যখন মেয়ে খুবই ছোটো থাকে তখন সে হেলাফেলায় বিশেষ বিঘ্ন সৃষ্টি না করে মেনে নেয় এসব। শিশুটি চলতে থাকে খেলা ও স্বপ্নের স্তরে, অভিনয় করতে থাকে সত্তার, অভিনয় করতে থাকে কর্মের; যখন কেউ শুধু কাল্পনিক অর্জন নিয়ে ব্যাপৃত থাকে, তখন করা ও হওয়ার মধ্যে সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য করা হয় না। ছোটো মেয়ে ছেলেদের বর্তমান শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষতিপূরণ করতে পারে তার নারীসুলভ নিয়তির মধ্যে নিহিত যে-সব প্রশ্রুিতি এবং অভিনয়ের মাধ্যমে সে যেগুলো চরিতার্থ করে, সেগুলোর সাহায্যে। যেহেতু এ-পর্যন্ত সে জানে শুধু তার শৈশবের মহাবিশ্বকে, তাই প্রথমে মাকে তার মনে হয় পিতার থেকে অধিক কর্তৃত্বে ভূষিত বলে; সে বিশ্বকে এক ধরনের মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলে কল্পনা করে; সে তার মাকে অনুকরণ করে এবং তার সাথে নিজেকে অভিন্ন করে তোলে; প্রায়ই সে বদলে দেয় নিজেদের ভূমিকা : ‘যখন আমি বড়ো হবে, আর তুমি ছোটো…’ সে ভালোবাসে তার মাকে বলতে। পুতুলটি শুধুই তার ডবল নয়; এটি তার সন্তানও। এ-ভূমিকা দুটি পরস্পরকে বাদ দেয় না, যেহেতু মায়ের কাছে আসল শিশুটিও একটি বিকল্প সত্তা। যখন সে তার পুতুলকে বকে, শাস্তি দেয়, এবং তারপর সেটিকে সান্ত্বনা দেয়, তখন সে একই সঙ্গে মায়ের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠা করে নিজেকে এবং নিজে ধারণ করে মায়ের মর্যাদা : সে নিজের মধ্যে সম্মিলিত করে মাতা-কন্যা যুগলের দুটি উপাদান। সে নিজের গোপন কথা বলে পুতুলকে, সে এটিকে লালন করে, এর ওপর প্রয়োগ করে তার সার্বভৌম কর্তৃত্ব, এমনকি অনেক সময় খসিয়ে ফেলে তার হাত, তাকে মারে, পীড়ন করে তাকে। এর অর্থ হচ্ছে পুতুলের মাধ্যমে সে অভিজ্ঞতা লাভ করে কর্তৃত্বপরায়ণ আত্মঘোষণার ও স্বরূপনির্ণয়ের। প্রায়ই মাকে জড়ানো হয় এ-কাল্পনিক জীবনে : শিশুটি তার মায়ের কাছে অভিনয় করে যেনো সে পুতুলটির পিতা ও মাতা, তৈরি করে এমন একটি দম্পতি, যাতে বাদ দেয়া হয় পুরুষটিকে। ছোটো মেয়ে স্থির করে যে শিশুদের যত্ন নেয়ার ভার পড়ে মায়ের ওপর, তাকে তা-ই শেখানে হয়; যতো গল্প সে শুনেছে, পড়েছে যতো বই, তার ছোট্ট অভিজ্ঞতা সপ্রমাণ করে এ-ধারণাকেই। তাকে উৎসাহিত করা হয় ভবিষ্যতের এসব সম্পদের যাদু অনুভব করতে, তাকে পুতুল দেয়া হয় যাতে এর পর এসব মূল্যবোধ লাভ করে একটা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য। তার ‘বৃত্তি’ সজোরে ছেপে দেয়া হয় তার ওপর।
