নারীকে মাঝেমাঝেই তুলনা করা হয়েছে জলের সাথে; সে হচ্ছ আয়না, যাতে পুরুষ, নার্সিসাসধর্মী, নিবিষ্টভাবে দেখে নিজেকে : সরল বিশ্বাসে বা প্রতারণার জন্যে সে হেলে পড়ে নারীর দিকে। নারী হচ্ছে তার জন্যে পরম ক্ষতিপূরণ, কেননা তার কাছে অচেনা এক আকৃতিতে, যা সে অধিকার করতে পারে নারীর মাংসে, নারী হচ্ছে তার নিজের দেবত্ব-অর্জন। সে আলিঙ্গন করে এ ‘অতুলনীয় দানবী’টিকে, যখন সে নিজের বাহুতে বাঁধে সে-সত্তাটিকে, যে তার কাছে বিশ্বের সারসংক্ষেপ এবং যার ওপর সে চাপিয়ে দিয়েছে তার মূল্যবোধ ও বিধিবিধান। তারপর, সে নিজের করে নিয়েছে যে-অপরকে, তার সাথে মিলিত হতে গিয়ে সে আশা পোষণ করে নিজের মধ্যে পৌঁছোতে। সম্পদ, শিকার, আমোদ ও বিপদ, সেবিকা, পথপ্রদর্শক, বিচারক, মধ্যস্থতাকারিণী, আয়না, নারী হচ্ছে সেই অপর, যার মধ্যে কর্তা সীমাবদ্ধ না থেকে করে নিজের সীমাতিক্রমণ, যে তার বিরোধিতা করে তাকে অস্বীকার না করে; তাই পুরুষের সুখ ও বিজয়ের জন্যে নারী এতো প্রয়োজনীয় যে বলা যেতে পারে যদি নারী থাকতো, তাহলে পুরুষ তাকে আবিষ্কার করতো।
তারা তাকে আবিষ্কার করেছে। ‘পুরুষ সৃষ্টি করেছে নারী, এবং কী দিয়ে? তার দেবতার পাঁজরের, তার আদর্শের একটি অস্থি দিয়ে, ‘দি টুইলাইট অফ দি গডস-এ বলেছেন নিটশে। কিন্তু নারী আছে তাদের আবিষ্কারশক্তি থেকে দূরেও। এবং তাই সে শুধু পুরুষের স্বপ্নের প্রতিমূর্তিই নয়, তার হতাশাও। এমন কোনো অলঙ্কৃত ভাবমূর্তি নেই নারীর, যা সাথে সাথে তার বিপরীত রূপকে স্মরণ করিয়ে দেয় না : সে জীবন ও মৃত্যু, প্রকৃতি ও ছল, দিবালোক ও রাত্রি। যে-বৈশিষ্ট্যেই আমরা তাকে বিবেচনা করি না কেননা, আমরা দেখতে পাই একই এগোনো ও পিছোননা, কেননা পরিহার্য দরকারবশতই ফিরে আসে অপরিহার্যের কাছে। কুমারী মেরি ও বিয়াত্রিসের আদর্শরূপের মধ্যে আজো বেঁচে আছে হাওয়া ও সির্সি।
যেহেতু নারী এক মিথ্যে অসীমতা, সত্যতাহীন এক আদর্শ, তাই সে দেখা দেয় সসীমতা ও মাঝারিত্ব রূপে, এবং একই কারণে, মিথ্যাচারিতারূপে। লাফর্গে সে দেখা দেয় এভাবেই। ওফেলিয়া, সালোমে আসলে নিতান্তই খর্ব নারী। নারী স্বপ্ন দেখায় পুরুষকে; তবু নারী আরামের কথা ভাবে, রাতের খাবারের জন্যে ভাবে স্টিউর কথা; পুরুষ তার কাছে যখন তার আত্মার কথা বলে, তখন সে নিতান্তই এক শরীর।
পুরুষ সফল হয়েছে নারীকে দাসী বানাতে; তবে একই মাত্রায় পুরুষ তাকে বঞ্চিত করেছে সে-জিনিশ থেকে, যার জন্যে তাকে অধিকারে আনা মনে হয়েছে কাম্য। পরিবারে ও সমাজে সংহত হয়ে নারীর যাদু রূপান্তরিত না হয়ে অপচয়িত হয়ে গেছে; যে ছিলো প্রকৃতির সমস্ত সম্পদের প্রতিমূর্তি, দাসীর পর্যায়ে নেমে গিয়ে সে আর আগের সেই অজেয় শিকার থাকে নি। শিভলরীয় প্রেমের উদ্ভব থেকে একটি গতানুগতিক কথা হচ্ছে যে বিয়ে হত্যা করে প্রেম। নিদারুণ অবজ্ঞার পাত্র হয়ে, অতিশয় ভক্তি পেয়ে, অতিশয় দৈনন্দিন ব্যাপার হয়ে, স্ত্রী হারিয়ে ফেলেছে তার কামের আবেদন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মূল লক্ষ্য ছিলো নারীর কবল থেকে পুরুষকে রক্ষা করা; নারী হয়ে ওঠে পুরুষের সম্পত্তি। কিন্তু আমরা যে-সবের মালিক সে-সবও হয়ে ওঠে আমাদের মালিক, এবং বিয়ে পুরুষের জন্যেও এক ধরনের দাসত্ব। সে ধরা পড়ে প্রকৃতির পাতা ফাঁদে : যেহেতু সে চেয়েছে একটি টাটকা তরুণী, তাই তাকে জীবনভর ভরণপোষণ করতে হয় একটি ভারি মেয়েলোককে বা একটি শুটকি বুড়ীকে। তার অস্তিত্বকে অলঙ্কৃত করার সুকুমার রত্নটি হয়ে ওঠে এক ঘৃণ্য বোঝা; জানতিপ্পি ধরনের নারী চিরকালই পুরুষের কাছে ভীতিকর; প্রাচীন গ্রিসে ও মধ্যযুগে সে হয়ে উঠেছিলো বহু বিলাপের বিষয়বস্তু। কিন্তু নারী যখন তরুণী, তখনও বিয়েতে থাকে এক ধোকাবাজি, কেননা কামের সামাজিকীকরণ করতে গিয়ে এটি সফল হয় শুধু কামকে হত্যা করতে।
