এ-সত্য, বস্তুর রাত্রিতে ঢাকা, আকাশেও জ্বলে দীপ্তভাবে; বিশুদ্ধভাবে সীমাবদ্ধ, তবে আত্মা আবার একই সময়ে সীমাতিক্ৰমণতা, ভাববস্তু। শুধু নগর ও জাতিই নয়, প্রতিষ্ঠানের মতো বিমূর্ত ব্যাপারগুলোও নারীত্বের গুণাবলিতে ভূষিত : গির্জা, সিনেগগ, প্রজাতন্ত্র, মানবজাতি নারী; শান্তি, যুদ্ধ, স্বাধীনতা, বিপ্লব, বিজয়ও তাই। নারী হচ্ছে আত্মা ও ভাব, তবে সে এদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারিণীও : সে হচ্ছে স্বর্গীয় করুণা, খ্রিস্টধর্মীকে যে পথ দেখিয়ে নেয় ঈশ্বরের দিকে, সে বিয়াত্রিসে, যে দান্তেকে পথ দেখিয়ে নেয় দূরান্তরে, সে লরা, যে পেত্রার্ককে ডাকে কবিতার উচ্চতম শিখরের দিকে। যে-সব মতবাদ সমন্বিত করে প্রকৃতি ও চেতনাকে, সেগুলোতে সে দেখা দেয় সঙ্গতি, যুক্তিশীলতা, সত্য রূপে। নস্টিক ধর্মগোত্রগুলো প্রজ্ঞাকে দিয়েছিলো নারীরূপ, সোফিয়া, যার কাজ বিশ্বকে এবং এমনকি তার সৃষ্টিকে পরিত্রাণ করা। এখানে নারীকে আমরা আর মাংসরূপে দেখতে পাই না, দেখি মহিমান্বিত বস্তুরূপে; সে আর অধিকৃত হওয়ার নয়, বরং ভক্তি করতে হবে তাকে তার অক্ষুন্ন গৌরবে; পোর মলিন মৃতরা জল, বায়ু, স্মৃতির মতো তরল; শিভলীয়প্রেমে, লে প্রেসিওতে, এবং রোমান্সের সমগ্র ধারা ভরে, নারী আর কোনো পাশব জীব নয়, বরং সে এক বায়বীয় সত্তা, প্রশ্বাস, শিখাহীন দীপ্তি। এভাবেই নারী নিশীথের অনচ্ছতা রূপান্তরিত হয় স্বচ্ছতায়, এবং খলতা রূপান্তরিত হয় শুদ্ধতায়।
নারীর নিম্নমুখি প্রভাব যায় পাল্টে; সে আর পুরুষকে পৃথিবীর দিকে ডাকে না, ডাকে আকাশের দিকে। ফাউস্ট-এর শেষভাগে এটা ঘোষণা করেন গ্যেটে :
শাশ্বতী নারী
ইশারা করে আমাদের উর্ধ্ব অভিমুখে।
কুমারী মেরি যেহেতু সবচেয়ে সম্পূর্ণরূপে রূপায়িত ও সাধারণভাবে পূজিত নারী ভাবমূর্তি, যে উৎসর্গিত শুভর কাছে, তাই সে কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে সাহিত্য ও চিত্রকলায়, সেটা দেখা হবে বেশ আকর্ষণীয়। নিচে উদ্ধৃত হলো মেরির উদ্দেশে নিবেদিত মধ্যযুগের এক ঐকান্তিক খ্রিষ্টধর্মীর প্রার্থনাগীত :
.. অতিশয় মহৎ কুমারী,তুমি উর্বর শিশির, আনন্দের ফোয়ারা, করুণার প্রণালি, প্রাণময় জলের কূপ যা শীতল করে আমাদের অনুভূতির উত্তাপ।
তুমি সেই স্তন যা ঈশ্বর পান করতে দিয়েছে অনাথদের…
তুমি সেই মজ্জা, ক্ষুদ্র কণা, সমস্ত ভালো জিনিশের শাঁস,
তুমি সেই প্রতারণাহীন নারী যার প্রেম কখনো বদলায় না…
তুমি সেই সূক্ষ্ম চিকিৎসক যার মতো কাউকে পাওয়া যাবে না সালেরনো বা মতপেলিয়েরে…
তুমি নিরাময় হাতের নারী… তুমি হাঁটাও পক্ষাঘাগ্রস্তদের, তুমি সংশোধন করো হীনকে, তুমি বাঁচিয়ে তোলা মৃতকে।
