কিংবদন্তি আছে নানা ধরনের। মানুষের অবস্থার এক অপরিবর্তনীয় দিককে পরিশোধিত করে–যেমন, মানবজাতিকে ‘ভাগ’ করা হয় দু শ্রেণীর মানুষে–এটি, নারীর কিংবদন্তিটি, এক অনড় কিংবদন্তি। প্লাতোয়ী ভাবের জগতে এটা প্রক্ষেপ করে এমন এক বাস্তবতা, যার অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে প্রত্যক্ষভাবে বা ধারণাবদ্ধ করা হয়েছে অভিজ্ঞতা ভিত্তি করে; ঘটনা, মূল্য, তাৎপর্য জ্ঞান, পর্যবেক্ষণলব্ধ সূত্রের বদলে এটা গ্রহণ করে এক লোকোত্তর ভাব, যা শাশ্বত, অপরিবর্তনীয়, প্রয়োজনীয়। এ-ভাব বিতর্কের উর্ধ্বে, কেননা এটা বিদ্যমানের বাইরের : এটা ভূষিত ধ্রুব সত্যে। তাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, ঘটনাচক্রজাত, নানা ধরনের জীবন যাপনকারী বাস্তব নারীদের বিপক্ষে এ-কিংবদন্তিমূলক চিন্তা উপস্থাপন করে চিরন্তনী নারী, যা অনন্য ও অপরিবর্তনীয়। যখন রক্তমাংসের নারীদের আচরণ বিরুদ্ধে যায় নারীধারণার এসংজ্ঞার, তখন বাস্তব নারীদেরই নির্দেশ করা হয় ভুল বলে : বলা হয় না যে নারীত্ব একটা ভুল ধারণা, বরং বলা হয় সংশ্লিষ্ট নারীরাই নারীধর্মী নয়। কিংবদন্তির বিরুদ্ধে অভিজ্ঞতার সত্যগুলো অচল। তবে, একভাবে, এর উৎস আছে অভিজ্ঞতার মধ্যেই। এটা খুবই সত্য যে নারী পুরুষ থেকে ভিন্ন, এবং এ-ভিন্নতা প্রত্যক্ষভাবে অনুভূত হয় বাসনায়, আলিঙ্গনে, প্রেমে; কিন্তু প্রকৃত সম্পর্কটি হচ্ছে এক পারস্পরিকতার সম্পর্ক; এভাবে এটা সৃষ্টি করে খাঁটি নাটক। কাম, প্রেম, বন্ধুতু, এবং এগুলোর বিপরীতগুলো, যেমন, প্রতারণা, ঘৃণা, প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে সম্পর্কটি হচ্ছে দুটি সচেতন সত্তার মধ্যে যুদ্ধ, যাদের প্রত্যেকেই হতে চায় অপরিহার্য, এটা হচ্ছে স্বাধীন সত্তাদের পারস্পরিক স্বীকৃতি, যারা প্রতিপন্ন করে পরস্পরের স্বাধীনতা, এটা হচ্ছে বিরূপতা থেকে অংশগ্রহণের দিকে অস্বচ্ছ উত্তরণ। নারীর অবস্থান নেয়া হচ্ছে ধ্রুব অপর-এর অবস্থান নেয়া, যাতে কোনো পারস্পরিকতা নেই, সে যে একজন কর্তা, একজন সহচর মানুষ, সমস্ত অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে তা অস্বীকার করা।
বাস্তবে, অবশ্য, নারী দেখা দেয় বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে; কিন্তু নারী বিষয়টি ঘিরে গড়ে ওঠা প্রতিটি কিংবদন্তির লক্ষ্য হচ্ছে নারীকে সংক্ষেপিত রূপে হুবহু ধারণ; প্রতিটিই হতে চায় অনন্য। পরিণামে, দেখা দেয় একরাশ পরস্পরবিরুদ্ধ কিংবদন্তি, এবং নারীত্বের ধারণা প্রকাশ করে যে-সব অদ্ভুত অসঙ্গতি, সেগুলোর কথা ভেবে বিবর্ণ হয়ে ওঠে পুরুষেরা। যেহেতু এসব আদিরূপের অধিকাংশের সাথে কিছুটা মিল আছে প্রত্যেক নারীরই–যেগুলোর প্রত্যেকটি দাবি করে যে সেটিই ধারণ করে নারী সম্পর্কে একমাত্র সত্য–তাই আজকালকার পুরুষেরাও এমন বিস্ময়ে বিচলিত হয় তাদের সঙ্গী নারীদের রূপে, যেমন প্রাচীন সোফিস্টরা বিস্মিত হতো একথা ভেবে যে মানুষ কী করে একই সময়ে হয় গৌর ও কৃষ্ণ! সে-পুরুষেরা, যারা ভাগ্যান্বেষী, জোচ্চোর, ফটকাবাজ, তারা সাধারণত ত্যাজ্য হয় তাদের গোত্রের দ্বারা; কিন্তু নারীরা আইনের মধ্যে থেকেও কামকলা প্রয়োগ করে পটাতে পারে তরুণদের, এমনকি পরিবারের কর্তাদের, ফলে