুকু জায়গা না পেয়ে যা ফুটে ঝরে গেছে; তার ঠিক গন্তব্য থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যা হয়ে উঠেছে এক অদ্ভুতত্ব, হয়ে উঠেছে উন্মাদের প্রকাশঅসম্ভব চিন্তার মতোপীড়াদায়ক। চল্লিশ বছর বয়স্ক এক নারী, যে তখনো রূপসী, কিন্তু সম্ভবত কুমারী, তার সম্পর্কে আমি একটি পুরুষকে স্থূলভাবে বলতে শুনেছি : ‘এটার ভেতরটা নিশ্চয়ই মাকড়সার জালে ভরা’। এটা সত্য, যে-সব ভূগর্ভস্থ ঘর ও চিলেকোঠায় কেউ ঢোকে না, যেগুলোর ব্যবহার নেই, সেগুলো ভরে ওঠে অশোভন রহস্যে; সেগুলোতে হয়তো প্রেতেরা ঘুরে বেড়ায়; ছাড়াবাড়ি হয়ে ওঠে ভুতপ্রেতের আবাসস্থল। যদি নারীর কুমারীত্ব কোনো দেবতার কাছে উৎসর্গিত না হয়, তাহলে লোকেরা সহজেই বিশ্বাসকরে যে তার এক রকম বিয়ে হয়েছে শয়তানের সাথে। পুরুষের দ্বারা পরাভূত হয় নি যে-নারী, বৃদ্ধা নারীরা যারা মুক্ত থেকেছে পুরুষের অধীনতা থেকে, তাদের অতি সহজেই মনে করা হয় যাদুকরিণী; কারণ নারীর ভাগ্যই হচ্ছে সে কারো দাসত্বে থাকবে, যদি সে পুরুষের জোয়াল থেকে মুক্তি পায়, তাহলে তাকে প্রস্তুত থাকতে হয়শয়তানের জোয়াল মেনে নিতে।

সতীত্বমোচন ব্রতের মধ্য দিয়ে অশুভ প্রেতের কবল থেকে মুক্ত হয়ে বা তার কুমারীত্বের মধ্য দিয়ে শুদ্ধিলাভ করে, ঘটনা যাই হোক, নববধুকে মনে হয় এক অতিশয় কাম্য শিকার। তাকে আলিঙ্গন করে প্রেমিক লাভ করে জীবনের সমস্ত ঐশ্বর্য। সে পৃথিবীর সব প্রাণী, পৃথিবীর সব উদ্ভিদ; হরিণ ও হরিণী, পদ্ম ও গোলাপ, কোমল জাম, সুগন্ধি বেরি, সে মূল্যবান রত্ন, শুক্তিপুট, গন্ধর্বমণি, মুক্তো, রেশম, আকাশের নীল, ঝরনার সুস্নিগ্ধ জল, বায়ু, অগ্নিশিখা, ভূখণ্ড ও সমুদ্র। পুব ও পশ্চিমের কবিরা নারীর দেহকে রূপান্তরিত করেছেন পুষ্পে, ফলে, পাখিতে। এখানে আবার, প্রাচীন, মধ্য, এবং আধুনিক যুগের লেখা থেকে এতো উদ্ধৃতি দেয়া যায় যে তাতে একটি বিশাল সংকলন তৈরি হয়ে যাবে। কে না জানে পরমগীতের কথা? প্রেমিক তার প্রেমিকাকে বলছে :

কপোতের চোখের মতো তোমার চোখ…

তোমার কেশপাশ ছাগপালের মতো…

তোমার দন্তরাজি মেষপালের মতো ছাঁটা হয়েছে যাদের পশম…

তোমার গাল ডালিমের মতো…

তোমার স্তনযুগল দুটি হরিণশাবকের মতো…

তোমার জিভের নিচে আছে মধু ও দুধ…

রহস্যময় ১৭তে আঁদ্রে ব্রেতো আবার শুরু করেছেন শাশ্বত স্তুতিগীতি : ‘মেলুসিন দ্বিতীয় চিৎকারের সময় : সে হঠাৎ লাফিয়ে উঠেছে তার তন্বী নিতম্ব থেকে, তার পেট আগস্টের সমস্ত গম, বাঁকানোকোমর থেকে আতশবাজির মতো জ্বলে ওঠে তার কবন্ধ, চাতকের দুটি ডানার মতো ছাঁচে ঢালা হয়েছে যাদের; তার স্তনযুগল আরমিনের মতো…’

পুরুষ নারীর মধ্যে আবার দেখতে পায় উজ্জ্বল নক্ষত্র ও স্বপ্নাতুর চাঁদ, সূর্যের আলো, কৃত্রিম গুহার ছায়ানিবিড়তা; এবং, বিপরীতভাবে, ঝোপঝাড়ের বন্যফুল, উদ্যানের গর্বিত গোলাপ হচ্ছে নারী। বনদেবীরা, বনপরীরা, সাইরেনরা, পরীরা বিচরণ করে মাঠে ও বনভূমিতে, হ্রদে, সাগরে, পতিত জমিতে। পুরুষের মনের গভীর তলে এ-সর্বপ্রাণবাদ ছাড়া আর কিছু নেই। নাবিকের কাছে সমুদ্র নারী, বিপজ্জনক, বিশ্বাসঘাতক, জয় করা কঠিন, কিন্তু তাকে পরাভূত করার বাসনা পুরুষের প্রবল। যে পর্বতারোহী জীবন বিপন্ন করে জয় করতে চায় গর্বিত, দ্রোহী, কুমারী ও খল পর্বত, তার কাছে পর্বত হচ্ছে নারী। অনেক সময় বলা হয় এসব তুলনা প্রকাশ করে কামের উদ্গতিপ্রাপ্তি; তবে এগুলো প্রকাশ করে নারী ও মৌল উপাদানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ, যা কামের মতোই মৌলিক। নারী হচ্ছে সেই সুবিধাপ্রাপ্ত বস্তু, যার মাধ্যমে পুরুষ পরাভূত করে প্রকৃতিকে। তবে অন্যান্য বস্তুও এ-ভূমিকা পালন করতে পারে। কখনো কখনো পুরুষ বালকের দেহে আবার খুঁজে পেতে চায় বালুকাময় উপকূল, মখমল রাত্রি, মধুমতির সুগন্ধ। তবে যৌন বিদ্ধকরণ পৃথিবীকে দৈহিকভাবে অধিকার করার একমাত্র রীতি নয়। স্টেইনবেক তার টু এ গড আননৌন উপন্যাসে রূপায়িত করেছেন এক পুরুষকে, যে একটি শ্যাওলাধরা পাথরকে বেছে নিয়েছে তার ও প্রকৃতির মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিশেবে; কলেৎ শাৎ-এ বর্ণনা করেছেন এক তরুণ স্বামীকে, যার প্রেমের কেন্দ্র তার প্রিয় বেড়ালটি, কেননা এ-বন্য ও নিরীহ পশুটির মধ্য দিয়ে সে ধরতে পারে ইন্দ্রিয়কাতর বিশ্বকে, যা তার স্ত্রীর একান্ত মানবিক দেহ তাকে দিতে পারে না। অপর নারীর মতোই চমৎকারভাবে রূপ লাভ করতে পারে সমুদ্ররূপে, পর্বতরূপে। সমুদ্র ও পর্বত যদি হয় নারী, তাহলে নারীও তার প্রেমিকের কাছে সমুদ্র ও পর্বত।

তবে পুরুষ ও বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিশেবে এভাবে কাজ করার জন্যে এটা আকস্মিকভাবে দেয়া হয় নি যে-কোনো নারীকে; পুরুষ শুধু তার সঙ্গিনীর মাঝে তার পরিপূরক যৌনপ্রত্যঙ্গগুলোদেখে সন্তুষ্টি লাভ করে না, নারীকে অবশ্যই হতে হবে জীবনের বিস্ময়কর প্রস্ফুটনের প্রতিমূর্তি এবং একই সময়ে তাকে লুকিয়ে রাখতে হবে জীবনের অবোধ্য রহস্যগুলো। সব কিছুর আগে, তাই, তার থাকতে হবে যৌবন ও স্বাস্থ্য, কেননা পুরুষ যখন একটি জীবন্ত প্রাণীকে আলিঙ্গনে বাঁধে, সে শুধু তখনই তার মধ্যে পেতে পারে মোহিনীশক্তি যদি সে ভুলে যেতে পারে মৃত্যু বাসা বেঁধে আছে জীবনের মাঝে। এবং সে চায়আরো বেশি কিছু : চায় তার প্রেমিকা হবে সুন্দর। নারীসৌন্দর্যের আদর্শ রূপ পরিবর্তনশীল, তবে কিছু দাবি থাকে অপরিবর্তিত; নারীর নিয়তিই যেহেতু কারো মালিকানায় থাকা, তাই তার দেহের থাকতে হয়বস্তুর জড় ও অক্ৰিয় গুণ। কর্মের জন্যে শারীরিক যোগ্যতার মধ্যে থাকে পৌরুষদীপ্ত সৌন্দর্য, থাকে শক্তিতে, ক্ষিপ্রতায়, নমনীয়তায়; এটা হচ্ছে সে-সীমাতিক্ৰমণতার প্রকাশ, যা সপ্রাণ করে তোলে শরীরকে। নারীর আদর্শ রূপ প্রতিসম শুধু স্পার্টা, ফ্যাশিবাদী ইতালি, ও নাটশি জর্মনির মতো সমাজে, যেগুলো নারীকে তৈরি করে রাষ্ট্রের জন্যে, ব্যক্তির জন্যে নয়, তাকে একান্তভাবে গণ্য করে মাতারূপে এবং তাতে কামের কোনো স্থান নেই।

