আজকাল খ্রিস্টীয় চিন্তাধারার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় আরো নানা প্রভাব; এবং এর রয়েছে নানা বৈশিষ্ট্য। তবে, পিউরিটান জগতে, শরীরের প্রতি ঘৃণা সমানভাবে বিরাজ করছে; এর প্রকাশ ঘটেছে, উদাহরণস্বরূপ, ফকনারের লাইট ইন আগস্ট-এ; নায়কের প্রথম দিকের যৌন অভিজ্ঞতাগুলো ভয়ঙ্করভাবে আতঙ্কজনক। সাহিত্য ভরেই এটা দেখানো খুবই সাধারণ ঘটনা যে এক তরুণ প্রথম সঙ্গমের পর এভোই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যে তার বিবমিষা জাগে; এবং বাস্তবে যদিও এমন প্রতিক্রিয়া খুবই দুর্লভ, তবু এটা যে এতো ঘনঘন বর্ণনা করা হয়, তা কোনো আকস্মিক ব্যাপার নয়। বিশেষ করে অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশগুলোতে, যেগুলো পিউরিটানবাদে বিশেষভাবে সিক্ত, অধিকাংশ তরুণ ও বহু পুরুষের মধ্যে নারী জাগিয়ে তোলে ভয়, যা কমবেশি খোলাখুলি স্বীকার করা হয়। এ-অনুভূতিটা বেশ তীব্রভাবে বিরাজ করে ফ্রান্সে। মিশেল লিরি আজ দঅম-এ লিখেছেন : ‘আজকাল আমি নারীর প্রত্যঙ্গটিকে মনে করি একটি ঘিনঘিনে জিনিশ বা একটা ঘা, কিন্তু এর জন্যে এটা কম আকর্ষণীয় নয়, তবে অন্য সব রক্তাক্ত, শ্লেষ্মল,রোগাক্রান্ত বস্তুর মতোই এটা ভয়ঙ্কর’। একটি সাধারণ বিশ্বাস হচ্ছে সঙ্গমের ফলে পুরুষ হারিয়ে ফেলে তার পেশিশক্তি ও চিন্তাশক্তি, তার ফসফরাস নিঃশেষিত হয়ে যায় এবং নির্জীব হয়ে পড়ে তার অনুভূতি। এটা সত্য যে হস্তমৈথুনও নির্দেশ করে এসব বিপদ, এবং নৈতিক কারণে সমাজ একে স্বাভাবিক যৌনকর্মের থেকে আরো বেশি ক্ষতিকর মনে করে। কামের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা হচ্ছে বৈধ বিবাহ ও সন্তানকামনা। নারী হচ্ছে ভ্যাম্পায়ার, সে পুরুষ খায় ও পান করে; তার যৌনাঙ্গ বেঁচে থাকে পুরুষের যৌনাঙ্গ খেয়ে খেয়ে। কিছু মনোবিশ্লেষক চেষ্টা করেছেন এসব অলীক কল্পনার বৈজ্ঞানিক প্রমাণযোগানোর, তারা প্রস্তাব করেছেন সঙ্গমে নারী যে-সুখ পায়, তা হয়তো আসে এ-ব্যাপার থেকে যে নারী পুরুষটিকে প্রতীকীরূপে খোজা করে এবং অধিকার করে নেয় শিশ্নটি। তবে মনে হয় মনোবিশ্লেষণ করা দরকার এসব তত্ত্বেরই, এবং এটা সম্ভবপর এসব তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন যে-সব চিকিৎসক, তাঁরা হয়তো লিপ্ত তাদের পূর্বপুরুষের ভীতি প্রক্ষেপণে।
পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে গভীরভাবে পোষ মানানো হয়েছিলো নারীর যাদুকে। তার ভেতরে আছে যে-মহাজাগতিক শক্তিগুলো, নারী সেগুলোকে অঙ্গীভূত করার সুযোগ দেয় সমাজকে। দুমিজেল তাঁর মিত্র-বরুণ গ্রন্থে দেখিয়েছেন যেমন রোমে তেমনি ভারতে পৌরুষ দেখানোর দুটি রীতি রয়েছে : প্রথমত, বরুণ ও রোমুলুসে, গন্ধর্বদের ও লুপারর্কির মধ্যে, এ-শক্তি হচ্ছে আক্রমণ, ধর্ষণ, বিশৃঙ্খলা, কাণ্ডজ্ঞানহীন হিংস্রতা; এতে নারী দেখা দেয় এমন সত্তারূপে, যাকে করতে হবে ধর্ষণ, বলাৎকার ধর্ষিতা সেবিন নারীদের, যারা স্পষ্টত ছিলো বন্ধ্যা, মারা হয়েছিলো বৃষের চামড়ায় তৈরি চাবুক; এটা করা হয়েছিলো অধিকতর হিংস্রতা দিয়ে অতিশয় হিংস্রতার ক্ষতিপূরণের জন্যে। তবে, দ্বিতীয়ত এবং এর বিপরীতে, মিত্র, নুমা, ব্রাহ্মণরা, ও পুরোহিতেরা ছিলো নগরের আইনশৃঙ্খলার পক্ষে : এক্ষেত্রে নারীকে বিয়ের বিস্তৃত আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ করা হয় স্বামীর সাথে, এবং তার সাথে কাজ করতে গিয়ে নারী তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় প্রকৃতির সব নারীশক্তিকে অধীনস্থ করার; রোমে স্ত্রীর মৃত্যু হলে জুপিটারের পুরোহিত ত্যাগ করতে নিজের পদ। একইভাবে মিশরে আইসিস দেবী মহামাতার পরম ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার পরও থাকে মহানুভব, সুস্মিত, দয়াবতী, ও শুভ, ওসিরিসের জাকজমকপূর্ণ স্ত্রী। কিন্তু নারী যখন পুরুষের সঙ্গী, পরিপূরক, তার ‘অর্ধাঙ্গিনী’, তখন দরকারবশতই নারীর থাকে এক সচেতন অহং, একটি আত্মা। পুরুষ এতো অন্তরঙ্গভাবে এমন কোনো প্রাণীর ওপর নির্ভর করতে পারে না, যে তার সাথে মানুষের সারসত্তার অংশী নয়। আমরা আগেই দেখেছি যে মনুর বিধান বৈধ স্ত্রীকে দিয়েছে স্বামীর সাথে একই স্বর্গের প্রতিশ্রুতি।
খ্রিস্টধর্ম, স্ববিরোধীরূপে, বিশেষ এক স্তরে ঘোষণা করেছে পুরুষ ও নারীর সাম্য। নারীর মধ্যে খ্রিস্টধর্ম ঘৃণা করে দেহ; নারী যদি দেহ অস্বীকার করে, তাহলে সে ঈশ্বরের জীব, ত্রাতা যাকে পাপমুক্ত করেছে, তখন সে পুরুষের থেকে কম নয় : নারী তখন আসন পায় পুরুষের পাশে, স্বর্গের সুখের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে যারা, সে-সব পুণ্যাত্মার মধ্যে। পুরুষ ও নারী উভয়ই বিধাতার দাস, অনেকটা দেবদূতদের মতো অলৈঙ্গিক, এবং একত্রে তারা বিধাতার করুণায় মুক্ত থাকে পার্থিব প্রলোভন থেকে। নারী যদি সম্মত হয় তার পাশবিকতাকে অস্বীকার করতে, তাহলে নারী, যে পাপের প্রতিমূর্তি, সেও তখন হয়ে ওঠে যারা পাপকে জয় করেছে, সেই মনোনীতদের বিজয়ের উজ্জ্বলতম প্রতিমূর্তি। অবশ্য সে-স্বর্গীয় ত্রাতা, যে পাপমুক্ত করে মানুষকে, সে পুরুষ। খ্রিস্ট বিধাতা; কিন্তু মানবমণ্ডলির ওপর রাজত্ব করে এক নারী, কুমারী মেরি। তবে কিছু প্রান্তিক ধর্মগোত্রই নারীর মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছে মহাদেবীর প্রাচীন সুযোগসুবিধা ও ক্ষমতা–গির্জা ধারণ ও সেবা করে এক পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার, যাতে পুরুষের উপাঙ্গ হিশেবে থাকাই নারীর জন্যে মানানসই ও বিধেয়। পুরুষের বাধ্য দাসীরূপেই সে হতে পারে আশীর্বাদপ্রাপ্ত সেইন্ট। এভাবে মধ্যযুগের অন্তরে জেগে ওঠে পুরুষের জন্যে শুভ নারীর এক অতিশয় সংস্কৃত ভাবমূর্তি। গৌরবে মণ্ডিত হয়খ্রিস্টের মাতার সুপ্রসন্ন মুখভাব। সে হচ্ছে পাপীয়সী হাওয়ার বিপরীত দিক; সে পায়ের নিচে পিষ্ট করে সাপটিকে; সে পাপমুক্তির মধ্যস্থতাকারিণী, যেমন হাওয়া ছিলো নরকদণ্ডের।
