পুরুষ দিতে চায়, এবং এখন এমন নারী আছে, যে নিজের জন্যে নেয়। এটা হয়ে উঠছে আত্মরক্ষার বিষয়, এটা আর খেলা নয়। নারী যখন স্বাধীন সে-মুহূর্ত থেকে সে স্বাধীনভাবে যা সৃষ্টি করে নিজের জন্যে, তা ছাড়া তার আর কোনো নিয়তি নেই। তারপর থেকে দুটি লিঙ্গের সম্পর্ক হচ্ছে সংগ্রামের সম্পর্ক। এক সহচর ব্যক্তি হয়ে নারী এখন হয়ে উঠেছে ততোটা ভীতিকর, যতোটা ছিলো যখন সে পুরুষের মুখোমুখি দাঁড়াতো বৈরী প্রকৃতির অংশ হয়ে। পরিশ্রমী মৌমাছি বা মা মুরগির কিংবদন্তির বদলে দেখা দিয়েছে এখন গোগ্রাসে গেলা স্ত্রী-পতঙ্গের কিংবদন্তি : আরাধনাকারী ম্যান্টিস, মাকড়সা। সে আর সে-নারী নেই যে লালন করতো নবজাত শিশু, বরং সে এমন নারী, যে পুরুষ খায়; ডিম্ব আর প্রাচুর্যের গোলাঘর নয়, বরং এটা এক জড় বস্তুর ফাঁদ, যার ভেতরে শুক্রাণুকে খোজা ও মগ্ন করা হয়। জরায়ু, সেই উষ্ণ, শান্তিময়, ও নিরাপদ নির্জন আশ্রয় হয়ে উঠেছে রসের মণ্ড, এক মাংসাশী উদ্ভিদ, এক অন্ধকার, সংকোচনসক্ষম উপসাগর, যেখানে বাস করে একটি সাপ, যে অশেষ ক্ষুধায় গেলে। পুরুষের শক্তি। একই দ্বান্দ্বিকতা আশ্লেষের বস্তুকে করে তোলে কৃষ্ণ যাদুর অধিকারী, দাসীকে করে বিশ্বাসঘাতকিনী, সিন্ডেরেলাকে রাক্ষসী, এবং সব নারীকে রূপান্তরিত করে শত্রুতে : পুরুষ যে প্রতারণা করে নিজেকে একমাত্র অপরিহার্য বলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো, এটা হচ্ছে তার মূল্য পরিশোধ।
তবে এ-বৈরী মুখমণ্ডলই অন্যগুলোর থেকে নারীর অধিকতর চূড়ান্ত মুখাবয়ব নয়। বরং নারীর অন্তরে প্রবর্তিত হয়েছে এক ম্যানিকীয়বাদ। পিথাগোরাস শুভ নীতিগুলোকে সম্পর্কিত করেছিলেন পুরুষের সাথে এবং অশুভগুলোকে নারীর সাথে। পুরুষেরা নারীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে জয় করতে চেয়েছিলো অশুভকে; তারা আংশিক সফল হয়েছে। কিন্তু খ্রিস্টধর্ম যেমন মুক্তি ও পাপমোচনের ধারণা এনে।নরকদণ্ড শব্দটিকে দিয়েছে তার পূর্ণ অর্থ, ঠিক সেভাবেই পবিত্ৰীকৃত নারীর সাথে তীব্র বৈপরীত্যেই নষ্ট নারী উদ্ভাসিত হয় বিশিষ্ট হয়ে। মধ্যযুগ থেকে আজ পর্যন্ত চলে এসেছে যে ‘নারী নিয়ে ঝগড়া’, তাতে কিছু পুরুষ স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে শুধু তাদের স্বপ্নের আশীর্বাদপ্রাপ্ত নারীকে, অন্যরা শুধু অভিশপ্ত নারীকে, যে ভ্রান্ত বলে প্রতীয়মান করে তাদের স্বপ্নকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পুরুষ যদি সব কিছু পেতে পারে নারীর মধ্যে, তার কারণ হচ্ছে এ-উভয় মুখই আছে তার। জীবন্ত, দৈহিক ধরনে সে ধারণ করে সব মূল্যবোধ ও প্রতি-মূল্যবোধ, যা অর্থপূর্ণ করে জীবনকে। এখানে, বেশ স্পষ্টভাবে, অনুরক্ত মাতা ও বিশ্বাসঘাতকিনী রক্ষিতারূপে পরস্পরের বিপরীতে রয়েছে শুভ ও অশুভ; প্রাচীন ইংরেজি গীতিকা লর্ড র্যান্ডাল, মাই সান-এ এক তরুণ নাইট, রক্ষিতা যাকে বিষ খাইয়েছে, বাড়ি ফিরে আসে মায়ের কোলে মৃত্যুবরণের জন্যে। মাতা, বিশ্বস্ত