অতিশয় কঠোর ট্যাবুগুলোর একটি নিষিদ্ধ করে ঋতুমতী অশুচি নারীর সাথে সব ধরনের যৌনসম্পর্ক। অনেক সমাজে এ-নিষেধভঙ্গকারীদেরই বিশেষ সময়ের জন্যে গণ্য করা হয়েছে অশুচি বলে, বা তাদের বাধ্য করা হয়েছে কঠোর প্রায়শ্চিত্ত করতে; মনে করা হতো যে পুরুষের শক্তি ও প্রাণবন্ততা ধ্বংস হয়ে যাবে, কেননা এ-সময়ে নারী-নীতি থাকে তার চূড়ান্ত ক্ষমতায়। আরো অস্পষ্টভাবে, তার অধিকারে যে-নারী তার মধ্যে মায়ের ভীতিকর সারসত্তার মুখোমুখি হতে ঘেন্না বোধ করে পুরুষ; সে নারীত্বের এ-দু-বৈশিষ্ট্যকে বিশ্লিষ্ট করার জন্যে বদ্ধপরিকর। তাই অজাচার নিষিদ্ধ। করে বিধিবদ্ধ হয়েছে সর্বজনীন আইন, যার প্রকাশ ঘটেছে গোত্রের বহির্ভূত বিয়ের বিধানে বা আরো আধুনিক নানা রূপে; এজন্যেই পুরুষ নারীর থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায় যখন নারী বিশেষভাবে থাকে তার প্রজননগত ভূমিকায় : তার ঋতুস্রাবের সময়, তার গর্ভের সময়, তার স্তন্যদানের সময়। ইদিপাস গূঢ়ৈষা, যাকে নতুনভাবে বর্ণনা করা দরকার, এ-প্রবণতাকে অস্বীকার করে না, বরং এটাই জ্ঞাপন করে। নারী যতোখানি প্রতিনিধিত্ব করে বিশ্বের অস্পষ্ট উৎসের ও অবোধ্য জৈববিকাশের, পুরুষ নারীর বিরুদ্ধে ততোখানি থাকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে।
মহাবিশ্ব ও দেবতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও আজো নারী এ-বেশেই তার গোষ্ঠিকে সামর্থ্য দেয় তাদের সাথে যোগাযোগ রাখার। নারী আজো বেদুইন ও ইরোকুইদের মধ্যে নিশ্চয়তা দেয় জমির উর্বরতার; প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যে নারী শুনতে পেতো পাতালের স্বর; সে বুঝতে পারতো বায়ু ও বৃক্ষের ভাষা; সে ছিলো পাইথিয়া, সিবিলে, দৈবজ্ঞা; মৃতরা ও দেবতারা কথা বলতো তার মুখ দিয়ে। সে আজো ধারণ করেভবিষ্যৎবক্তার ক্ষমতা : সে মাধ্যম, হস্তরেখা ও তাস পাঠক, অলোকদ্রষ্টা, অনুপ্রাণিত; সে স্বর শুনতে পায়, দেখতে পায় প্রেতচ্ছায়া। যখন পুরুষ আবার দরকার বোধ করে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবনের ভেতরে মগ্ন হওয়ার যেমন অ্যান্টিউস তার শক্তি নবায়নের জন্যে স্পর্শ করেছিলো মাটি–তারা আবেদন জানায় নারীর কাছে। গ্রিস ও রোমের যুক্তিপরায়ণ সমগ্র সভ্যতা ভরে অস্তিত্বশীল ছিলো গূহ্যধর্ম তন্ত্রগুলো। ওগুলোছিলো সরকারিভাবে স্বীকৃত ধর্মগুলোর থেকে প্রান্তিক অবস্থানে; ওগুলো অবশেষে, যেমন এলুসিসে, রূপ নেয় রহস্যের। পুরুষদের দ্বারা পুনরায় বিজিত এক বিশ্বে দেখা দেয় এক পুরুষ দেবতা, দিউনিসুস, যে দখল করে নেয় ইশতারের, আস্তারতের বন্য ও ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা; তবু তার মূর্তি ঘিরে উন্মত্ত আনন্দোৎসবে যারা মেতে উঠতো, তারা ছিলো নারী : মিনাদ, থাইয়াদ, বাকুসানুসারীরা মানুষদের আমন্ত্রণ জানাতো পবিত্র পানোন্মত্ততায়, পবিত্র উন্মত্ততায়। ধর্মীয় বেশ্যাবৃত্তি পালন করতো একই ভূমিকা : এটা ছিলো উর্বরতার শক্তিগুলোকে একযোগে বন্ধনমুক্ত ও প্রবাহিত করে দেয়া। লৌকিক উৎসবগুলোতে আজো দেখা যায়কামের তীব্র বহিঃপ্রকাশ; এতে নারী শুধু প্রমোদের বস্তু হিশেবে উপস্থিত থাকে না, বরং থাকে হাইব্রিস, বন্যতার অবস্থা অর্জনের উপায়রূপে, যাতে ব্যক্তি অতিক্রম করে যায় তার নিজের সীমা। ‘সেই লুপ্ত, বিয়োগান্তক, “অন্ধকারী বিস্ময়”-এর কী ধারণ করে একটি মানুষ তার গভীর ভেতরে, তা শয্যা ছাড়া আবার কোথাও পাওয়া যাবে না,’ লিখেছেন জি বাতাইল।
