নারীর প্রতি পুরুষের অনুভূতির পরস্পরবিপরীত মূল্য আবার জেগে ওঠে নিজের কামপ্রত্যঙ্গের প্রতি তার মনে ভাবে : সে এর জন্যে গর্বিত, সে এটিকে উপহাস করে, এটির জন্যে লজ্জা পায়। ছোটো ছেলে তার শিশ্নের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্যে বন্ধুদের সাথে নামে প্রতিযোগিতায় : তার শিশ্নের প্রথম উত্থান তাকে একই সাথে ভরে দেয় গর্বে ও ভীতিতে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ তার শিশ্নকে গণ্য করে সীমাতিক্ৰমণতা ও শক্তির প্রতীকরূপে; এটা এক স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত পেশিরূপে এবং একই সময়ে একটি ঐন্দ্রজালিক উপহাররূপে তৃপ্ত করে তার অহমিকাকে : সে এটি দিয়ে মুগ্ধ থাকে, তবে তার মনে সন্দেহ জেগে থাকে যে সে প্রতারিত হতে পারে। যে প্রত্যঙ্গটি দিয়ে সে নিজেকে দৃঢ়ভাবে জ্ঞাপন করতে চায়, সেটি তার অনুগত নয়, অতৃপ্ত কামনায় ভারি হয়ে, আকস্মিকভাবে দাঁড়িয়ে, কখনো ঘুমের মধ্যে নিজেকে ভারমুক্ত করে, এটা প্রকাশ করে এক সন্দেহজনক ও খামখেয়ালভরা প্রাণশক্তি। পুরুষ চৈতন্যকে জয়ী করতে চায় জীবনের ওপর, সক্রিয়তাকে অক্রিয়তার ওপর; তার চেতনা প্রকৃতিকে রাখে দূরে, তার ইচ্ছে তাকে রূপ দান করে, কিন্তু তার কামপ্রত্যঙ্গে সে নিজেকে আবার অবরুদ্ধ দেখতে পায় জীবন, প্রকৃতি ও অক্রিয়তা দিয়ে।
‘কামপ্রত্যঙ্গগুলো,’ লিখেছেন শপেনহায়ার, ‘ইচ্ছেশক্তির প্রকৃত পীঠস্থান, যার বিপরীত মেরু হচ্ছে মস্তিষ্ক’। তিনি যাকে ‘ইচ্ছেশক্তি’ বলেছেন, তা হচ্ছে জীবনলগ্নতা, যা হচ্ছে দুঃখভোগ ও মৃত্যু, আর সেখানে ‘মস্তিষ্ক’ হচ্ছে চিন্তা, যা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। তাঁর মতে যৌন লজ্জা হচ্ছে সে-লজ্জা, যা আমরা বোধ করি শরীরের প্রতি আমাদের নির্বোধ মোহের ফলে। তার তত্ত্বগুলোর হতাশাবাদকে আমরা আপত্তিকর মনে করলেও, যে-বৈপরীত্য তিনি দেখেছেন, তা ঠিক : কাম বনাম মস্তিষ্ক, মানুষের দ্বৈততার প্রকাশ। কর্তা হিশেবে পুরুষ মুখোমুখি হয় বিশ্বের, এবং এ-বিশ্বের বাইরে অবস্থান করে সে নিজেকে করে তোলে এর শাসক; যদি সে নিজেকে দেখে মাংস হিশেবে, কাম হিশেবে, সে আর থাকে না স্বাধীন চেতনা, স্পষ্ট, স্বাধীন সত্তা : সে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায় বিশ্বের সাথে, হয়ে ওঠে এক সীমাবদ্ধ ও বিনাশী বস্তু। সন্দেহ নেই যে প্রজননের কর্ম অতিক্রম করে যায় দেহের সীমা, তবে সে-মুহূর্তেই এটা প্রতিষ্ঠিত করে সীমা। শিশ্ন, প্রজন্মদের পিতা, সঙ্গতিপূর্ণ মায়ের জরায়ুর সাথে; পুরুষ উদ্ভূত হয় একটি জীবাণু থেকে, যে-জীবাণু বাড়েনারীর দেহের ভেতরে, পুরুষ নিজেই আবার জীবাণুর বহনকারী, এবং যা দান করে জীবন, তা বপন করে পুরুষকে পরিত্যাগ করতে হয় তার নিজের জীবনকেই। ‘সন্তানদের জন্ম হচ্ছে,’ হেগেল বলেছেন, ‘পিতামাতার মৃত্যু’। বীর্যপাত হচ্ছে মৃত্যুর প্রতিশ্রুতি, এটা ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রজাতির