যেমন প্রাচীন কিংবদন্তিতে তেমনি আধুনিক কাহিনীতে পুরুষ হচ্ছে সুবিধাপ্রাপ্ত বীর। রোমাঞ্চ উপন্যাসে ছেলেই বেয়োয় পৃথিবী পর্যটনে, যে ভ্রমণ করে জাহাজের নাবিক হয়ে, যে জঙ্গলে রুটিফল খেয়েবেঁচে থাকে। পুরুষের সক্রিয়তায়ই ঘটে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এসব উপন্যাস ও উপকথা যা বলে, বাস্তবতা তা সপ্রমাণিত করে। ছোটো মেয়ে যদি পত্রিকা পড়ে, যদি সে শোনে বড়োদের কথাবার্তা, সে বুঝতে পারে যেমন আজকাল তেমনি চিরকাল পুরুষেরাই চালিয়েছে বিশ্ব। যে-সব রাজনীতিক নেতা, সেনাপতি, অভিযাত্রী, সঙ্গীতস্রষ্টা, ও চিত্রকরের সে অনুরাগী, তারা সবাই পুরুষ; এটা নিশ্চিত যে পুরুষেরাই তার মনে জাগায় প্রবল উৎসাহ।
এ-মর্যাদা প্রতিফলিত হয় অতিপ্রাকৃত জগতে। সাধারণত, নারীর জীবনে ধর্মের বৃহৎ ভূমিকার পরিণতিরূপে, বালিকা তার ভাইয়ের থেকে মাকে দিয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত হয় বলে, তার ওপর ধর্মের প্রভাব পড়ে অনেক বেশি। পশ্চিমের ধর্মগুলোতে বিধাতা একজন পুরুষ, পুরুষের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যে ভূষিত একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক : তিনি শুভ্র শুশ্রুমণ্ডিত। খ্রিস্টধর্মীদের কাছে খ্রিস্ট আরো স্পষ্টভাবে রক্তমাংসের পুরুষ, যার আছে উজ্জ্বল শত্রু। ধর্মতাত্ত্বিকদের মতে দেবদূতদের কোনো লিঙ্গ নেই; কিন্তু। তাঁদের নামগুলো পুরুষের এবং তাঁদের সুদর্শন তরুণদের মতো দেখায়। পৃথিবীতে বিধাতার প্রতিনিধিরা :পোপ, বিশপ (যার আংটিতে চুমো খেতে হয়), পুরোহিত, যিনি খ্রিস্টের নৈশভোজের পর্বে মন্ত্রপাঠ করেন, যিনি ধর্মোপদেশ দেন, যার সামনে লোকজন নতজানু হয় স্বীকারোক্তির গোপনীয়তার সময়—তাঁরা সবাই পুরুষ। ক্যাথলিক ধর্ম ছোটো মেয়ের ওপর ফেলে এক অত্যন্তু বিভ্রান্তিকর প্রভাব। কুমারী নতজানু হয়ে শোনে দেবদূতের বাণী এবং উত্তর দেয়- ‘দ্যাখো বিধাতার দাসীকে’। মেরি ম্যাগডালিন পড়ে খ্রিস্টের পদতলে, পদতল ধুয়ে দেয় নিজের অশ্রুতে এবং শুকিয়ে দেয় নিজের মাথার কেশে, তার নারীর দীর্ঘ চুলে। সন্তরা নতজানু হয়ে দীপ্ত খ্রিস্টের প্রতি ঘোষণা করেন তাঁদের প্রেম। ধূপের গন্ধ নিশ্বাসে নিয়ে নতজানু বালিকা আত্মবিসর্জন করে বিধাতা ও দেবদূতদের স্থিরদৃষ্টির সামনে : পুরুষের স্থিরদৃষ্টির সামনে। আশ্লেষের ভাষা ও নারীদের বলা অতীন্দ্রিয় ভাষার সাদৃশ্যের ওপর প্রায়ই। জোর দেয়া হয় : উদাহরণস্বরূপ, সেইন্ট তেরেসা জেসাস সম্পর্কে লিখেছেন : ‘হে আমার প্রিয়তম, তোমার প্রেমের মাধ্যমে, এইখানে নিয়ে, আমি তোমার মুখের। অনির্বচনীয় চুম্বন অনুভব করতে চাই না… তবে আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি তোমার প্রেমে আমাকে প্রজ্জ্বলিত করো… আহ, আমার দাউদাউ উন্মত্ততায় আমাকে তোমার হৃদয়ে লুকোতো দাও… আমি তোমার প্রেমের শিকার হবো…’ ইত্যাদি।
তবে এমন সিদ্ধান্তে পৌছোনো ঠিক হবে না এসব অপ্রতিরোধ্য ভাবোচ্ছ্বাস সব সময়ই যৌন; বরং সত্য হচ্ছে যখন বিকশিত হয় নারীর কাম, তাতে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে ধর্মানুভূতি যা নারী সাধারণত আবাল্য চালিত করে পুরুষের দিকে। একথা সত্য যে ছোটো মেয়ে তার স্বীকারোক্তিগ্রহণকারীর মুখখামুখি, এবং একলা বেদিমূলে, বোধ করে একটা চাঞ্চল্য, যা সে পরে অনুভব করবে তার প্রেমিকের আলিঙ্গনে : এটা বোঝায় যে নারীর প্রেম হচ্ছে অভিজ্ঞতার এমন এক রূপ যাতে এক সচেতন অহং সে-সত্তার জন্যে নিজেকে পরিণত বস্তুতে করে, যে এর সীমাতিক্রমণ করেছে; এসব অক্রিয় সুখানুভবও ছায়াচ্ছন্ন গির্জায়বিলম্বকারী তরুণী ভক্তের আনন্দ।
