কুমারীর শরীরে আছে গোপন ঝরনাধারার সজীবতা, না-ফোটা ফুলের প্রভাতি আভা, মুক্তোর প্রাচ্য দ্যুতি, যার ওপর কখনো সূর্যের রশ্মি পড়ে নি। কৃত্রিম গুহা, মন্দির, পুণ্যস্থান, গোপন উদ্যান–শিশুর মতো পুরুষও মুগ্ধ হয় বেড়া দেয়া ও ছায়াচ্ছন্ন স্থান দিয়ে, যা কোনো চেতনার দ্বারা সজীব হয়ে ওঠে নি, যা অপেক্ষায় আছে যে তাকে দেয়া হবে একটি আত্মা : পুরুষ যা একা গ্রহণ এবং বিদ্ধ করবে, সত্যিকারভাবে মনে হয় তা যেনো সে নিজেই সৃষ্টি করেছে। সব কামনার একটি লক্ষ্য হচ্ছে কাম্যবস্তুকে ব্যবহার করে নিঃশেষ করে ফেলা, যা বোঝায় তার ধ্বংস। যে বিদ্ধকরণের পর সতীচ্ছদ অক্ষত থাকে, তার থেকে সতীচ্ছদ ছিন্ন করে পুরুষ নারীদেহ অধিকার করে অনেক বেশি অন্তরঙ্গভাবে; সতীচ্ছদ ছিন্নকরণের উল্টোনোঅসম্ভব কাজটি সম্পন্ন করে পুরুষ দেহটিকে সুস্পষ্টভাবে পরিণত করে একটি অক্রিয় বস্তুতে, সে এটিকে করায়ত্ত করার ব্যাপারটিকে করে প্রতিষ্ঠিত। এভাবনাটি যথাযথভাবে প্রকাশিত হয়েছে সে-নাইটের উপকথায়, যে বহু বাধা পেরিয়ে এগিয়েছে কাঁটাভরা ঝোপের ভেতর দিয়ে এমন একটি গোলাপ তোলার জন্যে, যার সুগন্ধ আজো অনাঘ্রাত; সে শুধু সেটি পায়ই নি, সে ডাটা ভেঙেছে, এবং এভাবেই সে সেটিকে করেছে নিজের। চিত্রকল্পটি এতো স্পষ্ট যে সাধারণ ভাষায় কোনো নারীর কাছে থেকে তার ফুল ছিড়েনেয়া বোঝায় তার কুমারীত্ব নষ্ট করা; এবং এপ্রকাশরীতি থেকেই উদ্ভূত হয়েছে ‘ডিফ্লোরেশন’ (সতীত্বমোচন) শব্দটি।
তবে সাথে যৌবন থাকলেই শুধু থাকে কুমারীত্বের যৌনাবেদন; নইলে তার রহস্য আবার হয়ে ওঠে পীড়াদায়ক। আজকের অনেক পুরুষ অতিশয় প্রলম্বিত কুমারীত্বের উপস্থিতিতে বোধ করে যৌন দৃণা; এবং শুধু মনস্তাত্ত্বিক কারণেই ‘আইবুড়ো’রা সংকীর্ণমনা ও তিক্ত নারীতে পরিণত হয় না। অভিশাপটি আছে তাদের মাংসের ভেতরেই, যে-মাংস কোনো কর্তার কর্ম নয়, যা কোনো পুরুষের কামনার কাছে হয়েওঠে নি কাম্য, পুরুষের পৃথিবীতে একটুকু জায়গা না পেয়ে যা ফুটে ঝরে গেছে; তার ঠিক গন্তব্য থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যা হয়ে উঠেছে এক অদ্ভুতত্ব, হয়ে উঠেছে উন্মাদের প্রকাশঅসম্ভব চিন্তার মতোপীড়াদায়ক। চল্লিশ বছর বয়স্ক এক নারী, যে তখনো রূপসী, কিন্তু সম্ভবত কুমারী, তার সম্পর্কে আমি একটি পুরুষকে স্থূলভাবে বলতে শুনেছি : ‘এটার ভেতরটা নিশ্চয়ই মাকড়সার জালে ভরা’। এটা সত্য, যে-সব ভূগর্ভস্থ ঘর ও চিলেকোঠায় কেউ ঢোকে না, যেগুলোর ব্যবহার নেই, সেগুলো ভরে ওঠে অশোভন রহস্যে; সেগুলোতে হয়তো প্রেতেরা ঘুরে বেড়ায়; ছাড়াবাড়ি হয়ে ওঠে ভুতপ্রেতের আবাসস্থল। যদি নারীর কুমারীত্ব কোনো দেবতার কাছে উৎসর্গিত না হয়, তাহলে লোকেরা সহজেই বিশ্বাসকরে যে তার এক রকম বিয়ে হয়েছে শয়তানের সাথে। পুরুষের দ্বারা পরাভূত হয় নি যে-নারী, বৃদ্ধা নারীরা যারা মুক্ত থেকেছে পুরুষের অধীনতা থেকে, তাদের অতি সহজেই মনে করা হয় যাদুকরিণী; কারণ নারীর ভাগ্যই হচ্ছে সে কারো দাসত্বে থাকবে, যদি সে পুরুষের জোয়াল থেকে মুক্তি পায়, তাহলে তাকে প্রস্তুত থাকতে হয়শয়তানের জোয়াল মেনে নিতে।
