যে-ভক্তিশ্রদ্ধা জ্যোতিশ্চক্রের মতো ঘিরে থাকে মাতাকে, তাকে ঘিরে থাকে যেনিষেধাবলি, সেগুলো চাপা দিয়ে রাখে সে-শত্রুতাপূর্ণ ঘৃণা, যা স্বতস্ফূর্তভাবে মিশ্রিত থাকে তার জাগানো দৈহিক কোমলতার সাথে। তবে এক ধরনের মাতৃভীতি টিকেই আছে। এটা উল্লেখ করা কৌতূহলজনক হবে যে মধ্যযুগ থেকেই আছে একটি গৌণ কিংবদন্তি, যাতে খোলাখুলিভাবে প্রকাশ পায় এ-ঘৃণা : সেটি হচ্ছে শাশুড়ীর কিংবদন্তি। উপকথা থেকে ভোদভিল পর্যন্ত স্ত্রীর মাতার মধ্য দিয়ে পুরুষ অবজ্ঞা করে মাতৃত্বকে, এবং স্ত্রীর মাতাকে রক্ষা করার জন্যে কোনো ট্যাবু নেই। যে-নারীকে সে ভালোবাসে, তাকে জন্ম লাভ করতে হয়েছে, এটা ভাবতেই অপছন্দ করে পুরুষ : তার শাশুড়ী হচ্ছে সে-জরাগ্রস্ততার দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ, কন্যাকে জন্ম দিয়ে যা সে নির্ধারিত করে রেখেছে নিজের কন্যার জন্যে। তার মেদ ও চামড়ার ভাঁজ জানিয়ে দেয় যে তরুণী নববধুর জন্যেও অপেক্ষা করে আছে এ-মেদ ও ভাঁজ,ভার ভবিষ্যৎ লাভ করে আছে এমন শোকাবহ রূপ।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে তার ঐন্দ্রজালিক অস্ত্রগুলো থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং আর্থিক ও সামাজিকভাবে স্বামীর অধীন হয়ে ‘সতী স্ত্রী’ হয়ে ওঠে পুরুষের অতিশয় মূল্যবান সম্পদ। সে এতোগভীরভাবে স্বামীর অধিকারে থাকে যে সে অংশী হয়ে ওঠে স্বামীর একই সারসত্তার; সে পায় স্বামীর নাম, স্বামীর দেবতা, এবং স্বামী নেয় তার দায়দায়িত্ব। স্বামী তাকে বলে তার ‘অর্ধাঙ্গিনী’। স্বামী যেমন তার গৃহ, জমিজমা, পশুপাল, ধনসম্পদ নিয়ে গর্ব বোধ করে, তেমনি সে গর্ব বোধ করে স্ত্রী নিয়েও, এবং কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি; তার মাধ্যমে স্বামী বিশ্বের কাছে দেখায় নিজের ক্ষমতা। সে হচ্ছে স্বামীর আদর্শ পরিমাপ এবং পার্থিব অংশ। প্রাচ্যদেশীয় দৃষ্টিতে নারীকে হতে হয় স্থূলকায় : লোকেরা দেখতে পায় যে সে বেশ পরিপুষ্ট এবং তার প্রভু ও মালিককে সে ভক্তি করে। কোনো মুসলমানের যেতো বেশি স্ত্রী থাকে এবং তারা যতোবেশি হৃষ্টপুষ্ট হয়, তার সম্বন্ধে পোষণ করা হয় তত ভালো ধারণা। বুর্জোয়া সমাজে নারীকে দেয়া হয় একটি ভূমিকা যে তাকে খাসা দেখাতে হবে; তার রূপ, মনোহারিত্ব, বুদ্ধি, মার্জিতভাব হচ্ছে তার স্বামীর ধনসম্পদের বাহ্যিক ও দর্শনীয় চিহ্ন, যেমন চিহ্ন তার গাড়ির ক্রেতা-নির্দেশিত গঠন। যদি স্বামী ধনী হয়, তাহলে সে স্ত্রীকে ঢেকে দেয় পশমে ও রত্নে; যদি ততো ধনী না হয়, তাহলে সে গর্ব করে স্ত্রীর নৈতিকতা ও গৃহিণীপনার। অতিশয় নিঃস্বও যদি তাকে সেবা করার জন্যে পেয়ে থাকে কোনো নারী, তাহলে সেও বিশ্বাস করে যে জগতে সেও কিছুর মালিক : দি টেমিং অফ দি শ্রুর নায়ক সব পাড়াপ্রতিবেশীকে ডেকে আনে সে কতোটা প্রভুত্বের সাথে পরাভূত করতে পারে তার স্ত্রীকে, তা দেখানোর জন্যে। সব পুরুষই স্মরণ করিয়ে দেয় রাজা কাঁদুলেকে : সে তার স্ত্রীকে প্রদর্শন করে, কেননা সে বিশ্বাস করে যে এভাবেই সে প্রচার করছে তার নিজের গুণাবলি।
