মাতারূপেই ভীতিকর ছিলো নারী; তাই মাতার মধ্যেই তাকে মহিমান্বিত করতে হবে ও পরিণত করতে হবে দাসীতে। সবার ওপরে মেরির কুমারীত্বের আছে এক নঞর্থক মূল্য : এটা যে যেটির মাধ্যমে মাংসকে পাপমুক্তি দেয়া হয়েছে, সেটি দৈহিক নয়; এটিকে স্পর্শ বা অধিকার করা হয় নি। একইভাবে এশীয় মহামাতারও কোনো স্বামী ছিলো না : সে সৃষ্টি করেছিলো বিশ্ব এবং নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাজত্ব করেছিলোএর ওপর; সে তার চপলতায় উচ্ছৃঙ্খল হতে পারে, কিন্তু মহামাতারূপে কোনো স্ত্রীধর্মী আনুগত্য দিয়ে তার মহিমার লাঘব ঘটে নি। একইভাবে মেরির গায়েও লাগে নি কামের দাগ। রণলিপ্সু মিনার্ভার মতো সে একটি গজদন্ত মিনার, নগরদুর্গ, অজেয় প্রধান দুর্গমিনার। প্রাচীন কালের যাজিকারাও, অধিকাংশ খ্রিস্টীয় সেইন্টের মতো, ছিলো কুমারী : শুভর কাছে উৎসর্গিত নারী উৎসর্গিত হতে হবে তার অক্ষত শক্তিরমহিমার মধ্যে; তাকে সংরক্ষিত রাখতে হবে তার নারীত্বের সারসত্তা, তার অপরাজিত সংহতির মধ্যে। স্ত্রী হিশেবে মেরির মর্যাদা যদি অস্বীকার করা হয়, সেটা করা হয়েছে এ-লক্ষ্যে যে তার মধ্যে বিশুদ্ধতররূপে উন্নীত করতে হবে নারী মাতাকে। কিন্তু সে গৌরব পাবে তার জন্যে নির্ধারিত অধস্তন ভূমিকা গ্রহণ করে। ‘আমি প্রভুর দাসী’। মানুষের ইতিহাসে এই প্রথম মাতা নতজানু হয় তার পুত্রের কাছে; সে তার নিকৃষ্টতা মেনে নেয় সহজে। পুরুষের এটা চরম বিজয়, যা চরিতার্থ হয়েছে কুমারীতন্ত্রে–এটা নারীর পরাজয় সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে নারীর পুনর্বাসন। ইশতার, আস্তারতে, সিবিলে ছিলো নিষ্ঠুর, খামখেয়ালপূর্ণ, কামনাপরায়ণ; তারা ছিলো ক্ষমতাশালী। তারা যেমন ছিলো মৃত্যুর তেমনি জীবনের উৎস, পুরুষ জন্ম দিয়ে তারা পুরুষকে করেছিলো নিজেদের দাস। খ্রিস্টধর্মে জীবন ও মৃত্যু শুধু ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল, এবং পুরুষ একবার মায়ের দেহ থেকে বেরিয়ে চিরকালের জন্যে মুক্তি পেয়ে গেছে দেহ থেকে; মা এখন অপেক্ষায় আছে শুধু তার অস্থিমালার। প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ হিশেবে মাতৃত্ব আর নারীকে কোনো ক্ষমতা দান করে না। তাই নারী যদি তার আদিদোষ থেকে উদ্ধার চায়, তাহলে তার জন্যে আছে শুধু বিধাতার ইচ্ছের কাছে মাথা নত করা, যা তাকে অধীনস্থ করে পুরুষের। এবং এ-বশ্যতাস্বীকারের মধ্য দিয়েই সে পুরুষের পুরাণে পেতে পারে একটি নতুন ভূমিকা। যখন সে আধিপত্য করতে চেয়েছে, তখন তাকে পিটিয়ে পিটিয়ে দেয়া হয়েছে বিশেষ আকার, করা হয়েছে পদদলিত এবং যতোদিন সে সুস্পষ্টভাবে অধিকার ত্যাগ না করবে, ততোদিন তাকে দেয়া যেতে পারে শুধু অনুগত দাসীর মর্যাদা। সে তার আদিম গুণগুলোর কোনোটিই হারাচ্ছে না, শুধু এগুলো সংকেত হিশেবে উল্টে যাচ্ছে; সেগুলো অশুভ সংকেত থেকে হয়ে ওঠে শুভ সংকেত; কৃষ্ণ যাদু রূপান্তরিত হয় শ্বেততে। দাসী হিশেবে নারীকে দেয়া হয়েছে অতিশয় জমকালো দেবীত্বলাভের অধিকার।
