মতেরলর কাছে রক্ষিতাও মায়ের মতোই অশুভ সংকেতবহ; সে বাধা দেয় পুরুষকে তার ভেতরের দেবতাকে পুনর্জীবিত করতে। তিনি ঘোষণা করেন যে নারীর নিয়তি হচ্ছে সদ্যস্কতার জীবন্ত সে বেঁচে থাকে ইন্দ্রিয়ানুভূতির ওপর, তার আছে বাঁচার দুর্বার ক্রোধ—এবং পুরুষকে সে আবদ্ধ করতে চায় এ-হীনবস্থায়। নারী পুরুষের সীমাতিক্ৰমণতার উত্তাল অনুভব করে না, তার নেই কোনো মহিমাবোধ; সে তার প্রেমিককে ভালোবাসে তার দুর্বলতার মধ্যে, তার শক্তির মধ্যে নয়, তার দুর্দশার মধ্যে এবং তার আনন্দের মধ্যে নয়; সে তাকে চায় নিরস্ত্র। প্রেমিক তাকে অতিক্রম করে যায় এবং মুক্তি পায় তার থেকে; কিন্তু সে জানে কীভাবে প্রেমিককে ক্ষীণ করে তার ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে হয়। কেননা প্রেমিককে তার দরকার, সে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, সে একটা পরগাছা। ল্য সঁজ-এ দমিনিকের চোখ দিয়ে মতেরল দেখান যে। রেনেলার পদচারণারত নারীরা ‘তাদের প্রেমিকদের বাহু থেকে ঝুলে আছে ছদ্মবেশী বিশাল শামুকসদৃশ অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মতো’। তার মতে শুধু নারী ক্রীড়াবিদেরা ছাড়া নারীরা অসম্পূর্ণ জীব, যারা নির্ধারিত দাসীত্বের জন্যে; কোমল এবং পেশিহীন হওয়ার জন্যে বিশ্বের ওপর তাদের কোনো আয়ত্তি নেই; তাই তারা কঠোর পরিশ্রম। করে একটা প্রেমিক, বা আরো ভালো হয় একটি স্বামী, সংযোজনের জন্যে। মতেরল আরাধনারত ম্যান্টিসের উপকথা ব্যবহার না করতে পারেন, কিন্তু তিনি প্রকাশ করেন এর বিষয় : প্রেম হচ্ছে, নারীর কাছে, গিলে খাওয়া; দেয়ার ভান করে সে নেয়। তিনি তুলে ধরেন মাদমোয়াজেল তলস্তয়ের চিৎকার : ‘আমি তার মধ্যে বাচি, তার জন্যে বাঁচি; আমি চাই আমার জন্যে সে তা-ই করুক’, এবং তিনি চিত্রিত করেন এমন প্রেমোত্তেজনার বিপদ; এবং এক্লিজিয়াস্টেস্-এর বচনে পান এক ভয়ঙ্কর সত্য : ‘যেপুরুষ তোমার অশুভ কামনা করে সেও ভালো সে-নারীর থেকে, যে তোমার শুভ কামনা করে’।
মতেরল যদি সত্যিই শাশ্বতী নারীর কিংবদন্তি চূর্ণ করে থাকেন, তাহলে এসাফল্যের জন্যে তাকে অভিনন্দন জানাতে হবে : শাশ্বতী নারীকে অস্বীকার করেই শুধু মানুষের মর্যাদা লাভে আমরা সাহায্য করতে পারি নারীকে। কিন্তু তিনি মূর্তিটি। চুরমার করেন না, তিনি একে করে তোলেন এক দানবী। তিনিও বিশ্বাস করেন সেঅস্পষ্ট ও মৌল সারবস্তুতে, নারীত্বে; আরিস্ততল ও সেইন্ট টমাসের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন নারীকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে নঞর্থকভাবে; নারী পৌরুষের অভাবেই নারী; এটা সংশোধন করতে সমর্থ না হয়ে এর কাছে আত্মসমর্পণ করাই প্রতিটি নারীর নিয়তি। যে-কেউ এর থেকে মুক্তির কথা ভাবে, সে-ই নিজেকে পতিত করে মানুষের মানদণ্ডের তলদেশে; সে পুরুষ হতে ব্যর্থ হয়, সে নারী হওয়াকে পরিত্যাগ করে; সে হয়ে ওঠে এক হাস্যকর প্রাণী, একটা ভান।
