শাসক জাতের কাছে কম কিংবদন্তিই বেশি সুবিধাজনক হয়েছে নারীকিংবদন্তির থেকে : এটা প্রতিপাদন করে সমস্ত বিশেষাধিকারের যাথার্থ্য, এমনকি অনুমোদন করে সেগুলোর অপব্যবহার। শারীরবৃত্তিক যে-সব দুঃখকষ্ট ও ভার নারীর নিয়তি, সেগুলো দূর করা নিয়ে পুরুষের মাথাব্যথা নেই, কেননা সেগুলো ‘প্রকৃতির ঈপ্সিত’ : সেগুলোর অজুহাতে পুরুষ বরং বাড়িয়ে চলে নারীর দুঃখকষ্ট, যেমন, কামসুখ লাভের কোনো অধিকার দেয়া হয় না নারীকে, তাকে খাটতে বাধ্য করা হয় ভারবাহী পশুর মতো।
এসব কিংবদন্তির মধ্যে নারীর ‘রহস্য’-এর কিংবদন্তিটি পুরুষের মনে যতোটা দৃঢ়ভাবে নোঙর ফেলে আছে, ততোটা আর কোনো কিংবদন্তি নয় এর আছে অজং সুবিধা। প্রথমত, যা কিছু অব্যাখ্যেয় মনে হয়, এটা দিয়ে সে-সব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়; যে-পুরুষ নারীকে বোঝে না, সে সুখ পায় মনের একটা মন্ময় উনতাকে বস্তুগত প্রতিরোধ দিয়ে বদল করে; নিজের অজ্ঞতা স্বীকারের বদলে সে নিজের। বাইরে বোধ করে এক ‘রহস্য’-এর উপস্থিতি; এ এমন এক অজুহাত, যা একসঙ্গে তুষ্ট করে আলস্য ও অহমিকাকে। প্রেমাহত হৃদয় এভাবে এড়িয়ে যায় বহু নিরাশা : প্রেমিকার আচরণ যদি হয়খামখেয়ালপুর্ণ, কথাবার্তা হয় মূঢ়, তাহলে এসব কিছুকে অব্যাহতি দেয়ার কাজ করে এ-রহস্য এবং পরিশেষে, আবার রহস্যের কল্যাণে, স্থায়ী করা হয়সে-নঞর্থক সম্পর্ক কিয়র্কেগার্দের কাছে যা অশেষভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিলো সদর্থক অধিকারের থেকে।
নারী, এক অর্থে, নিশ্চয়মই রহস্যময়, মেটারলিংকের ভাষায় ‘যেমন সমগ্র বিশ্বই রহস্যময়’। পুরুষ নারীর কামসুখের রীতি, ঋতুস্রাবের ঝামেলা, এবং সন্তান প্রসবের যন্ত্রণা সম্পর্কে অজ্ঞ। সত্য হচ্ছে দু-পক্ষেই আছে রহস্য : পুংলিঙ্গসম্পন্ন অপরূপে, প্রত্যেক পুরুষেরও আছে আন্তর একটি রূপ, একটি অন্তর্গত সত্তা, যা নারীর পক্ষে অভেদ্য; অন্যদিকে নারীও অজ্ঞ পুরুষের কামসুখ সম্পর্কে। কিন্তু যে-বিশ্বজনীন সূত্র আমি বর্ণনা করেছি, সে-অনুসারে পুরুষ যে-সমস্ত ধারণা দিয়ে বিশ্ব সম্পর্কে চিন্তা করে সেগুলো তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, ধ্রুরূপে প্রতিষ্ঠিত : এখানে, যেমন সবখানে, তারা পারস্পরিকতাকে ঠিকভাবে বুঝতে পারে না। পুরুষের কাছে এক রহস্য, তাই নারীকে বিবেচনা করা হয় সারসত্তায় রহস্যময়।
তার পরিস্থিতি খুবই দায়ী নারী সম্পর্কে এ-ধারণার জন্যে। তার শারীরবৃত্তিক প্রকৃতি খুবই জটিল : সে নিজে এর এমন অধীন যেনো সে অনুবর্তী বাইরের কোনো নিরর্থক কাহিনীর; তার দেহকে নিজের সুস্পষ্ট প্রকাশ বলে মনে হয় না তার কাছে; এর ভেতরে তার নিজেকেই নিজের অচেনা মনে হয়।
তবে সাধারণভাবে যাকে নির্দেশ করা হয় রহস্য বলে, তা সচেতন সত্তার কোনো মন্ময় একাকীত্বও নয়, গোপন জৈবিক জীবনও নয়। শুধুযোগাযোগের স্তরেই শব্দটি প্রকাশ করে তার প্রকৃত অর্থ : এটা কোনো শুদ্ধ নিঃশব্দতায়, অন্ধকারে, অনুপস্থিতিতে পরিণত করা নয়, এটা জ্ঞাপন করে এক বিভ্রান্তিকর রূপ, যা নিজেকে প্রকাশ করতে ও স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। নারী এক রহস্য, একথা বলার অর্থ এ নয় যে সে নীরব, বরং এর অর্থ হচ্ছে তার ভাষা দুর্বোধ্য; সে আছে, কিন্তু অবগুণ্ঠনের আড়ালে ঢাকা; এসব অনিশ্চিত রূপ পেরিয়ে সে আছে। সে কী? দেবদূতী, দানবী, অনুপ্রাণিত, অভিনেত্রী? মনে করা যেতে পারে যে এসব প্রশ্নের উত্তর আছে, কিন্তু সেগুলো আবিষ্কার করা অসম্ভব, অথবা এও মনে করা যেতে পারে কোনো উত্তরই যথার্থ নয়, কেননা এক মৌল দ্ব্যর্থবোধকতা নারীসত্তার বৈশিষ্ট্যসূচক লক্ষণ : হয়তো নিজের অন্তরে সে নিজের কাছেও অনিরূপণীয় : একটি স্ফিংক্স।
