নারী যেহেতু পুরুষের কাব্যকর্মের একান্ত বিষয়, তাই বোঝা যায় যে নারী দেখা দেবে পুরুষের প্রেরণারূপে, কাব্যদেবীরা নারী। কাব্যদেবী মধ্যস্থতা করে স্রষ্টা ও তার প্রাকৃতিক নির্ঝরগুলোর মধ্যে, যা থেকে আহরণ করতে হয় তাকে। নারীর চেতনা গভীরভাবে প্রকৃতির ভেতরে মগ্ন, এবং তার মাধ্যমেই পুরুষ জানার চেষ্টা করে নৈঃশব্দ্যের গভীরতার ও রাত্রির উর্বরতার অভিপ্রায়। কাব্যদেবী নিজে কিছুই সৃষ্টি করে; সে এক শান্ত, বিজ্ঞ সিবিলে, যে বশ মেনে নিজেকে সমর্পণ করেছে এক প্রভুর সেবায়। মূর্ত ও বাস্তবিক এলাকায় তার উপদেশ হবে অসার। পুরুষ চায় নারীর ‘বোধি’ যেমন সে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে তারামণ্ডলকে। এ-ধরনের ‘বোধি’কে সঞ্চারিত করা হয় এমনকি ব্যবসা ও রাজনীতিতে; আম্পাসিয়া ও মাদাম দ্য তেনোঁ আজো সফলভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের পেশা।
পুরুষ অন্য যে-একটি এলাকায় দায়িত্ব দেয় নারীকে, সেটি মূল্যায়নের এলাকা; নারী এক বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত বিচারক। পুরুষ অপর-এর স্বপ্ন দেখে শুধু তাকে অধিকার করার জন্যে নয়, তার দ্বারা অনুসমর্থিত হওয়ার জন্যেও; অন্য পুরুষদের দ্বারা, তার সমকক্ষদের দ্বারা অনুসমর্থিত হওয়ার জন্যে পুরুষকে থাকতে হয় স্থায়ী মানসিক চাপের মধ্যে; তাই সে চায় বাইরে থেকে বিবেচনা করে কেউ তার জীবনকে, তার কর্মোদ্যোগকে, এবং তাকে ভূষিত করুক ধ্রুব মূল্যে। বিধাতার বিবেচনা গুপ্ত, বৈরি, দুশ্চিন্তাজনক; এমনকি খুব কম সংখ্যক অতীন্দ্রিয় সাধকই এটা কামনা করেছেন। এ-ঐশ্বরিক ভূমিকা অধিকাংশ সময়ই হস্তান্তরিত হয়ে এসে পড়েছে নারীর ওপর। যেহেতু সে অপর, সে থাকে পুরুষের জগতের বাইরে এবং এটি সে দেখতে পায় বস্তুগতভাবে; এবং পুরুষের কাছে থেকে ও তার অধীনস্থ হয়ে সে পুরুষের বিরোধী কোনো মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করে না। নারী পুরুষের বিগড়ে যাওয়া জগতের বাইরের; তার সমস্ত পরিস্থিতি তার জন্যে নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট দর্শকের। ভূমিকা। নাইট তার নারীর জন্যে নামে অস্ত্রপ্রতিযোগিতায়; কবি চায় নারীর অনুমোদন। প্যারিস জয়ের অভিযাত্রায় বেরোনোর আগে রাস্তিগনায় প্রথমে চায় নারী, তবে সে তাদের শারীরিকভাবে অধিকার করতে বিশেষ চায় নি, সে চেয়েছিলো সেই খ্যাতি, যা শুধু নারীরা দিতে পারে পুরুষকে। বালজাক তাঁর নিজের যৌবনের কাহিনী প্রক্ষিপ্ত করেছেন তাঁর তরুণ নায়কদের মধ্যে : সে নিজেকে শিক্ষিত ও রূপায়িত করতে শুরু করে তার থেকে জ্যেষ্ঠ উপপত্নীদের সংস্পর্শে। নারীকে শিক্ষাদাত্রীর ভূমিকা দেয়া হয়েছে ফ্লুবেরের এদিকাসিয়ে সাঁতিমাতাল-এ, স্তেদালের উপন্যাসে, এবং শিক্ষানবিশির আরো অনেক গল্পে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে নারী হচ্ছে ফিসিস ও অ্যান্টি-ফিসিস : অর্থাৎ সে সমাজের যতোটা প্রতিমূর্তি, প্রকৃতিরও ততোটাই; তার মধ্যেই সাররূপ লাভ করে বিশেষ পর্বের সভ্যতা ও সংস্কৃতি, যেমন আমরা দেখতে পাই শিভলরির কবিতায়, দেকামেরন-এ, আন্ত্রিতে। সে সূচনা করে নতুন ফ্যাশনের, নেত্রীত্ব করে সলতে, প্রভাবিত ও প্রতিফলিত করে মতামত। খ্যাতি ও গৌরব হচ্ছে নারী; এবং মালার্মে বলেছেন, ‘জনতা হচ্ছে নারী’। তরুণেরা নারীর সাহচর্যের মধ্যে দীক্ষিত হয় ‘সমাজ’-এ, এবং জীবন নামক জটিল বাস্তবতায়। নারী হচ্ছে সেই বিশেষ পুরস্কার, যা অবধারিতভাবে জয় করে নায়কেরা, অভিযাত্রীরা, এবং কর্কশ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীরা। প্রাচীনকালে আমরা দেখতে পাই পার্সিউস মুক্ত করছে অ্যান্ড্রোমিডাকে, পাতাললোকে অফিউস খুঁজছে ইউরিদিসকে, এবং সুন্দরী হেলেনকে রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করছে ট্রয়। শিভলরির উপন্যাসের প্রধান বিষয়ই হচ্ছে বন্দিনী রাজকুমারীদের মুক্ত করার শৌর্যবীর্য। সুন্দর রাজকুমারের কী হতো কাজ যদি সে ঘুম ভাঙাতে নিদ্রিতা রূপসীর? রাজা বিয়ে করছে রাখালকন্যাকে, এ-উপকথা পুরুষকে যতোটা তৃপ্ত করে, ততোটাই করে নারীদের। ধনী পুরুষ দরকার বোধ করে দান করার, নইলে তার নিরর্থক ধন থেকে যায় এক নিষ্কর্ষ : তার কাছাকাছি কারো থাকা দরকার, যাকে সে দিতে পারে। সিন্ডেরেলা উপকথা বিকাশ লাভ করে বিশেষ করে আমেরিকার মতো ধনী দেশে। সেখানে পুরুষেরা তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ নারীর পেছনে ব্যয় না করে কী করবে?
এটা স্পষ্ট যে পুরুষ নিজেকে দাতা, মুক্তিদাতা, ভ্রাতা, পাপমোচনকারীরূপে স্বপ্ন দেখে কামনা করে তার কাছে নারীর অধীনতা; কেননা নিদ্রিতা রূপসীকে জাগানোর জন্যে তাকে আগে ঘুম পাড়ানো দরকার : বন্দিনী রাজকুমারী থাকতে হলে সেখানে থাকতে হবে রাক্ষসখোক্ষস। পুরুষ যতোই কঠিন কর্মোদ্যোগের রুচি অর্জন করে, সে ততোই সুখ বোধ করে নারীকে স্বাধীনতা দিতে। তবে উপহার বা মুক্তি দানের থেকে জয় করা অনেক বেশি মনোমুগ্ধকর।
তাই গড়পড়তা পশ্চিমি পুরুষের কাছে সে-ই হচ্ছে আদর্শ নারী, যে সানন্দে মেনে নেয় পুরুষের আধিপত্য, যে আলোচনা না করে পুরুষের চিন্তাভাবনা মেনে নেয় না, তবে সে নতি স্বীকার করে পুরুষের যুক্তির কাছে, সে বুদ্ধির সাথে পুরুষকে প্রতিরোধ করে এবং শেষ করে পুরুষের মতে বিশ্বাসী হয়ে। পুরুষের দুঃসাহসিক কাজ যতো বেশি বিপদসঙ্কুল, তার গর্ব ততো বেশি : একটি বশমানা সিন্ডেরেলাকে বিয়েকরার থেকে পেন্থেসিলিয়াকে জয় করা অনেক বেশি তৃপ্তিকর। ‘যোদ্ধা ভালোবাসে বিপদ ও আমোদ,’ বলেছেন নিটশে; ‘তাই সে ভালোবাসে নারী, সব আমোদর মধ্যে যে সবচেয়ে বিপজ্জনক’। যে-পুরুষ বিপদ ও আমোদ পছন্দ করে, সে নারীকে আমাজনে রূপান্তরিত হতে দেখে অসন্তুষ্ট হয় না, যদি তার ভেতরে আশা জেগে থাকে যে সে পরাভূত করতে পারবে নারীটিকে। তার অন্তরের অন্তস্তলে সে যা পোষণ করে, তা। হচ্ছে এ-যুদ্ধ তার জন্যে হবে এক খেলা, আর নারীর জন্যে হবে একান্ত নিয়তি। সে ত্রাতা বা বিজয়ী যাই হোক, পুরুষের প্রকৃত বিজয় হচ্ছে : নারী তাকে সানন্দে স্বীকার করে নেবে নিজের নিয়তি বলে।