দৃঢ় ঘোষণা; কামপ্রত্যঙ্গের অস্তিত্ব ও তার কর্মকাও অস্বীকার করে কর্তার গর্বিত বিশিষ্টতা। আত্মার বিরুদ্ধে জীবনের এ-প্রতিদ্বন্দ্বিতাই পুরুষাঙ্গটিকে লজ্জাজনক করে তোলে। পুরুষ যৌনাঙ্গ নিয়ে তখনই গৌরব বোধ করে যখন সে এটিকে মনে করে সীমাতিক্ৰমণ ও সক্রিয়তা, অপরকে অধিকার করার একটি হাতিয়ার; কিন্তু সে একে নিয়ে লজ্জা বোধ করে যখন সে এটিকে দেখে নিতান্ত অক্রিয় মাংসরূপে, যার মাধমে সে হয়ে ওঠে জীবনের অন্ধকার শক্তিরাশির খেলার সামগ্রি।
কিন্তু এখানেই সে বুঝতে পারে–শ্রেষ্ঠ প্রমাণের সাথে তার দৈহিক পরিস্থিতির দ্ব্যর্থবোধকতা। সে তার কামে ততোটাই গর্ব বোধ করে, এটা যতোখানি পরিমাণে অপরকে আত্মসাতের এক রকম উপায়–এবং মালিকানা লাভের এ-স্বপ্ন শেষ হয় শুধু হতাশায়। যথার্থ মালিকানায় অপর বিলুপ্ত হয়ে যায়, একে নিঃশেষ ও ধ্বংস করা হয় : যখন ভোর এসে হাজির হয় তার শয্যা থেকে রক্ষিতাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে, তখন শুধু আরব্যরজনীর সুলতানেরই আছে তার প্রত্যেক রক্ষিতার মাথা কাটার ক্ষমতা। নারী বেঁচে থাকে পুরুষের আলিঙ্গনের পরেও, এবং এ-ঘটনা দিয়েই সে মুক্তি পায় পুরুষের থেকে; যখনই পুরুষ শিথিল করে বাহু, তার শিকার আবার তার কাছে হয়ে ওঠে অচেনা; সেখানে সে পড়ে থাকে, নতুন, অক্ষত, একই স্বল্পস্থায়ী রীতিতে প্রস্তুত অন্য কোনো প্রেমিকের দ্বারা অধিকৃত হওয়ার জন্যে। পুরুষের এক স্বপ্ন হচ্ছে নারীটিকে এমনভাবে ‘ছাপ মেরে দেয়া,’ যাতে নারীটি চিরকাল তার হয়ে থাকে; তবে সবচেয়ে উদ্ধত পুরুষটিও ভালোভাবেই জানে সে নারীটির কাছে স্মৃতি ছাড়া আর কিছু রেখে যাবে না আর অতিশয় ব্যাকুল স্মৃর্তিচারণও সত্যিকারের, বর্তমান অনুভূতির তুলনায় ঠাণ্ডা। বিপুল পরিমাণ সাহিত্যে সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে এ-হতাশা। এটা নারীকে করেছে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু, তাকে বলা হয়েছে অস্থিরমতী এবং বিশ্বাসঘাতিনী, কেননা তার শরীরই এমন যে তা বিশেষ কোনো পুরুষের কাছে নয়, সাধারণভাবে সব পুরুষের কাছেই উৎসর্গিত হতে পারে।
তবে তার দ্রোহিতা আরো বেশি বিশ্বাসঘাতক : সত্য বলতে কী নারী তার প্রেমিককে পরিণত করে নিজের শিকারে। শুধু একটি দেহই স্পর্শ করতে পারে অন্য একটি দেহকে; পুরুষ তার কাম্য মাংসের প্রভু হয়ে ওঠে শুধু নিজে মাংসে পরিণত হয়ে; হাওয়াকে দেয়া হয়েছিলো আদমের কাছে, যাতে হাওয়ার মাধ্যমে আদম অর্জন করতে পারে তার সীমাতিক্ৰমণতা, এবং হাওয়া আদমকে টেনে নেয় সীমাবদ্ধতার রাত্রির ভেতরে। তার রক্ষিতা, প্রমোদের মাথাঘোরানোর মধ্যে, তাকে আবার বন্দী করে সে-অন্ধকার গর্ভের অনচ্ছ কাদামাটিতে, যা মা তৈরি করেছে তার পুত্রের জন্যে এবং যেখান থেকে সে চায় মুক্তি পেতে। পুরুষ চায় নারীকে অধিকার করতে; সে নিজেই হয় অধিকৃত! গন্ধ, আর্দ্রতা, ক্লান্তি, নির্বেদ–এক গ্রন্থাগারভর্তি বইয়ে বর্ণনা করা হয়েছে মাংসে পরিণত হওয়া চেতনার এ-বিষাদাচ্ছন্ন সংরাগ।