তবে নারীকে যখন সম্পত্তি হিশেবে দান করা হয় পুরুষের কাছে, তখন পুরুষ দাবি করে নারী হবে মাংসের জন্যে মাংসের প্রতীক। তার শরীরকে উপলব্ধি করা হয় না কোনো কর্ত-ব্যক্তিত্বের বিকিরণ হিশেবে, বরং গণ্য করা হয় আপন সীমাবদ্ধতায় গভীরভাবে বিলুপ্ত এক বস্তু হিশেবে; এমন শরীরের বিশ্বের সাথে কোনো অভিসম্বন্ধ থাকতে পারে না, এটা শুধু নিজের ছাড়া অন্য কিছুর প্রতিশ্রুতি হইতে পারে না : তাকে তৃপ্ত করতে হয় তার জাগানো কামনা। এ-প্রয়োজনীয়তার সবচেয়ে স্থূল রূপ হচ্ছে হটেনটটদের নিতম্বিনী ভেনাসের আদর্শ, কেননা শরীরের মধ্যে নিতম্বেই থাকে সবচেয়ে কম স্নায়ু, যেখানে মাংসকে মনে হয় উদ্দেশ্যহীন। প্রাচ্যদেশীয়দের স্থূলাঙ্গী নারী পছন্দ করাও একই প্রকৃতির; তারা ভালবাসে মেদের এ-নিরর্থক প্রবৃদ্ধি, যার কোনো পরিকল্পনা নেই, শুধু সেখানে থাকা ছাড়া যার আর কোনো অর্থ নেই। এমনকি সে-সব সভ্যতায় যেখানে কামবোধ অধিকতর সূক্ষ্ম, যেখানে পোষণ করা হয় গঠন ও সুষমা সম্পর্কে বিশেষ ধারণা, সেখানেও স্তন ও নিতম্ব থাকে পছন্দের বস্তুরূপে, তাদের অপ্রয়োজনীয়, বিনামূল্যে পাওয়াবিকাশের জন্যে।

পোশাকপরিচ্ছদ ও চালচলনকে অনেক সময় এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়, যাতে নারীদেহ বিচ্ছিন্ন হয় সক্রিয়তা থেকে : পা বাঁধা চিনদেশের নারীরা হাঁটতেই পারতো, হলিউডের তারকার মাজাঘষা নখ তাকে বঞ্চিত করে তার হাত থেকেই; উঁচু খুড়, কর্সেট, প্যানিয়ার, ফার্দিংগেল, ক্রিনোলিনের যতোটা কাজ ছিলো নারীশরীরের বাঁকগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা, তার চেয়ে বেশি ছিলো দেহকে সামর্থ্যহীন করেতোলা। নারীদেহ যখন মেদভারে নুজ হয়, বা এতে কৃশ হয় যে কাজের কোনো শক্তি থাকে না, অসহায় হয়ে ওঠে অসুবিধাজনক পরিচ্ছদ বা শোভনতা-শালীনতা দিয়ে-তখন নারীদেহকে পুরুষের মনে হয় নিজের সম্পত্তি, তার মাল। প্রসাধন ও অলঙ্কার আরো বাড়িয়ে তোলে মুখমণ্ডল ও শরীরের শিলীভবন। কারুকার্যখচিত বস্ত্রের ভূমিকা খুবই জটিল; কিছু আদিম সমাজে এর রয়েছে ধর্মীয় তাৎপর্য; তবে অধিকাংশ সময়এর লক্ষ্য হচ্ছে নারীকে কোনো মূর্তিতে রূপান্তরিত করা। দ্ব্যর্থবোধক মূর্তি! পুরুষ চায় যে নারী হবে শারীরিক, তার সৌন্দর্য হবে ফল ও ফুলের মতো; তবে সে তাকে আবার চায় নুড়ির মতো মসৃণ, শক্ত ও পরিবর্তনহীন।

নারী তার শরীর দিয়ে হয়ে ওঠে উদ্ভিদ, চিতাবাঘ, মাণিক্য, শুক্তি, আন্দোলিত পুষ্প, পশম, রত্ন, ঝিনুক, পালক; সে নিজেকে সুরভিত করে পদ্ম ও গোলাপের সুগন্ধ ছড়ানোর জন্যে। তবে পালক, রেশম, মুক্তো, ও সুগন্ধি অবশ্য তার মাংসের, গন্ধের পাশব স্থূলতাকে লুকিয়ে রাখার কাজ করে। সে তার মুখ ও চিবুক রঞ্জিত করে সেগুলোকে মুখোশের কঠিন স্থিরতা দেয়ার জন্যে; সে সুরমা ও মাসকারায় গভীরভাবে বন্দী করে তার দৃষ্টিকে, এটা তার চোখের বর্ণাঢ্য অলঙ্কারের থেকে বেশি কিছু নয়; বিনুনিত, কুঞ্চিত, বিন্যস্ত তার কেশপাশ হারিয়ে ফেলে উদ্বেগজাগানো উদ্ভিদ-ধর্মী রহস্য।

বস্ত্রপরিহিত ও অলঙ্কৃত নারীর মধ্যে প্রকৃতি উপস্থিত থাকে, তবে নিয়ন্ত্রিতভাবে, মানুষের ইচ্ছে দিয়ে তাকে ঢালাই করা হয় পুরুষের কামনা অনুসারে। কোনো নারীর মধ্যে প্রকৃতি যততবেশি বিকশিত ও বন্দী হয়, সে ততবেশি হয়ে ওঠে কামনার বস্তু : ‘পরিশীলিত’ নারীই সব সময় থেকেছে আদর্শ কামসামগ্রি। একটু বেশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পছন্দ করা অধিকাংশ সময়ই হচ্ছে পরিশীলনের এক আপাতসত্য রূপ। রেমি দ্য গরমো চেয়েছিলেন নারীদের চুল থাকবে এলানো, থাকবে স্রোতস্বিনীর ও প্রেইরির ঘাসের মতো ঢেউখেলানো। নারী যতো তরুণী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয় এবং তার নতুন ও দীপ্ত তনু যতবেশি চিরস্থায়ীসজীবতায় ভূষিত বলে মনে হয়, ছলাকলার প্রয়োজন হয় তার তত কম। পুরুষ যেহেতু ভয় পায় নারীর অনিশ্চিত নিয়তিকে, যেহেতু পুরুষ নারীকে দেখতে পছন্দ করে পরিবর্তনহীন, প্রয়োজনীয়রূপে, তাই পুরুষ নারীর মুখে, নারীর শরীরে, নারীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে দেখতে চায় এক আদর্শ রূপের যথাযথ প্রকাশ। আদিম জনগোষ্ঠির মধ্যে এ-আদর্শ হচ্ছে জনপ্রিয় প্রতিরূপের উৎকৃষ্ট রূপ : যে-জাতির ঠোট মোটা ও নাক বোঁচা তার ভেনাসও হয় মোটা ঠোঁটের ও বোচা নাকের; পরে আরো জটিল নান্দনিক বিধি প্রয়োগ করা হয়েছে নারীর ক্ষেত্রে। তারপর আমরা এসে পৌঁছি এক বিসঙ্গতিতে। পুরুষ নারীর মধ্যে প্রকৃতিকে লাভ করতে গিয়েতাকে বাধ্য করে ছলাকলাপূর্ণ হয়ে উঠতে। সে শুধু ফিসিস নয়, বরং সমপরিমাণে প্রতি-ফিসিস, এটা শুধু বৈদ্যুতিক ‘পার্ম’-এর, মোম দিয়ে অতিরিক্ত চুল তোলার, ল্যাটেক্স কোমরবন্ধের সভ্যতায়ই ঘটে না, ঘটে ওষ্ঠ-চাকতির নিগ্রোদের দেশে, চিনে এবং সারা পৃথিবীতে।

