সুইফট তাঁর বিখ্যাত অৌড টু সেলিয়ায় নিন্দা করেছিলেন এ-রহস্যীকরণের; ঘেন্নার সাথে তিনি বর্ণনা করেছেন ছেনালের টুকিটাকি জিনিশপত্র এবং ঘেন্নার সাথে স্মরণ করেছেন তার দেহের পাশবিক প্রয়োজনগুলো। ক্রোধে তিনি দু-বার ভুল করেছেন; কেননা পুরুষ চায় নারী একই সাথে হবে পশু ও উদ্ভিদ এবং সে ঢাকা। থাকবে এক কৃত্রিম সম্মুখভাগের আড়ালে; পুরুষ দেখতে ভালোবাসে যে নারী উঠে আসছে সমুদ্র থেকে এবং বেরিয়ে আসছে ফ্যাশনসম্মত বস্ত্রনির্মাতার প্রতিষ্ঠান থেকে, নগ্ন ও বস্ত্রপরিহিত, তার বস্ত্রের নিচে নগ্ন–এভাবেই পুরুষ নারীকে পায় মানবমণ্ডলির বিশ্বে। নগরের পুরুষেরা নারীর ভেতরে খোঁজে পাশবিকতা; তবে সামরিক কাজে নিয়োজিত তরুণ চাষীর কাছে বেশ্যালয়ই হচ্ছে নগরের সমস্ত ইন্দ্রজালের প্রতিমূর্তি। নারী ক্ষেত্র ও চারণভূমি, তবে সে ব্যাবিলনও।
তবে এটাই নারীর প্রথম মিথ্যাচার, তার প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা : এটা জীবনেরই মিথ্যাচার–জীবন যদিও প্রকাশ করে অতিশয় আকর্ষণীয় গঠন, তবু জীবন সব সময়ই উপদ্রুত থাকে বয়স ও মৃত্যুর উত্তেজনা দিয়ে। পুরুষ যেভাবে ব্যবহার করে নারীকে, তাতেই নষ্ট হয় নারীর সবচেয়ে মূল্যবান শক্তিগুলো : গর্ভধারণে ভারাক্রান্ত হয়ে সে হারিয়ে ফেলে তার কামের আবেদন; এমনকি নারী বন্ধ্যা হলেও শুধু কালপ্রবাহই নষ্ট করে দেয় তার মনোহারিত্ব। ক্ষীণবল, সাদামাটা, বৃদ্ধ অবস্থায় নারী আকর্ষণহীন। গাছ সম্পর্কে যেমন বলা হয় তেমনি বলা যেতে পারে সে হয়ে গেছে বিবর্ণ, ম্রিয়মাণ। এটা ঠিক যে পুরুষের জরাগ্রস্ততাও ভীতিকর; তবে পুরুষ সাধারণত বৃদ্ধ পুরুষদের মাংসরূপে দেখে না। নারীর শরীরেই–যে-শরীর সৃষ্টি করা হয়েছে পুরুষেরই জন্যেশুধু পুরুষ মুখোমুখি হয় মাংসের অবনতির। বৃদ্ধা নারী, সাদামাটা নারী আকর্ষণহীন বস্তুই শুধু নয়, তারা জাগায় ভয়মিশ্রিত ঘৃণা। যখন নিঃশেষিত হয়ে যায় স্ত্রীর মনোহারিত্ব, তখন তাদের মধ্যে আবার দেখা দেয় মাতার উদ্বিগ্নকর মূর্তি।
তবুও স্ত্রী এক ভয়ঙ্কর শিকার। সমুদ্রের ঢেউ থেকে উঠে আসে ভেনাসের মধ্যেসজীব ফেনা, উজ্জ্বল ফসল তোলা বেঁচে থাকে দিমিতার; পুরুষ যখন নারীর কাছে থেকে পাওয়া বিনোদের মধ্য দিয়েঅধিকার করে নারীকে, তখন পুরুষ নারীর ভেতরে জাগিয়ে তোলে উর্বরতার সন্দেহজনক শক্তিকেও : যে-প্রত্যঙ্গটিকে সে বিদ্ধ করে, সেটি দিয়েই নারী জন্ম দেয় সন্তান। এ-কারণেই সব সমাজেই নানা ট্যাবু দিয়েপুরুষকে রক্ষা করা হয় স্ত্রীলিঙ্গের বিপদ থেকে। এর বিপরীতটি সত্য নয়, পুরুষের কাছে নারীর ভয় পাওয়ার কিছু নেই; পুরুষের লিঙ্গকে গণ্য করা হয় ইহজাগতিক, লৌকিক বলে। শিশ্নকে