নারীর সকাতর এ-বন্ধু নারীরহস্যে বিশ্বাস করেন না, এ-কারণে যে তারা প্রকৃতই যেমন সে-রূপেই তিনি ভালোবাসেন তাদের; কোনো সারসত্তা চিরকালের জন্যে সংজ্ঞায়িত করে না নারীকে; ‘চিরন্তনী নারী’র ধারণাটি তার কাছে মনে হয় পণ্ডিতসুলভ ও হাস্যকর। ‘দু-হাজার বছর ধরে পণ্ডিতেরা এ-ধারণা বারবার ব্যক্ত করে এসেছেন যে নারীদের আছে এক অধিকতর প্রাণবন্ত আত্মা, পুরুষের আছে অধিকতর কাঠিন্য; নারীদের আছে ভাবনার কমনীয়তা পুরুষদের আছে মনোযোগ আকর্ষণের অধিকতর শক্তি। প্যারিসের এক কুঁড়ে যে একবার ভার্সাইয়ের উদ্যানে বেড়াতে গিয়েছিলো, সব কিছু দেখে সে সিদ্ধান্তেপৌঁচেছিলো গাছপালা পরিপাটি ছাটাকাটারূপেই জন্মে’। পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে-পার্থক্যগুলো দেখা যায়, সেগুলো প্রতিফলিত করে তাদের পরিস্থিতির পার্থক্য। কেননা নারীরা, উদাহরণস্বরূপ, হবে না তাদের প্রেমিকদের থেকে বেশি রোম্যান্টিক? ‘সূচিকর্মরত নারী, যে রত এক নীরস কাজে, যাতে ব্যবহৃত হয় শুধু তার হাত, সে স্বপ্ন দেখে তার প্রেমিকের; যখন প্রেমিক, তার স্কোয়াড্রনের সাথে অশ্বারোহণে চলে মুক্ত প্রান্তরে, ভুল পথে এগোলেই যার বন্দী হওয়ার সম্ভাবনা’। একইরূপে নারীদের বিচারবুদ্ধির অভাব আছে বলে অভিযুক্ত করা হয়। ‘নারী যুক্তির থেকে আবেগ বেশি পছন্দ করে, এবং এটা খুবই সহজ সরল ব্যাপার : আমাদের নির্বোধ প্রথানুসারে তারা যেহেতু কোনো পারিবারিক দায়িত্ব পায় না, তাই যুক্তি তাদের কাছে কখনোই উপকারী নয়… আপনার স্ত্রীকে চাষীদের সাথে আপনার দু-খণ্ড জমি দেখাশোনা করতে দিন, এবং আমি বাজি ধরতে পারি যে হিশেবনিকেশ আপনি রাখলে যা হতো রাখা হবে তার থেকে অনেক ভালোভাবে’। ইতিহাসে যদি পাওয়া যায় খুবই কম নারীপ্রতিভা, তার কারণ হচ্ছে সমাজ তাদের আত্মপ্রকাশের সব সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখে। ‘সব প্রতিভা যারা জন্ম নিয়েছেন নারীরূপে, তারা হারিয়ে গেছেন জনকল্যাণে; ভাগ্য যদি একবার সুযোগ দেয় তাদের নিজেদেকৃত করাতে, তাহলে দেখতে পাবেন তারা অর্জন করেছে দুরূহতম সাফল্য’।
তাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হতবুদ্ধিকর শিক্ষা; উৎপীড়নকারী সব সময়ই উৎপীড়িতকে পরিণত করতে চায় বামনে; পুরুষ ইচ্ছাকৃতভাবে নারীদের বঞ্চিত করতে চায় সুযোগসুবিধা থেকে। ‘আমরা নারীদের মধ্যে নিষ্ক্রিয় করে রাখি অসাধারণ মেধাপূর্ণ গুণরাশি, যা তাদের ও আমাদের জন্যে হতে পারতো অসামান্য উপকারী’। দশ বছর বয়সে বালিকা তার ভাইয়ের থেকে দ্রুতগামী ও অনেক বেশি চালাক; বিশ বছর বয়সের তরুণ এক বুদ্ধিমান পুরুষ আর তরুণীটি ‘একটি আস্ত বোকালাজুক এবং ভয় পায় মাকড়সাকে’; দোষ দিতে হবে তার শিক্ষাকে। নারীদের শিক্ষা দিতে হবে পুরুষদের সমান। নারীবিরোধীরা অভিযোগ তোলে যে সুসংস্কৃত ও বুদ্ধিমান নারীরা দানবী; কিন্তু গোলমালটি এখানে যে