প্রতিটি সুবিধারই খারাপ দিক হিশেবে সব সময় থাকে কিছু ভার; তবে ভারটা যদি হয় খুবই বেশি, তখন ওই সুবিধাটিকে আর দাসত্বশৃঙ্খলের থেকে অন্য কিছু মনে হয় না। অধিকাংশ শ্রমিকের জন্যে আজ শ্রম হচ্ছে একঘেয়ে ধন্যবাদহীন ক্লান্তিকর খাটুনি, আর নারীর বেলা সুনির্দিষ্ট সামাজিক মর্যাদা, তার আচরণের স্বাধীনতা, বা আর্থিক মুক্তি লাভের মধ্যে দিয়ে এর ক্ষতিপূরণ ঘটে না; তাই অনেক নারী শ্রমিক ও কর্মচারীর পক্ষে কর্মের অধিকারকে মনে হতে পারে বাধ্যবাধকতা, যা থেকে বিয়ে তাদের পরিত্রাণ করবে। এ-কারণে যে নারী সচেতন হয়ে উঠেছে নিজের সম্পর্কে এবং যেহেতু সে একটি চাকুরি নিয়েনিজেকে মুক্ত রাখতে পারে বিয়ে থেকে, তাই সে আর ভীরুতার সাথে গার্হস্থ্য অধীনতা মেনে নেয় না। সে যা আশা করে, তা হচ্ছে পারিবারিক জীবন ও চাকুরির মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের জন্যে তাকে নিঃশেষকর, কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে না। তার পরও, যতো দিন থাকবে সুবিধার প্রলোভন আর্থনীতিক অসাম্য, যা বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করে এবং এ-সুবিধাপ্রাপ্ত কোনো একটি পুরুষের কাছে নারীর নিজেকে বিক্রি করার স্বীকৃত অধিকার। স্বাধীনতার পথ বেছে নেয়ার জন্যে পুরুষের থেকে নারীর দরকার হয় অনেক বেশি নৈতিক উদ্যোগ। এটা যথেষ্টরূপে অনুধাবন করা হয় নি যে প্রলোভনও প্রতিবন্ধকতা, এবং অতিশয় ভয়ঙ্করগুলোর একটি। এখানে আছে একটা ধোঁকাবাজি, কেননা প্রকৃতপক্ষে বিয়ের লটারিতে হাজার হাজারের মধ্যে বিজয় হবে একজন। আধুনিক কাল নারীদের আমন্ত্রণ জানায়, এমনকি বাধ্য করে কাজ করতে; কিন্তু এটি তাদের চোখের সামনে মেলে রাখে আলস্য ও প্রমোদের স্বর্গের সূলিক : যারা বাঁধা থাকে মাটির সাথে, তাদের থেকে এটা জয়ীদের উন্নত করে অনেক উর্ধ্বে।
আর্থিক জীবন, তাদের সামাজিক উপযোগিতা, বিয়ের মর্যাদা প্রভৃতিতে পুরুষ অধিকার করে আছে যে-সুবিধাজনক স্থান তাতে নারীরা উৎসাহ বোধ করে পুরুষদের খুশি করতে। নারীরা এখনো, অধিক অংশে, আছে অধীন অবস্থায়। তাই নারী নিজেকে দেখে না এবং তার পছন্দগুলোও করে না তার প্রকৃত স্বভাব অনুসারে বরং করে যেভাবে পুরুষ তাকে সংজ্ঞায়িত করে। তাই আমরা প্রথম নারীকে বর্ণনা করবোপুরুষ নারীকে স্বপ্নে যেমন দেখতে চেয়েছে, কেননা তার বাস্তব পরিস্থিতির একটি আবশ্যক কারণ হচ্ছে পুরুষের-চোখে-তাকে-কেমন-দেখায়।
স্বপ্ন, ভয়, প্রতিমামধ্য
প্রথম খণ্ড । ভাগ ৩ – কিংবদন্তি। পরিচ্ছেদ ১
ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে পুরুষেরা সব সময় নিজেদের হাতে ধরে রেখেছে সব বস্তুগত ক্ষমতা; পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার আদিকাল থেকে তারা নারীকে পরনির্ভর অবস্থায় রাখাকেই মনে করেছে সবেচেয়ে ভালো, তাদের আইনগত বিধিবিধান তৈরি হয়েছে নারীর বিরুদ্ধে; এবং এভাবে তাকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অপররূপে। এ-ব্যবস্থা হয়েছে পুরুষের আর্থিক-স্বার্থের উপযোগী; এবং এটা খাপ খেয়েছে তাদের অস্তিত্বস্বরূপতাত্ত্বিক ও নৈতিক আত্মাভিমানের সাথেও। একবার কর্তা যখন নিজেকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তখন অপর, যে কর্তাকে সীমাবদ্ধ ও অস্বীকার করতে চায়, সেও কর্তার কাছে হয়ে ওঠে আবশ্যক : সে আত্মসিদ্ধি লাভ করে সে-সত্যের মাধ্যমে সে যা নয়, যা তার থেকে ভিন্ন কিছু। এজন্যেই পুরুষের জীবন কখনো প্রাচুর্য ও প্রশান্তি নয়; তা অভাব ও সক্রিয়তা, তা সংগ্রাম। নিজের সামনে, পুরুষ মুখোমুখি হয় প্রকৃতির; তার কিছু ক্ষমতা আছে প্রকৃতির ওপর, সে চায় নিজের বাসনা অনুসারে প্রকৃতিকে রূপ দিতে। তবে প্রকৃতি তার অভাব পূরণ করতে পারে না। হয়তো প্রকৃতি দেখা দেয় এক বিশুদ্ধ নৈর্ব্যক্তিক বিরোধিতারূপে, সে একটি বাধা এবং থেকে যায় আগন্তকরূপে; বা সে অক্রিয়ভাবে পুরুষের ইচ্ছের কাছে ধরা দেয় এবং সম্মত হয় সামঞ্জস্য লাভ করতে, তাই পুরুষ তাকে শুধু গ্রাস করে। অর্থাৎ, তাকে ধ্বংস করে–অধিকার করে। উভয় ক্ষেত্রেই পুরুষ থেকে যায় নিঃসঙ্গ; সে। নিঃসঙ্গ যখন সে ছোঁয় একটি পাথর, নিঃসঙ্গ যখন সে খায় একটি ফল। অপর-এর উপস্থিতি ঘটতেই পারে না যদি না অপর উপস্থিত থাকে তার ভেতরে এবং তার জন্যে : তাই বলা যায় সত্যিকার বিকল্পতা–অপরত্ব হচ্ছে আমার চেতনার থেকে পৃথক এক চেতনা এবং আমার চেতনার সাথে বস্তুত অভিন্ন এক চেতনা।
প্রত্যেক স্বতন্ত্র সচেতন সত্তা চায় একমাত্র নিজেকে সার্বভৌম কর্তা হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। প্রত্যেকেই নিজেকে চরিতার্থ করতে চায় অন্যকে দাসে পরিণত করে। তবে দাস যদিও কাজ করে এবং ভয়পায়, তবু সে একরকমে নিজেকে বোধ করে প্রয়োজনীয়; এবং এক দ্বান্দ্বিক বিপ্রতীপ রীতিতে প্রভুই নিজেকে বোধ করে অপ্রয়োজনীয়। পুরুষ নির্জনতার মধ্যে নিজেকে চরিতার্থ করতে পারে না, তাই পুরুষ তার সহচরদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে থাকে নিরন্তর বিপদের মধ্যে; তার জীবন এক কঠিন সাহসী উদ্যোগ, যাতে সাফল্য কখনোই নিশ্চিত নয়।
অন্যান্য পুরুষের অস্তিত্ব প্রতিটি পুরুষকে ছিন্ন করে আনে তার সীমাবদ্ধতা থেকে এবং তাকে সমর্থ করে তার সত্তার সত্যতাকে পূর্ণ করে তুলতে, সীমাতিক্ৰমণতার মধ্য দিয়ে, কোনো লক্ষ্যের দিকে যাত্রার মধ্য দিয়ে, কর্মের মধ্য দিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ করতে। তবে এ-স্বাধীনতা আমার নিজের নয়, আমার স্বাধীনতার আশ্বাস দিয়েও এটি তার বিরোধিতা করে : হতভাগ্য মানব চৈতন্যের ট্র্যাজেডি এখানেই; প্রতিটি সচেতন সত্তা শুধু একলা নিজেকে সার্বভৌম কর্তারূপে প্রতিষ্ঠিত করার অভিকাঙ্খী। অপরকে দাসে পরিণত করে প্রত্যেকে পরিপূর্ণ করতে চায় নিজেকে। কিন্তু দাস, যদিও সে কাজ করে ও ভয় পায়, কোনো-কোনো রকমে নিজেকে বোধ করে অপরিহার্যরূপে; এবং একটা দ্বান্দ্বিক বিপর্যাসের ফলে প্রভুকেই মনে হয় অপ্র্যোজনীয় বলে। যদি প্রতিটি ব্যক্তি খোলাখুলিভাবে অপরকে স্বীকার করে নেয়, যদি প্রত্যেকে যুগপৎ নিজেকে ও অপরকে পারস্পরিক রীতিতে গণ্য করে কর্ম ও কর্তারূপে, তাহলে এবিরোধ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সুতরাং নির্জনতার মধ্যে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে অসমর্থ হয়ে পুরুষ তার সহচরদের সাথে সম্পর্কের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে বিপদগ্রস্ত : তার জীবন এক দুঃসাধ্য কর্মোদ্যোগ, যাতে সাফল্যলাভ কখনোই নিশ্চিত নয়।
