তবে বিধাতার হাতে নারী শুধু এ-ক্ষুরই নয়; এ-বিশ্বের ভালো জিনিশগুলোকেও সব সময় অস্বীকার করা ঠিক নয় : তারাও পুষ্টি; পুরুষকে নিতে হবে তাদেরও এবং করে নিতে হবে নিজের।
নারী প্রকৃতির সর্বস্ব : গোলাপ ও পদ্ম, নক্ষত্র, ফল, কুঁড়ি, বায়ু, চাঁদ, সূর্য, ফোয়ারা, ‘দুপুরের সূর্যের নিচে এক মহা সমুদ্রবন্দরের শান্ত উত্তেজনা’।
তবে পুরুষ ও নারীর ভূমিকা পুরাপুরি সমরূপ নয়। সামাজিক স্তরে পুরুষের প্রাধান্য সুস্পষ্ট। ক্লদেল স্তরক্ৰমে বিশ্বাস করেন, অন্য সবখানের মতো পরিবারেও : স্বামীই প্রধান। শুধু পুরুষ হওয়ার মধ্যেই পাওয়া যায় একটি সুবিধা। সিনে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি কে, এক অভাগা মেয়ে, যে নিজেকে তুলনা করবো আমার জাতির পুরুষের সাথে?’ পুরুষই জমি চাষ করে, ক্যাথিড্রাল তৈরি করে, তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করে, বিশ্ব উদ্ঘাটন করে, দেশ জয় করে যারা কাজ করে, উদ্যোগ নেয়। পৃথিবীতে পুরুষের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয় বিধাতার পরিকল্পনা। নারী এক সহায়ক বস্তু মাত্র। সে থাকে বিশেষ স্থানে, অপেক্ষা করে, এবং সে গুছিয়ে রাখে জিনিশপত্র : ‘আমি সে, যে পড়ে থাকে, এবং সর্বদা সেখানে,’ বলে সিনে।
চার
ব্রেতোঁ বা কবিতা
ক্লদেলের ধর্মীয় জগতের সাথে ব্রেতের কাব্যিক বিশ্বের মেরুর ব্যবধান থাকলেও তাঁরা নারীকে যে-ভূমিকা দেন, তার মধ্যে রয়েছে সাদৃশ্য : নারী এক বিঘ্নকর জিনিশ; সে পুরুষকে ছিন্ন করে নেয়সীমাবদ্ধতার নিদ্রা থেকে মুখগহ্বর, চাবি, দরোজা, সেতু, দান্তেকে সে পথনির্দেশ করে নিয়ে যায় দূরান্তরে। কিন্তু ব্রেতোঁর কাছে ওই দূরান্তর সুদূর স্বর্গ নয় : এটা আসলে এখানে, এটা সরিয়ে দিতে পারে দৈনন্দিনতার মামুলিত্ব; কাম দূর করতে পারে মিথ্যা জ্ঞানের সম্মোহন। নারী এক হেঁয়ালি এবং সে জ্ঞাপন করে হেঁয়ালি; তার বহু বৈশিষ্ট্য একত্রে তৈরি করে ‘সে-অনন্য সত্তা, অনুগ্রহ করে যার মধ্যে আমাদের দেখতে দেয়া হয়েছে ফিংক্সের শেষ প্রতিমূর্তি’; এবং এ-কারণেই সে হচ্ছে প্রত্যাদেশ। এক নামাতে তিনি ভালোবাসেন, তাকে ব্রেতো বলেন, ‘তুমি হচ্ছো গূঢ়র একান্ত প্রতিরূপ’।
এটা বলার অর্থ নারী হচ্ছে কবিতা। এবং জেরার দ্য নেভালেও সে একই ভূমিকা পালন করে; কিন্তু তার সিলভি ও অরেলিতে নারীর আছে স্মৃতি বা প্রেতচ্ছায়ার গুণ, কেননা স্বপ্ন, সত্যিকারটির থেকে অনেক সত্য, এর সাথে ঠিকমতো খাপ খায় না। ব্রেতের কাছে মিল হচ্ছে উকৃষ্ট : বিশ্ব আছে মাত্র একটি; কবিতা জিনিশের মাঝে উপস্থিত বস্তুগতভাবে, আর নারী হচ্ছে অদ্ব্যর্থভাবে এক মাংস ও রক্তের সত্তা। একজন কেউ তার মুখোমুখি হয়, অর্ধ-স্বপ্নে নয়, পুরো জাগ্রত