কিন্তু সতীত্বমোচনের পেছনের ব্যাপকভাবে প্রচলিত এসব প্রথার সত্যিকার প্রেষণাগুলো অতীন্দ্রিয়। কিছু জনগোষ্ঠি কল্পনা করে যে যোনির ভেতরে আছে সাপ, যেটি সতীচ্ছদ ছিন্ন করার সাথে সাথে দংশন করবে স্বামীকে; অনেক জাতি মনে করে কুমারীর রক্তে আছে ভীতিকর শক্তি, যা ঋতুস্রাবের সাথে সম্পর্কিত, তাই একইভাবে তা বিনাশ ঘটাতে পারে পুরুষের বলের। এসব চিত্রকল্পে প্রকাশিত হয় এ-ধারণাটি যে নারী-নীতি তখনই বেশি বলশালী, বেশি হুমকিদায়ক, যখন সেটি থাকে অক্ষত।
অনেক ক্ষেত্রে কুমারীত্বমোচনের প্রশ্নই ওঠে না; উদাহরণস্বরূপ, ম্যালিনোস্কির বর্ণিত ট্রোব্রিয়ান্ড দ্বীপবাসীদের মধ্যে, মেয়েরা কখনোই কুমারী নয়, কেননা শৈশব থেকেই সেখানে কামক্রীড়া অনুমোদিত। কোনো কোনো সংস্কৃতিতে মা, বড়ো বোন, বা কোনো মাতৃকা যথারীতি মোচন করে বালিকার সতীত্ব এবং তার শৈশব ভরে প্রসারিত করে চলে যোনিমুখ। আবার, বয়ঃসন্ধিকালে ছিন্ন করা যেতে পারে সতীচ্ছদ, সেখানে নারীটি ব্যবহার করতে পারে কাঠি, হাড়, বা পাথর, এবং একে মনে করতে পারে শল্যচিকিৎসা। অন্য কিছু গোত্রে বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েকে বাধ্য করা হয় এক বর্বর দীক্ষায় : পুরুষেরা তাকে টেনেহেঁচড়েনিয়ে গ্রামের বাইরে এবং ধর্ষণ করে বা কোনো বস্তু দিয়ে তার চ্ছদ ছিন্ন করে। একটি সাধরণ প্রথা হচ্ছে অচেনা পথিকদের কাছে কুমারী দান–হয়তো তারা মনে কর যে ওই অচেনা পথিকেরা মানার বিরূপতার বাইরে, ওই মানা প্রযোজ্য শুধু তাদের গোত্রের পুরুষদের ক্ষেত্রে, বা হয়তো অচেনা পথিকদের বিপদের প্রতি তারা উদাসীন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরোহিত, বা কবিরাজ, বা কাশিক বা গোত্রপতি সাধারণত বিয়ের আগের রাতে মোচন করে বধুর সতীত্ব। মালাবার উপকূলে এ-দায়িত্ব পালন করে ব্রাহ্মণেরা, যা তারা কোনো সুখভোগ ছাড়াই সম্পন্ন করে এবং এর জন্যে বেশ ভালো দক্ষিণা দাবি করে। এটা সুবিদিত যে সমস্ত পবিত্র বস্তুই সাধারণের জন্যে ভয়ঙ্কর, তবে পূতপবিত্র ব্যক্তিরা ঝুঁকি ছাড়াই এসব করতে পারে; তাই বোঝা যায় পুরোহিতেরা আর গোত্রপতিরা জয় করতে পারে সে-অমঙ্গলজনক শক্তিগুলো, যাদের ক্ষোভ থেকে রক্ষা করতে হবে স্বামীকে। রোমে এমন প্রথার লেশ হিশেবে টিকে ছিলো শুধু একটি প্রতীকী অনুষ্ঠান : একটি পাথুরে প্রিয়াপাসের লিঙ্গের ওপর বসানো হতো বধুকে, যেটি পূরণ করতো দুটি উদ্দেশ্য যে এটা বাড়াবে তার উর্বরতা এবং শোষণ করে নেবে। তার ভেতরের অতি শক্তিশালী এবং এ-কারণে অশুভ–তরল পদার্থ। স্বামী নিজেকে আরেক উপায়ে রক্ষা করতে পারে : সে নিজে সতীত্বমোচন করতে পারে কুমারীটির, তবে এটা ঘটতে হবে উৎসবের মধ্যে, যা সংকটের মুহূর্তে তাকে করে তোলে অবেধ্য; উদাহরণস্বরূপ, সমগ্র পল্লীবাসীর উপস্থিতিতে সে এ-কাজটি করতে পারে কোনো কাঠি বা হাড় দিয়ে। সামোয়ায়সে ব্যবহার করে শাদা কাপড়ে মুড়ে তার। আঙুল, যে-কাপড় ছিন্নভিন্ন করে বিতরণ করা হয় উপস্থিতদের মধ্যে। বা স্বামীকে অনুমতি দেয়া যেতে পারে স্বাভাবিক রীতিতে স্ত্রীর সতীত্বমোচনের, তবে যাতে প্রজননশীল জীবাণু সতীচ্ছদের রক্তে দূষিত না হয়, তাই সে তিন দিন স্ত্রীর ভেতরে বীর্যপাত করতে পারবে না।
এক ধরনের মূল্যবদলের ফলে কম আদিম সমাজে কুমারীর রক্ত হয়ে ওঠে শুভ প্রতীক। ফ্রান্সে এখনো আছে অনেক গ্রাম, যেখানে বিয়ের পর দিন ভোরে, আত্মীয়স্বজনদের সামনে প্রদর্শন করা হয়রক্তরঞ্জিত বিছানার চাদর। যা ঘটেছে, তা হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরুষ হয়ে উঠেছে তার নারীর প্রভু; এবং যে-শক্তিরাশি বন্যপশুতে বা অবিজিত বস্তুতে থাকলে হয়ে ওঠে ভীতিকর, সে-একই শক্তিরাশি সেই মালিকের কাছে হয়ে ওঠে মূল্যবান গুণাবলি, যে তাদের পোষ মানাতে পারে। বন্য ঘোড়ার অগ্নি থেকে, বজ্রপাত ও জলপ্রপাতের হিংস্রতা থেকে পুরুষ বের করেছে সম্পদশালী হওয়ার উপায়। এবং তাই সে নারীকে তার সমস্ত সম্পদসহ অক্ষতরূপে আনতে চায় নিজের মালিকানায়। সন্দেহ নেই মেয়েটির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যে-সতীত্ব, সেটা দাবি করতে বেশ ভূমিকা পালন করে যুক্তিপরায়ণ প্রেষণা : স্ত্রীর সতীত্বের মতোই বাগদত্তার নিস্পাপতা প্রয়োজনীয়, যাতে পিতা পরে এমন ঝুঁকিতে না পড়ে যে তার সম্পত্তি দিয়ে যেতে হয় অন্য কারো সন্তানকে। তবে যখন পুরুষ নিজের স্ত্রীকে গণ্য করে ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে, তখন কুমারীত্ব দাবি করা হয় আরো জরুরি কারণে। প্রথমে, মালিকানার ধারণাটিকে সব সময়ই সদর্থকরূপে বোধ করা অসম্ভব; সত্য হচ্ছে, কখনোই কারো থাকে না কোনো জিনিস বা ব্যক্তি; মানুষ মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে নঞর্থকভাবে। কোনো কিছু আমার এটা সবচেয়ে নিশ্চিতভাবে জ্ঞাপন করার উপায় হচ্ছে অন্যদের সেটি ব্যবহার করতে না দেয়া। এবং যা কখনোই অন্য পুরুষের অধিকারে ছিলো না, তার থেকে বেশি কাম্য বস্তু পুরুষের কাছে আর কিছু হতে পারে না : তখন ওই বিজয়কে মনে হয় এক অনন্য ও ধ্রুব ঘটনা। অনাবাদী জমি সব সময়ই মুগ্ধ করেছে অভিযাত্রীদের; প্রত্যেক বছরই নিহত হয় পর্বতারোহীরা, কেননা তারা চায় অস্পৃষ্ট কোনো শিখরের হানি ঘটাতে বা এ-কারণে যে তারা চায় এক পাশে একটি নতুন পথ তৈরি করতে; এবং উৎসুক মানুষেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নামার চেষ্টা করে মাটির তলদেশের অজানা গুহায়। মানুষেরা যেবস্তু এরই মাঝে ব্যবহার করেছে, সেটি হয়ে উঠেছে একটি হাতিয়ার; প্রাকৃতিক বন্ধন থেকে ছিন্ন হয়ে সেটি হারিয়ে ফেলে তার গভীরতম গুণাবলি : গণফোয়ারার জলের থেকে প্রবল জলধারার অদম্য প্রবাহের মধ্যে আছে অনেক বেশি প্রতিশ্রুতি।
