প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, একদিকে, পুতুল বোঝায় পুরো শরীর, আবার, অন্য দিকে, এটি এক অক্রিয় ব। এজন্যে বালিকা তার সমগ্র শরীরকে এর সাথে অভিন্ন বলে মনে করতে থাকে এবং দেহকে মনে করতে থাকে এক অক্রিয় জড় বস্তু বলে। বালক যখন তার শিশ্নে নিজেকে খোঁজে এক স্বায়ত্তশাসিত কর্তা হিশেবে, তখন বালিকা তার পুতুলকে বুকের কাছে কোলে নিয়ে আদর করে এবং জামাকাপড় পরায়, যেমন সে স্বপ্ন দেখে কেউ তাকে বুকের কাছে কোলে নিয়ে আদর করছে এবং জামাকাপড় পরিয়ে দিচ্ছে; উল্টোভাবে, সে নিজেকে মনে করে এক বিস্ময়কর পুতুল। প্রশংসা ও তিরষ্কারের সাহায্যে, ছবি ও কথার ভেতর দিয়ে, সে শেখে সুন্দর ও সাদাসিধে শব্দ দুটির অর্থ; অবিলম্বে সে শিখে ফেলে যে মনোহর হওয়ার জন্যে তাকে হতে হবে। ‘ছবির মতো সুন্দর’; সে চেষ্টা করতে থাকে যাতে তাকে ছবির মতো দেখায়, পরতে থাকে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক, নিজেকে দেখতে থাকে আয়নায়, নিজেকে তুলনা করতে থাকে রাজকুমারী ও পরীদের সাথে। মারি বাশকির্তসেভ এ-শিশুসুলভ ছেনালিপনার এক চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন আমাদের। এটা আকস্মিক ঘটনা নয় যে বেশ দেরি করে দুধ ছেড়ে সাড়ে তিন বছর বয়সে–চার থেকে পাঁচ বছর বয়সে তিনি তীব্রভাবে বোধ করেন যে নিজেকে আকর্ষণীয় করতে হবে যাতে মুগ্ধ হয়অন্যরা, অন্যদের সুখী করে বাঁচতে হবে। এতোটা বয়স্ক শিশুর কাছে দুধ ছাড়ার আঘাতটি নিশ্চয়ই ছিলো প্রচণ্ড, এবং তিনি নিশ্চয়ই সংরক্তভাবে ক্ষতিপূরণ করতে। চেয়েছেন তার ওপর চাপানো বিচ্ছিন্নতার; তাঁর জর্নালে তিনি লিখেছেন : ‘পাঁচ বছর বয়সে আমি সেজেছি আমার মায়ের কারুকার্যময় ফিতেয়, চুলে পরেছি ফুল, এবং ড্রয়িংরুমে নাচতে গেছি। আমি ছিলাম মহানর্তকী পেতিপা, এবং আমাকে দেখার জন্যে ছিলো সারা পরিবার’।
বালিকার মধ্যে এ-আত্মরতি দেখা দেয় এতো অকালে, নারী হিশেবে এটা তার জীবনে পালন করবে এতো মৌল ভূমিকা যে এটা উদ্ভূত হয় এক রহস্যময় নারীপ্রকৃতি থেকে, এমন মনে করা সহজ। কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি যে প্রকৃতপক্ষে শারীরসংস্থানগত নিয়তি তার মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে না। যে-পার্থক্য ছেলেদের স্বতন্ত্র করে তোলে, তাকে একটি মেয়ে নানাভাবে গ্রহণ করতে পারে। শিশ্ন থাকা যে একটি বিশেষ সুবিধা, তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু এর মূল্য স্বাভাৰিক ভাবেই কমে যায় শিশুর কাছে, যখন সে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে মলমূত্রত্যাগের কর্মগুলোর প্রতি। যদি। আট বা ন-বছর বয়সের পরেও শিশুর মনে টিকে থাকে এর মূল্য, তার কারণ শিশ্নটি হয়ে উঠেছে পুরুষত্বের প্রতীক, যাকে সামাজিকভাবে মূল্যবান মনে করা হয়। সত্য হচ্ছে এ-ব্যাপারে শিক্ষা ও প্রতিবেশের প্রভাব অসীম। দুধ ছাড়ার ভেতর