সুইফট তাঁর বিখ্যাত অৌড টু সেলিয়ায় নিন্দা করেছিলেন এ-রহস্যীকরণের; ঘেন্নার সাথে তিনি বর্ণনা করেছেন ছেনালের টুকিটাকি জিনিশপত্র এবং ঘেন্নার সাথে স্মরণ করেছেন তার দেহের পাশবিক প্রয়োজনগুলো। ক্রোধে তিনি দু-বার ভুল করেছেন; কেননা পুরুষ চায় নারী একই সাথে হবে পশু ও উদ্ভিদ এবং সে ঢাকা। থাকবে এক কৃত্রিম সম্মুখভাগের আড়ালে; পুরুষ দেখতে ভালোবাসে যে নারী উঠে আসছে সমুদ্র থেকে এবং বেরিয়ে আসছে ফ্যাশনসম্মত বস্ত্রনির্মাতার প্রতিষ্ঠান থেকে, নগ্ন ও বস্ত্রপরিহিত, তার বস্ত্রের নিচে নগ্ন–এভাবেই পুরুষ নারীকে পায় মানবমণ্ডলির বিশ্বে। নগরের পুরুষেরা নারীর ভেতরে খোঁজে পাশবিকতা; তবে সামরিক কাজে নিয়োজিত তরুণ চাষীর কাছে বেশ্যালয়ই হচ্ছে নগরের সমস্ত ইন্দ্রজালের প্রতিমূর্তি। নারী ক্ষেত্র ও চারণভূমি, তবে সে ব্যাবিলনও।

তবে এটাই নারীর প্রথম মিথ্যাচার, তার প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা : এটা জীবনেরই মিথ্যাচার–জীবন যদিও প্রকাশ করে অতিশয় আকর্ষণীয় গঠন, তবু জীবন সব সময়ই উপদ্রুত থাকে বয়স ও মৃত্যুর উত্তেজনা দিয়ে। পুরুষ যেভাবে ব্যবহার করে নারীকে, তাতেই নষ্ট হয় নারীর সবচেয়ে মূল্যবান শক্তিগুলো : গর্ভধারণে ভারাক্রান্ত হয়ে সে হারিয়ে ফেলে তার কামের আবেদন; এমনকি নারী বন্ধ্যা হলেও শুধু কালপ্রবাহই নষ্ট করে দেয় তার মনোহারিত্ব। ক্ষীণবল, সাদামাটা, বৃদ্ধ অবস্থায় নারী আকর্ষণহীন। গাছ সম্পর্কে যেমন বলা হয় তেমনি বলা যেতে পারে সে হয়ে গেছে বিবর্ণ, ম্রিয়মাণ। এটা ঠিক যে পুরুষের জরাগ্রস্ততাও ভীতিকর; তবে পুরুষ সাধারণত বৃদ্ধ পুরুষদের মাংসরূপে দেখে না। নারীর শরীরেই–যে-শরীর সৃষ্টি করা হয়েছে পুরুষেরই জন্যেশুধু পুরুষ মুখোমুখি হয় মাংসের অবনতির। বৃদ্ধা নারী, সাদামাটা নারী আকর্ষণহীন বস্তুই শুধু নয়, তারা জাগায় ভয়মিশ্রিত ঘৃণা। যখন নিঃশেষিত হয়ে যায় স্ত্রীর মনোহারিত্ব, তখন তাদের মধ্যে আবার দেখা দেয় মাতার উদ্বিগ্নকর মূর্তি।

তবুও স্ত্রী এক ভয়ঙ্কর শিকার। সমুদ্রের ঢেউ থেকে উঠে আসে ভেনাসের মধ্যেসজীব ফেনা, উজ্জ্বল ফসল তোলা বেঁচে থাকে দিমিতার; পুরুষ যখন নারীর কাছে থেকে পাওয়া বিনোদের মধ্য দিয়েঅধিকার করে নারীকে, তখন পুরুষ নারীর ভেতরে জাগিয়ে তোলে উর্বরতার সন্দেহজনক শক্তিকেও : যে-প্রত্যঙ্গটিকে সে বিদ্ধ করে, সেটি দিয়েই নারী জন্ম দেয় সন্তান। এ-কারণেই সব সমাজেই নানা ট্যাবু দিয়েপুরুষকে রক্ষা করা হয় স্ত্রীলিঙ্গের বিপদ থেকে। এর বিপরীতটি সত্য নয়, পুরুষের কাছে নারীর ভয় পাওয়ার কিছু নেই; পুরুষের লিঙ্গকে গণ্য করা হয় ইহজাগতিক, লৌকিক বলে। শিশ্নকে উন্নীত করা যেতে পারে দেবতার পর্যায়ে; কিন্তু তার পুজোর মধ্যে নেই ভয়ের কোনো উপাদান, এবং প্রাত্যহিক জীবনে নারীকে পুরুষের থেকে অতীন্দ্রিয়ভাবে রক্ষা করার দরকার পড়ে না, পুরুষ সব সময়ই শুভ। উল্লেখযোগ্য যে বহু মাতৃধারার সমাজে বিরাজ করে খুবই অবাধ যৌনতা; তবে এটা সত্য শুধু নারীর বাল্যকালে, তার কৈশোরে, যখন সঙ্গম প্রজননের ধারণার সাথে জড়িত থাকে না। ম্যালিনোস্কি কিছুটা বিস্ময়ের সাথেই বর্ণনা করেছেন যে তরুণতরুণী যারা অবাধে ঘুমোয় ‘অবিবাহিতদের গৃহ’-এ, তারা তাদের প্রেমলীলার কথা খোলাখুলি প্রকাশ করে দেয়; ঘটনা হচ্ছে তারা মনে করে অবিবাহিত মেয়ের গর্ভ হয় না, এবং তাই সঙ্গমকে মনে করা হয় নিতান্তই এক অনুত্তেজিত ঐহিক প্রমোদ বলে। কিন্তু যেই বিয়ে হয় নারীর, স্বামী প্রকাশ্যে স্ত্রীর প্রতি কোনো অনুরাগও প্রকাশ করতে পারে না, স্ত্রীকে তার ছোঁয়া নিষেধ; এবং নিজেদের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের প্রতি কোনো ইঙ্গিত হচ্ছে অধর্মাচরণ : নারী অংশীদার হয়ে উঠেছে মাতার ভীতিকর সারসত্তার, এবং সঙ্গম হয়ে উঠেছে এক পবিত্র কর্ম। তারপর থেকে এটা পরিবৃত থাকে নিষেধ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা দিয়ে। ভূমি চাষের, বীজ বোনার, চারা লাগানোর সময় সঙ্গম নিষিদ্ধ।

পুরুষের মধ্যে নারী যে-ভয় জাগায়, তা কি সাধারণভাবে কাম থেকে উদ্ভূত, না কি ভয় থেকে জাগে কাম, সেটা এক প্রশ্ন। উল্লেখযোগ্য যে, বিশেষ করে লেভিটিকাসে, স্বপ্নদোষকে গণ্য করা হয় দূষণ বলে, যদিও এর সাথে নারীর সম্পর্ক নেই। এবং আমাদের আধুনিক সমাজে হস্তমৈথুনকে সাধারণত মনে করা হয় বিপজ্জনক ও পাপ : অনেক কিশোর ও তরুণ, যারা এর প্রতি আসক্ত, তারা একাজটি করে ভয়াবহ আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে। সমাজের এবং বিশেষ করে পিতামাতার হস্তক্ষেপে একটি একান্ত সুখ হয়ে ওঠে পাপ; তবে একাধিক ছেলে স্বতস্ফূর্তভাবে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে তাদের বীর্যপাতে : রক্ত বা বীর্য, তার নিজের যে-কোনো পদার্থের নিঃসরণ তার কাছে মনে হয় উদ্বিগ্নকর। যা বেরিয়ে যাচ্ছে, তা হচ্ছে তার জীবন, তার মানা। তবে পুরুষ কোনো নারীর উপস্থিতি ছাড়াই ব্যক্তিগতভাবে যৌনাভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েগেলেও তার কামের মধ্যে বস্তুগতভাবে জ্ঞাপন করা হয় নারীকে : প্লাতো যেমন উভলিঙ্গদের উপকথায় বলেছেন, পুরুষের সংগঠন ইঙ্গিত করে নারীর সংগঠনের প্রতি। পুরুষ নিজের লিঙ্গ আবিষ্কার করতে গিয়েআবিষ্কার করে নারী, এমনকি নারী রক্তমাংসে এবং চিত্রে উপস্থিত না থাকলেও।