তারা আজো ভিন্ন; যদি তারা সবাই পুরুষের মতোই পেতো সংস্কৃতি, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবেই এ দিয়ে উপকৃত হতো। তাদের এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার পর, তাদের করা হয়েছে অস্বাভাবিক বিধানের অধীন : তাদের অনুভূতির বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়ে তাদের কাছে আশা করা হয় যে তারা হবে বিশ্বস্ত, এবং যদি বিবাহবিচ্ছেদ হয়, তাহলে সেটাকে গণ্য করা হয় অসদাচরণের মতো একটা ভৎসনার ব্যাপার বলে। কাজ ছাড়া তাদের জীবনে আর কোনো সুখ নেই বলে অসংখ্য নারী নষ্ট হয় আলস্যে। এসব ব্যাপার তেঁদালকে ক্রুদ্ধ করেছে, এবং তিনি এর মাঝেই দেখেছেন সমস্ত দোষ, যার জন্যে তিরস্কার করা হয় নারীদের। তারা দেবদূতী নয়, দানবী নয়, স্ফিংক্সও নয়; তারা নিতান্তই মানুষ, সমাজের জড়বুদ্ধি রীতিনীতি যাদের নামিয়ে দিয়েছে আধা-দাসীত্বের স্তরে।
তারা উৎপীড়িত হয় বলেই তাদের শ্রেষ্ঠদের মধ্যে থাকে না সে-সব দোষ, যা বিকৃত করে তাদের উৎপীড়নকারীদের; তারা নিজেরা পুরুষের থেকে নিকৃষ্টও নয় উৎকৃষ্টও নয়; কিন্তু এক দুর্বোধ্য বিপর্যাসের ফলে তাদের দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা তাদের অনুগ্রহই করে। একাগ্ৰমনস্কতাকে কতোটা ঘেন্না করতেন তেঁদাল, তা সুবিদিত : অর্থ, গৌরব, পদমর্যাদা, ক্ষমতা তার কাছে মনে হতো সবচেয়ে করুণ ব্যাপার বলে;অধিকাংশ পুরুষই লাভের কাছে বিক্রি করে দেয় নিজেদের; পণ্ডিত, গণ্যমান্য ব্যক্তি, বুর্জোয়া, স্বামী–সবাই তাদের ভেতরের জীবন ও সত্যের প্রতিটি স্ফুলিঙ্গকে নিভিয়ে ফেলে ছাই চাপা দিয়ে; গতানুগতিক চিন্তাভাবনা ও হাতের কাছে পাওয়া আবেগ দিয়ে এবং সামাজিক বিধিবিধানের সাথে খাপ খাইয়ে, তাদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই থাকে না; এসব আত্মবর্জিত প্রাণীদের আবাস যে-বিশ্ব, তা এক নির্বেদের মরুভূমি। দুর্ভাগ্যবশত আছে বহু নারী, যারা গড়ায় একই ধরনের দুঃখদায়ক নর্দমায়; এগুলো হচ্ছে ‘সংকীর্ণ ও প্যারিসি ভাবভাবনার’ পুতুল, বা ভণ্ড ভক্ত। তেঁদাল আমরণ ঘৃণা বোধ করেন ‘সম্রান্ত নারীদের ও তাদের অপরিহার্য ভণ্ডামোর’ প্রতি; তারা তাদের তুচ্ছ কাজকে করে তোলে একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ, যা তাদের স্বামীদের করে কৃত্রিমতায় অনমনীয়; কুশিক্ষার ফলে নির্বোধ, ঈর্ষাকাতর, শূন্যগর্ভ, পরচর্চাকারী, আলস্যে অপদার্থ, শীতল, শুষ্ক, ভানপূর্ণ, বিদ্বেষপরায়ণ, তারা ভরে রেখেছে প্যারিস ও মফস্বলগুলো; আমরা তাদের দেখতে পাই একজন মাদাম দ্য রিনাল, একজন মাদাম দ্য শস্তেলেকে ঘিরে। স্তেদাল চরম অমঙ্গলকামী যত্নের সাথে যে-একজনকে চিত্রিত করেছেন, তিনি নিঃসন্দেহে মাদাম গ্রদে, যার মাঝে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন মাদাম রোলা, মেতিলদের সম্পূর্ণ বিপরীতকে।
