তবে সে বাধাবিপত্তি পছন্দ করে না, ভয় করে বিপদকে। পরস্পরবিরোধী রীতিতে সে অভিকাঙ্খী হয় জীবন ও বিশ্রাম, অস্তিত্ব ও নিতান্ত জীবনধারণ উভয়েরই; সে ভালোভাবেই জানে যে ‘আত্মার ঝঞাট’ হচ্ছে বিকাশের দাম, জানে যে অভীষ্ট বস্তু থেকে দূরত্ব হচ্ছে তার নিজের কাছে নৈকট্যের মূল্য; তবে সে স্বপ্ন দেখে উদ্বেগের মধ্যে শান্তির এবং এক অনচ্ছ পরিপূর্ণতার, যা ভূষিত থাকবে চৈতন্যে। এ-স্বপ্নের সম্যক প্রতিমূর্তি নারী; সে প্রকৃতির সাথে আকাঙ্খিত যোগাযোগের মাধ্যম, পুরুষের কাছে অপরিচিত, এবং সহচর সত্তা, যে অত্যন্ত অভিন্ন। প্রকৃতির বিরূপ নৈঃশব্দ দিয়েও সে পুরুষের বিরোধিতা করে না, আবার পারস্পরিক সম্পর্কের কঠোর আবশ্যকতা দিয়েও বিরোধিতা করে না; এক অনন্য বিশেষাধিকারের মাধ্যমে সে এক চৈতন্যসম্পন্ন সত্তা এবং তবুও মনে হয় যেনো তাকে শারীরিকভাবে অধিকার করা সম্ভব।
আমরা দেখেছি যে প্রথম দিকে ছিলো না মুক্ত নারীরা, পুরুষেরা যাদের পরিণত করেছিলো দাসীতে, এমনকি লিঙ্গভিত্তিক কোনো জাতও ছিলো না। নারীকে শুধু দাসী হিশেবে গণ্য করা ভুল; এটা ঠিক যে দাসদের মধ্যে অনেকে ছিলো নারী, কিন্তু সবসময়ই ছিলো মুক্ত নারী–অর্থাৎ ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন নারী। তারা মেনে নিয়েছিলো পুরুষের সার্বভৌমত্ব এবং পুরুষ এমন কোনো বিদ্রোহের হুমকি বোধ করে নি, যা তাকে কর্মে পরিণত করতে পারতো। এভাবে নারীকে মনে হয় সে অপ্রয়োজনীয়, পারস্পরিকতা ছাড়া যে আবার অপরিহার্য হয়ে ধ্রুব অপর হতে চায় না। এ-বিশ্বাস পুরুষের কাছে প্রিয়, এবং প্রতিটি সৃষ্টিপুরাণ এটা প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে আছে জেনেসিস, যাকে খ্রিস্টধর্মের মধ্য দিয়ে জীবন্ত করে রাখা হয়েছে পাশ্চাত্য সভ্যতায়। হাওয়াকে পুরুষের সাথে একই সময়ে নির্মাণ করা হয় নি; তাকে কোনো ভিন্ন পদার্থেও তৈরি করা হয় নি, আদমকে যে-মাটিতে তৈরি করা হয়েছিলো তাতেও তৈরি করা হয় নি তাকে; তাকে নেয়া হয়েছিলো প্রথম পুরুষের পার্শ্বাঙ্গ থেকে। তার জন্মও স্বাধীন ছিলো না; বিধাতা তাকে তারই জন্যে স্বতস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি করে নি এবং প্রতিদানরূপে সরাসরি তার উপাসনা লাভের জন্যেও সৃষ্টি করে নি। সে তার নিয়তি নির্ধারণ করেছিলো পুরুষের জন্যে; আদমকে নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্ত করার জন্যে সে হাওয়াকে দান করেছিলো আদমকে, তার সহচরের মধ্যেই ছিলো তার। উৎপত্তি ও উদ্দেশ্য; হাওয়া ছিলো অপ্রয়োজনীয়দের বিন্যাসের মধ্যে আদমের পরিপূরক। তাই সে দেখা দেয় সুবিধাপ্রাপ্ত শিকারের বেশে। সে ছিলো চেতনার স্তরে উন্নীত প্রকৃতি; সে সচেতন সত্তা ছিলো, কিন্তু প্রাকৃতিকভাবেই ছিলো অনুগত। এবং এখানেই রয়েছে সে-বিস্ময়কর আশাটি, পুরুষ যা পোষণ করেছে নারীর মধ্যে : সে সত্তা হিশেবে নিজেকে চরিতার্থ করতে চায় অন্য একটি