কিংবদন্তি হচ্ছে মিথ্যে বস্তুনিষ্ঠতার এক ফাঁদ, যার দিকে হঠকারীর মতো ছুটে যায় সে-পুরুষ, যে নির্ভর করে আগে-থেকে-প্রস্তুত মূল্যায়নে। এখানে আমরা আবার। জড়িয়ে পড়ি বাস্তবিক অভিজ্ঞতার স্থানে বসানো একগুচ্ছ মূর্তি এবং এর জন্যে দরকার যে-মুক্তমনের বিচার, তার সাথে। একজন স্বায়ত্তশাসিত অস্তিত্বের সঙ্গে খাঁটি সম্পর্কের স্থানে নারীর কিংবদন্তি স্থাপন করে মরীচিকার এক অপরিবর্তনীয় ধারণা। ‘মরীচিকা! মরীচিকা’! চিল্কার করে ওঠেন লাফৰ্গ। ‘আমাদের উচিত তাদের খুন করা, কেননা তাদের আমরা বুঝতে পারি না; তার চেয়ে ভালো তাদের অষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া, শিক্ষা দেয়া, এমন করা যাতে তারা ছেড়ে দেয় তাদের রত্নের জন্যে রুচি, তাদের করে তুলতে হবে আমাদের সত্যিকারের সমান সঙ্গী, আমাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু, তাদের ভিন্নভাবে পোশাক পরাতে হবে, তাদের চুল ছোটো করে ছাটাতে হবে, যাকিছু এবং সব কিছু বলতে হবে তাদের সাথে’। পুরুষ যদি নারীকে প্রতীকের ছদ্মবেশ পরানো ছেড়ে দেয়, তাহলে পুরুষের কোনো ক্ষতি নেই। লাক্লস, স্তেদাল, হেমিংওয়ের নায়িকাদের কোনো রহস্য নেই, সেজন্যে তারা কম আকর্ষণীয় নয়। নারীর মধ্যে একজন মানুষকে স্বীকার করলে পুরুষের অভিজ্ঞতা দরিদ্র হয়ে ওঠে না : এতে এর বৈচিত্র্য, এর ঐশ্বর্য, বা এর তীব্রতা এতোটুকুও কমে না, যদি তা ঘটে দুটি মানুষের মধ্যে। সমস্ত কিংবদন্তি বর্জন করা হলে ধ্বংস করা হয় না দুটি লিঙ্গের সব নাটকীয় সম্পর্ক, পুরুষের কাছে নারীর বাস্তবতা দিয়ে খাঁটিরূপে প্রকাশিত তাৎপর্য এতে অস্বীকার করা হয় না; এতে বাতিল হয় না কবিতা, প্রেম, অভিযাত্রা, সুখ, স্বপ্নদেখা। যা চাই, তা হচ্ছে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে আচরণ, ভাবাবেগ, সংরাগ।
‘হারিয়ে গেছে নারী। নারীরা কোথায়? আজকালকার নারীরা নারীই নয়!’ আমরা দেখেছি এসব রহস্যময় পদ কী অর্থ বোঝায়। পুরুষদের চোখে এবং সেনারীবাহিনী, যারা দেখে পুরুষদের চোখ দিয়ে, তাদের কাছে- নারীর শরীর থাকা বা স্ত্রী অথবা মা হিশেবে নারীর কাজগুলো করাই ‘খার্টি নারী’ হওয়ার জন্যে যথেষ্ট নয়। কামে ও মাতৃত্বে কর্তা হিশেবে নারী স্বায়ত্তশাসন দাবি করতে পারে; তবে ‘খাঁটি নারী’ হওয়ার জন্যে নিজেকে তার স্বীকার করে নিতে হবে অপর-রূপে। আজকালকার পুরুষেরা দেখিয়ে থাকে মনোভাবের এক ধরনের কপটতা, যা নারীর মনে সৃষ্টি করে বেদনাদায়ক ক্ষত : সব মিলিয়েতারা নারীকে একজন সহচর মানুষ, একজন সমান মানুষ হিশেবে মেনে নিতে চায়; কিন্তু তবু চায় যে নারী থাকবে অপ্রয়োজনীয়। নারীর কাছে এ-দুটি নিয়তি অসুঙ্গতিপূর্ণ একটির সাথেও ঠিকমতো মেলাতে না পেরে সে দুলতে থাকে একটি থেকে আরেকটিতে, এবং এ থেকে জন্মে তার ভারসাম্যের অভাব। পুরুষের কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে কোনো ছেদ নেই : কাজকর্মে ও বিশ্বে পুরুষ যতো বেশি প্রতিষ্ঠা করে তার অধিকার, তাকে দেখায় ততো বেশি পৌরুষসম্পন্ন; তার মধ্যে মিলিত হয় মানবিক ও প্রাণশক্তিগত গুণগুলো। আর সেখানে নারীর স্বাধীন সাফল্যগুলো তার নারীত্বের বিরোধী; কেননা ‘খাঁটি নারী’র কাছে চাওয়া হয় যে নিজেকে সে করে তুলবে বস্তু, করে তুলবে অপর।