ছোটো মেয়ে যেহেতু অনুভব করে শিশু জন্ম দেয়া হবে তার নিয়তি, এবং যেহেতু সে ছেলের থেকে তার ‘অভ্যন্তর’ সম্পর্কে বেশি আগ্রহী, সে বিশেষভাবেই উৎসুক হয় সন্তান উৎপাদনের রহস্য সম্পর্কে। সে আর বিশ্বাস করে না যে শিশুরা জন্ম নেয় বাঁধাকপির ভেতরে, বা শিশুদের নিয়ে আসা হয় ডাক্তারের থলেতে করে, বা নিয়ে আসে সারসেরা; সে শিগগির জানতে পারে, বিশেষ করে যদি এর মধ্যে জন্ম নেয়ভাইবোন, যে বাচ্চারা জন্ম নেয় মায়ের দেহের ভেতরে। তাছাড়া, আধুনিক মা-বাবারা ব্যাপারটিকে আর আগের দিনের মতো রহস্যে পরিণত করে না। ছোটো বালিকা ভয় পাওয়ার বদলে সাধারণত অভিভূত হয়বিস্ময়ে, কারণ প্রপঞ্চটিকে ঐন্দ্রজালিক বলে মনে হয় তার কাছে; সে তখনও সমস্ত শারীরবৃত্তিক নিহিতার্থ বুঝে উঠতে পারে না। প্রথমে সে অজ্ঞ থাকে বাবার ভূমিকা সম্পর্কে এবং ধারণা করে যে নারীরা বিশেষ কোনো খাবার খেয়ে গর্ভবতী হয়। এটা এক কিংবদন্তিমূলক বিষয় (রূপকথায় রাণীরা বিশেষ কোনো ফল, বা বিশেষ ধরনের মাছ খেয়ে জন্ম দেয় ছোট্ট মেয়ে বা সুন্দর ছেলে), এবং এটা অনেক নারীর মনে গর্ভধারণের ব্যাপারটিকে সম্পর্কিত করে পরিপাকতন্ত্রের সাথে। এসব সমস্যা ও আবিষ্কার বালিকার মনে জাগায় ঔৎসুক্য এবং লালন করে তার কল্পনা।
এ-ইতিহাস বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, যদিও ছোটো মেয়ে প্রায়ই বাবার ভূমিকা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো প্রশ্ন করে না, বা মা-বাবারা এড়িয়ে যায় এ-ব্যাপারটি। অনেক ছোটো মেয়ে তার জামার নিচে বালিশ নিয়ে গর্ভবতী হওয়ার খেলা খেলে, বা জামার ভাজের। টোপরে একটি পুতুল নিয়ে হাঁটে এবং সেটিকে ফেলে দোলনায়; সে এটিকে স্তন্যদান করতে পারে। ছেলেরা, মেয়েদের মতোই, বিস্ময় বোধ করে মাতৃত্বের রহস্যে; সব শিশুই ‘গভীরতা সম্পর্কে’ কল্পনা করে, যা তাদের দেয় জিনিশপত্রের অভ্যন্তরে গুপ্তধনের ধারণা বোধ করতে; তারা সবাই চারদিক ঘিরে ফেলার, পুতুলের ভেতরে পুতলের, বাক্সের ভেতরে বাক্সের, ছবির ভেতরে ক্রমিকভাবে ছোটো আকারের ছবির অলৌকিত্ব অনুভব করে; সবাই উল্লাস বোধ করে কুঁড়ি ছিড়েফেড়ে, ডিমের খোলসের ভেতরে ছানা দেখে, জলের গামলায় ভাসানো ‘জাপানি ফুল’-এর প্রস্ফুটিত হওয়া দেখে।ছোটো ছোটো চিনির ডিমে বোঝাই একটা ইস্টারের ডিম খুলে একটি ছোটো ছেলে আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলো : ‘আহ, এটা একটা মা’। কারো দেহের ভেতর থেকে একটি শিশুকে বের করা : তাভোজবাজির কৃতিত্বপূর্ণ কাজের মতোই চমৎকার। মাকে মনে হয় বিস্ময়কর পরীর ক্ষমতায় তৃষিত। অনেক ছেলে দুঃখ পায় তাদের এমন বিশেষাধিকার নেই বলে; পরে যখন তারা পাখির ডিম চুরি করে ও মাড়িয়ে যায় ছোটো ছোটো চারাগাছ, যখন তারা এক ধরনের প্রবল ক্ষিপ্ততায় ধ্বংস করে জীবন, তারা তা করে তাদের যে জীবন আনয়নের সামর্থ্য নেই, তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে; আর তখন ছোটো মেয়েকথা ভেবে সুখ পায় যে একদিন সে জীবন সৃষ্টি করবে।
