ঈর্ষা কেনো চির-অতৃপ্ত, তার কারণ এ-ই। আমরা দেখেছি যে অধিকার কখনোই সদর্থকভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে না; যদি আর সকলকেও সেখানে ডুব দিতে নিষিদ্ধ করা হয়, তবু যে-ঝরনাধারায় তার তৃষ্ণা মেটে সে তার মালিক হয় না : যে ঈর্ষাকাতর, সে এটা জানে ভালোভাবে। সারসত্তায় নারী হচ্ছে অস্থির, জল যেমন তরল; এবং কোনো মানবিক শক্তিই প্রাকৃতিক সত্যকে অস্বীকার করতে পারে না। সাহিত্য ভরেই, যেমন আরব্যরজনীতে তেমনি দেকামেরন-এ, আমরা দেখতে পাই নারীর ধূর্ততা জয়ী হচ্ছে পুরুষের সাবধানতার ওপর। অধিকন্তু, শুধু একলা নিজের ইচ্ছেয়ই পুরুষ কারারক্ষক হয়ে ওঠে নি : সমাজই তাকে–পিতা, ভ্রাতা, স্বামী রূপেদায়ী করে তার নারীর আচরণের জন্যে। নারীর ওপর সতীত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়। আর্থনীতিক ও ধর্মীয় কারণে, কেননা প্রতিটি নাগরিককে সপ্রমাণিত হতে হয় তার আসল পিতার পুত্ররূপে।
তবে এটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে সমাজ তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে যে-ভূমিকা, তার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য করতে হবে নারীকে। পুরুষের রয়েছে এক দ্বিগুণ দাবি, যা নারীকে কপটতার আশ্রয় নিতে বাধ্য করে : পুরুষ চায় নারী হবে তার এবং থাকবে তার সাথে অসম্পর্কিত; পুরুষ স্বপ্ন দেখে তাকে যুগপৎ দাসী ও মোহিনীরূপে পাওয়ার। কিন্তু প্রকাশ্যে সে স্বীকার করে শুধু প্রথমটি; অপরটি এমন প্রতারণাপূর্ণ। বাসনা যে সে তা লুকিয়ে রাখে তার হৃদয় ও মাংসের সংগোপনীয়তার ভেতরে। এটা নৈতিকতা ও সমাজ বিরোধী; এটা অপর-এর মততা, বিদ্রোহপরায়ণ প্রকৃতির মতো, নষ্ট মেয়েলোক-এর মতো খল। পুরুষ যে-শুভকে প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রয়োগ করেছে বলে দাবি করে, তার কাছে পুরুষ নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদন করে না; সে খারাপের সাথে রক্ষা করে লজ্জাজনক সম্পর্ক। কিন্তু যখনই ওই খারাপ অসতর্ক সাহসে খুলে দেখায় তার মুখ, পুরুষ তার বিরুদ্ধে লিপ্ত হয় যুদ্ধে। রাত্রির ছায়ার তলে পুরুষ নারীকে আমন্ত্রণ জানায় পাপে। কিন্তু পূর্ণ দিবালোকে সে অস্বীকার করে পাপ ও নির্দোষ পাপীকে। এবং নারীরা, শয্যার গোপনীয়তার ভেতরে যারা পাপী, প্রকাশ্যে আরো বেশি সংরক্ত হয়ে ওঠে সতীত্বের পুজোয়।
অন্য দিকে নারী যদি কৌশলে এড়িয়ে যায় সমাজের নিয়ম, তখন সে ফিরে যায় প্রকৃতির কাছে ও শয়তানের কাছে, সে সমষ্টির মধ্যে মুক্ত করে দেয় অদম্য ও অশুভ শক্তিরাশি। নারীর কামুক আচরণের নিন্দার সাথে সব সময়ই জড়িয়ে থাকে ভয়। স্বামী তার স্ত্রীকে সৎপথে রাখতে সফল না হলে সে ভাগী হয় স্ত্রীর দোষের; সমাজের চোখে তার দুর্ভাগ্য হয়ে ওঠে তার মানসম্মানের ওপর একটি কলঙ্ক; অনেক কঠোর। সভ্যতা আছে, যেগুলো স্ত্রীর অপরাধ থেকে নিজেকে বিশ্লিষ্ট করার জন্যে স্বামীকে বাধ্য করে দোষীকে হত্যা করতে। অনেকগুলোতে অপরের সন্তোষ বিধানে আগ্রহী স্বামীকে শাস্তি দেয়া হয় ব্যঙ্গতামাসার মধ্যে, তাকে ন্যাংটো করে দু-পা দু-দিকে ঝুলিয়ে গাধার পিঠে চাপিয়ে ঘোরানো হয়। এবং সারা সমাজ কঠোর