নারীর প্রতি পুরুষের অনুভূতির পরস্পরবিপরীত মূল্য আবার জেগে ওঠে নিজের কামপ্রত্যঙ্গের প্রতি তার মনে ভাবে : সে এর জন্যে গর্বিত, সে এটিকে উপহাস করে, এটির জন্যে লজ্জা পায়। ছোটো ছেলে তার শিশ্নের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে বন্ধুদের সাথে নামে প্রতিযোগিতায় : তার শিশ্নের প্রথম উত্থান তাকে একই সাথে ভরে দেয় গর্বে ও ভীতিতে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ তার শিশ্নকে গণ্য করে সীমাতিক্ৰমণতা ও শক্তির প্রতীকরূপে; এটা এক স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত পেশিরূপে এবং একই সময়ে একটি ঐন্দ্রজালিক উপহাররূপে তৃপ্ত করে তার অহমিকাকে : সে এটি দিয়ে মুগ্ধ থাকে, তবে তার মনে সন্দেহ জেগে থাকে যে সে প্রতারিত হতে পারে। যে প্রত্যঙ্গটি দিয়ে সে নিজেকে দৃঢ়ভাবে জ্ঞাপন করতে চায়, সেটি তার অনুগত নয়, অতৃপ্ত কামনায় ভারি হয়ে, আকস্মিকভাবে দাঁড়িয়ে, কখনো ঘুমের মধ্যে নিজেকে ভারমুক্ত করে, এটা প্রকাশ করে এক সন্দেহজনক ও খামখেয়ালভরা প্রাণশক্তি। পুরুষ চৈতন্যকে জয়ী করতে চায় জীবনের ওপর, সক্রিয়তাকে অক্রিয়তার ওপর; তার চেতনা প্রকৃতিকে রাখে দূরে, তার ইচ্ছে তাকে রূপ দান করে, কিন্তু তার কামপ্রত্যঙ্গে সে নিজেকে আবার অবরুদ্ধ দেখতে পায় জীবন, প্রকৃতি ও অক্রিয়তা দিয়ে।

‘কামপ্রত্যঙ্গগুলো,’ লিখেছেন শপেনহায়ার, ‘ইচ্ছেশক্তির প্রকৃত পীঠস্থান, যার বিপরীত মেরু হচ্ছে মস্তিষ্ক’। তিনি যাকে ‘ইচ্ছেশক্তি’ বলেছেন, তা হচ্ছে জীবনলগ্নতা, যা হচ্ছে দুঃখভোগ ও মৃত্যু, আর সেখানে ‘মস্তিষ্ক’ হচ্ছে চিন্তা, যা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁর মতে যৌন লজ্জা হচ্ছে সে-লজ্জা, যা আমরা বোধ করি শরীরের প্রতি আমাদের নির্বোধ মোহের ফলে। তার তত্ত্বগুলোর হতাশাবাদকে আমরা আপত্তিকর মনে করলেও, যে-বৈপরীত্য তিনি দেখেছেন, তা ঠিক : কাম বনাম মস্তিষ্ক, মানুষের দ্বৈততার প্রকাশ। কর্তা হিশেবে পুরুষ মুখোমুখি হয় বিশ্বের, এবং এ-বিশ্বের বাইরে অবস্থান করে সে নিজেকে করে তোলে এর শাসক; যদি সে নিজেকে দেখে মাংস হিশেবে, কাম হিশেবে, সে আর থাকে না স্বাধীন চেতনা, স্পষ্ট, স্বাধীন সত্তা : সে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায় বিশ্বের সাথে, হয়ে ওঠে এক সীমাবদ্ধ ও বিনাশী বস্তু। সন্দেহ নেই যে প্রজননের কর্ম অতিক্রম করে যায় দেহের সীমা, তবে সে-মুহূর্তেই এটা প্রতিষ্ঠিত করে সীমা। শিশ্ন, প্রজন্মদের পিতা, সঙ্গতিপূর্ণ মায়ের জরায়ুর সাথে; পুরুষ উদ্ভূত হয় একটি জীবাণু থেকে, যে-জীবাণু বাড়েনারীর দেহের ভেতরে, পুরুষ নিজেই আবার জীবাণুর বহনকারী, এবং যা দান করে জীবন, তা বপন করে পুরুষকে পরিত্যাগ করতে হয় তার নিজের জীবনকেই। ‘সন্তানদের জন্ম হচ্ছে,’ হেগেল বলেছেন, ‘পিতামাতার মৃত্যু’। বীর্যপাত হচ্ছে মৃত্যুর প্রতিশ্রুতি, এটা ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রজাতির দৃঢ় ঘোষণা; কামপ্রত্যঙ্গের অস্তিত্ব ও তার কর্মকাও অস্বীকার করে কর্তার গর্বিত বিশিষ্টতা। আত্মার বিরুদ্ধে জীবনের এ-প্রতিদ্বন্দ্বিতাই পুরুষাঙ্গটিকে লজ্জাজনক করে তোলে। পুরুষ যৌনাঙ্গ নিয়ে তখনই গৌরব বোধ করে যখন সে এটিকে মনে করে সীমাতিক্ৰমণ ও সক্রিয়তা, অপরকে অধিকার করার একটি হাতিয়ার; কিন্তু সে একে নিয়ে লজ্জা বোধ করে যখন সে এটিকে দেখে নিতান্ত অক্রিয় মাংসরূপে, যার মাধমে সে হয়ে ওঠে জীবনের অন্ধকার শক্তিরাশির খেলার সামগ্রি।

কিন্তু এখানেই সে বুঝতে পারে–শ্রেষ্ঠ প্রমাণের সাথে তার দৈহিক পরিস্থিতির দ্ব্যর্থবোধকতা। সে তার কামে ততোটাই গর্ব বোধ করে, এটা যতোখানি পরিমাণে অপরকে আত্মসাতের এক রকম উপায়–এবং মালিকানা লাভের এ-স্বপ্ন শেষ হয় শুধু হতাশায়। যথার্থ মালিকানায় অপর বিলুপ্ত হয়ে যায়, একে নিঃশেষ ও ধ্বংস করা হয় : যখন ভোর এসে হাজির হয় তার শয্যা থেকে রক্ষিতাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে, তখন শুধু আরব্যরজনীর সুলতানেরই আছে তার প্রত্যেক রক্ষিতার মাথা কাটার ক্ষমতা। নারী বেঁচে থাকে পুরুষের আলিঙ্গনের পরেও, এবং এ-ঘটনা দিয়েই সে মুক্তি পায় পুরুষের থেকে; যখনই পুরুষ শিথিল করে বাহু, তার শিকার আবার তার কাছে হয়ে ওঠে অচেনা; সেখানে সে পড়ে থাকে, নতুন, অক্ষত, একই স্বল্পস্থায়ী রীতিতে প্রস্তুত অন্য কোনো প্রেমিকের দ্বারা অধিকৃত হওয়ার জন্যে। পুরুষের এক স্বপ্ন হচ্ছে নারীটিকে এমনভাবে ‘ছাপ মেরে দেয়া,’ যাতে নারীটি চিরকাল তার হয়ে থাকে; তবে সবচেয়ে উদ্ধত পুরুষটিও ভালোভাবেই জানে সে নারীটির কাছে স্মৃতি ছাড়া আর কিছু রেখে যাবে না আর অতিশয় ব্যাকুল স্মৃর্তিচারণও সত্যিকারের, বর্তমান অনুভূতির তুলনায় ঠাণ্ডা। বিপুল পরিমাণ সাহিত্যে সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে এ-হতাশা। এটা নারীকে করেছে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু, তাকে বলা হয়েছে অস্থিরমতী এবং বিশ্বাসঘাতিনী, কেননা তার শরীরই এমন যে তা বিশেষ কোনো পুরুষের কাছে নয়, সাধারণভাবে সব পুরুষের কাছেই উৎসর্গিত হতে পারে।

তবে তার দ্রোহিতা আরো বেশি বিশ্বাসঘাতক : সত্য বলতে কী নারী তার প্রেমিককে পরিণত করে নিজের শিকারে। শুধু একটি দেহই স্পর্শ করতে পারে অন্য একটি দেহকে; পুরুষ তার কাম্য মাংসের প্রভু হয়ে ওঠে শুধু নিজে মাংসে পরিণত হয়ে; হাওয়াকে দেয়া হয়েছিলো আদমের কাছে, যাতে হাওয়ার মাধ্যমে আদম অর্জন করতে পারে তার সীমাতিক্ৰমণতা, এবং হাওয়া আদমকে টেনে নেয় সীমাবদ্ধতার রাত্রির ভেতরে। তার রক্ষিতা, প্রমোদের মাথাঘোরানোর মধ্যে, তাকে আবার বন্দী করে সে-অন্ধকার গর্ভের অনচ্ছ কাদামাটিতে, যা মা তৈরি করেছে তার পুত্রের জন্যে এবং যেখান থেকে সে চায় মুক্তি পেতে। পুরুষ চায় নারীকে অধিকার করতে; সে নিজেই হয় অধিকৃত! গন্ধ, আর্দ্রতা, ক্লান্তি, নির্বেদ–এক গ্রন্থাগারভর্তি বইয়ে বর্ণনা করা হয়েছে মাংসে পরিণত হওয়া চেতনার এ-বিষাদাচ্ছন্ন সংরাগ।