প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে সে কী তা স্থির করতে গিয়ে সে-ই ব্ৰিত বোধ করবে; তবে এটা এজন্যে নয় যে গৃঢ় সত্যটি এতোই অস্বচ্ছ যে শনাক্ত করা যায়না : এটা এজন্যে যে এ-এলাকায় কোনো সত্য নেই। একজন অস্তিত্বশীল যা করে, সে তা ছাড়া আর কিছুই নয়; সম্ভবপর বাস্তবকে পেরিয়ে ছড়িয়ে থাকে না, সারসত্তা অস্তিত্বের পূর্ববর্তী নয় : বিশুদ্ধ মন্ময়তায়, মানুষ কিছু নয়। তাকে পরিমাপ করতে হবে তার কাজ দিয়ে। কোনো কৃষাণী সম্পর্কে কেউ বলতে পারে যে সে একটি ভালো বা। খারাপ শ্রমিক, কোনো অভিনেত্রী সম্পর্কে বলা যায় যে তার প্রতিভা আছে বা নেই; কিন্তু কেউ যদি কোনো নারীকে বিবেচনা করে তার সীমাবদ্ধ রূপে, তার আন্তর সত্তায়, তাহলে আসলে তার সম্পর্কে কিছুই বলা সম্ভব নয়, তখন তার কোনো বৈশিষ্ট্যই থাকে। তার কাম বা দাম্পত্য সম্পর্ক, সমস্ত সম্পর্কে, নারী যেখানে একটি অনুগত দাসী, অপর, তাকে সেখানে দেখা হয় তার সীমাবদ্ধতার মধ্যে। লক্ষণীয় যে নারী সহকর্মীদের, সহচরদের কোনো রহস্য নেই; অন্য দিকে, যদি অনুগত দাসটি হয় পুরুষ, যদি একজন প্রবীণ বা ধনী নারী বা পুরুষের কাছে তরুণটি, উদাহরণস্বরূপ, পালন করে পরিহার্য বস্তুর ভূমিকা, তখন সেও হয়ে ওঠে রহস্যাবৃত। এটা আমাদের কাছে উন্মোচন করে নারীর রহস্যের তলদেশের এক ভিত্তিমূল, যা প্রকৃতিতে আর্থনীতিক।
কোনো ভাবাবেগকে কোনো বস্তু বলে মনে করা যায় না। জিদ লিখেছেন, ‘ভাবাবেগের ক্ষেত্রে বাস্তবিককে কাল্পনিকের থেকে পৃথক করা হয় না’। কাল্পনিক ও বাস্তবিকের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব শুধু আচরণ দিয়ে। পুরুষ যেহেতু পৃথিবীতে আছে এক সুবিধাপ্রাপ্ত অবস্থানে, সে সক্রিয়ভাবে দেখাতে পারে তার প্রেম; অনেক সময় সে ভরণপোষণ করে নারীটির, বা কমপক্ষে আর্থিকভাবে সাহায্য করে; নারীটিকে বিয়ে করে তাকে দেয় সামাজিক মর্যাদা; সে তাকে উপহার দেয়; তার আর্থিক ও সামাজিক স্বাধীনতা তাকে উদ্যোগ নিতে সাহায্য করে। অধিকাংশ সময়ই পুরুষটি থাকে ব্যস্ত, নারীটি কর্মহীন : পুরুষটি যতোক্ষণ নারীটির সাথে থাকে ততোক্ষণ সে নারীটিকে সময় দেয়, নারীটি নেয় : তা কি সুখের সাথে, সংরাগের সাথে, না কি শুধু প্রমোদের জন্যে? নারীটি কি এসব গ্রহণ করে প্রেমে, না কি নিজের স্বার্থে? সে কি তার স্বামীকে বা তার বিয়েকে ভালোবাসে? এমনকি পুরুষটির প্রমাণও দ্ব্যর্থতাবোধক : এটা-সেটা উপহার কি ভালবেসে দেয়া হয়েছে, না কি করুণা করে? কিন্তু কোনো নারী যখন কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্কবশত পায়অজস্র সুবিধা, তখন কোনো নারীর সঙ্গে কোনো পুরুষের সম্পর্ক পুরুষটির জন্যে ততোটা মাত্র লাভজনক যতোটা সে ভালোবাসে নারীটিকে। তাই তার মনোভাবের সম্পূর্ণ চিত্র থেকে তার প্রীতির মাত্রা অনেকটাই নির্ণয় করা যায়।