দয়িতা, ধৈর্যশীলা স্ত্রী–সবাই প্রস্তুত হয়ে থাকে ‘ছলনাময়ীরা’ ও ডাইনিরা পুরুষের হৃদয়ে যে-ক্ষত সৃষ্টি করে, তা পেঁচিয়ে বাঁধার জন্যে। এ-দুই স্পষ্ট স্থির মেরুর মাঝখানে দেখা যায় অসংখ্য দ্ব্যর্থবোধক মূর্তি, শোচনীয়, ঘৃণ্য, পাপিষ্ঠ, উপদ্রুত, ছেনালিপূর্ণ, দুর্বল, দেবদূতপ্রতিম, শয়তানপ্রতিম। নারী এভাবে পুরুষের জীবনকে উদ্দীপ্ত ও সমৃদ্ধ করার জন্যে যোগায় বিচিত্র আচরণ ও ভাবাবেগ।
পুরুষ মুগ্ধ হয় নারীর জটিলতা দিয়েই : এক অপূর্ব দাসী, যে ধাধিয়ে দিতে পারে তার চোখ–এবং খুব বেশি ব্যয়বহুলও নয়। সে কি দেবী না দানবী? এ-অনিশ্চয়তা তাকে পরিণত করে এক স্ফিংক্সে। এখানে আমরা উল্লেখ করতে পারি যে প্যারিসের প্রসিদ্ধতম বেশ্যালয়গুলোর একটি ব্যবসা চালাতো তার পৃষ্ঠপোষকতায়, স্ফিংক্সের উল্কি ধারণ করে। নারীত্বের মহাপর্বে, কর্সেটের কালে, পল বর্জে, অঁরি বাতাইল ও ফরাশি ক্যান-ক্যানের কালে, নাটক, কবিতা, গানে প্রবলভাবে চলেছিলো স্ফিংক্সের বিষয়বস্তু : ‘কে তুমি, কোথা থেকে আসো তুমি, অদ্ভুত স্ফিংক্স?’ এবং আজো নারীর রহস্য সম্পর্কে স্বপ্নের ও বিতর্কের কোনো শেষ নেই। বস্তুত এ-রহস্য রক্ষা করার জন্যেই পুরুষ বহু কাল ধরে নারীর কাছে আবেদন জানিয়েছে দীর্ঘ স্কার্ট, পেটিকোট, অবগুণ্ঠন, লম্বা গ্লোভ, উঁচু খুড়ের জুতো না ছাড়ার জন্যে : যা কিছু অপরের পার্থক্যকে করে তোলে দৃষ্টিনন্দন, তাই তাকে করে আরো কাম্য, কেননা পুরুষ এভাবেই অধিকার করতে চায় অপরকে। আমরা দেখতে পাই যে পুরুষের মতো করমর্দন করে বলে ইংরেজ নারীদের বকছেন আলা-ফরনিয়ে : তাকে উত্তেজিত করে ফরাশি নারীদের বিনয়ী সংযমশীলতা। সুদূরতমা রাজকুমারীর মতো গভীর ভালোবাসা পেতে হলে নারীকে থাকতে হবে গোপন, অজ্ঞাত। ফরনিয়ে তার জীবনে নারীর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তা মনে করার কোনো কারণ নেই; তিনি বাল্যকালের, যৌবনের সমস্ত বিস্ময়, হারানো সর্গের জন্যে সমস্ত কাতরতা ভরে দিয়েছিলেন তার নিজের সৃষ্টিকরা এক নারীর মধ্যে, যার প্রথম গুণই ছিলো যে সে অপ্রাপণীয়। তার ইন দ্য গালাইয়ের ছবিটি শাদায় ও সোনায় আঁকা।
তবে পুরুষেরা নারীর ত্রুটিগুলোও মনে সযত্নে লালন করে, যদি সেগুলো রহস্য সৃষ্টি করে। ‘নারীর লীলাচপলতা থাকা দরকার,’ এক পুরুষ কর্তৃত্বব্যঞ্জকভাবে বলেছিলো এক বুদ্ধিমান নারীকে। চপলতা সম্পর্কে কোনো ভবিষ্যগণী সম্ভব নয়, এটা নারীকে দেয় জলের ওপর ঢেউয়ের শোভা; মিথ্যাচার তাকে সাজায় মনোমুগ্ধকর প্রতিবিম্বে; ছেনালিপনা, এমনকি বিকৃতি, তাকে দেয় উন্মাদক সুগন্ধ। ছলনাময়, পলায়নপর, দুর্বোধ্য, প্রতারণাপূর্ণ–এভাবেই শ্রেষ্ঠরূপে সে ধরা দেয় পুরুষের স্ববিরোধী বাসনার কাছে; অজস্র ছদ্মবেশের আড়ালে সে মায়া। স্ফিংক্সকে তরুণীরূপে রূপায়িত করা এক গতানুগতিক ব্যাপার : কুমারীত্ব হচ্ছে এক গৃঢ়রহস্য, যা সাড়া জাগায় পুরুষের মনে–সেটা হয় ততো বেশি নারী হয় যতো বেশি অসচ্চরিত্র; বালিকার সতীত্ব