শাস্তি দেয় অপরাধীকে : স্ত্রী শুধু একলা স্বামীর বিরুদ্ধে অপরাধ করে নি, করেছে সম্পূর্ণ সমাজের বিরুদ্ধে। এসব প্রথা অতিশয় কঠোরভাবে প্রচলিত ছিলো কুসংস্কারাচ্ছন্ন অতীন্দ্রিয়বাদী স্পেনে, মাংস দিয়ে সন্ত্রস্ত এক ইন্দ্রিয়পরায়ণ দেশে। কালদেরন সর্কা, ভালে ইনক্লান বহু নাটকে ব্যবহার করেছেন এ-বিষয়। লর্কার হাউজ অফ বার্নাদায় গ্রাম্য পরচর্চাকারীরা ধর্ষিত মেয়েটিকে শাস্তি দেয় ‘যে-স্থানে সে পাপ করেছে’ সেখানে জ্বলন্ত কয়লার টুকরো পুড়িয়ে। ভালে ইনক্লানের ডিভাইন ওয়ার্ডস-এ ব্যভিচারিণী নারীটি দেখা দেয় শয়তানের সাথে নৃত্যরত অভিচারিণীরূপে, তার অপরাধ একবার ধরা পড়ার সাথে সাথে সারা গ্রাম জড়ো হয়ে ছিড়েফেড়ে ফেলে তার কাপড়চোপড়, তারপর তাকে জলে ডুবিয়ে মারে। বহু প্রথানুসারে, পাপী নারীকে এভাবে ন্যাংটো করা হতো; তার দিকে ছোঁড়া হতে পাথর, যেমন জানানো হয়েছে বাইবেলে, বা তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো, চুবিয়ে মারা হতো, বা পুড়িয়ে মারা হতো। এসব পীড়নের অর্থ হচ্ছে সামাজিক মর্যাদা বঞ্চিত করে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে প্রকৃতির কাছে; তার পাপ দিয়ে সে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো অশুভর প্রাকৃতিক প্রবাহ।
কুসংস্কার কমতে থাকার সাথে সাথে কমে এ-প্রচণ্ড বর্বরতা এবং দূর হয় ভয়। কিন্তু পল্লী অঞ্চলে আজো নাস্তিক জিন্সিদের গৃহহীন ভবঘুরে হিশেবে দেখা হয় সন্দেহের চোখে। যে-নারী যথেচ্ছ ব্যবহার করে তার আকর্ষণকে–সাহসিকা, ছলনাময়ী, করালী রূপসী–আজো হয়ে আছে উদ্বেগজাগানো নারী। হলিউডের ছায়াছবির নষ্ট নারীর মধ্যে আজো বেঁচে আছে সির্সির ভাবমূর্তি। নারীদের ডাইনিরূপে পুড়িয়ে মারা হয়েছে শুধু এ-কারণে যে তারা ছিলো রূপসী। অনৈতিক জীবনযাপনকারী নারীদের সামনে মফস্বলীয় সতীত্বের বিনয়াভিমানপূর্ণ অসন্তুষ্টির মধ্যে আজো বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে প্রাচীন এক ভীতি।
প্রকৃতপক্ষে এসব বিপদই দুঃসাহসিক পুরুষের কাছে নারীকে করে তোলে এক প্রলোভনজাগানো শিকার। বৈবাহিক অধিকারকে অবজ্ঞা করে এবং সমাজের বিধানের সমর্থন প্রত্যাখ্যান করে, পুরুষ দ্বৈরথে তাকে জয় করার চেষ্টা করে। নারীটি প্রতিরোধ করলেও পুরুষ তাকে অধিকার করতে চায়; পুরুষ নারীটির পেছনে ধাওয়া করে সেই স্বাধীনতার সাথে, যার মাধ্যমে নারীটি এড়িয়ে যায় তাকে। নিস্ফলভাবে। কেউ যখন স্বাধীন থাকে, তখন সে কোনো ভূমিকায় অভিনয় করে না : স্বাধীন নারী মাঝেমাঝেই পুরুষের বিরুদ্ধে করে এমন অভিনয়। এমনকি নিদ্রিতা রূপসীও ঘুম ভেঙে জেগে উঠতে পারে অসন্তোষের মধ্যে, যে তাকে জাগিয়েছে তাকে সে সুদর্শন রাজকুমার বলে মনে নাও করতে পারে, সে মধুরভাবে হাসতে নাও পারে। বীরের স্ত্রী নিস্পৃহভাবে শোনে তার দুঃসাহসিক কর্মগুলোর উপাখ্যান; কবি স্বপ্ন দেখে যেকাব্যদেবীর, সে হয়তো তার স্তবকরাশি শুনতে শুনতে হাই তোলে। আমাজন অবসাদবশত যুদ্ধে নামতে নাও পারে; এবং সে বিজয়ীও হতে পারে। অবক্ষয়ের যুগের রোমের নারীরা, আজকের বহু নারী, পুরুষের ওপর চাপিয়েদেয় তাদের লীলাচাপল্য বা তাদের নিয়ম। কোথায় সিন্ডেরেলা?
