নারীর কেনো রয়েছে এক দ্বৈত ও প্রতারক মুখাবয়ব, তার কারণ এ-ই : পুরুষ যা কিছু কামনা করে, সে তা এবং পুরুষ যা কিছু অর্জন করতে পারে না, সে তা। সুপ্রসন্ন প্রকৃতি ও পুরুষের মধ্যে সে এক ভালো মধ্যস্থতাকারিণী; এবং সে হচ্ছে অজিত প্রকৃতির প্রলোভন, যা সব শুভর বিরোধী। সে সব নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিমূর্তি, শুভ থেকে অশুভর, এবং তাদের বিপরীতের; সে কর্মের এবং যা কিছু তার প্রতিবন্ধক, তার বিষয়, সে পৃথিবীতে পুরুষের আয়ত্তি ও তার হতাশা : সে পুরুষের নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সব চিন্তাভাবনার এবং পুরুষ তা যেভাবে প্রকাশ করতে সমর্থ, তার সমস্ত কিছুর উৎস ও উদ্ভব; এবং এ-সত্ত্বেও সে কাজ করে পুরুষকে নিজের থেকে অন্য দিকে সরিয়ে নিতে, তাকে নিস্তব্ধতায় ও মৃত্যুতে ডুবে যেতে। সে দাসী ও সঙ্গিনী, কিন্তু পুরুষ আরো প্রত্যাশা করে যে সে হবে পুরুষের শ্রোতা ও সমালোচক এবং তাকে সমর্থন ও অনুমোদন করবে তার সত্তাবোধে; কিন্তু তার নিস্পৃহতা এবং এমনকি তার পরিহাস ও অট্টহাস্য দিয়ে সে বিরোধিতা করে পুরুষের। পুরুষ যা। কামনা করে ও যা ভয় করে, পুরুষ যা ভালোবাসে ও যা ঘৃণা করে, সে-সব পুরুষ প্রক্ষেপ করে নারীর ওপর। এবং নারীর সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছু বলা যদি এতোই কঠিন হয়, তার কারণ হচ্ছে পুরুষ নারীর মধ্যে খোঁজে নিজের পুরোটা এবং একারণে যে নারী হচ্ছে সব। নারী হচ্ছে সব, অর্থাৎ, অপ্রয়োজনীয়র তলে; সে সর্বাঙ্গীন অপর। সব হয়ে, সে কখনো তা নয়, যা তার হওয়া উচিত; যে চিরস্থায়ী ছলনা, সেই অস্তিত্বের একান্ত ছলনা, যা কখনোই সফলভাবে অর্জিত হয় নি সবার পুরোপুরি সামঞ্জস্যও লাভ করে নি অস্তিমানের সমগ্রতার সাথে।
পাঁচজন লেখকে নারীকিংবদন্তি
প্রথম খণ্ড । ভাগ ৩ – কিংবদন্তি। পরিচ্ছেদ ২
সাধারণ দৃষ্টিতে নারীকিংবদন্তি যে-রূপ নিয়েছে, তার এ-বিশ্লেষণকে দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করার জন্যে আমরা এখন বিচার করব কয়েকজন লেখকের লেখায় এটা যে-বিশেষ ও বিচিত্রভাবে সম্মিলিত রূপ নিয়েছে, সে-রূপগুলো। নারীর প্রতি সঁতেরল, ডি এইচ লরেন্স, ক্লদেল, ব্রেতো, এবং তেঁদালের মনোভাবকে আমার কাছে মনে হয়েছে বৈশিষ্ট্যসূচক।
এক
মঁতেরলঁ বা ঘৃণার রুটি
