শুরু থেকেই, এর বিপরীতে, নারীর মধ্যে থাকে তার স্বায়ত্তশাসিত অস্তিত্ব ও তার বস্তুগত সত্তার, তার ‘অপর-হওয়ার’, মধ্যে বিরোধ; তাকে শেখানো হয় অন্যদের খুশি করার জন্যে তাকে চেষ্টা করতে হবে খুশি করার, নিজেকে করে তুলতে হবে বস্তু; তাই তাকে অস্বীকার করতে হবে তার স্বায়ত্তশাসন। তাকে দেখা হয় একটি জীবন্ত পুতুলরূপে এবং অস্বীকার করা হয় তার স্বাধীনতা। এভাবে গড়ে ওঠে এক দুষ্টচক্র; কেননা তার চারপাশের বিশ্বকে বোঝার, তাকে আয়ত্ত ও আবিষ্কার করার জন্যে সে যতোই কম প্রয়োগ করতে থাকে তার স্বাধীনতা, সে নিজের ভেতরে পেতে থাকে ততোই কম শক্তি, আর সে ততোই কম পেতে থাকে নিজেকে কর্তারূপে প্রতিষ্ঠিত করার সাহস। যদি তাকে এতে উৎসাহিত করা হতো, তাহলে সে ছেলের মতো দেখাতে পারতো একই প্রাণপ্রাচুর্য, একই ঔৎসুক্য, একই উদ্যোগ, একই সাহসিকতা। এটা মাঝেমধ্যে ঘটে, যখন মেয়েকে লালনপালন করা হয় ছেলের মতো; এ-ক্ষেত্রে সে বেঁচে যায় নানা সমস্যা থেকে। লক্ষণীয় যে বাবারা তাদের কন্যাদের এ-ধরনের শিক্ষা দিতেই পছন্দ করে; পুরুষের অভিভাবকত্বে বেড়ে ওঠে যে-নারীরা, তারা মুক্ত থাকে নারীর দোষত্রুটিগুলো থেকে। কিন্তু প্রথা মেয়েদের ছেলেদের মতো লালনপালন করার বিরোধী। তিন বা চার বছর বয়সের কয়েকটি গ্রামের মেয়ের কথা আমি জানি, যাদের বাবারা তাদের বাধ্য করে ট্রাউজার পরতে। অন্য সব মেয়ে তাদের উপহাস করতো : ‘এরা কি মেয়ে না ছেলে?’–এবং তারা পরখ করে ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইতো। আক্রান্তরা আবেদন জানাতে ড্রেস পরার। যদি কোনো ছোটো মেয়ে অস্বাভাবিক নিঃসঙ্গ জীবন যাপন না করে, তাহলে তার পিতামাতার সম্মতি সত্ত্বেও ছেলের মতো জীবন যাপন আহত করবে তার সহচরদের, তার বন্ধুদের, তার শিক্ষকদের। বাবার প্রভাবকে প্রতিহত করার জন্যে চারপাশে সব সময়ই থাকবে খালারা, পিতামহীরা, চাচাতো-খালাতো ভাইবোনেরা। সাধারণত কন্যার শিক্ষার বেলায় পিতাকে দেয়া হয়একটা গৌণ ভূমিকা। একটা বিঘ্ন, যা নারীদের ওপর প্রচণ্ড ভার হিশেবে চেপে থাকে–মিশেলে যা যথার্থভাবে নির্দেশ করেছেন–তা হচ্ছে শৈশবে লালনপালনের ভার নারীদের হাতে ছেড়ে দেয়া। ছেলেও প্রথমে লালিত হয় মায়ের দ্বারাই, কিন্তু সে পুত্রের পুরুষত্বকে ভক্তি করে এবং ছেলে সত্বর মুক্তি পেয়ে যায়; সেখানে মা চায় তার মেয়েকে নারীর জগতের সাথে সম্পূর্ণরূপে খাপ খাইয়ে দিতে।
