অধিকাংশ নারীর জন্যেই সীমাতিক্রমণের পথ রুদ্ধ : কেননা তারা কিছুই করে না, তাই তারা নিজেদের কিছু করে তুলতে ব্যর্থ হয়। তারা নিরন্তর ভাবে তারা কী হতে পারতো, এবং এটা তাদের মনে প্রশ্ন জাগায় তারা কী? এটা এক নিষ্ফল প্রশ্ন। পুরুষ যে ব্যর্থ হয় নারীত্বের গূঢ় সারসত্তা আবিষ্কারে, তা শুধু এজন্যে যে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। বিশ্বের প্রান্তিক অবস্থানে রেখে এ-বিশ্ব দিয়ে নারীকে বস্তুনিষ্ঠভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে না; তার রহস্য শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই লুকিয়ে রাখে না।
এছাড়াও, সব উৎপীড়িতের মতোই, নারী ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করে রাখে তার বস্তুগত সত্য; দাস, ভৃত্য, দরিদ্র, যারা নির্ভরশীল কোনো প্রভুর-খেয়ালখুশির ওপর, তারা সবাই তার দিকে মেলে রাখতে শেখে একটি পরিবর্তনহীন হাসি বা একটা বিভ্রান্তিকর নির্বিকারত্ব; আসল ভাবাবেগ, বাস্তবিক আচরণ তারা সযত্নে গোপন করে রাখে। অধিকন্তু কিশোরী বয়স থেকে নারীকে শেখানো হয় পুরুষের কাছে মিথ্যে কথা বলতে, ফন্দি আঁটতে, ধূর্ত হতে। পুরুষের সাথে কথা বলার সময় সে মুখের ওপর পরে থাকে একটা কৃত্রিম ভাব; সে সতর্ক,কপটতাপূর্ণ, সে করে অভিনয়।
কিন্তু কিংবদন্তিমূলক চিন্তাধারায় শনাক্ত করা হয়েছে যে-নারীত্বের রহস্য, তা এক গভীরতর ব্যাপার। আসলে, এটা অবিলম্বে জ্ঞাপন করা হয় ধ্রুব অপর-এর পুরাণে। বিশুদ্ধ সীমাবদ্ধ রূপে এটা স্পষ্টতই হবে এক রহস্য। এটা নিজেই হবে এক রহস্য এ-ঘটনা থেকে যে এটা নিজের কাছেই রহস্য; এটা হবে ধ্রুব রহস্য।
একইভাবে এটা সত্য যে তাদের আসল মনোভাব গোপন করে রাখার ফলে সৃষ্টি হয় যে-গোপনীয়তা, তার বাইরে ততোখানি রহস্যই থাকে কৃষ্ণকায়ে, পীতকায়ে, যতোখানি ধ্রুবভাবে তাদের মনে করা হয় পরিহার্য অপর। লক্ষ্য করা যেতে পারে যে আমেরিকার নাগরিকেরা গভীরভাবে হতবুদ্ধি করে গড়পড়তা ইউরোপীয়দের, কিন্তু কেউ তাদের কখনো ‘রহস্যময়’ মনে করে না : স্ত্রভাবে তারা বলে যে আমেরিকার নাগরিকদের তারা বুঝতে পারে না। এবং একইভাবে নারীও সব সময় পুরুষকে ‘বোঝে’ না; তাই বলে পুরুষের রহস্য বলে কোনো জিনিশ নেই। ব্যাপার হচ্ছে ধনী আমেরিকা, এবং পুরুষ, আছে প্রভুর ধারে, আর দাসদেরই আছে রহস্য।
একথা সত্য, রহস্যের সদর্থক বাস্তবতা সম্পর্কে আমরা ধ্যান করতে পারি শুধু প্রতারণা করার উদ্দেশ্যের প্রদোষকালীন পার্শ্বপথে; কিন্তু কোনোকোনো গৌণ দৃষ্টিভ্রমের মতোই তার দিকে একদৃষ্টে তাকালে, তা অদৃশ্যে মিলিয়ে যায়। ‘রহস্যময়ী’ নারীদের চিত্রিত করতে গিয়ে সাহিত্য সব সময়ই ব্যর্থ হয়; শুধু উপন্যাসের শুরুতেই। তারা দেখা দেয় অদ্ভুত, বিভ্রান্তিকর চরিত্ররূপে; কিন্তু গল্পটি যদি অসমাপ্ত থেকে না যায়, তবে শেষে তারা ত্যাগ করে তাদের রহস্য এবং তারপর হয়ে ওঠে নিতান্তই সামঞ্জস্যপূর্ণ ও স্বচ্ছ মানুষ। উদাহরণস্বরূপ, পিটার শিনির বইগুলোর নায়কেরা সব সময়ই বিস্মিত হয়নারীদের অভাবিত চপলতায় : তারা কখন কী করবে সে-সম্পর্কে আগে থেকে কোনো ধারণাই করা যায় না, তারা সব হিশেবনিকেশকে বিপর্যস্ত করেদেয়। ঘটনা হচ্ছে একবার যখন পাঠকদের কাছে প্রকাশ পেয়ে যায় তাদের কার্যকলাপের কারণ, তখন দেখা যায় যে ওগুলো কাজ সাধনের খুবই সরল পদ্ধতি : এ-নারীটি ছিলো একটি গুপ্তচর, ওইটি ছিলো চোর; প্লট যতোই চাতুর্যপূর্ণই হোক-নাকেননা, রহস্যের জট খোলার একটি চাবি থাকে সব সময়ই; লেখকের যদি থাকতো বিশ্বের সমস্ত প্রতিভা ও কল্পনাশক্তি, তাহলে এটা অন্য রকম হতে পারতো না। রহস্য কখনোই মরীচিকার থেকে বেশি কিছু নয়, দেখার জন্যে আমরা যখন কাছাকাছি আসি, তখন তা অদৃশ্য হয়ে যায়।
আমরা দেখতে পাই যে পুরুষের কাছে তার উপকারিতা দিয়েই অনেকাংশে ব্যাখ্যা করা যায় কিংবদন্তি। নারীর কিংবদন্তি একটা বিলাস। এটা দেখা দিতে পারে তখন, পুরুষ যখন মুক্তি পায় তার জীবনযাপনের জরুরি চাহিদাগুলো থেকে; সম্পর্কগুলো যতো বাস্তবিকভাবে যাপিত হয়, ততোই কম আদর্শায়িত হয়। প্রাচীন মিশরের ফেলা, বেদুইন চাষী, মধ্যযুগের কারিগর, আজকের শ্রমিক তার বিশেষ নারীটির সাথে সম্পর্কে থাকে তার কাজ ও দারিদ্র্যের মধ্যে, তা এতো সুনির্দিষ্ট যে তাকে কোনো শুভ বা অশুভ অলৌকিক আভা দিয়ে অলঙ্কৃত করা যায় না। যেসব পর্ব ও সামাজিক শ্রেণী স্বপ্ন দেখার মতো অবকাশ পেয়েছিলো, সেগুলোই সৃষ্টি করেছে নারীত্বের, শাদা বা কালো, ভাবমূর্তি। তবে বিলাসের সাথে ছিলো উপযোগীতাও; এসব স্বপ্ন অপ্রতিরোধ্যভাবে চালিত হয়েছিলো স্বার্থ দিয়ে। এসব কিংবদন্তির মাধ্যমে কার্যকর রীতিতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজগুলো ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলোতাদের বিধিবিধান ও প্রথা; কিংবদন্তিরূপেই গোত্রীয় অবশ্যকর্তব্যগুলো প্রত্যেকের চেতনায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিলো বিশ্বাসরূপে। ধর্ম, প্রথা, ভাষা, কাহিনী, গান, চলচ্চিত্র প্রভৃতি যোগাযোগমাধ্যমের ভেতর দিয়ে এসব কিংবদন্তি ঢোকে এমন সব মানুষের মধ্যেও, যারা খুবই কঠোরভাবে আবদ্ধ বাস্তুব অবস্থার দাসত্বে। এতে প্রত্যেকে দেখতে পায় তার নীরস অভিজ্ঞতাগুলোর শোধিত রূপ: যে-নারীকে সে ভালোবাসে, তার দ্বারা প্রতারিত হয়ে সে ঘোষণা করে যে নায় এক বাতিকগ্রস্ত জরায়ু; অন্য কেউ তার নপুংসকতা দিয়ে আবিষ্ট হয়ে নারীকে বলে আরাধনাকারী ম্যান্টিস; আবার একজন উপভোগ করে তার স্ত্রীর সঙ্গ : দ্যাখো, নারী হচ্ছে সঙ্গতি, বিশ্রাম, সুপ্রসন্ন মৃত্তিকা। পকেট-মাপের একটি ধ্রুবর বিনিময়ে, যা থাকে অধিকাংশ পুরুষেরই, চিরন্তনের জন্যে অভিরুচি পরিতৃপ্ত হয় কিংবদন্তিতে। ক্ষুদ্রতম আবেগ, তুচ্ছ বিরক্তি হয়ে ওঠে এক শাশ্বত ধারণার প্রতিফলন–এমন এক প্রতিভাস, যাতে অহমিকা বোধ করে প্রীতিকর শ্লাঘা।
