তবে অধিকাংশ সময় পুরুষ লিপ্ত থাকে তার দৈহিক অবস্থার বিরুদ্ধে দ্রোহে; সে নিজেকে দেখে এক স্বর্গভ্রষ্ট দেবতা হিশেবে; তার অভিশাপ হচ্ছে এক দীপ্ত ও সুশৃঙ্খল স্বর্গ থেকে তার পতন ঘটেছে মাতৃগর্ভের বিশৃঙ্খল আঁধারে। এই অগ্নি, এই শুদ্ধ ও সক্রিয় নিঃসারণ, যার মধ্যে পুরুষ নিজেকে দেখতে পছন্দ করে, নারীর দ্বারা তা বন্দী হয়ে আছে মৃত্তিকার কর্দমে। বিশুদ্ধ ভাবের মতো, এক-এর মতো, সর্বশ্বের মততা, ধ্রুব আত্মার মতো অবধারিত হওয়ার কথা ছিলো তার; এবং সে দেখতে পায় সে বন্দী হয়ে আছে সীমিত ক্ষমতার একটি দেহের ভেতরে, এমন স্থানে ও কালে যা সে কখনো বেছে নেয় নি, যেখানে সে অনাহুত, অপ্রয়োজনীয়, দুর্বহ, উদ্ভট। তার পরিত্যক্তির মধ্যে, তার অপ্রতিপাদ্য অনাবশ্যকতার মধ্যে তাকেই ভোগ করা হয় সমগ্র শরীরের অনিশ্চয়তা। নারীও তাকে দণ্ডিত করে মৃত্যুতে। এই কম্পমান জেলি যা বিকশিত হয় জরায়ুতে (জরায়, সমাধির মতো সংগোপন ও রুদ্ধ) অতি স্পষ্টভাবে তার স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলে পূতিমাংসের কোমল গাঢ় তরলতা, কিন্তু ঘৃণায় তার থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়া যাবে না। যেখানেই জীবন প্রস্তুত হতে থাকে-বীজায়ন, গাজন–সেখানেই এটা জাগিয়ে তোলে ঘৃণাবোধ, কেননা ধ্বংসের ভেতর দিয়েই তৈরি হয় এটি; পিচ্ছিল ভ্রূণ শুরু করে সে-চক্র, যা সম্পূর্ণতা লাভ করে মৃত্যুর পচনের ভেতর দিয়ে। যেহেতু সে অনাবশ্যকতা ও মৃত্যুতে বিভীষিকা বোধ করে, তাই পুরুষ জন্মলাভের মধ্যেও বোধ করে বিভীষিকা; সে সানন্দে অস্বীকার করতে চায় তার পাশবিক বন্ধনরাশি; তার মৃত্যুর ভেতর দিয়ে ঘাতক প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে তাকে।
আদিম জনগণের মধ্যে শিশুর জন্মকে ঘিরে থাকে চরম কঠোর ট্যাবু; বিশেষ করে গর্ভফুলটি পোড়াতে হয় যত্নের সাথে বা ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয় সমুদ্রে, কেননা যার হাতেই এটা পড়বে নবজাতকের ভাগ্য থাকবে তারই হাতে। সে-ঝিল্লিময় বস্তুরাশি, যার সাহায্যে বেড়ে ওঠে ভ্রূণটি, তাই হচ্ছে এর পরনির্ভরশীলতার চিহ্ন; যখন এটি ধ্বংস করা হয়, তখন ব্যক্তিটি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে আনতে সমর্থ হয় জীবন্ত ম্যাগমা থেকে এবং হয়ে ওঠে স্বায়ত্তশাসিত সত্তা। জন্মের অশুচিতা চাপিয়ে দেয়া হয় মায়ের ওপর। লেভিটিকাস ও সমস্ত প্রাচীন বিধি শুচিতার সমস্ত কৃত্য চাপিয়ে দেয়া তার ওপর, যে জন্ম দিয়েছে; এবং অনেক পল্লী অঞ্চলে গির্জানুষ্ঠানে (শিশুজন্মের পর আশীর্বাদ) এখনো চলছে এ-প্রথা। আমরা জানি যে গর্ভিণীর পেট দেখে স্বতস্ফূর্তভাবে বিব্ৰত বোধ করে শিশুরা, বালিকারা, ও পুরুষেরা, অধিকাংশ সময় প্রকাশ পায়কৌতুকের হাসিতে। সমাজ এর প্রতি