মঁতেরলঁ অন্তর্ভুক্ত পুরুষের সে দীর্ঘ ধারায়, যারা আপন বলে গ্রহণ করেছেন পিথাগোরাসের গর্বিত ম্যানিকীয়বাদ। নিটশের অনুসরণে তিনি মনে করেন যে শুধু দুর্বলতায় বিশিষ্ট পর্বগুলোই উচ্চপ্রশংসা করেছে শাশ্বতী নারীর এবং তাই নায়ককে বিদ্রোহ করতে হবে মহামাতার বিরুদ্ধে। বীরত্ব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তিনি, দায়িত্ব নিয়েছেন নারীকে সিংহাসনচ্যুত করার। নারী–সে হচ্ছে রাত্রি, বিশৃঙ্খলা, সীমাবদ্ধতা। তার মতে আজকের পুরুষের নির্বুদ্ধিতা ও হীনতার জন্যেই নারীর উনতাগুলোকে দেয়া হচ্ছে সদর্থক মূল্য : আমরা শুনতে পাই নারীর সহজাত প্রবৃত্তি, তাদের বোধি, তাদের ভবিষ্যকথনের কথা, যখন নিন্দা করা উচিত তাদের যুক্তিশীলতার অভাবের, একগুঁয়ে মূর্খতার, তাদের বাস্তবতাবোধের অক্ষমতার। আসলে তারা পর্যবেক্ষকও নয় মনোবিজ্ঞানীও নয়; তারা বস্তুরাশিকে দেখতে পায় না, জীবন্ত বস্তুদের বুঝতেও পারে না; তাদের রহস্য এক ফাঁদ এবং এক প্রতারণা, তাদের অতল সম্পদের আছে শূন্যতার গভীরতা; পুরুষকে তাদের দেয়ার কিছুই নেই এবং তারা শুধু ক্ষতি করতে পারে পুরুষের। মতেরলর কাছে সবার আগে মা-ই হচ্ছে মহাশত্র; তারুণ্যপূর্ণ একটি প্রকাশনায়, ‘ল’একজিল-এ, তিনি আমাদের এমন এক মাকে দেখান, যে তার পুত্রকে বিয়ের চুক্তি করতে বাধা দেয়; লে অলেপিক-এ এক কিশোর, যে খেলায় নিজেকে নিয়োগ করতে চায়, সে ‘নিষিদ্ধ’ হয় মায়ের ভীরু আত্মপ্রচারের ফলে; লে সেলিবাতেরে-এ যেমন তেমনি লে জোনে ফিইতেও তেমনি মাকে দেয়া হয় ঘৃণ্য বৈশিষ্ট্য। তার অপরাধ সে চিরকাল তার পুত্রকে নিজের দেহের অন্ধকারে রুদ্ধ করে রাখতে চায়; সে পুত্রকে বিকলাঙ্গ করে দেয়, যাতে সে পুত্রকে শুধু একা তারই কাছে রাখতে পারে এবং ভরে তুলতে পারে তার সত্তার বন্ধ্যা শূন্যতাকে; সে হচ্ছে সবচেয়ে শোচনীয় শিক্ষক; সে শিশুর ডানা কেটে দেয়, পুত্র যে-উচ্চ শিখরে উঠতে চায়, তার থেকে অনেক পেছনে সে টেনে রাখে পুত্রকে; সে পুত্রকে করে তোলে নির্বোধ এবং অধঃপাতিত।
এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। তবে যে-তীব্র ভৎসনা চাপিয়ে দেন তিনি নারী মার ওপর, তাতে এটা স্পষ্টভাবে দেখা যায় তিনি মার মধ্যে যা ঘেন্না করেন, তা হচ্ছে তার নিজের জন্মের ঘটনা। তিনি বিশ্বাস করেন তিনিই বিধাতা, তিনি বিধাতা হতে চান; কেননা তিনি পুরুষ, কেননা তিনি একজন ‘উৎকৃষ্টতর মানুষ’, কেননা তিনি মতেরল। দেবতা কোনো জননিত সত্তা নয়; তার যদি দেহ থাকে, তাহলে তাঁর দেহ হচ্ছে দৃঢ় ও সুশৃঙ্খল পেশির ছাঁচে ঢালাই করা এক ইচ্ছে, সেটা স্থূলভাবে জীবন ও মৃত্যুর অধীন কোনো মাংসপিণ্ড নয়; তিনি মাকে দায়ী করেন এ-বিনাশী মাংসের জন্যে, যা অনিশ্চিত, অরক্ষিত, এবং তাঁর নিজের দ্বারা ত্যাজ্য। ‘তার শরীরের শুধু সে-স্থানেই ভেদ্য ছিলো একিলিস, যেখানে তাকে ধরে রেখেছিল তার মা,’ সির লে ফেম-এ বলেন মতেরল। মানুষ হওয়ার মধ্যে নিদের্শিত হয়ে আছে যে-অবস্থা, তা তিনি মেনে নিতে কখনোই ইচ্ছক ছিলেন না। নিজের উদ্ভবের উর্ধ্বে না উঠে তিনি একে অস্বীকার করেন প্রবলভাবে।
