এভাবে লরেন্স আবার আবিষ্কার করেন বোনালদ, অগাস্ত কোঁৎ, ক্লেমে ভতেলের প্রথাগত বুর্জোয়া ধারণা। নারীকে তার অস্তিত্বকে করতে হবে পুরুষের অধীন। ‘নারীকে বিশ্বাস করতে হবে তোমাকে এবং তুমি বোঝাও যে-গভীর লক্ষ্য, তাকে’। তাহলে পুরুষ তাকে দেবে অনন্ত প্রীতি ও কৃতজ্ঞতা। ‘আহা, কী চমকার বাড়িতে তোমার স্ত্রীর কাছে ফিরে আসা, যখন সে বিশ্বাস করে তোমাকে এবং অনুগত হয় তোমার লক্ষ্যের, যা তার ধরাছোঁয়ার বাইরে… যে-নারী তোমাকে ভালোবাসে, তার প্রতি তুমি অনুভব করো অতল কৃতজ্ঞতা’।
লরেন্স যার উচ্চপ্রশংসা করেন–প্রধো ও রুশোর ধরনে–তা হচ্ছে একপতিপত্নীক বিয়ে, যাতে স্বামীর কাছে থেকে স্ত্রী আহরণ করে তার অস্তিত্বের যথার্থতা। সঁতেরলর মতোই তীব্র ঘৃণার সাথে লরেন্স সে-স্ত্রীর বিরুদ্ধে লেখেন, যে পাল্টে দিতে চায় ভূমিকা। লরেন্স মাতৃত্বকে আদৌ ঘৃণা করেন না : বরং এর উল্টো। মাংস হতে পেরে তিনি খুশি, তিনি স্বেচ্ছায় মেনে নেন তার জন্মকে, তিনি তার মাকে ভালোবাসেন; তাঁর লেখায় মা দেখা দেয় খাঁটি নারীত্বের জমকালো উদাহরণরূপে; তারা বিশুদ্ধ। আত্ম-অস্বীকৃতি, পরম মহত্ত্ব, তাদের সমস্ত জীবন্ত উত্তাপ সন্তানের সেবায় নিয়োজিত : তাদের পুত্ররা পুরুষ হয়ে উঠছে এটা তারা সানন্দে মেনে নেয়, তারা এতে গর্বিত। কিন্তু ভয় পেতে হবে অহমিকাপরায়ণ অমৎকে, যে পুরুষকে ফিরিয়ে নেয় তার বাল্যকালে; সে ব্যাহত করে এল, পুরুষের উড়াল। ‘চাঁদ, নারীদের গ্রহ, আমাদের দুলিয়ে দেয়পেছনের দিকে’। নারী অনিঃশেষ কথা বলে প্রেম সম্বন্ধে; কিন্তু তার কাছে প্রেম হচ্ছে নেয়া, তার ভেতরে সে যে-শুন্যতা বোধ করে, এটা তা ভরিয়ে তোলার জন্যে; এমন প্রেম ঘৃণার মতোই।
তিন
ক্লদেল এবং প্রভুর দাসী
ক্লদেলের ক্যাথলিকবাদের মৌলিকত্ব এমন এক অনমনীয় আশাবাদের মধ্যে যে এতে অশুভকে পরিণত করা হয় শুভতে।
অশুভ নিজেই
জড়ানো তার শুভে যা আমরা হারিয়ে যেতে দিতে পারি না।
ক্লদেল সৃষ্টির সব কিছুকেই অনুমোদন করেন, তিনি গ্রহণ করেন এমন দৃষ্টিভঙ্গি, যা স্রষ্টার ছাড়া আর কারো নয়। কেননা পরেরজনকে মনে করা হয় সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, এবং দয়ালু। নরক ও পাপ ছাড়াস্বাধীন ইচ্ছেও থাকতো না পাপমুক্তিও। থাকতো না; তিনি যখন শূন্যতা থেকে সৃষ্টি করেন এ-জগত, তখন আগে থেকেই তিনি দেখতে পান পতন ও পরিত্রাণ। ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মী উভয়েরই চোখে হাওয়ারঅবাধ্যতা তার কন্যাদের ফেলে দেয় মহাঅসুবিধায়; সবাই জানে গির্জার পিতারা কী প্রচণ্ড ভৎসনা করেছেন নারীদের। কিন্তু উল্টোভাবে আমরা দেখতে পাবো যে সে ঠিক কাজই করেছে, যদি আমরা স্বীকার করি যে সে কাজ করেছে স্বর্গীয় লক্ষ্যকে এগিয়ে দেয়ার জন্যে। ‘নারী! সে-উপকার একদা স্বর্গোদ্যানে, যা সে করেছে বিধাতাকে তার অবাধ্যতা দিয়ে; সে-গভীর সমমর্মিতা তার ও তার মাঝে; সে-মাংস, যা সে পতনের মধ্য দিয়ে দান করেছে পরিত্রাণের কাছে!’ এবং নিশ্চিতভাবেই সে পাপের উৎস, এবং তার কারণেই পুরুষ হারিয়েছে স্বর্গ। তবে ক্ষমা করা হয়েছে মানুষের পাপ, এবং এবিশ্ব নতুনভাবে আশীর্বাদপ্রাপ্ত। ‘বিধাতা আদিতে আমাদের যেখানে স্থান দিয়েছিলেন আমরা কোনোক্রমেই ছেড়ে আসি নি সে-সুখকর স্বর্গলোক!’ ‘সমগ্র পৃথিবীই প্রতিশ্রুত দেশ’।
যা কিছু বিধাতার হাত থেকে এসেছে, যা কিছু তিনি দিয়েছেন, তা নিজে খারাপ হতে পারে না : ‘যা কিছু তিনি তৈরি করেছেন, তার কিছুই নিষ্ফল নয়’। মহাজগতের সঙ্গতির মধ্যে তাই আছে নারীর স্থান।
অতি নিশ্চিতভাবেই নারী হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসকারী : ক্লদেল লিসির মধ্যে মূর্তি দিয়েছেন খারাপ নারীকে, যে পুরুষকে নিয়ে যায় সমূহ সর্বনাশের দিকে; পাৰ্তাজ দ্য মিদিতে ওয়াইসি সর্বনাশ করে সে-পুরুষদের জীবন, যারা তার ফাঁদে পড়ে। কিন্তু যদি থাকতো এ-সর্বনাশের বিপদ, তাহলে আর পাপমোচনও থাকতো না। নারী হচ্ছে ‘বিপদের সে-উপাদান, যা তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তার বিশাল নির্মাণে’। মাংসের প্রলোভন জানা পুরুষের জন্যে শুভ। ‘এটা আমাদের ভেতরের সেশক্ত, যে আমাদের জীবনকে দেয় তার নাটকীয় উপাদান, এ-মর্মভেদী লবণ। আত্মা এভাবে যদি নৃশংসভাবে আক্রান্ত না হতো, তাহলে তা ঘুমিয়ে থাকতো, এবং দ্যাখো, তা লাফিয়ে উঠছে… জয়ের পথ যুদ্ধের ভেতর দিয়েই’। ‘এবং নারী ছাড়া পুরুষের সাথে কথা বলায় কোন মাংস বেশি শক্তিশালী?’ তবে অধিকাংশ সময়ই নারী হচ্ছে প্রতিভাসের এক প্রতারক বহনকারী। ‘আমি সে-প্রতিশ্রুতি, যা রক্ষা করা যাবে না এবং তার মধ্যেই আছে আমার আবেদন। যা নেই, তার জন্যে অনুতাপের সাথে, যা আছে, আমি তার মধুরতা’। তবে প্রতিভাসেরও আছে উপকারিতা; অভিভাবক দেবদূত এটাই বলে দোনা প্রোহেৎকে :
এমনকি পাপ! পাপও করে উপকার!
তাই ভালো ছিলো এ যে সে ভালোবাসতো আমাকে?
এ ছিলো ভালো যে তুমি কামনা শিখিয়েছিলে তাকে।
প্রতিভাসের জন্যে কামনা? এক ছায়ার জন্যে যে সব সময় পালায় তার থেকে?
যা আছে তার জন্যে কামনা, যা নেই তার প্রতিভাস। প্রতিতাসের
ভেতর দিয়ে কামনা
যা আছে তার জন্যে, যা নেই তার ভেতর দিয়ে।
বিধাতার ইচ্ছেয় রদরিগের কাছে প্রোহেৎ হচ্ছে : ‘তার হৃৎপিণ্ডের ভেতর দিয়ে একটি তরবারি’।