নাশ হতে পারে তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়সম্পত্তি। এমন কিছু নারী আত্মসাৎ করে তাদের শিকারদের ধনসম্পত্তি বা অবৈধ প্রভাব খাঁটিয়ে পায় উত্তরাধিকার; এ-কাজকে যেহেতু খারাপ মনে করা হয়, তাই যারা এটা করে, তাদের বলা হয় ‘নষ্টনারী’। কিন্তু সত্য হচ্ছে এর বিপরীতে তারা অভিভাবক দেবদূতীরূপে উপস্থিত হতে পারে অন্য কোনো পরিবেশে–বাড়িতে তাদের পিতা, ভাই, স্বামী, বা প্রেমিকদের সঙ্গে; যে-বিলাসিনী নারী ‘লোম তোলে’ ধনী পুঁজিপতির, সে হয়তো চিত্রকর ও লেখকদের কাছে দয়াবর্তী পৃষ্ঠপোষিকা। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আম্পাসিয়া বা মাদাম দ্য পপাদোরের ব্যক্তিত্বের দ্ব্যর্থতা বোঝা সহজ। নারীদের যদি চিত্রিত করা হয় আরাধনাকারী ম্যান্টিস, ম্যানড্রেক, দানবীরূপে, তাহলে তাদের মধ্যে কাব্যদেবী, দেবী মহামাতা, বিয়াত্রিসেকেও পাওয়া খুবই গোলমেলে ব্যাপার।
দলগত প্রতীক ও সামাজিক শ্রেণীরূপগুলোকে যেহেতু সাধারণত সংজ্ঞায়িত করা হয় বিপরীতার্থক শব্দযুগলের সাহায্যে তাই পরস্পরবিপরীত মূল্যধারণকে মনে হবে চিরন্তনী নারীর এক সহজাত বৈশিষ্ট্য বলে। দেবীর মতো মায়ের সাথে সম্পর্কিত ধারণা হচ্ছে নিষ্ঠুর সৎ মা, লক্ষ্মীর মতো তরুণীর সাথে সম্পর্কিত বিকারগ্রস্ত কুমারী : তাই কখনো কখনো বলা হয় যে মা মৃত্যুর সমান, প্রত্যেক কুমারীই হচ্ছে বিশুদ্ধ আত্মা বা শয়তানের কাছে উৎসর্গিত দেহ।
কিংবদন্তিকে তাৎপর্য শক্তির সাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়; তাৎপর্য সীমায়িত থাকে বস্তুর মধ্যে; এটা মনের কাছে ধরা দেয় যাপিত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে; আর সেখানে কিংবদন্তি হচ্ছে এক সীমাতিক্রমী ধারণা, যা মানসিক উপলব্ধিকে পুরোপুরি এড়িয়ে যায়। মিশেল লিরিস লআজ দঅম-এ যখন নারীর যৌনাঙ্গ সম্পর্কে তার স্বপ্নবিভাব বর্ণনা করেন, তখন তিনি বলেন তাৎপর্যপূর্ণ জিনিশের কথা, তিনি কোনো কিংবদন্তি বর্ণনা করেন না। নারীর শরীর দেখে বিস্ময় জাগে, ঋতুস্রাবে ঘেন্না লাগে মূর্ত বাস্তব উপলব্ধি থেকে। যে-অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে নারীশরীরের ইন্দ্রিয়সুখাবহ গুণ, তাতে কিংবদন্তির কিছু নেই, এবং এগুলো যদি কেউ ফুল বা উপলের সাথে তুলনা করে বর্ণনা করেন, তাতে তিনি কিংবদন্তির জগতে যান না। কিন্তু নারী হচ্ছে দেহ, দেহ হচ্ছে রাত্রি ও মৃত্যু, বা দেহ হচ্ছে মহাজগতের মহিমা, এসব বলা হচ্ছে পার্থিব সত্য ছেড়ে শূন্য আকাশে উড়াল দেয়া। কেননা পুরুষও নারীর কাছে দেহ; এবং নারী নিতান্ত এক দৈহিক কস্তু নয়; এবং দেহ প্রত্যেকের কাছে প্রত্যেক অভিজ্ঞতায় প্রকাশ করে বিশেষ তাৎপর্য। এটা খুবই সত্য যে নারী–পুরুষের মতোই প্রকৃতির ভেতরে শেকড়ছড়ানো এক মানুষ; পুরুষের থেকে সে অধিকতর দাসতে বন্দী তার প্রজাতির কাছে, তার পশুত্ব অনেক বেশি স্পষ্ট; কিন্তু যেমন পুরুষের ভেতরে তেমনি নারীর ভেতরেও বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যগুলো বিকশিত হয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে, সেও মানুষের জগতের অন্তর্ভুক্ত। তাকে প্রকৃতির সাথে সমীভূত করা নিতান্তই পূর্বসংস্কারজাত কাজ।
