কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং নারী হয়ে ওঠে। সমাজে যেভাবে দেখা দেয় স্ত্রীলিঙ্গ মানুষ কোনো জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, বা আর্থনীতিক নিয়তি তার রূপ নির্ধারণ করে না; সার্বিকভাবে সভ্যতাই উৎপাদন করে পুরুষ ও খোজার মাঝামাঝি এ-প্রাণীটি, যাকে বলা হয় নারী। শুধু অন্য কার হস্তক্ষেপই একটি মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে অপর-রূপে। যখন সে অস্তিত্বশীল নিজের মধ্যে ও নিজের জন্যে, তখন কোনোশিশুর পক্ষে নিজেকে লৈঙ্গিকভাবে পৃর্থক ভাবাই কঠিন। যেমন ছেলেদের বেলা, তেমনি মেয়েদের বেলাও সবার আগে দেহ হচ্ছে এক ব্যক্তিতার বিকিরণ, এটা এমন এক হাতিয়ার, যা সম্ভব করে তোলে বিশ্বকেবোঝা : হাত দিয়ে, চোখ দিয়ে শিশুরা বোঝে বিশ্বকে, যৌনাঙ্গ দিয়ে নয়। জন্মলাভের ও দুধ ছাড়ানোর নাটক একইভাবে উন্মোচিত হয় উভয় লিঙ্গের শিশুর কাছেই; এগুলোর আকর্ষণ ও আনন্দ একই; স্তন্যপান প্রথমে তাদের সবচেয়ে সুখকর ইন্দ্রিয়ানুভূতিগুলোর উৎস; তারপর তারা যায় এক পায়ুপর্বের ভেতর দিয়ে, যখন মলমূত্র ত্যাগে তারা পায় তাদের চরম সুখ, যা দুজনে একই রকম। তাদের যৌনাঙ্গের বিকাশও একই রকম; তারা একই আগ্রহে ও একই নৈর্ব্যক্তিকতার সাথে লাভ করে নিজেদের শরীর সম্বন্ধে জ্ঞান; ভগাঙ্কুর ও শিশ্ন থেকে তারা পায় একই রকম অস্পষ্ট সুখ। তাদের সংবেদনশীলতার যেহেতু দরকার হয়একটা বস্তু, তাই সেটি হয় মায়ের অভিমুখি : কোমল, মসৃণ, স্থিতিস্থাপক নারীশরীর জাগায় যৌনকামনা, এবং এ-কামনাগুলো পরিগ্রাহী; ছেলের মতোই আক্রমণাত্মকভাবে মেয়ে চুমো খায় তার মাকে, তাকে নাড়াচাড়া করে, আদর করে; আরেকটি নতুন শিশু জন্ম নিলে তারা বোধ করে একই রকম ঈর্ষা। বারো বছর বয়স পর্যন্ত বালিকা থাকে তার ভাইদের মতোই সবল, এবং তার থাকে একই মনোবল; কোনোক্ষেত্রেই সে তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত থাকে না। বয়ঃসন্ধির বেশ আগে এবং কখনো কখনো শৈশবের শুরু থেকেই, মেয়েকে যদি আগে থেকেই লৈঙ্গিকভাবে নির্ধারিত মনে হয় আমাদের, সেটা এজন্যে নয় যে রহস্যময় প্রবৃত্তি তাকে সরাসরি দণ্ডিত করেছে অক্রিয়তা, ছেনালিপনা, মাতৃত্বের জন্যে; বরং এজন্যে যে প্রায় শুরু থেকেই শিশুর ওপর অন্যদের প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, এবং এভাবে শৈশব থেকেই তাকে দীক্ষিত করা হয় তার বৃত্তিতে।
নবজাতক শিশুর কাছে বিশ্ব প্রথম ধরা পড়ে শুধু তার সহজাত ইন্দ্রিয়ানুভূতির সাহায্যে; সে তখনও মগ্ন থাকে সমগ্রের বুকে যেমন ছিলো যখন সে ছিলো অন্ধকার জরায়ুর ভেতরে; যখন তার মুখে দেয়াহয় স্তন বা দুধের বোতল তখনও সে পরিবৃত থাকে মায়ের মাংসের উষ্ণতা দিয়ে। একটু একটু করে সে নিজের থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন বলে বুঝতে শেখে বস্তুদের, এবং নিজেকে তাদের থেকে পৃথক করতে পারে।