এসব আবাহনে আমরা আবার দেখতে পাই আমাদের আলোচিত নারীর অধিকাংশ বৈশিষ্ট্য। কুমারী মেরি হচ্ছে উর্বরতা, শিশির, জীবনের নিঝর; বহু ক্ষুদ্র প্রতিমূর্তিতে তাকে দেখা যায় কুয়ো, নিঝর, ফোয়ারার পাশে একটি বহুলব্যবহৃত পদ হচ্ছে ‘জীবনের ফোয়ারা’; সে সৃষ্টিশীল নয়, তবে সে ফলবতী করে, যা মাটির নিচে গুপ্ত ছিলো, সেগুলোকে সে বিকশিত করে দিনের আলোতে। সে হচ্ছে বস্তুর প্রতিভাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর বাস্তবতা : শাঁস, মজ্জা। তার মাধ্যমে বাসনা প্রশমিত হয় : সে তাই, যা পুরুষের পরিতৃপ্তির জন্যে দেয়া হয়েছে পুরুষকে। সে নিরাময় করে ও বলশালী করে; সে মানুষ ও জীবনের সঞ্চারিকা; জীবন আসে ঈশ্বরের কাছে থেকে, সুতরাং সে মানবজাতি ও ঈশ্বরের সঞ্চারিকা। তারতুলিয়ান তাকে বলেছিলেন ‘শয়তানের প্রবেশদ্বার’; কিন্তু, মহিমান্বিত রূপ লাভ করে, সে হয়ে উঠেছে স্বর্গের প্রবেশদ্বার। চিত্রকলায় আমরা তাকে দেখতে পাই যে সে খুলছে স্বর্গের দিকের কোনো দরোজা বা জানালা, বা মই স্থাপন করছে পৃথিবী ও নভোমণ্ডলের মাঝখানে। তাকে আরো সরাসরি দেখানো হয়প্রবক্তারূপে, যে মানুষের জন্যে ওকালতি করছে তার পুত্রের কাছে, এবং শেষবিচারের দিনে, বক্ষ নগ্ন করে, দীনভাবে কৃতাঞ্জলিপুটে তার গৌরবান্বিত মাতৃত্বের নামে প্রার্থনা করছে খ্রিস্টের কাছে। সে রক্ষা করে শিশুদের, এবং তার করুণাময় প্রেম সব বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে মানুষকে অনুসরণ করে সমুদ্রে, যুদ্ধক্ষেত্রে। সে স্বর্গীয় ন্যায়বিচারকে দুলিয়ে সুস্মিত হাসিতে ভারি করে তোলে দাঁড়িপাল্লার দয়ার দিক।
এ-করুণা ও কোমলতার ভূমিকা নারীকে দেয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাগুলোর একটি। যখন নারী পরিপূর্ণরূপে সংহত হয়ে যায় সমাজের সাথে তখনও সে সূক্ষ্মভাবে প্রসারিত করে তার সীমা, কেননা তার আছে জীবনের বিশ্বাসঘাতক মহানুভবতা। পুরুষ দেবতারা নির্দেশ করে নিয়তি; দেবীদের মধ্যে দেখা যায় স্বেচ্ছাচারী হিতাকাঙ্খা, লীলাময় অনুগ্রহ। খ্রিস্টীয় বিধাতা সুবিচার কঠোরতায় পরিপূর্ণ, কুমারী পরিপূর্ণ দাক্ষিণ্যের বদান্যতায়। পৃথিবীতে পুরুষেরা রক্ষাকারী আইন, যুক্তিশীলতা, প্রয়োজনের। নারী নিরাময় করে পুরুষের ক্ষত, সে লালনপালন করে নবজাত শিশু, এবং সৎকারের জন্যে প্রস্তুত করে মৃতকে। কবিতার কাজ হচ্ছে যা আছে প্রতিদিনের গদ্য পেরিয়ে, তাকে ধরা; এবং নারীং হচ্ছে বিশেষভাবে এক কাব্যিক বাস্তবতা, কেননা পুরুষ তার ওপর প্রক্ষেপ করে সে সব, যা সে হতে চায় না। নারী প্রতিমূর্তিত করে স্বপ্নকে, পুরুষের কাছে যা সবচেয়ে অন্তরঙ্গ ও সবচেয়ে অদ্ভুত।