মতেরল প্রাচ্য মনোভাব অনুমোদন করেন : সম্ভোগের বস্তু হিশেবে দুর্বল লিঙ্গটির একটা জায়গা আছে জগতে, সন্দেহ নেই জায়গাটা খুবই হীন, তবে বেশ; পুরুষ এর থেকে যে-প্রমোদ আহরণ করে, তার জন্যেই সে থাকতে পারে এবং থাকতে পারে শুধু প্রমোদের জন্যেই। আদর্শ নারী নিখুঁতভাবে নির্বোধ ও নিখুঁতভাবে অনুগত; সে সব সময়ই পুরুষকে গ্রহণের জন্যে প্রস্তুত এবং পুরুষের কাছে সে কিছু দাবি করে না। এমন একজন হচ্ছে রিদিদিয়া, ছোট্ট আরব প্রেমের শান্তশিষ্ট পশু, বশমানারূপে যে গ্রহণ করে কাম ও অর্থ।
তবুও কোনক্রমেই মতেরল কোনো প্রাচ্য সুলতান নন; প্রথমত, তার রয়েছে কামবোধের অভাব। ‘নারী পশুদের মধ্যে কিছু আপত্তি ছাড়া তিনি কখনোই সুখ পান না: তারা অসুস্থ, অস্বাস্থ্যকর, কখনোপরিচ্ছন্ন নয়। কোস্তাল গোপনে আমাদের বলে যে বালকের চুলের গন্ধ নারীর চুলের থেকে অনেক বেশি সুগন্ধি ও তীব্র; অনেক সময় সে বিরক্তি বোধ করে সলজের, ‘সেই মিঠে, প্রায় অসুস্থকর গন্ধ ও সেই পেশিহীন, শাদা স্লাগের মতো স্নায়ুহীন দেহ’-এর উপস্থিতিতে। প্রাচ্যদেশীয়রা নারীতে পায় প্রবল ইন্দ্রিয়সুখাবহ আনন্দ এবং এভাবে প্রেমিকপ্রেমিকার মধ্যে স্থাপন করে এক দৈহিক পারস্পরিকতা : এটা প্রকাশ পেয়েছে পরমগীতের আকুল আবাহনে, আরব্যরজনীর কাহিনীগুলোতে, এবং দয়িতার স্তবমুখর অসংখ্য আরব কবিতায়। সেখানে সঁতেরর নায়ক সব সময়ই থাকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে : ‘পরাভূত না হয়েপরাজিত করা, শ্রেষ্ঠ পুরুষ ও নারীর মধ্যে এটাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য সূত্র’।
অক্স ফঁতেনে দি দেজির-এ মতেরল ঘোষণা করেন, ‘কামনার থেকে ঘৃণা মহত্তর’; এবং ল্য মেতর দ্য সান্তিয়াগোতে আলভারো চিৎকার করে ওঠে : ‘ঘৃণা আমার কাছে রুটি’। তিনি গরিব মেয়েদের টাকা অথবা রত্ন দিয়ে প্রলুব্ধ করতে মজা পান : তারা তার অমঙ্গলকামী উপহার গ্রহণ করলে তিনি উল্লাস বোধ করেন। মজা করার জন্যে তিনি আঁদ্রির সাথে খেলেন এক ধর্ষকামী খেলা, তাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে নয়, বরং সে নিজেকে কীভাবে হীন করে তুলছে, তা দেখার জন্যে।
নারীর প্রতি মতেরলর মনোভাবের বৈধতা বিচার করার জন্যে ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখা তার নীতিবোধ। তার মনোভাবের নেই কোনো সদর্থক প্রতি-রূপ, যা একে ব্যাখ্যার কাজ করতে পারতো; এটা প্রকাশ করে শুধু তার অস্তিত্বগত পছন্দ। প্রকৃতপক্ষে, এ-নায়ক বেছে নিয়েছে ভয়। তার নায়ক সব সময় একলা মুখোমুখি দাঁড়ায় পশুদের, শিশুদের, নারীদের, ভূদৃশ্যের; সে শিকার তার নিজের কামনার।