অবস্থায়, যে-কোনো একটা। সাদামাটা দিনে, দিনপঞ্জিতে অন্যান্য দিনের মতো তার তারিখ আছে–১২ এপ্রিল, ৪ অক্টোবর, বা যা-ই হোক–একটা সাদামাটা পরিবেশে : একটা কাফেতে, কোনো রাস্তার প্রান্তে। তবে সব সময়ই সে কোনো অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের জন্যে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। নাদিয়া ‘হেঁটে গেলো তার মাথা উঁচু করে, অন্য পথচারীদের থেকে একেবারে ভিন্ন… অদ্ভুত প্রসাধনে… এমন চোখ আমি কখনো দেখি নি’।
নারী প্রেমে লাভ করে পরিপূর্ণতা এবং প্রকৃত সিদ্ধি; বিশেষ, একটি বিশেষ নিয়তি মেনে নিয়ে এবং মহাজগত ভরে শেকড়হীন ভেসে বেড়িয়ে নয়–সে ধারণ করে সব কিছু। যে-মুহূর্তে তার সৌন্দর্য প্রকাশ পায় শ্রেষ্ঠরূপে, সেটা রাত্রির সে-সময়ে যখন ‘সে হচ্ছে বিশুদ্ধ দর্পণ, যাতে আছে যা কিছু ছিলো, যা কিছুকে হওয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, এবার যা হতে যাচ্ছে, তার ভেতরে মনোমোহনরূপে স্নাত হয়ে’।
অবিনাশী প্রেম অনন্য না হয়ে পারে না। ব্ৰেতোর মনোভাবের এটাই অসঙ্গতি যে তার বইগুলোতে, ভাজে কমিনিকাৎ থেকে আরকান ১৭ পর্যন্ত, তিনি দুর্দমনীয়ভাবে অঙ্গীকার করেছেন বিভিন্ন নারীর জন্যে এক অনন্য ও শাশ্বত প্রেম। কিন্তু তিনি ব্যাখ্যা করেন যে এমন সামাজিক অবস্থা আছে, যা পুরুষকে স্বাধীনভাবে পছন্দ করতে দেয় না, তাই পুরুষকে ভুলভাবে পছন্দ করতে হয়; এছাড়াও, এসব ভুলের ভেতর দিয়ে। আসলে সে খোঁজে একটি নারীকেই। এবং তিনি যদি সে-প্রিয়াদের মুখ স্মরণ করেন, তাহলে তিনি ‘সব নারীর মুখের মধ্যে উপলব্ধি করবেন একটি মুখ : শেষ যে-মুখটি তিনি ভালোবেসেছেন’।
পাঁচ
স্তেঁদাল বা বাস্তবের রোম্যান্টিক
বর্তমান কাল ছেড়ে যদি আমি ফিরে যাই স্তেদালের কাছে, তা এজন্যে যে কার্নিভালের এ-জলবায়ুতে, যেখানে নারী আছে প্রতিশোধের দেবী, বনদেবী, শুকতারা, সাইরেন প্রভৃতির ছদ্মবেশে, সেখান থেকে বেরিয়ে এমন একজন পুরুষের কাছে যেতে আমি স্বস্তি বোধ করি, যিনি বাস করে রক্তমাংসের নারীদের মধ্যে।
স্তেদাল বাল্যকাল থেকেই কামনাতুরভাবেই ভালোবাসতেন নারীদের; তিনি তাদের ওপর প্রক্ষেপ করেছিলেন তাঁর কৈশোরিক অভিলাষগুলো : কল্পনা করতে তিনি ভালোবাসতেন যে তিনি উদ্ধার করছেন কোনো অচেনা রূপসীকে এবং পাচ্ছেন তার প্রেম। প্যারিসে এসে তিনি যা অতিশয় ব্যাকুলভাবে চান, তা হচ্ছে ‘এক রূপসী নারী; আমরা পরস্পরকে ভালোবাসবো গভীরভাবে, সে জানবে আমার আত্মাকে’। বৃদ্ধকালে, তিনি ধুলোয় নাম লেখেন সে-নারীদের, যাদের তিনি ভালোবেসেছিলেন সবেচেয়ে বেশি। নারীরা অনুপ্রাণিত করেছিলো তাঁর বইগুলো, ওগুলো ভরে আছে নারীমূর্তিতে; এবং সত্য হচ্ছে বেশির ভাগ তিনি লিখেছেন তাদেরই জন্যে।
