পুতুল নিয়ে খেলা যে-আশাকে মূর্ত করে তোলে, তার সাথে পারিবারিক জীবন যোগ করে ছোটো মেয়ের আত্মপ্রকাশের আরো নানা সুযোগ। গৃহস্থালির বেশ কিছু কাজ ছোটো মেয়ের সামর্থ্যের মধ্যে; বালককে সাধারণত রেহাই দেয়া হয়, কিন্তু তার বোনকে অনুমতি দেয়া হয়, এমনকি আদেশ দেয়া হয় ঝাট দিতে, ধুলো ঝাড়তে, আলুর খোসা ছুলতে, শিশুকে স্নান করাতে, রান্নার দিকে চোখ রাখতে। বিশেষ করে বড়ো বোেনটিকে সাধারণত জড়িয়ে ফেলা হয় মাতৃসুলভ কাজে; হয়তো নিজের
সুবিধার জন্যে বা হয়তো শত্রুতা ও ধর্ষকামিতাবশত মা নিজেকে মুক্ত করে নেয় নিজের অনেক দায়িত্ব থেকে; এভাবে মেয়েটিকে অকালেই খাপ খেতে বাধ্য করা হয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের জগতের সাথে; নিজের গুরুতুবোধ তাকে সাহায্য করে নারীত্ব অর্জনে। কিন্তু সে বঞ্চিত হয় আনন্দময় স্বাধীনতা থেকে, শৈশবের ভাবনাহীনতা থেকে; অকালেই একটি নারী হয়ে উঠে সে জেনে ফেলে এ-অবস্থা একটি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয় কেমন অসামর্থ; সে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষরূপে পৌছে বয়ঃসন্ধিকালে, যা তার ইতিহাসকে দেয় এক বিশেষ চরিত্র। মাত্রাতিরিক্ত কাজের ভার বয়ে একটি শিশু অকালেই পরিণত হতে পারে একটি ক্রীতদাসে, যার জন্যে নির্ধারিত এক নিরানন্দ জীবন। মায়ের কাজগুলো মেয়ের পক্ষে করা বেশ সম্ভব; ‘সে এর মাঝেই হয়ে উঠেছে এক ছোটো নারী,’ তার মা-বাবারা বলে থাকে এমন কথা; এবং কখনোবা মনে করা হয় যে সে ছেলের থেকে বেশি মূল্যবান। প্রকৃতপক্ষে, যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক স্তরে পৌছেই থাকে, তাহলে তা এ-কারণে যে অধিকাংশ নারীতেই এ-স্তরটি প্রথাগতভাবে থাকে কম-বেশি শিশুধর্মী। ঘটনা হচ্ছে যে বালিকা সচেতন তার অকালপকৃতা সম্বন্ধে, তাই সে ছোটো শিশুদের সামনে ছোটো মায়ের অভিনয় করে গর্ব বোধ করে; গুরুত্বপূর্ণ হয়ে সে আনন্দ পায়, সে যথোচিতভাবে কথা বলে, সে আদেশ দেয়, সে তারছোটো ভাইদের কাছে গুরুজন হওয়ার ভাব করে, সে তার মায়ের সমান অবস্থান থেকে বলে কথাবার্তা।
এসব ক্ষতিপূরণ সত্ত্বেও তার জন্যে নির্ধারিত ভাগ্যকে সে খেদহীনভাবে মেনে নেয়; যতোই সে বড়ো হতে থাকে, ততোই ছেলেদের সে ঈর্ষা করতে থাকে তাদের বলিষ্ঠতার জন্যে। পিতামাতা ও পিতামহ-মহীরা একথা গোপন করে রাখে না যে সে মেয়ে না হয়ে ছেলে হলেই তারা বেশি পছন্দ করতো; বা তারা বোনটির থেকে ভাইটির প্রতি দেখায় বেশি স্নেহ। অনুসন্ধানে সুস্পষ্টভাবে জানা গেছে যে মেয়ে হওয়ার থেকে ছেলে হওয়াই পছন্দ করতো অধিকাংশ পিতামাতা। ছেলেদের সাথে কথাবার্তা বলা হয় অনেক বেশি গুরুত্ব ও শ্রদ্ধার সাথে, তাদের দেয়া হয় অনেক বেশি অধিকার; তারা নিজেরা মেয়েদের তাচ্ছিল্য করে; তারা নিজেরা খেলা করে, মেয়েদের তাদের দলে যোগ দিতে না দিয়ে তারা মেয়েদের অপমান করে : একদিকে, মেয়েদের প্রিসি বা ও-রকম কিছু বলা এবং এভাবে ছোটো মেয়ের মনে তার গোপন অবমাননা জাগিয়ে তোলা। ফ্রান্সে, মিশ্র বিদ্যালয়গুলোতে, ছেলেদের জাত ইচ্ছাকৃতভাবে পীড়ন ও অত্যাচার করে মেয়েদের জাতকে।