ধারাবাহিক উপন্যাসের অতিব্যবহৃত শব্দভাণ্ডার নারীকে বর্ণনা করেছে অভিচারিণী, সমোহনকারিণী রূপে, যারা পুরুষকে মুগ্ধ করে তার ওপর ছড়িয়ে দেয় সম্মোহন, এবর্ণনায় প্রতিফলিত হয় সবচেয়েপুরোনো ও সর্বজনীন কিংবদন্তিগুলো। নারী উৎসর্গিত যাদুর কাছে। আলাইন বলেছেন যে যাদু হচ্ছে কন্তর মাঝে বেঁকে ভেঙে পড়া প্রেত; কোনো কাজ তখনই ঐন্দ্রজালিক, যখন তা কোনো সংঘটক দ্বারা উৎপন্ন না হয়ে বয়ে আসে অক্রিয় কিছু থেকে। পুরোহিত ও যাদুকরের মধ্যে পার্থক্য সুবিদিত : প্রথমজন দেবতাদের ও বিধান অনুসারে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে শক্তিরাশিকে, সকলের কল্যাণের জন্যে, দলের সব সদস্যের নামে; যাদুকর কাজ করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, দেবতাদের ও বিধানের বিরুদ্ধে, তার নিজের গভীর আগ্রহ অনুসারে। এখন, পুরুষের বিশ্বে নারী সম্পূর্ণরূপে সংহতি লাভ করে নি; অপররূপে, সে তাদের বিরোধী পক্ষ। এটা তার পক্ষে স্বাভাবিক যে তার শক্তিগুলো সে প্রয়োগ করবে, সে বিস্তৃত হবে না পুরুষের সমাজে এবং ভবিষ্যৎ সীমাতিক্ৰমণতার শীতল উদ্যোগের মধ্যে, কিন্তু, যেহেতু সে বিচ্ছিন্ন, বিরোধী, সে পুরুষদের টেনে নেবে বিচ্ছিন্নতার নিঃসঙ্গতায়, সীমাবদ্ধতার তমসায়। নারী হচ্ছে সাইরেন, যার গানে প্রলুব্ধ নাবিকেরা আছড়ে পড়ে শিলার ওপর; সে সির্সে, যে তার প্রেমিকদের রূপান্তরিত করে পশুতে, সে আনডাইন, যে জেলেদের টেনে নেয় খাড়ির গভীরে। নারীর রূপে মুগ্ধ হওয়ার পর পুরুষের আর থাকে না ইচ্ছেশক্তি, কর্মোদ্যোগ, ভবিষ্যৎ; সে আর নাগরিক খাচ্ছে না, হয়ে ওঠে। মাংসের কামনার কাছে দাসত্বে বন্দী মাংস, গোষ্ঠি থেকে বিচ্ছি, সুহুর্তের কাছে বন্দী, পীড়ন ও প্রমোদের মধ্যে অক্রিয়ভাবে আন্দোলিত।

এ-মাংসের নাটকের কোন দিকের ওপর পুরুষ গুরুত্ব দিচ্ছে, সে-অনুসারে পুরুষের থাকতে পারে বহু মনোভাব। যদি কোন পুরুষ জীবনকে অনন্য মনে না করে, যদি সে তার বিশেষ নিয়তি নিয়ে উদ্বিগ্ন না থাকে, যদি সে মৃত্যুকে ভয় না পায়, তাহলে সে আনন্দের সাথে মেনে নেয় তার পাশবিকতা। সমাজের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যে মুসলমানদের মধ্যে নারীকে ধ্বংস করা হয় অতি শোচনীয় অবস্থায়; ওই সমাজ পরিবারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কাছে আবেদনের অনুমতি দেয় না, এবং ধর্মের কারণে, যে-ধর্ম প্রকাশ করে সভ্যতার যুদ্ধপরায়ণ ভাবাদর্শ, পুরুষকে সরাসরি উৎসর্গ করা হয়েছে মৃত্যুর কাছে এবং নারীকে বঞ্চিত করেছে তার যাদু থেকে। কীসের সে ভয় করবে পৃথিবীতে যে তৈরি হয়ে আছে যে-কোনো মুহূর্তে মুহম্মদীয় স্বর্গের ইন্দ্রিয়পরায়ণ প্রমোদে লিপ্ত হওয়ার জন্যে? এমন ক্ষেত্রে পুরুষ নিজের বা নারীর থেকে আত্মরক্ষার কোনো দরকার ছাড়াই শান্তভাবে উপভোগ করতে পারে নারী। আরব্যরজনীর গল্পগুলো নারীকে উপস্থাপিত করে সুখকর প্রমোদের উৎসরূপে, যেমন উৎস ফল, মোরব্বা, সুস্বাদু পিঠা, ও সুগন্ধি তেল। আজকাল আমরা ওই ইন্দ্রিয়ভারাতুরতা দেখতে পাই ভূমধ্যসাগরীয় জনগণের মধ্যে। ইন সিসিলিতে ভিত্তোরিনি বলেছেন সাত বছর বয়সে প্রশান্ত বিস্ময়ে তিনি দেখেছিলেন এক নারীর নগ্ন দেহ। গ্রিস ও রোমের যুক্তিশীল চিন্তাধারা সমর্থন করে এ-সহজিয়া মনোভাব। তবে যুক্তিশীলতা কখনোই সম্পূর্ণরূপে জয় লাভ করে নি এবং এসব সভ্যতায় কামের অভিজ্ঞতাগুলো রক্ষা করেছে তাদের পরস্পরবিপরীত মূল্যসম্পন্ন চরিত্র : আচারানুষ্ঠান, পুরাণ, সাহিত্য এসবের প্রমাণ। তবে নারীর প্রতি আকর্ষণ ও বিপদ প্রকাশ পেয়েছে দুর্বলতর রূপে।