জাগিয়ে তোলে সব ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার প্রত্যাশা; এবং কেউ জানে না তার নিষ্পপতার ভেতরে লুকিয়ে আছে কী সব বিকার। এখনো পশু ও উদ্ভিদের সন্নিকট, ইতিমধ্যেই সামাজিক নিয়মের অনুগত, সে শিশুও নয় প্রাপ্তবয়স্কও নয়; তার ভীরু নারীত্ব কোনো ভয় জাগায় না, শুধু জাগায় মৃদু উদ্বেগ। আমরা বোধ করি যে সে হচ্ছে নারীরহস্যের অন্যতম বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত উদাহরণ। ‘খাঁটি বালিকা’ যেহেতু লোপ পেয়ে গেছে, তাই তার তন্ত্রও সেকেলে হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে, বেশ্যার প্রতিমা, যাকে মায়ায় বিজয়দৃপ্তভাবে ফরাশি রঙ্গমঞ্চে উপস্থাপিত করেছেন গতিল, আজো রক্ষা করেছে তার বহু মর্যাদা। ভীরু পিউরিটানের কাছে বেশ্যা হচ্ছে পাপ, লজ্জা, রোগ, নরকদরে প্রতিমূর্তি; সে জাগিয়ে তোলে ভয় ও ঘৃণা; সে কোনো পুরুষের অধিকারে নয়, কিন্তু নিজেকে সে দান করে সকলের কাছে এবং জীবিকা নির্বাহ করে এ-ব্যবসা দিয়ে। সে এভাবে পুনরুদ্ধার করে প্রাচীন কালের বিলাসিনী দেবী মহামাতার ভয়ঙ্কর স্বাধীনতা, এবং সে ধারণ করে নারীত্বের এমন মূর্তি, যা পুরুষের সমাজ পবিত্রিত করে নি এবং সে ভরা থাকে ক্ষতিকর শক্তিতে। যৌনক্রিয়ায় পুরুষ সম্ভবত ভাবতেও পারে না যে সে বেশ্যাটির মূমালিক; সে নিতান্তই নিজেকে সমর্পণ করেছে মাংসের এ-দানবীর কাছে। এটা এমন এক অবমাননা, এমন এক দূষণ, যাতে বিশেষভাবেই তিক্ততা বোধ করে অ্যাংলো-স্যাক্সনরা, যারা দেহকে কমবেশি ঘৃণ্য বলেই মনে করে। অন্য দিকে,যে-পুরুষ দেহকে ভয় পায় না সে উপভোগ করে বেশ্যাকর্তৃক দেহের মহানুভব সৎ ঘোষণাকে; সে তার মধ্যে অনুভব করে নারীত্বের এমন এক উন্নয়ন, কোন নৈতিকতাই যাকে নিষ্প্রাণ করতে পারে নি। সে আবার তার দেহে ফিরে পায় সে-ঐন্দ্রজালিক গুণাবলি, যা অতীতে নারীকে করেছিলো নক্ষত্র ও সমুদ্রের বোন, একজন হেনরি মিলার বেশ্যার সাথে শুয়ে অনুভব করে সে মাপছে জীবন, মৃত্যু ও মহাজগতের গভীরতা; আশুগ্রাহী যোনির গভীর, আর্দ্র ছায়াতলে সে দেখা পায় বিধাতার। বেশ্যা যেহেতু এক ধরনের অস্পৃশ্যজন, যে বাস করে এক সকপট নৈতিক জগতের প্রান্তে, তাই আমরা নষ্ট কন্যাকে গণ্য করতে পারি গৃহীত সতীত্বের এক অকার্যকরকারী হিশেবে; তার দীন অবস্থা তাকে সম্পর্কিত করে খাঁটি সন্তের সাথে; কেননা যাকে পদদলিত করা হয়েছে, সে পাবে উচ্চস্থান। মেরি ম্যাগডালিন ছিলো খ্রিস্টের এক প্রিয়পাত্রী; সকপট সতীত্বের থেকে পাপ স্বর্গের দরোজা খোলে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি। সব নারীর মধ্যে বেশ্যারাই পুরুষের বেশি অনুগত, তবু তারাই বেশি সমর্থ পুরুষের থেকে মুক্তি পেতে; এজন্যেই তারা ধারণ করে বিচিত্র অর্থ। তবে এমন কোনো নারী-ধরন নেই–কুমারী, মাতা, স্ত্রী, বোন, দাসী, প্রেমিকা, প্রচণ্ড সতী, সুস্মিত অডালিস্ক–যে পুরুষের ছন্নছাড়া ব্যাকুল কামনাকে এভাবে সংক্ষেপিত করতে সমর্থ নয়।
