দুই
ডি এইচ লরেন্স বা শিশ্নের গর্ব
লরেন্স ও একজন মতেরল দু-মেরুর মতো সুদূর। পুরুষের ও নারীর বিশেষ সম্পর্ক সংজ্ঞায়িত করা তার কাজ নয়, বরং তাদের উভয়কে জীবনের সত্যের কাছে ফিরিয়ে আনা তার কাজ। এ-সত্য প্রদর্শনের মধ্যেও নেই, ইচ্ছের মধ্যেও নেই : এটা জড়িত পাশবিকতায়, যার ভেতরে ছড়ানো মানুষের শেকড়। লরেন্স সংরক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেন লিঙ্গ-মস্তিষ্কের বৈপরীত্য; তার আছে এক মহাজাগতিক আশাবাদ, যা আমূলভাবে বিপরীত শপেনহায়ারের হতাশাবাদের; শিশ্নের মধ্যে প্রকাশিত বেঁচেথাকার-ইচ্ছে হচ্ছে আনন্দ।
লেডি চ্যাটার্লি ও মেলর্স উন্নীত হয়েছে একই মহাজাগতিক আনন্দে : একে অন্যের সাথে মিশে গিয়ে, তার মিশে গেছে গাছপালা, আলো, বৃষ্টির সাথে। লরেন্স এ-মতবাদটি সাধারণভাবে ব্যাখা করেছেন দি ডিফেন্স অফ লেডি চ্যাটার্লিতে : ‘বিয়ে এক প্রতিভাস যদি তা স্থায়ীভাবে ও আমূলভাবে শৈকি না হয়, যদি তা জড়িত না থাকে সূর্য ও পৃথিবীর সাথে, চাঁদের, গ্রহনক্ষত্রের সাথে, ঋতুর, বর্ষের, লাস্ট্রার, শতাব্দীর ছন্দস্পন্দনের সাথে। বিয়ে কিছুই নয় যদি না তা স্থাপিত হয় রক্তের প্রতিসাম্যের ভিত্তির ওপর। কেননা রক্ত হচ্ছে আত্মার সারবস্তু’। ‘পুরুষের রক্ত আর নারীর রক্ত হচ্ছে দুটি অনন্তকালীন পৃথক স্রোতধারা, যা মিশ্রিত হতে পারে না’। একারণেই এ-স্রোতধারা দুটি তাদের সর্পিল পথেই আলিঙ্গন করে জীবনের সমগ্রতাকে। ‘শিশ্ন হচ্ছে কিছু পরিমাণ রক্ত, যা পরিপূর্ণ করে নারীর ভেতরের রক্তের উপত্যকাকে। পুরুষের রক্তের তীব্র ধারা চরম গভীরতম তলে নিমজ্জিত করে নারীর রক্তের মহাধারাকে… তবে কোনোটিই বাঁধ ভেঙে ছোটে না। এটা হচ্ছে মিলনের বিশুদ্ধতম রূপ… এবং এটা মহারহস্যগুলোর অন্যতম’। জীবনের এক অলৌকিক সমৃদ্ধিসাধন এ-মিলন; তবে এটা চায় লোপ করতে হবে ‘ব্যক্তিত্ব’-এর দাবি। যখন বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের অস্বীকার না করে পৌছোতে চায় পরস্পরের ভেতরে, যা সব সময়ই ঘটে আধুনিক সভ্যতায়, তখন তাদের উদ্যোগ পরিণত হয় হতাশায়। এমন ক্ষেত্রে থাকে এক কাম, যা ‘ব্যক্তিগত, শূন্য, শীতল, বিচলিত, কাব্যিক’, তা বিধ্বস্ত করতে চায় প্রত্যেকের প্রাণস্রোত। তখন প্রেমিকপ্রেমিকারা পরস্পরকে ব্যবহার করে উপকরণের মতো, যা জাগায় ঘৃণা : এটা ঘটে লেডি চ্যাটার্জি ও মাইকেলিসের ক্ষেত্রে; তারা রুদ্ধ থাকে নিজেদের ব্যক্তিতার মধ্যে; তারা ভোগ করতে পারে এমন জ্বর, যা দেয় অ্যালকোহল বা আফিম : তারা প্রত্যেকে ব্যর্থ হয় বাস্তবতা আবিষ্কারে; তারা কোথাও প্রবেশাধিকার পায় না।
