ধারাবাহিক উপন্যাসের অতিব্যবহৃত শব্দভাণ্ডার নারীকে বর্ণনা করেছে অভিচারিণী, সমোহনকারিণী রূপে, যারা পুরুষকে মুগ্ধ করে তার ওপর ছড়িয়ে দেয় সম্মোহন, এবর্ণনায় প্রতিফলিত হয় সবচেয়েপুরোনো ও সর্বজনীন কিংবদন্তিগুলো। নারী উৎসর্গিত যাদুর কাছে। আলাইন বলেছেন যে যাদু হচ্ছে কন্তর মাঝে বেঁকে ভেঙে পড়া প্রেত; কোনো কাজ তখনই ঐন্দ্রজালিক, যখন তা কোনো সংঘটক দ্বারা উৎপন্ন না হয়ে বয়ে আসে অক্রিয় কিছু থেকে। পুরোহিত ও যাদুকরের মধ্যে পার্থক্য সুবিদিত : প্রথমজন দেবতাদের ও বিধান অনুসারে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করে শক্তিরাশিকে, সকলের কল্যাণের জন্যে, দলের সব সদস্যের নামে; যাদুকর কাজ করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, দেবতাদের ও বিধানের বিরুদ্ধে, তার নিজের গভীর আগ্রহ অনুসারে। এখন, পুরুষের বিশ্বে নারী সম্পূর্ণরূপে সংহতি লাভ করে নি; অপররূপে, সে তাদের বিরোধী পক্ষ। এটা তার পক্ষে স্বাভাবিক যে তার শক্তিগুলো সে প্রয়োগ করবে, সে বিস্তৃত হবে না পুরুষের সমাজে এবং ভবিষ্যৎ সীমাতিক্ৰমণতার শীতল উদ্যোগের মধ্যে, কিন্তু, যেহেতু সে বিচ্ছিন্ন, বিরোধী, সে পুরুষদের টেনে নেবে বিচ্ছিন্নতার নিঃসঙ্গতায়, সীমাবদ্ধতার তমসায়। নারী হচ্ছে সাইরেন, যার গানে প্রলুব্ধ নাবিকেরা আছড়ে পড়ে শিলার ওপর; সে সির্সে, যে তার প্রেমিকদের রূপান্তরিত করে পশুতে, সে আনডাইন, যে জেলেদের টেনে নেয় খাড়ির গভীরে। নারীর রূপে মুগ্ধ হওয়ার পর পুরুষের আর থাকে না ইচ্ছেশক্তি, কর্মোদ্যোগ, ভবিষ্যৎ; সে আর নাগরিক খাচ্ছে না, হয়ে ওঠে। মাংসের কামনার কাছে দাসত্বে বন্দী মাংস, গোষ্ঠি থেকে বিচ্ছি, সুহুর্তের কাছে বন্দী, পীড়ন ও প্রমোদের মধ্যে অক্রিয়ভাবে আন্দোলিত।
এ-মাংসের নাটকের কোন দিকের ওপর পুরুষ গুরুত্ব দিচ্ছে, সে-অনুসারে পুরুষের থাকতে পারে বহু মনোভাব। যদি কোন পুরুষ জীবনকে অনন্য মনে না করে, যদি সে তার বিশেষ নিয়তি নিয়ে উদ্বিগ্ন না থাকে, যদি সে মৃত্যুকে ভয় না পায়, তাহলে সে আনন্দের সাথে মেনে নেয় তার পাশবিকতা। সমাজের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্যে মুসলমানদের মধ্যে নারীকে ধ্বংস করা হয় অতি শোচনীয় অবস্থায়; ওই সমাজ পরিবারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কাছে আবেদনের অনুমতি দেয় না, এবং ধর্মের কারণে, যে-ধর্ম প্রকাশ করে সভ্যতার যুদ্ধপরায়ণ ভাবাদর্শ, পুরুষকে সরাসরি উৎসর্গ করা হয়েছে মৃত্যুর কাছে এবং নারীকে বঞ্চিত করেছে তার যাদু থেকে। কীসের সে ভয় করবে পৃথিবীতে যে তৈরি হয়ে আছে যে-কোনো মুহূর্তে মুহম্মদীয় স্বর্গের ইন্দ্রিয়পরায়ণ প্রমোদে লিপ্ত হওয়ার জন্যে? এমন ক্ষেত্রে পুরুষ নিজের বা নারীর থেকে আত্মরক্ষার কোনো দরকার ছাড়াই শান্তভাবে উপভোগ করতে পারে নারী। আরব্যরজনীর গল্পগুলো নারীকে উপস্থাপিত করে সুখকর প্রমোদের উৎসরূপে, যেমন উৎস ফল, মোরব্বা, সুস্বাদু পিঠা, ও সুগন্ধি তেল। আজকাল আমরা ওই ইন্দ্রিয়ভারাতুরতা দেখতে পাই ভূমধ্যসাগরীয় জনগণের মধ্যে। ইন সিসিলিতে ভিত্তোরিনি বলেছেন সাত বছর বয়সে প্রশান্ত বিস্ময়ে তিনি দেখেছিলেন এক নারীর নগ্ন দেহ। গ্রিস ও রোমের যুক্তিশীল চিন্তাধারা সমর্থন করে এ-সহজিয়া মনোভাব। তবে যুক্তিশীলতা কখনোই সম্পূর্ণরূপে জয় লাভ করে নি এবং এসব সভ্যতায় কামের অভিজ্ঞতাগুলো রক্ষা করেছে তাদের পরস্পরবিপরীত মূল্যসম্পন্ন চরিত্র : আচারানুষ্ঠান, পুরাণ, সাহিত্য এসবের প্রমাণ। তবে নারীর প্রতি আকর্ষণ ও বিপদ প্রকাশ পেয়েছে দুর্বলতর রূপে।