সত্তাকে দৈহিকভাবে দখল করে, এবং একই সময়ে একটি মুক্ত মানুষের বাধ্যতার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করতে চায় তার স্বাধীনতাবোধ। কোনো পুরুষই কখনো নারী হতে সম্মত হবে না, তবে প্রতিটি পুরুষই চায় নারী থাকুক। ‘নারী সৃষ্টির জন্যে বিধাতাকে ধন্যবাদ’। ‘প্রকৃতি শুভ, কেননা সে পুরুষকে দিয়েছে নারী’। এসব উক্তির মধ্যে পুরুষ পুনরায় স্থূল উগ্রতার সাথে জ্ঞাপন করে যে এ-বিশ্বে তার উপস্থিতি এক অবধারিত ঘটনা ও অধিকার, নারীরটা এক দুর্ঘটনা মাত্র, তবে খুবই সুখকর দুর্ঘটনা। অপররূপে দেখা দিয়ে একই সময়ে নারী দেখা দেয় সত্তার এক প্রাচুর্যরূপে, যা বিপরীত সে-অস্তিত্বের, যার শূন্যতা পুরুষ বোধ করে নিজের মধ্যে; কর্তার চোখে কর্মরূপে গণ্য হয়ে ওই অপর গণ্য হয় আঁ সুওঅ রূপে; সুতরাং একটি সত্তারূপে। পুরুষ যে-অভাব বহন করে তার অন্তরে, তা সদর্থকরূপে প্রতিমূর্তিত হয় নারীতে, এবং তার মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়ে পুরুষ আশা করে আত্মসিদ্ধি অর্জনের।
তবে নারী পুরুষের কাছে শুধু অপর-এর প্রতিমূর্তি উপস্থাপন করে নি, এবং ইতিহাসের যাত্রাপথ ভরে সে সমান গুরুত্ব ধারণ করে নি। অনেক মুহুর্ত এসেছে যখন সে গ্রস্ত হয়েছে অন্যান্য প্রতিমা দিয়ে। যখন নগর বা রাষ্ট্র গিলে খায় নাগরিকদের, তখন পুরুষের পক্ষে ব্যক্তিগত নিয়তি নিয়ে বিভোর থাকা সম্ভব হয় না। রাষ্ট্রের কাছে উৎসর্গিত হয়ে স্পার্টার নারীদের অবস্থা ছিলো গ্রিসের অন্যান্য নারীদের ওপরে। তবে এটা সত্য যে নারী কোনো পুরুষসুলভ স্বপ্নের ফলে রূপান্তরিত হয় নি। নেতাতন্ত্র, তা সে নেপলিয়ন, মুসোলিনি, বা হিটলারই হোক, বর্জন করে অন্য সব তন্ত্র। সামরিক স্বৈরতন্ত্রে, একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, নারী আর সুবিধাপ্রাপ্ত বস্তু থাকে না। এটা বোঝা যায় যে নারীকে দেবীতে উন্নীত করা হয় এমন ধনী দেশে, যেখানে নাগরিকেরা জীবনের অর্থ সম্পর্কে বিশেষ নিশ্চিত নয় : যেমন হয় আমেরিকায়। অন্য দিকে, সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শগুলো, যা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করে সব মানুষের সাম্য, সেগুলো এখন ও ভবিষ্যতে কোনো মানবশ্রেণীকে বস্তু বা দেবতা বলে গণ্য করতে অস্বীকার করে : মার্ক্সের ঘোষিত খাঁটি গণতান্ত্রিক সমাজে অপর-এর কোনো স্থান নেই। ফরাসি বেশ্যাদের কাছে লেখা জর্মন সৈন্যদের চিঠি আমি দেখেছি, যাতে, নাটশিবাদ সত্ত্বেও, স্থূলভাবে জ্ঞাপন করা হয়েছে কুমারীর শুদ্ধতার অন্তর্নিহিত ঐতিহ্য। ফ্রান্সে আরাগ, আর ইতালিতে ভিত্তোরিনির মতো সাম্যবাদী লেখকেরা নিজেদের লেখায় নারীদের স্থান দিয়েছেন প্রথম সারিতে, তারা রক্ষিতা বা মাতা যা-ই হোক। হয়তো কোনোদিন নির্বাপিত হবে নারী-কিংবদন্তি, যতো বেশি নারীরা নিজেদের দাবি করবে মানুষ হিশেবে। তবে আজো তা আছে প্রতিটি মানুষের মনে।