খ্রিস্টধর্ম আবার নারীকে ভরে তোলে ভীতিকর মর্যাদায় : পুরুষের অস্বস্তিপূর্ণ বিবেকের তীব্র যন্ত্রণা রূপ নেয় অন্য লিঙ্গের প্রতি ভীতি রূপে। একজন খ্রিস্টান নিজের ভেতরে দ্বিধাবিভক্ত; দেহ ও আত্মার, জীবন ও চৈতন্যের স্বাতন্ত্র্য এখানে সম্পূর্ণ; আদিপাপ দেহকে করেছে আত্মার শত্রু; মাংসের সমস্ত বন্ধনকে মনে হয় অশুভ। শুধু খ্রিস্টের দ্বারা ত্রাণ লাভ করে এবং স্বর্গরাজ্যের দিকে চালিত হয়েই রক্ষা পেতে পারে মানুষ; তবে মূলত মানুষ হচ্ছে দূষণ; তার জন্ম তাকে শুধু মৃত্যুদণ্ডিত করে না, নরকদণ্ডিতও করে; শুধু স্বর্গীয় করুণায়ই তার সামনে উন্মুক্ত হতে পারে স্বর্গ, তবে তার পার্থিব অস্তিত্বের সব রূপের ওপরই রয়েছে একটা অভিশাপ। অশুভ হচ্ছে এক ধ্রুব বাস্তবতা; আর দেহ হচ্ছে পাপ। নারী যেহেতু সব সময়ই অপর, তাই এটা বিশ্বাস করা হয় না যে পুরুষ ও নারী উভয়ই পরস্পরের কাছে দেহ : খ্রিস্টানের কাছে দেহ হচ্ছে সেই বৈরী অপর, যা সব সময়ই নারী। খ্রিস্টানের কাছে নারীর মধ্যে রূপ ধারণ করেছে বিশ্বের, মাংসের, ও শয়তানের প্রলোভন। গির্জার সব পিতাই এধারণার ওপর জোর দেন যে নারীই আদমকে প্রলুব্ধ করেছে পাপে। আমাদের আবার উদ্ধৃত করতে হবে তারতুলিয়ানকে : ‘নারী! তুমি শয়তানের প্রবেশদ্বার। তাকে তুমি প্ররোচিত করেছিলে, যাকে শয়তানও সরাসরি আক্রমণের সাহস করে নি। তোমার জন্যেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে ঈশ্বরের পুত্রকে। তুমি সব সময় থাকবে শোকে ও ছিন্নবস্ত্রে’। সমগ্র খ্রিস্টান সাহিত্যের প্রয়াস হচ্ছে নারীর প্রতি পুরুষের ঘৃণা বাড়ানো। তারতুলিয়ান নারীর সংজ্ঞা দিয়েছেন ‘পয়ঃপ্রণালির ওপর নির্মিত মন্দির’রূপে। সেইন্ট অগাস্টিন বিভীষিকার সাথে কামের ও মলমূত্র ত্যাগের প্রত্যঙ্গগুলোর মেশামেশির দিকে আকর্ষণ করেছেন দৃষ্টি : ‘আমরা জন্ম নিই মলও মূত্রের মধ্যে’। নারীশরীরের প্রতি খ্রিস্টধর্মের বিরূপতা এতো যে যখন এটি তার ঈশ্বরকে ধ্বংস করতে চায় এক কলঙ্কজনক মৃত্যুতে, তখন এটি তাকে অব্যাহতি দেয় জন্ম নেয়ার কালিমা থেকে : প্রাচ্য গির্জার এফিসুসের পরিষদ এবং পাশ্চাত্য গির্জার ল্যাটেরান পরিষদ ঘোষণা করেছে যে খ্রিস্টের জন্ম হয়েছে কুমারী মায়ের গর্ভে। গির্জার আদিপিতারা–অরিগেন, তারতুলিয়ান, ও জেরোমে-মনে করেছিলেন অন্যান্য নারীর মতো মেরিও প্রসব করেছিলো রক্ত ও ময়লার মধ্যেই; কিন্তু সেইন্ট অ্যামব্রোজ ও সেইন্ট অগাস্টিনের মতামতই জয়লাভ করে। কুমারীর দেহ থেকেছিলো রুদ্ধ। মধ্যযুগ থেকেই শরীর থাকা, নারীর বেলা, গণ্য হয়ে এসেছে কলঙ্ক বলে। এমনকি বিজ্ঞানও দীর্ঘকাল বিহ্বল ছিলো এ-ঘৃণায়। লিনাউস তার প্রকৃতি বিষয়ক সন্দর্তে ‘ঘৃণ্য’ বলে নারীর যৌনপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আলোচনা এড়িয়ে যান। ফরাশি চিকিৎসক দ্য লরে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন এ-মর্মপীড়াদায়ক প্রশ্নটি : ‘এ-স্বর্গীয় প্রাণীটি, যে পরিপূর্ণ যুক্তিশীলতা ও বিচারবুদ্ধিতে, যাকে আমরা বলি পুরুষ, সে কী করে আকৃষ্ট হয় নারীর ওইসব অশ্লীল প্রত্যঙ্গের প্রতি, যা নোংরা হয়ে থাকে তরল পদার্থে এবং লজ্জাকরভাবে অবস্থিত ধড়ের নিম্নতম অংশে?’

আজকাল খ্রিস্টীয় চিন্তাধারার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় আরো নানা প্রভাব; এবং এর রয়েছে নানা বৈশিষ্ট্য। তবে, পিউরিটান জগতে, শরীরের প্রতি ঘৃণা সমানভাবে বিরাজ করছে; এর প্রকাশ ঘটেছে, উদাহরণস্বরূপ, ফকনারের লাইট ইন আগস্ট-এ; নায়কের প্রথম দিকের যৌন অভিজ্ঞতাগুলো ভয়ঙ্করভাবে আতঙ্কজনক। সাহিত্য ভরেই এটা দেখানো খুবই সাধারণ ঘটনা যে এক তরুণ প্রথম সঙ্গমের পর এভোই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যে তার বিবমিষা জাগে; এবং বাস্তবে যদিও এমন প্রতিক্রিয়া খুবই দুর্লভ, তবু এটা যে এতো ঘনঘন বর্ণনা করা হয়, তা কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। বিশেষ করে অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশগুলোতে, যেগুলো পিউরিটানবাদে বিশেষভাবে সিক্ত, অধিকাংশ তরুণ ও বহু পুরুষের মধ্যে নারী জাগিয়ে তোলে ভয়, যা কমবেশি খোলাখুলি স্বীকার করা হয়। এ-অনুভূতিটা বেশ তীব্রভাবে বিরাজ করে ফ্রান্সে। মিশেল লিরি আজ দঅম-এ লিখেছেন : ‘আজকাল আমি নারীর প্রত্যঙ্গটিকে মনে করি একটি ঘিনঘিনে জিনিশ বা একটা ঘা, কিন্তু এর জন্যে এটা কম আকর্ষণীয় নয়, তবে অন্য সব রক্তাক্ত, শ্লেষ্মল,রোগাক্রান্ত বস্তুর মতোই এটা ভয়ঙ্কর’। একটি সাধারণ বিশ্বাস হচ্ছে সঙ্গমের ফলে পুরুষ হারিয়ে ফেলে তার পেশিশক্তি ও চিন্তাশক্তি, তার ফসফরাস নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং নির্জীব হয়ে পড়ে তার অনুভূতি। এটা সত্য যে হস্তমৈথুনও নির্দেশ করে এসব বিপদ, এবং নৈতিক কারণে সমাজ একে স্বাভাবিক যৌনকর্মের থেকে আরো বেশি ক্ষতিকর মনে করে। কামের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা হচ্ছে বৈধ বিবাহ ও সন্তানকামনা। নারী হচ্ছে ভ্যাম্পায়ার, সে পুরুষ খায় ও পান করে; তার যৌনাঙ্গ বেঁচে থাকে পুরুষের যৌনাঙ্গ খেয়ে খেয়ে। কিছু মনোবিশ্লেষক চেষ্টা করেছেন এসব অলীক কল্পনার বৈজ্ঞানিক প্রমাণযোগানোর, তারা প্রস্তাব করেছেন সঙ্গমে নারী যে-সুখ পায়, তা হয়তো আসে এ-ব্যাপার থেকে যে নারী পুরুষটিকে প্রতীকীরূপে খোজা করে এবং অধিকার করে নেয় শিশ্নটি। তবে মনে হয় মনোবিশ্লেষণ করা দরকার এসব তত্ত্বেরই, এবং এটা সম্ভবপর এসব তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন যে-সব চিকিৎসক, তাঁরা হয়তো লিপ্ত তাদের পূর্বপুরুষের ভীতি প্রক্ষেপণে।

পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে গভীরভাবে পোষ মানানো হয়েছিলো নারীর যাদুকে। তার ভেতরে আছে যে-মহাজাগতিক শক্তিগুলো, নারী সেগুলোকে অঙ্গীভূত করার সুযোগ দেয় সমাজকে। দুমিজেল তাঁর মিত্র-বরুণ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যেমন রোমে তেমনি ভারতে পৌরুষ দেখানোর দুটি রীতি রয়েছে : প্রথমত, বরুণ ও রোমুলুসে, গন্ধর্বদের ও লুপারর্কির মধ্যে, এ-শক্তি হচ্ছে আক্রমণ, ধর্ষণ, বিশৃঙ্খলা, কাণ্ডজ্ঞানহীন হিংস্রতা; এতে নারী দেখা দেয় এমন সত্তারূপে, যাকে করতে হবে ধর্ষণ, বলাৎকার ধর্ষিতা সেবিন নারীদের, যারা স্পষ্টত ছিলো বন্ধ্যা, মারা হয়েছিলো বৃষের চামড়ায় তৈরি চাবুক; এটা করা হয়েছিলো অধিকতর হিংস্রতা দিয়ে অতিশয় হিংস্রতার ক্ষতিপূরণের জন্যে। তবে, দ্বিতীয়ত এবং এর বিপরীতে, মিত্র, নুমা, ব্রাহ্মণরা, ও পুরোহিতেরা ছিলো নগরের আইনশৃঙ্খলার পক্ষে : এক্ষেত্রে নারীকে বিয়ের বিস্তৃত আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ করা হয় স্বামীর সাথে, এবং তার সাথে কাজ করতে গিয়ে নারী তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় প্রকৃতির সব নারীশক্তিকে অধীনস্থ করার; রোমে স্ত্রীর মৃত্যু হলে জুপিটারের পুরোহিত ত্যাগ করতে নিজের পদ। একইভাবে মিশরে আইসিস দেবী মহামাতার পরম ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পরও থাকে মহানুভব, সুস্মিত, দয়াবতী, ও শুভ, ওসিরিসের জাকজমকপূর্ণ স্ত্রী। কিন্তু নারী যখন পুরুষের সঙ্গী, পরিপূরক, তার ‘অর্ধাঙ্গিনী’, তখন দরকারবশতই নারীর থাকে এক সচেতন অহং, একটি আত্মা। পুরুষ এতো অন্তরঙ্গভাবে এমন কোনো প্রাণীর ওপর নির্ভর করতে পারে না, যে তার সাথে মানুষের সারসত্তার অংশী নয়। আমরা আগেই দেখেছি যে মনুর বিধান বৈধ স্ত্রীকে দিয়েছে স্বামীর সাথে একই স্বর্গের প্রতিশ্রুতি।