কিন্তু নারী শুধু পুরুষের সামাজিক শ্লাঘাকে ফুলিয়ে তোলে না; সে পুরুষের আরো আন্তর শ্লাঘার উৎস। নারীর ওপর আধিপত্যে সে আনন্দ পায়; লাঙলের ফাল খুঁড়ছে। হলরেখা এ-বাস্তবসম্মত প্রতীকের ওপর–যখন নারী একজন ব্যক্তি–চাপিয়ে দেয়। আরো আধ্যাত্মিক প্রতীক : স্বামী তার স্ত্রীকে শুধু কামগতভাবে গঠন করে না, করে নৈতিক ও মননগতভাবেও; স্বামী তাকে শিক্ষা দেয়, তার মূল্যায়ন করে, তার ওপর। মারে নিজের ছাপ। যে-সমস্ত স্বপ্নে পুরুষ আনন্দ পায়, তার একটি হচ্ছে তার ইচ্ছেয় জিনিশপত্র রঞ্জিত করা–তাদের গঠনকে বিশেষ রূপ দিতে, তাদের উপাদানকে বিদ্ধ করতে। নারী হচ্ছে সর্বোচ্চ মাত্রায়তার হাতের কর্দম, যার ওপর অক্রিয়ভাবে ক্রিয়া করা যায় এবং যাকে আকৃতি দেয়া যায়; আত্মসমর্পণ করতে করতে নারী বাধা দিতে থাকে, তার ফলে পুরুষের কাজ চলতে থাকে অনির্দিষ্ট কাল ধরে।
খ্রিস্টধর্মের জন্ম থেকে নারীর দেহকে কীভাবে আধ্যাত্মিক করে তোলা হয়েছে, তা দেখা যেতে পারে। পুরুষ নারীর মাধ্যমে উপভোগ করতে চায় যে-সৌন্দর্য, উষ্ণতা, অন্তরঙ্গতা, সেগুলো আর শরীরী গুণাবলি নয়; বস্তুর অব্যবহিত ও উপভোগ্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করার বদলে নারী হয়ে ওঠে তাদের আত্মা; শরীরী রহস্যের থেকে গভীর, তার হৃদয়ে এক গোপন ও বিশুদ্ধ উপস্থিতি প্রতিফলিত করে বিশ্বের সত্য। সে গৃহের, পরিবারের, বাড়ির আত্মা। এবং সে নগর, রাষ্ট্র, জাতির মতো বৃহত্তর সংঘগুলোর আত্মা। ইয়ুং বলেছেন নগরকে সব সময়ই সম্পর্কিত করা হয়েছে মায়ের সাথে, কেননা তারা বক্ষে ধারণ করে নগরবাসীদের, তাই সিবিলেকে রূপায়িত করা হয় সৌধের মুকুটপরা মূর্তিতে। এবং এভাবে বলা হয় ‘মাতৃভূমি’; তবে জীবন লালনকারী মাটিরই শুধু নয়, নারী প্রতীক আরো সূক্ষ্ণ বাস্তবতার। পুরোনো বাইবেল ও আপকালিপসে জেরুজালেম ও ব্যাবিলন শুধু মা নয় : তারা স্ত্রীও। আছে অনেক কুমারী নগর, এবং বাবেল ও টায়ারের মতো বেশ্যাস্বভাবা নগর। এজন্যে ফ্রান্সকে বলা হয়েছে ‘গির্জার জ্যেষ্ঠ কন্যা’; ফ্রান্স ও ইতালি হচ্ছে লাতিন বোন। পুরুষেরা যে বিভিন্ন স্থানকে নারীর সঙ্গে সম্পর্কিত করে, তা বিশুদ্ধভাবে প্রতীকধর্মী নয় : অনেক পুরুষ আবেগগতভাবেই এটা অনুভব করে। অধিকাংশ সময়ই ভ্রমণকারী তার ভ্রমণের দেশের চাবি খোঁজে নারীর মধ্যে : সে যখন কোনো ইতালীয় বা স্পেনীয় নারীকে আলিঙ্গনে বাঁধে, তার মনে হয় সে অধিকার করেছে ইতালি বা স্পেনের সুগন্ধি সারসত্তা। ‘যখন আমি কোনো নতুন নগরে যাই, সব সময়ই আমি শুরু করি কোনো বেশ্যালয়ে গিয়ে,’ মন্তব্য করেছেন এক সাংবাদিক। যদি একটি দারুচিনি চকোলেট জিদের কাছে মেলে ধরতে পারে সমগ্র স্পেনকে, তাহলে অদ্ভুত মদির ওষ্ঠের চুম্বন প্রেমিককে দেয় তার সমস্ত পশুপাখিউদ্ভিদ, তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিসহ একটি সম্পূর্ণ দেশ। নারী রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান বা আর্থনীতিক সম্পদগুলোর সারাংশ ধারণ করে না; কিন্তু সে যুগপৎ প্রতিমূর্তি তাদের সম্পদের মর্মবস্তু ও অতীন্দ্রিয় মানার। খ্রিস্টান বিশ্ব বনদেবী ও পরীর স্থানে বসিয়েছে অনেক কম শরীরী উপস্থিতিকে; তবে গৃহ, ভূখণ্ড, নগর, এবং ব্যক্তিদের ভেতরে এখনো আনাগোনা করে স্পর্শাতীত নারীত্ব।