খ্রিস্টধর্ম আবার নারীকে ভরে তোলে ভীতিকর মর্যাদায় : পুরুষের অস্বস্তিপূর্ণ বিবেকের তীব্র যন্ত্রণা রূপ নেয় অন্য লিঙ্গের প্রতি ভীতি রূপে। একজন খ্রিস্টান নিজের ভেতরে দ্বিধাবিভক্ত; দেহ ও আত্মার, জীবন ও চৈতন্যের স্বাতন্ত্র্য এখানে সম্পূর্ণ; আদিপাপ দেহকে করেছে আত্মার শত্রু; মাংসের সমস্ত বন্ধনকে মনে হয় অশুভ। শুধু খ্রিস্টের দ্বারা ত্রাণ লাভ করে এবং স্বর্গরাজ্যের দিকে চালিত হয়েই রক্ষা পেতে পারে মানুষ; তবে মূলত মানুষ হচ্ছে দূষণ; তার জন্ম তাকে শুধু মৃত্যুদণ্ডিত করে না, নরকদণ্ডিতও করে; শুধু স্বর্গীয় করুণায়ই তার সামনে উন্মুক্ত হতে পারে স্বর্গ, তবে তার পার্থিব অস্তিত্বের সব রূপের ওপরই রয়েছে একটা অভিশাপ। অশুভ হচ্ছে এক ধ্রুব বাস্তবতা; আর দেহ হচ্ছে পাপ। নারী যেহেতু সব সময়ই অপর, তাই এটা বিশ্বাস করা হয় না যে পুরুষ ও নারী উভয়ই পরস্পরের কাছে দেহ : খ্রিস্টানের কাছে দেহ হচ্ছে সেই বৈরী অপর, যা সব সময়ই নারী। খ্রিস্টানের কাছে নারীর মধ্যে রূপ ধারণ করেছে বিশ্বের, মাংসের, ও শয়তানের প্রলোভন। গির্জার সব পিতাই এধারণার ওপর জোর দেন যে নারীই আদমকে প্রলুব্ধ করেছে পাপে। আমাদের আবার উদ্ধৃত করতে হবে তারতুলিয়ানকে : ‘নারী! তুমি শয়তানের প্রবেশদ্বার। তাকে তুমি প্ররোচিত করেছিলে, যাকে শয়তানও সরাসরি আক্রমণের সাহস করে নি। তোমার জন্যেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে ঈশ্বরের পুত্রকে। তুমি সব সময় থাকবে শোকে ও ছিন্নবস্ত্রে’। সমগ্র খ্রিস্টান সাহিত্যের প্রয়াস হচ্ছে নারীর প্রতি পুরুষের ঘৃণা বাড়ানো। তারতুলিয়ান নারীর সংজ্ঞা দিয়েছেন ‘পয়ঃপ্রণালির ওপর নির্মিত মন্দির’রূপে। সেইন্ট অগাস্টিন বিভীষিকার সাথে কামের ও মলমূত্র ত্যাগের প্রত্যঙ্গগুলোর মেশামেশির দিকে আকর্ষণ করেছেন দৃষ্টি : ‘আমরা জন্ম নিই মলও মূত্রের মধ্যে’। নারীশরীরের প্রতি খ্রিস্টধর্মের বিরূপতা এতো যে যখন এটি তার ঈশ্বরকে ধ্বংস করতে চায় এক কলঙ্কজনক মৃত্যুতে, তখন এটি তাকে অব্যাহতি দেয় জন্ম নেয়ার কালিমা থেকে : প্রাচ্য গির্জার এফিসুসের পরিষদ এবং পাশ্চাত্য গির্জার ল্যাটেরান পরিষদ ঘোষণা করেছে যে খ্রিস্টের জন্ম হয়েছে কুমারী মায়ের গর্ভে। গির্জার আদিপিতারা–অরিগেন, তারতুলিয়ান, ও জেরোমে-মনে করেছিলেন অন্যান্য নারীর মতো মেরিও প্রসব করেছিলো রক্ত ও ময়লার মধ্যেই; কিন্তু সেইন্ট অ্যামব্রোজ ও সেইন্ট অগাস্টিনের মতামতই জয়লাভ করে। কুমারীর দেহ থেকেছিলো রুদ্ধ। মধ্যযুগ থেকেই শরীর থাকা, নারীর বেলা, গণ্য হয়ে এসেছে কলঙ্ক বলে। এমনকি বিজ্ঞানও দীর্ঘকাল বিহ্বল ছিলো এ-ঘৃণায়। লিনাউস তার প্রকৃতি বিষয়ক সন্দর্তে ‘ঘৃণ্য’ বলে নারীর যৌনপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আলোচনা এড়িয়ে যান। ফরাশি চিকিৎসক দ্য লরে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন এ-মর্মপীড়াদায়ক প্রশ্নটি : ‘এ-স্বর্গীয় প্রাণীটি, যে পরিপূর্ণ যুক্তিশীলতা ও বিচারবুদ্ধিতে, যাকে আমরা বলি পুরুষ, সে কী করে আকৃষ্ট হয় নারীর ওইসব অশ্লীল প্রত্যঙ্গের প্রতি, যা নোংরা হয়ে থাকে তরল পদার্থে এবং লজ্জাকরভাবে অবস্থিত ধড়ের নিম্নতম অংশে?’