অবনত মস্তকে, আপন হাতে মুখ ঢেকে, সে বোঝে আত্ম-অস্বীকৃতির অলৌকিকত্ব : জানুতে ভর দিয়ে সে ওঠে স্বর্গের দিকে; মেঘ ও দেবদূতদের উর্ণাজালের মধ্যে বিধাতার বাহুতে তার আত্মসমর্পণ তাকে দেয় স্বর্গে প্রবেশের নিশ্চয়তা। এ-চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা থেকেই সে নকল করে তার পার্থিব ভবিষ্যৎ। শিশু এটা পেতে পারে আরো নানা পথেও; এক গৌরবের স্বর্গে স্থানান্তরিত হওয়ার জন্যে সব কিছুই দিবাস্বপ্নে। তাকে আমন্ত্রণ জানায় পুরুষের বাহুতে নিজেকে সমর্পণ করতে। সে শেখে যে সুখী হওয়ার জন্যে তাকে প্রেম পেতে হবে; প্রেম পাওয়ার জন্যে তাকে অপেক্ষা করতে হবে প্রেমিকের আগমনের জন্যে। নারী হচ্ছে নিদ্রিতা রূপসী, সিন্ডেরেলা, তুষারশুভ্রা, যে গ্রহণ করে এবং বশ্যতা স্বীকার করে। গানে ও গল্পে দেখা যায় যুবক অভিযাত্রায় বেরিয়ে পড়েছে নারীর খোঁজে; সে হত্যা করে ড্রাগন, সে যুদ্ধ করে দানবদের সাথে; নারী বন্দী থাকে কোনো মিনারে, প্রাসাদে, উদ্যানে, গুহায়, সে শৃঙ্খলিত থাকে পাথরের সাথে, সে বন্দিনী, গভীর দ্রিামগ্ন : সে অপেক্ষা করে।
একদিন আসবে আমার রাজকুমার… একদিন আসবে সেই পুরুষ, যাকে আমি ভালোবাসি জনপ্রিয়গানের ভাষা তাকে ভরে দেয়ধৈর্য ও আশার স্বপ্নে ।
তাই নারীর কাছে চরম প্রয়োজনের ব্যাপার হচ্ছে কোনো পুরুষের হৃদয়কে মুগ্ধ করা; তারা হতে পারে অকুতোভয় ও রোমাঞ্চাভিলাষী, সব নায়িকারই অভিকাঙ্খী হয় পুরস্কারপ্রাপ্তির; এবং অধিকাংশ সময়ই রূপ ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো গুণই চাওয়া হয় না। তাই বোঝা যায় যে তার শারীরিক সৌন্দর্যের যত্ন নেয়াই হয়ে ওঠে বালিকার প্রকৃত আবিষ্টতা; তারা রাজকন্যাই হোক আরা রাখালীই হোক, ভালোবাসা ও সুখ পাওয়ার জন্যে সব সময় রূপসী হতেই হবে তাদের; সাদাসিধে ভাবের সাথে নির্মমভাবে জড়ানো হয় খলস্বভাবকে, আর কুৎসিত মেয়ের ওপর যখন নেমে আসে দুর্ভাগ্য, বোঝা যায় না তারা শাস্তি পাচ্ছে তাদের অপরাধের জন্যে, না তাদের অসুন্দর চেহারার জন্যে। মাঝেমাঝেই রূপসী তরুণী জীবদের, যাদের জন্যে রক্ষিত আছে এক উপভোগ্য ভবিষ্যৎ, তাদের প্রথম দেখা যায় শিকাররূপে; ব্ৰাৰ্বরের জেনেভিয়েভের, গ্রিসেলদার কাহিনী যতোটা সরল মনে হয় আসলে ততটা সরল নয়; তাদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে মিশ্রিত হয়ে আছে প্রেম ও দুঃখভোগ; নারী প্রথমে শোচনীয় দুর্দশার গভীরে পতিত হয়েই নিশ্চিত করে তার চরম স্বাদু বিজয়গুলো; বিধাতা বা পুরুষ যে-ই জড়িত থাক-না-কেনো ছোটো বালিকা জানে সে সর্বশক্তিমান হয়ে উঠবে গভীরতম দাবিত্যাগের মাধ্যমে : সে আনন্দ পায় এমন এক মর্ষকামিতায়, যা তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় পরম বিজয়লাভের। সেইন্ট ব্লাদিন, সিংহের থাবায় গাঁথা তার রক্তের ডোরাকাটা দেহ, মৃতের মতো কাঁচের কফিনে শায়িত তুষারশুভ্রা, নিদ্রিতা রূপসী, মূৰ্ছিতা আতালা, একপাল ভঙ্গুর নায়িকা ক্ষতবিক্ষত, অক্রিয়, আহত, নতজানু, অবমানিত, তাদের বালিকা বোনের কাছে প্রদর্শন করে শহিদ হওয়ার, পরিত্যক্ত হওয়ার, দাবিত্যাগী সৌন্দর্যের মোহনীয় মর্যাদা। আমরা বিস্মিত হই না যখন তার ভাই পালন করে বীরের ভূমিকা, তখন বালিকা স্বেচ্ছায় পালন করে শহিদের ভূমিকা : পৌত্তলিকেরা তাকে ছুঁড়ে দেয় সিংহের মুখে, নীলশ তাকে চুল ধরে টেনে হিচড়ে নেয়, তার স্বামী, মহারাজ, তাকে নির্বাসিত করে অরণ্যের গভীরে; সে বশ্যতা স্বীকার করে, দুঃখভোগ করে, মৃত্যুবরণ করে, এবং তার মাথা পরে গৌরবের জ্যোতিশ্চক্র।