ঘটনা হচ্ছে যে কাম জানায় সমইয়ের বিরুদ্ধে মুহূর্তের, দলের বিরুদ্ধে ব্যক্তির দাবি; এটা যোগাযোগের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠা করে বিচ্ছিন্নতা; এটা সব বিধিবিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; এর মধ্যে আছে সমাজের বিরোধী নীতি। প্রথা কখনোই পুরোপুরি নত হয় নি সংস্থা ও বিধিবিধানের কাছে; প্রেম সব সময়ই দেখিয়েছে অবাধ্যতা। গ্রিসে ও রোমে ইন্দ্রিয়াতুর রূপে প্রেম চালিত হয়েছিলো তরুণ ও পতিতাদের দিকে; শিভলরীয় প্রেম, যা ছিলো যুগপৎ শারীরিক ও পাততায়ী, সব সময়ই তার লক্ষ্য ছিলো পরকীয়া। বিস্তান হচ্ছে ব্যভিচারের মহাকাব্য। যে-পর্বে, ১৯০০র দিকে, সৃষ্টি হয়। নারীর নতুন কিংবদন্তি, তখন ব্যভিচার বিষয় হয়ে ওঠে সমস্ত সাহিত্যের। ব্যভিচার লোপ পেতে পারে শুধু বিয়ের সাথে। যেহেতু বিয়ের একটি লক্ষ্য হচ্ছে তার নিজের স্ত্রীর থেকে পুরুষকে অনাক্রম্য করা : কিন্তু অন্য নারীরা স্বামীর জন্যে–ছড়িয়ে রাখে তাদের উচণ্ড আবেদন; এবং তাদের দিকেই সে এগোয়। নারীরা এতে সহযোগী। করে তোলে নিজেদের। এর কারণ বস্তুর এমন বিন্যাসের বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ করে, যা তাদের বঞ্চিত করতে চায় তাদের অস্ত্র থেকে। নারীকে দেয়া হয়েছে শুধু বন্দিনী হওয়ার স্বাধীনতা; সে শুধুই প্রাকৃতিক বস্তু হিশেবে নিজের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্যে প্রত্যাখ্যান করে এ-মানবিক সুবিধা। দিনভর দুরাচারিণীরূপে সে পালন করে তার। বশমানা দাসীর ভূমিকা, কিন্তু রাতে সে রূপান্তরিত হয় বেড়ালীতে, বা হরিণীতে; সে আবার ঢুকে পড়ে তার সাইরেনের চামড়ার ভেতরে, বা কোনো ঝড়তে চড়ে যাত্রা করে শয়তানের নৃত্যোৎসবের দিকে। কখনোকখনো সে তার নিজের স্বামীর ওপরই প্রয়োগ করে তার নৈশ ইন্দ্রজাল; তবে তার প্রভুর কাছে থেকে তার রূপান্তররাশি লুকিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ; তাই তার নিয়তিই হচ্ছে অসতীত্ব : এটাই তার মুক্তির একান্ত মূর্তরূপ। এমনকি তার কামনা, চিন্তা, সচেতনা পেরিয়ে সে অবিশ্বাসিনী; যেহেতু তাকে গণ্য করা হয় বস্তু হিশেবে, তাই সে নিবেদিত হতে পারে যে তাকে অধিকার করতে সম্মত, এমন যে-কোনো কর্তার কাছে। হারেমে বন্দী থেকে, অবগুণ্ঠনের আড়ালে গুপ্ত থেকেও নিশ্চিত নয় যে সে কারো ভেতরে কামনা জাগিয়ে তুলবে না; এবং কোনো অপরিচিতের মনে কামনা জাগানো হচ্ছে স্বামী ও সমাজকে প্রত্যাখ্যান করা। অধিকাংশ সময়ই সে এ-দুষ্কর্মের আগ্রহী সহযোগী; শুধু প্রতারণা ও ব্যভিচারের মধ্য দিয়েই সে প্রমাণ করতে পারে যে সে কারো অস্থাবর সম্পত্তি নয়। স্বামীর ঈর্ষা কেননা এতো দ্রুত জেগে ওঠে তার কারণ এ-ই; উপকথায় দেখতে পাই অকারণেই সন্দেহ করা হয় নারীদের, তুচ্ছতম সন্দেহে, ব্রাবাতের জেনেভিয়েভ ও দেসদিমোনার মতো, দণ্ডিত করা হয় তাদের। এমনকি যখন কোনো সন্দেহ দেখা দেয় নি, তখনও গ্রিসেলদাকে যেতে হয়েছে কঠোর অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে; একাহিনী হতো উদ্ভট যদি নারীদের আগে থেকেই সন্দেহ করা না হতো; তার অপরাধ প্রমাণের কোনো কথাই ওঠে না; তার সতীত্ব প্রমাণের দায়িত্ব তারই।