দিয়েতাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যে-বিচ্ছিন্নতা, সব শিশুই তার ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করে অন্যদের প্ররোচিত করে ও নিজেকে জাহির করার আচরণের মাধ্যমে; বালক বাধ্য হয় এ-অবস্থা পেরিয়ে যেতে; নিজের শিশ্নের প্রতি মনোনিবেশের মাধ্যমে সে মুক্তি পায় আত্মরতি থেকে; আর তখন ছোটো মেয়ে নিবদ্ধ হয়ে থাকে নিজের প্রতি অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণের প্রবণতার মধ্যে, যা সব ছোটো শিশুর মধ্যে দেখা যায়। পুতুল একটি সহায়ক, কিন্তু এর নেই আর কোনো নিয়ন্ত্রণকারী ভূমিকা; ছেলেও লালন করতে পারে একটা খেলনা ভালুক, বা পুতুল, যাতে সে প্রক্ষেপ করে নিজেকে; তাদের জীবনের সমগ্রতার মধ্যেই প্রতিটি ব্যাপার–শিশ্ন অথবা পুতুল–অর্জন করে তার গুরুত্ব।
তাই ‘নারীধর্মী’ নারীর অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য যে-অক্রিয়তা, তা এমন এক চারিত্রিক গুণ, যা তার ভেতরে দেখা দেয় তার জীবনের আদিকাল থেকেই। তবে এর মূলে আছে এক জৈবিক তথ্য, এমন দাবি করা ভুল; প্রকৃতপক্ষে এটা এমন এক নিয়তি, যা তার ওপর চাপিয়ে দেয় তার শিক্ষকেরা ও সমাজ। ছেলে যে-বিশাল সুবিধা উপভোগ করে, তা হচ্ছে এই যে অন্যদের সাথে সম্পর্কে তার অস্তিত্বের ধরন তাকে তার কর্তৃমূলক স্বাধীনতা জ্ঞাপনের দিকে নিয়ে যায়। জীবনের জন্যে তার শিক্ষানবিশির মূল উপাদান হচ্ছে বাইরের বিশ্বের দিকে স্বাধীন অগ্রগতি; অন্য ছেলেদের সাথে সে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাহসিকতা ও স্বাধীনতার মধ্যে, সে তাচ্ছিল্য করে মেয়েদের। গাছে চড়ে, তার সঙ্গীদের সাথে মারামারি করে, কষ্টকর খেলাধুলোয় তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে নিজের দেহকে বোধ করে প্রকৃতির ওপর আধিপত্য করার একটি উপায়হিশেবে এবং লড়াই করার একটা অস্ত্র বলে; সে তার পেশি নিয়ে গর্ব করে যেমন গর্ব করে তার যৌনাঙ্গ নিয়ে; খেলাধুলোয়, ক্রীড়ায়, মারামারিতে, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রতিযোগিতায়, শক্তির পরীক্ষায় সে দেখতে পায় তার ক্ষমতার একটা ভারসাম্যপূর্ণ প্রয়োগ; একই সময়ে সে আত্মীভূত করে হিংস্রতার কঠোর পাঠ; অল্প বয়স থেকেই সে শেখে ঘুসি সহ্য করতে, যন্ত্রণা তাচ্ছিল্য করতে, অশ্রু ধরে রাখতে। সে দায়িত্ব গ্রহণ করে, সে আবিষ্কার করে, সে স্পর্ধা দেখায়। নিশ্চয়ই সে নিজেকেও পরখ করে এমনভাবে যেনো সে অন্য কেউ; সে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ডাকে নিজের পৌরুষকে, এবং বয়স্কদের ও অন্য শিশুদের সাথে সম্পর্কে দেখা দেয় বহু। সমস্যা। কিন্তু যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে সে যে-বস্তুগত মানবমূর্তি, তার জন্যে তার যে-আগ্রহ, ও বস্তুগত লক্ষ্যের মধ্যে আত্ম-উপলব্ধির ইচ্ছার মধ্যে কোনো মৌল বৈপরীত্য নেই। করার মাধ্যমেই সে সৃষ্টি করে নিজের অস্তিত্ব, এক ও অভিন্ন কর্মের মধ্যে।