উন্নীত করা যেতে পারে দেবতার পর্যায়ে; কিন্তু তার পুজোর মধ্যে নেই ভয়ের কোনো উপাদান, এবং প্রাত্যহিক জীবনে নারীকে পুরুষের থেকে অতীন্দ্রিয়ভাবে রক্ষা করার দরকার পড়ে না, পুরুষ সব সময়ই শুভ। উল্লেখযোগ্য যে বহু মাতৃধারার সমাজে বিরাজ করে খুবই অবাধ যৌনতা; তবে এটা সত্য শুধু নারীর বাল্যকালে, তার কৈশোরে, যখন সঙ্গম প্রজননের ধারণার সাথে জড়িত থাকে না। ম্যালিনোস্কি কিছুটা বিস্ময়ের সাথেই বর্ণনা করেছেন যে তরুণতরুণী যারা অবাধে ঘুমোয় ‘অবিবাহিতদের গৃহ’-এ, তারা তাদের প্রেমলীলার কথা খোলাখুলি প্রকাশ করে দেয়; ঘটনা হচ্ছে তারা মনে করে অবিবাহিত মেয়ের গর্ভ হয় না, এবং তাই সঙ্গমকে মনে করা হয় নিতান্তই এক অনুত্তেজিত ঐহিক প্রমোদ বলে। কিন্তু যেই বিয়ে হয় নারীর, স্বামী প্রকাশ্যে স্ত্রীর প্রতি কোনো অনুরাগও প্রকাশ করতে পারে না, স্ত্রীকে তার ছোঁয়া নিষেধ; এবং নিজেদের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের প্রতি কোনো ইঙ্গিত হচ্ছে অধর্মাচরণ : নারী অংশীদার হয়ে উঠেছে মাতার ভীতিকর সারসত্তার, এবং সঙ্গম হয়ে উঠেছে এক পবিত্র কর্ম। তারপর থেকে এটা পরিবৃত থাকে নিষেধ ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা দিয়ে। ভূমি চাষের, বীজ বোনার, চারা লাগানোর সময় সঙ্গম নিষিদ্ধ।
পুরুষের মধ্যে নারী যে-ভয় জাগায়, তা কি সাধারণভাবে কাম থেকে উদ্ভূত, না কি ভয় থেকে জাগে কাম, সেটা এক প্রশ্ন। উল্লেখযোগ্য যে, বিশেষ করে লেভিটিকাসে, স্বপ্নদোষকে গণ্য করা হয় দূষণ বলে, যদিও এর সাথে নারীর সম্পর্ক নেই। এবং আমাদের আধুনিক সমাজে হস্তমৈথুনকে সাধারণত মনে করা হয় বিপজ্জনক ও পাপ : অনেক কিশোর ও তরুণ, যারা এর প্রতি আসক্ত, তারা একাজটি করে ভয়াবহ আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে। সমাজের এবং বিশেষ করে পিতামাতার হস্তক্ষেপে একটি একান্ত সুখ হয়ে ওঠে পাপ; তবে একাধিক ছেলে স্বতস্ফূর্তভাবে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে তাদের বীর্যপাতে : রক্ত বা বীর্য, তার নিজের যে-কোনো পদার্থের নিঃসরণ তার কাছে মনে হয় উদ্বিগ্নকর। যা বেরিয়ে যাচ্ছে, তা হচ্ছে তার জীবন, তার মানা। তবে পুরুষ কোনো নারীর উপস্থিতি ছাড়াই ব্যক্তিগতভাবে যৌনাভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েগেলেও তার কামের মধ্যে বস্তুগতভাবে জ্ঞাপন করা হয় নারীকে : প্লাতো যেমন উভলিঙ্গদের উপকথায় বলেছেন, পুরুষের সংগঠন ইঙ্গিত করে নারীর সংগঠনের প্রতি। পুরুষ নিজের লিঙ্গ আবিষ্কার করতে গিয়েআবিষ্কার করে নারী, এমনকি নারী রক্তমাংসে এবং চিত্রে উপস্থিত না থাকলেও।