যতোই যুক্তি দেখাক না কেনো গর্ভধারণের ব্যাপারটি আজো জাগিয়ে তোলে স্বতর্ফূর্ত ঘেন্নার বোধ। আর ছোটো বালক যদিও শৈশবে ইন্দ্রিয়সুখে জড়িত থাকে মায়ের মাংসের সাথে, কিন্তু যখন সে বড়ো হয়, সামাজিকীকরণ হয় তার, এবং বোধ করে অস্তিত্বের স্বাতন্ত্র, তখন ওই একই মাংস সন্ত্রস্ত করে তাকে; সে এটা অস্বীকার করে এবং মায়ের মধ্যে সে দেখে শুধু এক নীতিপরায়ণ ব্যক্তিকে। সে যে মাকে শুদ্ধ ও সতী বলে বিশ্বাস করার জন্যে উদ্বিগ্ন থাকে, তা যতোটা যৌন ঈর্ষার কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি এ-কারণে যে সে মাকে একটি শরীর হিশেবে দেখতে রাজি নয়। যৌবনে সদ্য পা দেয়া কিশোর বিব্রত বোধ করে, লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে যদি সঙ্গীদের সাথে থাকার সময় সে হঠাৎ মুখোমুখি হয় মায়ের, বোনদের, বা কোনো আত্মীয়ার : এর কারণ তাদের উপস্থিতি তাকে মনে করিয়ে দেয় সে-সীমাবদ্ধতার কথা, যার থেকে সে পালিয়ে যেতে চায়, এটা মেলে ধরে সে-শেকড়, যার থেকে সে ছিন্ন করতে চায় নিজেকে। মায়ের চুম্বনে আদরে বালকের বিরক্তিরও একই তাৎপর্য; সে অস্বীকার করে পরিবার, মা, মায়ের বুক। তার ভালো লাগতো পৃথিবীতে হঠাৎ বিকশিত হতে পারলে, অ্যাথেনার মতোপরিপূর্ণগঠিত, সশস্ত্র, অপরাজেয়। মায়ের পেটে বিকশিত হওয়া ও তারপর শিশুরূপে জন্ম নেয়া হচ্ছে সে-অভিশাপ, যা ঝুলে আছে তার নিয়তির ওপর, সে-অশুচিতা, যা দূষিত করে তার সত্তাকে। এবং এটা তার মৃত্যুরও ঘোষণা। বীজায়ন তন্ত্রের সাথে সব সময়ই জড়িত হয়ে আছে মৃত্যুর তন্ত্র। মাতা বসুমতী গ্রাস করে তার সন্তানদের অস্থিপুঞ্জ। যারা বয়ন করে মানবজাতির নিয়তি–পারকেয়ে, মোইরাই–তারা নারী; আবার তারাই ছিড়ে ফেলে সুতো। অধিকাংশ জনপ্রিয় উপস্থাপনে মৃত্যু এক নারী, এবং মৃতের জন্যে বিলাপ নারীর কাজ, কেননা মৃত্যু তাদেরই কর্ম।
তাই নারী-মাতার মুখমণ্ডল ছায়াচ্ছন্ন : সে হচ্ছে সে-বিশৃঙ্খলা, যেখান থেকে সবাই এসেছে এবং একদিন যেখানে সবাইকে ফিরতে হবে; সে হচ্ছে শূন্যতা। রাত্রিতে বিশ্বের বহু রকমের বৈশিষ্ট্য বিভ্রান্তিজাগানো অবস্থায় থাকে, যা উদ্ভাসিত হয় দিনের আলোতে। সমুদ্রের গভীর তলদেশে আছে রাত্রি : নারী মারে তেনেব্রারুম, অন্ধকার সাগর, যাকে ভয় করেছে পুরোনো দিনের নাবিকেরা; পৃথিবীর অন্ত্রে আছে রাত্রি। পুরুষ এ-রাত্রি, যা উর্বরতার বিপরীত, যা তাকে গিলে খেতে চায়, তার ভয়ে ভীত। তার অভিকাঙ্খা হচ্ছে আকাশ, আলোক, রৌদ্রদীপ্ত শিখর, নীলাকাশের বিশুদ্ধ ও স্ফটিক কামশীতলতা; এবং তার পায়ের নিচে আছে এক আর্দ্র, উষ্ণ, ও আঁধারাচ্ছন্ন উপসাগর, যা প্রস্তুত হয়ে আছে তাকে তলদেশে টানার জন্যে; অজস্র উপকথায় আমরা দেখতে পাই নায়ক লুপ্ত হয়ে গেছে মাতৃধর্মী ছায়ায়–গুহায়, রসাতলে, নরকে।