খ্রিস্টধর্ম, স্ববিরোধীরূপে, বিশেষ এক স্তরে ঘোষণা করেছে পুরুষ ও নারীর সাম্য। নারীর মধ্যে খ্রিস্টধর্ম ঘৃণা করে দেহ; নারী যদি দেহ অস্বীকার করে, তাহলে সে ঈশ্বরের জীব, ত্রাতা যাকে পাপমুক্ত করেছে, তখন সে পুরুষের থেকে কম নয় : নারী তখন আসন পায় পুরুষের পাশে, স্বর্গের সুখের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে যারা, সে-সব পুণ্যাত্মার মধ্যে। পুরুষ ও নারী উভয়ই বিধাতার দাস, অনেকটা দেবদূতদের মতো অলৈঙ্গিক, এবং একত্রে তারা বিধাতার করুণায় মুক্ত থাকে পার্থিব প্রলোভন থেকে। নারী যদি সম্মত হয় তার পাশবিকতাকে অস্বীকার করতে, তাহলে নারী, যে পাপের প্রতিমূর্তি, সেও তখন হয়ে ওঠে যারা পাপকে জয় করেছে, সেই মনোনীতদের বিজয়ের উজ্জ্বলতম প্রতিমূর্তি। অবশ্য সে-স্বর্গীয় ত্রাতা, যে পাপমুক্ত করে মানুষকে, সে পুরুষ। খ্রিস্ট বিধাতা; কিন্তু মানবমণ্ডলির ওপর রাজত্ব করে এক নারী, কুমারী মেরি। তবে কিছু প্রান্তিক ধর্মগোত্রই নারীর মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছে মহাদেবীর প্রাচীন সুযোগসুবিধা ও ক্ষমতা–গির্জা ধারণ ও সেবা করে এক পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার, যাতে পুরুষের উপাঙ্গ হিশেবে থাকাই নারীর জন্যে মানানসই ও বিধেয়। পুরুষের বাধ্য দাসীরূপেই সে হতে পারে আশীর্বাদপ্রাপ্ত সেইন্ট। এভাবে মধ্যযুগের অন্তরে জেগে ওঠে পুরুষের জন্যে শুভ নারীর এক অতিশয় সংস্কৃত ভাবমূর্তি। গৌরবে মণ্ডিত হয়খ্রিস্টের মাতার সুপ্রসন্ন মুখভাব। সে হচ্ছে পাপীয়সী হাওয়ার বিপরীত দিক; সে পায়ের নিচে পিষ্ট করে সাপটিকে; সে পাপমুক্তির মধ্যস্থতাকারিণী, যেমন হাওয়া ছিলো নরকদণ্ডের।

মাতারূপেই ভীতিকর ছিলো নারী; তাই মাতার মধ্যেই তাকে মহিমান্বিত করতে হবে ও পরিণত করতে হবে দাসীতে। সবার ওপরে মেরির কুমারীত্বের আছে এক নঞর্থক মূল্য : এটা যে যেটির মাধ্যমে মাংসকে পাপমুক্তি দেয়া হয়েছে, সেটি দৈহিক নয়; এটিকে স্পর্শ বা অধিকার করা হয় নি। একইভাবে এশীয় মহামাতারও কোনো স্বামী ছিলো না : সে সৃষ্টি করেছিলো বিশ্ব এবং নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাজত্ব করেছিলোএর ওপর; সে তার চপলতায় উচ্ছৃঙ্খল হতে পারে, কিন্তু মহামাতারূপে কোনো স্ত্রীধর্মী আনুগত্য দিয়ে তার মহিমার লাঘব ঘটে নি। একইভাবে মেরির গায়েও লাগে নি কামের দাগ। রণলিপ্সু মিনার্ভার মতো সে একটি গজদন্ত মিনার, নগরদুর্গ, অজেয় প্রধান দুর্গমিনার। প্রাচীন কালের যাজিকারাও, অধিকাংশ খ্রিস্টীয় সেইন্টের মতো, ছিলো কুমারী : শুভর কাছে উৎসর্গিত নারী উৎসর্গিত হতে হবে তার অক্ষত শক্তিরমহিমার মধ্যে; তাকে সংরক্ষিত রাখতে হবে তার নারীত্বের সারসত্তা, তার অপরাজিত সংহতির মধ্যে। স্ত্রী হিশেবে মেরির মর্যাদা যদি অস্বীকার করা হয়, সেটা করা হয়েছে এ-লক্ষ্যে যে তার মধ্যে বিশুদ্ধতররূপে উন্নীত করতে হবে নারী মাতাকে। কিন্তু সে গৌরব পাবে তার জন্যে নির্ধারিত অধস্তন ভূমিকা গ্রহণ করে। ‘আমি প্রভুর দাসী’। মানুষের ইতিহাসে এই প্রথম মাতা নতজানু হয় তার পুত্রের কাছে; সে তার নিকৃষ্টতা মেনে নেয় সহজে। পুরুষের এটা চরম বিজয়, যা চরিতার্থ হয়েছে কুমারীতন্ত্রে–এটা নারীর পরাজয় সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে নারীর পুনর্বাসন। ইশতার, আস্তারতে, সিবিলে ছিলো নিষ্ঠুর, খামখেয়ালপূর্ণ, কামনাপরায়ণ; তারা ছিলো ক্ষমতাশালী। তারা যেমন ছিলো মৃত্যুর তেমনি জীবনের উৎস, পুরুষ জন্ম দিয়ে তারা পুরুষকে করেছিলো নিজেদের দাস। খ্রিস্টধর্মে জীবন ও মৃত্যু শুধু ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল, এবং পুরুষ একবার মায়ের দেহ থেকে বেরিয়ে চিরকালের জন্যে মুক্তি পেয়ে গেছে দেহ থেকে; মা এখন অপেক্ষায় আছে শুধু তার অস্থিমালার। প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ হিশেবে মাতৃত্ব আর নারীকে কোনো ক্ষমতা দান করে না। তাই নারী যদি তার আদিদোষ থেকে উদ্ধার চায়, তাহলে তার জন্যে আছে শুধু বিধাতার ইচ্ছের কাছে মাথা নত করা, যা তাকে অধীনস্থ করে পুরুষের। এবং এ-বশ্যতাস্বীকারের মধ্য দিয়েই সে পুরুষের পুরাণে পেতে পারে একটি নতুন ভূমিকা। যখন সে আধিপত্য করতে চেয়েছে, তখন তাকে পিটিয়ে পিটিয়ে দেয়া হয়েছে বিশেষ আকার, করা হয়েছে পদদলিত এবং যতোদিন সে সুস্পষ্টভাবে অধিকার ত্যাগ না করবে, ততোদিন তাকে দেয়া যেতে পারে শুধু অনুগত দাসীর মর্যাদা। সে তার আদিম গুণগুলোর কোনোটিই হারাচ্ছে না, শুধু এগুলো সংকেত হিশেবে উল্টে যাচ্ছে; সেগুলো অশুভ সংকেত থেকে হয়ে ওঠে শুভ সংকেত; কৃষ্ণ যাদু রূপান্তরিত হয় শ্বেততে। দাসী হিশেবে নারীকে দেয়া হয়েছে অতিশয় জমকালো দেবীত্বলাভের অধিকার।

এবং নারীকে যেহেতু বশ মানানো হয়েছে মাতারূপে, তাই সর্বপ্রথম তাকে লালন ও সম্মান করা হয় মাতারূপে। পরিবারে ও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে, বিধিবিধান ও প্রথার সাথে খাপ খাইয়ে, মাতা হয়েউঠেছে শুভর অনন্য প্রতিমূর্তি : যে-প্রকৃতির সে আংশিক অংশীদার, সে-প্রকৃতি হয়ে উঠেছে শুভ, তা আর চেতনার শত্রু নয়; আর যদি সে রহস্যময়ও থাকে, তবে তার রহস্যটা ; লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ম্যাডোনাদের মতো সুস্মিত রহস্য। পুরুষ নারী হতে চায়না, কিন্তু সে স্বপ্ন দেখে অস্তিত্বশীল সব কিছু–এই নারীসহ, সে যা নয়-নিজের মধ্যে জড়িয়ে ধরার; মাতৃপুজোর মধ্য দিয়ে পুরুষ অধিকার করতে চায় তার অদ্ভুত সম্পদরাশি।