এবং নারীকে যেহেতু বশ মানানো হয়েছে মাতারূপে, তাই সর্বপ্রথম তাকে লালন ও সম্মান করা হয় মাতারূপে। পরিবারে ও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে, বিধিবিধান ও প্রথার সাথে খাপ খাইয়ে, মাতা হয়েউঠেছে শুভর অনন্য প্রতিমূর্তি : যে-প্রকৃতির সে আংশিক অংশীদার, সে-প্রকৃতি হয়ে উঠেছে শুভ, তা আর চেতনার শত্রু নয়; আর যদি সে রহস্যময়ও থাকে, তবে তার রহস্যটা ; লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ম্যাডোনাদের মতো সুস্মিত রহস্য। পুরুষ নারী হতে চায়না, কিন্তু সে স্বপ্ন দেখে অস্তিত্বশীল সব কিছু–এই নারীসহ, সে যা নয়-নিজের মধ্যে জড়িয়ে ধরার; মাতৃপুজোর মধ্য দিয়ে পুরুষ অধিকার করতে চায় তার অদ্ভুত সম্পদরাশি।
পার্কের প্রাচীন পুরাণের মতো জড়িয়ে থাকে মৃত্যুর সাথে; মৃতকে সৎকারের জন্যে প্রস্তুত করার কাজটি করতে হয় তাকেই, মৃতের জন্যে শোকপালনও করতে হয় তাকেই। তবে তার কাজ হচ্ছে জীবনের, সমাজের, সকলের মঙ্গলের সাথে মৃত্যুর সামঞ্জস্য বিধান। এবং তাই সুশৃঙ্খলভাবে উৎসাহিত করা হয় ‘বীরমাতা’তন্ত্র : সমাজ যদি মাতাদের সম্মত করাতে পারে তাদের পুত্রদের মৃত্যুর কাছে সমর্পণ করতে, তাহলে সমাজ বোধ করে যে তাদের হত্যা করার অধিকার তার আছে। মাতার যেহেতু প্রভাব আছে তার পুত্রদের ওপর, তাই মাতাকে হাতে রাখা সমাজের জন্যে বিশেষ সুবিধাজনক : এ-কারণেই মাতাকে ঘিরে দেয়া হয় শ্রদ্ধার অজস্র নিদর্শনে, তাকে ভূষিত করা হয় সমস্ত গুণাবলিতে, তাকে নিয়ে গড়ে ওঠে একটা ধর্ম। তাকে করা হয় নৈতিকতার অভিভাবক; সে পুরুষের দাসী, যারা ক্ষমতাশালী হবে তাদের সে দাসী,সে তার সন্তানদের সুকোমলভাবে পরিচালিত করে বিধিবদ্ধ পথে। যে-সমাজ যতোবেশি দৃঢ় আশাবাদী, সেটি ততো বশমানাভাবে অনুগত হয় এ-অমায়িক কর্তৃত্বের কাছে, আর মাতা ততোবেশি লাভ করে আদর্শায়িত রূপ। মাতাকে গৌরবান্বিত করা হচ্ছে জন্ম, জীবন, ও মৃত্যুকে একই সময়ে তাদের পাশবিক ও সামাজিক রূপে গ্রহণ করা, এর কাজ প্রকৃতি ও সমাজের সঙ্গতি ঘোষণা। এ-সংশ্লেষণের স্বপ্ন দেখেছিলেন বলে অগাস্ত কোঁৎ নারীকে করেছিলেন ভবিষ্যৎ মানবজাতির দেবী। কিন্তু একই বিবেচনা সব বিপ্লবীকেই উদ্বুদ্ধ করে মাতৃমূর্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে; তাকে অবজ্ঞা করে তারা প্রত্যাখ্যান করে স্টেটাস কৌ, বিধিবিধান ও প্রথার অভিভাবকরূপে মাতার মাধ্যমে সমাজ যা চাপিয়ে দিতে চায় তাদের ওপর।