সতীত্বমোচন ব্রতের মধ্য দিয়ে অশুভ প্রেতের কবল থেকে মুক্ত হয়ে বা তার কুমারীত্বের মধ্য দিয়ে শুদ্ধিলাভ করে, ঘটনা যাই হোক, নববধুকে মনে হয় এক অতিশয় কাম্য শিকার। তাকে আলিঙ্গন করে প্রেমিক লাভ করে জীবনের সমস্ত ঐশ্বর্য। সে পৃথিবীর সব প্রাণী, পৃথিবীর সব উদ্ভিদ; হরিণ ও হরিণী, পদ্ম ও গোলাপ, কোমল জাম, সুগন্ধি বেরি, সে মূল্যবান রত্ন, শুক্তিপুট, গন্ধর্বমণি, মুক্তো, রেশম, আকাশের নীল, ঝরনার সুস্নিগ্ধ জল, বায়ু, অগ্নিশিখা, ভূখণ্ড ও সমুদ্র। পুব ও পশ্চিমের কবিরা নারীর দেহকে রূপান্তরিত করেছেন পুষ্পে, ফলে, পাখিতে। এখানে আবার, প্রাচীন, মধ্য, এবং আধুনিক যুগের লেখা থেকে এতো উদ্ধৃতি দেয়া যায় যে তাতে একটি বিশাল সংকলন তৈরি হয়ে যাবে। কে না জানে পরমগীতের কথা? প্রেমিক তার প্রেমিকাকে বলছে :
কপোতের চোখের মতো তোমার চোখ…
তোমার কেশপাশ ছাগপালের মতো…
তোমার দন্তরাজি মেষপালের মতো ছাঁটা হয়েছে যাদের পশম…
তোমার গাল ডালিমের মতো…
তোমার স্তনযুগল দুটি হরিণশাবকের মতো…
তোমার জিভের নিচে আছে মধু ও দুধ…
রহস্যময় ১৭তে আঁদ্রে ব্রেতো আবার শুরু করেছেন শাশ্বত স্তুতিগীতি : ‘মেলুসিন দ্বিতীয় চিৎকারের সময় : সে হঠাৎ লাফিয়ে উঠেছে তার তন্বী নিতম্ব থেকে, তার পেট আগস্টের সমস্ত গম, বাঁকানোকোমর থেকে আতশবাজির মতো জ্বলে ওঠে তার কবন্ধ, চাতকের দুটি ডানার মতো ছাঁচে ঢালা হয়েছে যাদের; তার স্তনযুগল আরমিনের মতো…’
পুরুষ নারীর মধ্যে আবার দেখতে পায় উজ্জ্বল নক্ষত্র ও স্বপ্নাতুর চাঁদ, সূর্যের আলো, কৃত্রিম গুহার ছায়ানিবিড়তা; এবং, বিপরীতভাবে, ঝোপঝাড়ের বন্যফুল, উদ্যানের গর্বিত গোলাপ হচ্ছে নারী। বনদেবীরা, বনপরীরা, সাইরেনরা, পরীরা বিচরণ করে মাঠে ও বনভূমিতে, হ্রদে, সাগরে, পতিত জমিতে। পুরুষের মনের গভীর তলে এ-সর্বপ্রাণবাদ ছাড়া আর কিছু নেই। নাবিকের কাছে সমুদ্র নারী, বিপজ্জনক, বিশ্বাসঘাতক, জয় করা কঠিন, কিন্তু তাকে পরাভূত করার বাসনা পুরুষের প্রবল। যে পর্বতারোহী জীবন বিপন্ন করে জয় করতে চায় গর্বিত, দ্রোহী, কুমারী ও খল পর্বত, তার কাছে পর্বত হচ্ছে নারী। অনেক সময় বলা হয় এসব তুলনা প্রকাশ করে কামের উদ্গতিপ্রাপ্তি; তবে এগুলো প্রকাশ করে নারী ও মৌল উপাদানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ, যা কামের মতোই মৌলিক। নারী হচ্ছে সেই সুবিধাপ্রাপ্ত বস্তু, যার মাধ্যমে পুরুষ পরাভূত করে প্রকৃতিকে। তবে অন্যান্য বস্তুও এ-ভূমিকা পালন করতে পারে। কখনো কখনো পুরুষ বালকের দেহে আবার খুঁজে পেতে চায় বালুকাময় উপকূল, মখমল রাত্রি, মধুমতির সুগন্ধ। তবে যৌন বিদ্ধকরণ পৃথিবীকে দৈহিকভাবে অধিকার করার একমাত্র রীতি নয়। স্টেইনবেক তার টু এ গড আননৌন উপন্যাসে রূপায়িত করেছেন এক পুরুষকে, যে একটি শ্যাওলাধরা পাথরকে বেছে নিয়েছে তার ও প্রকৃতির মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিশেবে; কলেৎ শাৎ-এ বর্ণনা করেছেন এক তরুণ স্বামীকে, যার প্রেমের কেন্দ্র তার প্রিয় বেড়ালটি, কেননা এ-বন্য ও নিরীহ পশুটির মধ্য দিয়ে সে ধরতে পারে ইন্দ্রিয়কাতর বিশ্বকে, যা তার স্ত্রীর একান্ত মানবিক দেহ তাকে দিতে পারে না। অপর নারীর মতোই চমৎকারভাবে রূপ লাভ করতে পারে সমুদ্ররূপে, পর্বতরূপে। সমুদ্র ও পর্বত যদি হয় নারী, তাহলে নারীও তার প্রেমিকের কাছে সমুদ্র ও পর্বত।
