প্রাপ্তবয়স্কদের স্থিরদৃষ্টির যাদু চপল। শিশু ভান করে যেনো সে অদৃশ্য হয়ে গেছে; এ-খেলায় প্রবেশ করে তার মা-বাবা, অন্ধের মতো তাকে খোঁজার চেষ্টা করে এবং হাসতে থাকে; তবে অবিলম্বে তারা বলে : ‘তুমি ক্লান্তিকর হয়ে উঠছো, তুমি একেবারেই অদৃশ্য নও’। শিশুটি তাদের একটি চমৎকার কথা বলে মজা দিয়েছে; সে এটা আবার বলে, এবং এবার তারা তাদের কাঁধ ঝাঁকায়। এ-বিশ্বে, যা কাফকার মহাবিশ্বের মতো অনিশ্চিত ও ভবিষ্যদ্বাণী-অসম্ভব, পদে পদে মানুষ হোঁচট খায়। এজন্যেই অনেক শিশু বেড়ে উঠতে ভয় পায়; তারা হতাশ হয় যখন তাদের পিতামাতা আর তাদের হাঁটুর ওপরে তোলে না বা উঠতে দেয় না বড়োদের বিছানায়। দৈহিক হতাশার মধ্য দিয়ে তারা অধিকতর নিষ্ঠুরভাবে অনুভব করতে থাকে অসহায়ত্ব, পরিত্যাগ, যন্ত্রণাবোধ ছাড়া যা কোনো মানুষ বুঝতে পারে না।
ঠিক এখানেই ছোটো মেয়েদের প্রথম মনে হয় বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত বলে। একটি দ্বিতীয় বারের জন্যে দুধ ছাড়া, যেটি প্রথমটির থেকে কম নিষ্ঠুর ও অনেক বেশি ধীর, মায়ের দেহকে দূরে সরিয়ে নেয়শিশুর আলিঙ্গন থেকে; তবে একটু একটু করে ছেলেদেরই অস্বীকার করা হয় আর চুমো খেতে বা আদর করতে, যাতে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলো। ছোটো মেয়ের বেলা, তাকে ভুলিয়ে রাখা হয় মিষ্টি মিষ্টি কথায়, তাকে লেগে থাকতে দেয়া হয় তার মায়ের স্কার্টের সাথে, তার বাবা তাকে পায়ের ওপর তুলে দোলায়, তার চুলে হাত বুলোয়। সে পরে ছোটো ছোটো মিষ্টি পোশাক, লাই দেয়া হয় তার চোখের জল ও খেয়ালখুশিকে, সুন্দরভাবে তার চুল বেঁধে দেয়া হয়, বড়োরা মজা পায় তার ভাবভঙ্গি ও ছেনালিপনায়–শারীরিক সংস্পর্শ ও আদরভরা চাহনি তাকে রক্ষা করে নিঃসঙ্গতার উদ্বেগ থেকে। এর বিপরীতে ছেনালিপনা করতে দেয়া হয় না ছোটো ছেলেকে; তার অন্যদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা, তার ছলছলনা বিরক্তিকর। তাকে বলা হয় ‘পুরুষ চুমো চায় না… পুরুষ আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে না… পুরুষ কাঁদে না’। তাকে বলা হয় একটি ছোট্ট পুরুষ হতে; বড়োদের থেকে স্বাধীন হয়ে সে পায় বড়োদের সম্মতি। তারা খুশি হয় যদি সে তাদের খুশি করার চেষ্টা না করে।
বহু ছেলে, তাদের যে-কঠোর স্বাধীনতায় দণ্ডিত করা হয়েছে, তাতে ভয় পেয়ে মনে করে যে মেয়ে হলেই ভালো ছিলো; আগের দিনে ছোটো বয়সে যখন ছেলেদের পরানো হতো মেয়েদের মতো পোশাক, তারা কাদাকাটি করতো যখন তাদের মেয়ের পোশাক ছেড়ে পরানো হতো ট্রাউজার, কেটে ফেলা হতো তাদের ঝুঁটি। তাদের কেউ কেউ একগুয়েভাবে চাইতো নারী থাকতেই–এটা সমকামিতার সাথে পরিচিত হওয়ার একটা ধরন। মরিস সাক (ল্য সাবাতে) বলেন : ‘আমি সংরক্তভাবে চেয়েছিলাম মেয়ে হতে এবং পুরুষ হওয়ার মহিমা সম্পর্কে অসচেতনতাকে আমি এতো দূর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলাম যে আমি ভান করতাম বসে প্রস্রাব করার’।