এটা খুবই সম্ভব যে সংশোধিত হতে চলছে পুরুষের সংবেদনশীলতা ও যৌনতা। ইতিমধ্যেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন সৌন্দর্যতত্ত্ব। সমতল বুক ও সংকীর্ণ নিতম্বের ফ্যাশন–ছেলেদের মতো অবয়ব–যদিও টিকেছে স্বল্প সময় ধরে, তবু অতীত শতাব্দীগুলোর অতি-অতি-বৃদ্ধিশীল আদর্শ আর ফিরে আসে নি। চাওয়া হয় যে নারীর দেহ হবে মাংস, তবে সতর্কভাবে; এটাকে হতে হবে তন্বী এবং মেদে বোঝাই হতে পারবে না; হতে হবে পেশল, কোমল, সবল, এটাকে জ্ঞাপন করতে হবে। সীমাতিক্ৰমণতার ব্যঞ্জনা; অতিশয় ছায়াবৃত উষ্ণগৃহের উদ্ভিদের মতো বিবর্ণ হবে না এটা, তবে ভালো হয় যদি হয় রোদে-খোলা-থেকে কর্মজীবী পুরুষের কবন্ধের মতো রোদ-পোড়া তামাটে। নারীর পোশাক ব্যবহারিক হয়ে উঠছে বলে তাকে কামহীন দেখালে চলবে না : বরং ঘটেছে উল্টোটা, খাটো স্কার্ট পা ও উরুকে করে তুলেছে এতো আকর্ষণীয় যে তা আগে কখনো ঘটে নি। কাজ যে কেড়ে নেবে নারীর যৌনাবেদন তার কোনো কারণ নেই। নারীকে একই সঙ্গে একজন সামাজিক ব্যক্তি ও কামের শিকার বলে ভাবা বেশ পীড়াদায়ক।
যা নিশ্চিত তা হচ্ছে আজ নারীদের পক্ষে একই সাথে স্বায়ত্তশাসিত মানুষ হিশেবে তাদের মর্যাদা ও তাদের নারীসুলভ নিয়তি মেনে নেয়া খুবই কঠিন; এটা সে-নির্বোধ ভুল ও অস্থিরতার উৎস, যার জন্যে তাদের কখনো কখনো মনে করা হয় ‘বিলুপ্ত লিঙ্গ’। সন্দেহ নেই যে মুক্তির জন্যে কাজের থেকে অন্ধ দাসত্বের কাছে আত্মসমর্পণ অনেক বেশি আরামপ্রদ : মৃতরা জীবিতদের থেকে অনেক ভালোভাবে খাপ খায় মাটির সাথে। সব দিক দেয়ই অতীতে ফেরা যতোটা কাম্য, তার থেকে বেশি অসম্ভব। যা অবশ্যই আশা করতে হবে, তা হচ্ছে যে-পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে যাচ্ছে, পুরুষদের তা অকুণ্ঠিতচিত্তে মেনে নিতে হবে; শুধু তখনই নারী সে-পরিস্থিতিতে বাস করতে পারবে মানসিক যন্ত্রণা ছাড়া। তখনই পাওয়া যাবে লাফর্গের প্রার্থনার উত্তর : ‘আহ, তরুণীরা, কখন তোমরা হবে আমাদের ভাই, অন্তরঙ্গভাবে আমাদের ভাই পরিশেষে শোষিত হওয়ার ভয় ছাড়া? কখন আমরা সত্যিকারভাবে ধরবো হাত শক্ত করে?’ তখন ব্রেতোর ‘মেলুসিন, আর থাকবে না পুরুষ কর্তৃক তার ওপর চাপিয়ে দেয়া দুর্যোগের ভারের নিচে। মুক্ত মেলুসিন…’ ফিরে পাবে মানুষের মাঝে তার স্থান। তখন সে হবে একজন সম্পূর্ণ মানুষ, ‘যখন রাবোর চিঠি থেকে উদ্ধৃত করছি, নারীর অসীম দাসত্ব ধ্বংস হবে, যখন সে নিজের মধ্যে ও নিজের জন্যে বাঁচবে, পুরুষ–এ-পর্যন্ত ঘৃণার্হ –তাকে হতে দেবে স্বাধীন’।
শৈশব
ভাগ ৪ – গঠনের বছরগুলো। পরিচ্ছেদ ১ – শৈশব
