প্রতিটি কিংবদন্তি ইঙ্গিত করে একটি কর্তার প্রতি, যে তার আশা ও ভয়গুলোকে বিস্তীর্ণ করে দেয় এক সীমাতিক্ৰমণতার আকাশের দিকে। নারীরা নিজেদের কর্তারূপে প্রতিষ্ঠিত করে না এবং সেজন্যে তারা এমন কোনো পুরুষপুরাণ সৃষ্টি করে নি, যাতে প্রতিফলিত হয়েছে তাদের পরিকল্পনা; তাদের নিজেদের কোনো ধর্ম বা কবিতা নেই : তারা আজো পুরুষের স্বপ্নের ভেতর দিয়ে স্বপ্ন দেখে। পুরুষের তৈরি দেবতারাই তাদের দেবতা, যাদের তারা পুজো করে। পুরুষেরা নিজেদের পরমে উন্নীত করার জন্যে সৃষ্টি করেছে বীরপ্রতিমা : হারকিউলিস, প্রেমিথিউস, পার্সিফাল; এ-বীরদের নিয়তিতে নারীরা পালন করেছে শুধুই গৌণ ভূমিকা। সন্দেহ নেই যে আছে নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িত পুরুষের নানা প্রথাগত প্রতিমা : পিতা, প্রলুব্ধকারী,স্বামী, ঈর্ষাকাতর প্রেমিক, সুবোধ পুত্র, নষ্ট পুত্র; তবে এদের সবাইকে প্রতিষ্ঠিত করেছে পুরুষেরা, এবং এগুলোর নেই পুরাণের মহিমা, এগুলো শস্তা গতানুগতিকের বেশি কিছু নয়। আর সেখানে নারীকে একান্তভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় পুরুষের সাথে তার সম্পর্ক অনুসার। পুরুষ ও নারী–এ-ধারণা দুটির অপ্রতিসাম্যকে প্রকাশ করা হয়েছে কামপুরাণগুলোর একপাক্ষিক গঠনের মধ্য দিয়ে। আমরা অনেক সময় নারী বোঝানোর জন্যে বলি ‘লিঙ্গ’; নারী হচ্ছে মাংস, মাংসের সুখ ও বিপদ। নারীর জন্যে পুরুষও যে লিঙ্গ ও মাংস, তা কখনো ঘোষিত হয় নি, কেননা ঘোষণা করার কেউ নেই। বিশ্বের উপস্থাপন, বিশ্বের মতোই, পুরুষেরই কাজ; তারা একে বর্ণনা করে নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকে, যাকে তারা গুলিয়ে ফেলে ধ্রুবসত্যের সাথে।
কোনো একটি পুরাণ বর্ণনা করা সব সময়ই কঠিন; একে ধরা বা বেষ্টন করা যায় না; এটি কোনো স্থির রূপে উপস্থিত না হয়ে মানুষের চেতনায় ঘুরে ফিরে হানা দেয়। পুরাণ এতো বিচিত্র, এতোপরস্পরবিরোধী যে প্রথমে উপলব্ধি করা যায় না এর ঐক্য : ডেলাইলা ও জুডিথ, আস্পাসিয়া ও লুক্ৰেতিয়া, প্যান্ডোরা ও অ্যাথেনা–নারী একই সময়ে হাওয়া ও কুমারী মেরি। সে প্রতিমা, ভৃত্য, জীবনের উৎস, অন্ধকারের শক্তি; সে সত্যের আদি নৈঃশব্দ্য, সে ছল, গুজব, ও মিথ্যাচার; সে শুশ্রুষাকর উপস্থিতি ও মায়াবিনী; সে পুরুষের শিকার, তার পতন, সে সব কিছু পুরুষ যা নয় এবং পুরুষ যা কামনা করে, সে পুরুষের নেতি এবং তার লক্ষ্য ও সত্যতাপ্রতিপাদন।
‘নারী হওয়া,’ স্টেজেজ অন দি রোড অফ লাইফ-এ বলেছেন কিয়ের্কেগার্ড, ‘এমন অদ্ভুত, এতো গোলমেলে, এতো জটিল যে কোনো বিধেয় একে প্রকাশ করার কাছাকাছিও আসে না এবং প্রয়োগ করতে হয় যে-বহুসংখ্যক বিধেয়, সেগুলো এতো পরস্পরবিরোধী যে শুধু নারীর পক্ষেই সেগুলো সহ্য করা সম্ভব’। নারীর নিজেকে নিজের কাছে যেমন মনে হয়, এটা তেমন সদর্থকভাবে গণ্য করা থেকে বেরিয়ে আসে নি, এসেছে নঞর্থকভাবে, তবে একথা সত্য যে নারীকে সব সময় সংজ্ঞায়িত করা হয় অপররূপে। আগেই বলেছি অপর হচ্ছে অশুভ; তবে তা শুভর জন্যে আবশ্যক হয়ে হয়ে ওঠে শুভ। নারী কোনো স্থির ধারণা রূপায়িত করে না, এখানেই রয়েছে তার। কারণটি; তার মাধ্যমে নিরন্তর যাতায়াত চলে আশা থেকে নিরাশায়, ঘৃণা থেকে প্রেমে, শুভ থেকে অশুভে, অশুভ থেকে শুভে। যে-বৈশিষ্ট্যেই নারীকে বিবেচনা করি না কেননা, পরস্পরবিপরীত এ-মূল্যই প্রথম ঘা দেয় আমাদের মনে।
পুরুষ নারীর মধ্যে অপরকে খোঁজে প্রকৃতিরূপে এবং তার সহচর সত্তারূপে। তবে আমরা জানি পুরুষের মধ্যে প্রকৃতি জাগিয়ে তোলে কোন পরস্পরবিপরীত মূল্যসম্পন্ন অনুভূতিরাশি। পুরুষ নারীকে শোষণ করে, নারী পুরুষকে চুরমার করে, পুরুষ নারী থেকে জন্ম নেয় এবং নারীর মধ্যে মৃত্যুবরণ করে; নারী তার সত্তার উৎস এবং সে-এলাকা, যা সে নিজের ইচ্ছের অধীন করে; প্রকৃতি হচ্ছে অমার্জিত বস্তুর মিশ্রণ, যাতে বন্দী হয়ে আছে আত্মা, আর নারী হচ্ছে পরম বাস্তবতা; নারী আকস্মিকতা ও ভাব, সসীম ও সম্পূর্ণ; সে আত্মার বিপরীত, এবং আত্মা নিজে। এখন মিত্র, পরক্ষণেই শত্রু, সে প্রতিভাত হয় সে-অন্ধকার বিশৃঙ্খলারূপে যেখান থেকে জীবন উৎসারিত হয়, প্রতিভাত হয় এ-জীবনরূপে, এবং ওই সুদূররূপে, যার দিকে ঝুঁকে আছে জীবন। জননী, স্ত্রী, ও ভাবরূপে নারী প্রকাশ করে প্রকৃতির সার; এরূপগুলো কখনোমিলেমিশে যায় এবং কখন্যে সংঘর্ষে আসে, এবং এদের প্রত্যেকে ধারণ করে দ্বৈত মুখাবয়ব।
পুরুষের শেকড় প্রকৃতির ভেতর গভীরভাবে ছড়ানো; তার জনন ঘটেছে পশু ও উদ্ভিদের মতো; সে ভালোভাবেই জান্র সে ততোদিনই অস্তিত্বশীল, যতোদিন সে বেঁচে আছে। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার আগমনের পর থেকে তার চোখে জীবন গ্রহণ করেছে দুটি বৈশিষ্ট্য : জীবন হচ্ছে চেতনা, ইচ্ছা, সীমাতিক্ৰমণতা, এটি চৈতন্য; এবং জীবন হচ্ছে বস্তু, অক্রিয়তা, সীমাবদ্ধতা, এটি মাংস। এস্কিলুস, আরিস্ততল, হিপোক্রেতিস ঘোষণা করেছিলেন অলিম্পাসে যেমন পৃথিবীতেও তেমনি পুরুষ-নীতিই সত্যিকারভাবে সৃষ্টিশীল : এর থেকে এসেছে গঠন, সংখ্যা, গতি; দিমিতারের প্রযত্নে শস্য জন্মে ও সংখ্যায় বাড়ে, কিন্তু শস্যের উদ্ভব ও সত্যিকার অস্তিত্বের মূলে আছে জিউস; নারীর উর্বরতাকে গণ্য করা হয় শুধু এক অক্রিয় গুণ হিশেবে। নারী হচ্ছে মাটি, আর পুরুষ বীজ; নারী জল এবং পুরুষ অগ্নি। সৃষ্টিকে অনেক সময় কল্পনা করা হয়েছে অগ্নি ও জলের বিবাহরূপে; উষ্ণতা ও আর্দ্রতা জন্ম দেয় জীবন্ত বস্তুদের; সূর্য হচ্ছে সমুদ্রের স্বামী; সূর্য, অগ্নি হচ্ছে পুরুষ দেবতা; এবং সমুদ্র মাতৃপ্রতীকগুলোর মধ্যে প্রায়-সর্বজনীন প্রতীকগুলোর একটি। জল অক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে জ্বলন্ত বিকিরণের উর্বরায়ণ ক্রিয়া। একইভাবে তৃণভূমির মাটি চাষীর