এর মাঝে কম বা বেশি নৃশংসভাবে তাকে বিচ্ছিন্ন করা হয় পুষ্টিকর শরীরটি থেকে। অনেক সময় শিশু প্রচণ্ড সংকট দিয়ে এ-বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানায়, তা যাই থোক, যখন এ-বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণতা লাভ করে, হয়তো ছ-মাস বয়সে, তখন শিশু নানা রকম অনুকৃতির মাধ্যমে দেখাতে থাকে অন্যদের আকৃষ্ট করার বাসনা, যা পরে হয়ে ওঠে আসলে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা। নিশ্চিতভাবেই এ-মনোভাব একটা সুবিবেচিত পছন্দের মাধ্যমে ঘটে না। দুধের শিশু প্রত্যক্ষভাবে যাপন করে প্রতিটি অস্তিত্বশীলের মৌল নাটক : অপর-এর সঙ্গে তার সম্পর্কের নাটক। মানসিক যন্ত্রণার সাথে পুরুষ বোধ করে তার বাঁধনমুক্তি, তার অসহায়ত্ব। তার স্বাধীনতা, তার মন্ময়তা থেকে পলায়নের সময় সে নিজেকে সানন্দে হারাতে চায় সমগ্রের বুকে। এখানেই, আসলে, আছে তার বিস্মৃতির জন্যে আকুলতার জন্যে, নিদ্রার জন্যে, পরমোল্লাসের জন্যে, মৃত্যুর জন্যে মহাজাগতিক সর্বেশ্বরবাদী স্বপ্নের উৎস।
এ-পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যাখ্যা করতে হবে শিশুর আচরণ : দৈহিক রূপে এক অদ্ভুত বিশ্বে সে আবিষ্কার করে সসীমতা, একাকীত্ব, অসহায় পরিত্যাগ। সে তার অস্তিত্বকে একটি মূর্তিতে প্রক্ষেপ করে প্রয়াস চালায় এ-বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণের, অন্যরা প্রতিষ্ঠিত করবে যার বাস্তবতা ও মূল্য। এমন মনে হয় যে সে-সময় সে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করতে শুরু করে তার স্বরূপ যখন সে আয়নায় চিনতে পারে তার। প্রতিফলন–এ-সময়টা মিলে যায় দুধ ছাড়ার সময়ের সাথে : তার অহং এতোটা পরিপূর্ণভাবে অভিন্ন হয়ে হয়ে ওঠে এ-প্রতিফলিত ছবির সাথে যে প্রক্ষিপ্ত হয়েই শুধু এটি গঠিত হয়। আয়না প্রকৃতপক্ষে একটি বড়ো ভূমিকা পালন করুক বা না করুক, এটা নিশ্চিত যে শিশু ছ-মাস বয়সের দিকে তার বাবা-মাকে অনুকরণ করতে, এবং তাদের স্থিরদৃষ্টির তলে সে নিজেকে একটি বস্তু হিশেবে গণ্য করতে শুরু করে। ইতিমধ্যেই সে হয়েউঠেছে এক স্বায়ত্তশাসিত কর্তা, যে সীমাতিক্রমণ করতে শুরু করেছে বাইরের বিশ্বের দিকে; কিন্তু সে নিজের মুখোমুখি হয় শুধু এক প্রক্ষিপ্ত রূপে।
যখন শিশু আরো বেড়ে ওঠে, আদি পরিত্যাগের বিরুদ্ধে সে লড়াই করে দুরকমে। সে উদ্যোগ নেয় বিচ্ছিন্নতাকে অস্বীকার করার : মায়ের বাহুতে গিয়ে পড়ে সে খোঁজে তার সজীব উষ্ণতা এবং দাবি করে তার আদর। এবং সে নিজের যাথার্থ প্রতিপাদন করতে চায় অন্যদের অনুমোদনের মাধ্যমে। তার কাছে প্রাপ্তবয়স্কদের মনে হয় দেবতা, কেননা তাদের আছে তাকে অস্তিত্বে ভূষিত করার ক্ষমতা। সে অনুভব করে এ-বোধের যাদু, যা তাকে একবার পরিণত করে আনন্দদায়ক ছোট্ট দেবতায়, আবার পরিণত করে দানবে। প্রথম তিন-চার বছর ছেলে ও মেয়ের মনোভাবের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না; উভয়েই চায় দুধ ছাড়ার আগে তারা যে-সুখের মধ্যে ছিলো, সে-অবস্থাটিকে স্থায়ী করে রাখতে; উভয় লিঙ্গেই দেখা দেয় অন্যদের মনে প্রলোভন জাগানোর ও নিজের গরিমা প্রদর্শনের স্বভাব : তাদের বোনদের মতোই ছেলেরাও চায় বড়োদের খুশি করতে, তাদের হাসাতে, তাদের প্রশংসা পেতে।