লরেন্স সংরক্তভাবেই বিশ্বাস করেন পুরুষের আধিপত্যে। ‘শৈশ্নিক বিয়ে’ পদটিতে, তিনি ‘কামগত’ ও ‘শৈশ্নিক’-এর মধ্যে স্থাপন করেন যে-প্রতিসাম্য, তাতেই এটা প্রমাণ হয়। যে-দুটি রক্তধারা রহস্যময়ভাবে বিবাহিত হয়, তাদের মধ্যে শৈশ্নিক ধারাটিই লাভ করে আনুকূল্য। ‘শিশ্ন কাজ করে দুটি নদীর মিলনের উপায়রূপে; এট একই স্রোতে সংযুক্ত করে দুটি ভিন্ন ছন্দকে।‘ তাই পুরুষটি শুধু যুগলের মধ্যে একটি উপাদানই নয়, বরং তাদের সংযোগের কারণ; সে যোগায় তাদের সীমাতিক্ৰমণতা : ‘ভবিষ্যতের সাথে সেতু হচ্ছে শিশ্ন’। মাতা মহাদেবীর তন্ত্রের বিকল্পে লরেন্স প্রতিষ্ঠা করতে চান শিশ্নতন্ত্র; তিনি যখন মহাজগতের কামধর্মীতাকে উদ্ভাসিত করতে চান, তখন তিনি নারীর উদরের বদলে মনে পড়িয়ে দেন পৌরুষকে। তিনি কখনোই দেখান না যে নারী আলোড়িত করছে পুরুষকে; কিন্তু বারবার দেখান যেগোপনে নারী উত্তেজিত হচ্ছে পুরুষের তীব্র, সূক্ষ্ম, ও ধীরে-কৌশলে-প্রবেশকারী আবেদনে। তার নায়িকারা রূপসী ও স্বাস্থ্যবতী, কিন্তু হঠকারী নয়; আর সেখানে তার নায়কেরা উদ্বিগ্নকর ফন। পুরুষ প্রাণীরাই ধারণ করে জীবনের আলোড়ন ও শক্তিশালী রহস্য; নারী বোধ করে শুধু সম্মােহন : এটি অভিভূত হয় একটা শেয়াল দিয়ে, ওটি অনুরক্ত হয়ে ওঠে একটি অশ্বের, গাড্রুন অতি উত্তেজিত হয়ে রুখে দাঁড়ায়একপাল তরুণ ষাড়ের সামনে; সে অভিভূত হয় একটি খড়গোশের বিদ্রোহী বলিষ্ঠতায়।
পুরুষের একটি সামাজিক সুবিধাকে জোড়া লাগিয়ে দেয়া হয় এসব মহাজাগতিক সুবিধার সাথে। সন্দেহ নেই এ শৈশ্নিক ধারা যেহেতু মহাবেগশালী, আক্রমণাত্মক, যেহেতু ছড়িয়ে পড়ে ভবিষ্যতের ভেতরে লরেন্স নিজেকে ব্যাখ্যা করেন, তবে অশুদ্ধভাবে পুরুষকেই ;সামনের দিকে বইতে হয় জীবনের ধ্বজা’; পুরুষ উদ্দেশ্য ও পরিণতির প্রতি একাগ্রচিত, পুরুষ ধারণ করে সীমাতিক্ৰমণতা; নারী জড়িত থাকে তার ভাবাবেগের মধ্যে, সে ইচ্ছে সম্পূর্ণ অন্তর্মুখিতা; সে উৎসর্গিত সীমাবদ্ধতার কাছে। পুরুষ শুধু যৌনজীবনে সক্রিয় ভূমিকাই পালন করে না, সে একে অতিক্রম করার ব্যাপারেও সক্রিয়; তার মূল রয়েছে কামের বিশ্বে, কিন্তু সে এর থেকে মুক্তি অর্জন করে; নারী বন্দী হয়ে থাকে এর ভেতরেই। চিন্তা ও কর্মের মূল রয়েছে শিশ্নে; শিশ্নের অভাবে এটিতেও নারীর অধিকার নেই ওটিতেও নেই : সে পুরুষের ভূমিকায় অভিনয়করতে পারে, এবং চমক্কারভাবেই পারতে পারে, কিন্তু এটা খেলা মাত্র, এতে নেই গভীর সত্যতা। নারীর ‘গভীরতম চেতনা আছে পাছায় ও পেটে’। যদি একে বিকৃত করা হয় এবং তার শক্তিপ্রবাহ ধাবিত করা হয়উধ্বমুখে, বক্ষে ও মাথায়, নারী হয়তো পুরুষের বিশ্বে বুদ্ধিমান, মহৎ, দক্ষ, মেধাবী, যোগ্য হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু, লরেন্সের মতে, তখন সব কিছু ধসে পড়ে, এবং সে ফিরে যায় কামের কাছে, ‘বর্তমান মুহূর্তেযা তার করণীয়’। কর্মের এলাকায় পুরুষকেই হতে হবে প্রবর্তক, সদর্থক; নারী সদর্থক শুধু আবেগের স্তরে।