শ্রমে বিচূর্ণ হয়ে তার হলরেখায় অক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে বীজ। তবে এটা পালন করে এক দরকারি ভূমিকা : এটা বাঁচিয়ে রাখে জীবন্ত জীবাণুটিকে, একে রক্ষা করে এবং এর বিকাশের জন্যে সরবরাহ করে বস্তু। এবং এ-কারণেই মহামাতার সিংহাসনচ্যুতির পরও পুরুষ পুজো করে এসেছে উর্বরতার দেবীর; পুরুষ তার শস্য, পশুপাল, ও তার সমস্ত সমৃদ্ধির জন্যে ঋণী সিবিলের কাছে। এমনকি সে তার জীবনের জন্যেও ঋণী তার কাছে। সে অগ্নির যতোটা স্তব করে, জলের স্তবও তারচেয়ে কম করে না। ‘সমস্ত প্রশংসা সমুদ্রের! সমস্ত প্রশংসা পবিত্র অগ্নিতে পরিবৃত তার তরঙ্গরাশির! সমস্ত প্রশংসা তরঙ্গরাশির! সমস্ত প্রশংসা অগ্নির! সমস্ত প্রশংসা এ-অদ্ভুত অভিযাত্রার,’ ফাউস্ট-এর দ্বিতীয় ভাগে এভাবে চিৎকার করেছেন গ্যেটে। পুরুষ পুজো করে মাটির : যেমন ব্লেক মাটিকে বলেছেন ‘মাতৃকা কর্দম’। ভারতবর্ষের এক ধর্মপ্রবর্তক তার ভক্তদের মাটিতে কোদাল না চালানোর উপদেশ দিয়েছেন, কেননা ‘চাষ করতে গিয়ে আমাদের সকলের জননীকে বিক্ষত করা বা কাটা বা ছিন্ন করা পাপ… আমি কি একটা ছোরা ঢুকিয়ে দেবো আমার জননীর বুকে?… আমি কি তাঁর মাংস টুকরো টুকরো করে ঢুকবো তাঁর অস্থিতে?… আমার কী সাহস যে আমি কাটবো আমার মাতার কেশ?’ মধ্যভারতে ‘মাতা বসুমতীর বুক লাঙল দিয়ে ছিন্নভিন্ন করাকে’ পাপ বলে গণ্য করেন বৈদ্য। উল্টোভাবে, ইদিপাস সম্পর্কে এস্কিলুস বলেছেন সে ‘বীজ বপন করেছিলো সেই পবিত্র হলরেখায়, যেখানে সে গঠিত হয়েছিলো’। সফোক্লিজ বলেছেন ‘পৈতৃক হলরেখা’র কথা এবং ‘সেই কৃষক, দূরের জমির যে প্রভু, যেন সে যায় মাত্র একবার, বীজ বপনের সময়’, তার কথা। একটি মিশরি গানে দয়িতা ঘোষণা করে : ‘আমিই মৃত্তিকা!’ ইসলামি ধর্মীয় রচনায় নারীকে বলা হয় ‘জমি… দ্রাক্ষাক্ষেত্র’। আসিসির সেইন্ট ফ্রান্সিস একটি স্তোত্রে বলেছেন তার কথা, যে ‘আমাদের ভগিনী, মাটি, আমাদের জননী, লালন করছে আমাদের, ফলাচ্ছে সব ধরনের ফল, ফোটাচ্ছে নানান রঙের ফুল ও জন্মাচ্ছে ঘাস’। মিশেলে আঁকুইয়ে কর্দমস্নানের পর, বিস্ময়ে বলে উঠেছিলেন : ‘সকলের প্রিয় জননী! আমরা এক। তোমার থেকে এসেছিলাম আমি, তোমার কাছে আমি ফিরে আসছি ..’ এবং এমনই ঘটে সে-সব পর্বে, যখন দেখা দেয় প্রাণবাদী রোম্যান্টিসিজযম যার কাম্য আত্মার ওপর জীবনের জয়; তখন ভূমির, নারীর ঐন্দ্রজালিক উর্বরতাকে বেশি বিস্ময়কর মনে হয় পুরুষের আবিষ্কৃত কৌশলগুলোর থেকে, তখন পুরুষ মাতৃছায়ায় নিজেকে নতুনভাবে হারিয়ে ফেলার স্বপ্ন দেখে, যাতে সেখানে আবার সে পেতে পারে তার সত্তার সত্যিকার উৎস। মা হচ্ছে মহাবিশ্বের অতলে লুপ্ত সে-শেকড়, যে টানতে পারে এর রস; সে হচ্ছে সেই ফোয়ারা যেখান থেকে ঝরে জীবন্ত জল, সেই জল যা পুষ্টিকর দুগ্ধও, এক উষ্ণ ঝরনাধারা, সঞ্জীবনী গুণাবলিতে সমৃদ্ধ মৃত্তিকা ও জলে তৈরি কর্দম।