যদি মেয়েরা লড়াই করতে চায় ছেলেদের সাথে এবং লড়াই করে তাদের অধিকারের জন্যে, তাহলে তাদের কঠোরভাবে তিরস্কার করা হয়। তারা দ্বিগুণ ঈর্ষা বোধ করে একান্তভাবে ছেলেদের কাজকর্মের প্রতি; প্রথমত, বিশ্বের ওপর তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করার জন্যে তাদের স্বতস্ফূর্ত বাসনা আছে বলে, এবং, দ্বিতীয়ত, তাদের যে-নিকৃষ্ট অবস্থানে দণ্ডিত করা হয়েছে, তারা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলে। একদিকে, গাছে ওঠা এবং মই বাওয়া বা ছাদে ওঠা যে তাদের জন্যে নিষিদ্ধ, এতে তারা কষ্ট পায়। অ্যাডলার মন্তব্য করেছেন যে উচ্চ ও নিম্ন ধারণার আছে মহাগুরুত্ব, স্থানিকভাবে উচ্চতা জ্ঞাপন করে আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব, যেমন দেখা যায় বিচিত্র ধরণের বীরত্বব্যঞ্জক কিংবদন্তিতে; কোনো শিখরে, কোনো চুড়োয় আরোহণ হচ্ছে সার্বভৌম কর্তা (অহং) হিশেবে ঘটনার সাধারণ বিশ্ব পেরিয়ে ওপরে ওঠা; ছেলেদের মধ্যে প্রায়ই আরোহণ করা হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিদ্বন্দিতার ভিত্তি। ছোটো মেয়ে, যার জন্যে এসব কাজ নিষিদ্ধ এবং কোনো গাছ বা সমুদ্রতীরের উঁচু খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে বসে যে তার থেকে অনেক ওপরে দেখে বিজয়দৃপ্ত ছেলেটিকে, সে অবশ্যই অনুভব করে যে সে, দেহে ও আত্মায়, তাদের থেকে নিকৃষ্ট। একই রকম ঘটে যদি সে দৌড় বা সাফ দেয়ার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, যদি হাতাহাতির সময়তাকে ফেলে দেয়া হয় বা তাকে রাখা হয় শুধু দর্শক হিশেবে।
সে যখন আরো বড়ো হয়, তার বিশ্ব সম্প্রসারিত হয়, এবং তখন সে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব আরো স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে। মায়ের সাথে অভিন্নতাবোধ করা প্রায়ই আর সন্তোষজনক সমাধান বলে মনে হয় না; যদি ছোটো মেয়ে প্রথমে মেনেও নেয় তার নারীসুলভ বৃত্তি, এটা এ-কারণে নয় যে সে দাবি ত্যাগ করতে চায়; এটা বরং শাসন করার জন্যে; সে মাতৃকা হতে চায়, কেননা মাতৃকাদের বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত মনে হয়; কিন্তু যখন তার সঙ্গীরা, তার পড়াশুনো, তার খেলাধুলো, তার পাঠ, তাকে বের করে নেয় মাতাদের বৃত্ত থেকে, তখন সে দেখতে পায় নারীরা নয়, পুরুষেরাই নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব। এ-উপলব্ধিই–শিশ্ন আবিষ্কারের থেকে অনেক বেশি–অপ্রতিরোধ্যভাবে বদলে দেয় তার নিজের সম্বন্ধে ধারণা।