পরে আমরা দেখতে পাবো কন্যার সাথে মায়ের সম্পর্ক কতো জটিল : মায়ের কাছে তার কন্যা একই সময়ে তার ডবল এবং এক ভিন্ন মানুষ, মা একই সময়ে তার কন্যার প্রতি অতিশয় স্নেহপরায়ণ এবং শক্রতাপ্রবণ; মা তার শিশুর ওপর চাপিয়ে দিতে চায় তার নিজের নিয়তির বোঝা; এটা হচ্ছে সগর্বে একে নিজের নারীত্ব বলে দাবি করার একটি উপায় এবং এর জন্যে নিজের ওপর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করারও একটি উপায়। একই প্রক্রিয়া দেখা যাবে বালকমেহনকারী, জুয়োরি, মাদকাসক্তদের মধ্যে, তাদের সকলের মধ্যে যারা একই সঙ্গে গর্ববোধ করে বিশেষ একটি। ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এবং লজ্জিতবোধ করে এ-সংঘের জন্যে : ধর্মান্তরিতকরণের ব্যগ্রতার সাথে তারা প্রয়াস চালায় নতুন অনুগামী লাভের। সুতরাং যখন কোনো শিশুকে লালনপালনের ভার পড়ে নারীদের ওপর, তখন তারা সর্বাত্মকভাবে নিজেদের নিয়োগ করে শিশুটিকে নিজেদের মতো নারীতে পরিণত করার কাজে, দেখায় এমন উদ্দীপনা যাতে মিশ্রিত থাকে উগ্রতা ও ক্ষোভ; এমনকি মহানুভব মা, আন্তরিকভাবেই যে কল্যাণ চায় তার কন্যার, স্বাভাবিকভাবে সেও মনে করে মেয়েকে ‘খাঁটি নারী’ করে তোলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ, কেননা এটা করা হলেই সমাজ মেয়েটিকে সানন্দে গ্রহণ করবে। তাই তাকে খেলা করতে দেয়া হয় ছোটো মেয়েদের সাথে, তাকে দেয়া হয় মহিলা শিক্ষকদের কাছে, গ্রিসের গাইনিকিউমের মতো সে থাকে বৃদ্ধা নারীদের সাথে, তার জন্যে বাছাই করা হয় এমন সব বই আর খেলাধুলো, যা তাকে দীক্ষিত করে তার নির্ধারিত এলাকায়স্ত্রীবুদ্ধিরাশি ঢেলে দেয়া হয় তার কানে, তার কাছে চাওয়া হয় নারীর গুণাবলি, তাকে সেখানো হয় রান্নাবান্না, সূচিকর্ম, ঘরকন্না, শেখানো হয় শরীর ও রূপের যত্ন নিতে, বিনয়ী হতে; তাকে পরতে হয়। অসুবিধাজনক ও ঝালরঅলা পোশাক, যার জন্যে তাকে সব সময় সাবধানে থাকতে হয়, তার চুল বাঁধা হয় নয়নাভিরাম ভঙ্গিতে, তাকে শেখানো হয় চালচলনের নিয়মকানুন : ‘সোজা দাঁড়াও, পাতিহাঁসের মতোহেঁটো না’; সৌষ্ঠব বাড়ানোর জন্যে তাকে দমন করতে হয় তার স্বতস্ফূর্ত চলাফেরা; তাকে বলা হয় ছেলে হয়ে ওঠার মতো ক্রিয়াকলাপ না করতে, তাকে নিষেধ করা হয় কঠোর ব্যায়াম করতে, তাকে। মারামারি করতে দেয়া হয় না। সংক্ষেপে, তাকে চাপ দেয়া হয় তার প্রবীণদের মতো দাসী ও মূর্তি হওয়ার জন্যে। আজকাল, নারীদের জয়ের কল্যাণে, ক্রমিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে শিক্ষা নেয়ার জন্যে ছোটো মেয়েকে উৎসাহিত করা, খেলাধুলোর প্রতি তাকে আগ্রহী করে তোলা; তবে এসব ক্ষেত্রে তার অসাফল্যকে ছেলেদের থেকে অনেক বেশি নির্ধিধায় ক্ষমা করা হয়; তার কাছে আরেক রকম অর্জন দাবি করে সাফল্যকে কঠিন করে তোলা হয় : যাই হোক তাকে একটি নারীও হতে হবে, সে তার নারীত্ব হারাতে পারবে না।