যদি প্রথম প্রথম মনেও হয় যে ছেলেকে তার বোনদের থেকে দেখানো হচ্ছে কম অনুগ্রহ, তা এ-কারণে যে তার জন্যে অপেক্ষায় আছে বড়ো বড়ো ব্যাপার। তার কাছে যা দাবি করা হয়, তা নির্দেশ করে উচ্চ মূল্যায়ন। মাওরা তার স্মৃতিকথায় বর্ণনা করেছেন যে তিনি ঈর্ষা বোধ করেছিলেন তার এক কনিষ্ঠ ভাইয়ের প্রতি, যাকে তার মা ও দাদী স্তোকবাক্যে ভুলোনোর চেষ্টা করছিলেন। তাঁর বাবা হাত ধরে তাকে ঘর থেকে নিয়ে যান, বলেন : ‘আমরা পুরুষ, চলো আমরা এসব নারীদের ছেড়ে কোথাও যাই’। শিশুকে বোঝানো হয় যে ছেলেদের কাছে বেশি দাবি করা হয়, কেননা তারা। শ্রেষ্ঠতর; যে-কঠিন পথে তাকে চলতে হবে, তাতে চলার সাহস দেয়ার জন্যে তার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয় পুরুষত্বের গর্ব; এ–বিমূর্ত ধারণাটি তার মধ্যে রূপায়িত হয় একটি মূর্ত বস্তুতে : এটা মূর্ত হয় তার শিশ্নে। স্বতস্ফূর্তভাবে সে তার লিঙ্গে কোনো গর্ব বোধ করতে পারে না, বোধ করে তার চারপাশের লোকজুনের মনোভাবের মধ্য দিয়ে। মায়েরা ও ধাত্রীরা বাঁচিয়ে রাখে সে-প্রথাটি, যা শিশ্ন ও পুরুষত্বের ধারণাকে করে তোলে অভিন্ন; তারা শিশুর শিশ্নকে দেখে অসামান্য আত্মপ্রসাদের সাথে। একটু বেশি বিনয়ী নারীরা আজো বালকের লিঙ্গকে ডাকে ডাকনামে, তার সাথে এটার সম্পর্কে এমনভাবে তারা কথা বলে যেনো এটা একটি ছোটো মানুষ, যেনোএটা সে নিজে এবং তার থেকে ভিন্ন কেউ : তারা একে করে তোলে একটা ‘বিকল্প সত্তা, যে শিশুটির থেকে সাধারণত একটু বেশি রঙ্গিলা, বেশি বুদ্ধিমান, এবং বেশি চতুর’।
শারীরসংস্থানগতভাবে শিশ্ন এ ভুমিকার জন্যে খুবই উপযুক্ত; দেহ থেকে বেরিয়ে থাকে বলে এটাকে মনে হয় একটা প্রাকৃতিক খেলনা, এক রকম পুতুল। বয়স্করা শিশ্নটিকে তার ডবলে পরিণত করে মূল্য দেয় শিশুকে। এক বাবা আমাকে বলেছিলেন তার এক ছেলে তিন বছর বয়সেও বসে প্রস্রাব করতো; বোনদের ও চাচাতো বোনদের দ্বারা পরিবৃত থেকে সে হয়ে উঠেছিলো এক ভীতু ও বিষন্ন শিশু। একদিন তার বাবা তাকে পায়খানায় নিয়ে বলে, ‘তোমাকে দেখাচ্ছি পুরুষেরা এটা কীভাবে করে’। তারপর থেকে সে গর্ববোধ করতে থাকে সে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে বলে, এবং তিরষ্কার করতে থাকে মেয়েদের ‘যারা একটা ছিদ্র দিয়ে প্রস্রাব করে’; মূলত মেয়েদের শিশ্ন নেই বলে তার ঘেন্না জাগে নি, বরং জাগে এ-কারণে যে মেয়েদের কেননা আগে খুঁজে বের করা হয় নি, এবং বাবা কেননা তার মতো করে তাদের এতে দীক্ষিত করে নি। এভাবে, শিশ্ন এমন কোনো প্রত্যক্ষ সুবিধা নির্দেশ করে না যার থেকে বালক আহরণ করতে পারে শ্রেষ্ঠত্বের বোধ, এর উচ্চ মূল্যকে বরং মনে হয় দ্বিতীয়বার দুধ ছাড়ার দুর্ভোগের ক্ষতিপূরণ বলে–বয়স্করা যা আবিষ্কার করেছে ও অতি আকুলতার সাথে শিশু যা গ্রহণ করেছে। এভাবে তাকে রক্ষা করা হয় দুগ্ধপোষ্য শিশু হিশেবে তার মর্যাদা হারানোর এবং মেয়ে না হওয়ার দুঃখ থেকে। পরে সে তার সীমাতিক্ৰমণতা ও গর্বিত সার্বভৌমতুকে মূর্ত করবে তার লিঙ্গে।