কামে পুরুষ আলিঙ্গন করে প্রিয়াকে এবং নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায় মাংসের অপার রহস্যে। তবে আমরা দেখেছি যে, উল্টোভাবে, তার স্বাভাবিক কাম মাতাকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় স্ত্রী থেকে। সে জীবনের রহস্যময় রসায়নের প্রতি বোধ করে ঘৃণা, যদিও তার নিজের জীবনই লালিত ও প্রফুল্ল হয় মৃত্তিকার সুস্বাদু ফলে; সে এগুলো অধিকার করে নিতে চায় নিজের জন্যে; সে প্রবলভাবে কামনা করে সদ্য ঢেউ থেকে উঠে আসা ভেনাসকে। নারীকে স্ত্রী হিশেবে প্রথম প্রকাশ করা হয়েছিলো পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, যেহেতু পরম সৃষ্টিকর্তাই পুরুষ। মানবজাতির মাতা হওয়ার আগে হাওয়া ছিলো আদমের সঙ্গিনী; তাকে দান করা হয়েছিলো পুরুষের কাছে, যাতে পুরুষ তাকে অধিকার ও উর্বর করতে পারে, যেমন সে অধিকার ও উর্বর করে ভূমি; এবং তার মাধ্যমে পুরুষ সমগ্র প্রকৃতিকে করে তোলে নিজের রাজ্য। পুরুষ যৌন ক্রিয়ায় শুধু ব্যক্তিগত ও ক্ষিপ্র আনন্দ খোঁজে না। সে চায় জয় করতে, দখল করতে, অধিকার করতে; একটি নারী পাওয়া হচ্ছে তাকে জয় করা; লাঙলের ফাল যেমন বিদ্ধ করে হলরেখাকে তেমনি সে বিদ্ধ করে নারীকে; নারীকে সে নিজের করে নেয় যেমন সে নিজের করে নেয় নিজের কর্ষিত জমি; সে চাষ করে, রোপণ করে, বপন করে : এসব চিত্রকল্প সাহিত্যের মতোই প্রাচীন; প্রাচীন কাল থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত উদ্ধৃত করা যায় সহস্র উদাহরণ : ‘নারী ক্ষেত্রের মতো, এবং পুরুষ বীজের মতো,’ বলেছে মনুর বিধান। আঁদ্রে মাসোর একটি রেখাচিত্রে আছে কোদাল হাতে একটি পুরুষ, সে কোদাল দিয়ে কোপাচ্ছে একটি নারীর যোনিদ্বারের উদ্যান। নারী তার স্বামীর শিকার, তার বিষয়সম্পত্তি।
ভয় ও কামনার মাঝে, নিয়ন্ত্রণক অসম্ভব শক্তিরাশিকে অধিকারে রাখার ভয় ও সেগুলোকে জয় করার বাসনার মধ্যে পুরুষের দ্বিধা চমকপ্রদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কুমারীপুরাণে। পুরুষ একে এই ভয়পাচ্ছে, আবার এই কামনা করছে বা এমনকি দাবি করছে, কুমারী তাই নারীরহস্যের নিখুঁততম পূর্ণাঙ্গ রূপের প্রতীক; তাই সে এর সবচেয়ে পীড়াদায়ক এবং একই সময়ে সবচেয়ে সুখদ রূপ। তাকে ঘিরে ফেলেছে যে-শক্তিরাশি, পুরুষ সেগুলো দিয়ে অভিভূত হচ্ছে বলে বোধ করছে, না কি সে সগর্বে বিশ্বাস করছে সে এসব নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ, সে-অনুসারে সে তার স্ত্রীকে কুমারী রূপে পেতে অস্বীকার করে অথবা দাবি করে। আদিমতম সমাজে, যেখানে নারীর শক্তি অত্যন্ত বেশি, সেখানে ভয়ই নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষকে; তাই বিয়ের রাতের আগেই নারীটির কুমারীত্বমোচন করাই সঙ্গত। মার্কো পোলো তিব্বতিদের সম্বন্ধে বলেছেন ‘তাদের কেউই কুমারী মেয়ে বিয়ে করতে রাজি নয়’। এ-অস্বীকৃতিকে অনেক সময় ব্যাখ্যা করা হয়েছে যুক্তিসঙ্গত রীতিতে : কোনো পুরুষ এমন স্ত্রী চায় না যে এরই মাঝে পুরুষের কামনা জাগায়নি। আরব ভূগোলবিদ আল বাকরি স্লাভদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানিয়েছেন ‘যদি কোনো পুরুষ বিয়ের পর দেখতে পায় তার স্ত্রী কুমারী, তাহলে সে স্ত্রীকে বলে : “যদি তোমার কোনো রূপ থাকতো, তাহলে পুরুষেরা তোমার সাথে শৃঙ্গার করতো এবং কোনো একজন হরণ করতো তোমার কুমারীত্ব।” তারপর সে স্ত্রীকে বের করে দেয় ঘর থেকে এবং তাকে ত্যাগ করে’। এও দাবি করা হয়েছে যে কিছু আদিম জাতির পুরুষ শুধু সে-নারীকেই বিয়ে করতে চায় যে ইতিমধ্যেই মা হয়েছে, এভাবেই সে প্রমাণ দেয় নিজের উর্বরতার।