পার্কের প্রাচীন পুরাণের মতো জড়িয়ে থাকে মৃত্যুর সাথে; মৃতকে সৎকারের জন্যে প্রস্তুত করার কাজটি করতে হয় তাকেই, মৃতের জন্যে শোকপালনও করতে হয় তাকেই। তবে তার কাজ হচ্ছে জীবনের, সমাজের, সকলের মঙ্গলের সাথে মৃত্যুর সামঞ্জস্য বিধান। এবং তাই সুশৃঙ্খলভাবে উৎসাহিত করা হয় ‘বীরমাতা’তন্ত্র : সমাজ যদি মাতাদের সম্মত করাতে পারে তাদের পুত্রদের মৃত্যুর কাছে সমর্পণ করতে, তাহলে সমাজ বোধ করে যে তাদের হত্যা করার অধিকার তার আছে। মাতার যেহেতু প্রভাব আছে তার পুত্রদের ওপর, তাই মাতাকে হাতে রাখা সমাজের জন্যে বিশেষ সুবিধাজনক : এ-কারণেই মাতাকে ঘিরে দেয়া হয় শ্রদ্ধার অজস্র নিদর্শনে, তাকে ভূষিত করা হয় সমস্ত গুণাবলিতে, তাকে নিয়ে গড়ে ওঠে একটা ধর্ম। তাকে করা হয় নৈতিকতার অভিভাবক; সে পুরুষের দাসী, যারা ক্ষমতাশালী হবে তাদের সে দাসী,সে তার সন্তানদের সুকোমলভাবে পরিচালিত করে বিধিবদ্ধ পথে। যে-সমাজ যতোবেশি দৃঢ় আশাবাদী, সেটি ততো বশমানাভাবে অনুগত হয় এ-অমায়িক কর্তৃত্বের কাছে, আর মাতা ততোবেশি লাভ করে আদর্শায়িত রূপ। মাতাকে গৌরবান্বিত করা হচ্ছে জন্ম, জীবন, ও মৃত্যুকে একই সময়ে তাদের পাশবিক ও সামাজিক রূপে গ্রহণ করা, এর কাজ প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গতি ঘোষণা। এ-সংশ্লেষণের স্বপ্ন দেখেছিলেন বলে অগাস্ত কোঁৎ নারীকে করেছিলেন ভবিষ্যৎ মানবজাতির দেবী। কিন্তু একই বিবেচনা সব বিপ্লবীকেই উদ্বুদ্ধ করে মাতৃমূর্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে; তাকে অবজ্ঞা করে তারা প্রত্যাখ্যান করে স্টেটাস কৌ, বিধিবিধান ও প্রথার অভিভাবকরূপে মাতার মাধ্যমে সমাজ যা চাপিয়ে দিতে চায় তাদের ওপর।

যে-ভক্তিশ্রদ্ধা জ্যোতিশ্চক্রের মতো ঘিরে থাকে মাতাকে, তাকে ঘিরে থাকে যেনিষেধাবলি, সেগুলো চাপা দিয়ে রাখে সে-শত্রুতাপূর্ণ ঘৃণা, যা স্বতস্ফূর্তভাবে মিশ্রিত থাকে তার জাগানো দৈহিক কোমলতার সাথে। তবে এক ধরনের মাতৃভীতি টিকেই আছে। এটা উল্লেখ করা কৌতূহলজনক হবে যে মধ্যযুগ থেকেই আছে একটি গৌণ কিংবদন্তি, যাতে খোলাখুলিভাবে প্রকাশ পায় এ-ঘৃণা : সেটি হচ্ছে শাশুড়ীর কিংবদন্তি। উপকথা থেকে ভোদভিল পর্যন্ত স্ত্রীর মাতার মধ্য দিয়ে পুরুষ অবজ্ঞা করে মাতৃত্বকে, এবং স্ত্রীর মাতাকে রক্ষা করার জন্যে কোনো ট্যাবু নেই। যে-নারীকে সে ভালোবাসে, তাকে জন্ম লাভ করতে হয়েছে, এটা ভাবতেই অপছন্দ করে পুরুষ : তার শাশুড়ী হচ্ছে সে-জরাগ্রস্ততার দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ, কন্যাকে জন্ম দিয়ে যা সে নির্ধারিত করে রেখেছে নিজের কন্যার জন্যে। তার মেদ ও চামড়ার ভাঁজ জানিয়ে দেয় যে তরুণী নববধুর জন্যেও অপেক্ষা করে আছে এ-মেদ ও ভাঁজ,ভার ভবিষ্যৎ লাভ করে আছে এমন শোকাবহ রূপ।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে তার ঐন্দ্রজালিক অস্ত্রগুলো থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং আর্থিক ও সামাজিকভাবে স্বামীর অধীন হয়ে ‘সতী স্ত্রী’ হয়ে ওঠে পুরুষের অতিশয় মূল্যবান সম্পদ। সে এতোগভীরভাবে স্বামীর অধিকারে থাকে যে সে অংশী হয়ে ওঠে স্বামীর একই সারসত্তার; সে পায় স্বামীর নাম, স্বামীর দেবতা, এবং স্বামী নেয় তার দায়দায়িত্ব। স্বামী তাকে বলে তার ‘অর্ধাঙ্গিনী’। স্বামী যেমন তার গৃহ, জমিজমা, পশুপাল, ধনসম্পদ নিয়ে গর্ব বোধ করে, তেমনি সে গর্ব বোধ করে স্ত্রী নিয়েও, এবং কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি; তার মাধ্যমে স্বামী বিশ্বের কাছে দেখায় নিজের ক্ষমতা। সে হচ্ছে স্বামীর আদর্শ পরিমাপ এবং পার্থিব অংশ। প্রাচ্যদেশীয় দৃষ্টিতে নারীকে হতে হয় স্থূলকায় : লোকেরা দেখতে পায় যে সে বেশ পরিপুষ্ট এবং তার প্রভু ও মালিককে সে ভক্তি করে। কোনো মুসলমানের যেতো বেশি স্ত্রী থাকে এবং তারা যতোবেশি হৃষ্টপুষ্ট হয়, তার সম্বন্ধে পোষণ করা হয় তত ভালো ধারণা। বুর্জোয়া সমাজে নারীকে দেয়া হয় একটি ভূমিকা যে তাকে খাসা দেখাতে হবে; তার রূপ, মনোহারিত্ব, বুদ্ধি, মার্জিতভাব হচ্ছে তার স্বামীর ধনসম্পদের বাহ্যিক ও দর্শনীয় চিহ্ন, যেমন চিহ্ন তার গাড়ির ক্রেতা-নির্দেশিত গঠন। যদি স্বামী ধনী হয়, তাহলে সে স্ত্রীকে ঢেকে দেয় পশমে ও রত্নে; যদি ততো ধনী না হয়, তাহলে সে গর্ব করে স্ত্রীর নৈতিকতা ও গৃহিণীপনার। অতিশয় নিঃস্বও যদি তাকে সেবা করার জন্যে পেয়ে থাকে কোনো নারী, তাহলে সেও বিশ্বাস করে যে জগতে সেও কিছুর মালিক : দি টেমিং অফ দি শ্রুর নায়ক সব পাড়াপ্রতিবেশীকে ডেকে আনে সে কতোটা প্রভুত্বের সাথে পরাভূত করতে পারে তার স্ত্রীকে, তা দেখানোর জন্যে। সব পুরুষই স্মরণ করিয়ে দেয় রাজা কাঁদুলেকে : সে তার স্ত্রীকে প্রদর্শন করে, কেননা সে বিশ্বাস করে যে এভাবেই সে প্রচার করছে তার নিজের গুণাবলি।

কিন্তু নারী শুধু পুরুষের সামাজিক শ্লাঘাকে ফুলিয়ে তোলে না; সে পুরুষের আরো আন্তর শ্লাঘার উৎস। নারীর ওপর আধিপত্যে সে আনন্দ পায়; লাঙলের ফাল খুঁড়ছে। হলরেখা এ-বাস্তবসম্মত প্রতীকের ওপর–যখন নারী একজন ব্যক্তি–চাপিয়ে দেয়। আরো আধ্যাত্মিক প্রতীক : স্বামী তার স্ত্রীকে শুধু কামগতভাবে গঠন করে না, করে নৈতিক ও মননগতভাবেও; স্বামী তাকে শিক্ষা দেয়, তার মূল্যায়ন করে, তার ওপর। মারে নিজের ছাপ। যে-সমস্ত স্বপ্নে পুরুষ আনন্দ পায়, তার একটি হচ্ছে তার ইচ্ছেয়