তবে পুরুষ ও বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিশেবে এভাবে কাজ করার জন্যে এটা আকস্মিকভাবে দেয়া হয় নি যে-কোনো নারীকে; পুরুষ শুধু তার সঙ্গিনীর মাঝে তার পরিপূরক যৌনপ্রত্যঙ্গগুলোদেখে সন্তুষ্টি লাভ করে না, নারীকে অবশ্যই হতে হবে জীবনের বিস্ময়কর প্রস্ফুটনের প্রতিমূর্তি এবং একই সময়ে তাকে লুকিয়ে রাখতে হবে জীবনের অবোধ্য রহস্যগুলো। সব কিছুর আগে, তাই, তার থাকতে হবে যৌবন ও স্বাস্থ্য, কেননা পুরুষ যখন একটি জীবন্ত প্রাণীকে আলিঙ্গনে বাঁধে, সে শুধু তখনই তার মধ্যে পেতে পারে মোহিনীশক্তি যদি সে ভুলে যেতে পারে মৃত্যু বাসা বেঁধে আছে জীবনের মাঝে। এবং সে চায়আরো বেশি কিছু : চায় তার প্রেমিকা হবে সুন্দর। নারীসৌন্দর্যের আদর্শ রূপ পরিবর্তনশীল, তবে কিছু দাবি থাকে অপরিবর্তিত; নারীর নিয়তিই যেহেতু কারো মালিকানায় থাকা, তাই তার দেহের থাকতে হয়বস্তুর জড় ও অক্ৰিয় গুণ। কর্মের জন্যে শারীরিক যোগ্যতার মধ্যে থাকে পৌরুষদীপ্ত সৌন্দর্য, থাকে শক্তিতে, ক্ষিপ্রতায়, নমনীয়তায়; এটা হচ্ছে সে-সীমাতিক্ৰমণতার প্রকাশ, যা সপ্রাণ করে তোলে শরীরকে। নারীর আদর্শ রূপ প্রতিসম শুধু স্পার্টা, ফ্যাশিবাদী ইতালি, ও নাটশি জর্মনির মতো সমাজে, যেগুলো নারীকে তৈরি করে রাষ্ট্রের জন্যে, ব্যক্তির জন্যে নয়, তাকে একান্তভাবে গণ্য করে মাতারূপে এবং তাতে কামের কোনো স্থান নেই।
তবে নারীকে যখন সম্পত্তি হিশেবে দান করা হয় পুরুষের কাছে, তখন পুরুষ দাবি করে নারী হবে মাংসের জন্যে মাংসের প্রতীক। তার শরীরকে উপলব্ধি করা হয় না কোনো কর্ত-ব্যক্তিত্বের বিকিরণ হিশেবে, বরং গণ্য করা হয় আপন সীমাবদ্ধতায় গভীরভাবে বিলুপ্ত এক বস্তু হিশেবে; এমন শরীরের বিশ্বের সাথে কোনো অভিসম্বন্ধ থাকতে পারে না, এটা শুধু নিজের ছাড়া অন্য কিছুর প্রতিশ্রুতি হইতে পারে না : তাকে তৃপ্ত করতে হয় তার জাগানো কামনা। এ-প্রয়োজনীয়তার সবচেয়ে স্থূল রূপ হচ্ছে হটেনটটদের নিতম্বিনী ভেনাসের আদর্শ, কেননা শরীরের মধ্যে নিতম্বেই থাকে সবচেয়ে কম স্নায়ু, যেখানে মাংসকে মনে হয় উদ্দেশ্যহীন। প্রাচ্যদেশীয়দের স্থূলাঙ্গী নারী পছন্দ করাও একই প্রকৃতির; তারা ভালবাসে মেদের এ-নিরর্থক প্রবৃদ্ধি, যার কোনো পরিকল্পনা নেই, শুধু সেখানে থাকা ছাড়া যার আর কোনো অর্থ নেই। এমনকি সে-সব সভ্যতায় যেখানে কামবোধ অধিকতর সূক্ষ্ম, যেখানে পোষণ করা হয় গঠন ও সুষমা সম্পর্কে বিশেষ ধারণা, সেখানেও স্তন ও নিতম্ব থাকে পছন্দের বস্তুরূপে, তাদের অপ্রয়োজনীয়, বিনামূল্যে পাওয়াবিকাশের জন্যে।
পোশাকপরিচ্ছদ ও চালচলনকে অনেক সময় এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়, যাতে নারীদেহ বিচ্ছিন্ন হয় সক্রিয়তা থেকে : পা বাঁধা চিনদেশের নারীরা হাঁটতেই পারতো, হলিউডের তারকার মাজাঘষা নখ তাকে বঞ্চিত করে তার হাত থেকেই; উঁচু খুড়, কর্সেট, প্যানিয়ার, ফার্দিংগেল, ক্রিনোলিনের যতোটা কাজ ছিলো নারীশরীরের বাঁকগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা, তার চেয়ে বেশি ছিলো দেহকে সামর্থ্যহীন করেতোলা। নারীদেহ যখন মেদভারে নুজ হয়, বা এতে কৃশ হয় যে কাজের কোনো শক্তি থাকে না, অসহায় হয়ে ওঠে অসুবিধাজনক পরিচ্ছদ বা শোভনতা-শালীনতা দিয়ে-তখন নারীদেহকে পুরুষের মনে হয় নিজের সম্পত্তি, তার মাল। প্রসাধন ও অলঙ্কার আরো বাড়িয়ে তোলে মুখমণ্ডল ও শরীরের শিলীভবন। কারুকার্যখচিত বস্ত্রের ভূমিকা খুবই জটিল; কিছু আদিম সমাজে এর রয়েছে ধর্মীয় তাৎপর্য; তবে অধিকাংশ সময়এর লক্ষ্য হচ্ছে নারীকে কোনো মূর্তিতে রূপান্তরিত করা। দ্ব্যর্থবোধক মূর্তি! পুরুষ চায় যে নারী হবে শারীরিক, তার সৌন্দর্য হবে ফল ও ফুলের মতো; তবে সে তাকে আবার চায় নুড়ির মতো মসৃণ, শক্ত ও পরিবর্তনহীন।
নারী তার শরীর দিয়ে হয়ে ওঠে উদ্ভিদ, চিতাবাঘ, মাণিক্য, শুক্তি, আন্দোলিত পুষ্প, পশম, রত্ন, ঝিনুক, পালক; সে নিজেকে সুরভিত করে পদ্ম ও গোলাপের সুগন্ধ ছড়ানোর জন্যে। তবে পালক, রেশম, মুক্তো, ও সুগন্ধি অবশ্য তার মাংসের, গন্ধের পাশব স্থূলতাকে লুকিয়ে রাখার কাজ করে। সে তার মুখ ও চিবুক রঞ্জিত করে সেগুলোকে মুখোশের কঠিন স্থিরতা দেয়ার জন্যে; সে সুরমা ও মাসকারায় গভীরভাবে বন্দী করে তার দৃষ্টিকে, এটা তার চোখের বর্ণাঢ্য অলঙ্কারের থেকে বেশি কিছু নয়; বিনুনিত, কুঞ্চিত, বিন্যস্ত তার কেশপাশ হারিয়ে ফেলে উদ্বেগজাগানো উদ্ভিদ-ধর্মী রহস্য।
বস্ত্রপরিহিত ও অলঙ্কৃত নারীর মধ্যে প্রকৃতি উপস্থিত থাকে, তবে নিয়ন্ত্রিতভাবে, মানুষের ইচ্ছে দিয়ে তাকে ঢালাই করা হয় পুরুষের কামনা অনুসারে। কোনো নারীর মধ্যে প্রকৃতি যততবেশি বিকশিত ও বন্দী হয়, সে ততবেশি হয়ে ওঠে কামনার বস্তু : ‘পরিশীলিত’ নারীই সব সময় থেকেছে আদর্শ কামসামগ্রি। একটু বেশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পছন্দ করা অধিকাংশ সময়ই হচ্ছে পরিশীলনের এক আপাতসত্য রূপ। রেমি দ্য গরমো চেয়েছিলেন নারীদের চুল থাকবে এলানো, থাকবে স্রোতস্বিনীর ও প্রেইরির ঘাসের মতো ঢেউখেলানো। নারী যতো তরুণী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয় এবং তার নতুন ও দীপ্ত তনু যতবেশি চিরস্থায়ীসজীবতায় ভূষিত বলে মনে হয়, ছলাকলার প্রয়োজন হয় তার তত কম। পুরুষ যেহেতু ভয় পায় নারীর অনিশ্চিত নিয়তিকে, যেহেতু পুরুষ নারীকে দেখতে পছন্দ করে পরিবর্তনহীন, প্রয়োজনীয়রূপে, তাই পুরুষ নারীর মুখে, নারীর শরীরে, নারীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে দেখতে চায় এক আদর্শ রূপের যথাযথ প্রকাশ। আদিম জনগোষ্ঠির মধ্যে এ-আদর্শ হচ্ছে জনপ্রিয় প্রতিরূপের উৎকৃষ্ট রূপ : যে-জাতির ঠোট মোটা ও নাক বোঁচা তার ভেনাসও হয় মোটা ঠোঁটের ও বোচা নাকের; পরে আরো জটিল নান্দনিক বিধি প্রয়োগ করা হয়েছে নারীর ক্ষেত্রে। তারপর আমরা এসে পৌঁছি এক বিসঙ্গতিতে। পুরুষ নারীর মধ্যে প্রকৃতিকে লাভ করতে গিয়েতাকে বাধ্য করে ছলাকলাপূর্ণ হয়ে উঠতে। সে শুধু ফিসিস নয়, বরং সমপরিমাণে প্রতি-ফিসিস, এটা শুধু বৈদ্যুতিক ‘পার্ম’-এর, মোম দিয়ে অতিরিক্ত চুল তোলার, ল্যাটেক্স কোমরবন্ধের সভ্যতায়ই ঘটে না, ঘটে ওষ্ঠ-চাকতির নিগ্রোদের দেশে, চিনে এবং সারা পৃথিবীতে।
